নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব- ৪
প্রথমেই বলি, আমার গল্প চুরি করে নিজের পেইজে আপলোড দিয়ে চোরের পরিচয় দিবেন না। কিছু পেইজ আছে যারা এমন করে চলেছে।
বেলা ঠিক দুপুর। সূর্য মাথার ওপর স্থির, আলো এত তীক্ষ্ণ যে মাটির ওপর ছায়াও যেন ধারালো হয়ে আছে। সাহাবাদের পথ ধুলোয় ঝাপসা, গরম হাওয়ায় তালপাতা কাঁপছে ধীর, ভারী শব্দে।
সামনে এগিয়ে চলেছে কয়েকজন সশস্ত্র রক্ষী। তাদের পেছনে শ্বেত অশ্ব সিমুর্গ। অশ্বের পিঠে স্থির হয়ে বসে আছে বাইজিদ শাহ্। মুখ গম্ভীর, দৃষ্টি সোজা সামনে। চোয়াল শক্ত, যেন ভেতরে জমে থাকা রাগ দাঁতে দাঁত চেপে আটকে রেখেছে। তার পেছনে, আরেক অশ্বের গাড়িতে বসানো হয়েছে এক আবৃত অবয়ব।
মেহেরুন্নেসা।
তার মুখ সম্পূর্ণ নিকাবে ঢাকা। ভ্রমনে আরো বেশি পর্দা নিশ্চিত করে তার ওপর দিয়েও আরেকটা চাদরে ঘোমটা দিয়ে রেখেছে। সাদা-হালকা নীল ওড়না, তার ওপর সূক্ষ্ম নকশা। রোদে কাপড়ের প্রান্ত একটু স্বচ্ছ হয়ে উঠলেও ভেতরের মুখ অস্পষ্ট। বাইজিদ একবারও ঘুরে তাকায়নি।
ইচ্ছে করেই নয়। মুখ দেখলে সিদ্ধান্ত দুর্বল হয়ে যেতে পারে।
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে আছে। কোনো চিৎকার নেই, কোনো ভাঙচুর নেই। শুধু নীরবতা। সেই নীরবতা এখনো বাতাসে ঝুলে আছে।
পথে গ্রামের মানুষ থেমে তাকায়। কারও চোখে কৌতূহল, কারও চোখে ভীতি। জমিদার পুত্র দুপুরবেলায় এমন অশ্ব বহর নিয়ে ফিরছে এ দৃশ্য সাহাবাদ আগে দেখেনি।
বাইজিদের বুকের ভেতর রাগের আগুন জ্বলছে— রত্নপ্রভার অত্যাচারের চিহ্ন তার মাথা গরম করে রেখেছে। কিন্তু সেই আগুনের মাঝেই অদ্ভুত এক অস্থিরতা। আচ্ছা মেয়েটি এত চুপ কেন?
কেন একবারও বলে না “আমায় ছেড়ে দিন”?
সিমুর্গের গতি কিছুটা কমতেই ঘোড়ার গাড়ি আর বাইজিদ পাশাপাশি হলো। হাওয়া বইতেই ওড়নার প্রান্ত উড়ে গিয়ে তার হাতের পিঠ ছুঁয়ে যায়। বাইজিদ অনিচ্ছায় অনুভব করে সেই হালকা স্পর্শ। যেন রোদ্দুরের ভেতরেও ঠাণ্ডা স্রোত।
সে তৎক্ষণাৎ হাত সরিয়ে নেয়। নিজের ওপর বিরক্ত হয়।
লাগাম টেনে ঘোড়া আরো দ্রুত ছোটায়।
সাহাবাদ প্রাসাদ দেখা যায় দূরে। বিশাল ফটক, প্রহরীদের দাঁড়িয়ে থাকা ছায়া। দুপুরের এত রোদও যেন গিলে নিচ্ছে প্রাসাদ টা। ভিতরে শুধুই অন্ধকার।
ফটক খুলতেই ভারী শব্দ ওঠে। অন্দরমহলের দাসীরা দূর থেকে তাকিয়ে থাকে। কানে কানে ফিসফাস।
বাইজিদ প্রথমে অশ্ব থেকে নামে। তার ছায়া পড়ে পাথরের সিঁড়িতে। ভিতরে ঢুকতে গিয়েও আবার থামে। প্রভাকে কয়েকজন নারী দাসীরা ধরে নামায়। মেহেরুন্নেসাও সাহায্য করে। সিড়ি উঠার সময় মেহেরুন্নেসা একটু টলে যায়। এত রোদে এসে বোধহয় মাথাটা ঘুরছে। রক্ষীরা এগিয়ে আসতে চাইলেও বাইজিদ ইশারায় থামায়। সে জড়তা নিয়ে নিজেই তার কনুই ধরে স্থির করে দেয়।
স্পর্শটা ছিল মাত্র এক মুহূর্তের। তবু বুকের ভেতর কেমন যেন টান লাগে। এখনও যার মুখটাও দেখেনি। ঘোমটা এত নিচু যে চোখও বোঝা যায় না। বাইজিদ বোঝার চেষ্টাও করে না। শুধু অনুভব করে মেয়েটির নিঃশ্বাস দ্রুত, কিন্তু কান্না নেই।
এই নীরব সাহসটাই তাকে অস্বস্তিতে ফেলে।
প্রাসাদের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হয় তাকে। দাসীরা মাথা নিচু করে পথ ছাড়ে। চারদিকে চাপা উত্তেজনা।
বাইজিদ সিঁড়ির পাদদেশে এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে থাকে। সূর্যের আলো পেছন থেকে এসে তার সবুজাভ চোখে তীব্র ঝিলিক ফেলে। বাইজিদ মনকে স্থির করে এ সিদ্ধান্ত কেবল তার প্রতিশোধের অংশ।
তবু বুকের ভেতর যে অকারণ ঝড় উঠেছে, তার ব্যাখ্যা সে নিজেও দিতে পারে না।
মুখ না দেখেই, চোখে চোখ না মিলিয়েই,
এক আবৃত মুখ তার স্থির পৃথিবীতে অদ্ভুত অস্থিরতা ছড়িয়ে দিয়েছে।
দুজন বয়স্ক মহিলা বৈদ্য রত্নপ্রভা কে ঘরে নিয়ে গেলো। মেহেরুন্নেসাও গেলো সাথে। প্রাসাদে তখন হৈচৈ পড়ে গেছে এক প্রকার। বাকের শাহ্ মেয়ের খবর পেয়ে দৌড়ে ছুটে এলেন নিজ কক্ষ থেকে। বাইজিদ একবারও ওনাকে জানায়নি কোথায় যাচ্ছে। বৈদ্যরা এখন কাওকে যেতে নিষেধ করেছেন। মারজান বেগম রত্নপ্রভা কে দেখে নিজের মেয়ের অবস্থা কি হবে সেটা ভেবে কেঁদে অস্থির হচ্ছে। সিমরান ধীর পায়ে এগিয়ে এলো বাইজিদ এর কাছে। নরম গলায় বলল
“আপা ঠিক হয়ে যাবে। চিন্তা করবেন না”
বাইজিদ কোনো প্রতুত্তর করলো না। সিমরান ফের বলল
“গোসল করে পরিষ্কার হয়ে নিন। সকাল থেকে অভুক্ত আপনি। কিচ্ছু মুখে দেন নি। আমি খাবার আপনার কক্ষেই পাঠাচ্ছি”
বাইজিদ তাও কোনো জবাব দিলো না। বড় বড় পা ফেলে চলে গেলো নিজের ঘরে। সিমরান মুচকি হেসে বাইজিদ এর জন্য খাবার তৈরি করতে গেলো। বাকের শাহ্ মেয়ের কাছে বসেছেন। এতকালের মান-অভিমান সব মূর্ছা গেছে মেয়েকে এমন বিধ্বস্ত দেখে। মারজান আর সুনেহেরাও প্রভার কাছে বসে আছে। মারজান অনবরত কেঁদেই চলেছে। সুনেহেরার ভিতরটা দাউ দাউ করে জ্বলছে, মনে হচ্ছে প্রভার স্বামীর গোটা পরিবার টার গর্দান নিলে শান্তি হতো”
সিমরান ট্রে তে কয়েক পদের খাবার খাবার সাজিয়েছে বাইজিদ এর জন্য। তখনই কয়েকজন পরিচ্ছন্ন করা দাসীদের থেকে শুনলো
“আমি তো চিনলাম না। মনে হয় জমিদার বেটির শশুড় বাড়ির কেউ হবে”
“আরে কি কস। ওই বাড়ির কাওরে না শাহজাদা বাচাই রাখছে হুহহহ। আর তারে মহলে লইয়া আইতো কস?”
সিমরান ওদের জিজ্ঞেস করলো
“কার কথা বলছো তোমরা?”
ওরা একে অপরের দিক মুখচাওয়া চাওয়ি করে বলল
“জ্বী আপা, জমিদার পুত্র আর তার বোনের সাথে অন্য একজন নারীও এসেছে প্রাসাদে। তাকে ঠিক চিনি না। সর্বাঙ্গ এমন ভাবে ঢাকা যেনো বেঝার ই উপায় নেই সে কমবয়সী না বৃদ্ধা”
সিমরান এর কপালে সূক্ষ্ম ভাজ পড়লো।
গোসল শেষে বাইজিদ যখন নিজের কক্ষের দরজা খুলে বের হলো, তখনও তার চুলের ডগা থেকে টপটপ করে জল ঝরছে। ভেজা চুলগুলো কপালের ওপর হালকা নুয়ে পড়েছে। যেনো বৃষ্টিভেজা শালিকের ডানা। সাদা পাতলা পাঞ্জাবিটা তার প্রশস্ত বুক আর বলিষ্ঠ কাঁধে এমনভাবে লেপ্টে আছে, মনে হচ্ছে কাপড়টাও তার দেহ রেখার কাছে হার মানতে বাধ্য।
ধীর পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামছে। প্রতিটি ধাপে তার উপস্থিতি যেন প্রাসাদের নিস্তব্ধতাকে আরও গম্ভীর করে তুলছে। সূর্যের আলো জানালা পেরিয়ে এসে তার ভেজা চুলে আটকে আছে, জলকণাগুলো হালকা ঝিলমিল করছে। তীক্ষ্ণ চোয়াল, সোজা নাক, আর সেই সবুজাভ গভীর চোখ। যেনো কারও দিকে তাকালেই ভেতরটা পড়ে ফেলতে পারে।
বৈঠক খানার খাবার টেবিলের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল সিমরান। প্রথমে সে কেবল পায়ের শব্দ শুনেছিল। তারপর চোখ তুলে তাকাতেই তার বুকের ভেতর কেমন এক অদ্ভুত ঢেউ উঠল। এই মানুষটা কি সত্যিই মানুষ? নাকি কোনো কাব্যের নায়ক?
বাইজিদের ভেজা চুল থেকে ঝরে পড়া এক ফোঁটা জল গড়িয়ে তার গলার কাছে নেমে এল।
কন্ঠনালীর উঁচু অংশের উঠা নামা দেখে সিমরান মৃদু ঢোক গিলল। রক্তিম ঠোঁট জোড়াও ভেজা লাগছে। সিমরানের গাল হঠাৎই রাঙা হয়ে উঠল। সে তড়িঘড়ি চোখ নামিয়ে নিল, অথচ নির্লজ্জ মন মানল না, আবারও চোরা দৃষ্টিতে তাকাল।
বাইজিদ যত এগিয়ে আসছে, সিমরান যেন স্থির রাখতে পারছে না নিজেকে। বাইজিদ কে আসতে দেখে পরিচ্ছন্ন করতে থাকা দাসীরা দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো। বাইজিদ রাজকীয় চেয়ার টা টেনে বসতে বসতে বলল
“কিছু বলবেন?”
সিমরানের কণ্ঠ শুকিয়ে এলো। মাথা নত করে ফেলল। বাইজিদ বোধহয় তার বেহায়া দৃষ্টি ধরে ফেলেছে। কি লজ্জার ব্যাপার। কিন্তু ভ্রু গুটিয়ে সিমরান মনে মনে বলতে লাগলো।
“ বাহ রে, নিজে আকর্ষণীয় হয়ে ঘুরে বেড়াবেন। আর আমার বেহায়া চোখ নজর দিলেই দোষ?”
গলা খাকারি দিয়ে বলল
“না কিছু না। কোনটা আগে দিব?”
বাইজিদ থালা উল্টে হাত ধুয়ে নিলো। নিজেই খাবার বেড়ে নিলো থালায়। সিমরান জোর করেই এটা ওটা পাতে তুলে দিচ্ছে।
বাইজিদ খাবারের থালায় দৃষ্টি রেখেই বলল
“আমি নিয়ে নিব কিছু লাগলে। আপনার কষ্ট করে দাঁড়িয়ে থাকতে হবে না”
সিমরান তবুও দাড়িয়ে রইলো। দিনে দুই থেকে একবার ই এই মহান পুরুষের দেখা পায় সে। তাতে মন ভরে না। চাতকের ন্যায় সারাদিন চেয়ে থাকে অন্দরের প্রবেশ পথে। এখন খাবার দেওয়ার অযুহাতে হলেও তার পাশে কিছুক্ষণ দাড়িয়ে থাকার সুযোগ পাচ্ছে। এটা কোনো ভাবেই হাত ছাড়া করা যায় নাকি।
বাইজিদ খাবার খাচ্ছে, আর সিমরান পাশে দাড়িয়ে বাইজিদকে চোখ দিয়ে গিলছে।
বুকের ভেতর তখনও কাঁপন লেগে আছে। যেনো ভেজা চুলে সাদা পোশাকে নেমে আসা সেই দৃশ্য তার হৃদয়ের কোথাও স্থায়ী হয়ে গেল। বাইজিদ খাবার খেতে পারলো না। কয়েকবার মুখে দিয়েই হাত ধুয়ে নিলো। সিমরান পাশে থাকা নরম ছোট তোয়ালে টা আলগোছে টেনে নিয়ে টেবিলের তলায় ছুড়ে দিলো।
বাইজিদ হাত ধুয়েই দেখলো তোয়ালে টা নেই পাশে। উঠে দাড়াতেই সিমরান নিজের ওড়নার এক প্রান্ত এগিয়ে দিলো বাইজিদ এর দিকে।
“এটায় হাত মুছে নিন”
কোনো পরনারীর আচল ধরতেই বাইজিদ এর অস্বস্তি হচ্ছিলো। কিন্তু সিমরান হয়ে উঠলো আরেকটু নির্লজ্জ। বাইজিদ এর ভেজা হাতে গুজে দিলো নিজের আচল খানা। উপায় না পেয়ে বাইজিদ অল্প মুছেই দ্রুত ছেড়ে দিলো আচল।
বৈঠকখানার ভারী ঝাড়বাতির নিচে তখন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতায় মুড়ে গেলো সিমরান। এটুকুতেই এত সুখ অনুভূত হচ্ছে।
তখনই প্রভার ঘর থেকে বেরিয়ে এলেন বাকের শাহ্। তাঁর চেহারায় অস্বস্তির ছাপ স্পষ্ট। তাঁর এক ধাপ পেছনে, নির্দিষ্ট দূরত্ব বজায় রেখে, মাথা নিচু করে পিছু পিছু আসছিল মেয়েটি। ওড়নায় সম্পূর্ণ আবৃত, এমনভাবে জড়ানো যে তার শরীরের কোনো অংশ আলাদা করে চোখে পড়ে না। মাথা নত, পা ফেলছে নিঃশব্দে। যেনো নিজের উপস্থিতিকেও আড়াল করতে চাইছে। বৈঠকখানার মাঝখানে এসে বাকের শাহ্ থামলেন। তাঁর দৃষ্টি গিয়ে থামল মেয়েটির ওপর, তারপর সরাসরি ছেলের দিকে তাকিয়ে বলল
“ বাইজিদ, এই মেয়েটা কে?”
বাইজিদ আর সিমরান দুজনেই তাকালো মেহেরুন্নেসার দিকে। অচেনা লোক সম্মুখে মেহের এর ইচ্ছা করছে মাটির সাথে মিশে যেতে। সুনেহেরা আর মারজান ও এসে দাড়ালো সেখানে।
বাইজিদ প্রথমে কোনো উত্তর দিল না। তার চোখ ধীরে গিয়ে স্থির হলো মেয়েটির ওপর। সেই নত মুখ, শব্দহীন দাঁড়িয়ে থাকা নারীটি যেনো এক মুহূর্তের জন্য তাকে স্তব্ধ করে দিল। চারপাশের সব শব্দ যেনো দূরে সরে গেল। সে যেনো অল্পক্ষণের জন্য ঘোরে ঢুকে গেল।
বাকের শাহ্ আবার ডাকলেন, এবার কণ্ঠে তীক্ষ্ণতা
“আমি তোমাকে বলছি। কে এই মেয়েটা?”
বাইজিদ ধীরে দৃষ্টি সরালো। তার সবুজাভ গভীর চোখে এবার ঝড়ের রেখা। বাবার দিকে তাকিয়ে স্পষ্ট স্বরে বলল
“ও সেই পরিবারের সদস্য… যে পরিবার আমার বোনকে মরণ যন্ত্রণা দিয়েছে।”
সবাই চকিতে তাকালো মেহের এর দিকে। বাইজিদ একটু থেমে গলা আরও ভারী করে বলল।
“ওকে ও সেই যন্ত্রণা ভোগ করতে এনেছি।”
কথাগুলো বৈঠকখানার দেয়ালে প্রতিধ্বনির মতো লাগল। মেহের মাথা আরও নিচু করল। তবু তার স্থির দাঁড়িয়ে থাকা যেনো অন্য কিছু বলছে। বাইজিদের চোখ এক মুহূর্তের জন্য আবার তার দিকে ফিরল। তার দৃষ্টি কঠিন থাকার কথা, কিন্তু কোথাও যেনো এক অদ্ভুত দ্বিধা লুকিয়ে রইল। কিন্তু তার চোখ নিজেই তাকে প্রশ্ন করছে এই নীরব অবয়ব কি সত্যিই অপরাধের ভার বইছে?
সিমরান একদৃষ্টে দেখছে মেহেরকে। আগাগোড়া পরখ করল মেয়েটিকে। নত মাথা, স্থিরতা, কোনো প্রতিবাদের শব্দ নেই,তবু আত্মসম্মানের এক অদৃশ্য রেখা স্পষ্ট। বয়স কিংবা গায়ের রং কিচ্ছু বুঝবার উপায় নেই।
“এমন মানুষদের জায়গা এই প্রাসাদে হতে পারে না!”
বাকের শাহ্ দেওয়ালে ঝুলানো তরবারি কোষ থেকে এক খানা তলোয়ার ছুটিয়ে এনে ক্ষিপ্র গতিতে মেহেরুন্নেসার দিকে বাড়ালো।
“ওকে এখনো তুমি বাচিয়ে রেখেছো?”
সে এক পা এগোতেই বাইজিদ দ্রুত সামনে এসে দাঁড়াল। তার উপস্থিতিই দেয়াল হয়ে গেল মেয়েটির সামনে।
“আর এক পা ও নয়, সাবধান আব্বাজান”
কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভেতরে অস্বীকারহীন কর্তৃত্ব।
“ও এখানে আমার সিদ্ধান্তে এসেছে। আমার অনুমতি ছাড়া ওর দিকে কেউ হাত বাড়াবে না।”
বাকের শাহ্ স্থির চোখে সব দেখলেন। তাঁর মুখে চিন্তার ছায়া। বৈঠকখানার বাতাস ভারী হয়ে উঠল। প্রতিশোধের ঘোষণার আড়ালে এক অদৃশ্য টানও যেনো জন্ম নিচ্ছে।
বাকের শাহ্ থামলো। বাইজিদ কয়েকজন দাসী কে ডেকে বলল
“ওকে অন্দরের শেষ প্রান্তের ঘরটায় রাখার ব্যাবস্থা করো। কোনে রক্ষী যেনো আজ থেকে সেদিকে পা না বাড়ায়। আর কিছু কাপড় জামা ব্যাবস্থা করে দাও ওর ঘরে। দাসীদের সাথে মেহেরুন্নেসা বাইজিদের পাশ কাটিয়ে নিঃশব্দে হেটে যায়। এখন এদের কথা শুনতেই হবে। প্রভার জ্ঞান ফিরলেই প্রভা এদের বোঝাতে পারবে মেহের নির্দোষ। তার আগ পর্যন্ত কিছুই করার নেই মেহেরুন্নেসার।
সিমরান একটু সন্দিহান দৃষ্টিতে তাকালো বাইজিদ এর দিকে। মেহেরুন্নেসার ঘরটা এত সুরক্ষিত আর ভিতরে রাখার কারণ কি? মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে যাওয়ার পর সবাই যে যার ঘরে চলে গেলো। বাকের শাহ্ অতো মাথা ঘামালেন না। ছেলের ওপর তার সম্পূর্ণ ভরসা আছে। সবাই স্থান ত্যাগ করলে বাইজিদ ও যেতে নিলো। সিমরান ডাকলো
“শুনছেন?”
বাউজিদ থামলো তবে তাকালো না। সিমরান একটু এগিয়ে গিয়ে বলল
“সে একা একা কি করবে বুঝবে না। আমি গিয়ে ঘরে সব গুছিয়ে দিয়ে আসবো?”
সিমরান এর মূল উদ্দেশ্য হলো মেহের কে দেখা। বাইরে মুখ না খুললেও, ঘরে কোনো নারীর সামনে নিশ্চয়ই না করবে না। কিন্তু বাইজিদ স্পষ্ট করে বলল
“তাকে এখানে কোনো আতিথিয়তা দেখাতে আনা হয় নি। একা একা যা পারে তাই করবে। পুরুষ তো দূর, কোনো নারীও যেনো ওই কক্ষের দিকে এক পা ও না বাড়ায়।”
বাইজিদ এর কথায় আকাশ থেকে পড়লো সিমরান। ঘরবন্দী করে রাখা আবার কেমন প্রতিশোধ। বাইজিদ চলে গেলো, সিমরান পড়ে গেলো ভাবনায়। বাইজিদ নিজের ঘরে যেতেই একজন রক্ষী এলো ছুটে।
“সাহেব, বানিজ্যিক জাহাজ এসে ভিড়েছে নদীর পাড়ে।”
বাইজিদ ফের সেই চারকোণা বড় কাপড় টা দিয়ে মুখ মাথা মুড়িয়ে নিলো। উন্মুক্ত শুধু তার সবুজাভ চোখ জোড়া। ব্রিটিশ দের থেকে আনা কিছু অত্যাধুনিক কামান সাথে নিয়ে সাথে অশ্ববহর নিয়ে যাবে নদীর পাড়ে। প্রাসাদটি পাহাড় এর গা ঘেষে নির্মিত। দক্ষিণ পাশেই নদী। বিভিন্ন রাজ্যের সাথে তাঁরা ব্যাবসা করে থাকে। সেখান কারই এক বানিজ্য জাহাজ আসছে। বাইজিদ মহল ছেড়ে বের হতেই এক সৈনিক ঘোড়ায় চেপে এসে ধপাস করে পড়ে গেলো প্রাসাদের ভিতরে এসেই। বুকে তীর বিদ্ধ। পড়ে গিয়েই কাতরাতে লাগলো
“ছোট, জমিদার। যাবেন না। ওরা…..ওরা
আর কিছু বলার আগেই শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করলো সে। বাইজিদ এর পান্নার ন্যায় চোখ জোড়া জ্বলে উঠলো। সৈনিক দের সে বড় ভালোবাসে। প্রাসাদের প্রত্যেক টা সৈনিক কে সে পরিবার মনে করে। দৌড়ে দিয়ে মৃত রক্ষীর পাশে হাঁটু মুড়ে বসে
“তাহান? এই তাহান। তাহান কথা বলো। শুনছো? তাহান শুন…….
বাইজিদ বুঝতে পারলো সে আর শুনবে। অদূরে সেই জাহাজের শব্দ চোনা যায়। কয়েকজন ছুএে গিয়ে আবার ফিরে আসে
“সাহেব, জাহাজ টি ফিরে যাচ্ছে”
সময় বিকাল গড়াচ্ছে। সামনেই সন্ধ্যা। সেই অন্ধকার সময় ঘনিয়ে আসছে। ফিরতে পারবে না তারা সময় মতো। না হলে তাদের জলপথে যে সৈনিক আছে জাহাজ টা জব্দ করা যেত। বাইজিদ হাত মুঠো করে চোখ বন্ধ করে রাগ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে। আর কতকাল এই রক্তপিপাসু রা তাদের দুর্বলতা হবে? কবে এই কালো অধ্যায় থেকে সাহাবাদ মুক্তি পাবে? দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে জোরে করে ডাকলো
“মাহাদি, মাহাদি! ওর দাফনের ব্যাবস্থা করো”
দ্রুত ছুটে আসলো লোহার বর্মে আবৃত এক সৈনিক। রক্ষীদের প্রধান। বাইজিদ এর সবচেয়ে বিশ্বস্ত লোক। মাহাদি আসলে বাইজিদ ভিতরে চলে গেলো। সব কেমন পাগল পাগল লাগছে। যেখানে জমিদার দের কাছে চাকর বাকর দের মৃত্যু অতি সাধারণ বিষয়। সেখানে কোনো সৈনিকের মৃত্যু হলে সব চেয়ে বেশি আধার নেমে আসে জমিদার পুত্রের ওই সুদর্শন মুখ খানায়।
নিজ কক্ষে গিয়ে গিয়ে পালঙ্কের ওপর ধপাস করে শুয়ে পড়লো বাইজিদ। সন্ধ্যা হয়ে আসছে। বিকট শব্দে ভারি লোহার দরজা গুলো বন্ধ করা হচ্ছে নিচে। প্রবেশদ্বারের পর থেকে দেওয়ালের সারি সারি মশাল গুলোও নিভিয়ে দেওয়া হলো। বাইজিদ চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে পালঙ্কে। দরজার সামনক ঝনাৎ করে কিছু পড়ার শব্দ হলো। বাইজিদ ধড়ফড়িয়ে উঠে বসলো। কোনো বহিরাগত কি অন্দরে প্রবেশ করেছে? তলোয়ার টা নিয়ে সতর্ক হয়ে দরজার সামনে গেলো বাইজিদ। হাতে একটা ছোট মশাল। ঘর থেকে বের হতেই দেখা গেলো কারো অবয়ব। ভিতরের দিকে যাচ্ছে, বাইজিদ ও তার পিছু নিলো। অবয়বটা সেদিকেই যাচ্ছে, যে ঘরে মেহেরুন্নেসা আছে।
ঘরের সামনে তলোয়ার বাড়িয়ে এগিয়ে যেতেই চিৎকার শুনলো এক নারী কন্ঠের। তলোয়ার ফেলে তৎক্ষনাৎ গিয়ে চেপে ধরলো তার মুখ। আরেক হাতে মশাল নিয়ে ঘরের সামনে টেনে আনলো তাকে। মশাল এর হলুদ আলোয় তার ডাগর ডাগর চোখ জোড়া মুক্তোর মতো চকচক করছে। মেহের আতঙ্কিত হয়ে তাকালো বাইজিদ এর দিকে। সবুজাভ চোখ জোড়া এক দৃষ্টিতে দেখছে তাকে। কি এক অদ্ভুত মুগ্ধতা দুই চোখে। মেহের হাসফাস করে উঠলো। বাইজিদ দ্রুত মেহেরুন্নেসার মুখ ছেড়ে দিয়ে সরে দাড়ালো।
“এই রাত বিরেতে একা একা বেড়িয়েছেন কোন সাহসে? তাও আবার এই অচেনা প্রাসাদে।”
চলবে?
কেমন লাগলো অবশ্যই বলবেন হুমম। আর অবশ্যই ২k রিয়্যাক্ট পূরণ করবেন কিন্তু।
পরবর্তী পর্ব পেতে পেইজে ফলো করে রাখুন। যাতে পোস্ট করার সাথে সাথে আপনার ফিডে চলে যায়।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৬