পরগাছা |১৮|
ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
গুঞ্জরিকা তখন সবে ষোলোতে পদার্পণ করেছে। শশী দিঘিতে সে বছর বড়ো গ্রাম্য মেলার আয়োজন করেছেন গ্রামের মোড়ল সহ ধনী ব্যক্তিবর্গ গণ মিলে। মেলা থাকবে এক সপ্তাহ ধরে। প্রতিবারের মতই সেবারের মেলাটাও স্কুলের সামনে মাঠেই বসেছিল। হরেক রকমের জিনিসের আনাগোনা ছিল সেখানে। মেলার দ্বিতীয় দিনে পুকুরপাড়ে বসে চন্দ্রা এবং গুঞ্জরিকা পরিকল্পনা করে রাতে তারা মেলাতে যাবে। বাড়ির সকলে ঘুমিয়ে পড়লে আর অসুবিধা হবে না। দুজনেই ভীষণ উৎসুক ছিল। কারণ ওত বড়ো মেলা তারা আগে কখনো দেখেনি। দিনের আর রাতের মেলা এক হলো নাকি? রাতের মেলার সৌন্দর্য অন্যরকম মনমুগ্ধকর। কথার এক ফাঁকে চন্দ্রা বলে বসেছিল,
“গুঞ্জ তোর ভাইজানরে সঙ্গে আনিস।”
গুঞ্জরিকা সেদিন অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল। স্পষ্ট দেখেছিল লাজুকতায় মোড়ানো চন্দ্রার বদন। মেয়েটার ফর্সা ফুলো গাল দুটো লালচে হয়ে উঠেছিল। কী মারাত্মক ছিল সেই সৌন্দর্য! খিলখিলিয়ে হেসে উঠে জবাবে জিজ্ঞাসা করেছিল,
“ভাইজানরে আনলে তুই খুশি হবি?”
চন্দ্রা লাজুক হেসে মাথা নেড়েছিল। ওড়নার একাংশের নিচে মুখ লুকিয়েছিল। সেই নিয়ে কত হেসেছিল গুঞ্জরিকা। সেই রাতে গুঞ্জরিকা সত্যিই তাইমুরকে নিয়ে মেলায় গিয়েছিল। তাইমুরকে দেখে চন্দ্রার খুশি ছিল আকাশচুম্বী। তিনজনে মিলে নাটক দেখেছিল। নগর থেকে অভিনেতারা এসে অভিনয় করেছিল। নাটকের শেষটা ছিল ভীষণ মর্মান্তিক। নায়ক, নায়িকা দুজনেই মারা যায়। সেই নিয়ে দুই সখী নাকের পানি, চোখের পানি এক করেছিল। তাইমুর সেই কাণ্ড দেখে মুচকি হেসেছিল কেবল। দুজনকেই একজোড়া করে দুই জোড়া চুড়ি কিনে দিয়েছিল। সেই রাতের সবটা স্বপ্নের মতো সুন্দর ছিল।
কিন্তু সমস্যা বেঁধেছিল বাড়িতে ফেরার সময়। পথিমধ্যে দুটো খেপা কুকুর তাদের তাড়া করে। তাইমুর সাহস করে প্রথমে তাড়াতে চাইলে খুব একটা সুবিধা করতে পারে না। তিনজন ভয়ে দিক-বেদিক ভুলে দৌড় দেয়। কুকুরের কামড়ে জলাতঙ্ক হলে মুশকিল। প্রকৃতিতে বিছিয়ে রাখা আঁধারের চাদর ঠেলে বেরোতে পারে না গুঞ্জরিকা। পথ ভুলে অন্যদিকে চলে আসে। দীর্ঘ একটা সময় দৌড়ে মেয়েটা হাঁপিয়ে যায়। পা পিছলে ভুলবশত খাদে পড়ে যায়। গা-হাত-পা সব ছিলেছুলে যায়। কীভাবে কী হয়ে যায় সবটা গুঞ্জরিকার মাথার একহাত উপর দিয়ে যায়।
সেই সময় অমন জনমানবহীন মাঠের মধ্যে অপ্রত্যাশিতভাবে দেখা মেলে একটুকরো জ্যোতির। গুঞ্জরিকা যেন একটু আশার আলো দেখতে পায়। দেহে প্রাণ ফিরে পায়। কিন্তু পরক্ষণেই ভয়ে জড়োসড়ো হয়ে পড়ে। যদি কোনো ডাকাত দল হয়? কী করবে ভেবে কুলকিনারা পায় না। খাদের পাশের কাঁচা রাস্তা ধরে আলোর উৎসটা ক্রমশ এগিয়ে আসে। আস্তে ধীরে গুঞ্জরিকা বরাবর চলে আসে। মেয়েটা তখনো বুঝে উঠতে পারে না কী করবে! হঠাৎ সেই সময় সাইকেলটা থেমে যায়। সাইকেলে ঝুলানো লণ্ঠনটা কিঞ্চিৎ উঁচু হয়। দুটো চোখের তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে গুঞ্জরিকার ভয়ার্ত দৃষ্টি মিলে যায়। মেয়েটা ভয় পায়, অন্তঃস্থল ভীত হয়। শ্রবণেন্দ্রিয়ে প্রবেশ করে বজ্রগম্ভীর পুরুষালী কণ্ঠস্বর,
“কে ওখানে?”
গুঞ্জরিকা তৎক্ষণাৎ কোনো জবাব দিতে পারে না। হঠাৎ করেই নিজেকে লুকানোর প্রয়াস চালায়। খাদের আরেকটু নিচে নেমে যায়। এতে অপরপক্ষের কপালে দৃঢ় ভাঁজের সৃষ্টি হয়। সাইকেল থেকে নেমে দাঁড়ায়। সাইকেলটা রাস্তার একপাশে রেখে লণ্ঠন হাতে খাদের দিকে এগিয়ে আসে। নিচে একটু উঁকি দিতেই দেখে জলজ্যান্ত একটা মানুষ নিজেকে গুটিয়ে রেখেছে। একেবারে ছোট্ট বিড়ালছানার মতো। এতে আগন্তুকের অধরযুগলে মুচকি হাসির রেশ ছড়ায়। মেয়েটার ভয়ের কারণ খানিকটা উপলব্ধি করতে পারে। কোনো কথা ছাড়াই বলে,
“উপরে উঠে আসুন মেয়ে। ভয় নেই। আমি আপনার কোনো ক্ষতি করব না।”
গুঞ্জরিকা চকিতে ফিরে উপরের দিকে তাকায়। ঠোঁটের কোণটা কেটে গেছে। রক্ত ঝরছে সেখান থেকে। সেটা চেপে ধরে আছে। তবুও মুখমণ্ডল উজ্জ্বল। হাসিমুখে শুধায়,
“সত্যি বলছেন?”
অপরপক্ষ মাথা নাড়ে। একটা হাত এগিয়ে দেয়। গুঞ্জরিকা হাতের দিকে তাকিয়ে একটু ইতস্ততবোধ করে। মিনিট দুই নিচেই দাঁড়িয়ে থাকে। কিছু একটা ভেবে সেই হাতকে আশ্রয় করে উপরে উঠে আসে। আগন্তুকের দিকে চেয়ে মুচকি একটা হাসি দেয়। লণ্ঠনের আলোয় নিজের ক্ষতস্থান গুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে। ভাবে, এগুলো কীভাবে আব্বা-মায়ের চোখের আড়ালে রাখা যায়। এগুলো তাদের চোখে পড়লে তুফান উঠে যাবে বাড়িতে। সেই সময় শুনতে পায় অপরপক্ষ থেকে ভেসে আসা একটা প্রশ্ন,
“মেয়ে, আপনার নাম কী?”
গুঞ্জরিকা কষ্ট চেপে মুখের হাসি বজায় রাখে। জবাব দেয়, “গুঞ্জরিকা।”
“পুরো নাম?”
গুঞ্জরিকা নিজের শরীরে লেগে থাকা কাঁদা-মাটি ঝাড়ছে। সেই অবস্থাতেই জবাব দেয়,
“গুঞ্জরিকা প্রামাণিক।”
অপরপক্ষ থেকে পুনরায় একের পর এক প্রশ্নের বাণ ভেসে আসে, “কোন গ্রামে থাকা হয়?”
“শশী দিঘি।”
“শশীদিঘি তো পাশের গ্রাম। এখানে কীভাবে এলেন এতরাতে? আর খাদেই বা কী করছিলেন?”
গুঞ্জরিকার চোখে পানি জমে। ভয় হয়। ভাইজান আর সখীর জন্য খুব চিন্তা হচ্ছে। কোথায় কীভাবে আছে কে জানে? মেয়েটা ম্লান কণ্ঠে বলে, “মেলাতে গিয়েছিলাম ভাইজান আর সখীর সাথে। রাস্তায় কুকুড়ের তাড়া খেয়ে সব এলোমেলো হয়ে গেছে। আমি হারিয়ে গেছি।”
কিছুক্ষণ নীরবতা চলে। অপরপক্ষের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি চারপাশে ভাসমান হয়। এতরাতে এই সুনসান মাঠে থাকা উচিত নয়। গম্ভীর কণ্ঠে আদেশ জারি করে,
“সাইকেলের পিছনে উঠে বসুন। আপনাকে বাড়ি অবধি রেখে আসি। এখানে এভাবে থাকা ঠিক নয়।”
গুঞ্জরিকা জবাবে দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়ে। যার অর্থ না। এত রাতে একটা ছেলের সাথে তাকে দেখে নিলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে। সমাজে মুখ দেখাতে পারবে না। ফুঁপিয়ে ওঠে মেয়েটা। ক্রন্দনরত গলায় বলে,
“লোকে দেখলে নিন্দে করবে। আমি যেতে পারব না। এ কী ঝামেলায় ফেঁসে গেলাম আল্লাহ! রক্ষা করো। পথ দেখাও।”
মুখের কথা শেষ হতেই মেয়েটা শুনতে পায়,
“তাহলে এখানেই থাকুন। আমি যাই।”
গুঞ্জরিকার কান্নার বেগ বাড়ে। দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে। নিজেকে একটু ধাতস্থ করে সন্তর্পণে চোখ মুখ মুছে নেয়। রিনরিনে গলায় জানতে চায়,
“আপনার নামটা কী বাবু?”
উত্তস্বরুপ শোনা যায় শীতল গলার আওয়াজ,
“আরুষ শেখ।”
গুঞ্জরিকা এতক্ষণে পূর্ণ দৃষ্টি মেলে সামনে দাঁড়ানো মানুষটাকে দেখে। শুভ্র রঙা পাঞ্জাবী পাজামা পরিহিত সুদর্শন একজন যুবকের সাথে এতক্ষণ কথা বলছে সে। পোশাক দেখেই মনে হচ্ছে ধনীর দুলাল। তবে ভদ্র সভ্য। কী সুন্দরভাবে আপনি সম্বোধন করছে! ভরসা করাই যায়। আর তাছাড়া উপায় ও তো নেই। গুঞ্জরিকা দ্রুত চোখ নামিয়ে নেয়। নরম গলায় বলে,
“আমাকে গ্রামের সীমানায় নামিয়ে দিয়ে এলেই হবে বাবু।”
আরুষ ক্ষীণ হাসে। ভ্রু তুলে প্রশ্ন করে,
“অতদূর অবধি যাবেন আমার সাথে? যদি মানুষে দেখে নেয়? বিয়ে হবে না তো আপনার।”
গুঞ্জরিকা এমন কথাতে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। পরক্ষণেই বুঝতে পারে আরুষ মশকরা করছে। মৃদু হাসে মেয়েটা। নিঃশব্দে সাইকেলের পিছনে উঠে বসে। দূরাকাশের মৃগাঙ্কের আলতো আলোয়, ঝিরিঝিরি পবনে মেঠোপথ ধরে নিজের গ্রামে ফিরে আসে গুঞ্জরিকা। পথিমধ্যে গুঞ্জরিকা জানতে চায় এতরাতে আরুষ কোথায় থেকে আসছে? উত্তরে জানার সুযোগ হয়, নগর থেকে ফিরছে ছেলেটা। মাঠের কিনারায় গুঞ্জরিকাকে নামিয়ে দিয়ে আরুষ বলে,
“আপনার পায়ের ক্ষতটা গভীর। ডাক্তার দেখিয়ে ঔষধ খাবেন ঠিকমতো।”
গুঞ্জরিকা মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। মেয়েটা তখনো জানত না এতখানি ভরসা করা ছেলেটা পাশের গ্রামের বড়ো ব্যবসায়ীর একমাত্র ছেলে। যে প্রথম সাক্ষাতে নিজেকে খুইয়ে বসেছে তার মাঝে। জানলে বুঝি ওটাই প্রথম এবং শেষবারের মতো সাক্ষাৎ হতো তাদের? হতো বোধহয়। সেদিন যদি গুঞ্জরিকা জানত আকস্মিকভাবে দেখা হয়ে যাওয়া নম্র ভদ্র গম্ভীর ছেলেটা তাকে এক বুক সমান যন্ত্রনা দিবে তাহলে ওই খাদেই পড়ে থাকত। শেয়াল কুকুরের খাবার হতো তবুও এমন জীবন চাইত না। যাকে মনে জায়গা দিয়েছে তাকে কীভাবে অন্যজনের হতে দিতে পারে? এতটা উদার মন আদৌও একজন নারীর হতে পারে? পারে কী?
অতীতে ডুব দিয়ে গুঞ্জরিকা ডুকরে কেঁদে উঠল। এত সুখকর অতীত অভাগীদের থাকতে নেই। দুহাতে খামচে ধরল বিছানার চাদর। মধ্যরাতে যখন শেখ বাড়ির সকলে গভীর তন্দ্রায় আচ্ছন্ন তখন কপালপোড়া গুঞ্জরিকা ব্যস্ত স্মৃতিচারণে। পাশেই বসে আছে আরিকা। ছলছল চোখে মায়ের কান্না দেখছে। এই পর্যায়ে বলে উঠল,
“মা কান্না, মা কান্না।”
গুঞ্জরিকার কান্না থামল না। আর মাত্র দুটো দিন আছে এই শখের সংসারে। নিজ হাতে সাজানো গোছানো সংসার তার। পাঁচ পাঁচটা বছর ধরে আগলিয়ে রেখেছে। এই অবধি এনেছে। অথচ কত সহজেই একজন তৃতীয় ব্যক্তি হয়ে এসে সবকিছু পেয়ে গেল। হাহ্! আরিকা উড়ে যেয়ে মায়ের মাথার কাছে বালিশের উপরে বসল। আলগোছে মাথাটা গুঞ্জরিকার কপালে ঠেকাল। সেভাবেই বসে রইল। গুঞ্জরিকার রোদন তখনো থামেনি। দমবন্ধ হয়ে আসছে মেয়েটার। বারবার মস্তিষ্কে একটা শব্দ উঁকি দিচ্ছে,
“তৃতীয় ব্যক্তি গুলো এত ভাগ্যবতী কেন হয়? একজনের বহু কাঙ্ক্ষিত শখ, সুখ সবটা না চাইতেও তারা পেয়ে যায়।”
.
রাতের শেষ প্রহর। ফজরের আযানের সময় হয়ে আসছে। নিশাচর প্রাণীর মতো শেখ বাড়িতে আরও একটা মানুষ বেশকিছু দিন হলো ঘুমায় না। ঘটা করে তার নেত্রপল্লবের বিচ্ছেদ ঘোষণা করা হয়েছে। দূরকাশের তারকার দিকে চেয়ে রাত্রিযাপন করে সে। পবনে ভেসে আসা গুঞ্জনে নিজের দুঃখ বিলায়। সঙ্গী হয় আসমানের ওই সুন্দরী শশী আর চোখের দুফোঁটা নোনা জল। একদিনের সংসারে সে নিজেকে খুইয়ে এসেছে। বের হতে পারেনি এখনো। সে চায় না বের হতে। থাকুক না এমন একটা সুন্দর কলঙ্ক। রবী তাকে চাঁদের সাথে তুলনা দিয়েছিল। বলেছিল,
“আপনার সৌন্দর্যের কাছে চাঁদ বড়ো তুচ্ছ রাগিনী। সে বড্ড হিংসা করছে আমায়। কারণ আমার ঘরেও তার থেকে অনেক বেশি সুন্দর চাঁদ আছে।”
সেই রাতে অদিতি প্রথম বারের মতো রবীর সামনে মন খুলে হেসেছিল। মনে মনে বারকয় আওড়েছিল,
“ছেলেটা বদ্ধ উন্মাদ।”
চাঁদের ও কলঙ্ক আছে। তাহলে অদিতির থাকলে ক্ষতি কি? পৃথিবীর চন্দ্র আর রবীর চন্দ্র এইদিক থেকে না হয় একই হলো। একটা কলঙ্ক নিয়েই নিজেদের আলোকিত করল। বেঁচে থাকল একজীবন।
বিয়ের প্রথম রাতে রবী বলেছিল সে পশুপাখিকে ভীষণ ভালোবাসে। তাই ছাদে সে কবুতর পালে। সেখানে একজোড়া কবুতর আছে। যাদের নাম রাজা-রানী। এই নাম রেখেছিল কারণ ওরা দুজন নাকি একে অপরকে ছাড়া কিছুই বুঝত না। বাচ্চা ফুটানোর সময় রাজা রানীকে যত্ন খাইয়ে দিত। তাদের এত ভালোবাসা দেখে শখ করে এই নাম রেখেছিল। রবী অদিতিকে নিয়ে বিকেলে গিয়েছিল ছাদে। রাজা রানীর সাথে এক বিকেল ভোর দুজন আড্ডা দিয়েছিল। অতটুকু সময়ে অদিতির গা ঘেঁষা হয়ে গিয়েছিল কবুতর দুটো। আচ্ছা রবীকে ছাড়া তারা এখন কেমন আছে? মুখে খাবার তুলছে কি? রবীকে খুঁজছে না একটুও? অদিতির গাল বেয়ে দুই ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। বুক চিরে ক্লান্ত দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এল। ভাবল আগামীকাল মানুষ পাঠিয়ে রাজা রানীকে এনে নিজের কাছে রাখবে। তাদের পালবে। এই একজীবনের সঙ্গী না হয় তারাই হবে। ভাবী জান যেমন আরিকাকে নিয়ে বেঁচে আছে। সেও না হয় রাজা রানীকে নিয়েই বেঁচে থাকবে।
অদিতি যখন কল্পনার জগতে হারিয়েছে তখন নিচ থেকে চিৎকার চেঁচামেচির আওয়াজ ভেসে এল। মেয়েটা ধ্যান চ্যুত হলো। এই ভোর রাতে কার কী বিপদ হলো? ব্যস্ত হাতে চোখ মুখ মুছে উঠে দাঁড়াল। হন্তদন্ত হয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
অদিতি, গুঞ্জরিকা এবং চন্দ্রা তিনজনে একসাথে সিঁড়ির মুখে এসে দাঁড়াল। সকলেই হট্টগোলের আওয়াজ পেয়ে ছুটে এসেছে। দেখল, একটা চেয়ারে বসে আছেন রোকেয়া শেখ। পাশেই সালেহা শেখ, আয়েশা শেখ, সারথী এবং আসমান শেখ দাঁড়িয়ে আছেন। রোকেয়া শেখ যন্ত্রনায় কাতরাচ্ছেন। পাশে বসে আয়েশা শেখ কাঁদছেন আর গুনগুনিয়ে কী সব জপ করছেন। ওরা তিনজন ত্বরান্বিত পায়ে নিচে নেমে গেল। রোকেয়া শেখের কাছে উপস্থিত হতেই জানতে পারল, ওজু করতে যেয়ে কলপাড়ে পা পিছলে পড়েছেন রোকেয়া শেখ। কোমরে আর মাথার পিছন দিকটাতে অত্যধিক আঘাত পেয়েছেন। ঠিকমতো কথাটাও বলতে পারছে না। কেমন ঝিম মেরে গেছেন মানুষটা। কিন্তু দুঃখের বিষয় এখন কিছু করার ও নেই। সকাল অবধি অপেক্ষা করতে হবে। তবেই ডাক্তার পাওয়া সম্ভব নচেৎ নয়।
অদিতি ছুটল ঠাণ্ডা পানি আনতে। সেটা নিয়ে এসে খুব করে মায়ের মাথার পিছনে এবং কোমরে দিল। কোমরে আলতো হাতে ডলে দিচ্ছে মেয়েটা। সেই অবস্থাতেই বলে উঠল,
“এই সামান্য ব্যথা টুকু সহ্য করতে পারছ না আম্মা? অথচ কারোর থেকে তার স্বামী কেড়ে নিয়ে মৃত্যু সমান যন্ত্রনা তুমি দিচ্ছ। আল্লাহ ছাড় দেন তবে ছেড়ে দেন না।”
এমন বিষাদে মোড়ানো পরিবেশে অদিতির কথাগুলো বড্ড অদ্ভুত শোনাল। ওই যে সত্য সবসময় তেঁতো হয়। সবাই হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। আয়েশা শেখের কান্না থেমে গেছে। রোকেয়া শেখ শরীর বিষিয়ে তোলা যাতনা সয়ে নিভু নিভু চোখে মেয়ের দিকে চেয়ে রইলেন। গুঞ্জরিকা নির্বিকার ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে। যেন এইসব তার ভেতরে কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। আর চন্দ্রা? একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে মেঝের দিকে। তার বলার কিছু নেই। ইচ্ছা, অনিচ্ছা যেটাই হোক না কেন একজনের সাথে সে অন্যায় করেছে। আর এই সত্য সে কখনোই মুছতে পারবে না। সম্ভব নয়।
চলবে
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। প্রিয় পাঠক আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা গল্পের লিংক
-
পরগাছা পর্ব ১
-
পরগাছা পর্ব ১৭
-
পরগাছা পর্ব ১২
-
পরগাছা পর্ব ১৪
-
পরগাছা পর্ব ১৫
-
পরগাছা পর্ব ১৩
-
পরগাছা পর্ব ৪
-
পরগাছা পর্ব ৩
-
পরগাছা পর্ব ৭