পরগাছা |২১|
ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
শাহরিয়ার এর শরীরটা আজ ভালো নেই। কেমন ম্যাজ ম্যাজ করছে। শীত শীত অনুভূত হচ্ছে। আজ সারাদিনে তৃপ্তির সাথে দুমুঠো খেতে পারেনি। জ্বর আসার পূর্ব লক্ষণ। গ্রামের মোড় থেকে দুপুরেই ফিরে এসেছে। আড়তের কাজ একজন বিশ্বস্ত কর্মচারীর হাতে ছেড়ে দিয়েছে এক দিনের জন্য। যেভাবে পারে একটা দিন সামলিয়ে নিক।
ঘড়ির কাঁটার দখলদারিত্ব নয়টার ঘরে। রাতের গভীরতা অনেকখানি। এতক্ষণে গ্রামের সকলে গভীর তন্দ্রায় তলিয়েছে। দুমুঠো অন্নের জন্য সারাদিন হাড়ভাঙা পরিশ্রম করে সকলে। সন্ধ্যার পর খেয়ে দেয়ে খাটা খাটুনির শরীর বিছানায় ছোঁয়াতেই ঘুমের দেশে পাড়ি জমায়। শাহরিয়ার নিজ কক্ষে শুয়ে আছে। ঘরের দাওয়ায় বসে আছেন ববিতা শাহ্ এবং কমলিকা। ছেলের জন্য মায়ের চোখে ঘুম নেই আজ। তাই অসুস্থ শরীর নিয়েই বউমার সাথে এটা সেটা নিয়ে টুকটাক আলোচনা করছেন। সেই সময়ে বাড়ির প্রধান ফটক খোলার শব্দ শোনা গেল। টিনের দরজাটা ক্যাচ-ক্যাচ শব্দ তুলল। ওনারা দুজন তাকালেন সেদিকে। অন্ধকারে ঠিক ঠাহর করতে পারলেন না। পরপরই উঠানে দৃশ্যমান হলো একটা মানুষের অবয়ব। আস্তে ধীরে লণ্ঠনের আলোয় মুখটা স্পষ্ট হলো। রক্তাক্ত একখানা পরিচিত মুখাবয়ব চোখের পর্দায় ভাসল। মুখমণ্ডলের একপাশে তাজা র ক্ত শুকিয়ে কড়কড়ে হয়ে আছে। পরিহিত পাঞ্জাবীর উপরাংশ র ক্তে স্নানিত। জায়গায় জায়গায় কুঁচকে গেছে। চুলগুলো উস্কো খুস্কো। ববিতা শাহ্ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলেন। কমলিকা নিজেও স্থবির হয়ে পড়েছে। পরিপাটি মানুষের এই রুপ বড্ড অচেনা।
সেই সময়ে কক্ষ থেকে বের হলো শাহরিয়ার। একা একা ভেতরে শুয়ে থাকতে ভালো লাগছে না। সঙ্গ দিবে মা এবং অর্ধাঙ্গিনীকে। কিন্তু ছেলেটা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল চৌকাঠের নিকট। আর এক পাও এগোতে পারল না। বন্ধুর এই ভঙ্গুর সত্তা বুকে কাঁপন ধরাল। বোকা মেয়েটা যদি একটা বার দেখত এই অগোছালো আরুষকে তবে কি পারত মুখ ফিরিয়ে নিতে? পারত বোধহয়! তীব্র অভিমানের জোরে ঠিক পারত। যেই অভিমান নিয়ে নিজের সুখ, সংসার ত্যাগ করল তার কাছে এই যাতনা যৎসামান্য। শাহরিয়ার এর বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। বড়ো বড়ো পা ফেলে ঘরের দাওয়া থেকে নেমে গেল। আরুষের মুখোমুখি দাঁড়াল। অবাক চোখে দেখে চলল প্রাণপ্রিয় বন্ধুকে। অকস্মাৎ দুহাতে নিজের সাথে জড়িয়ে ধরল। পিঠে হাত বুলিয়ে আশ্বাস দিল,
“নদীর চরে চল। সবসময় আছি তোর জন্য। আজকের রাতটা তোর জন্য বরাদ্দ।”
আরুষ নির্বিকার। কেবল ঠোঁটের কোণে এক চিলতে ক্ষীণ হাঁসি দাগ কেটে গেল। পুরোটা গ্রাম তন্ন তন্ন করে খুঁজে অবশেষে সে বন্ধুর দ্বারস্থ হয়েছেন। শাহরিয়ার আরুষকে ছেড়ে দিল। আরুষ আর দাঁড়াল না। যন্ত্রের ন্যায় হাঁটা ধরল রাস্তার দিকে। শাহরিয়ার ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে চাইল। মা এবং বউয়ের উদ্দেশে বলল,
“বাইরে যাচ্ছি আমি। ফিরতে রাত হবে। কমলিকার কাছে থেকো মা।”
ববিতা শাহ্ অধর নাড়িয়ে কিছু বলতে নিবেন তক্ষুনি কমলিকা ওনার হাত চেপে ধরল। ইশারায় চুপ থাকতে বলল। শাহরিয়ার এর নজর এড়াল না কিছুই। হনহনিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। ববিতা শাহ্ সেদিকে তাকিয়ে বললেন,
“আমার ছেলের শরীরটা ভালো নেই বউমা। আমাকে থামালে কেন? এই রাতে বাবুর বাইরে থাকা উচিত নয়।”
কমলিকা শাশুড়ির কথায় মুচকি হাসল,
“আপনার ছেলে ছোট নেই মা। সে নিজের ভালো মন্দ বোঝে। আরুষ ভাইজানের এখন তাকে প্রয়োজন। সঙ্গ দিতে দিন। বন্ধুত্বে ফাটল ধরিয়ে লাভ নেই আমাদের।”
ববিতা শাহ্ বড়ো একটা শ্বাস ফেললেন,
“ছেলেটা নিজের কী অবস্থা করেছে! বউয়ের শোকে নির্ঘাত পাগল হয়েছে।”
কমলিকার মুখের হাসি বাড়ল। কষ্টের হাসি এটা। গুঞ্জরিকার সাথে শেষ দেখাটা মানসপটে উঁকি দিল। মেয়েটা ঠিক কতটা যন্ত্রনা নিয়ে এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে হয়ত কারোরই জানা নেই। জানবে কীভাবে? মেয়েটাকে তো একঘরে করে দিয়েছিল। কথাই বলত না কেউ ঠিকমতো। দুচ্ছাই, দুচ্ছাই করত। শেষ বেলায় কাউকে পাশে পায়নি। কমলিকার খুব মায়া হয় ওই নম্র ভদ্র মেয়েটার জন্য। একজীবনে স্বামীকে অন্য নারীর সাথে দেখার মতো কষ্ট ও তাকে পেতে হলো। এর থেকে বোধহয় মরণ শ্রেয় একজন মেয়ের কাছে। নারী জীবনের সব দুঃখ একদিকে আর স্বামীর ভাগ দেওয়ার দুঃখ একদিকে। হাহ্! সবই অদৃষ্টের পরিহাস। কমলিকা মুখে বলল,
“এখন পাগল হয়ে লাভ আছে, মা? আমরা মানুষেরা গাছ উপড়ে পানি দিতে বড্ড পারদর্শী। অথচ থাকতে যত্ন নিতে পারি না। ফিরেও দেখি না সেদিকে।”
ববিতা শাহ্ এই সত্যিটুকু অস্বীকার করলেন না। বরং আরও একবার চমৎকারভাবে উপলব্ধি করলেন। দুজনের কেউই আর কোনো কথা বলল না। দুরাকাশে দৃষ্টি নিবদ্ধ রেখে চুপচাপ ঠায় বসে রইল। যার দুঃখ তাকেই বয়ে বেড়ানো লাগে। আমরা বড়ো জোর দুটো কথা বলে সান্ত্বনা দিতে পারি। এর বেশি কিছু না। যার ঘা, তারই সব জ্বালা যন্ত্রণা।
.
বহমান নদী আর মানবজীবনের মধ্যে একটা দারুণ মিল আছে। কথায় আছে, নদীর একুল ভাঙে তো ওকুল গড়ে। আমাদের মানুষের জীবন ও ঠিক এমনই। আমরা পুরোনো কিছু হারায় নতুনত্বের স্বাদ নিতে। আমাদের জীবনে দুঃখ আসে সুখকে ভেতর থেকে উপলব্ধি করাতেই। তবে কিছু ক্ষেত্রে ভিন্নতা আছে বৈকি। কিছু মানুষ থাকে জনমদুঃখী। যাদের কেবল কুল কিনারা ভেঙেই যায়। নতুন করে আর গড়ে ওঠে না। তারা একুল, ওকুল দুকুল হারিয়ে মাঝ নদীতে ভেসে বেড়ায়।
গ্রামের পাশ দিয়ে প্রবাহিত নদীর সাঁকোর মাঝামাঝিতে দুই বন্ধু পাশাপাশি বসে আছে। দুজনের পা জোড়া নদীর পানি ছুঁই ছুঁই। এই সময়ে প্রতি বছর তটিনীর পানি বাড়ে। এবারও তার ব্যতিক্রম নয়। চন্দ্রের আলো এসে খেলা করছে তরঙ্গে। নির্মল সলিলে ফুটে উঠেছে সুন্দরী শশীর স্বচ্ছ প্রতিবিম্ব। আরুষের দৃষ্টি নিবিষ্ট সেখানেই। অপরদিকে শাহরিয়ার চেয়ে আছে বন্ধুর ক্লান্ত মুখটাতে। চারপাশ আঁকড়ে আছে অদৃশ্য এক নীরবতার জাল। এই পর্যায়ে সেই নিগূঢ় নিস্তব্ধতা ভেঙে দিল শাহরিয়ার। ম্লান কণ্ঠে শুধাল,
“খুব কষ্ট হচ্ছে তোর?”
আরুষের নদীর পানি থেকে চোখ সরল না। জবাব ও দিল না তৎক্ষণাৎ। বিশেষ কোনো হেলদোল দেখা গেল না ছেলেটার মধ্যে। বেশ কিছুক্ষণ সময় পেরোল সেভাবেই। শাহরিয়ার হাল ছেড়ে দিল। এখানে এসে বসেছে কম করেও আধাঘণ্টা পেরিয়েছে। অথচ ছেলেটার মুখ থেকে একটা শব্দও বের হয়নি। কিন্তু এইবার শাহরিয়ার এর নিজের ভাবনা ভুল প্রমাণিত হলো। শুনতে পেল আরুষের নির্লিপ্ত জবাব,
“আমার কি কষ্ট পাওয়া উচিত?”
ফিরতি এমন উদ্ভট প্রশ্নে শাহরিয়ার একটু অবাক হলো। বিস্ময়ের সাথে বলল,
“তুই তো দিব্যি কষ্ট পাচ্ছিস দোস্ত।”
আরুষ এতক্ষণে দৃষ্টি চ্যুত হলো। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকাল পাশে বসা বন্ধুর দিকে। নিষ্প্রাণ চাহনি। ওই দৃষ্টিতে শাহরিয়ার বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারল না। মুখ ফিরিয়ে নিল। আরুষ তাচ্ছিল্য হাসল। শীতল কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“গুঞ্জন কোথায়?”
শাহরিয়ার নড়েচড়ে বসল। চোখে চোখ রাখার দুঃসাহস করল না। পাছে যদি ধরা পরে যায়? নদীর ঢেউয়ে চেয়ে নরম গলায় উত্তর দিল,
“আশ্চর্য! আমি কীভাবে জানব ভাবী কোথায়?”
আরুষ একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল শাহরিয়ার এর দিকে। এতে ছেলেটার বড্ড অস্বস্তি লাগছে। নিজেকে অপরাধী মনে হচ্ছে। বন্ধুর কষ্টে বুক পুড়ছে কিন্তু সে নিজেও যে ওয়াদা বদ্ধ। কীভাবে পারে নিরপরাধ একজন মেয়েকে দেওয়া কথার খেলাপ করতে? এটা তো কস্মিনকালেও সম্ভব নয়। আরুষ কী বুঝল কে জানে! মাথা নেড়ে হাসল। পরপরই সাঁকোর উপরেই শরীর ছেড়ে দিল। কিছুক্ষণ নীরব রইল। অম্বরের রুপবতীর দিকে চেয়ে বলল,
“ভালোবেসেছিলাম তাকে। অথচ নিজের দোষ গুণের মারপ্যাঁচে খুইয়ে বসলাম। নিজেদের সাথে ঘটে যাওয়া অন্যায়ে যখন আমরা দোষী থাকি তখন কারোর কাছে সাহায্য চাওয়ার মুখ থাকে না। মানবজাতিও মুখ ফিরিয়ে নেয়। কাছের সকলে পর হয়ে যায়। কিন্তু আল্লাহ? তিনি নিশ্চয় তার বান্দার খারাপ সময়ে সঙ্গ ছেড়ে দেন না? আমি আল্লাহর কাছে চাইব আমার গুঞ্জনকে। প্রতি ওয়াক্ত নামাজে সে থাকবে আমার প্রার্থনায়। নিজের সর্বোচ্চ দিয়ে খুঁজব। যতদূর সম্ভব খুঁজে যাব। নিজের শেষ নিঃশ্বাসের আগ অবধি খুঁজব। সুদূর মক্কার কাবা শরীফে কপাল ছুঁইয়ে তাকে চাইব। তাহলে নিশ্চয় আমাকে খালি হাতে ফিরতে হবে না? মানবকুল ত্যাগ করে আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দা হয়ে জীবন পার করব। এক জীবনের সব পাপ-কলঙ্ক ধুয়ে মুছে নিঃশেষ হয়ে যাক আমার।”
শাহরিয়ার চকিতে ফিরে তাকাল বন্ধুর দিকে। এতক্ষণ মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিল কথাগুলো। এভাবে আজ অবধি কখনো নিজের অসহায়ত্ব দেখায়নি আরুষ। স্বল্পভাষী ছেলেটা সুখ, দুঃখ নিজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ রাখতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করে। কিন্তু আজ! কিছু সময়ের ব্যবধানে এত পরিবর্তন! তবে কি শাহরিয়ার এর ভাবনা ভুল ছিল না? বন্ধুর ভালোবাসায় আসলেই কোনো খাদ নেই। কিন্তু সবকিছুর মধ্যিখানে দ্বিতীয় বিয়ে শব্দটা প্রশ্ন হয়ে থেকে যায়। পবিত্র ভালবাসার মধ্যে দেওয়াল হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এত ভালোবাসায় দ্বিতীয় বিয়ে কীভাবে জায়গা করে নিল? ভেতরের ঘটনা না জানা অবধি এই রহস্যের জাল ভেদ করা সম্ভব নয়। শাহরিয়ার মৃদু হাসল,
“উত্তম সিদ্ধান্ত দোস্ত। ভুল থেকে যদি ভালো কিছু হয় তবে ক্ষতি নেই। তুই যে নিজের ভুল বুঝতে পেরেছিস এই অনেক। এইবার ইন শা আল্লাহ সবটা ভালো হবে।”
একটু থেমে ফের বলল, “কিন্তু চন্দ্রা ভাবীর কী হবে? তালাক দিয়ে দিবি?”
আরুষ আখি জোড়া বুঁজে নিল। বুক চিরে ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চারপাশে আলোড়ন তুলল শান্ত গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“যে যেভাবে আছে থাক। আম্মার পাপের জন্য তার সাথে আমি অন্যায় করতে পারি না। একটা আশ্রয় চেয়েছে সে। নিঃসঙ্গ হয়ে একই ছাদের নিচে থেকে যাক। কাটিয়ে দিক তার একজীবন। তবে আমাকে পাওয়ার স্বপ্নটা বৃথা এই যা।”
শাহরিয়ার অবাকের শীর্ষে পৌঁছাল। হতবাক হয়ে জানতে চাইল,
“তোদের মধ্যে শারীরিক কিছু হয়নি? এক কক্ষে থেকেও তোরা একে অপরকে ছুঁয়ে দেখিসনি?”
আরুষ নেত্রপল্লব মেলে তাকাল। অবজ্ঞার সুরে হাসল। পরক্ষণেই চুপ হয়ে গেল। চোখের কার্নিশ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ল। সেই জল মুক্তোর মত চকচক করছে। শাহরিয়ার বাকরুদ্ধ হয়ে দেখে চলেছে সবটা। আরুষকে স্বাভাবিক দেখাচ্ছে না। এই অস্বাভাবিক আরুষ তার নিকট ভীষণ অচেনা। ভাবনার মাঝেই শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল আরুষের করুণ গলার আওয়াজ,
“চলবে না দোস্ত। গুঞ্জনকে ছাড়া আমার চলবে না। আমি অসহায় তাকে ছাড়া। গুঞ্জন ব্যতীত আমি আমার একটা পাঞ্জাবীও খুঁজে পাই না। তাহলে তাকে ছাড়া এই জীবন কীভাবে পাড়ি দিব? তুই তো জানিস কোথায় সে। ফিরে আসতে বল না দোস্ত। আম্মা আমাকে শেষ করে দিল। বিশ্বাস কর, আমি এতটা কাপুরুষ কখনো হতে চাইনি।”
কথাগুলোর মধ্যে যেন এক পৃথিবী সমান অসহায়ত্ব লুকিয়ে আছে। নিজের উত্তর সহজেই পেয়ে গেল শাহরিয়ার। বন্ধুর দুঃখে তার গাল বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়ল। সে নিজেও অপারগ। একজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে তো কিছু করা সম্ভব নয়। তবুও মনস্থির করল আগামীকালই যাবে ভাবীর কাছে। একটা বার অনুরোধ করে বলবে ভাবীকে ফিরে আসতে। শেষ চেষ্টা তো করায় যায়। ভাই সমতূল্য বন্ধুর কষ্ট সে সহ্য করতে পারছে না। নিজেও আরুষের পাশে শুয়ে পড়ল। দুই বন্ধু নীরবে নিভৃতে সময় কাটিয়ে চলল। তাদের সঙ্গ দিল ওই আসমানের চন্দ্রমা, বয়ে চলা ঝিরিঝিরি হাওয়া এবং নদীর তরঙ্গ। মাঝেমধ্যে অবশ্য নিশাচর পক্ষী কুল ও সঙ্গ দিতে এল। বন্ধুর দুঃসময়ের ঢাল হলো শাহরিয়ার। স্বার্থ ছাড়া বন্ধুত্ব গুলো দেখতেও ভালো লাগে। সবার ভাগ্যে এমন একজন শাহরিয়ার থাকুক। এতে ভালো বই মন্দ নেই।
.
আরুষ যখন বাড়িতে ফিরল তখন রাতের শেষ প্রহর চলমান। আর কিছু সময়ের ব্যবধানেই ফজরের আযান দিবে। শাহরিয়ার আরুষকে বাড়ির প্রধান ফটক অবধি দিয়ে তারপর গেছে। শেখ বাড়িটা অশরীরীর ন্যায় দাঁড়িয়ে আছে। প্রাণহীন বাড়িটা দেখলেই আরুষের বুকভার হচ্ছে। যন্ত্রনারা কিলবিল করে মস্তিষ্ক খুবলে খাচ্ছে। শান্তি পাচ্ছে না একদণ্ড। মন চাইছে সব ছেড়েছুড়ে দেশান্তরী হতে। আর কখনো এই বাড়ি মুখো না হতে। যেখানে তার গুঞ্জন নেই সেখানে সে কীভাবে থাকবে? থাকা আদৌতে সম্ভব? ঘৃণার সম্পর্ক ছিল তবুও তো আরুষের সামনে থাকত মেয়েটা। কিন্তু এখন কোথাও নেই।
আরুষ আলগোছে সদর দরজা খুলতেই প্রথমেই চক্ষু গোচর হলো আদিতির বদনখানা। খাবার টেবিলে মাথা রেখে বসে আছে। চোখজোড়া বুজে আছে। হয়ত ভাইজানের জন্য অপেক্ষা করতে যেয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। পাশেই একখানা লণ্ঠন মৃদু আলোয় জ্বলছে। আরুষ একঝলক দেখে চোখ ফিরিয়ে নিল। দরজা আটকে গুটি গুটি পায়ে সিঁড়ির দিকে অগ্রসর হলো। ঘুমন্ত বোনকে ডাকতে মন সায় দিল না। প্রথম সিঁড়িতে পা দিতেই পিছন থেকে ভেসে এল অদিতির গলা,
“খাবে না ভাইজান? এসে অবধি কিচ্ছুটি মুখে দিলে না যে।”
আরুষের পদযুগল থেমে গেল। পিছনে ফিরে দাঁড়াল। মুখটা স্বভাবসুলভ গম্ভীর রেখেই জবাব দিল,
“না, ক্ষুধা নেই। তুই না ঘুমিয়ে এখানে অপেক্ষা করছিস কেন? অন্যের জন্য নিজেকে কষ্ট দিতে নেই।”
“অথচ ভাবীজানের জন্য দিব্যি তুমি নিজেকে কষ্ট দিচ্ছ।”
কথাটা বলেই অদিতি মলিন চাহনিতে চেয়ে রইল। আরুষ কী বলবে ঠিক বোধগম্য হলো না। ওকে দেখেই কি তবে কষ্টের সাগর মনে হচ্ছে? যে দেখছে সেই উপলব্ধি করতে পারছে। এতটা সহজপাঠ্য কবে হলো? কী মুশকিল! ছোট্ট করে বলল,
“আমার কথা বাদ দে। তুই কক্ষে যেয়ে ঘুমিয়ে পড়।”
অদিতি এই পর্যায়ে বেশ আক্ষেপের সাথেই বলে উঠল,
“তুমি প্রতিবাদ ঠিকই করলে ভাইজান কিন্তু দুঃখের বিষয় সময় ফুরানোর পরে। ভাবীজানের কাপুরুষ থেকে সুপুরুষের খাতায় নাম লেখালে তবে সব খুইয়ে। তোমার উপর দুঃখের চাইতে রাগটাই বেশি আসে ভাইজান। তোমাকে আম্মা মানুষের মতো মানুষ করতে ব্যর্থ হয়েছে। অবশ্য তিনি নিজেই তোমাকে এভাবে গড়েছে। নিজের ভালো পাগলেও বোঝে। অথচ মা-ভক্ত তুমি বুঝলে না ভাইজান। এই আক্ষেপ আমার এই জীবনে শেষ হবে না।”
কঠিন সত্য এবং তিক্ততায় মোড়ানো বাণ গুলো ছুঁড়ে অদিতি উঠে দাঁড়াল। আরুষের পাশ কাটিয়ে দোতলায় চলে গেল। আরুষ তখনো ঠায় দাঁড়িয়ে রইল। উদাসীন চিত্তে কিছু একটা ভেবে চলল। পরক্ষণেই গুটি গুটি পায়ে নিজের কক্ষের দিকে হাঁটা ধরল। প্রতিক্ষণে উপলব্ধি করছে, এই কলঙ্কের জীবন বয়ে বেড়ানো সহজ নয় তার জন্য। কাপুরুষের সাথে মা-ভক্ত আরও একটা শব্দ তার নামের পাশে যুক্ত হলো আজ। অর্ধাঙ্গিনী এবং মায়ের সাথে সমঝোতার খাতাটা সমান না হলে জীবন কখনোই সুখকর হয় না। হতে পারে না।
চলবে
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা পর্ব ১৯
-
পরগাছা পর্ব ২
-
পরগাছা পর্ব ১১
-
পরগাছা পর্ব ১৮
-
পরগাছা পর্ব ৬
-
পরগাছা পর্ব ১৭
-
পরগাছা পর্ব ১
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
পরগাছা পর্ব ১৬
-
পরগাছা পর্ব ১৪