নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
২২ এর প্রথমাংশ
মধ্যাহ্নভোজের জন্য নিচে প্রায় সবাই বসে পড়েছে। হেঁশেল থেকে একের পর এক গরম খাবার উঠছে। বৈঠকখানার পাশ দিয়ে দাসীরা দ্রুত পায়ে এদিক-ওদিক ছুটছে। কিন্তু বাইজিদের এখনও দেখা নেই। মারজান কিছু একটা ভেবে সিমরানের দিকে তাকালো।
“ এদিকে আসো। যাও তো, শাহজাদাকে ডেকে আনো।”
সিমরান ভ্রু কুচকালো। মারজান কিটমিট করে বলল
“একটু আদর-আল্লাদ কর”
সিমরান ঠোঁট টিপে হাসলো।
“আচ্ছা আম্মা।”
সে দ্রুত পায়ে উপরে উঠে গেল। বাইজিদের কক্ষের দরজাটা পুরোপুরি বন্ধ ছিল না। আধখোলা। সিমরান আলতো করে ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই থমকে দাঁড়ালো। কক্ষজুড়ে হালকা চন্দন আর আতরের গন্ধ। বাইজিদ সদ্য গোসল করে বেরিয়েছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে সে। তার গায়ে তখন শুধু সাদা তোয়ালে, ভেজা চুল থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ছে কাঁধ বেয়ে। সিমরানের নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য আটকে গেল। বাইজিদকে এমনভাবে সে বহু বার দেখেছে হুট হাট আাসার ফলে। এ দৃশ্য যেন তার ভীষণই প্রিয়।
তার গায়ের রং অদ্ভুত ফর্সা, কিন্তু ঠান্ডা নয়। একটা উষ্ণ, দীপ্ত আভা আছে। প্রশস্ত কাঁধ, দৃঢ় বাহু, বুকের ওপর ছড়িয়ে থাকা পানির ফোঁটাগুলো যেন আলোয় চকচক করছে। তার মুখের গড়ন এত নিখুঁত যে দূর থেকে দেখলেও মনে হয় কোনো শিল্পী পাথরে খোদাই করেছে।
আর সেই চোখ। ভেজা চুলের ফাঁক দিয়ে আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া সবুজ চোখদুটো আরও তীক্ষ্ণ, আরও গভীর লাগছে।
এই মহলের অনেক পুরুষই সুদর্শন। কিন্তু বাইজিদের মধ্যে এমন কিছু আছে, যেটা অন্য কারও নেই। তার দিকে তাকালে চোখ সরানো যায় না। যেন তার সৌন্দর্যের ভেতরেও একটা বিপদ লুকিয়ে আছে।
সিমরান চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। চোখে তখন লুকোনো বিস্ময়, আর একরাশ লোভ।
এমন পুরুষকে যে কোনো নারী চাইবে। ঠিক তখনই আয়নার দিকে তাকিয়েই বাইজিদ তাকে দেখে ফেললো।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে বিরক্ত দেখা দিল।
সিমরান হকচকিয়ে গেল। আমতা আমতা করে বলল
“আমি আপনাকে নিচে ডাকতে এসেছি। সবাই অপেক্ষা করছে।”
বাইজিদ ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরলো। তার দৃষ্টি এত ঠান্ডা যে সিমরানের বুক কেঁপে উঠলো।
“বলা হয়ে গেছে? এবার আসতে পারেন।”
সিমরান কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর অনিচ্ছায় চোখ নামিয়ে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল।
দরজার বাইরে এসে সে একবার পিছনে তাকালো। আর তখনই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক জ্বালা জেগে উঠলো। এমন একজন পুরুষের পাশে আজ মেহেরুন্নেসা আছে। এখন যদি তার বলে মেহেরুন্নেসা হতো, তাহলে বাইজিদ এমন ব্যাবহার করত না। মেহেরুন্নেসা কে দেখলেই শাহজাদা মুগ্ধ হয়ে যায়।
সিমরানের আঙুল মুঠো হয়ে গেল। তার চোখে ধীরে ধীরে ঈর্ষার ছায়া গাঢ় হতে লাগলল। সিমরান নিচে নেমে আসতেই দেখলো খাবারের বড় দস্তরখান প্রায় প্রস্তুত। বড় কাসার থালা, পিতলের বাটি, গরম ভাত, মাংস, শাহী কোর্মা সব একে একে সাজিয়ে রাখা হচ্ছে।
মেহেরুন্নেসা নিজ হাতে একটা থালা টেনে নিয়ে তাতে খাবার তুলে দিচ্ছিল। সিমরানের চোখ সঙ্গে সঙ্গে সেদিকে চলে গেল।সে এগিয়ে এসে মেহেরুন্নেসার হাত থেকে থালাটা নিয়ে নিল।
“এটা আমি সাজাচ্ছি”
ঠোঁটের কোণে অদ্ভুত এক হাসি ফুটিয়ে বললো সে। মেহেরুন্নেসা একটু অবাক হয়ে তাকালো। “না, আপনি বসুন। আমি করছি।”
সিমরান মাংসের বাটি খুলে খুব যত্ন করে একটা একটা করে টুকরো তুলে রাখতে রাখতে বললো, “শাহজাদা কোনটা পছন্দ করে, কতটুকু ঝাল খায়, কোন খাবার আগে নেয়,এসব একমাত্র আমিই জানি। তুমি বসো। সে আমার হাতে খেতেই অভ্যস্ত”
তার গলায় এমন একটা ভঙ্গি ছিল, যেন কথাগুলো ইচ্ছে করেই বলা। মেহেরুন্নেসার চোখের ভেতর হালকা ঝিলিক খেলে গেল। এতক্ষণ শান্ত ছিল সে। কিন্তু সিমরানের কথাগুলো তার বুকের ভেতর কেমন একটা জেদ জাগিয়ে তুললো। সে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সিমরানের হাত থেকে থালাটা নিয়ে নিল।
খুব শান্ত গলায় বললো,
“ এতকাল আমি ছিলাম না। আমার স্বামীর খেয়াল রেখেছেন তার জন্য আমি আপনার ওপ কৃতজ্ঞ। এখন আমি এসে গেছি। আমার স্বামীকে আমি যেভাবে দিব, সেভাবেই খাবে।”
কথাটা বলেই সে আবার থালায় খাবার সাজাতে লাগলো। চারপাশ হঠাৎ নিস্তব্ধ হয়ে গেল। সিমরানের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। তার চোখে ক্ষণিকের জন্য তীব্র অপমান আর জ্বালা ফুটে উঠলো। মারজান দূর থেকে সব দেখছিল।
এখানে আমিনা না থাকলে নির্ঘাত কয়েক কথা শুনিয়ে দিত। আমিনা, যে চুপচাপ বসে ছিল, মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে মৃদু হেসে ফেললো।
ছোট্ট, নরম মেয়েটার ভেতরেও যে এতখানি অধিকার লুকিয়ে আছে, সেটা যেন বোঝাই যায় না।
সিঁড়ির উপর ভারী পায়ের শব্দ হতেই সবাই একসাথে মাথা তুলে তাকালো। বাইজিদ নিচে নামছে। সদ্য গোসলের পর এখন সে পুরোপুরি তৈরি। গাঢ় কালো রঙের যুদ্ধবস্ত্রের মতো পোশাক, কোমরে চওড়া বেল্ট, কাঁধে রুপালি কারুকাজ। হাতাকাটা পোশাকের কারণে তার বাহুর পেশিগুলো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। শক্ত, দৃঢ়, যেন তলোয়ার ধরার জন্যই তৈরি। তার ভেজা চুলগুলো এখন পেছনে সরানো। সবুজ চোখদুটো আজ আরও তীক্ষ্ণ লাগছে। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তাকে এমন লাগছিল যেন কোনো যুদ্ধ জিতে ফেরা শাহজাদা।
বৈঠকখানার বাতাস যেন কয়েক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। সিমরান একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো।
তার চোখে কোনো লজ্জা নেই, কোনো আড়াল নেই। যেন চোখ দিয়েই সে বাইজিদকে গিলে ফেলতে চাইছে।
তার বুকের ভেতর আবারও হিংসা আর আকাঙ্ক্ষা একসাথে দাউ দাউ করে উঠলো।
বাইজিদ নিচে নেমে সবার দিকে হালকা মাথা ঝুঁকাল। তারপর তার চোখ সরাসরি গিয়ে থামলো মেহেরুন্নেসার মুখে। মুহূর্তেই তার মুখের কঠিন ভাবটা নরম হয়ে গেল।
“এসেছেন?”
মেহেরুন্নেসা আস্তে বললো। বাইজিদ কিছু বলতে যাবে, এমন সময় এক দাস দ্রুত ভেতরে ঢুকলো।
“শাহজাদা”
হাঁপাতে হাঁপাতে বললো সে
“ইংরেজ বনিক রা এসে গেছে।”
বাইজিদের মুখ মুহূর্তেই গম্ভীর হয়ে গেল। সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তারপর বিরক্ত গলায় বললো।
“চলো আমি প্রস্তুত আছি”
“জি শাহজাদা।”
মারজান বললো,
“আগে খেয়ে যাও। তারপর যেও।”
“সময় নেই।”
বাইজিদ একবার দস্তরখানের দিকে তাকালো, তারপর মেহেরুন্নেসার কাছে এগিয়ে এলো।
সবার সামনে, মেহেরুন্নেসা কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে তার কপালের উপর আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
“ফিরে এসে তোমার সাথে খাবো,”
নিচু গলায় বললো সে। মেহেরুন্নেসার গাল সঙ্গে সঙ্গে লাল হয়ে উঠলো। সে মাথা নিচু করে ফেললো। সিমরান আঙুলের ভেতর ধরা চামচটা এত জোরে চেপে ধরলো যে আঙুল সাদা হয়ে গেল।
তার চোখের সামনে যেন আগুন জ্বলে উঠেছে।
যে পুরুষটার দিকে সে এতক্ষণ তাকিয়ে ছিল, যে একবারও তার দিকে ভালো করে তাকালো না।
সে সবার সামনে মেহেরুন্নেসার কপালে চুমু খেয়ে চলে গেল। সিমরানের মনে হলো, তার বুকের ভেতর কেউ ধীরে ধীরে আগুন ঢেলে দিচ্ছে।
হিংসায়, অপমানে, জ্বালায় তার গলা শুকিয়ে গেল।
আর মেহেরুন্নেসার গলায় ঝুলে থাকা আমিনার দেওয়া রত্নহারটার দিকে তাকিয়ে তার মনে হলো,
এই মেয়েটার সবকিছুই যেন সে ছিনিয়ে নিতে চায়। না খেয়ে ফট করে উঠে গেল টেবিল ছেড়ে।
বিকেলের রোদ ধীরে ধীরে ফিকে হয়ে এলো। প্রাসাদের উঠোনের ওপর লম্বা ছায়া পড়তে শুরু করলো। একসময় সেই আলোও মিলিয়ে গেল, চারপাশে নেমে এলো নরম সন্ধ্যা। মেহেরুন্নেসা তখনও হেঁশেলে। সকাল থেকে একটানা কাজ করছে সে। কখনো মশলা বাটা, কখনো দুধ জ্বাল দেওয়া, কখনো আবার দাসীদের সাথে দাঁড়িয়ে রাতের খাবারের আয়োজন দেখা। মারজান যেন আজ ইচ্ছে করেই তাকে একটুও বসতে দেয়নি।
“ওই হাঁড়িটা নামাও। এই মশলাটা আরেকবার বাটো। দুধে চোখ রাখো। উপচে পড়লে কিন্তু আমি শুনবো না।”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ সব করেছে। মুখে একটা কথাও বলেনি। তবে সন্ধ্যার দিকে এসে তার হাতদুটো ব্যথা করতে শুরু করলো। কাঁধে টান ধরেছে। মাথাটাও কেমন ভারী লাগছে।
হেঁশেলের আগুনের তাপে তার কপাল ভিজে গেছে ঘামে। লাল হয়ে গেছে গাল। সারা গায়ে রান্নার গন্ধ, ধোঁয়ার গন্ধ লেগে আছে।
শেষবারের মতো একটা হাঁড়ির ঢাকনা বসিয়ে সে যখন বাইরে বের হলো, তখন আকাশে সন্ধ্যার শেষ আলোটুকুও নেই। দূরে দূরে প্রাসাদের বারান্দায় প্রদীপ জ্বলে উঠেছে। বাতাসে শিউলি আর রাতরানির গন্ধ।
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠলো। পা দুটো যেন আর চলছে না। নিজের কক্ষের সামনে এসে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো। দরজা বন্ধ করেই আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। সোজা চলে গেল স্নানাগারের দিকে।
এই স্নানাগারটা এখনও তার কাছে অবিশ্বাস্য লাগে। এত বড়, এত পরিষ্কার, এত সুন্দর জায়গায় সে আগে কখনো গোসল করেনি।
সাদা পাথরের মেঝে যেন আয়নার মতো চকচক করছে। চারপাশে মসৃণ দেয়াল, দেয়ালে খোদাই করা ফুল আর লতার নকশা। কোণায় বড় পিতলের পাত্রে গোলাপজল আর গরম পানি রাখা। বাতাসে হালকা চন্দনের গন্ধ। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে চুল খুলে দিল। সারাদিন শক্ত করে বাঁধা থাকার পর কোমর ছাপানো চুলগুলো একঝাঁক কালো মেঘের মতো পিঠ জুড়ে নেমে এলো। সে চোখ বন্ধ করে ঠান্ডা পানি গায়ে ঢাললো। মুহূর্তেই শরীরের সমস্ত ক্লান্তি যেন একটু একটু করে ধুয়ে যেতে লাগলো। অনেকক্ষণ ধরে সে স্নান করলো। চুলে গোলাপজল মাখলো, হাতভর্তি ফেনা দিয়ে শরীর ধুয়ে নিল। ঠান্ডা পানিতে মুখ ভিজিয়ে আয়নার সামনে দাঁড়াতেই মনে হলো, দিনের সব ক্লান্তি কোথায় যেন মিলিয়ে গেছে।
স্নানাগারের পাশে রাখা কাপড়ের ভাঁজ থেকে সে একটা শাড়ি বের করলো। টকটকে লাল। সিঁদুরের মতো উজ্জ্বল, গাঢ় লাল সুতি শাড়ি। এমন শাড়ি সে আগে কখনো পরেনি। এখন পর্যন্ত সে শুধু সালোয়ার, ওড়না, বা হালকা কাপড়ই পরেছে। শাড়ি পরা শেখার সুযোগও হয়নি কখনো। কিন্তু আজ হঠাৎ কেন জানি তার মনে হলো এই শাড়িটাই পরবে। অনেকটা সময় নিয়ে, একটু এলোমেলোভাবে, একটু লজ্জা নিয়ে সে শাড়িটা পরতে শুরু করলো। কখনো আঁচল পড়ে যাচ্ছে, কখনো ভাঁজ ঠিক হচ্ছে না। তবুও ধীরে ধীরে শেষ পর্যন্ত পরে ফেললো।
তারপর আয়নার সামনে এসে দাঁড়ালো। আর নিজেই থমকে গেল। লাল শাড়িটা তার গায়ের রঙকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। ভেজা চুলগুলো একপাশে নেমে আছে। গলায় আমিনার দেওয়া রত্নহার। কোনো রকম সাজ ছাড়াই মেহেরুন্নেসাকে এমন লাগছে যেন কোনো পুরোনো রাজকাহিনীর বধূ আয়নার ভেতর থেকে বেরিয়ে এসেছে। সে ধীরে ধীরে নিজের মুখে হাত ছুঁইয়ে দিল।
তার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হলো। লজ্জা, বিস্ময়, আর একটুখানি সুখ।
আজ যদি বাইজিদ তাকে এভাবে দেখতো…
ভাবনাটা মাথায় আসতেই তার গাল লাল হয়ে উঠলো। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেললো। কিন্তু আয়নার ভেতরের মেয়েটার ঠোঁটের কোণে তখনও লাজুক একটা হাসি লেগে। তার ভাবনা টা অবিশ্বাস্য ভাবে সত্যি করে দিয়ে দরজা ঠেলে ভিতর ঢুকলো বাইজিদ।
কিন্তু সামনে চোখ পড়তেই থমকে গেল। যেন তার পা মেঝেতে আটকে গেছে। মেহেরুন্নেসা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে । সদ্য গোসল শেষে তার লম্বা চুলগুলো ভেজা অবস্থায় কোমর পেরিয়ে আরও নিচে নেমে এসেছে। এত ঘন, এত কালো চুল দূর থেকে দেখলে মনে হয় কারো ছড়িয়ে দেওয়া রাত। চুলের ডগা থেকে ফোঁটা ফোঁটা পানি গড়িয়ে লাল শাড়ির আঁচলে পড়ছে।
টকটকে সিঁদুর রঙা সুতি শাড়িটা তার গায়ে এমনভাবে জড়িয়ে আছে যেন তার জন্যই বানানো। শাড়ির ভাঁজে ভাঁজে ফুটে উঠেছে তার কোমল গড়ন। গলায় আমিনার দেওয়া রত্নহারটা চিকচিক করছে।
আর তার মুখ লজ্জায় যেন সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। বাইজিদ অনেক সুন্দরী দেখেছে। এই মহলের, এই রাজ্যের, বাইরের দেশেরও। কিন্তু মেহেরুন্নেসাকে দেখে আজ তার মনে হলো, সৌন্দর্য হয়তো এটাই।
মুখটা যেন কারো নিখুঁত হাতে গড়া। ধবধবে কোমল ত্বক, লম্বা পাপড়ির নিচে গভীর চোখ, ভেজা ঠোঁটের কোণে হালকা লাজুকতা। তার কপাল ফাঁকা, কোনো টিপ নেই, তবুও কেমন অপূর্ব লাগছে। বরং টিপ থাকলে হয়তো এই মুখের স্বাভাবিক সৌন্দর্যটাই ম্লান হয়ে যেত।
মেহেরুন্নেসাকে এমন লাগছে যেন কোনো পুরোনো রাজকাহিনীর রানী সন্ধ্যার আলোয় দাঁড়িয়ে আছে।
বাইজিদ তাকিয়ে রইলো একদৃষ্টে। তার চোখ যেন আর সরছেই না। মেহেরুন্নেসা প্রথমে কিছু বুঝতে পারলো না। তারপর যখন আয়নায় বাইজিদের প্রতিচ্ছবি দেখলো, বুকের ভেতর ধক করে উঠলো।
সে ঘুরে তাকাতেই দেখলো বাইজিদ দরজার পাশে দাঁড়িয়ে আছে, আর এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন নিঃশ্বাস নিতেও ভুলে গেছে।
“কি হয়েছে?”
খুব আস্তে বললো মেহেরুন্নেসা। বাইজিদ কোনো উত্তর দিল না। ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এলো। তার সবুজ চোখদুটো আজ অদ্ভুত গভীর। সেই চোখের ভেতর মুগ্ধতা আছে, বিস্ময় আছে, আর এমন এক তীব্রতা আছে যে মেহেরুন্নেসার গাল মুহূর্তেই লাল হয়ে গেল।
“তবাইজিদের গলা ভারী হয়ে এলো
“আমায় হ’ত্যার আয়োজন করে বসে আছো দেখছি। খুন হয়ে যাব তো”
মেহেরুন্নেসা সঙ্গে সঙ্গে চোখ নামিয়ে ফেলল। বাইজিদ একেবারে কাছে এসে দাঁড়ালো। এত কাছে যে তার নিঃশ্বাস গায়ে লাগছে। তার হাত ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার ভেজা চুলের ওপর দিয়ে নেমে এলো। এত লম্বা চুল মুঠোয় নিয়ে সে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইলো। গভীর ভাবে শুকলো চুলের ঘ্রাণ। নিচু গলায় বললো
“আমি যদি এতে নিজেকে বেঁধে ফেলি, তাহলেও হয়তো মুক্তি চাইবো না।”
মেহেরুন্নেসা আর সহ্য করতে পারলো না। তার মনে হচ্ছিল, বাইজিদের এই দৃষ্টিতে সে গলে যাবে। দ্রুত তাকে সরানোর ব্যাবস্থা করলো।
“আপনি আগে গোসল করুন তো”
বাইজিদ ভ্রু তুললো।
“একটু থাকি না”
“একদম না। রাত বাড়ছে। ঠান্ডা লাগবে তো”
“তুমি আছো তো উষ্ণতা দিতল”
সে দুই হাতে বাইজিদকে একটু ঠেলে দিল।
“আপনি বাইরে থেকে এসেছেন। আগে গোসল।”
বাইজিদ নড়লো না। শুধু ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো।
“আজ তোমাকে দেখে আমার নিজের উপর ভরসা হচ্ছে না। কখন মরে টরে যাই। আচ্ছা একবার শক্ত করে জড়িয়ে ধরো তো দেখি মরি কিনা”
মেহেরুন্নেসা তপ্ত শ্বাস ছেড়ে বলল
“আপনি হলেন ভবিষ্যত জমিদার। আপনার এমন ছেলেমানুষী মানায় না শাহজাদা”
বাইজিদ আকুল চোখে তাকিয়ে বাচ্চাদের মত করে বলল
“বুকে নাও আগে”
“বাইরে তো খুব কড়া হয়ে চলেন। বীরের মতো চলাফেরা করেন। কক্ষে আসলে ব্যাবহারে পরিবর্তন আসে কেন এত?”
বাইজিদ হ্যাচকা টানে মেহেরুন্নেসা কে নিজের কাছে নিয়ে আসলো
“অতি ভালোবাসায় পুরুষ বাচ্চা হয়ে যায়। তারপর বাচ্চার জন্ম দেয়”
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে গেল। সে আর কিছু না বলে বাইজিদের হাত ধরে প্রায় ঠেলেই স্নানাগারের দিকে নিয়ে গেল।
“খুব অসভ্য কথা বলছেন আজকাল”
বাইজিদ যাওয়ার আগে শেষবারের মতো ঘুরে তাকালো। একটা উড়ন্ত চুমু ছুড়লো মেহেরুন্নেসার দিকে।
বাইজিদ স্নানাগারে ঢুকে দরজা বন্ধ করতেই মেহেরুন্নেসা একবার স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললো।
তার বুকটা এখনও কেমন ধকধক করছে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের গাল ছুঁয়ে দেখলো, এখনও গরম।
“এই মানুষটা আমাকে একদিন মেরেই ফেলবে”
খুব আস্তে নিজেকেই বললো সে। তারপর তাড়াতাড়ি নিজেকে সামলে নিল। নিচে হেঁশেল থেকে সে বাইজিদের জন্য খাবার নিয়ে এলো। বড় থালায় গরম গরম রুটি, মাংস, কোর্মা, সঙ্গে দুধে জ্বাল দেওয়া নরম রুটি। একপাশে পানির পাত্র। খুব যত্ন করে সব সাজিয়ে রাখলো।
তারপর কক্ষের মাঝখানে নিচু টেবিলটার উপর থালাটা রেখে দিল। পাশে একটা প্রদীপ জ্বালিয়ে দিল, যেন বাইজিদ বের হয়েই খেতে পারে।
সব প্রস্তুত করে দিয়ে সে বেরিয়ে গেল।
মারজানের কক্ষের দিকে যেতে যেতে প্রাসাদের করিডোরে রাতের নরম বাতাস লাগলো তার গায়ে। চারপাশে তখন নিস্তব্ধতা। দূরে কোথাও দাসীদের ক্ষীণ কথা, আর উঠোনের গাছ থেকে ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক।
মারজানের কক্ষে ঢুকতেই দেখলো, সে বড় খাটের ওপর আধশোয়া হয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা কে দেখেই বলল
“এসেছো?”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ গিয়ে তার পায়ের কাছে বসল। পাশে রাখা ছোট পিতলের বাটি থেকে তেল নিয়ে ধীরে ধীরে তার পায়ে মালিশ করতে লাগলো। মারজান চোখ বন্ধ করে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললো।
“তোমার হাতের ছোঁয়াটা খুব ভালো,একদম ঠান্ডা ঠান্ডা।”
মেহেরুন্নেসা হালকা হেসে চুপ করে রইলো।
কিছুক্ষণ পর খুব আস্তে বললো, “আম্মা… একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?”
“করো।”
মেহেরুন্নেসা একটু ইতস্তত করলো। তারপর নিচু গলায় বললো, “অরণ্যের ব্যাপারে…”
মারজানের চোখ হঠাৎ করেই খুলে গেল।
তার মুখের শান্ত ভাবটা মিলিয়ে গেল এক মুহূর্তে। চোখের ভেতর কেমন একটা ছায়া নেমে এলো।
মেহেরুন্নেসা থমকে গেল।
“রাতে বলবেন বলেছিলেন”
মারজান চিলঞ্চি তে পানের পিক ফেলে বলল
“অরণ্য আমগো ছুডো পোলা। মানে জাবের এর পোলা। একটাই পোলা আছিল ওর। বাইজিদ এর থেকে ৪ বছরের ছোট। ওয় এত্ত সুন্দর আছিলো, ওর পাশে দাড়ালে বাইজিদ রেও ফিকে লাগতো, পাইনসা লাগতো। সুন্দর হইবো না ক্যান? ওর মায় যেই সুন্দর। আরব দেশের মাইয়া। কিন্তু পোলাডা ভালো রইলো না। নেশা-পানি কইরা চেহারা সুরত শেষ কইরা হালাইছিল। মদ আর মাইয়া। দুনো ডায় জড়াইছিল।”
মারজান এর কথার মধ্যেই মেহেরুন্নেসা বলল
“উনি আর শাহজাদা কি একই রকম দেখতে ছিল? না মানে ছবিতে…..”
“আরে নাহহহ, ছবিতে শিল্পিরা আঁকতে যাইয়া ওগো রে গড়মিল কইরা হালাইতো। সামনাসামনি চেহারা আলাদাই। তয় গা-গতরের গড়নে বড় মিল ছিল। একই বংশের পোলা তো। সেইবার রাজ্যে উৎসব। তার মধ্যে অরণ্য….
কথার মাঝেই কক্ষের বাইরে থেকে তাড়াহুড়ো পায়ের শব্দ এলো। এক দাসী দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো।
“ছোট বেগম,শাহহজাদা আপনাকে অবিলম্বে ডাকছেন।”
মারজান সঙ্গে সঙ্গে বিরক্ত মুখে উঠে বসল।
“আল্লাহ! এই ছেলে কি এক মুহূর্তও বউকে ছাড়তে পারে না? এই যাও যাও। তোমার সোয়ামী রে সন্তুষ্ট করো আগে। পরে আবার পুরো মহল মাথায় তুলবো।
গল্প হারিয়ে যায় তারপর লিংক চান। ফলো দিয়ে রাখলেই তো পারেন 🤷♀️ আগের পর্বের রিয়্যাক্ট চাঙ্গে। এটায় ৩k না করলে কিন্তু কাল গল্প দিবো না দেখিও। সবাই পড়ো, কিন্তু রিয়্যাক্ট দাও না কেন? আমি তোমাদের জন্য কত কষ্ট করে লিখি। আর কেমন হইছে বলিও 😽🫶
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১০
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৮
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২০
-
নূর এ সাহাবাদ বিয়ে স্পেশাল পর্ব
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৮ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০