পরগাছা |১৯|
ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
সাত সকালে গ্রামের ডাক্তার সাহেব এসে রোকেয়া শেখকে দেখে গেছেন। পরিক্ষা নিরীক্ষা করে ঔষধ ও দিয়ে গেছেন। কোমরের হাড়ে বেশ খানিকটা আঘাত পেয়েছেন। আপাতত মাস কয়েক একেবারে বিছানা বন্দি হয়ে কাটাতে হবে রোকেয়া শেখকে। প্রয়োজন ব্যতীত হাঁটাচলা না করাই ভালো। এমনকি ভারী কাজের ধারেকাছেও যাওয়া যাবে না। রোকেয়া শেখ এই শুনে কেদে কুটে অস্থির হয়ে আছেন। খাওয়ার বিষয়ে বেশ নাক উঁচু তিনি। গুঞ্জরিকা ইদানিং রান্নাঘরে যায় না, রান্নার কাজেও হাত দেয় না। উনি নিজেই রান্না করেন। সালেহা শেখ একটু সাহায্য করেন এই যা। ওনার দুশ্চিন্তা দেখে চন্দ্রা আশ্বস্ত করেছে রান্নাটা সে করবে। কাজের খালাদের দিয়ে করাবে না। রোকেয়া তখন একটু শান্ত হয়েছিলেন বটে। কিন্তু কাঁদতে কাঁদতে বারবার বলে চলেছেন আরুষকে জানানোর কথা। যদি উনি মারা যান। ছেলের সাথে দেখা না হয়। এই আশঙ্কায় গুটিয়ে এসেছেন রোকেয়া শেখ। অদিতি কাটকাট জানিয়েছে, ভাইজান আগামীকাল সন্ধ্যা নাগাদ ফিরে আসবে। আজ চিঠি পাঠালে ভাইজান হাতে পাবে না ঠিক সময়ে। তাই ধৈর্য ধরতে হবে সকলকে। রোকেয়া শেখ মেয়ের কথার উপরে কথা বলার সাহস পাননি। কিছু সময়ের ব্যবধানেই মানুষটা কেমন যেন নেতিয়ে এসেছে। বয়স বেড়েছে কয়েকগুণ। চোখ মুখের দিকে তাকানো যাচ্ছে না।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরে নিজের ঘাঁটি স্থাপন করেছে আটটার ঘরে। সকাল থেকেই আজ শেখ বাড়ি উত্তাল। ক্ষণে ক্ষণে শোনা যাচ্ছে রোকেয়া শেখের রোদনের করুণ সুর। ওই যে কিছু মানুষ থাকে মৃত্যু শব্দটাকে ভীষণ ভয় পায়। যেকোনো প্রকার অসুস্থতাকে ঘিরে বারবার মৃত্যুকে স্মরণ করে থাকে। সেরকম একজন মানুষ রোকেয়া শেখ। মানুষটা সহজে তেমন অসুস্থতার কবলে পড়ে না। তাই তো এত জোর, এত আধিপত্য বিস্তার করতে পারে সকলের উপরে। অথচ নিজের কিছু হলেই চুপসে যায় একেবারে।
গুঞ্জরিকা শাহরিয়ার এর নিকট গিয়েছিল। ফিরল মাত্রই। ক্ষুধা পেয়েছে ভীষণ। তাই উপরে না যেয়ে রান্নাঘরের দিকে পা বাড়াল। নিজের জন্য খাবার বেড়ে রান্নাঘর থেকে বেরোতে নিলেই সম্মুখীন হলো আয়েশা শেখের। আয়েশা শেখ তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আছেন গুঞ্জরিকার হাতে থাকা ভাতের থালার দিকে। কঠিন গলায় বললেন,
“বাড়ির সক্কলে না খাইয়া রইয়াছে। কারোর মুখে খাওন উঠতাছে না। আর এদিকে তুই দেখি গামলা গামলা গিলছিস নাত বৌ? খাওন ঢুকছে ওই পোড়া মুখডাই?”
গুঞ্জরিকা এক পলক হাতে থাকা থালায় স্বল্প ভাত টুকুর দিকে তাকাল। পরপরই ওনার মুখের দিকে। মিষ্টি করে হাসল,
“আপনিও তো খেতেই এসেছেন দাদী। ভয় নেই আপনার ভাগ নেইনি আমি। খাবার আছে খেয়ে নিন।”
আয়েশা শেখ চোখ গরম করে তাকালেন। যেন অগ্নি দৃষ্টি দিয়েই ঝলসে দেবে গুঞ্জরিকাকে। তাকে খোটা দিচ্ছে! এই বাড়ির সবচেয়ে গুরুজনকে খোটা দেওয়ার দুঃসাহস দেখাচ্ছে এই মেয়ে! অথচ গুঞ্জরিকা এইসবে নির্বিকার। অধরযুগলে লেপ্টে আছে স্নিগ্ধ হাসি। আজ আর কারোর সাথে খারাপ আচরণ করার ইচ্ছা নেই। গুঞ্জরিকা মুখের কথা শেষ করে পাশ কাটিয়ে যেতে নিলেই আয়েশা শেখ কর্কশ কণ্ঠস্বরে বলে উঠলেন,
“তোর শাশুড়িডা বিছানায় পইড়া আছে। একটু তেল গরম করে মালিশ ও করে দিবার পারিস নাত বৌ?”
গুঞ্জরিকা থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে চাইল। ঠোঁটের কোণে হাসি টুকু ধরে রেখে জবাব দিল,
“পোড়া মুখীর হাতের তেল মালিশে আম্মার যন্ত্রনা বাড়বে দাদী। দেশের একজন সচেতন নাগরিক হিসেবে এত বড়ো অবিচার আমি করতে পারব না। তাছাড়া আম্মার সুন্দরী বউমা আছে না? তাকে বলুন। দেখবেন আজ রাতের মধ্যেই আম্মার সব জ্বালা যন্ত্রণা কমে যাবে।”
গুঞ্জরিকার মুখনিঃসৃত কথাগুলোতে আয়েশা শেখ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন। ঠিক সেই সময়ে ভেসে এল চন্দ্রার গলা,
“আজকাল পারিবারিক শিক্ষার সাথে বড়োদের সম্মান করাটাও ভুলে যাচ্ছিস মনে হচ্ছে?”
গুঞ্জরিকার সামনেই দাঁড়িয়ে আছে চন্দ্রা। দুজনের কথাবার্তার মাঝে এসে দাঁড়িয়েছে হয়ত। মুখের কথার শেষ হওয়ার সাথে সাথেই থাপ্পড়ের প্রবল আওয়াজে চমকে উঠলেন আয়েশা শেখ। চন্দ্রার মাথাটা ভনভন করছে। ডান গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে আছে। গুঞ্জরিকা দুই পা এগিয়ে যেয়ে মুখোমুখি দাঁড়াল। মুচকি হেসে ফিসফিস করে বলল,
“খবরদার, আমার পরিবার তুলে কথা বলবি না। নিজের জন্য নির্ধারিত গণ্ডিতে থাকবি। আমার পারিবারিক শিক্ষার দিকে আঙ্গুল তুললে সেটা ভেঙ্গে মুচড়ে দিব আমি। তোর সামনে তোর সখী গুঞ্জ নয় তোর সতীন গুঞ্জ দাঁড়িয়ে আছে। যেই সম্পর্ক তুই স্বেচ্ছায় গড়েছিস।”
মুখের কথা শেষ করে হনহনিয়ে প্রস্থান করল গুঞ্জরিকা। চন্দ্রা দাঁতে দাঁত চেপে দাঁড়িয়ে রইল। হাতটা তুলেছিল তবে তা নামিয়ে নিল। কিছু সময় পরাজয়েও জিত থাকে। ফিরতি আঘাত করতে নেই। মেয়েটার পানিতে টইটম্বুর চোখদুটো রহস্যময় দেখাচ্ছে। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে ছোট ছোট পা ফেলে ওখান থেকে চলে গেল।
আয়েশা শেখ গুঞ্জরিকার এত তেজ ঠিক হজম করতে পারলেন না। দাদুভাই না থাকলে এই মেয়ের যেন পাখা গজায়। জাত-পাত হীন মেয়েটাকে এত ইন্ধন কে জোগায়? যেই জাতের মুখে গ্রামের সকলে লাথি মারত সেই জাতের মেয়ের মুখে এরকম কথা বড্ড বেমানান শোনায়। সেদিন যদি আরুষ দাদুভাই পাশে না দাঁড়াত পুরো পরিবারের সাথে এই বান্দির মেয়েও তো ভেসে যেত। গেলে বেশ হতো। এত হেডম দেখা লাগত না। পাপের রক্ত শরীরে ধারণ করে এখন বড়ো বড়ো জ্ঞানের বাণী শোনায়। আয়েশা শেখ একবুক বিতৃষ্ণা নিয়ে গুঞ্জরিকার প্রস্থানের দিকে তাকিয়ে আছেন। এই তো বছর খানেক আগেও মেয়েটা নরম পুতুল ছিল একেবারে। যে যা বলত তাই মাথা পেতে নিত। কখনো ফিরতি একটা শব্দও উচ্চারণ করেনি। যে যেমন পারত দাদু ভাইয়ের অগোচরে খাটিয়ে নিত, কথা শোনাত। কিন্তু এখন? স্বল্প সময়ের ব্যবধানে এত পরিবর্তন মেনে নেওয়া যায় না। আয়েশা শেখ বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
“কুকুরের পেটে কখনো ঘি ভাত সহ্য হয় না।”
.
সকাল সকাল চৌধুরী বাড়ির উদ্দেশে রওনা দিয়েছিল শেখ বাড়ির একজন কর্মকর্তা। নাম তার মেজবাহ। বয়স বড়ো জোর সতেরো হবে। অদিতির বড়ো ভক্ত সে। সবসময় আপা, আপা বলে মুখে ফেনা তুলে ফেলে। অদিতি ও ছোট ভাইয়ের মতোই স্নেহ করে মেজবাহকে। এখন দুপুর গড়িয়ে বিকাল হতে চলল। সময় তিনটা বেজে পঁচিশ মিনিট। অদিতি বারবার সদর দরজার ফাঁক দিয়ে দেওয়ালে টাঙানো ঘড়িটার দিকে তাকাচ্ছে আর সময় দেখছে। বড়ো বারান্দা জুড়ে পায়চারী করছে। রাজা-রানী সহ মেজবাহ এর অপেক্ষায় প্রহর গুণছে। মেজবাহ এর সাথে চিরকুট লিখে পাঠিয়েছে অদিতি। শাশুড়ি আম্মা নিশ্চয় খালি হাতে ফিরিয়ে দিবে না? এতটুকু ভরসা অদিতির আছে।
অবশেষে সবটুকু প্রতিক্ষার অবসান ঘটিয়ে শেখ বাড়ির বড়ো লোহার দরজার সম্মুখে মেজবাহ এসে উপস্থিত হলো। হাতে একটা খাঁচা। তারমধ্যে একজোড়া সফেদ রঙা কবুতর জ্বলজ্বল করছে। সেটা লক্ষ্য করতেই অদিতির চোখের কোণে জল জমল। একপ্রকার ছুটে গেল মেজবাহ এর কাছে। কপাট খুলে আগে খাঁচাটা নিজের হাতে নিল। রাজা-রানী অদিতিকে দেখতেই ডেকে উঠল। অদিতি ফিক করে হেসে ফেলল। মেজবাহ এর দিকে তাকিয়ে শুধাল,
“ওই বাড়ির সবাই কেমন আছে মেসবাহ?”
মেজবাহ ক্লান্ত। আসমান শেখের সাইকেল নিয়ে এত ক্রোশ পথ গিয়েছিল আবার এসেছে। হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
“ভালোই আছে আপা। আপনার শাশুড়িকে দেখে তো আমি প্রথমে চিনতেই পারি নাই। কেমন যেন হয়ে গেছেন। সুন্দরী মানুষটা আর সুন্দরী নেই।”
অদিতির মুখটা ম্লান হয়ে উঠল। হাসি টুকু মিলিয়ে গেল। জানতে চাইল,
“আম্মা দিলেন রাজা-রানীকে?”
মেজবাহ মাথা নাড়ল,
“জি, আপা। কবুতর দুটো দিল আর বলল ওদের মাঝেই দুলাভাইরে খুঁজে নিতে। তার বড়ো শখের ছিল ওরা দুজন। আপনার কাছেই ভালো থাকবে ওরা। আর আপনাকে দেখতে চেয়েছেন তিনি। সময় সুযোগ করে যেতে বলেছেন।”
অদিতির বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। কথার পরিপ্রেক্ষিতে কিছু বলল না। কেবল মনোযোগ দিয়ে শুনল। ক্লান্ত মেজবাহ এর উদ্দেশে আদেশ ছুঁড়ল,
“পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়ে ঘরে আয় মেজবাহ। আমি খাবার বেড়ে দিচ্ছি। খেয়ে আড়তে যা।”
মেজবাহ তৎক্ষণাৎ উত্তর দিল,
“আচ্ছা আপা। ও বাড়িতেও আমাকে খাওয়ানোর জন্য খুব চেষ্টা করেছিল কিন্তু দেরি হয়ে যাবে বলেই আমিই খাইনি।”
কথাগুলো বলেই কলপাড়ের দিকে চলে গেল মেজবাহ। অদিতিও আর দাঁড়াল না। মেজবাহকে খেতে দিয়ে রাজা-রানীকে খাওয়াতে হবে। অনেক্ষণ না খেয়ে আছে তারা। ব্যস্ত পায়ে বাড়িতে প্রবেশ করল।
.
নিজ কক্ষে শুয়ে আছেন রোকেয়া শেখ। মাগরিবের নামাজ আদায় করেছেন বিছানায় বসেই। বেশ কষ্ট হচ্ছে বসতে। পাশে আপাতত কেউই নেই। যে যার কক্ষে আছে। পরে আসবে হয়ত। তবে এই অসময়ে দুয়ারে এসে উপস্থিত হলো গুঞ্জরিকা। গুটি গুটি পায়ে এগিয়ে যেয়ে রোকেয়া শেখের পাশে দাঁড়াল। আস্তে করে ডাকল,
“আম্মা।”
রোকেয়া শেখ আধশোয়া হয়ে কপালের উপর হাত রেখে শুয়ে ছিলেন। ডাক শুনে চোখ মেলে তাকালেন। পাশ ফিরে চাইলেন। গুঞ্জরিকাকে দেখতেই ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল ওনার। আজ সারাদিনে একটাবারও খোঁজ নিতে আসেনি গুঞ্জরিকা। হঠাৎ করেই রোকেয়া শেখের অভিমান হলো। কেন হলো, কার উপর অভিমান জমল এইসব নিয়ে তিনি ভাবলেন না। ছলছল নেত্র যুগল নিয়ে শুধালেন,
“আমি এতটাই খারাপ গুঞ্জ? পাড়াপড়শিরা সবাই এল অথচ তুমি একটাবারও দেখতে এলে না আমায়।”
কঠিন মানুষটার এমন বাচ্চামো আচরণে গুঞ্জরিকা মুচকি হাসল। নিঃশব্দে পাশেই মেঝেতে বসল। রোকেয়া শেখের ডান হাতটা নিজের দুহাতের মুঠোয় পুরে নিল। সেখানে কপাল ঠেকিয়ে নীরবে চুপচাপ বসে রইল। গুঞ্জরিকার এমন অদ্ভুত আচরণ রোকেয়া শেখ হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন। কিছুই বোধগম্য হলো না। নিজের হাতে পানির উপস্থিতি অনুভব করলেন। হঠাৎ করেই আজ বুক ভার হলো ওনার। গুঞ্জরিকা ফুঁপিয়ে উঠল। তারপর আবার আগের মতোই সব নিশ্চুপ। কিছুক্ষণ পেরোল সেভাবেই। শোনা গেল গুঞ্জরিকার মলিন গলার আওয়াজ,
“যেদিন ভাইজানের শোকে, গ্রামবাসীর কটুকথা সইতে না পেরে আব্বা-মা গলায় ফাঁস বেঁধে মারা গেলেন সেদিন অষ্টাদশী আমি নতুন এক জগৎকে আবিষ্কার করেছিলাম। যেখানে আমি ব্যতীত আর কারোর অস্তিত্ব ছিল না। সম্পূর্ণ পৃথিবী শূন্য ছিল আমার জন্য। গ্রামবাসীরা যখন একাকী আমিটাকে একঘরে করে দিল সেবার একটা সপ্তাহ আমি না খেয়ে ছিলাম। শুধু পানি আর জমানো মুড়ি পড়েছিল পেটে। নিজেও সিদ্ধান্ত নিয়েছিলাম মাঠের বড়ো বটগাছটাতে গলায় ফাঁস দেব। কার জন্য বাঁচব আমি? আমার তো আর কেউ নেই। তখন এগিয়ে এসেছিলেন শেখ বাবু। আমার ভরসার কাঁধ হয়েছিলেন। সান্ত্বনা দিয়েছিলেন। দুঃসময়ের বন্ধু হয়েছিলেন। নিসংকোচে বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিলেন। প্রথমে দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভুগলেও, আমার সাতকুলে কেউ না থাকায় পরবর্তীতে আমি একবাক্যে রাজি হয়ে যাই। নতুন করে একটা পরিবারের স্বপ্ন দেখি। যেদিন প্রথম আপনার সান্নিধ্যে এসেছিলাম আম্মা, সেদিন আমি একজন মা পাওয়ার খুশিতে কেঁদেছিলাম। দুই রাকাত নফল নামাজ আদায় করেছিলাম আল্লাহর দরবারে। কিন্তু আফসোস আম্মা আপনি কখনো আমাকে বোঝেননি। আমি কতটা অসহায় হয়ে এত বড়ো বাড়িতে নিজের সম্পর্ক গড়েছিলাম আপনি কখনো জানার চেষ্টাও করেননি। টাকা দিয়ে আমি কী করতাম আম্মা? আমার তো জীবনের কোনো পিছুটান ছিল না। কাকে দিতাম আপনাদের থেকে টাকা নিয়ে? আমি তো শুধু একটু স্নেহ আর ভালোবাসার লোভী ছিলাম আম্মা? সব কষ্টের সমাপ্তি ঘটিয়ে আল্লাহ যখন আমাকে পরিপূর্ণ করতে নতুন একজন সঙ্গী পাঠাল আমার ঘরে আপনি ঘৃণার জের ধরে, দাদীর প্ররোচনায় তাকেও কেড়ে নিলেন আম্মা। শুধু তাই নয় আমার অজান্তে শেকড়, বাকড় সহ সেসবের রস খাইয়ে আমাকে বন্ধ্যা বানিয়ে দিলেন। সন্তান সুখের হাত থেকে বঞ্চিত করলেন। এত পাপের কথা কীভাবে বলতাম আপনার ছেলেকে? তখন আপনার প্রতি অনিহা জন্মালেও আমি তো নির্জীব ছিলাম আম্মা। প্রতিবাদ করার মতো মন মানসিকতা ছিল না। আর না ছিল কোনো ইচ্ছে। আপনার ছেলে সেই ঘটনাকে পুঁজি করে আমাকে দোষারোপ করে। অথচ আমার হাত-পা সবদিক থেকে বাঁধা ছিল। প্রমাণ বিহীন আপনার বিরুদ্ধে কোনো কথা বরদাস্ত করত বুঝি আপনার ছেলে? আপনিই বলুন আম্মা, করত? সে আজন্ম মা ভক্তই রয়ে গেল। সব ভুল আমার, আম্মা। আব্বাকে আমি আজও দোষারোপ করি। আমাকে শূন্যে ভাসিয়ে, সমাজের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে পালিয়েছে সে। আব্বা আমার কথা ভাবেনি। আপনাদের কারোর উপর আমার কোনো অভিযোগ নেই আম্মা। আমি আমার ভাগ্যকে মেনে নিয়েছি। আমি চাই এই পরিবারের সবাই খুব ভালো থাকুক। তাদের কারোর ভাগ্য গুঞ্জর মতো না হোক।”
আস্তে ধীরে কথাগুলো বলে থামল গুঞ্জরিকা। কী অদ্ভুত বিষাদ মিশে ছিল উচ্চারিত প্রতিটা শব্দে! রোকেয়া শেখ পাথর বনে গেছেন। বুকটা ভীষণ ব্যথা করছে। গাল দিয়ে বারিধারা নেমেছে। মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারলেন না। অথচ ওনার অনেক কথা বলার ছিল। সবটা গলায় কাঁটার মতো বিঁধছে অথচ উচ্চারণ করতে অক্ষম। গুঞ্জরিকা মুখ তুলে চাইল রোকেয়া শেখের দিকে। শেষ বারের মতো অধর ছুঁয়ে দিল রোকেয়া শেখের ডান হাতটাতে। পরপরই উঠে দাঁড়াল। শ্লথগতিতে হেটে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল। শ্রবণেন্দ্রিয়ে পৌঁছাল ডুকরে কান্নার আওয়াজ। আত্মগ্লানি সবচেয়ে বড়ো মরণব্যাধি। যে একবার এই আত্মগ্লানিতে ভোগে তার জীবন আর জাহান্নামের মধ্যে পার্থক্য যৎকিঞ্চিত থাকে। প্রতিটা সেকেণ্ড, প্রতিটা মিনিট ধুঁকে ধুঁকে মরে সে। অথচ তার নিজের পাপের নিজের শাস্তি এটা। হাহ্!
.
মধ্যরাতে যখন শেখ পরিবারের সকলে গভীর তন্দ্রাচ্ছন্ন তখন গুঞ্জরিকার কক্ষের দুয়ারখানা মৃদু শব্দে খুলে গেল। কক্ষ থেকে বের হলো গুঞ্জরিকা। দক্ষিণ দিক থেকে দমকা হাওয়া এসে খেলে গেল দেহজুড়ে। মেয়েটার শরীরে শাড়ি জড়ানো। সুন্দরভাবে শরীর আচ্ছাদিত সেটার দ্বারা। হাতে ছোট্ট একটা পুটলি দৃশ্যমান। কাঁধে আরিকা চুপচাপ বসে আছে। মেয়েটা দরজার সামনেই থমকে দাঁড়িয়ে রইল কিছু সময়। দৃষ্টি আটকেছে আরুষের কক্ষের বন্ধ কপাটের দিকে। সুক্ষ্ম একটা ব্যথা প্রতিটি শিরা – উপশিরায় প্রবাহিত হলো। দেহ খানা অসাড় হয়ে আসতে চাইল। গুঞ্জরিকার গাল বেয়ে দুফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। এক বুক হাহাকার নিয়ে সামনের দিকে পা বাড়াল। সিঁড়ির কাছটাই আসতেই পিছন থেকে ভেসে এল অদিতির গলা,
“তুমিও আমাকে ফাঁকি দিলে ভাবীজান?”
গুঞ্জরিকার চলন্ত পা-জোড়া থেমে গেল। পিছনে ফেরার সাহস করল না। আর কোনো পিছুটান সে রাখতে চায় না। কাঁপা কাঁপা গলায় কেবল বলল,
“নিরুপায় আমি। ক্ষমা করো আমাকে। তোমার জন্য সবসময় দোয়া থাকবে।”
“অথচ তুমি থাকবে না ভাবীজান। আমি সুখ দুঃখের কথা বলার শেষ মানুষটাকে খুইয়ে বসলাম।”
“রাজা-রানী আছে তো। তাদের নিয়ে এই এক জীবন কাটিয়ে দাও। আমি দূর থেকে সবসময় তোমার পাশে থাকব মেয়ে। ভয় নেই। আর কীই বা হারানোর আছে তোমার?”
গুঞ্জরিকার বলা শেষ বাক্য কর্ণগোচর হতেই অদিতি মুচকি হাসল। আজ সায় দিল না সামনে দাঁড়ানো মেয়েটাকে আটকাতে। তার নিজেরও তো একটা শান্তিপূর্ণ জীবন প্রাপ্য। মাথা নেড়ে মেনে নিল,
“তবে তাই সই ভাবীজান। তোমার নতুন জীবনের জন্য শুভকামনা। ভালো থেকো তুমিও। বেনামি প্রভঞ্জনে নিজেদের দীর্ঘশ্বাসে আমাদের সুখ দুঃখের আদান-প্রদান হবে।”
জবাব টুকু পেতেই আর দাঁড়াল না গুঞ্জরিকা। নিজের নতুন গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলল। অদিতি পিছনে ঘুরতেই দেখল আরুষের কক্ষের সম্মুখে চন্দ্রা দাঁড়িয়ে আছে। চোখদুটো পানিতে টলমল করছে। যার অর্থ সে নিজেও এই বিদায় বেলার সাক্ষী। অদিতি মুখের হাসি ধরে রেখেই বলল,
“তুমি কাঁদছ কেন ভাবী? তোমার তো রাস্তা পরিষ্কার এখন। স্বামী, সংসার সব তোমার। তোমাদের এবারের বাসরের ঘরটা আমি নিজ হাতে সাজিয়ে দেব। বাচ্চা আনার দায়িত্ব তোমার। এই বংশের মুখ উজ্জ্বল করার দায়িত্ব তোমার।”
তিক্ত বাণ গুলো ছুঁড়ে নিজের কক্ষের দিকে অগ্রসর হলো অদিতি। অথচ চোখ বুজে সবটা হজম করে নিল চন্দ্রা। কিছু একটা স্মরণ হতেই ছুটল দোতলার বারান্দার দিকে। গুঞ্জরিকা ততক্ষণে বড়ো ফটক পেরিয়েছে। রাস্তায় পা রাখার আগে শেষ বারের মতো বাড়িটার দিকে তাকাল। হারিকেনের মৃদু আলোয় দোতলার বারান্দায় একটা অবয়ব চোখের পর্দায় ভাসল। চিনতে অবশ্য সমস্যা হলো না গুঞ্জরিকার। ঠোঁটের কোণ ঘেঁষে তাচ্ছিল্যের হাসির রেশ ছড়াল। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে মুখ ফিরিয়ে নিল। পদযুগল রাখল রাস্তায়। এগিয়ে চলল নিজের নতুন জীবনের উদ্দেশে। নিজের নতুন গন্তব্যে। এইবার অন্তত সবটা ভালো হোক। দুটো দিন বাঁচলেও স্বস্তিতে বাঁচার সুযোগ হোক। চলতি পথে গুঞ্জরিকা বিড়বিড় করে আওড়াল,
“অতঃপর সমাপ্তি দীর্ঘ এক নাটকীয়তার।”
চলবে
(রিচেক নেই আজ। ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা পর্ব ৭
-
পরগাছা পর্ব ১৪
-
পরগাছা পর্ব ৫
-
পরগাছা পর্ব ৩
-
পরগাছা পর্ব ১
-
পরগাছা পর্ব ১৭
-
পরগাছা পর্ব ১৮
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
পরগাছা পর্ব ৯
-
পরগাছা পর্ব ১৫