নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ৩
নিজ কক্ষের ভাড়ি দরজা খানা চাপিয়ে দিয়ে ভিতরে রয়েছে বাইজিদ। উঁচু ছাদের নিচে ঝুলে থাকা পিতলের ঝাড়বাতি থেকে নরম আলো পড়ছে পালিশ করা মেঝেতে। দেয়ালের গা ঘেঁষে সারি সারি পুরোনো কাঠের আলমারি, তার ভেতর দলিল-দস্তাবেজ, জমিজমার খতিয়ান, পূর্বপুরুষদের সিলমোহর।
বাইজিদ বিশাল টেবিলের সামনে বসে আছে। তার প্রশস্ত কাঁধে শুভ্র পাঞ্জাবি, হাতা গুটানো। তীক্ষ্ণ চোয়াল, সুঠাম দেহ, আর সেই অদ্ভুত সবুজাভ চোখ। যেন গভীর বনের ছায়া জমে আছে দৃষ্টিতে। এক হাতে কলম, অন্য হাতে একটি চিঠি। চিঠির ভাঁজে আঙুল স্থির হয়ে আছে একটি নামের ওপর –
“মেহেরুন্নেসা।”
কেনো এমন মনে হচ্ছে নামটি কাগজে লেখা নয়, তার বুকের ভেতর খোদাই হয়ে আছে। সে বারবার পড়ছে, অথচ পড়া শেষ হচ্ছে না। ঠোঁটের কোণে অজান্তেই এক টুকরো নরমতা এসে ভিড় করছে।
এমন সময় কক্ষের দরজায় হালকা কড়া নাড়ার শব্দ।
“ভিতরে আসা যাবে?”
নরম, মার্জিত কণ্ঠ।
বাইজিদ চোখ না তুলেই বলল,
“আসুন।”
দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করল সিমরান। জমিদারের ঘনিষ্ঠ বন্ধুর মেয়ে। বন্ধু যখন মারা যায়, তখন মেয়েটি ছিলো ১১ বছরের। বাকের শাহ্ এর হাতে দিয়ে গেছিলো তার দেখভাল। গোটা পরিবার ডাকাতির শিকার হয়ে মারা যায় সিমরানের। দুদিন চিকিৎসা রত থেকে মারা যায় তার বাবাও। তারপর থেকেই সে এখানে থাকছে। বয়স ২১ বছর। মেয়েটা খুব পরিপাটি, কালো হিজাব পরা, শুধু উজ্জ্বল মুখখানি উন্মুক্ত। তার চোখে একধরনের স্থির কোমলতা, যেন সে অনেকদিন ধরেই এই কক্ষে আসার অজুহাত খুঁজছিল।
হাতে একটা খালি ট্রে।
“খাবার তৈরি । চাচাজান বলেছেন আপনাকে ডেকে নিতে।”
বাইজিদ এবার চোখ তুলল। সবুজ দৃষ্টি এক মুহূর্তের জন্য সিমরানের মুখে এসে থামল। সে ভদ্র, সংযত ভাবে বলল
“বাবা কে বলুন শুরু করতে । আমি একটু পরেই আসছি।”
কিন্তু সিমরান ট্রে নামিয়ে রেখে দাঁড়িয়ে রইল। তার দৃষ্টি ধীরে ধীরে বাইজিদের ওপর বয়ে গেল প্রশস্ত কাঁধ, শক্ত বাহু, গভীর চোখ। সেই দৃষ্টিতে ছিল অকপট মুগ্ধতা, অব্যক্ত অনুভূতি যেন সে আপাদমস্তক পরখ করে নিচ্ছে মানুষটিকে, নিজের স্বপ্নের সঙ্গে মিলিয়ে দেখছে।
“আপনি খুব ব্যস্ত?”
সে আস্তে জিজ্ঞেস করল।
বাইজিদ হালকা ভ্রু কুঁচকালো, তবে কণ্ঠ রুক্ষ নয়
“হ্যাঁ। কিছু হিসাব মিলাতে হবে।”
আঙুল আবার চিঠির ভাঁজে ফিরে গেল। মেহেরুন্নেসা নামটি যেন তাকে টেনে নিচ্ছে অদৃশ্য কোথাও। চিঠিটা না খুলে ওপরের এক নামেই আটকে আছে তার ভ্রম।
সিমরান সেটা লক্ষ করল। চিঠির দিকে একঝলক তাকালেও কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না।
পাশে থাকা পানির পাত্রটা নিতে গেলে খেয়াল করলো চিঠিটা খুব মনোযোগ এর সহিত দেখছে বাইজিদ। পাশে থাকা প্রদীপ টার হলদে আলোয়া স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে মেহেরুন্নেসা নাম টা। সিমরান এর ভ্রু যুগল কুঞ্চিত হয়। কোনো নারী তাকে চিঠি পাঠিয়েছে? জমিদারদের কাছে বহু চিঠি ক্রমাগত আসতে থাকে, তবে কখনো নারী দের কোনো চিঠি আসতে দেখেনি সিমরান। তাও আবার বাইজিদ এত মনোযোগ দিয়ে দেখছে? বাইজিদ সিমরান এর উপস্থিতি তে অস্বস্তি অনুভব করছে। যতই হোক একা এক কক্ষে প্রাপ্তবয়স্ক নারী, পুরুষ অবস্থান করা ঠিক না।
“আপনি আর কিছু বলবেন?”
সিমরান এর বুকের ভেতরটা অকারণ ভারী হয়ে উঠল। এত কাছে দাঁড়িয়ে থেকেও মানুষটা যেন বহু দূরে।
“তাহলে… আমি চলি,”
সে মৃদু হাসল, কিন্তু সেই হাসিতে কষ্টের সূক্ষ্ম রেখা। বাইজিদ মাথা নেড়ে আবার চিঠির দিকে ঝুঁকল। তার কাছে এই মুহূর্তে কক্ষের নীরবতা, দলিলের হিসাব, কিংবা সিমরানের নরম উপস্থিতি কিছুই নয়। তার সমস্ত মনোযোগ আটকে আছে চিঠিতে। অতু সাবধানে খামের মোড়ক খুলল। যেন ভিতরে থাকা পত্রের ক্ষতি না হয়।
প্রথম দুই লাইন পড়েই তার দরদর করে ঘাম হতে লাগলো। দুইটা বছর পেরিয়ে গেছে রত্নপ্রভা চলে গেছে। এই মৃত্যুপুরী থেকে বেশ তো পালিয়েছিল। কিন্তু ওই বাড়িতেও সে অত্যাচারিত?
অস্ফুট স্বরে আওড়ালো
“রত্না”
ইচ্ছে করছে এক্ষুনি ছুটে যেতে। কিন্তু সন্ধ্যার পর মহলের বাইরে পা দেওয়া নিশ্চিত মৃত্যু। শক্ত কাঠের টেবিলটায় মুষ্টিবদ্ধ হাতটা ঠুকে দিলো রাগে। কিন্তু মেহেরুন্নেসা কে? এই মেয়েটা কেনো চিঠি লিখেছে?
সবুজ চোখ দুটো হঠাৎ গভীর হয়ে উঠল। যেন দূর আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে, অথচ দেখছে কেবল এক অদেখা মুখ।
সিমরান নিঃশব্দে কক্ষ ত্যাগ করল। পেছনে রয়ে গেল ঝাড়বাতির নরম আলো আর এক সুদর্শন পুরুষ। যার হৃদয় ইতিমধ্যেই বন্দী হয়ে গেছে এমন এক নামের কাছে, যে নাম এখনও এই প্রাসাদের চৌকাঠ পেরোয়নি। এমনই ভুলভাল চিন্তা ঘুরছে সিমরান এর মাথায়।
কক্ষের দরজা টেনে বাইরে বেরিয়েই সিমরান থমকে দাঁড়াল। করিডোর জুড়ে লম্বা জানালা দিয়ে পড়া বিকেলের আলো তার হিজাবের প্রান্ত ছুঁয়ে মেঝেতে ছায়া ফেলেছে। হাতে ধরা খালি ট্রেটা হঠাৎ খুব ভারী মনে হলো।
ভেতরে, নিশ্চয়ই আবার চিঠিটার দিকেই ঝুঁকে পড়েছেন তিনি।
সিমরান ধীরে ধীরে হাঁটতে লাগল। তার পায়ের শব্দ প্রায় শোনা যায় না, তবু নিজের বুকের ধুকপুকানি যেন প্রাসাদের দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুলছে। সে জানে বাইজিদ ভদ্র, সংযত, দায়িত্ববান। কারও প্রতি অযথা কঠোর নন। কিন্তু ভালোবাসা? সে ভালোবাসা তো কারও দিকে ছুড়ে দেওয়া দয়া নয়। চোখের পাতা ভিজে ওঠে তার ভাবনার দরুন।
বড় খাবার টেবিলটা জুড়ে সাজানো ফলমূল, মাছ-মাংস, আর সুস্বাদু খাবারে। সামনের চেয়ার টায় বসে বাকের শাহ্ ছেলের অপেক্ষা করছে। পাশেই বড় ঘোমটা টেনে দাঁড়িয়ে আছে তার দ্বিতীয় স্ত্রী মারজান বেগম। অপরপ্রান্তের চেয়ারে বসে ঝিমাচ্ছে জমিদার এর ছোট মেয়ে সুনেহেরা। সিমরান মুখ ভার করে উপস্থিত হলো সেখানে। মারজান বেগম বললেন
“কি হলো সিমরান? আসবে না ও?”
সিমরান ট্রে টা টেবিলে রেখে বলল
“বললেন খাওয়া শুরু করতে। উনি একটু পর আসবেন। ব্যাস্ত আছে”
এ রোজকার কথা। বাইজিদ কখনোই মারজান আর বাকের শাহ্ একসাথে থাকলে সেখানে আসেন না। সৎ মায়ের প্রতি এই মনঃক্ষুণ্ণতা তার আজও কাটেনি। যেদিন মারজান এই বাড়িতে আসলো তখন বাইজিদ এর বয়স ১২ আর প্রভার ৭ বছর। সাথে নিয়ে এসেছিলো তিলোত্তমা কে। তিলোত্তমার ও ছিলো ৭ বছর। সেইদিন ই ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলো বাইজিদ, আজও তা কাটেনি। মারজান বহুবার বাইজিদ এর সাথে কথা বলার, মেশার চেষ্টা করেছে। প্রত্যেকবারই এড়িয়ে চলেছে। তিলোত্তমা ছিলো বাইজিদ এর আরো বড় ঘৃণা। তার আগমনের পর থেকেই প্রভা প্রতিনিয়ত অবহেলিত হয়েছে। সমবয়সী হওয়ায় প্রভার সব জিনিসে ভাগ বসানে তার রোজকার রুটিন হয়ে উঠেছিলো।
একমাত্র সুনেহেরার সাথে কথা বলে বাইজিদ। তার কাছে মনে হয় এটা ওদের ই রক্ত। আর সুনেহেরার চোখে সে প্রভার জন্য যে ভালোবাসা দেখতে পায়, সেটাই ওকে ভালোবাসার একমাত্র কারণ। সুনেহেরা দেখতে হুবহু পুতুলের মতো। চুলগুলো সোনালি রঙের। জমিদার বাড়ির অন্য নারী দের মত কখনোই অত পর্দা করে না। অত লজ্জাশীলাও না। তার ইচ্ছা করে ঘোড়া ছুটাতে, তলোয়ার চালাতে, তীর ছোড়া শিখতে আর সাতার তার সবচেয়ে প্রিয়। ঘর বন্দি হয়ে থাকতে তার ভালো লাগে না।
সিমরান এর মলিন মুখ দেখে মারজান বললেন
“কিছু হয়েছে সিমরান? তোমায় এত উদাস দেখাচ্ছে কেনো? বাইজিদ কিছু বলেছে?”
“না চাচি আম্মা। ওনার কাছে কোনো এক চিঠি এসেছে। সেটা নিয়েই বোধহয় খুব চিন্তিত আছেন।”
বাকের শাহ্ খাওয়া ছেড়ে উঠে দাড়ালেন
“কি বলছো? চিঠি নিয়ে চিন্তিত? কোনো বিপদ সংকেত নাকি”
মারজান ফের তাকে বসালো
“তেমন কিছু হলে ও আপনাকে বলতো। আগে খেয়ে নিন”
রাত্রির শেষ প্রহর ও বিদায় নিচ্ছে। সূর্য উদয়ের পূর্ব মূহুর্ত আসন্ন। বাইজিদ উত্তরে বিশাল বারান্দায় দাড়িয়ে ঝড়না দেখছে। যদিও মন তার ঝর্ণার সৌন্দর্যে নেই। প্রভার চিন্তায় ঘুম হয়নি সারারাত। মাঝরাতে সিমরান এসে কক্ষেই খাবার দিয়ে গেছে। সেটাও ওইভাবেই পড়ে রয়েছে। খায়নি এক দানাও। পাহাড় ঘেষে গড়ে ওঠা এই বিশাল জমিদার প্রাসাদের উত্তরে আরেকটি ছোট দুর্গ রয়েছে। কিন্তু সেখানে কি করা হয় বা কারা থাকে তা সকলের অজানা। জমিদার বাড়ির কয়েকজন পুরুষ ব্যাতিত কেউ জানে না। সামনে জমিদার মহল থাকায় বাইরের মানুষ বুঝতেও পারে না পিছনে আরেকটি দুর্গ রয়েছে।
বাইজিদ শাহ দাঁড়িয়ে রইলেন বারান্দার প্রান্তে। তার পান্না-দীপ্ত নয়ন দুটি যেনো আচমকা কঠিন পাথরে পরিণত হলো। সেই চোখে আর কোনো কোমলতা নেই, আছে কেবল জমিদারি রক্তের অগ্নি। কয়েকজন রক্ষী প্রাসাদের সুবিশাল প্রবেশদ্বার খুলে দিলো। বাইজিদ তার ব্যাক্তিগত তলোয়ার নিয়ে নিলো। মুখটা বাধলো কালো সাদার মিশ্রণে নকশা করা চারকোণা কাপড়ে।
বিশাল রাজকীয় সিড়ি দিয়ে নিচে আসতেই সামনে পড়লো সিমরান। বাইজিদ পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই সিমরান সালাম দিলো
“আসসালামু আলাইকুম”
“ওয়ালাইকুম আসসালাম”
বাইজিদ সালাম এর উত্তর দিলেও পা থামলো না।
তাই দেখে সিমরান দৌড়ে গিয়ে বাইজিদ এর সামনে দাড়ালো। বাইজিদ এর হাঁটার গতি রোধ করে অল্পের জন্য ধাক্কা খায় নি দুজন। ওর এমন ব্যাবহারে বাইজিদ এর রাগ হলো। কিন্তু নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করে বলল
“কি করছেন?”
সিমরান মাথা নিচু করে বলল
“কোথাও বের হচ্ছেন? আমি নাশতা প্রস্তুত করেছি, খেয়ে যান দয়া করে। রাতেও খাননি দেখলাম”
বাইজিদ চোখ ছোট করে বলল
“না ঘুমিয়ে আমার ঘরের আশেপাশে ঘুরঘুর করেন সারারাত?”
সিমরান লজ্জায় পরে গেলো ভীষণ। রাতে খাবার এর বিষয় টা না বললেও হতো। মিনমিনে গলায় বলল
“খেয়ে যান”
“রেখে দিন। এসে খাবো। আর এই কথা টা ডেকে বললেই তো হতো। এমন ভাবে সামনে এসে দাড়িয়েছেন, লেগে যেতে পারতো”
“আসলে আমার আম্মা বলতো কোথাও যাত্রা পথে পিছন থেকে ডাকতে নেই। তাই”
বাইজিদ আর কথা বাড়ালো না।
বেরিয়ে গেলো মহল ছেড়ে।
সিমরান তাকিয়ে রইলো যতদূর দেখা যায়। বয়সে এত ছোট হওয়া সত্ত্বেও বাইজিদ সবসময় তাকে আপনি আপনি বলে। মেয়েদের সম্মান করার এই বিষয়টা সিমরান এর বড় ভালো লাগে।
প্রাসাদের সামনে রক্ষীরা দাড়িয়ে।
বাইজিদ ধীরস্বরে বললেন,
“কতজন অশ্বারোহী প্রস্তুত?”
দেওয়ান কাঁপা গলায় উত্তর দিল,
“হুজুর, বারো জন অশ্বারোহী সৈন্য, সঙ্গে ছয়জন পদাতিক ও দু’জন বরকন্দাজ প্রস্তুত আছে।”
“যথেষ্ট নয়”
বাইজিদ শাহর কণ্ঠে বজ্রধ্বনি।
“বিশ জন অশ্বারোহী হবে। এই মূহুর্তে রওনা হবো।”
অল্পক্ষণের মধ্যেই জমিদারবাড়ির ফটকের সামনে সারিবদ্ধ হলো কুড়িটি ঘোড়া। তাদের শরীরে ঝনঝন করছে রূপার ঘণ্টা, পিঠে বসা বলিষ্ঠ সৈন্যরা তলোয়ারে হাত রেখে অপেক্ষমাণ। মশালের আগুন দপদপ করে জ্বলছে, যেনো প্রতিটি শিখায় জমে আছে ক্রোধ। এখনো আলো পুরোপুরি ফোটেনি।
বাইজিদ শাহ নিজে চড়লেন তার কালো সাদা
অশ্ব সিমুর্গ এর পিঠে। সাদা পশমের ওপর লাল মখমলের কাঁথা, কোমরে ঝোলানো খাঁড়া তলোয়ার। তার সবুজাভ নয়ন দুটি মৃদু অন্ধকারেও অদ্ভুত দীপ্তি ছড়াচ্ছে, যেনো শ্রাবণের অরণ্যে হঠাৎ জ্বলে ওঠা দুটি জোনাকি। কিন্তু সে আলো শান্ত নয় সে আলো সতর্কবার্তা।
অশ্বখুরের শব্দে কাঁপতে লাগল পথের ধুলো। কুড়িটি ঘোড়া, বিশ জন অশ্বারোহী, ছয় পদাতিক, দু’জন বরকন্দাজ, আর তাদের অগ্রভাগে বাইজিদ শাহ। তার দৃষ্টি সামনে স্থির, মুখ কঠিন, যেনো এক চলমান রণদেবতা।
সে রাতে আকাশে চাঁদ উঠেছিল বটে, কিন্তু পথ আলোকিত করছিল আসলে এক জমিদার পুত্রের ক্রুদ্ধ সবুজ নয়নের অগ্নি।
রাজ্যের শেষ প্রান্তে এসে আসতে আসতে আলো পরিষ্কার হলো। সূর্য উদিত হয়ে সব অন্ধকার মুছে দিয়েছে প্রকৃতি থেকে। সবগুলো ঘোড়া গিয়ে থামলো শামসুর হাওলাদার এর বাড়ির আঙিনায়। বাড়িটা মাটির। বাইরে কাঠের ছোট্ট একটা গেট বানানো। ফজরের নামাজ শেষে মেহেরুন্নেসা চোখ বুজেছিলো ক্লান্তিতে। মল্লিকা আর রমলা রান্না ঘরে। শিমু তাদের সাহায্য করছে। নতুন বউ এখনো স্বামীর সাথে ঘুমাচ্ছে। পুরুষেরা সকলেই বাড়িতে।
বাইরে এতগুলো ঘোড়ার শব্দ আর অস্ত্রের শানশান আওয়াজ, ভারি বুটের দপদপ শব্দে বাড়ির প্রত্যেকের হএশ উড়ে গেলো। কারা এসেছে বাইরে? সবাই একজায়গা জড় হলো। এরই মধ্যে মূল ফটকে কড়া নাড়লো। শামসুর হাওলাদার দ্রুত গিয়ে দরজা খুলতেই হুরমুরিয়ে ঢুকে পড়লো কয়েকজন সৈনিক। প্রত্যেকের দিকে অস্ত্র তাক করে দাড়িয়ে পড়লো। সবাই কিছু বুঝে ওঠার আগেই এতকিছু হয়ে গেলো। গমগমে পায়ে বাড়িতে ঢুকলো বাইজিদ। পিছনে আরো কয়েকজন সৈন্য। আর কেউ না চিনলেও মাহবুব আর শামসুর হাওলাদার বাইজিদ কে ঠিকই চিনে। হাত জড় করে বসে পড়লো হাঁটুমুড়ে। তারা যা আন্দাজ করেছিলো তাই হলো। বাইজিদ এর কানে ঠিকই পৌঁছে গেছে বোনের খবর।
শামসুর হাত জড় করে বললেন
“আ…আমাদের মারবেন না ছোটসাহেব। মারবেন না আমাদের। আমরা…..
বাইজিদ তাকাতেই তার কথা বন্ধ হয়ে গেলো। প্রতিবশি বেশ কয়েকজন ও ভির করেছে এসে। নারীরা এই প্রথম জমিদার পুত্র কে দেখলো। তাদের দৃষ্টি এক বাইজিদ এ স্থির। সারাজীবন নারী সৌন্দর্যের বর্ননা শুনে এসেছে। কিন্ত পুরুষও যে এমন সুদর্শন হয় তা জানা ছিলো না এদের
বাইজিদ শাহকে একবার দেখলে দ্বিতীয়বার দৃষ্টি সরানো দুরূহ। দীর্ঘদেহী, প্রশস্ত কাঁধ, দৃঢ় পেশিবহুল বাহু, যেনো যুদ্ধক্ষেত্রে অবতীর্ণ কোনো প্রাচীন সেনাপতি। তার চলনে স্বভাবজাত রাজকীয়তা, প্রতিটি পদক্ষেপে মনে হয় মাটিও সম্মানে নত হচ্ছে।
স্বচ্ছ ত্বকের ওপর সূর্যের আলো পড়লে এক অদ্ভুত দীপ্তি ছড়িয়ে যায় যেন। তীক্ষ্ণ চোয়াল, সুশৃঙ্খল নাসিকা, আর দৃঢ় অধররেখা। তার মুখাবয়বে ছিল কঠোরতা ও সৌন্দর্যের বিরল সমন্বয়। যেনো ভাস্কর্যের ছেনি দিয়ে নিখুঁত যত্নে গড়া এক পুরুষ প্রতিমা।
কিন্তু তার সমগ্র সত্তার সবচেয়ে বিস্ময়কর দিক ছিল নয়নযুগল। শ্যামলাভ-সবুজ সেই চোখ, যেনো পান্নাখচিত রত্ন। কখনো সে দৃষ্টি শান্ত অরণ্যের মতো স্থির, আবার ক্রোধে জ্বলে উঠিলে মনে হয় বর্ষার ঘন জঙ্গলে হঠাৎ দাউদাউ আগুন লেগেছে।
বাইজিদ শাহ একাধারে সৌন্দর্য, শক্তি ও জমিদারি অহংকারের জীবন্ত প্রতীক।
তলোয়ার উন্মুক্ত করে প্রথমেই চেপে ধরলো মাহবুব এর গলায়।
“বল আমার বোন কোথায়?”
ভয়ে টু শব্দটি করার সাহস পাচ্ছে না মাহবুব। রমলা বললেন
“ও তো সেই কবেই বেড়িয়ে গেছে জমিদার বাড়ি যাবে বলে।”
বাইরের চ্যাচামেচি তে ঘর থেকে বেড়িয়ে এলো তিলোত্তমা। বাইজিদ কে দেখেই তার আত্মা উড়ে গেলো। আজ কোনো অঘটন ঘটবেই। স্বামী কে তলোয়ার এর জিম্মায় দেখে একছুটে গিয়ে বাইজিদ এর সামনে হাতজোড় করে বসে পড়লো
“ভাইজান, ভাইজান দোহাই আমার স্বামী কে মারবেন না। আপা সত্যিই চলে গেছে বাড়ি ছেড়ে। বিশ্বাস করুন”
তখনই ভিতর থেকে শোনা গেলো এক মিষ্টি রিনরিনে কন্ঠ। যা বজ্রধ্বনির মতো আঘাত করলো জনসম্মুখে
“মিথ্যে কথা। ভাবি কোথাও যায় নি।”
তার কন্ঠ অনুসরন করে তাকাতেই বাইজিদ এর চোখে পড়লো কালো নিকাবে ঢাকা এক জোড়া তেজি চোখ। দরজা পার করে বের হতেই আরেকটা তলোয়ার ঠেকলো তার গলায়। কিন্তু সে অনড়, চমকেও উঠলো না এমনকি ভয়ও পেলো না। বাইজিদ এর দৃষ্টি স্থির হলো সেই মায়াবী আখিযুগল এ। চোখের তেজি আগুন তার দমে আসতে লাগলো। তলোয়ারের হাতল খানিকটা আলগা হলো তার মুষ্টি থেকে। ওই চোখ টেনে নিলো তার সমস্ত ক্রোধ। ভারি গলায় বলল
“আপনি?”
“আমি এই বাড়ির মেয়ে । আপনার বোনকে ওই ঘরে আটকে রেখেছে আমার ভাই, ফুপু আর মা মিলে।”
সঙ্গে সঙ্গে কয়েকজন রক্ষী ছুটে গিয়ে তালা ভাঙলো কক্ষ টার। চেয়ারের সঙ্গে বাধা অবস্থায় মেয়ঝেতে পড়ে আছে জমিদার কন্যা। রক্ষীরা তাকে মুক্ত করে বাইরে আনলো। তাকানোর অবস্থান নেই প্রভার। বোনের দিকে তাকিয়ে চোখ জোড়া শিথিল হয়ে আসে বাইজিদ এর। কি হাল হয়েছে মেয়েটার। শরীরের বিভিন্ন জায়গায় নীলচে হয়ে আছে রক্ত জমে। ঠোঁটের কোণায় রক্ত শুকিয়ে গেছে। সারা শরীরে ধুলো ময়লায় জর্জরিত। তলোয়ার ছেড়ে দিয়ে বোনকে জাপটে ধরলো বাইজিদ। ভিতর টা দুমড়ে মুচড়ে যাচ্ছে। কেনো এতদিন এলো না বোনের কাছে। গলা রোধ করে কথা বের হচ্ছে না তার
“রত্ন। আমার রত্ন”
প্রভার গলা দিয়ে কথা বের হয় না। একজন লোহার বর্মে আবৃত সৈন্য এসে বলল
“এভাবে ওনাকে রাখা যাবে না ছোট সাহেব। দ্রুত প্রাসাদে নিয়ে বৈদ্য ডাকতে হবে”
বাইজিদ এর চোয়াল আবার শক্ত হলো। খাস কর্মচারী রক্ষী দের প্রধান মাহাদি কে বলল রত্নপ্রভা কে ঘোড়ার গাড়িতে তুলতে। তাড়া শিঘ্রই রওনা হবে। মাহাদ প্রভা কে নিয়ে যেতেই বাইজিদ প্রথমে তলোয়ার তাক করলো শামসুর হাওলাদার এর গলায়। সবাই কেদে উঠলো। মেহের এক ছুটে এসে বাইজিদ এর পায়ের কাছে হাত জড় করে বসে পড়লো।
“আল্লাহর দোহাই লাগে জমিদার সাহেব। আমার আব্বুকে মারবেন না। আমার আব্বু এসবের সাথে নেই। আব্বু তো সবসময় ভাবি কে বাঁচাতে চেয়েছে।”
মেহেরুন্নেসার জলে টইটম্বুর চোখ জোড়ায় বাইজিদ আবার থমকে গেলো। অশ্রু ভরা দুচোখে আকুতি, হাত দুটো জড়ো করে বসে আছে বাইজিদ এর সামনে। বাইজিদ বড় করে শ্বাস নিয়ে চোখ বন্ধ করলো। নারী জাতী ছলনাময়ী, মায়াবতী, এর চোখের দিকে তাকালে সে বার বার ক্রোধ হারাবে। আচমকা তলোয়ার গুজলো কোমড়ে রাখা তরবারি কোষে। গমগমে গলায় বলল
“আমি আমার সিদ্ধান্ত বদলে ফেলেছি। কাওকে মারবো না, তবে এই মেয়েটিকে আমার সঙ্গে নিয়ে যাব।”
মেহের এর দিকে আঙুল তাক করে বলল
“যতটা যন্ত্রণা আমার বোনকে দিয়েছিস তোরা, সবটা আমি একে ফেরত দিব”
শামসুর হাওলাদার চুম্বক এর মতো এসে বাইজিদ এর পা জড়িয়ে ধরলো।
“এতবড় সর্বনাশ করবেন না বাবা। আমার মেয়েটা নির্দোষ”
“তাহলে সবার এক সাথে গর্দান যাক”
কয়েকজন রক্ষী মেহেরুন্নেসার কাছে এগিয়ে গেলে মেহেরুন্নেসা বাইজিদ কে উদ্দেশ্য করে চেচিয়ে বলল
“আমি যাচ্ছি নিজে থেকে, ওনাদের বলুন আমায় স্পর্শ না করতে”
অনেকে ইনবক্সে লিংক চান পরবর্তী পর্বের। খুজে পান না অনেকেই। ফলো দিয়ে রাখুন, পোস্ট করার সাথে সাথে আপনার ফিডে পৌঁছে যাবে।
খুউব তো বলেন নূর-এ-সাহাবাদ ভালোলাগে, তাহলে আগের টায় ২k হলো না কেনো? 🥲🥹
এটায় কিন্তু করা চাই হুমমম। আর কেমন লাগলো অবশ্যই জানাবেন। ভালোবাসা সবাইকে 🫶
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৭
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৩৮ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ