Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৮


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব- ৮

হেঁশেলের ভেতর তখন বিকেলের ব্যস্ততা। মাটির চুলায় জ্বলে উঠেছে শুকনো কাঠের আগুন। ধোঁয়ার গন্ধে আর মশলার সুবাসে পুরো ঘরটা ভরে আছে। রত্নপ্রভা হাঁড়িতে ডাল নেড়ে দিচ্ছে, পাশে মারজান পিঁয়াজ কুটছে, আর সিমরান শিলপাটায় মশলা বাটছে।
হঠাৎ দরজার কাছে কারো পায়ের শব্দ হলো।
তিনজনই একসাথে তাকিয়ে দেখল দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরুন্নেসা। মাথা থেকে পা পর্যন্ত পর্দায় ঢাকা। কালো নিকাবের ফাঁক দিয়ে শুধু চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে।
রত্নপ্রভা একটু অবাক হয়ে বলল,
“মেহের? তুমি হেঁশেলে?”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে ভেতরে এল। তার কণ্ঠ নরম, নিচু
“ঘরে একা একা ভালো লাগছিলো না ভাবি। তাই ভাবলাম আপনাদের সাথে একটু বসি।”

রত্নপ্রভা মুচকি হেসে বলল,
“সে তো ভালোই করেছো। তবে এখানে তো খুব গরম। নিকাবটা খুলে ফেলো। হেঁশেলে কোনো পুরুষ মানুষ আসে না।”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। যেন অভ্যাসবশত একটু দ্বিধা হলো। তারপর ধীরে ধীরে হাত তুলে নিকাবের প্রান্তটা সরিয়ে দিল।
মুহূর্তটা যেন থমকে গেল।
নিকাব সরে যেতেই তার মুখখানা যেন হঠাৎ আলো ছড়িয়ে দিল চারপাশে। দুধের মতো স্বচ্ছ গায়ের রঙ, কপালের কাছে নরম চুলের লট, আর চোখ দুটো যেন গভীর কোনো জলের মতো শান্ত অথচ টান আছে ভেতরে।
মারজানের হাতে ধরা পিঁয়াজটা মাঝখানেই থেমে গেল। তার মুখ হা হয়ে আছে। এই মেয়ে এত সুন্দর? সিমরানের শিলপাটা থেমে গেছে অনেকক্ষণ। সে শুধু তাকিয়ে আছে। মেহেরুন্নেসাকে সামনে দেখে সিমরান যেন মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল।

মেয়েটা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে, পর্দার আড়ালে মুখটুকুই দৃশ্যমান। তবু যে অল্পটুকু দেখা যায়, সেটুকুতেই যেন চোখ আটকে যায়। এমন কোমল, এমন নিস্তব্ধ সৌন্দর্য… যেন কোনো কথা না বলেও চারপাশের আলোটুকু নিজের দিকে টেনে নিচ্ছে। সিমরানের বুকের ভেতরটা কেমন তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল।
তার মনে হঠাৎ এক নিষ্ঠুর সত্য ভেসে উঠল,
পুরুষরা সৌন্দর্যের পূজারী। আর যদি… যদি একদিন বাইজিদের চোখেও এই রূপ ধরা পড়ে?
ভাবনাটা আসতেই সিমরানের ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল।

সে স্পষ্ট বুঝতে পারছিল,মেহেরুন্নেসার পাশে দাঁড়ালে তার নিজের সৌন্দর্য যেন হঠাৎ করেই ফিকে হয়ে যায়। এতদিন যে রূপ নিয়ে সে গর্ব করত, আজ সেটাই যেন ম্লান, নেহাৎ সাধারণ।
তার মনে বিষের মতো একটা হিংসা জন্ম নিল।
যদি বাইজিদ এই মুখটা একবার দেখে ফেলে…
তাহলে কি আর কখনো তার দিকে তাকাবে?
না… হয়তো না।

হয়তো সেই দৃষ্টি একবার মেহেরুন্নেসার উপর থেমে গেলে আর কোনোদিন ফিরবে না।
ভাবনাটা সিমরানের ভেতর আগুনের মতো ছড়িয়ে পড়ল।
কারণ সে হঠাৎ অনুভব করল এই মেয়েটা যদি বাইজিদের চোখে পড়ে, তবে সে শুধু একজন প্রতিদ্বন্দ্বী হবে না… সে হবে এমন এক সৌন্দর্য, যার কাছে সিমরান হারতে বাধ্য।

সিমরান এর এমন দৃষ্টি দেখে রত্নপ্রভা মৃদু হাসল।
“এত অবাক হচ্ছো কেন? মেহের তো এমনই।”

কিন্তু সিমরানের ভেতরে তখন অন্য আগুন জ্বলছে। সে তাকিয়ে আছে মেহেরুন্নেসার দিকে এক অদ্ভুত দৃষ্টিতে। মনে মনে যেন আগুনের ঢেউ উঠছে তার বুকের ভেতর।

এই রূপ দেখিয়ে যদি মেহেরুন্নেসা একবার হাসে, তবে বাইজিদের মতো পুরুষ কি আর স্থির থাকতে পারবে? সিমরানের বুকটা হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল।
তার মনে হলো এই মেয়েটা বিপদ। এই মেয়েটা যদি এই প্রাসাদে থাকে, তবে একদিন না একদিন সে তার কাছ থেকে বাইজিদকে কেড়ে নেবেই।
আর সেই ভাবনাতেই সিমরানের চোখের গভীরে ধীরে ধীরে জমে উঠল এক নিঃশব্দ হিংসা।

তার ভাবনার ছেদ ঘটিয়ে দাসী এসে দাড়ালো হেঁশেলে।
“আপা, শাহজাদা খেতে বসবেন”

সিমরান এর মুখে কুটিল হাসি দেখা যায়। মেহেরুন্নেসার দিকে একবার তাকিয়ে আদূরে ভঙ্গিতে বলে
“সে কিইইইই? উনি এখনো খান নি? হায় আল্লাহ! উনি তো অসময়ে খান না কখনো। শরীর টরীর ঠিক আছে তো? যাও যাও আমি খাবার নিয়ে আসছি”

সিমরান থালাটা হাতে নিয়ে এগিয়ে গেলো, প্রতিদিনের মতোই তাকে খাবার পরিবেশন করবে। কিন্তু আজ তার আচরণে অদ্ভুত এক অতিরিক্ত কোমলতা। যেন ইচ্ছে করেই ধীরে ধীরে হাঁটছে, যেন প্রতিটি পদক্ষেপ হিসেব করে রাখা।
মেহেরুন্নেসা একটু হেশেলে দাঁড়িয়ে আছে, পর্দা টেনে মুখ নিচু করে। তবু সিমরানের চোখ বারবার তার দিকে চলে যাচ্ছে। হেশেল থেকে খাবার টেবিলটা বেশি দূরে নয়। দেখা যায় সবটাই।

সিমরান এর তার মনে তখন একটাই উদ্দেশ্য। মেহেরুন্নেসা কে দেখানো সে বাইজিদ এর কতটা ঘনিষ্ঠ। মনে মনে বলছে
দেখো দেখো, আমি তার কতটা কাছে।”
সিমরান খাবারের থালা সামনে রেখে একটু বেশি ঝুঁকে পড়ল। পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিতে গিয়ে তার হাত প্রায় ছুঁয়ে গেল বাইজিদের হাতের গা। তারপর পাশে দাঁড়ানোর বদলে সে আরও একটু এগিয়ে এসে দাঁড়াল, যেন অকারণে তার খুব কাছাকাছি থাকতে চাইছে।
সবটাই যেন কারওকে দেখানোর জন্য। মেহেরুন্নেসা নীরবে দাঁড়িয়ে থাকলেও সিমরানের আচরণে সেই অদৃশ্য প্রদর্শনের ইঙ্গিত স্পষ্ট।

কিন্তু বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে গেল।
সে একবার তীক্ষ্ণ চোখে সিমরানের দিকে তাকাল, যেন বুঝে ফেলেছে এই অকারণ ঘেঁষাঘেঁষির মানে। তার স্বভাব এমন নয় যে এসব নরম ভঙ্গি বা অতিরিক্ত আদিখ্যেতা সে সহ্য করবে।
বিরক্তি লুকোল না তার চোখে। কঠিন স্বরে বলল,
“ একটু দূরে দাঁড়ান। গরম লাগছে আমার।”

কথাটা খুব জোরে না বললেও তাতে এমন শীতল কঠোরতা ছিল যে সিমরানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। মুহূর্তের মধ্যে তার মুখের হাসিটা ম্লান হয়ে গেল। কিন্তু দমে গেলো না মেয়ে। আরো আহ্লাদী হয়ে বলল
“গরম লাগছে? বাতাস করবো?”

মেহেরুন্নেসার অদ্ভুত লাগছে তার এমন আচরণ। যদিও সে চিনে না সিমরান কে। রত্নপ্রভার কানে কানে বলল
“ভাবি, এটাও কি তোমাদের বোন হয়?”

রত্নপ্রভা মেহের এর দৃষ্টি অনুসরণ করে তাকাতেই দেখলো সিমরান কে। মুচকি হেসে বলল
“না। ওর বাবা আমার আব্বার বন্ধু ছিলো। ডাকাত এর আক্রমণে ওর পুরো পরিবার মারা যায়। তারপর থেকে ও এখানেই আছে। বোন না হলেও, বোনের মতই দেখি ওকে আমরা”

মেহের ঠোঁট সরু করে বলল
“ওওওও। কিন্তু উনি তো পরপুরুষ, তার সাথে এমন করছে কেনো?”

প্রভা তাকালো আবার। সিমরান অনেক কাছাকাছি দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ এর। বাতাস করছে পাখা দিয়ে। গুরুত্ব দিলো না
“ও ওমন ই”

মেহেরুন্নেসা ও কান দিলো না। একটা পিঁড়ি তে বসে রইলো প্রভার কাছেই।

বাইজিদ চুপচাপ বসে খাবার খাচ্ছিল। সিমরান তার সামনে দাঁড়িয়ে, যেন অকারণে একটু বেশি সময় ধরে থালা ঠিক করছে, পানির গ্লাস সরাচ্ছে। সবই এমন ভঙ্গিতে যেন কাওকে দেখিয়ে দিতে চায়, সে কতটা কাছের।

কিন্তু বাইজিদের মন যেন সেখানে নেই। এক সময় তার দৃষ্টি ঘরের কোণে গিয়ে থামল। দূরে, একটু আড়ালে বসল আছে মেহেরুন্নেসা। মাথায় পর্দা টানা, চোখ নিচু। যেন ইচ্ছে করেই নিজেকে যতটা সম্ভব আড়ালে রাখছে। বাইজিদের মনে হঠাৎ অদ্ভুত এক টান জাগল। কারণ এই মেয়েটাকে সে এড়িয়ে চলতে চায়, অথচ চোখ বারবার সেদিকেই ফিরে যায়। কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে সে গলা পরিষ্কার করল। স্বরটা যথারীতি সংযত, ভদ্র।
“মেহেরুন্নেসা… আপনি হেশেলে বসে আছেন কেন? আপনি তো অসুস্থ”
মেহেরুন্নেসা একটু চমকে উঠল। মাথা আরও নিচু হয়ে গেল। ধীরে বলল,
“আমি… ঠিক আছি।”

বাইজিদের দৃষ্টি এবার সম্পূর্ণ রুপে মেহের এর ওপর গেলো
“আপনার হাতের পোড়াটা এখন কেমন আছে?”

মেহেরুন্নেসা আস্তে বলল,
“অনেকটাই ভালো… আলহামদুলিল্লাহ।”

বাইজিদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে রইল। তারপর আবার জিজ্ঞেস করল,
“খাওয়া হয়েছে আপনার?”
“জি… হয়েছে।”
কথাগুলো খুব সাধারণ। কিন্তু তার ভেতরে একটা অদ্ভুত সংযম ছিল।যেন ইচ্ছে করেই সে নিজেকে সীমার মধ্যে রাখছে। বাইজিদের চোখে তখন অদ্ভুত কিছু অনুভূতি খেলছিল।কৌতূহল,সামান্য মায়া, আবার অকারণ অস্বস্তিও।
যেন সে নিজেই বুঝতে পারছে না কেন এই মেয়েটার খোঁজ নিতে ইচ্ছে হলো।

মেহেরুন্নেসার ও কেমন অস্বস্তি লাগছে সবার সামনে এমন খোঁজ খবর নিচ্ছে বাইজিদ। দাসী, পরিবারের লোক সবাই তাকিয়ে আছে। মেহের নিজেকে আড়াল করতে দাসীকে অনুরোধ করলো হেঁশেলের পর্দা টেনে দিতে।

বাইজিদ পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সিমরানের বুকের ভেতরটা জ্বলে উঠল। সে পরিষ্কার দেখল,
বাইজিদ তাকে একবারও জিজ্ঞেস করল না সে কেমন আছে খেয়েছে কিনা? কিন্তু দূরে দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটার পোড়া হাতের খোঁজ নিচ্ছে।
তার মনে হিংসার আগুন ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ল।

বাইজিদ যতই ভদ্রতা আর দূরত্ব বজায় রেখে কথা বলুক, তার চোখের সেই ক্ষণিক থেমে থাকা দৃষ্টি কিন্তু সিমরানের চোখ এড়ায় নি। সেটা মোটেও অকারণে নয়।

এত বছর ধরে খাবার বেড়ে দেয় বাইজিদ কে। যদিও বাইজিদ বলে না বা চায়ও না। কই কখনো জিজ্ঞেস করে নি সিমরান খেয়েছো কিনা?

**

রাত গভীর হলে সাহাবাদ যেন অন্য এক জগতে ঢুকে পড়ে। দিনের কোলাহল মিলিয়ে যায়, বিশাল প্রাসাদের দেয়ালগুলো চাঁদের আলোয় নীরব প্রহরীর মতো দাঁড়িয়ে থাকে। দূরে কোথাও শেয়ালের ডাক ভেসে আসে, আবার সব থেমে যায়। এই নিস্তব্ধতার মাঝেই ধীরে ধীরে নিজের কক্ষের দরজা খুলল সুনেহেরা।

তার চলার ভঙ্গিতে অভ্যাসের নিখুঁততা। যেন এই পথ সে শতবার পেরিয়েছে। গায়ের উপর কালচে চাদরটা টেনে নিল, যাতে দূর থেকে তাকে আলাদা করে বোঝা না যায়। তারপর নিঃশব্দে করিডোর পেরিয়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। প্রাসাদের পেছনের দিকটা প্রায় অন্ধকারে ডুবে আছে। সেখানেই আস্তাবল।

কাঠের বড় দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই খড়ের গন্ধ আর ঘোড়ার নিঃশ্বাসের উষ্ণতা নাকে এল। কয়েকটা ঘোড়া নড়েচড়ে উঠল, যেন তার উপস্থিতি চিনে ফেলেছে। সুনেহেরা সরাসরি এগিয়ে গেল তার প্রিয় ঘোড়াটার কাছে।
হাত বাড়িয়ে ঘোড়ার কেশরে আলতো করে হাত বুলিয়ে দিল।
ঠিক তখনই পেছনে হঠাৎ একটা শুকনো শব্দ।
কাঠের দরজা ধীরে ধীরে বন্ধ হওয়ার আওয়াজ।
সুনেহেরার চোখ মুহূর্তেই সরু হয়ে গেল।
“রাতে আস্তাবলে কে ঢুকলো?”

তলোয়ার টা প্রস্তত করে চোখ দুটো তৈরি হলো অচেনা কোনো শত্রুকে চিহ্নিত করতে। অন্ধকার কোণ থেকে ভেসে একটা পুরুষালী কন্ঠ
“বাহহহহ, আজকেও?”

সুনেহেরা ঘুরে দাঁড়াতেই দেখল মাহাদি। দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। মুখ আবৃত, তবে চোখ জোড়া দেখে হাসি বোঝা যাচ্ছে।
চাঁদের আলো দরজার ফাঁক দিয়ে এসে তার মুখের অর্ধেকটা আলোকিত করেছে।
সুনেহেরার কণ্ঠ ঠান্ডা হয়ে গেল।
“আপনি? আপনি এখানে কেন? জানের মায়া নেই?”

মাহাদি ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল।
“প্রশ্নটা তো আমার করা উচিত। জমিদারের ছোট কন্যা… রাত নামলেই আস্তাবলে এসে ঘোড়া নিয়ে কোথায় ছুটে যান? তার কি জানের মায়া নেই?”

সুনেহেরা কোনো উত্তর দিল না। তলোয়ার ফের কোষে রেখে চুপচাপ ঘোড়ার লাগাম খুলতে লাগল।বমাহাদি একটু এগিয়ে এল।
“উত্তরের জঙ্গলটা কি এতই আকর্ষণীয়?”

এইবার সুনেহেরা থেমে গেল। তার চোখ ধীরে ধীরে মাহাদির দিকে উঠল। সেই দৃষ্টিতে স্পষ্ট সতর্কতা।
“আমার পথ থেকে সরে দাঁড়ান।”

মাহাদি হেসে ফেলল।
“না দাঁড়ালে?”
এক মুহূর্ত নীরবতা, তারপর সবকিছু এত দ্রুত ঘটল যে মাহাদি বুঝে ওঠার সুযোগই পেল না।
সুনেহেরা আচমকা এগিয়ে এল। তার হাতে থাকা তলোয়ার এর হাতল বিদ্যুতের মতো উঠে এসে মাহাদির বুকে জোরে ধাক্কা দিল।
অপ্রস্তুত অবস্থায় মাহাদি পেছনে সরে গিয়ে খড়ের গাদার সাথে ধাক্কা খেল।

তার ভারসাম্য সামলে ওঠার আগেই সুনেহেরা এক লাফে ঘোড়ার পিঠে উঠে পড়েছে।
লাগাম টেনে ঘোড়াকে ঘুরিয়ে নিল।
দরজাটা ঠেলে খুলতেই ঠান্ডা রাতের বাতাস ভেতরে ঢুকে পড়ল। মাহাদি তখনও সামলে উঠছে।
সে দাঁতে দাঁত চেপে বলল
“যাবেন না, শাহজাদি শুনুন!”

কিন্তু ততক্ষণে দেরি হয়ে গেছে। ঘোড়ার খুরের শব্দ বজ্রের মতো বাজল। সুনেহেরা এক মুহূর্তের জন্যও পেছনে তাকাল না। প্রাসাদের সীমানা পেরিয়ে সে সোজা ছুটে গেল উত্তরের জঙ্গলের অন্ধকারের দিকে। মাহাদি দরজার সামনে এসে দাঁড়িয়ে রইল। দূরে মিলিয়ে যাওয়া ঘোড়ার শব্দ শুনতে শুনতে তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হাসি ফুটে উঠল।
মনে মনে বলল
“রহস্যটা আমি জানবোই শাহজাদি…”

উত্তরের জঙ্গলে ঢুকতেই চারপাশের বাতাস বদলে গেল। ঘন গাছপালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলোও ঠিকমতো নামতে পারছে না। ছায়া আর অন্ধকার মিলে পথটাকে আরও রহস্যময় করে তুলেছে। সুনেহেরার ঘোড়ার খুরের শব্দ শুকনো পাতার উপর চাপা পড়ে যাচ্ছে। সে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছিল।
হঠাৎ দূরে কিছু একটা নড়াচড়া চোখে পড়ল।
সুনেহেরা লাগাম টেনে ঘোড়াকে থামাল।
তার দৃষ্টি সরু হয়ে এল। উত্তরের সেই পরিত্যক্ত প্রাসাদ, যেটা বছরের পর বছর ধরে শুনশান পড়ে আছে, যার ভাঙা দেয়াল আর কালচে জানালা নিয়ে গ্রামে নানা গল্প শোনা যায় সেই প্রাসাদের ভেতর থেকে আলো বের হচ্ছে। কিন্তু একটিমাত্র নয়। অনেকগুলো। কিছু মুহূর্ত পর দৃশ্যটা স্পষ্ট হলো। প্রাসাদের ভাঙা দরজা দিয়ে সারিবদ্ধভাবে বেরিয়ে আসছে একদল মানুষ।

সবাই কালো পোষাকে ঢাকা। মুখে অদ্ভুত মুখোশ। আর প্রত্যেকের হাতে জ্বলছে হারিকেন। হারিকেনের কম্পিত আলো তাদের মুখোশের ছায়াকে আরও ভয়ঙ্কর করে তুলেছে।
তারা একেবারে শৃঙ্খলাবদ্ধভাবে হাঁটছে। যেন আগে থেকেই সব ঠিক করা। সুনেহেরার বুকের ভেতর ধক করে উঠল।
“এরা বেড়িয়ে পড়েছে?”

তার চোখ দ্রুত চারপাশে ঘুরল। ওরা সোজা মূল ফটকের দিকেই এগোচ্ছে। যদি একবার গেইট পার হয়ে যায়, তাহলে অন্ধকার জঙ্গলে ছড়িয়ে পড়বে। তারপর আর কাউকে ধরা যাবে না।
এক মুহূর্তও দেরি করল না সুনেহেরা।
সে হঠাৎ লাগাম শক্ত করে ধরল।
“হাআআআআহহহ”
এক ঝটকায় ঘোড়াটা ছুটে উঠল। খুরের শব্দ বজ্রের মতো বাজতে লাগল নিস্তব্ধ জঙ্গলে। বাতাস তার চুল উড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে। সামনে বিশাল লোহার গেইটটা দেখা যাচ্ছে, অর্ধেক খোলা। আর ওই মুখোশধারী দলটা ঠিক তার দিকেই এগিয়ে আসছে। সময় খুব কম।
সুনেহেরা দাঁত চেপে ঘোড়াকে আরও জোরে ছুটাল। মুহূর্তের মধ্যে সে গেইটের কাছে পৌঁছে গেল। ঘোড়া থামার আগেই সে প্রায় লাফিয়ে নিচে নেমে পড়ল। ভারী লোহার গেইটটা ঠেলতে গিয়ে হাতের শিরাগুলো ফুলে উঠল।
লোহা ঘষার কর্কশ শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা চিরে দিল ধীরী ধীরল
তারপর ধাম করে শব্দ হলো। বিশালাকার গেইটটা বন্ধ হয়ে গেল।

ঠিক সেই মুহূর্তে মুখোশধারী লোকগুলো কয়েক কদম দূরে এসে থেমে গেল।
হারিকেনের আলো দুলছে। অন্ধকার জঙ্গলের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা। বুকে হাত দিয়ে হাঁপাচ্ছে। একটুর জন্য বেচে গলো সব। মনে মনে জিদে ফুঁসছে মাহাদির ওপর
“ওই অকর্মা সেনাপতি টার জন্য আজ সর্বনাশ হয়ে যেত। এবার ওকে জোরসে একটা শিক্ষা দিতে হবে দেখছি।

ওপাশের আটকা পড়া লোক গুলো ঝাঁপিয়ে পড়ে গেইটের ওপর দিয়ে ছুড়ে মারতে লাগল ইট, পাথর হারিকেনের ভাঙা অংশ। ইটগুলো লোহার গেইটকে আঘাত করল, ধকধক, ঝনঝন সারা রাতের নীরবতায় যেন বজ্রপাতের মতো শব্দ
ছড়াল।

একটি পাথর হঠাৎ উড়ে এসে সুনেহেরার কপাল ছুঁয়ে গেল। তার ত্বক ছিঁড়ে গেল, ছোট্ট রক্তের দাগ ঝলমল করল চাঁদের আলোয়। তবু সে হড়বড় করল না। ঘোড়ার পিঠে মাথা ধাক্কা দিয়ে ফিরে উঠল, হাত শক্ত করে লাগামে ধরল। মুখে একটুখানি সংযমী ভয়, কিন্তু আত্মবিশ্বাস স্পষ্ট।

ঘোড়ার খুর শুকনো পাতার উপর থাপ থাপ শব্দ তুলছে, বাতাসে তার চুল উড়ছে, পেছনে গেইটের ওপরে লাফানো ইট-পাথরের ঝাঁকুনি। কিছুক্ষণ বাদে মুখোশধারীরা একটু থেমে গেলো হারিকেনের আলো দুলছে তাদের হাতে। ছায়া ছায়ার সঙ্গে লড়ছে, অন্ধকারে অদৃশ্য অগ্নিকাণ্ডের মতো। কিন্তু সুনেহেরা আর পিছনে তাকায়নি। দরজা বন্ধ করার পর তার পথ একমাত্র জঙ্গলের গভীর দিকে।

জঙ্গলের ভেতর ঢুকতেই চারপাশের গাছপালা আরও ঘন হয়ে এসেছে। চাঁদের আলো শিকড়ের ফাঁক দিয়ে ঢুকছে, পাতার উপরে নাচছে। বাতাসে আর্দ্রতা, ধুলো ও শীতলতা মিশে আছে। ঘোড়ার খুর শুকনো পাতায় ঠোকাঠোকি করছে, প্রতিটি পদক্ষেপে মাটির গন্ধ উঠে আসছে।

সুনেহেরা আরও গভীরে গেল। পেছনের দিকে গেইট এখনও লোহার মতো শক্ত। সামনে পুরো জঙ্গলের অন্ধকার। কখনও কখনও শেয়ালের ডাক ভেসে আসে, কখনও ঝোপের নড়াচড়া। তার চোখ বারবার চারপাশে ঘুরছে, হাত শক্ত করে লাগামে। অদ্ভুত, ভীতিকর কাহিনী বুনে যাচ্ছে।

জঙ্গলের শেষপ্রান্তে পৌঁছতেই ঘোড়া হঠাৎ থেমে গেল। সেখানে আছে ছোট্ট ঝর্ণা, পাহাড়ি শিলার ফাঁক দিয়ে জল পড়ছে, ছোট ছোট বুদবুদ গড়িয়ে নদীর মতো সরছে। ঝর্ণার ঠান্ডা জল রাতে জঙ্গলের নিস্তব্ধতায় ভেসে আসছে শুধু সেই স্রোতের ধ্বনি, আর ঘোড়ার নিঃশ্বাস।

সুনেহেরা নামল। কপাল থেকে রক্ত মুছে নিতে জল ছুঁয়ে নিল। ঠান্ডা জল ছুঁয়ে ভিজে গেল চামড়া, ছোট্ট দাগগুলো অদৃশ্য হতে লাগল। ঝর্ণার নীরব, কিন্তু সতেজ স্রোত যেন তাকে শক্তি দিচ্ছে। সে গভীর শ্বাস নিল, ঘোড়ার পিঠে আবার উঠে বসল। অন্ধকার জঙ্গলের শেষ প্রান্তে দাঁড়ালো। ওখানে সেই সুরঙ্গ যা মাটির তলদেশে হয়ে আস্তাবল এর অপর প্রান্তে গিয়ে ঠেকেছে।


সকালের শীত শীত আবহাওয়ায় গাঢ় ঘুম ঘুমিয়ে পড়েছে তিলোত্তমা। দরজার খটখটানি তে কপাল কুচকে আসে। সারা বাড়ির মানুষ জড়ো হয়ে যাচ্ছে তাও তিলোত্তমার ঘুম ভাঙছে না। ওদিকে রমলা মনে হয় দরজা টা এবার ভেঙেই ফেলবে। অবশেষে ঘুম থেকে ছুটি পেয়ে দরজা খুলল তিলোত্তমা। দরজা খুলার সাথে সাথে এক বালতি পানি ভিজিয়ে দিল তার সর্বাঙ্গ। মেজাজ চড়ে গেলো তার। শাশুড়ী কে কড়া গলায় বলল
“কি অসভ্যতা হচ্ছে মা?”

রমলা খ্যাক খ্যাক করে বলল
“এহহহহ, জমিদারের বেটি। এইডা কি বাপের রাজমহল পাইছো, ওহহ বাপ কইলে ভুল হইবো। হেয় তো পাতা বাপ। তা হের মহল না এইডা, যে বেলা তুরি ঘুমাইবা। ভদ্দ লোকের বেটির মতন উঠিয়া খাওন রান্ধো যাইয়া।”

(সারা এলাকায় বিদ্যুৎ নেই আমার। পাশের এলাকায় এক বাড়ি থেকে ফোন চার্জ করে এনেছি। তাই একটু দেরি হলো গল্প দিতে। খুব সমস্যায় আছি এ নিয়ে।)

আর কিছু কথা না বললেই নয়। কয়েকজন টিকটকার কে দেখছি আমার গল্প এবং আমার ইডিট করা ভিডিও টিকটকে আপলোড দিচ্ছে। অথচ রাইটার মেনশন কিংবা গল্পের নাম উল্লেখ নেই। তাদের জন্য শুভ কামনা কারণ আমি একজন এক্সপার্ট এর সাথে কথা বলেছি, সামনে পড়লেই সে সকল আইডি নষ্ট করা হবে। জাস্ট ওয়েট এন্ড ওয়াচ। দেখতে থাকো।

এমন চলতে থাকলে লিখবো কীভাবে আমি?
কেমন হইছে বলিও কিন্তু। আর আগের পর্বের রেসপন্স অনেক কম 🙂। এটায় যেনো ভালো হয় 🙃🫶

গল্পের কাহিনী নিয়ে ভিডিও বানাও, রাইটার মেনশন গল্পের নাম দাও। আমি মানা করিনি। তবে গল্প আপলোড দিবা ভং সং নাম দিবা অথচ গল্প আমার। এগুলা মেনে নেওয়া যায় না। একজন দেখলাম নাম দিয়েছে জমিদারের ছেলে আর সাহাবাদ 🙂

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply