পরগাছা |১৩|
ইসরাত_তন্বী
(অনুমতি বিহীন কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ)
‘যার লগে আমাদের মন মিলে তার লগে ভাগ্য মিলে না।’
ভাইজানের মুখনিঃসৃত এমন কথাতে সেদিন অবিশ্বাস্য নয়নে চেয়েছিল গুঞ্জরিকা। গ্রাম্য ভাষাতে উচ্চারিত প্রতিটা শব্দ অদ্ভুত রকমের অনুভূতির সাথে পরিচয় করিয়ে দিয়েছিল। তাইমুরের সাথে এক জীবনের শেষ কথপোকথন ছিল এটাই। অথচ সময় ঘুরে ভাইজানের বলা কথাগুলো নিজের সাথে মিলে গেল। তবে কি ভাইজানের দীর্ঘশ্বাসে ছিল গুঞ্জরিকা? চাইলে কি ভাইজানের শেষটা সুখকর হতে পারত? পারত কি?
গায়ে হলুদের পর্ব শেষ হয়েছে দুপুর নাগাদ। সময় পেরিয়ে ধরণির বুকে সাঝ নেমেছে। আলোর অস্তিত্ব ক্রমশ ফিকে হয়ে এসেছে। আঁধার তার পুঁটলা পুঁটলি বেঁধে প্রকৃতিতে রাজত্ব করতে নেমেছে। গুঞ্জরিকা মাগরিবের নামাজ আদায় করে রান্নাঘরে এসেছে অদিতির জন্য মেহেন্দি বাটতে। স্বেচ্ছায় খুশিমনে কাজটা হাতে নিয়েছে। রান্নাঘরের দখিনা বাতায়ন গলিয়ে ক্ষণে ক্ষণে ক্ষণে প্রবেশ করছে শীতল মারুত। ছুঁয়ে দিচ্ছে ক্লান্ত চিত্তের অধিকারিণীকে। রাঙা হাতে থমকে বসে আছে গুঞ্জরিকা। দৃষ্টি নিবিষ্ট খিড়কির ওপাশে দৃশ্যমান পুষ্পে। বসার ঘর থেকে সমস্বরে ভেসে আসা অট্টহাসির শব্দে গুঞ্জরিকা নড়েচড়ে বসল। ধ্যান ভাঙল। ধূর! এইসব কী উদ্ভট কথা ভাবছে। না চাইতেও মস্তিষ্কের প্রতিটা নিউরনে দখলদারিত্ব চালাচ্ছে চন্দ্রার বলা শেষ বাক্যগুলো। বারকয় মাথা ঝাঁকিয়ে এইসব থেকে বেরোতে চাইল। নিজের কাজে পুনরায় মনোনিবেশ করল মেয়েটা। আর একটুখানি বাকি আছে। ওটুকু বাটা হলেই শেষ। নিশ্চয় ওর অপেক্ষায় আছে অদিতি।
পেরিয়েছে মিনিট দশ। গুঞ্জরিকার মেহেন্দি বাটা শেষ। সবটা ঠিকঠাকভাবে গুছিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে এল। হাতে একটা পিতলের বাটি, যেটাতে মেহন্দি বাটা রাখা। পায়ে পায়ে এগিয়ে এসে বসার ঘরের চৌকাঠের সম্মুখে দাঁড়াল। সম্পূর্ণ কক্ষ মানুষে পরিপূর্ণ। গুঞ্জরিকা মুচকি হেসে ভেতরে প্রবেশ করল। দেখল পরিবারের সকলেই উপস্থিত আছে সাথে অতিথিরাও। আরুষ এবং আসমান শেখ একপাশে দাঁড়িয়ে কিছু একটা নিয়ে আলোচনা করছে। আর কোনোদিকে তাকাল না গুঞ্জরিকা। সোফায় বসা অদিতির সামনে দাঁড়িয়ে মেহেন্দির বাটিটা এগিয়ে দিল। অদিতি হাসি মুখে নিল। বলল,
“এত বেটেছ ভাবী? তুমি দিবে না? বসো এখানে।”
অদিতির মুখের কথাতেই গুঞ্জরিকা ভীষণ খুশি হলো। যদিও থাকবে না এখানে। আর না আড্ডাতে সামিল হবে, মেহেন্দি দিবে। কিছু বলার উদ্দেশে অধর নাড়াতেই কর্ণগোচর হলো রোকেয়া শেখের গলা। বেশ কটাক্ষের সাথেই বললেন,
“শুভ কাজে যাকে তাকে সঙ্গে নিতে নেই অদিতি। তুমি সারথীকে দিয়ে মেহেন্দি লাগিয়ে নাও।”
পরপরই বিড়বিড় করে আওড়ালেন,
“চাল চুলোহীন মেয়ে। বাপের মতোই আদব কায়দা নেই। ফকিরের ঘরের ….”
মুখের কথাতে ইতি টানতে পারলেন না রোকেয়া শেখ। ঝড়ের গতিতে পানি জাতীয় কিছু একটা উড়ে এসে মুখে পড়ল। মুখে দৃশ্যমান বিন্দু বিন্দু কণার উপরে আলতো করে ছুঁয়ে দিতেই আঠালো অনুভব হলো। ওটা যে কী সেটা বুঝতে একটুও সমস্যা হয়নি। চোখজোড়ায় দপ করে আগুন জ্বলে উঠল। অগ্নি দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলেন রোকেয়া শেখ। যেন জ্যান্ত গিলে খাবেন।
কক্ষে উপস্থিত সকলের চক্ষুজোড়া চড়কগাছ হয়ে গেছে। হৈ হুল্লোড়ে মেতে থাকা পরিবেশ একেবারে শান্ত। পিনপতন নীরবতা বিরাজমান কক্ষের সর্বকোণে। অথচ গুঞ্জরিকা নির্বিকার। ভাবটা এমন যেন কিছুই হয়নি। রোকেয়া শেখ উচ্চস্বরে কর্কশ গলায় প্রশ্ন ছুঁড়লেন,
“এত বড়ো দুঃসাহস কীভাবে দেখালি তুই? তোকে তো আজ উচিত শিক্ষা দিব।”
কথা শেষ হতেই আবারও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি ঘটল। সেই একইভাবে একদলা পানি জাতীয় কিছুর অস্তিত্ব মুখমণ্ডলে অনুভব করলেন রোকেয়া শেখ। সবেমাত্র দাঁড়িয়ে ছিলেন। পা জোড়া আর এক কদম ও নড়ল না। হুংকার ছুঁড়ল আরুষ,
“গুঞ্জন এইবার অতিমাত্রায় বাড়াবাড়ি করছ। এখুনি কক্ষ ত্যাগ করবে তুমি।”
গুঞ্জরিকা শুনল কথাগুলো তবে বিশেষ পাত্তা দিল না। রোকেয়া শেখের দিকে চেয়ে দাঁতে দাঁত পিষে আওড়াল,
“এভাবে সাহস দেখিয়েছি। এবং আপনি এটারই যোগ্য। থেমে গেলেন কেন? দিন আমাকে উচিত শিক্ষা।”
এতক্ষণে আরুষের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। বাড়িভর্তি মানুষের সামনে এই রঙ্গ তামাশা না করলেও পারে। যেটুকু সম্মান অবশিষ্ট ছিল সেটুকুও আজ ধূলিসাৎ করতে মাঠে নেমেছে সকলে। রাগে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে তেড়ে গেল গুঞ্জরিকার দিকে। আসমান শেখ ছেলেকে থামাতে চাইলেও ব্যর্থ হলেন। গুঞ্জরিকার মুখ বরাবর পুরুষালী শক্ত হাতটা উঠেও থেমে গেল। আরুষের কর্ণগোচর হলো কঠিন গলায় আওড়ানো নারীর তেজী কণ্ঠ,
“আপনি থামলেন কেন? মারুন? আপনার আম্মা আমার আব্বাকে নিয়ে কটুকথা বলছে। শুনেছেন নিশ্চয়? সেই সাহস আপনার আম্মা কোথায় থেকে পান? আমার আব্বার নখের যোগ্য নয় এই পরিবারের কেউ। আমার আব্বা সহ আমার পরিবারের কাউকে নিয়ে একটা শব্দও আওড়ালে কসম মাটিতে পুঁতে রেখে দেব তাকে।”
গুঞ্জরিকা যেন নিজের মধ্যে নেই। রণ মূর্তি ধারণ করেছে। মুখনিঃসৃত প্রতিটা শব্দ বহন করছে তার নিজস্ব তেজস্বিতা। আরুষ হাত নামিয়ে নিজেকে ধাতস্থ করার প্রয়াস চালাল। এক্ষুনিই একটা অঘটন ঘটিয়ে ফেলত। বড়ো বড়ো শ্বাস ফেলে নিজেকে সামলাল। বজ্রগম্ভীর কণ্ঠে আদেশ ছুঁড়ল,
“গুঞ্জন শেষ বারের মতো বলছি নিজের কক্ষে যাও। নয়ত আমি বড়ো কোনো অঘটন ঘটিয়ে ফেলব।”
বাক্যটাতে দাঁড়িও টানতে পারল না আরুষ। থাপ্পড়ের প্রবল আওয়াজে থমকাল শেখ বাড়ির পরিবেশ। চমকে উঠল ওখানে অবস্থান করা সবাই। থমকাল উপস্থিত সকলের হৃৎস্পন্দন। আঁখিজোড়া কপালে তুলে হতবাক হয়ে তাকিয়ে রইল। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা সবাই বাকরুদ্ধ হয়ে পড়ল। যা হচ্ছে সবটা হঠাৎ ধেয়ে আসা ঝড়ের মতোই ঘটে যাচ্ছে। সবটা একেবারে কল্পনাতীত। বাড়ির উপর দিয়ে মৃদুমন্দ গতিতে শীতল হাওয়া বয়ে গেল। এতে যেন নিশ্চুপতা বাড়ল কয়েকগুণ।
আরুষ ডান হাতটা তুলে নিজের রক্তিম গালে ছোঁয়াল বারকয়। ঘাড়টা কটমট শব্দ তুলে দুদিকে ঘোরাল। না ঠিকই আছে। তবে নরম হাতের জোরটা আসলেই প্রসংশার দাবিদার। গুঞ্জরিকার এমন দুঃসাহসিক কাজটা পুরুষ অহং এ বড্ড আঘাত হানল। তবে জোরপূর্বক নিজেকে দমিয়ে রাখল আরুষ। ঝামেলা বাড়াতে মন সায় দিল না। আরুষ দুই পা এগিয়ে যেয়ে গুঞ্জর মুখোমুখি দাঁড়াল। চোখে চোখ রেখে হিসহিসিয়ে বলল,
“শান্তি? এইবার আসতে পারো এখান থেকে।”
গুঞ্জরিকার ওষ্ঠজোড়ার কোণ ঘেঁষে বক্র হাসি খেলে গেল। ইশারায় নিজের হাতটা দেখিয়ে অদমনীয় কণ্ঠস্বরে বলে উঠল,
“এই খেটে খাওয়া হাত আপনাদের সকলের সুশ্রী চেহারার নকশা পরিবর্তন করার ক্ষমতা রাখে। মায়ের ছেলে হয়ে বউয়ের সাথে করা অবিচারের জন্য এটা আপনার প্রাপ্য ছিল। আজও পারলেন না নিজের মায়ের দিকে আঙ্গুল তুলতে। ছুটে এলেন কেবল আমাকে দমাতে। অথচ সত্য কারোর অজানা নয়। কে দোষী সেটা সবাই জানে।”
নিজ কথাতে সমাপ্তি টেনে চারপাশে একঝলক আড়দৃষ্টি তাক করল গুঞ্জরিকা। পরক্ষণেই বড়ো বড়ো পা ফেলে ওখান ঘর থেকে প্রস্থান করল। আরুষ নিজেও আর দাঁড়াল না। মন মেজাজ ক্ষিপ্ত হয়ে আছে। নিজেকে সামলানো বড্ড প্রয়োজন। মাথা ঠাণ্ডা না হলে এই বাড়িতে আগুন লেগে যাবে।
অদূরে দাঁড়ানো চন্দ্রা নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছে না। গুঞ্জরিকার সামনে আরুষের সিংহ থেকে বিড়াল হয়ে যাওয়াটা ওকে যেন নিজের পরাজয়ের আগাম বার্তা দিয়ে গেল। এভাবে চলতে দিলে হবে না। অন্যকিছু ভাবতে হবে। দন্ত দিয়ে অধর চেপে ভাবল কিয়ৎসময়। অমনিই চট করে একটা বুদ্ধি খেলে গেল মাথাতে। নিজের অবস্থান ধরে রাখতে হলে এতটুকু করতেই হবে। আজকের ঘটনাকে পুঁজি করে অনেক কিছুই করা সম্ভব। জিততে এসে হেরে গেলে তো চলবে না। উঁহু, একদমই নয়। কুটিল হাসল মেয়েটা।
রোকেয়া শেখ ততক্ষণে কক্ষ ত্যাগ করেছেন। আয়েশা শেখ গুনগুনিয়ে কাঁদছেন আর আওড়িয়ে চলেছেন,
“শেষ পর্যন্ত কি-না নাত বউয়ের থুথু খাওয়ন লাগল মোর বউমারে। এই দিন ও দেখবার ছিল! এই দিন দেখবার আগে মোর মরণ ক্যান হইল না?”
অদিতি এইসবে তিতিবিরক্ত হয়ে উঠে দাঁড়াল। মায়ের উপর রাগের সাথে অভিমান জমল। শখের মেহেন্দির উপরে অনিহা জন্মাল। ওটা আর কখনোই হাতে লাগাবে না। মেহেন্দির বাটিটা ফ্লোরে ছুঁড়ে ফেলল। সেই শব্দে আরও একবার সকলে চমকাল। অদিতি সেইসবে পরোয়া করল না।হনহনিয়ে চলে গেল নিজের কক্ষের দিকে। হাসিখুশি একটা মুহূর্ত হঠাৎ করেই বিষাদে ছেয়ে গেল।
.
সদর দরজার সম্মুখে শাহরিয়ার দাঁড়িয়ে আছে। হাতে একটা সফেদ রঙা কাগজ জ্বলজ্বল করছে। গুঞ্জরিকাকে সেটা দিতেই মূলত শেখ বাড়িতে এসেছে। আজ দুপুরেই বাড়িতে ফিরেছে নগর থেকে। ওর মুখোমুখি হাসিমুখে অবস্থান করছে গুঞ্জরিকা। বসার ঘর থেকে নিজের কক্ষে যাওয়ার সময়ই ভাইজানকে দেখে থেমেছে। আরুষ খাবার টেবিলের নিকটবর্তী দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাড়িয়ে আছে। হাতজোড়া আড়াআড়িভাবে বুকের উপর ভাঁজ করে রাখা। শাণিত দৃষ্টি নিবিষ্ট ওদের দিকেই। এসেছিল মূলত পানি খেতে। শাহরিয়ার বাড়ির ভেতরের খবর জানে না। তবে বিয়ে বাড়ির এমন শান্ত পরিবেশ দেখে কিছু একটা ঠিকই আঁচ করতে পারছে। হাসিমুখে শাহরিয়ার জানতে চাইল,
“ভালো আছেন ভাবী? সব ঠিকঠাক আছে তো?”
গুঞ্জরিকা মুচকি হাসল। প্রত্যুত্তর করল,
“আলহামদুলিল্লাহ ভাইজান। আপনি কেমন আছেন? এদিকের সব ঠিকঠাক। কেবল নতুন করে মা এবং মায়ের ছেলেকে তাদের অবস্থান সম্পর্কে অবগত করেছি।”
শাহরিয়ার এর কপালে ভাঁজ পড়ল। ওতশত বুঝল না। দৃষ্টি যেয়ে থমকাল আরুষের দিকে। বন্ধুর দুর্বোধ্য চাহনিতে চোখ মিলল। আরুষের ডান গালটা লাল হয়ে ফুলে আছে। ঘটনা হয়ত কিছুটা ঠাহর করতে পারল। তবে কারোর ব্যক্তিগত বিষয়ে জানার আগ্রহ দেখাল না। হাতের কাগজ খানা এগিয়ে দিল গুঞ্জরিকার দিকে,
“আমিও আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি ভাবী। এই যে এটা নিন। কাজ শেষ।”
গুঞ্জরিকা হাসিমুখে নিল ওটা। সঙ্গে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করল,
“ভাইজান ধন্যবাদ দিয়ে আপনাকে ছোট করব না। এই নগন্য আমি সারাজীবন কৃতজ্ঞ থাকব আপনার নিকট। আগামীকাল আসব আপনাদের বাড়িতে প্রয়োজনীয় কথাগুলো বলতে।”
শাহরিয়ার মাথা নেড়ে সম্মতি দিল,
“অবশ্যই ভাবী। আপনার পাশে সবসময় আছি। এখন আসি তবে।”
গুঞ্জরিকা সাথে সাথেই বলে উঠল,
“ভেতরে আসুন ভাইজান। কিছু মুখে দিয়ে তারপর যাবেন। নয়ত আমি কষ্ট পাব ভীষণ।”
শাহরিয়ার এর মুখের হাসি বাড়ল। মেয়েটাকে একেবারে নিজের বোনের মতোই মনে হয়। বলল,
“ক্লান্ত লাগছে ভীষণ। একটু বিশ্রামের প্রয়োজন ভাবী। নগর থেকে এসেই আড়তে গিয়েছিলাম। ফিরেছি কিছুক্ষণ আগেই। অন্য কোনোদিন খাব ইন শা আল্লাহ।”
গুঞ্জরিকা ভাইজানের অবস্থা বুঝল। তাই আর জোর করল না। মেনে নিল শাহরিয়ার এর কথা,
“আচ্ছা ভাইজান। সাবধানে যাবেন। আজকের সবটা তোলা রইল।”
শাহরিয়ার মৃদু শব্দে হেসে ফেলল,
“আচ্ছা তুলে রাখুন। আসি আমি।”
কথাটা বলেই চলে গেল শাহরিয়ার। গুঞ্জরিকা দিব্যি অনুভব করতে পারছে পিছনের তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। যেটা ওর দিকেই নিবদ্ধ। বড়ো একটা শ্বাস ফেলে উলটো ঘুরে দোতলার উদ্দেশে হাঁটা ধরল। প্রথম সিঁড়িতে পা রাখতেই কর্ণগোচর হলো পুরুষালী গম্ভীর কণ্ঠস্বর,
“এখনো মুক্তির আশা করছ তুমি? বোকা মেয়ে!”
গুঞ্জরিকা স্বেচ্ছায় থামাল নিজের পদযুগল। পিছু ফিরল। এগিয়ে এল কয়েক পা। দুজনের মাঝে মোটামুটি একটা দুরত্ব রেখে দাড়াল। স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বলল,
“গাছের ও খাবেন, তলার ও কুড়াবেন। আর সব আমি মুখবুজে সহ্য করব। আমাকে আপনার অবলা নারী মনে হয়? যেই শরীরে মুগ্ধতা আসে সেখানেই নিজের ঠিকানা খুঁজে নিন।”
আরুষের অধরযুগল একপাশে কিঞ্চিত উঁচু হলো। বাম ভ্রু তুলে বলতে শুরু করল,
“প্রথমত বিয়েতে তোমার মত ছিল গুঞ্জন। দ্বিতীয়ত আমি, তুমি ব্যতিত কারোর প্রতি মুগ্ধ হইনি। তৃতীয়ত তুমি চাইলে আমি ওই মেয়েকে তালাক দিয়ে দিব তবুও তোমার মুক্তি নেই। এবং সর্বশেষ, ঘটনার সবটা সম্পর্কে তুমি অবগত। তাই এই বিয়েকে এত বড়ো করে দেখার কিছু নেই।”
এত বড়ো মিথ্যা! রাগে, ঘৃণায় শরীর গুলিয়ে উঠল গুঞ্জরিকার। ক্ষিপ্র গলায় বলল,
“আপনার ওই মুখে একদলা থুথু আরুষ শেখ। ভয় পাবেন না এক্ষুনি এখান থেকে যাচ্ছি না। এই বাড়ির সকলের উপযুক্ত জায়গা দেখিয়ে তবেই না হয় নিজের গতি করব। আমার বাবাকে নিয়ে কটুকথা শোনানোর দুঃসাহস দেখিয়েছে আপনার আম্মা। নিজের করা কুকর্ম জেনেও সে চুপ থাকেনি। উচিত ছিল নিজে চুপ থেকে আমাকে শান্ত থাকতে দেওয়ার। শুরুটা আপনার আম্মা করেছে।”
“দুই আঙ্গুল অপরের দিকে তুললে তিন আঙ্গুল কিন্তু নিজের দিকেই থাকে গুঞ্জন। তুমি একেবারে নির্দোষ বিষয়টা এমন ও নয়। নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কোনোকিছু সম্পর্কে তুমি আমাকে অবগত করোনি। আমি কি তোমার কেউ ছিলাম না তখন? কোনো তৃতীয় ব্যক্তি ছিল না আমাদের মধ্যিখানে। তবে আমাকে কেন পরিবারের সদস্যদের বাইরে থেকে তোমার দুঃখের কথা শুনতে হলো? সে তোমার একার অংশ ছিল না। তোমার অপূর্ণতা শুধু তোমার একার নয় আমার নিজেরও। তুমি স্বেচ্ছায় নিজের জায়গা ছেড়ে দিচ্ছ।”
আরুষ কথাগুলো বলেই সামনে থেকে সরে গেল। গুঞ্জরিকা হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তৎক্ষণাৎ মুখ ফুটে কিচ্ছুটি বলতে পারল না। অজান্তেই গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ল। সময় নিয়ে কম্পিত গলায় আওড়াল,
“আজও আপনি মায়ের ছেলেই থেকে গেলেন আরুষ শেখ। আমি আপনাকে ভালোবেসে জীবনের সবচেয়ে বড়ো ভুল করেছি। আপনি খুব পস্তাবেন। আপনাকে পস্তাতে হবে।”
আরুষ ততক্ষণে সদর দরজা দিয়ে শেখ বাড়ি ত্যাগ করেছে। গুঞ্জনের কথাগুলো শুনল কি? অভিমান একপাক্ষিক হলে তা পুনরায় ভাঙার যোগ্য। কিন্তু সেটা যদি হয় দ্বিপাক্ষিক, তবে?
চলবে
(ভুলত্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। রিচেক নেই। প্রিয় পাঠক, আপনাদের সকলের রেসপন্স ও গঠনমূলক মন্তব্যের আশা রাখি।)
Share On:
TAGS: ইসরাত তন্বী, পরগাছা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পরগাছা পর্ব ৭
-
পরগাছা পর্ব ২
-
পরগাছা পর্ব ১২
-
পরগাছা পর্ব ৩
-
পরগাছা পর্ব ১
-
পরগাছা পর্ব ৮
-
পরগাছা পর্ব ১০
-
পরগাছা পর্ব ৪
-
পরগাছা পর্ব ১১
-
পরগাছা পর্ব ৫