Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৭


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ৭

দরবার ভর্তি লোকের মধ্যে এত দ্রুত ঘটনাটা ঘটল যে কেউ বুঝে ওঠার সুযোগ পেল না। মুহূর্তের মধ্যে বর্শার ফলা বুক চিরে সামনে বেরিয়ে এল। দাসীটির মুখ হাঁ হয়ে গেল। এক ফোঁটা শব্দও বের হলো না তার মুখ থেকে। শুধু চোখ দুটো বিস্ফারিত হয়ে উঠল। তারপর ধীরে ধীরে শরীরটা সামনে ঝুঁকে পড়ে গেল পাথরের মেঝেতে। ঠক করে শব্দ হলো।

মেঝেতে লাল রক্ত ছড়িয়ে পড়তে লাগল। দরবারখানার ভেতর মুহূর্তেই নেমে এল মৃত্যু নীরবতা। কারও শ্বাস নেওয়ার শব্দও যেন শোনা যাচ্ছে। সবাই স্থির হয়ে আছে। কারও মাথায়ও আসেনি ঠিক কোথা থেকে বর্শাটা এল। সবাই এতক্ষণ বিচার সভার দিকে মনোযোগ দিয়ে ছিল যে কারও চোখ দরজার দিকে বা জানালার দিকে যায়নি। বাকের শাহ্ আচমকা উঠে দাঁড়ালেন।
তার গম্ভীর কণ্ঠ বজ্রের মতো গর্জে উঠল
“কে করেছে এটা?”

কেউ উত্তর দিল না। সবাই আতঙ্কিত। আজ অবদি মহলের ভিতরে এমন ঘটনা ঘটেনি।
দরবারখানার বাতাস যেন হঠাৎ জমে গেছে।
মেঝেতে পড়ে থাকা দাসীটির শরীর নিস্তেজ হয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। কেউ এগিয়ে গিয়েও তাকে বাঁচানোর চেষ্টা করল না।
কারণ আঘাত থেকে বাঁচার কোনো উপায় নেই।

ভয়ে সিটিয়ে গেল মেহেরুন্নেসা।তার আঙুল শক্ত হয়ে ধরল প্রভার হাত। মুহূর্তেই তার চোখে আতঙ্ক ভরে উঠল। এই প্রথম সে এত কাছে থেকে কারও মৃত্যু দেখছে। শরীরটা অনিচ্ছাকৃত কেঁপে উঠল।
অজান্তেই আরও কাছে সরে এল প্রভার। নিকাবের আড়াল থেকেও বোঝা যাচ্ছে তার শ্বাস দ্রুত হয়ে উঠেছে। প্রভা মেহেরকে আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার নিজের চোখেও আতঙ্ক, যদিও এমন দৃশ্য বহুবার দেখেছে সে। কিন্তু তা মহলের বাহিরে।
দরবারখানার সবাই এখন একসাথে তাকিয়ে আছে চারদিকে। কিন্তু কেউই বুঝতে পারছে না
বর্শাটা ছুড়েছে কে। শুধু বাইজিদ শাহ্ স্থির দাঁড়িয়ে আছে। তার চোখ ধীরে ধীরে ঘুরে গেল দরবারখানার অন্ধকার কোণের দিকে।
চোখের গভীরে তখন অদ্ভুত এক সন্দেহের ছায়া।
কারণ এই প্রাসাদে এমন নিখুঁত নিশানা করতে পারে, এমন মানুষ খুব বেশি নেই।

মেহের এর দিকে খেয়াল হতেই বাইজিদ দেখলো সে প্রভার পিছনে লুকিয়ে ভয়ে সিটিয়ে আছে। এসব দেখার অভ্যাস নেই তো তার। দ্রুত লাশ সরানোর ব্যাবস্থা করতে বলল।

দাসীটির লাশ বাইরে নিয়ে যাওয়া হলো। দরবারখানায় আবার নীরবতা নেমে এলো।
বাকের শাহ্ ধীরে গম্ভীর কণ্ঠে বললেন
“মেহেরুন্নেসা নির্দোষ। না সে প্রভার অত্যাচারিনদের সাথে সামিল, আর না শাহজাদা ঘটিত কোনো বিষয়ে যুক্ত।”

প্রভা নিঃশব্দে মেহেরুন্নেসাকে আরও কাছে টেনে নিল। বাকের শাহ্ আবার বললেন
“সকালেই তাকে তার বাড়িতে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমাদের প্রাসাদে আর তার কোনো বন্দিত্ব নেই।”

কথাটা শেষ হতেই দরবারখানায় হালকা গুঞ্জন উঠল। কিন্তু সেই শব্দগুলো যেন বাইজিদ শাহ্ এর কানে পৌঁছালো না। তার বুকের ভেতর আচমকা যেন কেউ একটা ঝড় ছেড়ে দিয়েছে। মেহেরুন্নেসা চলে যাবে? এই মেয়েটা চলে যাবে?
মুহূর্তের জন্য তার বুকের ভেতর অদ্ভুত শূন্যতা ছড়িয়ে পড়ল। যেন কেউ নীরবে এসে তার ভেতর থেকে কিছু একটা ছিনিয়ে নিতে চাইছে।
তার চোখ অজান্তেই গিয়ে থামল মেহেরুন্নেসার দিকে। সাদা বোরখার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে সে। ক্লান্ত, দুর্বল। হাতের কব্জি দুটো লাল হয়ে আছে।
কিন্তু সেই দুর্বলতার মাঝেও মেয়েটার ভেতরে এক অদ্ভুত নীরব শক্তি আছে।

বাইজিদের মনে হঠাৎ ভেসে উঠল সেই রাতের কথা। খামের ওপর ছোট করে লেখা একটা নাম
‘মেহেরুন্নেসা’। কেবল একটা নাম অকারণে কেমন যেন তার মনে গেঁথে গিয়েছিল। তারপর সেই দিন প্রভাকে আনতে গিয়ে প্রথম যখন এই মেয়েটার চোখের দিকে তাকিয়েছিল। সেই চোখে ছিল ভয়, তবু অদ্ভুত এক সাহসও ছিল। সেদিন থেকেই যেন কোথাও অজান্তে একটা অদৃশ্য সুতো বেঁধে গেছে।
আজ যদি সে চলে যায়? এই অদ্ভুত অনুভূতিটা কি আবার শূন্য হয়ে যাবে? এই অনুভূতি টা কেমন ভালো লাগছে তার কাছে। এই চিনচিনে ব্যাথাটাও মধুর লাগছে। মেহেরুন্নেসার যাওয়ার কথা উঠতেই অস্থিরতা বাড়তে লাগলো। বাইজিদ বুঝতে পারছে না কেন তার ভেতরটা এমন অস্থির হয়ে উঠছে। কখনো তো কোনো নারীর জন্য এমন অদ্ভুত টান অনুভব করেনি।

তবু এই মেয়েটার কথা ভাবলেই বুকের ভেতর কেমন অচেনা অস্বস্তি জন্ম নেয়।
যেন তাকে এখান থেকে চলে যেতে দেওয়া মানেই
নিজের ভেতর থেকে কোনো অমূল্য জিনিস হারিয়ে ফেলা। বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল।
“এখনই তাকে যেতে দেওয়া যাবে না।”

সবাই তাকাল তার দিকে। বাকের শাহ্ ভ্রু কুঁচকে বললেন
“যেতে দেনে না মানে?”
বাইজিদ স্থির কণ্ঠে বলল
“এই অবস্থায় তাকে পাঠানো ঠিক হবে না আব্বা।”
তার চোখ তখনও মেহেরুন্নেসার ওপর স্থির।
“ওনার শরীর দুর্বল। হাতের অবস্থা তো আপনি দেখেছেন। এমন অবস্থায় কাউকে বাড়ি পাঠানো টা ঠিক হবে না”

বাইজিদ এর কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা।
“সে সুস্থ হোক। তারপর তাকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়া হবে। আমি নিজে গিয়ে দিয়ে আসবো”

দরবারখানার বাতাস আবার ভারী হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে বাকের শাহ্ ধীরে মাথা নাড়লেন।
“ঠিক আছে। তাহলে সুস্থ হলে যাবে।”
এই কথাটা শোনার পর তার বুকের ভেতর জমে থাকা অদৃশ্য চাপটা যেন একটু হালকা হলো।

সিমরান দাঁত কটমট করল বিড়বিড় করছে
“উনি এই মেয়েটাকে আটকাচ্ছে কেন? বেশ তো বিদেয় হচ্ছিল অসহ্য টা। ধুরর”

মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে প্রভা নিজের ঘরে গেলো। পালঙ্কের ওপর মেহের কে বসতে বলে দরজা বন্ধ করে দিয়ে আসলো।
“এখন কেউ আসবে না। বোরখা খোলো, হাসফাস লাগে না তোমার?”

মেহের হিজাব টা হাত দিয়ে ধরতে পারছে না। দুটো হাত টকটকে ফোসকায় ভরে গেছে। প্রভা সাহায্য করলো। বোরখা খুলে সবুজ রঙের জামা পরে মাথায় ঘোমটা টেনে দিল। প্রভা মেহের এর পোড়া হাত দুইটা ধরে অশ্রুসিক্ত আখি নিয়ে বলল
“আমার ভাইজান এর হয়ে আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি মেহের, মাফ করে দাও”

“এসব বলিও না তো ভাবি। তোমার ভাইজান আমার সাথে কোনো খারাপ ব্যাবহার করেনি। করেছে তোমার মা।”

ওদের কথার মধ্যেই দরজায় কড়া পড়লো। মেহের চলে গেলো ভিতরের কক্ষে। প্রভা দরজা খুলতেই এক দাসী বলল
“জমিদার বাবু আপনাকে তার কক্ষে ডেকেছেন”

প্রভার ঘরের ভিতরে আরেকটি ছোট্ট ঘর আছে। সেখানে কেবল ছোট একটি পালঙ্ক। দেওয়ালে একটি ছোট্ট মশাল লাগানো। মেহের সেখানে গিয়ে বসলো। দরজার সামনে শুধু একটা পর্দা দেয়া। প্রভা পর্দা টা ভালো করে টেনে দিয়ে বলল
“আমি আব্বার সাথে দেখা করে আসি। তুমি এখানেই থাকো”

মেহের মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো। পালঙ্কের ওপাশে ছোট একটা জানালা আছে। মেহের এগিয়ে গিয়ে বসলো সেখানে। জানালা খুলে দিলো দুই হাতে। চাঁদের আলোয় প্রাসাদের পাশের ঝর্ণা টা খুব মনোমুগ্ধকর লাগছে। পাহারের কোল ঘেষে গড়ে তোলা এই প্রাসাদ টার সৌন্দর্য অসীম। জানালা দিয়ে দেখা যাচ্ছে দূরের কয়েকটা পাহাড়ের চূড়া। কুয়াশা রা ঢেকে রেখেছে পাহাড়ের গা। এ যেন চোখের শান্তি। মেহের মুগ্ধ হয়ে দেখছে বাহিরের প্রকৃতি। বড় বড় পাইন গাছের মাথার ওপর কুয়াশার আস্তর। কিন্তু এত বড় প্রাসাদ টা এত নিরব হয়ে গেলো কেনো? দিনের বেলায় তো বেশ জাঁকজমকপূর্ণ থাকে।

কক্ষের ভারি দরজা টা ঠেলার শব্দে সতর্ক হলো মেহের। হকচকিয়ে উঠে বসলো। ভারী দরজাটা ঠেলেই কক্ষে ঢুকল বাইজিদ। দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ভারি কাঠের ঘর্ষণের শব্দটা ঘর জুড়ে প্রতিধ্বনির মতো বাজল। কক্ষে ঢুকেই সে অভ্যাসবশত গম্ভীর কণ্ঠে ডাকল
“রত্না… রত্না?”

তার কণ্ঠের গভীরতা যেন ঘরের দেয়ালে গিয়ে ধাক্কা খেল। কিন্তু কোনো উত্তর এল না।
ভেতরের ছোট কক্ষের পর্দার আড়ালে বসে থাকা মেহেরুন্নেসা মুহূর্তে সোজা হয়ে বসে পড়ল। বুকের ভেতর ধুপধুপ শব্দ উঠছে। সে বুঝতেই পারেনি কেউ আসবে। কণ্ঠস্বর শুনেই বুঝে গেছে বাইজিদ শাহ্ এসেছে।
কয়েক মুহূর্ত নীরব থাকার পর সে পর্দার আড়াল থেকেই ধীর কণ্ঠে বলল
“ভাবি…তো নেই এ ঘরে। উনি তো তার বাবার সাথে দেখা করতে গেছেন।”

কথাটা বলেই যেন একটু থেমে গেল মেহের। নিজের কণ্ঠ শুনে নিজেই অবাক হলো। এত বড় প্রাসাদে একজন পুরুষের সঙ্গে এমনভাবে কথা বলার অভ্যাস তার নেই। বাইজিদ দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল। কণ্ঠটা শুনেই তার চোখ সরু হয়ে এল। সে ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এল ঘরের ভেতর।
“আপনি?”
কণ্ঠে অবাক হওয়ার চেয়ে যেন সংকোচ বেশি ছিল। পর্দার আড়াল থেকে মেহের বলল
“জি।”
এক মুহূর্ত চুপ করে থেকে বাইজিদ আবার বলল
“রত্নপ্রভা নেই?”
“না… উনি জমিদার বাবুর কাছে গেছেন।”

বাইজিদের চোখ এবার গিয়ে থামল সেই ছোট পর্দাটার দিকে। পর্দার ওপাশে মশালের ক্ষীণ আলো দুলছে। আলোয় ছায়ার আভাস দেখা যাচ্ছে। সে ধীরে ধীরে বলল
“আর আপনি এখানে একা বসে আছেন?”

মেহের কিছু বলল না। শুধু চুপ করে রইল। হঠাৎ বাইজিদের গলা একটু শক্ত হয়ে উঠল।
“আর একটা কথা।”

মেহের ভ্রু কুঁচকে শুনছে।
“রত্নপ্রভাকে ভাবি ভাবি বলে ডাকবেন না।”
পর্দার আড়ালেই মেহের চমকে উঠল।
“কেন?”
বাইজিদ কঠিন গলায় বলল
“সে সম্পর্ক টা আর নেই তাই”

মেহের কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে ধীরে বলল
“ঠিক আছে”
কথাটা শুনে বাইজিদের চোখে অদ্ভুত এক ঝলক দেখা দিল। ঠিক তখনই বাইরের দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস এসে ঢুকল জানালা দিয়ে। মশালের আগুনটা দুলে উঠল। বাইজিদের সবুজাভ চোখ এবার সরু হলো। কড়া কণ্ঠে বলল
“জানালাটা বন্ধ করুন।”
মেহের একটু অবাক হলো। মনে মনে বলল
“পর্দার ওপাশে থেকে বুঝলো কি করে জানালা খোলা?”

বাইজিদ যেন অচিরেই বুঝে ফেলল মেহের এর মনের অব্যক্ত প্রশ্ন।
“বাতাসে মশালের আলো দুলছে বেশ টের পাচ্ছি। এই মহলে রাতের বেলা কেউ দরজা জানালা খুলে না। আপনিও মাথায় রাখবেন কথাটা”

মেহের কন্ঠ নিচু করে বলল
“আমি মাথায় রেখে কি করবো? আমি কি এখানে থাকবো নাকি?”

“হ্যা থাকবেন”

কথাটা এমনভাবে বলল বাইজিদ, যেন অধিকার আছে, আবার অদৃশ্য এক উদ্বেগও লুকানো।
মেহের কিছু না বলে উঠে দাঁড়াল। ধীরে ধীরে জানালার কাছে গিয়ে সেটা বন্ধ করে দিল। কাঠের পাল্লা লাগার শব্দটা ছোট কক্ষের মধ্যে ভারি হয়ে উঠল। আবার এসে পালঙ্কে বসল।
বাইজিদ কয়েক মুহূর্ত চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল। তারপর জিজ্ঞেস করল
“হাতের অবস্থা কেমন?”

প্রশ্নটা শুনে মেহের নিজের দুটো হাতের দিকে তাকাল। ফোসকায় ভরা লাল হয়ে থাকা চামড়া মশালের আলোয় আরও স্পষ্ট দেখাচ্ছে।
সে ধীরে বলল
“আগের চেয়ে একটু ভালো।”
বাইজিদের ভ্রু কুঁচকে গেল।
“ভালো?”
তার কণ্ঠে অবিশ্বাস। সে কয়েক পা এগিয়ে এল পর্দার দিকে।
“হাত টা কি আমায় একটু দেখানো যাবে?”
মেহের চুপ করে রইল। এবার বাইজিদ নিজেই পরে গেলো অস্বস্তি তে। এভাবে বলা টা বোধহয় ঠিক হয় নি। কয়েক মুহূর্ত নীরবতার পর বাইজিদ নিচু গলায় বলল
“র….রত্না ওষুধ লাগিয়ে দিয়েছে?”

“উহুম”

“তাহলে….

বাইজিদ কিছু বলতে যাবে এমন সময় মেহের নিজের হাতের তালু জোড়া বাড়িয়ে দিলো পর্দার অপর পাশে। বাইজিদ এতটাও আশা করে নি বোধহয়। হাতের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলল। ইচ্ছে করলো পোড়া জায়গা গুলে একটু হাত দিয়ে ছুয়ে দিতে। ইশশশ কি বাজে ভাবেই আঘাত করেছে ফুলের মত মেয়েটাকে। মারজান এর প্রতি জিদ টা ক্রমশ বাড়লো বাইজিদ এর।

তারপর গলা আবার আগের মতো গম্ভীর হয়ে গেল।
“হাত দুটো সাবধানে রাখবেন। কয়েকদিন ভারি কিছু ধরবেন না।”

মেহের উত্তর দিল না। বাইজিদ আবার চুপ হয়ে গেল। পর্দার আড়ালে বসে থাকা মেয়েটাকে সে দেখতে পাচ্ছে না। তবু অদ্ভুতভাবে মনে হচ্ছে সে যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছে তার ক্লান্ত চোখ, ফ্যাকাশে মুখ, আর পোড়া হাত।

মশালের আগুনটা টুকটুক করে জ্বলছে। পর্দার দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে রইল বাইজিদ। অদ্ভুত এক টান অনুভব করছে বুকের ভেতর। মনে হচ্ছিল এই সামান্য কাপড়ের আড়াল সরালেই সে দেখতে পাবে মেহেরুন্নেসাকে। কেন যেন প্রবল ইচ্ছে হচ্ছিল একবার শুধু তার মুখটা দেখার। কিন্তু সেই ইচ্ছে যতটা তীব্র হয়ে উঠছিল, ততটাই শক্ত করে নিজেকে সামলে নিল সে। চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। শেষমেশ গভীর একটা নিঃশ্বাস ফেলে সে মুখ ফিরিয়ে নিল। কারণ সে বুঝে গেছে, এই মুহূর্তে পর্দাটা সরানো মানে শুধু একজন মেয়েকে দেখা নয়, নিজের ভেতরের এক অচেনা দুর্বলতার সামনে হার মানা। এই মেয়েটার আশেপাশে আসলে নিজের অনুভূতি দের নিয়ন্ত্রণ করা এক যুদ্ধের সমান মনে হয় বাইজিদ এর কাছে।


কক্ষের মাঝখানে ভারী কাঠের সেই লম্বা টেবিল। তার উপর ছড়িয়ে আছে রাজ্যের মানচিত্র, জমির নকশা, হিসাবের মোটা খাতা আর সিলমোহর করা কাগজপত্র। মশালের হলুদ আলোয় টেবিলের ওপর আঁকাবাঁকা ছায়া পড়েছে, যেন প্রতিটা রেখাই কোনো গোপন হিসাবের গল্প বলছে।
সেই টেবিলের সামনে বসে আছেন বাইজিদ শাহ্।
গায়ে তার কালো পাতলা পাঞ্জাবি। রাতের নীরবতায় পোশাকটা শরীরের সঙ্গে লেগে আছে, যেন তার দীর্ঘকায় গড়নটাকে আরও স্পষ্ট করে তুলেছে। গলার কাছে দু-একটা বোতাম খোলা, চুলগুলো হালকা এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে। মাথা নিচু করে তিনি কাগজের ওপর ঝুঁকে আছেন—কখনো মানচিত্রে আঙুল চালিয়ে কিছু মাপছেন, কখনো হিসাবের খাতায় দ্রুত কিছু লিখে নিচ্ছেন।
দেখলে মনে হয়, এই মুহূর্তে তার চারপাশে আর কোনো পৃথিবী নেই, আছে শুধু কাজ।
ঠিক তখন দরজার কাছে হালকা শব্দ হলো। খাবারের থালা হাতে সিমরান ঢুকল। ভিতরে ঢুকেই সে থেমে গেল।তার চোখ প্রথমে টেবিলের কাগজে নয়, সরাসরি গিয়ে থামল বাইজিদের মুখে। মশালের আলোয় সেই গম্ভীর মুখটা অদ্ভুতভাবে স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। কালো পাঞ্জাবির ভাঁজে আলো লেগে আছে, আর মাথা নিচু করে কাজ করতে থাকা মানুষটার ভঙ্গিটা এতটাই দৃঢ় যে সিমরানের বুকের ভেতর কেমন সুখ সুখ অনুভূত হলো। কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইল।
ধীরে ধীরে তার মনে কল্পনার দরজা খুলে গেল।
সে যেন নিজেকেই দেখতে পেল এই কক্ষের গৃহিণী হয়ে।

এই টেবিলের পাশেই দাঁড়িয়ে আছে সে।
বাইজিদ ঠিক এভাবেই কাগজপত্রে ডুবে আছে, আর সে বিরক্ত মুখে বলছে—
“আর কত কাজ করবেন? একটু বিশ্রাম নিন।”
বাইজিদ হয়তো প্রথমে গম্ভীর হয়ে বলবে,
“এখন না, কাজ আছে।”
তখন সে জোর করে তার হাত ধরে টেনে উঠাবে।
বলবে, “আপনি শুধু রাজ্যের কথা ভাবেন, নিজের শরীরের কথা ভাবেন না।”

তারপর তাকে বসিয়ে নিজের হাতে কাঁধে তেল দিয়ে মালিশ করবে। ক্লান্ত চোখে তখন বাইজিদ তাকিয়ে থাকবে তার দিকে…
সেই দৃষ্টিতে থাকবে মায়া, থাকবে ভালোবাসা।
এই কল্পনায় সিমরানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক সুখের ঢেউ উঠল।

ঠিক তখনই গম্ভীর কণ্ঠে শব্দ ভেসে এলো
“কিছু বলবেন?”

সিমরান চমকে উঠল। কল্পনার জগৎ ভেঙে বাস্তবে ফিরে এল। খাবার টা নিয়ে রাখলো টেবিলের এক প্রান্তে। কাগজ গুলো গুছিয়ে দিতে লাগলো। এই মেয়েটার আচরণে বাইজিদ বেশ বিরক্ত। নানান ইঙ্গিতে সসব সময় বোঝায় যেন এমন রাত বিরেতে না আসে। কিন্ত এর চোখে তো কালো কাপড় বেধে আছে।

সিমরান কাগজ গুলো গুঋিয়ে হেসে ঘুরে দাঁড়াল, চোখে হালকা উজ্জ্বলতা। বাইজিদ এবার মাথা তুললেন। এক মুহূর্ত তার দিকে তাকিয়ে শান্ত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন
“মেহেরুন্নেসা খেয়েছে?”

শব্দগুলো যেন সোজা গিয়ে সিমরানের বুকের ভেতর আঘাত করল। কিছুক্ষণ আগেও যে সুখের কল্পনায় সে নিজেকে এই কক্ষের গৃহিণী দেখছিল, মুহূর্তেই সবকিছু ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তবু মুখে কিছু প্রকাশ করল না সে। বাইজিদ আবার চোখ নামিয়ে কাগজে মন দিলেন। যেন প্রশ্নটা খুবই স্বাভাবিক।
তারপর নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলল
“আপনি যেতে পারেন। আমি খেয়ে নিবো।”

সিমরান ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়াল। কিন্তু বের হয়ে যেতে যেতে তার বুকের ভেতরটা হিংসায় জ্বলে উঠল। সে এতক্ষণ ভেবেছিল এই মানুষটার দৃষ্টি একদিন তার দিকেই থাকবে।
কিন্তু না…
এই রাতের নিঃশব্দ কক্ষেও বাইজিদ শাহ্ অন্য এক নারীর কথাই ভাবছেন। এই মেয়েটাকে প্রাসাদ থেকে বিদেয় করতেই হবে।


ফজরের আজানের ধ্বনি তখন ধীরে ধীরে ভেসে উঠছে প্রাসাদের চারপাশে। ভোরের আলো এখনও পুরোপুরি ফোটেনি। আকাশের পূর্ব দিগন্তে শুধু ফিকে নীলচে আভা, যেন রাত আর দিনের মাঝামাঝি কোনো নিঃশব্দ সময়।
প্রাসাদের উত্তর দিকের পথটা নিস্তব্ধ। সেখানে কুয়াশা জমে আছে পাতলা পর্দার মতো। দূরে জঙ্গলের ভেতর থেকে হালকা ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এল
ধুপ… ধুপ… ধুপ…

সোনালি রঙের ঘোড়া দ্রুতগতিতে ছুটে এসে ধীরে ধীরে গতি কমাল। ঘোড়ার পিঠে বসে আছে সুনেহেরা। জমিদারের ছোট মেয়ে। বয়স উনিশ। তার সোনালি চুলগুলো পেছনে উড়ছিল এতক্ষণ, এখন ধীরে ধীরে কাঁধে নেমে এল। রাতের শিশিরে ভেজা চুলে ভোরের আলো পড়তেই যেন মৃদু সোনালি আভা ঝিলিক দিল। তার গায়ে গাঢ় রঙের পোশাক, যেন রাতের অন্ধকারে মিশে যাওয়ার জন্যই পরা। দক্ষ ভঙ্গিতে ঘোড়া থামাল।

এই কাজটা সে বহুবার করেছে। এতটাই অভ্যস্ত যে কোনো শব্দ না করেই প্রাসাদের পেছনের গোপন পথ দিয়ে ঢুকে পড়ল। আস্তাবলটা খুব কাছেই। চারপাশে তখনও নিস্তব্ধতা। প্রাসাদের ভেতরের কেউ জেগে ওঠেনি। সুনেহেরা ধীরে ধীরে ঘোড়া থেকে নেমে এল। মাটিতে পা পড়তেই শুকনো পাতার ওপর হালকা শব্দ হলো। দ্রুত ঘোড়ার লাগাম ধরে এগোতে লাগল আস্তাবলের দিকে। ঘোড়াটা যেন তার গোপন সঙ্গী। মাথা নিচু করে শান্তভাবে হাঁটছে। সুনেহেরা চারপাশে তাকাল, কেউ নেই। তার ঠোঁটে একটুখানি সন্তুষ্টির হাসি ফুটল। আস্তাবলের সারি সারি ঘোড়ার পাশে তার প্রিয় ঘোড়া টিকে বাধছিলো
ঠিক তখনই পেছন থেকে গভীর, ভারী এক কণ্ঠ ভেসে এল
“সোনালি ঘোড়াটা আপনার খুব প্রিয় তাই না শাহজাদী”

শব্দটা যেন ছুরি হয়ে নেমে এল নীরবতার ওপর।
সুনেহেরা স্থির হয়ে গেল। ধীরে ধীরে সে ঘুরে দাঁড়াল। কুয়াশার ভেতর থেকে একটা লম্বা অবয়ব সামনে এগিয়ে এল। মাথা থেকে পা পর্যন্ত লোহার বর্মে ঢাকা শরীর। ভোরের ফিকে আলোয় বর্মের ওপর শিশির জমে হালকা ঝিলিক দিচ্ছে।
প্রাসাদের রক্ষীদের প্রধান ‘মাহাদি’।

তার মুখের অর্ধেকটা লোহার হেলমেটের নিচে ঢাকা। শুধু তীক্ষ্ণ চোখ দুটো দেখা যাচ্ছে। সেই চোখে শান্ত অথচ দৃঢ় দৃষ্টি।
সুনেহেরার বুকের ভেতর মুহূর্তে সতর্কতার ঘণ্টা বেজে উঠল। মাহাদি ধীরে ধীরে কয়েক পা এগিয়ে এল। গভীর কণ্ঠে বলল
“বহু দিন ধরেই সোনালি ঘোড়াটা রাতে আস্তাবলে থাকে না। কিন্তু সকালে সে ঠিকই নিজের জায়গায় থাকে। বিষয়টা কিনৃতু আমার চোখ এড়ায়নি শাহজাদী””

কথাটা বলল অদ্ভুত এক শান্ত রহস্য নিয়ে। যেন সে কোনো গোপন দরজা খুলে ফেলেছে। এক মুহূর্তও দেরি করল না সুনেহেরা।
বিদ্যুতের মতো দ্রুততায় কোমর থেকে তলোয়ার বের করে এক ঘূর্ণনে সামনে এসে দাঁড়াল। ঝলকে ওঠা ইস্পাতের ধার সোজা গিয়ে ঠেকল মাহাদির গলায়। ঠাণ্ডা তলোয়ারের ধাতব ধার লোহার বর্মের ফাঁক দিয়ে তার গলার কাছে ছুঁয়ে আছে।
সুনেহেরার চোখ তখন আগুনের মতো জ্বলছে।
নিচু গলায় বলল
“নিয়মের বাইরে কিছু তে নজর দেওয়া নিষেধ। যে কাজে রাখা হয়েছে সেই কাজে মন দিলেও তো হতো। যেচে পড়ে রহস্য উদঘাটন করে নিজের বিপদ ডেকে আনলপন যে। এবার মৃত্যুর সাথে সাক্ষাৎ হোক তবে?”

ভোরের নিস্তব্ধতায় তার কণ্ঠটা অদ্ভুত ঠাণ্ডা শোনাল। মাহাদি একটুও নড়ল না। বরং ধীরে ধীরে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল তার সামনে।
লোহার বর্মের শব্দ হলো মাটিতে ঠেকে।
তার মাথা সামান্য নিচু। তলোয়ার এখনও গলার কাছে।
তারপর শান্ত কণ্ঠে বলল
“আপনার হাতে মৃত্যুও কবুল।”

সুনেহেরা এক মুহূর্ত স্থির হয়ে গেল।
মাহাদির কণ্ঠে ভয় নেই, তাড়াহুড়া নেই। যেন সত্যিই সে মৃত্যুকে স্বীকার করে নিয়েছে।
সে আবার বলল
“আমি যা দেখেছি… তা কাউকে বলার জন্য নয়। কেবল জানার আগ্রহে। ভাববেন না আপনার হাত থেকে বাচতে এসব বলছি। বললে আরো আগেই বলে দিতে পারতাম। যেদিন সেই জাহাজের পিছু নিয়েছিলেন, সেদিন ই দেখলাম প্রথম। তখনই বলে দিতে পারতাম।”

সুনেহেরার কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো। চাচ্ছে কি লোকটা। দূরে মসজিদ থেকে তখন আজানের শেষ ধ্বনি ভেসে আসছে। সুনেহেরার চোখে এখনও সন্দেহের ঝিলিক। তলোয়ারের চাপ একটু বাড়াল সে।
সতর্ক কণ্ঠে বলল
“মাথা তুলুন।”
মাহাদি মাথা তুলল। তার চোখে অদ্ভুত এক শান্ত দৃষ্টি। সেই দৃষ্টি দেখে সুনেহেরার মনে হলো লোকটা বোধ হয় বহু দিনের পরিচিত কেউ।

কেমন হইছে বলিও পাখিরা। টুইস্ট বোধহয় শুরু হয়ে গেলো 😌 ২.৫k রিয়্যাক্ট পূরণ করে দিও কিন্তু। আর ৫০০ কমেন্ট চাই কিন্তু।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply