নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
২২ এর শেষাংশ
মেহেরুন্নেসা দ্রুত পায়ে নিজের কক্ষের দিকে যাচ্ছিল। রাত অনেক হয়েছে। প্রাসাদের করিডোরগুলো প্রায় ফাঁকা। দেয়ালে টাঙানো প্রদীপের আলোয় লম্বা ছায়া পড়েছে। বাইজিদ যদি শোনে সে মারজান এর পায়ে তেল মালিশ করছিল, আজ বোধহয় আর রক্ষে নেই। শাড়ির দুইপাশে ধরে সামান্য উঁচু করে সিড়ি উঠছে মেহেরুন্নেসা।
ঠিক তখনই সামনে রত্নপ্রভাকে দেখতে পেল সে।
রত্নপ্রভা চারদিকে একবার তাকালো। তারপর খুব অদ্ভুতভাবে আঁচলটা মাথার উপর আরও টেনে নিয়ে অন্দরের সামনের পথ ছেড়ে পিছনের সরু করিডোরের দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
মেহেরুন্নেসা থেমে গেল। এই সময়? এদিকে?
পিছনের পথটা সাধারণত কেউ ব্যবহার করে না। ওদিকে পুরোনো সিঁড়ি, ভাঙা বারান্দা, আর মহলের সবচেয়ে উঁচু চূড়ার দিকে ওঠার সরু পথ।
রত্নপ্রভার হাঁটার ভঙ্গিটাও স্বাভাবিক লাগলো না। যেন সে চুপিচুপি কোথাও যাচ্ছে। মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর কেমন কৌতূহল জেগে উঠলো।
“আপা এত রাতে এভাবে কোথায় যাচ্ছে?”
সে আস্তে আস্তে রত্নপ্রভার পিছু নিল। পাথরের সরু সিঁড়ি বেয়ে রত্নপ্রভা উপরে উঠতে লাগলো। সিঁড়ির চারপাশে অন্ধকার, শুধু দূরের এক-দুটো প্রদীপের আলো। বাতাসে কেমন ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। মেহেরুন্নেসা খুব সাবধানে পা ফেলছে। যেন কোনো শব্দ না হয়। অবশেষে রত্নপ্রভা মহলের একদম চূড়ার কাছে ছোট্ট একটা ঘরের সামনে এসে থামলো।
এই ঘরটার কথা মেহেরুন্নেসা শুনেছে। কেউ বলে, একসময় এখানে পুরোনো জিনিসপত্র রাখা হতো। কেউ বলে, বহু বছর ধরে দরজাই খোলা হয়নি।
রত্নপ্রভা কোমরের কাছ থেকে ছোট্ট একটা চাবি বের করলো। দরজাটা কড় কড় শব্দ করে খুলে গেল। মেহেরুন্নেসা দ্রুত পাশের দেয়ালের আড়ালে লুকিয়ে রইলো।
ঘরের ভেতরে খুব মৃদু আলো জ্বলছে। হয়তো আগে থেকেই একটা প্রদীপ রাখা ছিল। রত্নপ্রভা ভেতরে ঢুকে দরজা পুরোপুরি বন্ধ করলো না। সামান্য ফাঁক রয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা নিঃশব্দে এগিয়ে গিয়ে সেই ফাঁক দিয়ে ভেতরে তাকালো।
আর তাকিয়েই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
ঘরটা ছোট, কিন্তু চারপাশে সারি সারি বাক্স রাখা। কিছু বড়, কিছু ছোট। পুরোনো কাঠের বাক্স, পিতলের বাক্স, আবার কিছু কালো রঙের অদ্ভুত ধাতুর তৈরি। রত্নপ্রভা একটা ছোট কাঠের বাক্স টেনে নিজের সামনে আনলো। ধীরে ধীরে খুললো।
ভেতরে সারি করে রাখা আছে ছোট ছোট কাচের শিশি।মেহেরুন্নেসা এমন জিনিস আগে কখনো দেখেনি।
শিশিগুলো খুব ছোট, আঙুলের সমান। আর প্রতিটাতে ভরা আলাদা আলাদা রঙের তরল।
একটাতে গাঢ় লাল। একটাতে সবুজ। আরেকটাতে নীলচে কালো, যেন রাতের আকাশ গলিয়ে ভরে রাখা হয়েছে।
কোনোটা সোনালি, কোনোটা আবার ধূসর।
প্রদীপের আলো পড়তেই সেগুলো কেমন চকচক করে উঠছে। যেন কাচের ভেতরে শুধু রঙ নয়, অন্য কিছু আছে।
রত্নপ্রভা খুব সাবধানে একটা শিশি তুলে আলোয় ধরলো। তারপর অন্য একটা বাক্স খুললো।
সেখানেও একই জিনিস। আরও অনেক শিশি।
আরও অনেক রঙ। নিজের আঁচলের তলা থেকে ছোট্ট একটা থলে বের করল। তাতেও গোটা কয়েক শিশি। সেগুলো একটা বাক্সে সাবধানে সাজালো।
ঘরের এক কোণায় বড় বড় বাক্স স্তূপ করে রাখা। কিছু খোলা, কিছু বন্ধ। মেহেরুন্নেসা শুধু বুঝতে পারলো, এই ঘরে এমন বহু কিছু আছে যা কেউ জানে না। তার বুকের ভেতরটা কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।এগুলো কি?ঔষধ? বিষ? নাকি আরও ভয়ংকর কিছু?
রত্নপ্রভার মুখে তখন অদ্ভুত এক ছায়া। তার চোখদুটো প্রদীপের আলোয় কেমন ঝিলমিল করছে। যেন সে বহুদিন ধরে লুকিয়ে রাখা কোনো মূল্যবান জিনিসের কাছে এসে দাঁড়িয়েছে।
মেহেরুন্নেসা দেয়ালের আড়ালে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার মনে হলো, সে এমন কিছু দেখে ফেলেছে, যা তার দেখার কথা ছিল না।
রত্নপ্রভা কক্ষের ভেতর থেকে বেরোতেই মেহেরুন্নেসা দম বন্ধ করে দেয়াল ঘেঁষে দাঁড়িয়ে গেল। পুরনো চূড়ার সেই সরু করিডোরে আলো বলতে কেবল দুটো মশাল। তাও নিভু নিভু, যেন একটু পরেই নিভে যাবে। মশালের কাঁপা আলোয় রত্নপ্রভার ছায়া লম্বা হয়ে মেঝের ওপর পড়েছে। তার হাতে তখনও একটা ছোট পিতলের চাবি।
মেহেরুন্নেসা দ্রুত একখানা মোটা স্তম্ভের আড়ালে সরে গেল। রত্নপ্রভা দরজাটা ধীরে টেনে বন্ধ করলো। তারপর কোমরের আঁচলের ভাঁজ থেকে বের করলো অদ্ভুত এক তালা।
তালাটা সাধারণ তালার মতো নয়। গাঢ় কালচে ধাতুর তৈরি। মাঝখানে গোলাকার অংশ, চারদিকে ফুলের পাপড়ির মতো খোদাই। কিন্তু সবচেয়ে অদ্ভুত তার ওপরে খচিত একটা চিহ্ন। দুই পাশে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে থাকা দুটো সাপ, মাঝখানে অর্ধচন্দ্র। সাপ দুটোর চোখের জায়গায় বসানো লালচে পাথর মশালের আলোয় চকচক করে উঠছে। তালার নিচে আবার ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র নকশা, যেন কোনো অজানা ভাষার অক্ষর।
রত্নপ্রভা চারদিকে একবার তাকালো। তার চোখে অস্থিরতা, ভয়, আবার কেমন এক গোপন তাড়াহুড়ো। কাউকে না দেখে সে তাড়াতাড়ি তালাটা লাগিয়ে দিল দরজায়।
টক করে শব্দ হলো। শব্দটা শুনে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। রত্নপ্রভা এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর আঁচলটা ভালো করে মাথায় টেনে নিয়ে দ্রুত সিঁড়ির দিকে নেমে গেল।
সে চলে যেতেই চারদিক আবার নিস্তব্ধ।
দূরে কোথাও রাতের পাখি ডাকছে। জানালার ফাঁক দিয়ে ঢুকে পড়া হাওয়ায় মশালের আগুন দপদপ করে উঠছে। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে আড়াল থেকে বেরিয়ে এলো। তার চোখ স্থির হয়ে আছে দরজার তালাটার দিকে।
কোথায় যেন দেখেছে। এই নকশা, এই দুই সাপ আর অর্ধচন্দ্র
মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। কিছুতেই মনে করতে পারছে না। অথচ খুব চেনা। খুব।
সে একটু এগিয়ে গেল। হাত বাড়িয়ে তালাটার গায়ে আঙুল ছোঁয়াতেই ঠাণ্ডা ধাতুতে শরীর শিউরে উঠলো। আঙুল বুলিয়ে নকশাগুলো ছুঁতে ছুঁতে হঠাৎ যেন মাথার ভেতর বিদ্যুতের মতো কিছু ঝলসে উঠলো।
বাইজিদের কক্ষ। হ্যাঁ… বাইজিদের কক্ষের ভেতরে ছোট্ট যে আলাদা ঘরটা আছে, যেখানে শুধু কাগজ পত্র নিয়ে কাজ করতেই সে যায়। সেখানে দেয়ালের পাশে একটা ভারি কাঠের বাক্স রাখা। বিয়ের রাতে দরজা টা আধখোলা ছিল। তখন দূর থেকে বাক্সটার গায়ে ঠিক এই একই চিহ্ন দেখেছিল মেহেরুন্নেসা। দুই সাপ। মাঝখানে অর্ধচন্দ্র। একই নকশা।
মুহূর্তেই তার বুক ধড়ফড় করে উঠলো। তবে কি এই ঘর… আর বাইজিদের সেই বাক্সের মধ্যে কোনো সম্পর্ক আছে?
রত্নপ্রভা কেন লুকিয়ে এলো এখানে আর ঐসব কাচের শিশিতে কী ছিল? এত রঙের তরল আর এতগুলো বাক্স?
মেহেরুন্নেসার মনে হলো সে যেন মহলের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এমন একটা রহস্যের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, যার গভীরতা সে এখনো কল্পনাও করতে পারেনি। এই মহলের প্রতিটি মানুষ মুখোশ পড়ে আছে। তাদের প্রত্যেকের আসল রুপ ভয়ংকর।
আনমনে হয়ে তালাটায় চাপ দিতেই কেমন কাটা ফুটার মত ফুটলো। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। দ্রুত হাত সরিয়ে নিল তালা থেকে। তারপর শেষবারের মতো দরজার দিকে তাকালো।
অদ্ভুত কক্ষটা নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে। যেন তার ভেতরে শত শত গোপন কথা বন্দী। এখানে থাকা টা নিরাপদ নয়। এও দেখতে হবে রত্নপ্রভা কোথায় গেল।
চূড়ার সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে নামতে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত হয়ে উঠছিল। এতদিন ধরে রত্নপ্রভাকে সে কেমন ভেবেছে? সাহসী, শান্ত, অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো এক নারী। এই মহলে যখন সবাই তাকে ভয় দেখিয়েছে, অবহেলা করেছে, তখন রত্নপ্রভাই তো তার পাশে দাঁড়িয়েছিল।
তবু আজ আজ নিজের চোখে যা দেখলো, তার পর যেন কিছুই আর আগের মতো মনে হচ্ছে না।
মেহেরুন্নেসার মাথার ভেতর বারবার একই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে। রত্নপ্রভা সেখানে কী করছিল?
করিডোর পেরিয়ে নিচে নামতেই দূরে রত্নপ্রভার সাদা শাড়ির আঁচলটুকু এক ঝলক দেখা গেল। সে দ্রুত নিজের কক্ষের দিকে চলে যাচ্ছে। মাথা নিচু, হাঁটায় কেমন এক অস্থিরতা।
মেহেরুন্নেসাও ধীরে ধীরে নিজের কক্ষের দিকে ফিরতে লাগলো। কিন্তু দু’পা যেতেই হঠাৎ তার চোখ আটকে গেল মেঝের দিকে।
পাথরের সাদা মেঝেতে ছোট ছোট লালচে দাগ।
সে থেমে গেল। প্রথমে মনে হলো হয়তো আলোছায়ার ভুল। কিন্তু না। একটা… দুটো… তারপর আরও কয়েকটা।
পায়ের ছাপ।
রত্নপ্রভা যেদিক দিয়ে হেঁটে গেছে, ঠিক সেদিকেই মেঝেতে ভেসে আছে ক্ষীণ লালচে পায়ের ছাপ। যেন রক্ত ভেজা পা নিয়ে কেউ হাঁটছিল। মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে এলো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। মশালের হলুদ আলোয় নিচু হয়ে তাকাতেই বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো।
ওগুলো রক্ত।
গাঢ় লাল। কোথাও শুকিয়ে বাদামি হয়ে গেছে, কোথাও এখনো টাটকা। পায়ের পাতার অস্পষ্ট রেখাও বোঝা যাচ্ছে। ছোট ছোট দাগগুলো করিডোর জুড়ে ছড়িয়ে আছে। যেন রত্নপ্রভা বুঝতেই পারেনি, তার পায়ের সঙ্গে লেগে আছে রক্ত। মেহেরুন্নেসার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল। তবে কি রত্নপ্রভার পা কেটেছে?
নাকি… নাকি সেই ঘরের ভেতরে এমন কিছু আছে, যেখান থেকে এই রক্ত লেগে এসেছে?
শেষ পায়ের ছাপটা গিয়ে থেমেছে রত্নপ্রভার কক্ষের দরজার সামনে। দরজাটা ভেতর থেকে বন্ধ। করিডোর নিস্তব্ধ। দূরে বাতাসে জানালার কপাট কেঁপে উঠছে। অথচ মেহেরুন্নেসার মনে হচ্ছিল, পুরো মহলটা যেন নিঃশব্দে তার দিকে তাকিয়ে আছে।
তার হাত-পা কাঁপছিল। তবু সে ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে রত্নপ্রভার দরজার সামনে দাঁড়ালো।
দরজার নিচের ফাঁক দিয়ে একফোঁটা লাল রঙ বেরিয়ে এসে পাথরের ওপর ছড়িয়ে আছে।
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে কাঁপা হাতে দরজার দিকে হাত তুললো।
কিন্তু ঠিক তখনই ভেতর থেকে চাপা, খুব ক্ষীণ একটা শব্দ ভেসে এলো।
মনে হলো… কেউ কাঁদছে।কান্নার শব্দটা ধীরে ধীরে আরও স্পষ্ট হতে লাগলো।
প্রথমে খুব ক্ষীণ ছিল। যেন দূরে কোথাও কেউ নিঃশব্দে কাঁদছে। কিন্তু মুহূর্ত গড়াতেই সেটা যেন চারদিক থেকে ভেসে আসতে লাগলো। কখনো ডানদিকের অন্ধকার করিডোর থেকে, কখনো বাঁদিকের ফাঁকা বারান্দা থেকে।
মেহেরুন্নেসা দিশেহারা হয়ে চারদিকে তাকালো।
মহলের এই দিকটায় সন্ধ্যার পর খুব কম লোকই আসে। বৈঠকখানার পাশের লম্বা করিডোরে একটা মশালও জ্বলছে না। দূরের জানালা দিয়ে ঢুকে পড়া ফিকে চাঁদের আলো পাথরের মেঝেতে পড়ে আছে। তাতেও অন্ধকার যেন আরও গভীর, আরও রহস্যময় লাগছে।
আবার সেই কান্না।
এবার মনে হলো একেবারে সামনের দিক থেকে।
মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছে। তার লাল শাড়ির আঁচল মেঝের সঙ্গে ঘষা খেয়ে সরসর শব্দ তুলছে।
সে একটু এগোতেই কান্না থেমে গেল।
পুরো মহল আবার নিস্তব্ধ।
মেহেরুন্নেসা থমকে দাঁড়ালো। কাঁপা গলায় ডাকলো,
“ কে… কে ওখানে?”
কোনো উত্তর নেই। হঠাৎ আবার সেই কান্না। এবার যেন তার একেবারে পেছন থেকে। মেহেরুন্নেসা চমকে উঠে দ্রুত ঘুরে দাঁড়ালো। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। শুধু লম্বা করিডোর, কালো ছায়া আর দপদপ করতে থাকা দূরের একটুখানি আলো। তার গলা শুকিয়ে এলো। হাত-পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। মনে হচ্ছিল মহলের দেয়ালগুলোও যেন তাকে ঘিরে আসছে। সে ধীরে ধীরে পেছাতে লাগলো। এক পা, দুই পা। আরেকটু পেছাতেই আচমকা তার পিঠ গিয়ে ধাক্কা খেল কারও শক্ত, উষ্ণ বুকে।
মেহেরুন্নেসা আতঙ্কে চিৎকার করতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই নাকে ভেসে এলো সেই চেনা, মন মাতানো আতরের গন্ধ। কস্তুরি আর হালকা গোলাপের মিশ্রণে এক অদ্ভুত গভীর সুবাস।
এই গন্ধ সে চিনে। খুব ভালো করেই চিনে।
মুহূর্তেই মেহেরুন্নেসা আর নিজেকে সামলাতে পারলো না। ভয়ে কাঁপতে কাঁপতে সে দুহাতে শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো বাইজিদকে।
“আপনি…”
তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো। বাইজিদ এক মুহূর্ত স্থীর হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর নিচু হয়ে তার দিকে তাকালো। চাঁদের ম্লান আলোয় মেহেরুন্নেসার মুখটা ফ্যাকাসে। চোখদুটো ভয়ে বড় বড় হয়ে গেছে। কাঁপতে থাকা আঙুলগুলো তার পোশাক আঁকড়ে ধরে আছে। বাইজিদের কপাল কুঁচকে গেল। সে ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার পিঠে হাত রাখলো। তার শক্ত বাহুর ভেতরে মেহেরুন্নেসাকে টেনে নিয়ে গম্ভীর গলায় বললো,
“কী হয়েছে, মেহের?”
মেহেরুন্নেসা মাথা তুললো না। তার কপাল তখনও বাইজিদের বুকের সঙ্গে ঠেসে আছে। বুকের নিচে স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে তার স্বামীর হৃদস্পন্দন। আশ্চর্য, এই শব্দটা শুনলেই কেন যেন পৃথিবীর সব ভয় একটু একটু করে কমে যায়।
তবু কাঁপা কণ্ঠে সে ফিসফিস করে বললো,
“কেউ কাঁদছিল… আমি শুনেছি। এদিকেই… খুব কাছে…”
বাইজিদ চারদিকে তাকালো। অন্ধকার করিডোর নিঃশব্দ। বাতাসও যেন থেমে গেছে।
তারপর আবার নিচে তাকিয়ে মেহেরুন্নেসার মুখ দেখলো। ভয় পেয়ে লাল হয়ে যাওয়া নরম মুখটা, এলোমেলো ভেজা চুল, আর আঁকড়ে ধরা কাঁপা হাত দেখে তার চোখ হঠাৎ অদ্ভুত নরম হয়ে এলো।
সে মৃদু স্বরে বললো,
“আমি আছি। ভয় কিসের? আর তুমি কক্ষে না গিয়ে মহলে খবরদারি করছো? আমি সেই কখন থেকে তোমার অপেক্ষায় জানো তুমি?”
মেহেরুন্নেসা আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরলো তাকে। যেন এক মুহূর্তের জন্যও ছেড়ে দিলে আবার সেই অন্ধকার, সেই কান্না তাকে ঘিরে ধরবে। বাইজিদের বুকের সঙ্গে লেগে দাঁড়িয়ে থাকা অবস্থাতেই হঠাৎ এক অদ্ভুত ঝাঁঝালো গন্ধ নাকে এল। মিশ্রিত আতরের সঙ্গে হালকা ধুলোর সুগন্ধ, যা এক মুহূর্তে মনের সব সতর্কতা ঝেড়ে দিল। কেমন নাকের তালুতে গিয়ে ঠেকলো গন্ধ টা।
মাথাটা ঘুরে এল। বুকের ওপর ঢলে পড়তে চাইলো। নিজেকে সামলাতে পারলো না, বাইজিদের বুকে ঢলে পড়ল। বাইজিদ হালকা বাকা হাসি দিল। চোখের কোণে কেবল অল্প একটা ঠোঁটের বাঁক। সেই হাসি যেন তার ভেতরের সমস্ত উত্তেজনা আরও বাড়িয়ে দিল।
তারপর বাইজিদ ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসাকে কোলে তুলে নিল। মেহেরুন্নেসা প্রথমে কিছুটা ছলছল চোখে তাকাল, কিন্তু তারপর আর লড়াই করার শক্তি রাখলো না। তার শরীরকে যেন এক অদ্ভুত শান্তি আচ্ছন্ন করেছে। চোখ জোড়া বুজে এলো।
রাজকীয় কক্ষের পালঙ্কের দিকে এগোলো বাইজিদ। পালঙ্কটা এত নিখুঁতভাবে সাজানো, যেন এক রাজকন্যার স্বপ্নের সমাধান। লাল, সাদা, হালকা গোলাপি ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা, মোমবাতির হালকা আলোয় পালঙ্কের চারপাশে ঝিলিক ফোটে।
বাইজিদ ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসাকে পালঙ্কে শুইয়ে দিল। সে নিজের দৃষ্টি সরাতে পারছে না মেহেরুন্নেসার শরীরের প্রতিটি ভাজ, প্রতিটি নরম রেখা, প্রতিটি অদ্ভুত সৌন্দর্য তার চোখে রঙিন হয়ে ফুটে উঠছে।
সে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, যেন সমগ্র পৃথিবী থেমে গেছে। মেহেরুন্নেসার কম্পমান কাঁপা শ্বাস, রক্তিম লালিমা, তার কোমল হাতে কেবল এটুকুই দেখতে পাচ্ছে কতটা নিখুঁত, কতটা অনন্য।
মেহেরুন্নেসার যেন নেশা হয়ে গেছে। মাদকতার মত কোনো নেশা। নিজের উন্মুক্ত কোমর থেকে বাইজিদ এর হাত সরিয়ে দিয়ে, ঠেলে দিলো বাইজিদ কে। জড়ানো গলায় বলল
“ছোঁবেন না আমায়, খবরদার ছোঁবেন না।”
বাইজিদ এর ঠোঁটে ফিচেল হাসি
“তোমাকে ছোঁয়া লাগে না, দেখলেই বুক ভরে যায়”
মেহেরুন্নেসার কাপড়ের আঁচল পুনরায় ঠিক করে দিয়ে বাইজিদ বলল
“মহোদয়া, একটি বার ছোঁয়ার অনুমতি দিলে ধন্য হতাম। আপনাকে ছুঁতে না পারলে বোধহয় আজ মরেই যাব”
মেহেরুন্নেসা তখন নিস্তেজ হয়ে পড়েছে। বাইজিদ ঝুকে মেহেরুন্নেসার থুতনি ধরে রক্তিম ঠোঁট জোড়ায় গাঢ় করে চুমু খেল।
“আরেকবার হ্যা? এরাই শেষ আজকের মত”
ফের ঠোঁট ছুইয়ে দিল স্ত্রীর ঠোঁটে। কানের কাছে মুখ নিয়ে হিশহিশিয়ে বলল
“চাইলে আজ তোমায় গভীর ভাবে ছুঁয়ে দিতে পারতাম। কিন্তু জীবনের প্রথম স্পর্শ তোমার মনে থাকবে না, তা কি করে হতে দিই বলো। আমি যেদিন প্রথম তোমায় আপন করে নিব, সেই স্মৃতি আজীবন তোমার মস্তিষ্কে গেঁথে থাকবে।”
কিছু টা সময় নিয়ে দেখলো মেহের কে। তারপর বালিশে হেলান দিয়ে আধশোয়া হয়ে বলল
“ইউ আর ভেরি বিউটিফুল হানি”
সকাল বেলার প্রথম রোদ্দুর ঠিক যেন ঘুম ভাঙার আগে মৃদু জ্বালাপোড়া দেবে, ঠিক সেই রোদ্দুর মেহেরুন্নেসার চোখে পড়তেই ঘুমের জড়তা ছিঁড়ে গেল। কিন্তু সঙ্গে সঙ্গে তার চোখ বড় হয়ে উঠলো, হৃদয় কেমন অদ্ভুত করে ওঠলো। বাইজিদের নগ্ন বুকে সে শুয়ে আছে। নিজেরও পোষাক এলোমেলো। শরীরের কিছু অংশ ঢেকে, কিছু উন্মুক্ত।
মুহূর্তের জন্য সে স্থির হয়ে গেল, মনে হচ্ছিল যেন চোখ নিজেরই বিশ্বাস করতে পারছে না। রাতের যে স্মৃতিগুলো ম্লান ম্লান মনে হচ্ছিল, সেগুলো আবার স্মৃতির ভেতর ঘুরপাক খাচ্ছে। কি হয়েছিল? রাতের কোনো ঘটনা কি সত্যিই ঘটেছে? কিন্তু শাহজাদা কি আদৌ তার অচেতনতার সুযোগ নিবে?
হঠাৎ নিজেকে স্বামীর শক্ত বন্ধন থেকে কাঁপা হাতে সরিয়ে নিয়ে মেহেরুন্নেসা দাঁড়িয়ে পড়ল। দ্রুত পোষাক ঠিক করে নিল। তারপর ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামল। করিডোরের শেষ প্রান্ত থেকে অচেনা কান্নার শব্দ আসছিল।
নিচে নামতেই সে চোখে পড়লো মহল যেন কান্নায় ভেঙে পড়েছে। মারজান হামাগুড়ি দিয়ে কাদছে, গা ভিজানো হাহাকার নিঃশ্বাসের সাথে মিশে মহল জুড়ে ছড়িয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা আতঙ্কিত হলেও দ্রুত এগিয়ে গেল। আমিনা কাঁদছে মেঝেতে বসে। প্রভা থমথমে মুখে দেয়াল হেলান দিয়ে বসে আছে।
মেহেরুন্নেসা কিছু বুঝলো না প্রথমে। কাছে গিয়ে দাসী দলের একজনকে জিজ্ঞেস করল, ভেঙে ভেঙে কণ্ঠে:
“ কি হয়েছে? সবাই কাঁদছে কেন?”
দাসী কাঁপতে কাঁপতে সামনের দিকে দেখালো। তার ইশারা অনুসরণ করে তাকাতেই মেহেরুন্নেসা দেখলো অন্দরের ফটকের সামনে সাদা কাপড়ে ঢাকা লাশ। পাশে আগরবাতি জ্বালানো। তার ঘ্রান অন্দর জুড়ে এক শোকের ছায়া বিছিয়েছে।
নিকাবের আড়ালে থাকা মেহেরুন্নেসার চোখ কেমন বড় হয়ে গেল। বুকের ভেতর ধক করে উঠলো। ঠান্ডা ঘাম ঘরে ভিজিয়ে গেল। রক্তিম আলোয় যেন ধীরে ধীরে সব ভয়, সব অজানা সত্য সামনে এসে দাঁড়ালো।
মুহূর্তের জন্য দুনিয়ার সমস্ত শব্দ থেমে গেছে মনে হলো। চারিদিকে কান্নার রোল পরে গেছে বাকের শাহ্ নিশ্চুপ হয়ে বসে আছে। দাসীদের ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেল সামনে। মেহেরুন্নেসা কে দেখে এক দাসী মুখের কাপড় সরালো লা’শের। দেখা মাত্রই মেহেরুন্নেসা চিৎকার দিয়ে নিজের মুখ নিজেই দু’হাতে চেপে ধরলো।
বিদ্যুৎ বড্ড ঝামেলা করছে। আরো আগেই গল্প দিতে পারতাম। ঠিকঠাক রিয়্যাক্ট কমেন্ট করো নয়তো ঝামেলা লাগিয়ে দিব বলে দিলাম 🌚।
তারপর কাইন্দো। আর কেমন হইছে বলিও 😽🫶। নিয়মিত গল্প পেতে পেইজ টা ফলো করে রাখো।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১২
-
নূর এ সাহাবাদ গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর প্রথমাংশ