Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ২


পরগাছা |২|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

প্রকৃতির বুকে এখনো আবছা আঁধার বিরাজমান। সবে পূর্ব আকাশে সফেদ রঙা একটা রেখা দাগ কেটে গেছে। চারপাশ মুখরিত করে ভেসে আসছে পক্ষীকুলের গুঞ্জন। ললাটে আলতো আঙ্গুলের ছোঁয়া, বাতায়ন গলিয়ে প্রবেশ করা শীতল মারুতের সংস্পর্শে গুঞ্জরিকার শীর্ণ কায়া শিরশির করে উঠল। মেয়েটা উষ্ণ কিছুর আশায় জড়োসড়ো হয়ে এল। সেভাবেই পেরোল কিয়ৎসময়। আস্তে ধীরে নিজের বন্ধ নেত্রপল্লব মেলে তাকাল গুঞ্জরিকা। অমনিই অধরযুগলে খেলে গেল স্নিগ্ধ হাসি। মুগ্ধ চোখে পাশে বসা মানুষটার শাণিত চোয়ালের মুখমণ্ডলে চেয়ে রইল। হাসিটা মিইয়ে এসে কেমন যেন অদ্ভুত তাচ্ছিল্যের সুর তুলল।

“আমাকে ছুঁবেন না শেখ বাবু। আজকের পর থেকে আমার শরীরে আপনার আর কোনো স্পর্শ না পড়ুক। একজন মানুষ হিসেবে এতটুকু স্বাধীনতা কি আমি পেতে পারি না?”

পালঙ্কের পাশে কেদারা টেনে বসে আছে আরুষ। প্রিয়তমার মুখ নিঃসৃত শব্দগুলো বড্ড অসহায় অনুভব করাল ওকে। ঈষৎ বুকব্যথা অনুভূত হলো। কী অদ্ভুত এক যাতনা! দেখবে, দূর থেকে ভালোবাসবে অথচ একটু ছুঁয়ে দিতে পারবে না? কিছুক্ষণ নীরব দৃষ্টিতে গুঞ্জরিকার ম্লান আননে চেয়ে রইল। মেয়েটা উঠে বসেছে ততক্ষণে। তন্দ্রা ধরা দিয়েছিল রাত্রির শেষ প্রহরে। কল্পনার জগতে নিজেকে হারিয়ে কখন যে ঘুমিয়ে পড়েছে তা ওর নিজের নিকট অজানা। আপাতত তাকিয়ে আছে স্বামী নামক মানুষটার চোখে চোখ রেখেই‌। নেই কোনো দ্বিধা, কোনো সংকোচ।

আরুষের বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। মাথা নামিয়ে নিল। মেঝেতে নজর স্থির রাখল। নিশ্চুপ রইল। কী বলবে ঠিক ঠাহর করতে পারছে না। নিজে যখন বংশের একটা গতি করে দিতে স্বার্থপরের মতো কাজ করে বসেছে সেখানে অপরপক্ষের তো এতটুকু স্বাধীনতা ঠিকই প্রাপ্য। অন্তত এটা থেকে তাকে বঞ্চিত করা না হোক। আরুষ মেনে নিল মস্তিষ্কের কথা। বুকব্যথাকে প্রাধান্য দিল না। বসা থেকে উঠে দাঁড়াল। গুঞ্জরিকার দিকে তাকাল। সব সময়ের মতোই গুরুগম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর কর্ণগোচর হলো গুঞ্জরিকার,

“তোমার সব স্বাধীনতা কবুল। তবুও এই বাড়ির আঙিনাকে আঁকড়েই বাঁচতে হবে। মুক্তি নেই তোমার।”

মুখের কথাতে ইতি টেনে বড়ো বড়ো পা ফেলে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল আরুষ। গুঞ্জরিকা দেখল মানুষটার প্রস্থান টুকু। টুপ করে গাল বেয়ে দুফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সন্তর্পণে আঁখি জোড়া মুছে নিল। পালঙ্ক থেকে নেমে দাঁড়াল। নামাজ পড়তে হবে। পরিষ্কার হয়ে ওজুর উদ্দেশে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
.

ঘড়ির কাঁটার দখলদারিত্ব সাতটার ঘরে। আরুষ নিজ কক্ষের বারান্দায় পায়ের উপর পা তুলে কেদারায় বসে আছে। মেঘেদের সাথে সূর্যিমামার লুকোচুরি দেখতে ব্যস্ত। হাতে চায়ের পেয়ালা। এই পর্যায়ে চায়ের পেয়ালায় হালকা করে ঠোঁট ছোঁয়াল। সহসা পাশে কারোর উপস্থিতি অনুভব করল। নমনীয় ঘাড়টা বেঁকে পাশে ফিরল। চোখের পর্দায় ভাসল সদ্য স্নানিত একটা নারী অবয়ব।টকটকে লাল রঙের একটা শাড়ি শরীরে জড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রা। ভিজে কোমর ছুঁই ছুঁই কেশ পিঠজুড়ে মেলে দেওয়া। ঘোমটার ফাঁকফোকর দিয়ে দেখা যায়। লাজুক মুখটা নামিয়ে রেখেছে। চোখদুটো স্থির মেঝেতে। ইতোমধ্যে আরুষের কপালে গুটিকয়েক ভাঁজের সৃষ্টি হয়েছে। চোখ দুটো ছোট ছোট করে প্রশ্ন ছুঁড়ল,

“এত সকালে গোসল করার কী প্রয়োজন ছিল?”

চন্দ্রার ঠোঁটের কোণে দৃশ্যমান মুচকি হাসিটা মুহূর্তেই মিলিয়ে গেল। লাজুক মুখটা কঠিন হয়ে উঠল। চোখ তুলে সামনে তাকাল। মিছে হাসার প্রয়াস চালাল। গরম লাগার ভান ধরে ইনিয়ে বিনিয়ে বলল, “ভীষণ গরম লাগছিল আমার। তাই গোসল করেছি। এখন ভালো লাগছে একটু।”

আরুষ কথাগুলো ঠিক বিশ্বাস করল কি বোঝা গেল না। দুই সেকেন্ড মতো ভ্রু কুঁচকে চেয়ে রইল। ভারী কণ্ঠে ফের প্রশ্ন করল,

“কী দরকার এখানে?”

“আম্মা আপনাকে ডেকে দিতে বলল।”

“আচ্ছা।”

ছোট্ট করে জবাব দিয়ে চায়ের পেয়ালা হাতে উঠে দাঁড়াল আরুষ। বারান্দার দরজা অবধি যেয়ে কী যেন ভেবে থামল। চন্দ্রার শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করল অপ্রত্যাশিত কিছু বাক্য,

“গুঞ্জন আমার প্রথম স্ত্রী, আমার প্রথম ভালোবাসা। তাকে কষ্ট দেওয়ার মতো দুঃসাহস কখনো করবে না। তুমি তোমার প্রাপ্য মর্যাদা ঠিক পাবে এতটুকু নিশ্চয়তা আছে চন্দ্রা। প্রতিযোগিতায় নেমো না।”

আস্তে ধীরে গম্ভীর বাক্যগুলো বেনামি হাওয়ায় মিশে গেল। সঙ্গে হারিয়ে গেল আরুষের অস্তিত্ব। একাকী নিরবে ঠায় দাঁড়িয়ে রইল চন্দ্রা। বড়ো একটা শ্বাস টেনে কেবল মুচকি হাসল। এটুকু হলেই ওর চলবে। অবহেলার জীবনে অতটুকু সম্মান পাওয়া মানে অনেক বড়ো কিছু। যার যেটা নেই সে তো বরাবরই সেটাই চাইবে। চন্দ্রাও তার ব্যতিক্রম নয়।
.

চুলোয় ভাত হচ্ছে। সকালে এ বাড়িতে ভাত না হলে চলে না। বিশেষ করে বাড়ির কর্তা আসমান শেখের। তার তিন বেলাতেই ভাত চায়। গুঞ্জরিকা রান্নাঘরের মেঝেতে বসে পুঁইশাক কাটছে। ঠিক সেই সময়ে রান্নাঘরের দুয়ারে এসে দাঁড়ালেন রোকেয়া শেখ। গুঞ্জরিকার দিকে তাকিয়ে ব্যাথাতুর কণ্ঠে ডাকলেন, “বড়ো বৌমা শোনো তো?”

গুঞ্জরিকা হাতের কাজ থামিয়ে সামনে তাকাল। মিষ্টি একটা হাসি দিল, “জি আম্মা বলুন।”

“বাতের ব্যথাটা খুব বেড়েছে বড়ো বৌমা। একটু সরিষার তেল গরম করে আমার কক্ষে এসো তো। মালিশ করতে হবে।”

এমন কথাতে গুঞ্জরিকার মুখের হাসি বাড়ল। প্রত্যুত্তরে নরম কণ্ঠে বলল, “ভালো কাজ ঘরের লক্ষ্মীকে দিয়ে করাতে হয় আম্মা। অলক্ষ্মীর হাতের মালিসে যদি ব্যথা বেড়ে যায় তখন সেই দায়ভার যে আমার হবে। আপনি ছোট বউকে ডাকুন আম্মা। তাছাড়া আপনার ছেলে খেয়ে বাজারে যাবে। রান্না শেষ করতে হবে। আমার হাতে অনেক কাজ।”

গুঞ্জরিকার এমন কথায় অতি আশ্চর্যে বাকরুদ্ধ হয়ে পড়লেন রোকেয়া শেখ। এত বড়ো স্পর্ধা! ওনার মুখের উপরে নাকচ করে দেওয়া। আবার কথা শোনানো! হুংকার ছুঁড়লেন, “বড়ো বৌমা!”

“আপনার ছেলে বলেছে মৃ ত্যু র আগ অবধি এই বাড়ির আঙিনাকেই আঁকড়ে আমায় বাঁচতে হবে।”

ছেলের প্রসঙ্গ আসতেই রোকেয়া শেখ দমলেন একটু। কিন্তু নেত্র যুগল সাক্ষাৎ অগ্নিকুণ্ড। ওই চোখজোড়া দিয়েই যেন গুঞ্জরিকাকে ভষ্ম করে দিবে। অথচ মেয়েটা এইসবে নির্বিকার। পুনরায় পুঁইশাক কাটতে মনোযোগী হয়েছে। বসার ঘরে সোফায় বসে ছিলেন আসমান শেখ। রোকেয়া শেখের চিৎকার শুনে এগিয়ে এসেছেন। সবটুকু কথপোকথন শুনে কেবল মাথা নেড়ে হাসলেন। বিড়বিড় করে আওড়ালেন, “ইট মারলে পাটকেল খেতে হয়।”

আসমান শেখ যেভাবে নীরবে এসেছিলেন সেভাবেই চলে গেলেন। বাড়ির এইসব ঝুটঝামেলায় নিজেকে জড়ান না তিনি। বড়ো শান্তশিষ্ট মানুষ। যার মাথা বেশি বড়ো , তার মাথাব্যথা বেশি হবে। এটাই স্বাভাবিক। অদিতি হাঁটু সমান বেনুনি দোলানো অবস্থাতেই রান্নাঘরের সম্মুখে এসে দাঁড়াল। সিঁড়িতে দাঁড়িয়ে সবকিছুই শুনেছে। মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরল। কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে শুধাল, “মা, ডেকে দিবো ছোট ভাবীকে? তার কাজের অভ্যাসটা তো গড়তে হবে?”

রোকেয়া শেখ মেয়ের দিকে তীক্ষ্ণ নজরে তাকালেন, “মশকরা করছ তুমি?”

“উঁহু, আগে সংসার কেবল বড়ো ভাবীজানের ছিল। এখন ভাগ হয়েছে। কাজ ও ভাগ হোক। তুমি দাঁড়াও আমি ভাবীকে উপর থেকে ডেকে নিয়ে আসি।”

কথাটা বলেই দোতলার উদ্দেশে ছুটল অদিতি। এইসব যেন দেখেও দেখছে না গুঞ্জরিকা। সে তার কাজ নিয়ে পড়ে আছে। সেই মুহূর্তে সিঁড়ি দিয়ে আরুষকে নামতে দেখা গেল। ছেলেকে দেখতেই রোকেয়া শেখ ঢং ধরলেন। কাঁদতে কাঁদতে একপ্রকার ছুটে গেলেন। আরুষ একহাতে মাকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল। ব্যাকুল হয়ে জানতে চাইল,

“কী হয়েছে আম্মা? কাঁদছেন কেন?”

রোকেয়া বেগম এটারই অপেক্ষায় ছিলেন। সুযোগ পেতেই কান্নার বেগ বাড়িয়ে দিলেন। বলতে শুরু করলেন, “তুমি আমাকে মে রে ফেলো আব্বা। এত অসম্মান আমার সইবে না। ভোর রাত থেকে বাত ব্যথাটা বড্ড বেড়েছে। বড়ো বউমাকে বললাম একটু গরম তেল মালিশ করে দিতে আর সে আমাকে কথা শোনাল। বলল ছোট বউমাকে দিয়ে মালিশ করে নিতে। আমি কি খুব ভারি হয়ে গেলাম তোমাদের কাছে? এত অপমান, এত কটুকথা আমাকে শোনানো হচ্ছে।”

আরুষ তাকাল রান্নাঘরের দিকে। গুঞ্জরিকা ওদের দিকেই তাকিয়ে আছে। মেয়েটার শান্ত দৃষ্টিতে দৃষ্টি মিলল আরুষের। কয়েক সেকেন্ড চেয়ে রইল। বুকচিরে ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। চোখ ফিরিয়ে মায়ের মাথায় সযত্নে হাত বুলিয়ে দিল,

“গুঞ্জন কাজ করছে তো আম্মা। আপনি চন্দ্রাকে দিয়েই মালিশ করিয়ে নিন। একটু ত্যাগ না করলে তো চলবে না আম্মা। ছোট ছোট বিষয়গুলো বড়ো করে দেখে দিনরাত এভাবে ঝামেলা বাঁধালে আমি বাড়ি ছাড়তে বাধ্য হবো। একটু শান্তিতে মিলেমিশে থাকুন সবাই মিলে। খুব কঠিন কিছু তো নয় আম্মা।”

রোকেয়া শেখ দাঁতে দাঁত চেপে মেনে নিলেন ছেলের কথা। ছেলের চোখে তিনি মোটেও খারাপ হতে চান না। আর এখন তো একপ্রকার শান্তভাবে হুঁশিয়ারি দিল। রোকেয়া শেখ জবাবে মাথা নাড়লেন। আরুষ মাকে ছেড়ে একপলক গুঞ্জনের দিকে তাকিয়ে হনহনিয়ে সদর দরজা দিয়ে বেরিয়ে গেল। রোকেয়া শেখ আর কিছু বললেন না। সাপের মতো ফুঁসতে ফুঁসতে কোনো রকমে হেঁটে কক্ষের দিকে হাঁটা ধরলেন। গুঞ্জরিকার সবজি কাটাকুটো শেষ। এইবার ধুয়ে চুলোয় বসাতে হবে। অধরে অবজ্ঞার হাঁসি ঝুলিয়ে নিজের কাজে মনোনিবেশ করল।

চলবে

(ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্য চাইইইইইইই।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply