Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ২০


পরগাছা |২০|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

গ্রামের মধ্যিখানে অবস্থিত চৌধুরী বাড়িটা নির্জীব হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। বাড়ি ভর্তি মানুষ অথচ নেই কোনো কোলাহল। চৌধুরীদের বড়ো ছেলে যেন নিজের সাথেই সম্পূর্ণ বাড়ির সবটুকু আমেজ নিয়ে গেছে। মানুষ গুলো এখন আর আগের মতো একসাথে তিনবেলা খায় না। তাদের দৈনন্দিন জীবনের নিয়মে বিশদ পরিবর্তন এসেছে। বাড়ির চারপাশ ঘিরে সবসময় মৃদুমন্দ গতিতে বিষাদের হাওয়া বয়ে চলে। মধ্যরাতে ক্ষণে ক্ষণে শোনা যায় লাবণ্য চৌধুরীর বুকফাটা আর্তনাদ। সেই রোদনের করুণ সুরে থমকে যায় অশরীরী গুলো। তাদের ও বুকভার হয়। প্রকৃতির সাথে দুঃখ বিলাস করে।

সময় সকাল সাতটা বেজে পাঁচ মিনিট। চৌধুরী পরিবারের গুরুজনেরা বসার ঘরে বসে আছেন। সামনে রোযা সেই নিয়ে আলোচনা করছেন। ত্রিশটা রোযাতেই তারা গরীব দুঃখীদের ইফতার খাইয়ে থাকেন। সকলের মতামত নিয়ে একটা সুন্দর মতো পরিকল্পনা করা হলো। কেনাকাটার দায়িত্ব পড়ল রবীর চাচার বড়ো ছেলে আহনাফ এর উপরে। আগামী পরশুদিন সে নগরে যেয়ে প্রয়োজনীয় সবকিছু কেনাকাটা করে আনবে। কথার এক ফাঁকে তামজাদ চৌধুরীর ছোট ভাই তৈয়ব চৌধুরী বললেন,
“ভাইজান আপনাদের সাথে আমার গুরুত্বপূর্ণ কিছু কথা ছিল।”

তামজাদ চৌধুরী কথা বলছিলেন রেখা চৌধুরীর সাথে। ঘাড় ঘুরিয়ে তাকালেন ছোট ভাইয়ের দিকে। মুচকি হেসে বললেন,
“বলো তৈয়ব। তবে দ্রুত কথা শেষ কোরো। আমার হাতে সময় কম। ঘাট থেকে স্টিমার ছেড়ে দিলে মুশকিল। আজকে নগরে যাওয়া অত্যাবশ্যক।”

ভাইজানের আদেশে তৈয়ব চৌধুরী বাধ্যের মত মাথা নাড়লেন। রয়ে সয়ে একটু আমতা আমতা করলেন,
“ভাইজান আহনাফ এর তো বিয়ের বয়স হয়েছে। এই বিষয়ে একটু এগোতে চাইছি। আফিয়ার বয়স হচ্ছে। কোমরের ব্যথার জন্য কক্ষ থেকে ঠিকমতো বোরোতে পারে না। একজন গল্পের সঙ্গী থাকলে মন্দ হতো না।”
কথাটা বলেই পাশা বসা অর্ধাঙ্গিনীর দিকে তাকালেন তৈয়ব চৌধুরী। আফিয়া খোন্দকার ইশারায় ওনাকে আশ্বস্ত করলেন। পরিবারের এমন দূর্বিষহ অবস্থায় বিয়ে শব্দটা শুনতেই ভ্রু কুঁচকে তাকালেন রেখা চৌধুরী। লাবণ্য চৌধুরী অবশ্য নির্লিপ্ত। একদৃষ্টে মেঝের দিকে তাকিয়ে আছেন। ছোট ভাইয়ের আবদারে হাসলেন তামজাদ চৌধুরী,
“অবশ্যই, মেয়ে দেখো তবে। ভাইজানকে পাশে পাবে সর্বদা।”

তামজাদ চৌধুরীর কথা শেষ হওয়ার সাথে সাথেই তৈয়ব চৌধুরী বলে উঠলেন,
“ভাইজান পাত্রী হিসেবে আফিয়া একজন মেয়েকে পছন্দ করেছে। তার কথাবার্তা, আচার আচরণে ভীষণ মুগ্ধ হয়েছে।”

তামজাদ চৌধুরীর মুখের হাসি বাড়ল। ছোট ভাই তার সবকিছুতেই এগিয়ে। জানতে চাইলেন মেয়ের নাম,
“নাম কী মেয়ের? কোন গ্রামে থাকে? আর্থিক অবস্থা কেমন?”

এই প্রশ্নে একটু নীরবতা খেলে গেল বসার ঘর জুড়ে। সময় নিয়ে তৈয়ব চৌধুরী নামটা উচ্চারণ করলেন,
“অদিতি, অদিতি শেখ।”

নামটা বজ্রপাতের মতো আঘাত হানল কক্ষে। নিগুঢ় নিস্তব্ধতায় মুড়িয়ে গেল কক্ষের সর্বকোণ। রেখা চৌধুরীর কপালে ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। মেঝেতে নিবদ্ধ চোখজোড়া তুলে সামনে তাকিয়েছেন লাবণ্য চৌধুরী। চোখে মুখে অবিশ্বাস্যতা ফুটে উঠেছে। মানুষ গুলো আজ অবধি কেবল প্রতিযোগিতায় করে গেল? মনুষ্যত্বের ডাকে সাড়া দিল না? তামজাদ চৌধুরীর স্তব্ধ হয়ে বসে আছেন। প্রত্যুত্তরে ঠিক কী বলা উচিত ওনার বোধগম্য হচ্ছে না। সবাই যখন হতভম্ব হয়ে বসে আছেন তখন মুখ খুললেন রেখা চৌধুরী। তৈয়ব চৌধুরীর উদ্দেশে তাচ্ছিল্যের সাথে বললেন,
“যেই মেয়ে স্বামীর মৃতদেহ দাফনের সাথে সাথে শ্বশুরবাড়ি ত্যাগ করেছে তাকে আপনি আপনার ছেলের বউ হিসেবে চাইছেন ভাইজান? চাওয়াটা বেশি নয় তবে অবাস্তব। আপনারা তাকে চিনতে ভুল করেছেন। এত ঠুনকো আত্মসম্মান তার নয়।”

তৈয়ব চৌধুরী শুনলেন প্রাণপ্রিয় বোনের কথা। এতক্ষণে তাকালেন লাবণ্য চৌধুরীর দিকে। কণ্ঠে সম্মান মিশিয়ে শুধালেন,
“ভাবী আপনার মতামত জানা অনেক বেশি প্রয়োজন। কিছু তো বলুন?”

লাবণ্য চৌধুরী থমকে বসে আছেন। যেই মেয়েকে নিজের ছেলের জন্য এনেছিলেন, যেই মেয়ে মাত্র দুটো দিনে তার বুকের একাংশে জায়গা করে নিয়েছে তাকে কীভাবে ভাইয়ের বউমা হিসেবে দেখবেন? কিছু একটা ভাবলেন। সেদিন অদিতির অদ্ভুত আচরণ দেখেছিলেন। মেয়েটার মনের উত্তর ওনার অজানা নয়। রবীর মৃত্যুর পরে প্রথম বারের মতো মুচকি হাসলেন,
“আপনারা যান তবে সম্বন্ধ নিয়ে। বাকিটা অদিতির মতামতের উপর নির্ভর করছে। ওটা সম্পর্কে আমি অবগত নই।”

মুখের কথা শেষ করে উঠে দাঁড়ালের লাবণ্য চৌধুরী। শ্লথগতিতে হেটে বসার ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন। সবাই অবাক চোখে দেখল ওনার প্রস্থান। এত সহজে মেনে নেওয়াটা ঠিক হজম হলো না। দুটো দিনে অদিতির সাথে তার সখ্যতা সবাই স্বচক্ষে দেখেছিল। মনে হচ্ছিল যুগ যুগ ধরে পরিচিত তারা। তবে সে যাইহোক, অনুমতি তো পাওয়া গেছে। তৈয়ব চৌধুরী তৃপ্তির সাথে হাসলেন। আফিয়া চৌধুরীর অধরের কোণ ঘেঁষে ক্রুর হাসি লেপ্টে আছে। রেখা চৌধুরীর চোখ এড়াল না সেটা। বড়ো ভাবীজানের সাথে যে ছোট ভাবীজান প্রতিযোগিতায় নেমেছে সেটা বুঝতে আর বাকি নেই। দুই দিনের দুনিয়ায় আমরা হিংসা বিদ্বেষ করেই নিজেদের সবটুকু মূল্যবান সময় ব্যয় করে ফেলি। আল্লাহর দেওয়া আমাদের প্রধান কাজটাই ভুলে যাই। এতে আমাদের ক্ষতি বই লাভ নেই। হাহ্! বোকা মানবকুল।
.

দিনের প্রহর শেষ। মাগরিবের আযান দিয়েছে কিছুক্ষণ আগেই। মুসল্লিরা দলে দলে মসজিদের দিকে ছুটছে। আলোর অস্তিত্ব ক্রমশ ফিকে হয়ে আসছে। আঁধারে মুড়িয়ে যাচ্ছে প্রকৃতি। ঝিঁঝিঁ পোকার দলেরা সংঘবদ্ধভাবে আন্দোলনে নেমেছে। জোনাকির দলেরা ছুটে ছুটে আসছে মানবের বন্ধু হতে। তাই তো অবহেলায় পড়ে থাকা বনজঙ্গলে সৌন্দর্য বাড়িয়ে তুলছে নিজেদের আলোয়। মানুষেরা খিড়কি গলিয়ে মুগ্ধ চোখে দেখছে তাদের নৃত্য। কী চমৎকার উড়ে উড়ে নৃত্য পরিবেশন করছে!

শহর থেকে ফিরেছে আরুষ। গ্রামের মোড় থেকেই মেজবাহ তাকে রোকেয়া শেখ সম্পর্কে সবটা অবগত করেছে। অতঃপর একপ্রকার ছুটে বাড়িতে এসেছে আরুষ। কোনোমতে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে, পরিহিত পোশাক পরিবর্তন করেই মায়ের ঘরে এসেছে। আপাতত শেখ পরিবারের সকলে রোকেয়া শেখের কক্ষে অবস্থান করছে। আজ নিজ বাসগৃহে ফিরে গেছেন সালেহা শেখ এবং সারথী। ভাইজানের দুর্দিনে তিনি একপ্রকার বাধ্য হয়ে ফিরে গেছেন। চেয়েও পারেননি সঙ্গ দিতে। মেয়েদের বিবাহিত জীবন যে এমনই। শ্বশুর নিবাস থেকে চিঠি এসে পৌঁছেছিল আজ সকালে। ইদানিং সালেহা শেখের শ্বশুরের শরীর ভালো যাচ্ছে না। তাই ওনাকে দ্রুত ফিরে যেতে হবে। স্বামীর চিঠি পেতেই বাধ্য বউয়ের মতো দুপুর নাগাদ রওনা দিয়েছেন। দাদা ভাইয়ের অসুস্থতার কথা শুনে সারথী ও আর থাকেনি।

আরুষ মায়ের উদরে বসে আছে। বুকের মধ্যিখানে আঁকড়ে ধরেছে মায়ের মাথাটা। ছেলের ভালবাসা পেতেই রোকেয়া শেখ হাউমাউ করে কাঁদছেন। অনুশোচনায় দগ্ধ হৃদয়ের আর্তনাদ এত সহজে থামার নয়। আরুষ মায়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিচ্ছে। মায়ের মধ্যে কোনো হেলদোল না দেখে এই পর্যায়ে ডাকল,
“আম্মা? কাঁদবেন না। আমি এসে গেছি। আপনি দ্রুত সুস্থ হয়ে উঠবেন। আমি নগরে নিয়ে যাব আপনাকে।”

রোকেয়া শেখ বুঝি থামে? ছেলের কথা শুনে কান্না থামানোর চেষ্টা করলেন তবে সক্ষম হলেন না। কক্ষের একপাশে চেয়ার টেনে বসে আছে আসমান শেখ। মুখটা বেজায় শুকনো দেখ দেখাচ্ছে। একদৃষ্টে জানালার ওপাশে চেয়ে আছেন। একমনে কী যেন ভেবে চলেছেন। আয়েশা শেখ এবং অদিতি আরুষের অপরপাশে বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। সবাইকে ভীষণ চিন্তিত দেখাচ্ছে। অদ্ভুতভাবে বাড়িটা আরও নিশ্চুপ হয়ে উঠেছে। এর কারণ কী? আরুষের তৃষ্ণার্ত চোখ দুটো কাঙ্ক্ষিত একটা মুখ খুজে চলেছে কিন্তু তার দেখা নেই। আরিকার ও খোঁজ নাই। অথচ আরুষ যখন বাইরে থেকে বাসায় ফেরে সে দিব্যি বাবা, বাবা বলে উড়ে এসে দেখা দিয়ে যায়। কিন্তু আজ কী হলো?
নিজের মনের মধ্যে ঘোরপাক করতে থাকা প্রশ্ন গুলো আর দমিয়ে রাখতে পারল না আরুষ। অদিতির দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল। কণ্ঠস্বরে ক্লান্তিভাব উপচে পড়ছে,
“গুঞ্জন কোথায় অদিতি? কোথাও দেখছি না যে।”

অদিতি অন্যমনস্ক ছিল। আরুষের প্রশ্নে নড়েচড়ে বসল। তাকাল ভাইজানের ক্লান্ত মুখটাতে। কেন যেন বুক ফেটে কান্না আসছে মেয়েটার। নিজেকে খুব করে সামলিয়ে নিল। বড়ো একটা শ্বাস ফেলল। ছোট্ট করে জবাব দিল,
“ভাবীজান নাই।”

আরুষের মসৃণ কপাল গুটিয়ে এল। ভ্রু যুগল কুঁচকে গেল। চোখ দুটো ছোট ছোট করে ফের জানতে চাইল,
“নাই মানে?”

অদিতি লুকোচুরি করল না। সোজাসাপ্টাভাবে বলল,
“ভাবীজান শেখ বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। জাহান্নাম থেকে নিজেকে মুক্তি দিয়েছে।”

আরুষ বিদ্যুৎ চমকানোর মতোই চমকাল, থমকাল। হৃৎস্পন্দন ক্রমশ কমে চলল। কুঁচকানো ভ্রু দ্বয়ে শীতলতা খেলে খেল। রোকেয়া শেখকে বেষ্টিত করে রাখা হাত দুটো আলগা হয়ে এল। নিজের কান দুটোকে ঠিক বিশ্বাস করতে পারছে না। এটা কীভাবে সম্ভব? সঙ্গ ত্যাগের মতো এতটা দৃঢ় ঘৃণার দেওয়াল তাদের মধ্যে তৈরি হয়নি। কীভাবে পারল মেয়েটা? একটা বারের জন্যও আরুষের কথা ভাবল না? তার দিকটা বোঝানোর সুযোগটুকু দিল না? সে তো সন্তান সঙ্গ কখনোই চায়নি। চেয়েছে কেবল তার গুঞ্জনকে। যাকে এক দেখায় নিজের দিন দুনিয়া ভুলতে বসেছিল। গুঞ্জন ব্যতীত এই জীবন কাটানো সম্ভব নয়। কীভাবে কাটাবে আরুষ? কীভাবে? আনমনে দাঁড়াতে যেয়ে পায়ে পা বেঁধে পালঙ্ক থেকে মুখ থুবড়ে পড়ল আরুষ। ভ্রুয়ের ক্ষত অংশ প্রবল জোরে ধাক্কা খেল টেবিলের কোনায়। সাথে সাথেই থেঁতলে রক্ত বেরিয়ে এল ক্ষতস্থান থেকে। পুরোনো ক্ষত আবার তরতাজা হয়ে উঠল। মুখমণ্ডলের একপাশ রক্তে স্নানিত হয়ে উঠল। অথচ ছেলেটা উদাসীন। দেহে যেন প্রাণ নেই। টেবিলের পায়ার সাথে হেলান দিয়ে বসল। আলগোছে চোখজোড়া বুজে নিল। মানসপটে ভাসল প্রিয়তমার সাথে শেষ দেখার দৃশ্য টুকু। লাল টকটকে শাড়ি তবে এইজন্য আনতে বলেছিল! শেষ আবদার টুকু এইজন্যই এতটা সুন্দর ছিল! ঝড় উঠল ক্ষতবিক্ষত, ব্যথিত বক্ষস্থলে। আরুষের চোখের কোণ ঘেঁষে পানি গড়িয়ে পড়ল। ঠোঁটের কোণ ঘেষে ক্ষীণ কটাক্ষের হাসির রেশ ছড়াল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আমার পবিত্র ভালোবাসার বিনিময়ে একবুক হাহাকার আর আফসোস দিয়ে আমাকে মেরে গেল। আমাকে দাফনের জন্যই এত এত আয়োজন তার।”

রোকেয়া শেখের কান্নার বেগ আরেকটু বাড়ল। অদূরে বসা আসমান শেখ ছলছল নেত্রে ছেলের দিকে তাকিয়ে আছেন। অদিতির বুকটা জ্বলে পুড়ে যাচ্ছে। ভাইজানকে এবার এভাবেই ধুঁকে ধুঁকে মরতে দেখতে হবে। এতে ভাইজানের দোষ আছে বৈকি! আয়েশা শেখ মুখ ঘুরিয়ে বসে আছেন। সকলের সব যাতনা উপেক্ষা করে বললেন,
“দাদুভাই ওই মাইয়ার লাইগা কাইন্দো না। পোড়া মুখী বিদেয় হয়েছে ভালো হয়েছে। আগে নিজের আব্বা মারে খাইয়েছে, নিজের সন্তান রেও….”

“দাদী মুখ সামলিয়ে। নয়ত ওই মুখ আমি কেটে ফেলব। খুব বলেছেন এতদিন। এইবার থামুন। আমার গুঞ্জনকে খুঁজে না পেলে এই বাড়িতে আমি আগুন ধরিয়ে দেব। আমার জীবন নিয়ে আর খেলার সুযোগ পাবেন না।”

গর্জে উঠল আরুষ। শক্ত গলায় কথাগুলো বলল। পরপরই উঠে দাঁড়াল। অত্যধিক রাগে বলিষ্ঠ হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হয়ে আছে। নিজের রাগ দমিয়ে রাখতে পারল না ছেলেটা। পাশে থাকা লণ্ঠনটা আঁচড়ে ফেলল ফ্লোরে। মুহুর্তেই একবার দাউদাউ করে আগুন জ্বলে নিভে গেল সেটা। কাঁচের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র অংশগুলো ছড়িয়ে পড়ল ফ্লোর জুড়ে। আকস্মিক এমন ঘটনায় উপস্থিত সকলে ভড়কাল। বিষ্ময়ে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে গেল। আরুষের মুখের একপাশ রক্তাক্ত। বিড়াল রঙের মণি দুটো রক্তাভ হয়ে আছে। দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। সফেদ রঙা পাঞ্জাবীর উপরের দিকে লাল রক্তে ভিজে চুপচুপে আছে। দেখতে সাক্ষাৎ এক দানব। এই আরুষ সকলের নিকট বড্ড অপরিচিত। যেই ছেলে আজ অবধি গুরুজনের কথার পরিপ্রেক্ষিতে পালটা শব্দ উচ্চারণ করেনি। সবসময় চোখ নামিয়ে রেখেছে। সেই ছেলের এই হিংস্রতা হজম করার মতো নয়। আয়েশা শেখ তীব্র অসম্মানে ডুকরে কেঁদে উঠলেন। ভয়ে জড়সড় হয়ে বসলেন। তৎক্ষণাৎ শোনা গেল নারীর স্নিগ্ধ গলা,
“গুঞ্জ যদি পোড়ামুখী হয় তাহলে তো আপনাদের বাড়ির মেয়েও পোড়ামুখী দাদী। বিয়ের দ্বিতীয় দিনে সে তার জামাইকে খেয়েছে। চৌধুরীরা তাকে কি এই নিয়ে ভৎর্সনা করেছে? করেনি বোধহয়! কারণ সবার মন-মানসিকতা তো এতটা নোংরা হয় না।”

সবাই কণ্ঠস্বর লক্ষ্য করে দরজার দিকে তাকাল। দেখল লণ্ঠন হাতে চন্দ্রা দাঁড়িয়ে আছে। রান্নাঘরে ছিল সে। রাতের রান্না করছিল। অদিতির রেগে যাওয়ার কথা ছিল। সেটাতেই বোধহয় মানাত। অথচ না, মেয়েটা রাগল না। উলটো মুচকি হাসল। উত্তর তার পছন্দ হয়েছে। আয়েশা শেখের কান্না থেমে গেছে। হতবাক হয়ে চেয়ে আছেন। গতকাল সকালেও না এই মেয়ে গুঞ্জকে কটুকথা শোনাল। অথচ এখন তার পক্ষ নিচ্ছে! একরাতে এত পরিবর্তন? নাকি রুপবদল? আরুষ কাউকে দেখল না। কারোর কথার শুনল না। হনহনিয়ে কাঁচ মাড়িয়ে প্রস্থান করল। পায়ের রক্তে মেঝে রাঙা হয়ে উঠল। সেদিকে চেয়েই রোকেয়া শেখ কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“ওগো আরুষের বাবা যাও ছেলেটার সাথে। আমার ছেলের মাথা ঠিক নেই। যদি ভুল কিছু করে বসে।”
আসমান শেখ বসা থেকে উঠে দাঁড়ালেন। হন্তদন্ত পায়ে কক্ষ থেকে বের হয়ে গেলেন। অগোছালো জীবন আরও একধাপ ধ্বংসের দিকে এগোল। মানুষগুলোর ভালো থাকার দিন ফুরোল। ভুল নিজেরা করে সবসময় ভাগ্যকে দোষারোপ করলেই বুঝি হলো? সব দোষ ভাগ্য কেন নিবে? তার কিসের এত দ্বায়? মন-মানসিকতা এতটা কলুষিত কেন করব আমরা যেখানে ঠিক-ভুলের পার্থক্য টুকুও আমরা উপলব্ধি করতে পারব না। প্রবাদে আছে,

“মানুষ দাঁত থাকতে দাঁতের মর্ম বোঝে না।”
.

নদীর তীরে গড়ে উঠেছে ছোট্ট একটা কুঠির। চারপাশে বাঁশের বেড়া দিয়ে ঘেরাও কৃত। কুঠিরের চারিদিকে সবুজের মেলবন্ধন। শো শো শব্দে বয়ে চলেছে শীতল হাওয়া। সেই প্রবল বাতাসে ঘরের চালার খড়গুলো দুলছে। শশীর মৃদু আলোয় চারপাশটা স্পষ্ট। সুনসান নীরবতায় আচ্ছন্ন পরিবেশ। কুঠিরের ভেতরে নিভু নিভু দ্যুতিতে জ্বলছে একটা লণ্ঠন। তেল কম, আলোর তেজ ও ক্ষীণ। কুঠিরের একপাশে একটা মাদুর বিছিয়ে রাখা হয়েছে। সেখানে ঠাঁই পেয়েছে গুঞ্জরিকার শীর্ণ দেহখানা। সুশ্রী আনন লাল হয়ে ফুলে আছে। চোখদুটো রক্তিম দেখাচ্ছে। দীর্ঘক্ষণ কান্নার ফলস্বরূপ এরকম হয়। যেই অভিশাপ থেকে মুক্তি পেতে গুঞ্জরিকা প্রস্থান করল। নিজের সব ত্যাগ করল। সেই অভিশাপ যেন আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরছে তাকে। আসলে আমরা চাইলেই কি সব পারি? পারি বোধহয়! হয়ত! হয়ত না! সবটা সময়ের অপেক্ষা। সময়ের সাথে সাথে এই মাটির তৈরি দেহে সবটা সয়ে যায়।

গুঞ্জরিকার গাল বেয়ে পুনরায় স্বধারায় বর্ষণ নামল। ফুঁপিয়ে উঠল মেয়েটা। তৎক্ষণাৎ পেটটা মোচড় দিয়ে উঠল। ক্ষুধার জ্বালা অনুভব করল। আজ সারাদিনে পেটে কিছু পড়েনি। শাহরিয়ার রান্না খাবার সহ রান্নার সকল সরঞ্জাম দিয়ে গেছে দুপুরে এসে। যেটা ঘরের এক কোণে অবহেলায় পড়ে আছে। গুঞ্জরিকার মুখে ওঠেনি। মন অসুস্থ হলে ইহ জগতের কিচ্ছুটি ভালো লাগে না। সবকিছু বড্ড অসহনীয় লাগে। সেখানে খাওয়া ভীষণ বিলাসিতা।

গুঞ্জরিকা পেট ধরে সেভাবেই পড়ে রইল। নীরবতার মাঝে থেকে থেকে ফুপানোর শব্দ শোনা যাচ্ছে। পেরোল কিছু সময়। এই পর্যায়ে মেয়েটা উঠে বসল। সন্তপর্ণে বদন মুছে নিল। সে এখানে বাঁচতে এসেছে। নতুন জীবন খুঁজে পেতে এসেছে। ধুঁকে ধুঁকে মরতে নয়। তাকে খেতে হবে। বাঁচতে হবে। সর্বোপরি ভালো থাকতে হবে। বাতায়ন গলিয়ে তাইমুরের লাগানো বকুল ফুল গাছটার দিকে একবার দেখল। চাঁদের আলোয় চোখের পর্দায় স্পষ্ট ভাসল ভাইজানের অবয়ব। ওই তো ওই বকুল গাছের নিচে দাঁড়িয়ে আছে। মুখে সেই অতিব পরিচিত মুচকি হাসি লেপ্টে আছে। গুঞ্জরিকাকে আশ্বাস দিচ্ছে, ভাইজান সবসময় তোর সঙ্গে আছে গুঞ্জ। ভয় নেই। তুই নির্ভয়ে থাক এখানে। গুঞ্জরিকা ম্লান মুখেই হাসল। উঠে জানালার সম্মুখে দাঁড়াল। নিচু গলায় অস্ফুট স্বরে আওড়াল,
“ভাইজান, আমার একজনম বৃথা গেল নিম্নবিত্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করার অপরাধে। স্বামী, সন্তান, সংসার সব হারাইলাম। সবশেষে তোমার বিচার চাওয়ার ধৈর্য টুকুও হারাইলাম। ক্ষমা করিও আমাকে, ভাইজান।”

অদূরে দাঁড়ানো তাইমুরের মুখের হাসি বর্ধিত হলো। গুঞ্জরিকার দিকে স্নেহের চোখে তাকিয়ে বলল,
“ধূর পাগলী! বিচার তো আল্লাহর দরবারে অনেক আগেই হয়ে গেছে। তুই ভালো থাক। ভীষণ ভালো থাক। তোর দীর্ঘশ্বাসে অপরপক্ষ পুড়ে খাক হয়ে যাক।”

চলবে

(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। লিখেই পোস্ট করেছি তাই ভুলত্রুটি থাকতে পারে। সবকিছু একপাশে ঠেলে পড়ে ফেলুন। আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply