Golpo কষ্টের গল্প পরগাছা

পরগাছা পর্ব ১৪


পরগাছা |১৪|

ইসরাত_তন্বী

(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)

আজ সকলের দিন শুরু হয়েছে ব্যস্ততার হাত ধরে। কেউ বসার ফুরসৎ টুকুও পাচ্ছে না। একটা বিয়ে বাড়ির কাজ তো আর কম নয়। গুঞ্জরিকা সকাল থেকেই এটা সেটা কাজ ধরে ছুটছে এদিকে সেদিকে। অদিতিকে বিয়ের জন্য প্রস্তুত করে দেওয়ার দায়িত্ব তাকে দেওয়া হয়েছে। গুঞ্জরিকা এই দায়িত্ব নিতে ইতস্তত বোধ করছিল। আজকের দিনে অন্তত সে কোনো প্রকার ঝামেলা বাঁধাতে চায় না। আর না কারোর কটুকথা শুনতে চায়।‌ কিন্তু অদিতি ছিল নাছোড়বান্দা। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়েই রাজি হয়েছে।

ঘড়ির কাঁটার দখলদারিত্ব এখন এগারোটার ঘরে। অদিতিকে গোসল করিয়ে কক্ষে রেখে মাত্রই বেরিয়েছে গুঞ্জরিকা। নিজে পরিপাটি হয়ে একেবারে আসবে এই কক্ষে। বরযাত্রী না এলে তো শাড়ি সহ গহনা কিছুই পাবে না। সাজুগুজু করাবে কী দিয়ে? সময় তো ক্রমশ পেরিয়ে চলেছে। তার থেকে ওদিকের কাজ গুছিয়ে আসাই ভালো। গুঞ্জরিকা নিজের কক্ষের দিকে হাঁটা ধরল। অমনিই কর্ণগোচর হলো আরুষের কণ্ঠস্বর। ডাকছে ওকেই,
“গুঞ্জন? কোথায় তুমি? আমার নতুন সাদা পাঞ্জাবিটা কোথাও খুঁজে পাচ্ছি না।”

আগের মতোই হাক-ডাক আরুষের। যেন কত মাখো মাখো সম্পর্ক বিদ্যমান তাদের মধ্যে। আরুষের কক্ষ পেরোনোর সময় একঝলক তাকাল সেদিকে গুঞ্জরিকা। দেখল ঘরের মধ্যে কাপড়চোপড় সব এলোমেলো। চন্দ্রা এবং আরুষ দুজন মিলে খুঁজে চলেছে। গুঞ্জরিকা মুচকি হেসে পাশ কাটিয়ে চলে গেল। এইসব দেখার মতো ওত সময় আপাতত হাতে নেই। সবাই নতুন অভ্যাস গড়ে তুলুক। মানুষ হয়ে কারোর আশ্রয়ে বাঁচতে নেই। পরবর্তীতে সেই আশ্রয় হারিয়ে গেলে মানুষের মন মরে যায়। একটা সময় পরে তাকে জীবন্ত লা শ ঘোষণা করা হয়। আর যাই হোক গুঞ্জরিকা কখনো নিজের শত্রুর ও খারাপ চায় না। সেখানে মানুষটা তো তার স্বামী ছিল। যদিও সেই সম্পর্ক এখন আপন-পরের মধ্যস্থানে ঝুলে আছে‌। নেই কোনো ভবিষ্যৎ। কিন্তু ছিল তো? যেই স্পর্শ স্বেচ্ছায় নিজের অঙ্গে ধারণ করেছে সেটা মুছে ফেলার সাধ্য তো ওর নেই।
.

মধ্যিখানে পেরিয়েছে বেশ অনেকটা সময়। দুপুর হতে চলল। বরযাত্রী আসার সময় হয়ে আসছে। বরের থালা গোছানো সহ ওদিকের সব কাজ সেরে মাত্রই গোসল করে কক্ষে এসেছে গুঞ্জরিকা। নিজেকে পরিপাটি করতে নিযুক্ত। শরীরে একটা হালকা গোলাপী রঙের সুতি শাড়ি জড়িয়েছে। ফর্সা শরীরে রঙটা বড্ড মানিয়েছে। ঠিক সেই সময় দরজায় করাঘাত এর শব্দ শোনা গেল। গুঞ্জরিকা ব্যস্ত গলায় বলল,
“ভেতরে আসুন।”
কথাটা বলেই পুনরায় নিজের কাজে মনোনিবেশ করল। দেখল না অবধি কে এসেছে। শুধু অনুভব করল কারোর উপস্থিতি। তক্ষুনি টেবিলের উপর রাখা ছোট্ট আয়নায় আরও একটা মুখমণ্ডলের প্রতিবিম্ব ফুটে উঠল। গুঞ্জরিকার চুলে চালানো হাতটা থেমে গেল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টি তাক করল আয়নার ভেতর দিয়েই। এতে অপরপক্ষের মুখের হাসি বাড়ল। গুঞ্জরিকা পিছু ফিরে দাঁড়াল। হাতে থাকা চিরুনিটা আলগোছে টেবিলে রাখল। নজরে এল অপরপক্ষের হাতে থাকা একটা লাল টকটকে শাড়ি। আর এতেই মসৃণ কপাল গুটিয়ে গেল। কিছুক্ষণ একদৃষ্টে চেয়ে রইল সেদিকে। পরক্ষণেই মুচকি হাসল,
“ওটা ফিরিয়ে নিয়ে যান শেখ বাবু।”

আরুষের মাঝে কোনো হেলদোল দেখা গেল না। নিঃশব্দে শাড়িটা পালঙ্কের উপরে রাখল। পরপরই গুঞ্জরিকার দিকে তাকাল। নেত্র যুগলে ছড়াল মুগ্ধতা। বাম ভ্রু তুলে অভিভূত হয়ে আওড়াল,
“মা শা আল্লাহ।”
দাঁড়াল না আর। উলটো ঘুরে হাঁটা ধরল। এমন অদ্ভুত ব্যবহারে গুঞ্জরিকা একটু অবাক হলো বৈকি। পিছন থেকে বলে উঠল,
“আগুন দিয়ে পুড়িয়ে ছারখার করে দিব। নিয়ে যান আপনার আনা শাড়িটা। ওটা কখনো আমার শরীর স্পর্শ করতে পারবে না।”

থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল আরুষ। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে দেখল। ঠোঁটের কোণে হাসি ঝুলিয়ে স্বভাবসুলভ গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্ন করল,
“কেন আমার স্পর্শ আছে তাই?”
গুঞ্জরিকা নরম হলো না। সেভাবেই বলল,
“জি, তাই।”
“নগর থেকে খুব সাধ করে আনিয়েছি তোমার জন্য। আজ এটা পড়ো গুঞ্জন। শেষ অনুরোধ টুকু রাখো। আর কখনো আবদার করব না। তোমাকে লাল শাড়িতে দেখার ইচ্ছাটুকু অপূর্ণ রাখতে চাই না।”

গুঞ্জরিকার কুঁচকানো কপাল সমতল হয়ে এল। শীতলতা খেলে গেল চোখ দুটোতে। থমকাল হৃৎস্পন্দন। বক্ষপিঞ্জরে এক ঝাঁক মুক্ত প্রজাপতি আটকে রইল। ওড়ার সুযোগ পেল না। আরুষ বড্ড আশা নিয়ে চেয়ে আছে। গুঞ্জরিকার মন বলছে, জীবন তো একটাই গুঞ্জ। সব মানিয়ে গুছিয়ে থেকে যা। ভাগ্যের উপর জোর দেখাস না। ভালোবাসার উপরে আর কিছু আছে নাকি? অপরদিকে মস্তিষ্ক বলে চলেছে, তুই বড়ো মুর্খ গুঞ্জ। তোর ক্ষতসৃষ্টিকারীর কাছেই ক্ষতের ঔষধ চায়ছিস? ওই ক্ষত কি আদৌও নিরাময় হবে? সময়ের সাথে সাথে তো ক্ষতের পরিমাণ বাড়বে। গভীর হবে, তোকে গ্রাস করে ফেলবে। তুই মরণ যন্ত্রনায় দগ্ধ হয়ে পুড়ে চলবি নির্নিমেষ। কিন্তু মুক্তি মিলবে না। জেনেবুঝে আবারও বিষ পান করবি? বুকজ্বালা সইতে পারবি তো?

গুঞ্জরিকার নিজেকে কেমন পাগল পাগল অনুভূত হলো। মন-মস্তিস্কের নীরব যুদ্ধে দিশেহারা লাগল। রাগ জমল আরুষের উপরে। ক্ষুধার্ত বাঘিনীর ন্যায় কর্কশ গলায় চিৎকার করে উঠল,
“আপনি আসবেন না আমার সামনে। আমাকে বাঁচতে দিন। নিয়ে যান ওই শাড়ি। লাল রং আজ থেকে আমার জন্য হারাম ঘোষণা করলাম। সব লাল ত্যাগ করলাম আমি।”

মুখের কথা শেষ করে পা জোড়া জোরপূর্বক টেনে ঘর থেকে প্রস্থান করল গুঞ্জরিকা। একটা বার পিছু ফিরে দেখল না। আরুষের মুখাবয়ব জুড়ে অসহায়ত্বেরা ভীড় জমাল। করুণ চোখে মেয়েটার যাওয়ার দিকে চেয়ে রইল। চৌকাঠের ওপাশেই চন্দ্রা দাঁড়িয়ে আছে। গুঞ্জরিকা সেদিকে পাত্তা দিল না। পাশ কাটিয়ে চলে গেল। চন্দ্রা আরুষের দিকে তাকিয়ে অবজ্ঞার স্বরে হাসল,
“অথচ এটা আমারও প্রাপ্য ছিল। আপনার আম্মা বলেছিলেন তোমার সব আবদার, ভালোবাসার সকল সাধ আমার ছেলে মিটিয়ে দিবে। এভাবেই বুঝি মিটবে? এত বড়ো বাড়ি, এত টাকা পয়সা থাকতেও আমার কপালে একটা নতুন শাড়ি জুটল না বিয়ে উপলক্ষে। আমাকে পরিবারের সদস্য হিসেবে গণ্য করা হলো না। বোকা আমি সারাজীবন সকলের দাবার গুটিই রয়ে গেলাম। একজনের সাথে করা অপরাধ আমার গলায় বিষব্যথার ন্যায় আটকে রয়ে গেল। তার মুক্তি মিললেও আমার মিলল না। পণ্যের মত বিক্রি করা হলো আমাকে। মামা চিনল টাকা। আর আমি পড়লাম জাঁতাকলে। সারক্ষণ পিষে চলেছি।”

নরম, নীরস গলায় কথাগুলো বলেই হনহনিয়ে ওখান থেকে চলে গেল চন্দ্রা। আরুষের প্রথমে কিছুই বোধগম্য হলো না। যখন মস্তিষ্ক সবটা উপলব্ধি করতে পারল তখন মায়ের উপর জন্মানো বিতৃষ্ণার পারদ বাড়ল। আঁখি জোড়া ঝাঁপসা হয়ে এল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“আপনি আর কত নিচে নামবেন আম্মা? আমার মৃত্যু কি পারবে আপনার এই কুটিলতা থামাতে?”
.

ধরণির বুকে সাঝ নেমেছে। চৌধুরী বাড়ি আজ মেতেছে উৎসবের আমেজে। নতুন বউ বাড়িতে এসেছে কিছুক্ষণ আগেই। অদিতিকে বসার ঘরে সোফায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। রাত হলেও পাড়া প্রতিবেশীরা ভীড় জমিয়েছে নতুন বউ দেখতে। ওদিকে কন্যা দানের পর থেকে একভাবে কেঁদে কুটে চোখ মুখ ফুলিয়ে ফেলেছে অদিতি। এখানে তেমন কেউই পরিচিত নয়। কামনা আপা এসেছে ওদের সাথে কিন্তু তারও খোঁজ নেই কোনো। কোথায় আছে কে জানে? কোনো কিছুকে পরোয়া না করা অদিতি আজ উদ্বিগ্ন। নতুন জায়গার, নতুন মানুষের কথাগুলো হজম করার শক্তি দিক আল্লাহ। একেক জন এসে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখছে। যেন বউ নয় পণ্য দেখতে এসেছে। কতশত খুঁত ধরে চলেছে। কথা শুনিয়ে চলেছে। অদিতির ধৈর্যশক্তির চুড়ান্ত পরিক্ষা নিচ্ছে আজ সকলে। মুখ ফসকে কিছু বলে বসলেই বিপদ। জোরপূর্বক মুখে হাসি টেনে অনুভূতিহীন পাথরের মত বসে আছে মেয়েটা।

এই পর্যায়ে অদিতির সামনে এসে দাঁড়াল মধ্যবয়স্ক একজন নারী। সম্পর্কে রবীর ফুপি মনি। পরিহিত পোশাকে আভিজাত্যের ছোঁয়া বিদ্যমান। শাণিত দৃষ্টিতে অদিতিকে নিচ থেকে উপর অবধি পরখ করলেন। ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“হাসতে জানো না? এই বিয়েতে খুশি নও তুমি?”
রসকষহীন কণ্ঠস্বর ভদ্রমহিলার। অদিতি দ্রুত দুদিকে মাথা নাড়ল। ক্লান্ত বদনে অনিচ্ছাকৃত হাসি ফুটিয়ে তুলল। রিনরিনে কণ্ঠস্বরে জবাব দিল,
“জি, পারি।”
ভদ্রমহিলা এইবার অধিকতর শক্ত গলায় বললেন,
“তাহলে হাসছ না যে? বাড়ি থেকে নিষেধাজ্ঞা জারি করা আছে কি?”

অদিতির ধৈর্যের পারদ ক্রমশ ক্ষয়ে আসছে। মুখের হাসি টুকু মিলিয়ে যেতে চাইলেও ধরে রাখল। তৎক্ষণাৎ পিছন থেকে ভেসে এল একটা নারী কণ্ঠ,
“রেখা আপা আপনার বিয়ের সময় আপনি দুইদিন ভাত খেয়েছিলেন না বাবার বাড়ির শোকে। সেখানে আমার বউমা তো শুধু একটু মন ভার করেই আছে। আর হাসতে না জানলে সমস্যা কোথায়? শিখিয়ে দেওয়ার জন্য আমি তো আছি।”

অদিতি সহ ওখানে উপস্থিত সকলে পিছনে ফিরে দেখল। হাসিমুখে দাঁড়িয়ে আছেন চৌধুরী বাড়ির বড়ো বউ লাবণ্য চৌধুরী। অদিতি চিনল মানুষটাকে। যখন পালকি থেকে নেমেছিল তখন এই মানুষটাই মিষ্টি খাইয়ে ঘরে তুলেছিলেন। রবীর মা, নিজের শাশুড়ি আম্মা। অদিতির অধরযুগলে হাসি ফুটে উঠল। রেখা চৌধুরী ঠোঁট বাঁকিয়ে অনাদরের সহিত বললেন,
“আপনি তো সর্বগুণী ভাবী। সব পারেন।”

লাবণ্য চৌধুরীর মুখের হাসি বাড়ল। উত্তর দিলেন,
“জি, আপনাদের দোয়ায় আলহামদুলিল্লাহ অনেক কাজই পারি আপা।”
রেখা চৌধুরী কথাগুলো শুনলেন তবে প্রত্যুত্তর করলেন না। গটগট পায়ে হেঁটে প্রস্থান করলেন। লাবণ্য চৌধুরী এগিয়ে এসে অদিতির সম্মুখে দাঁড়ালেন। বললেন,
“কক্ষে চলো বউমা। তোমাকে দেখে বড্ড ক্লান্ত মনে হচ্ছে। রবী ওর বন্ধুদের আনতে স্টেশনে গিয়েছে। চলে আসবে একটু পরেই।”

অদিতির আননে কৃতজ্ঞতার রেশ ছড়াল। এতক্ষণে এটার অপেক্ষাতেই ছিল। ক্লান্তিতে শরীর ভেঙে আসছে মেয়েটার। তবুও মুখ ফুটে কিছু বলার সাহস করতে পারছে না। আসার সময় ভাবীজান বারবার করে বলে দিয়েছেন মুখের অপব্যবহার না করতে। মানুষের মধ্যে অনেক ভেদাভেদ আছে। কেউ প্রসংশায় পঞ্চমুখ হবে তো কেউ খুঁত ধরে দুই-দশটা কথা শুনিয়ে দিবে। বিয়ের প্রথম কয়েকদিন যেন অদিথি একটু হজম করে নেয়। প্রয়োজনে এখন শব্দ বাঁচিয়ে পরবর্তীতে একসাথে ঢেলে দিবে।

অদিতি সুযোগ পেতেই দ্রুত উঠে দাঁড়াল। লাবণ্য চৌধুরী ওর কপালে চুমু এঁকে দিলেন। ওখানে অবস্থান করা সকলকে শুনিয়ে শুনিয়ে জোর গলায় বললেন,
“তুমি আমার বউমা নও আমার একমাত্র মেয়ে অদিতি শেখ। এই বাড়ির বড়ো মেয়ে তুমি। তোমার মা সবসময় তোমার পাশে আছে।”

অদিতির লোচন জোড়া পানিতে টইটম্বুর হয়ে উঠল। এত চমৎকার মনের মানুষটা ওর শ্বাশুড়ি আম্মা ভাবতেও মনগহীনে সুখকর বসন্ত দোলা দিয়ে যাচ্ছে। এইজন্যই বোধহয় ভাবীজান বলত মানবজাতিকে এক পাল্লায় মাপা সম্ভব নয়। একই মানুষ অথচ কেউ মা হিসেবে ভালো কিন্তু ফুপি, চাচি হিসেবে ব্যতিক্রম। আবার একই শব্দ কিন্তু মানুষভেদে পরিবর্তন আসে। এই ধরিত্রী বড়ো বিচিত্র। এই বসুধা সম্পর্কে জানতে, এখানে বসবাসরত মানুষগুলোকে জানতে এক জীবন নেহায়েত কম পড়ে যাবে।
.

মধ্যরাতে গ্রামখানা নিস্তব্ধ। অশরীরী এর মতো দাঁড়িয়ে আছে। দূরের বাড়িগুলো দেখে মনে হচ্ছে ভূত প্রেতের বসবাস সেখানে। প্রতিটা ঘরের লণ্ঠন নেভানো। প্রকৃতির বুকে বয়ে চলেছে ঝিরিঝিরি মারুত। অম্বরের মন ভার আজ। কালো কাদম্বিনীর ঘনঘটা সেথায়। থেকে থেকে আসমান চিরে দ্যুতির রেখার দেখা মিলছে। আলোকিত হয়ে উঠছে চারিদিক। এমন বৈরী আবহাওয়ায় নদীর পাড়ে একাকী বসে আছে আরুষ। জনমানবশূন্য নদীর চারপাশ। তটিনীর সলিল হাওয়ার সনে নৃত্যে মজেছে। আরুষের দৃষ্টি নিবিষ্ট স্রোতস্বিনীর তরঙ্গে। ছেলেটার এক হাতে জলন্ত সিগারেট স্পষ্ট। যেটা দিয়ে কুণ্ডুলি পাকিয়ে কালো ধোঁয়া উড়ছে। পরক্ষণেই মিশে যাচ্ছে বেনামী পবনে।

আরুষ আজ জীবনের প্রথম বারের মতোই ঠোঁট ছুঁইয়েছে সিগারেট নামক বস্তুতে। অপরহাতে লাল রঙের শাড়িটা দৃশ্যমান। যেটা বুকের সাথে জড়িয়ে রেখেছে। ছেলেটার নাক, মুখ লাল হয়ে ফুলে আছে। এসেছিল নদীতে ঝাঁপ দিয়ে জীবনের ইতি টানতে। কিন্তু পারেনি এত বড়ো কাজটা করতে। অদৃশ্য একটা পিছুটান জাল বিছিয়ে আঁকড়ে রেখেছে ওকে। এই পর্যায়ে শাড়িটাতে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। সেভাবেই মুখের সাথে ধরে রাখল। গাল বেয়ে বারিধারা নামল। ভিজে চুপচুপে হয়ে গেল শাড়ির একাংশ। সেভাবেই পেরোল কিয়ৎসময়। অকস্মাৎ শাড়িটা সবুজ ঘাসের উপরে রাখল আরুষ। পাশ থেকে দেশলাই কাঠি তুলে নিল। আগুন ধরিয়ে ছুঁড়ে দিল শাড়িটার দিকে। দাউদাউ করে আগুন জ্বলে উঠল। একচিত্তে চেয়ে রইল সেইদিকে। চোখের সামনে ঝড়ের গতিতে শাড়িটা পুড়ে চলল। শাড়িটার সাথে সাথে আরুষের শখ, স্বপ্ন সব যেন পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে।

হঠাৎ আকাশ ফুঁড়ে ঝমঝমিয়ে বৃষ্টি নেমে এল। নিভিয়ে দিল জলন্ত অগ্নিশিখা। শাড়ির তিনভাগের একভাগ অবশিষ্ট রইল। সেদিকে চেয়ে রক্তিম মুখমণ্ডলেই হেসে ফেলল আরুষ। সিক্ত ঘাসের উপরে শরীর ছেড়ে দিল। আঁখি জোড়া বুঁজে নিল। বিড়বিড় করে আওড়াল,
“শেষ স্মৃতি হিসেবে ওটুকু রয়ে গেলি? অথচ এটা বহনের শক্তি আর আমার মাঝে অবশিষ্ট নেই। চেনা পরিচিত মুখটা আজ বড্ড অপরিচিত। তোরা গুঞ্জনকে বলে দিস আমি অন্য একজীবনে আর রোকেয়া শেখের গর্ভ থেকে জন্ম নিব না।”

চলবে

(রিচেক নেই আজ। আপনারা এভাবেই পড়ুন।‌ সময় পেলে রিচেক দিয়ে দিব। ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন পাঠক। আপনাদের সকলের গঠনমূলক মন্তব্য ও রেসপন্সের আশা রাখি।)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply