নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
বিয়ে স্পেশাল পর্ব
সকালের নরম আলোটা জানালার ফাঁক গলে ধীরে ধীরে ঘরে ঢুকছে। আলোর সাথে মিশে আছে কাঁচা হলুদের গন্ধ, আতরের মিষ্টি সুবাস আর মানুষের ফিসফাস শব্দ। সেই শব্দেই ধীরে ধীরে চোখ মেলে মেহেরুন্নেসা। চোখ খুলেই যেন থমকে যায় সে।
চারপাশে এত লোকজন, দাসী, আত্মীয়া, সখীরা সবাই তাকে ঘিরে আছে। কেউ শাড়ি গুছিয়ে রাখছে, কেউ গয়নার বাক্স খুলছে, কেউ আবার তার দিকে তাকিয়ে মৃদু হাসছে। যেন পুরো ঘরটা উৎসবের রঙে রঙিন।
এক মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসা কিছুই বুঝতে পারে না। তার দৃষ্টি ছুটে যায় নিজের দিকে। এই তো তার নিজের ঘর! নিজের বিছানা! অথচ হঠাৎই গত রাতের স্মৃতি ঝলসে ওঠে তার মনে। বুকটা যেন ধক করে ওঠে।
“আমি? আমি এখানে কীভাবে এলাম?”
মনে মনে প্রশ্নটা ঘুরপাক খেতে থাকে। সে স্পষ্ট মনে করতে পারছে সে তো জঙ্গলের ভেতরে ছিল! তাহলে কে তাকে এখানে নিয়ে এলো? কীভাবে? মুখটা ধীরে ধীরে ফ্যাকাসে হয়ে যায়।
ঠিক তখনই পাশে বসা রত্নপ্রভা খেয়াল করে তার অস্বাভাবিক চেহারা। ভ্রু কুঁচকে মেহেরুন্নেসার মুখের দিকে তাকিয়ে নরম গলায় বলে উঠল
“কী হয়েছে মেহের? শরীর খারাপ লাগছে নাকি?”
মেহেরুন্নেসা চমকে তাকায় তার দিকে। কয়েক সেকেন্ড যেন কথা হারিয়ে ফেলে সে। রত্নপ্রভা একটু কাছে সরে আসে, তার কপালে হাত রাখে।
“জ্বর তো নেই, কিন্তু মুখটা এমন ফ্যাকাসে কেন? কিছু হয়েছে?”
মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত চুপ থাকে। তার চোখে তখনো স্পষ্ট আতঙ্কের ছায়া। কিন্তু চারপাশে এত মানুষ এত প্রশ্ন, আর আজ তার বিয়ের দিন।
না, এখন কিছু বলা যাবে না। নিজেকে জোর করে সামলে নিয়ে সে হালকা হাসার চেষ্টা করে।
“না কিছু হয়নি। হয়তো ঘুমটা ঠিক মতো হয়নি।”
তার কণ্ঠে স্বাভাবিকতা আনার চেষ্টা থাকলেও, ভেতরের কাঁপনটা পুরোপুরি চাপা থাকে না।
রত্নপ্রভা পুরোপুরি বিশ্বাস করতে পারে না। সন্দেহের দৃষ্টি নিয়ে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে তার দিকে। তারপরও আর কিছু না বলে মৃদু স্বরে বলে
“আজ কিন্তু তোমার জীবনের সবচেয়ে বড় দিন। কোনো চিন্তা মাথায় আনবে না। সব ঠিক আছে তো?”
মেহেরুন্নেসা মাথা নাড়ে।
“হ্যাঁ সব ঠিক আছে।”
কিন্তু তার ভেতরের কণ্ঠ তখন চিৎকার করে বলছে
“কিছুই ঠিক নেই! কিছু বেঠিক হচ্ছে এই প্রাসাদে। যা একদমই ঠিক নয়”
চারপাশে আবার কোলাহল শুরু হয়ে যায়। দাসীরা এগিয়ে এসে তাকে ঘিরে ধরে।
“বিবি, দ্রু উঠুন গোসলের সময় হয়ে গেছে।”
“এই শাড়িটা পরাবো আপনাকে, একেবারে রাজকন্যার মতো লাগবে!”
“দেখবেন, আজ সবাই তাকিয়ে থাকবে আপনার দিকে”
রত্নপ্রভা চোখ রাঙানি দিয়ে বলল
“সবাই নয়, শুধু যার স্ত্রী সেই”
তাদের কথায় হাসি, উচ্ছ্বাস, আনন্দ সবই আছে। কিন্তু মেহেরুন্নেসার কানে সেগুলো যেন দূরের কোনো আওয়াজের মতো লাগে। সে ধীরে ধীরে উঠে বসে। তার চোখ আবার একবার ঘরের চারপাশে ঘুরে যায়। সবকিছুই পরিচিত তবুও আজ অদ্ভুত লাগছে। গত রাতের ঘটনাটা কি স্বপ্ন ছিল? তার মনে পড়ে সেই মুহূর্তটা।
যখন সে অনুভব করেছিল কেউ তাকে দেখছে…
তারপর অন্ধকারের ভেতর থেকে ভেসে আসা এক অজানা উপস্থিতি। এগুলো তো স্বপ্ন হতেই পারে না।
মেহেরুন্নেসার আঙুলগুলো অজান্তেই কেঁপে ওঠে।
রত্নপ্রভা আবার তার দিকে তাকিয়ে বলে
“কী ভাবছো এত?”
মেহেরুন্নেসা এবার দ্রুত নিজেকে সামলায়।
“কিছু না। আজ তো আমার বিয়ে একটু……”
রত্নপ্রভা হেসে ওঠে।
“ চিন্তা হচ্ছে? ওটা হওয়াটাই স্বাভাবিক। সব মেয়েরই এমন লাগে।”
চারপাশে থাকা দাসীরাও হাসতে থাকে। কিন্তু মেহেরুন্নেসা জানে তার এই অনুভূতি শুধু বিয়ের জন্য নয়। তার ভেতরে এক অজানা ভয় কাজ করছে। একটা অদ্ভুত রহস্য তাকে ঘিরে ধরছে…
সে চুপচাপ নিজেরহাত দুটো জড়িয়ে ধরে।
মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে, আজ কিছুই প্রকাশ করবে না। আজ তার বিয়ে সবকিছু স্বাভাবিক রাখতেই হবে।
সাজঘরে তখন হালকা কোলাহল। দাসীরা যে যার কাজ নিয়ে ব্যস্ত। মাঝখানে পিঁড়ির ওপর সোজা হয়ে বসে আছে মেহেরুন্নেসা। মাথা নিচু, চোখে লাজ, কিন্তু ভেতরে ভেতরে চাপা অস্থিরতা।
এক দাসী এসে লাল জমকালো পোশাকটা তার গায়ে জড়িয়ে দেয়। ভারী কাপড়, পুরোটা জুড়ে সোনালি জরি আর সূক্ষ্ম নকশা। পোশাকটা পরতেই যেন তার পুরো শরীরের গঠন আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে রাজকীয়, গম্ভীর, কোমল।
তারপর একে একে গয়না পরানো শুরু হয়।
গলায় মোটা সোনার হার, তার ওপর আরেকটা স্তর করা লম্বা হার। কানে ভারী ঝুমকা, কপালে টিকলি। নাকে নথটা পরানোর সময় দাসী একটু থেমে যায়
“হায় আল্লাহ, কী মানাইছে”
হাতে চুড়ি পরাতে পরাতে আরেকজন বলে ওঠে
“এমন বউ এই মহলে তো দূর, গোটা রাজ্যে আর আসেনি কোনোদিন।”
চুলগুলো সুন্দর করে আঁচড়ে খোপা করা হয়। তারপর সেই খোপায় গুঁজে দেওয়া হয় তাজা ফুল বেলি আর গোলাপ। ফুলের গন্ধে ঘরটা ভরে যায়।
সবশেষে যখন আয়নাটা সামনে ধরা হয়, তখন মেহেরুন্নেসা একটু মুখ তুলে তাকায়।
কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। নিজেকে দেখে সে নিজেই যেন বিশ্বাস করতে পারে না। এটা কি সত্যিই সে?
পাশে দাঁড়িয়ে থাকা দাসীরা আর জমিদার বাড়ির নারী সদস্যরা একদৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। কারও চোখে বিস্ময়, কারও ঠোঁটে মুগ্ধতা।
“মাশাল্লাহ, চোখ সরানো যায় না। একেবারে জমিদার বাড়ির যোগ্য বউ”
কথাগুলো একটার পর একটা ভেসে আসে।
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে ফেলে। ঠোঁটের কোণে হালকা কাঁপন, আঙুলগুলো একে অপরের সাথে জড়িয়ে নেয়। তার এই মূহুর্তে সব চেয়ে বেশি মনে পড়ছে নিজের আব্বুকে। যেই মানুষটা সবচেয়ে বেশি অনুপ্রেরণা দিয়েছে মেহের কে। প্রতিটা বিষয়ে সঙ্গ দিয়েছে, বুঝেছে। কত স্বপ্ন ছিল তার মেয়ের বিয়ে নিয়ে। চোখ ভরে ওঠে তার পানিতে। আজ সেই মেহের এর বিয়ে হচ্ছে জমিদার পুত্রের সাথে, অথচ তার বাবা এখানে উপস্থিত নেই।
এইসবের মাঝেই একটু দূরে দাঁড়িয়ে আছে সিমরান। তার মুখে কোনো হাসি নেই। চোখে শুধু তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। সবার কথা শুনছে, কিন্তু কিছু বলছে না। হাত দুটো জোরে চেপে ধরে আছে। নখগুলো তালুতে বসে যাচ্ছে।
মনে মনে বলে
“এই মেয়ে না জানি শাহজাদার কত আদর পাবে। যেগুলো আমি পাওয়ার স্বপ্ন দেখতাম। হয়তো আমার ভাবনার চাইতেও বেশি ভালোবাসবে শাহজাদা তাকে”
তার চোখ মেহেরুন্নেসার ওপর স্থির হয়ে থাকে। মাথা থেকে পা পর্যন্ত একবার দেখেও নেয়। তারপর ঠোঁট বাঁকিয়ে ফেলে। পাশে থাকা আরেক দাসী যখন বলে
“একদম রাণী লাগছে”
সিমরান আর সহ্য করতে পারে না। মুখ ঘুরিয়ে নেয়। তার বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠছে।
কিন্তু বাইরে থেকে সে চুপ। শুধু চোখের ভেতর সেই হিংসাটা স্পষ্ট হয়ে থাকে। সাজঘরের ভেতর তখনো ফিসফাস, প্রশংসা, আর মুগ্ধ দৃষ্টি। মেহেরুন্নেসা চুপচাপ বসে আছে, মাথা নিচু করে।
সিমরান উল্টো দিকে হাটা শুরু করলো।
তার মুখ গম্ভীর, চোখে অদ্ভুত এক অস্থিরতা।
সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে পা বাড়াতেই পেছন থেকে সুনেহেরার কড়া গলা
“কোথায় যাচ্ছো?”
সিমরান একটু থামে। তারপর ঘুরে তাকায়। ঠোঁট সোজা করে বলে
“দেখতে যাচ্ছি শাহজাদা প্রস্তুত হচ্ছে কিনা।”
ঘরের ভেতর মুহূর্তে নীরবতা নেমে আসে। কয়েকজন দাসী একে অপরের দিকে তাকায়।
সুনেহেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে আসে। তার চোখে স্পষ্ট কঠোরতা।
“তোমার যাওয়ার দরকার নেই।”
সিমরান ভ্রু কুঁচকে ফেলে
“কেন? আমি কি যেতে পারি না?”
সুনেহেরা এবার একদম সামনে এসে দাঁড়ায়। নিচু স্বরে,ল প্রতিটা শব্দে চাপা তীক্ষ্ণতা রেখে বলল
“এখন থেকে শাহজাদার চিন্তা তুমি বাদ দাও।”
সিমরান কিছু বলতে যাবে, ঠিক তখনই সুনেহেরা আবার বলে
“এখন থেকে তার স্ত্রী আছে। বুঝেছো?”
কথাটা যেন সরাসরি গিয়ে লাগে সিমরানের বুকে।
তার চোখ এক মুহূর্তের জন্য কেঁপে ওঠে। ঠোঁট শক্ত হয়ে যায়। চারপাশে যারা দাঁড়িয়ে ছিল, তারা নিঃশব্দে সব দেখছে। সিমরান কিছু বলে না।
শুধু একবার মেহেরুন্নেসার দিকে তাকায়। সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট জ্বালা, অপমান, আর অদ্ভুত এক প্রতিশোধের ইঙ্গিত।
তারপর ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে আবার নিজের জায়গায় এসে বসে পড়ে। কিন্তু তার হাত দুটো এখনো শক্ত করে চেপে ধরা। মাথা নিচু, কিন্তু চোখ দুটো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, খুব ঠাণ্ডা।
বড় আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে জমিদার পুত্র বাইজিদ।
গোসল সেরে এসেছে সে। ভেজা চুল পেছনে আচড়ানো, কয়েকটি ভেজা গোছা কপালের কাছে এসে পড়েছে। গায়ের রঙ চাপা শ্যামলা হলেও তার মধ্যে এক অদ্ভুত দীপ্তি যা তাকে অন্যদের থেকে আলাদা করে দেয়। চোয়াল শক্ত, নাক সোজা, আর সেই সবুজাভ চোখ তীক্ষ্ণ, গভীর, যেন কারও ভেতরটা দেখে ফেলতে পারে।
দাসীরা ধীরে ধীরে তাকে শেরওয়ানী পরিয়ে দিচ্ছে।
গাঢ় রঙের ভারী শেরওয়ানীটা গায়ে উঠতেই যেন তার পুরো অবয়বটাই বদলে যায়। বুক চওড়া হয়ে ওঠে, কাঁধে রাজকীয় ভর, হাঁটায় একটা স্বাভাবিক দম্ভ চলে আসে। সোনালি কারুকাজগুলো আলোয় ঝিলমিল করে তার প্রতিটা নড়াচড়ায়।
একজন দাস পাগড়ি বেঁধে দেয় যত্ন করে। ভাঁজের পর ভাঁজ ঠিক করে বসানো হয়। সামনে ছোট্ট অলংকারটা লাগাতেই যেন তার মুখের দিক থেকে চোখ সরানোই কঠিন হয়ে পড়ে।
বাইজিদ আয়নার দিকে তাকিয়ে আছে, কিন্তু নিজের দিকে না। তার দৃষ্টি যেন কোথাও দূরে।
ক্ষণে ক্ষণে তার মনে ভেসে ওঠে মেয়েটার মুখ। লাল পোশাকে কেমন লাগবে তাকে? মাথা নিচু করে বসে থাকবে? নাকি একবার চোখ তুলে তাকাবে?
বাইজিদের গলা শুকিয়ে আসে হালকা। সে কল্পনা করে ঘোমটার আড়াল থেকে ধীরে ধীরে মুখটা তুলছে মেহেরুন্নেসা। তার চোখে লাজ, ঠোঁটে কাঁপন। কাছাকাছি বসলে কেমন গন্ধ আসবে তার চুল থেকে? সেই তাজা ফুলের? বাইজিদের বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। তার শ্বাস একটু ভারী হয়ে যায়। দাসরা একসময় সরে যায়। কেউ খেয়ালই করে না, আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই মানুষটার ভেতরে কী ঝড় চলছে।
সে একা হয়ে যায় ঘরে। ধীরে ধীরে এক পা এগিয়ে আয়নার খুব কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। নিজের চোখের দিকে তাকায় কিন্তু সেখানে নিজের প্রতিচ্ছবি নয়, সে যেন অন্য কাউকে খুঁজছে।
তার ঠোঁট নড়ে
“মেহেরুন্নেসা”
নামটা উচ্চারণ করতেই তার চোখে এক অদ্ভুত তীব্রতা জেগে ওঠে। কখন সব শেষ হবে? কখন সে তাকে নিজের কাছে পাবে?
তার কল্পনা থামে না, বাসরঘর,নিভু আলো,
মেহেরুন্নেসা চুপ করে বসে আছে। সে এগিয়ে যাচ্ছে।
তার হাত ছুঁয়ে দিলে কেঁপে উঠবে কি?
এইসব ভাবতেই তার আঙুলগুলো মুঠো হয়ে যায়।
বাইজিদ চোখ বন্ধ করে একবার গভীর নিঃশ্বাস নেয়। নিজেকে সামলানোর চেষ্টা করে, কিন্তু তার ভেতরের অস্থিরতা লুকানো যায় না। আবার চোখ খুলে আয়নায় তাকায়।
আজ সে শুধু জমিদার পুত্র না । আজ সে একজন পুরুষ, যে অপেক্ষা করছে তার স্ত্রীকে নিজের করে পাওয়ার। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে একটা হাসি ফুটে ওঠে।
চোখে জ্বলতে থাকে অধীরতা আর দহন—
“আর বেশি দেরি নেই”
নিজের সাথেই ফিসফিস করে বলে ওঠে বাইজিদ।
ভিতর টা ভীষণ রকম পুরছে। সম্ভব হলে সময় টাকে আরো একটু এগিয়ে দিত টেনে। কিন্তু তাও সম্ভব না। মনে উদয় হলো একবার মেহেরুন্নেসা কে দেখার প্রয়াস। ভীষণ সাধ জাগল দেখার কেমন লাগছে তাকে বউ সাজে। একবার গেলে মন্দ হয় না। পাশেই দাড়ানো মাহাদি। বাইজিদ মাথার পাগড়ী টা খুলে মাহাদির হাতে দিয়ে কক্ষ থেকে বের হতে লাগলো। মাহাদি লোকটাকে ভীষণ ভালো বোঝে। মুচকি হেসে বলল
“আজ তাকে দেখার কোনো সুযোগ ই নেই শাহজাদা। কমপক্ষে শ খানিক নারীরা তাকে ঘিরে আছে।”
বাইজিদ এর পা থামার আগে কুচকালো কপাল খানা। অস্থিরতা ছাপিয়ে উঠলো রুক্ষতা।
“কে অনুমতি দিয়েছে?”
বাইজিদ কপট রাগ দেখিয়ে এগিয়ে এলো মাহাদির নিকট
“আমি বারে বারে না করেছিলাম তাকে জনসম্মুখে না আনতে। কোনো বহিরাগত নারীও যেন তার দর্শন না পায়। বলেছিলাম কি না?”
মাহাদি শান্ত গলায় বলল
“আমি খোঁজ নিয়েছি শাহজাদা, সকলেই অন্দরের নারী। কোনো বহিরাগত নেই”
বাইজিদ শান্ত হলো না। কোমরে হাত দিয়ে দাড়িয়ে শ্বাস নিলো বড় করে
“তবুও। এত মানুষের সামনে ওকে বসানো টা কি ঠিক হয়েছে? বদ নজর কি কেবল পুরুষরাই দেয়? নারীরাও তো দিতে পারে তাই না”
মাহাদির চোখ জোড়া যেন হেসে ওঠে। কখনো কোনো নারীর ব্যাপারে মন্তব্য শোনা যায় নি যেই জমিদার পুত্রের কাছ থেকে। সে আজ কোনো এক নারীর চিন্তায় দিকশূন্য হয়ে পড়ছে। কত উতলা আর অস্থির লাগছে তাকে। আলগোছে হেসে বলল
“এক্ষুণি আপনাদের বিবাহ কার্য শুরু হতে চলেছে শাহজাদা”
“হ্যা জলদি ক……
মুখ ফসকে কথাটা বলে ফেলতেই বেশ লজ্জায় পরে গেল বাইজিদ। এখানে তার দোষ ই বা কি। মাথা ঠিক আছে নাকি তার। মাহাদি পাগড়ী টা বাইজিদ এর মাথায় পরিয়ে দিয়ে ইশারা করলো অন্দরে যেতে।
অন্দরমহলের সেই বিশাল কক্ষটা যেন আজ স্বর্গের কোনো টুকরো। চারদিকে গাঁদা, রজনীগন্ধা আর গোলাপের মালা ঝুলছে, বাতাসে মিশে আছে মিষ্টি এক ঘ্রাণ। মাটিতে পাতা নরম কারুকাজ করা গালিচা, তার উপর ফুলের পাপড়ি ছড়িয়ে রাখা যেন প্রতিটা পদক্ষেপেই ফুটে উঠছে নতুন সৌন্দর্য।
দু’পাশ দিয়ে ধীরে ধীরে অন্দরমহলে প্রবেশ করে বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসা। চারদিকে ফিসফাস, দাসীদের চুপিচুপি হাসি, আর বড়দের গম্ভীর দৃষ্টি সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত আবহ।
মেহেরুন্নেসাকে বসানো হয় এক পাশে। মাথা নিচু, লাজে রাঙা গাল, চোখের পাতা কাঁপছে হালকা হাওয়ার মতো। তার গায়ে লাল বেনারসি, সোনার গয়নায় মোড়া পুরো শরীরটা যেন ঝলমল করছে প্রদীপের আলোয়। পাশে বসা দাসীরা তার ঘোমটা ঠিক করে দেয় বারবার।
অন্য পাশে বসে বাইজিদ। জমকালো শেরওয়ানিতে তাকে যেন যোগ্য রাজপুত্রের মতো লাগছে। গাঢ় রঙের পোশাকে সোনালি কারুকাজ, মাথায় পাগড়ি চোখে এক অদ্ভুত তীব্রতা। কিন্তু তার সেই দৃষ্টি বারবার ছুটে যাচ্ছে মেহেরুন্নেসার দিকে।
দুজনের মাঝখানে টানিয়ে দেওয়া হয় বড় একটি দোপাট্টা। নরম, রঙিন কাপড়টা যেন এক অদৃশ্য দেয়াল তবুও সেই দেয়ালের ওপার থেকে অনুভব করা যায় একে অপরের উপস্থিতি।
বাইজিদের বুকের ভেতর ধুকপুক শব্দ যেন আরও জোরে শোনা যাচ্ছে। তার মনে হাজারটা প্রশ্ন, হাজারটা কল্পনা
“এই মেয়েটা এখন থেকে আমার। একান্ত আমার…”
তার ঠোঁটে হালকা হাসি খেলে যায়, কিন্তু চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা। ওদিকে মেহেরুন্নেসা অনুভব করছে তার দৃষ্টি। ঘোমটার আড়ালেও সে যেন টের পাচ্ছে সেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, যা তার বুক কাঁপিয়ে দিচ্ছে। অজানা এক শিহরণ ছড়িয়ে পড়ছে শরীরজুড়ে।
এমন সময় কক্ষের মাঝখানে এসে বসেন কাজী। চারদিকে এক মুহূর্তে নেমে আসে নীরবতা। শুধু শোনা যায় কাগজের শব্দ আর কাজীর গম্ভীর কণ্ঠ।
কাজী ধীরে ধীরে বিয়ের খুতবা শুরু করেন। তার কণ্ঠস্বর গম্ভীর, ভারী প্রতিটা শব্দ যেন কক্ষের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে।
“বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম…”
সবাই মাথা নিচু করে শোনে। পরিবেশটা হয়ে ওঠে আরও পবিত্র, আরও গভীর।
প্রথমে বাইজিদের দিকে প্রশ্ন আসে।
“ সাহাবাদ রাজ্যের দক্ষিনের বাসিন্দ, জনাব শামসুর হাওলাদার এর একমাত্র কন্যা, মেহেরুন্নেসা নূর কে, আড়াইশো স্বর্ণ মুদ্রা দেন মোহর নগদ দিয়া, নিজ জ্ঞানে স্বেচ্ছায় বিবাহের জন্য রাজি থাকিলে, বলুন কবুল”
তার নাম উচ্চারণ হতেই সে একটু সোজা হয়ে বসে। গলা শুকিয়ে আসে, তবুও দৃঢ় কণ্ঠে বলে
“কবুল”
তার কণ্ঠে ছিলো এক ধরনের নিশ্চয়তা, যেন বহুদিনের অপেক্ষার পর পাওয়া কোনো স্বপ্নের স্বীকৃতি। তিনবার একই প্রশ্ন, আর তিনবারই তার সেই দৃঢ় উত্তর
“কবুল… কবুল… কবুল…”
ওপাশে বসে থাকা মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে ওঠে বাইজিদের বলা প্রতিটা শব্দে। এরপর কাজীর কণ্ঠ ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরে আসে।
“সাহাবাদ রাজ্যের জমিদার বাকের শাহ্ এর একমাত্র পুত্র, বাইজিদ শাহ্ কে, আড়াইশো স্বর্ণ মুদ্রা দেনমোহর ধার্য করিয়া এবং না নগদ বুঝিয়া পাইয়া, বিবাহে আপনার সম্মতি থাকলে বলুন আলহামদুলিল্লাহ কবুল”
ঘোমটার আড়ালে মেহেরুন্নেসার ঠোঁট কাঁপে, হাতের আঙুলগুলো জড়িয়ে যায় একসাথে। পাশে বসা দাসী তার কানে আস্তে করে বলে
“বলুন বেগম, কবুল বলুন”
অস্বস্তি তে জড়িয়ে যাচ্ছে মেহেরুন্নেসা। গলা দিয়ে একটুও শব্দ বের হচ্ছে না। রত্নপ্রভা এগিয়ে গিয়ে মেহেরুন্নেসার হাত দুখানা শক্ত করে ধরলো। এতে যদি একটু সাহস পায়। মেহেরুন্নেসার সারা শব্দ না পেয়ে বাইজিদ উশখুশ করতে শুরু করে। কাজী ফের বলল
“মা, রাজি থাকলে বলুন কবুল”
একটু থেমে, লাজে আর কাঁপা কণ্ঠে মেহেরুন্নেসা উচ্চারণ করে
“ক… কবুল…”
তার সেই নরম কণ্ঠ যেন বাইজিদ এর হৃদয়ে গিয়ে লাগে। এতক্ষণের অস্বস্তি আর বুকের ভিতর জলা আগুণ যেন এক ঝটকায় শান্ত হয়ে যায়। শীতল হয় তার জ্বলতে থাকা বুক টা।
দ্বিতীয়বার
“কবুল…”
তৃতীয়বার
“কবুল…”
শব্দগুলো খুব ছোট, কিন্তু তাতে লুকিয়ে আছে এক নতুন জীবনের শুরু। কাজী দোয়া পড়েন। চারদিকে “আমিন” ধ্বনি ওঠে। ফুলের গন্ধে ভরা সেই কক্ষ যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
দোপাট্টার দুই পাশে বসে থাকা দুজন মানুষ আর এখন আর আলাদা নয়। এক অদৃশ্য বন্ধনে জড়িয়ে গেছে তারা।
সবাই দুই হাত তুলে মোনাজাত করে নবদম্পতির জন্য। সিমরান এর পানিতে টইটম্বুর চোখ জোড়া থেকে কয়েক ফোটা পানি মোনাজাতে তোলা হাতের তালুতে পরে টুপ করে। আজ থেকে তাকে ছেড়ে দিতে হবে শাহজাদা কে পাওয়ার স্বপ্ন। সাক্ষরিত ভাবে হারালো আজ সব পাওয়া না পাওয়ার অধিকার।
মোনাজাত শেষে কাজী অনুমতি দিলেন শাহজাদা কে তার স্ত্রীর মুখ দেখতে। সকল পুরুষ রা সারি বদ্ধ ভাবে অন্দর ত্যাগ করলো। বাইজিদ গিয়ে বসলো মেহেরুন্নেসার পাশে। খুউব কাছাকাছি, একদম গা ঘেষে। মেহেরুন্নেসা লজ্জা পাচ্ছে ভীষণ তাকে এত কাছে বসতে দেখে। কিন্তু চোখ তুলছে না ঘোমটা থেকে। সুনেহেরা আর রত্নপ্রভা ফুলে মোড়ানো বড় একখানা গোল আয়না এনে ধরলো তাদের সামনে। বাইজিদ এর চোখ আটকে গেলো আয়নায় প্রতিফলিত হওয়া তার স্ত্রীর রুপে। সুনেহেরা হাসিমুখে বলল
“বলো ভাইজান, কী দেখছো?”
বাইজিদ অবিলম্বে উত্তর দিল
“আমার চাঁদ।”
হো হো করে হেঁসে উঠলো সবাই। মেহেরুন্নেসা যেন আরো লাল হয়ে উঠলো লজ্জায়। এবার পালা তার বলার। কিন্তু মেহেরুন্নেসা তাকিয়েই দেখছে না আয়নার দিকে। অবশেষে সবার জোরাজোরি তে তাকালো আয়নায়। বাইজিদের কামুক চোখে মেহেরুন্নেসার চোখ পড়তেই বাইজিদ চুমু ইশারা করলো ঠোঁট দিয়ে। মেহের সঙ্গে সঙ্গে বুজলো আবার। এবার বোধহয় আর চোখ খোলানো যাবে না মেয়েটার। চোখ মুখ খিঁচে বন্ধ করে রাখা অবস্থায় মেহেরুন্নেসা নিজের পোষাক ভেদ করে উন্মুক্ত কোমরে পুরুষালী হাতের স্পর্শ পেলো। যা ধীরে ধীরে উদর বরাবর এগোচ্ছে। ধুকপুকানি যেন বাড়লো আরো। জড়তায় মিইয়ে, গুটিয়ে যাচ্ছে বাইজিদ এর সাথে।
কেমন হয়েছে বলিও পাখিরা। ইনশাআল্লাহ আগামী পর্ব কালই দেওয়ার চেষ্টা করবো। তোমরা ৩k পূরণ করে দাও। আর তোমাদের একটা দরকারি কথা বলিন, আমার আগেই যারা পরবর্তী পর্ব ভুলভাল লিখছে। সেসব পড়া থেকে বিরত থাকো। নিয়মিত এই পেইজেই গল্প পাবে। হারিয়ে না ফেলতে পেইজটা ফলো করে রাখো
পাঠিকা সমাজ : (বাইজিদ হ্লায় তো দেখি জন্মের লুমান্টিক 🌚)
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ গল্পের লিংক
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৫
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৪
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৪