Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২৫


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ২৫

বিকেল গড়িয়ে পড়ন্তে এসে ঠেকেছে। পশ্চিম আকাশে সূর্যটা যেন ধীরে ধীরে রঙ বদলাচ্ছে সোনালি থেকে কমলা, কমলা থেকে রক্তিম। সেই আলো এসে পড়েছে প্রাসাদের উঁচু মিনার, সাদা পাথরের বারান্দা আর নীল কাঁচ বসানো জানালাগুলোর উপর। দূরে নদীর জলও সেই রঙে রাঙা হয়ে উঠেছে। আজ মহলে কেমন যেন এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা।
সকাল থেকে উৎসব, কোলাহল, সানাই, অতিথিদের আনাগোনা সবই ছিল। অথচ এই বিকেলে মেহেরুন্নেসার কাছে সবকিছুই ফাঁকা ফাঁকা লাগছে।
বাইজিদ মহলে নেই। নদীর পাড়ে ইংরেজ বণিকেরা এসে তাবু ফেলেছে। দূর সমুদ্র পেরিয়ে তারা এসেছে নানা রকম পণ্য নিয়ে। দামী কাপড়, কাঁচের তৈজস, সুগন্ধি, ছোট ছোট ধাতব যন্ত্র, এমনকি এমন কিছু বস্তু, যেগুলোর নামও এই প্রাসাদের অনেকেই জানে না। বাকের শাহ্ নিজেই বলেছেন, বিদেশি অতিথিদের খোঁজখবর নেওয়া শাহজাদার দায়িত্ব। তাই দুপুরের খানিক পরই বাইজিদ চলে গেছে নদীর পাড়ে।
যাওয়ার সময় একবারও সে মেহেরুন্নেসাকে বলে যেতে পারেনি। চারপাশে লোকজন ছিল, অতিথি ছিল। কিন্তু কেথাও মেহেরুন্নেসা কে দেখেনি। তবু সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় তার চোখ খুঁজছিল প্রিয় নারীটিকে। পরবর্তী তে বাইজিদ যাওয়ার পর মেহেরুন্নেসা হেঁশেল থেকে বেড়িয়েছে।
সে এখন বিশাল বারান্দাটায় একা একা পায়চারি করছে।

বারান্দার একপাশে সারি সারি মোটা থাম। থামের ফাঁক দিয়ে দেখা যায় দূরের নদী। বাতাসে তার ওড়নার প্রান্ত বারবার উড়ে যাচ্ছে। কিন্তু সেদিকে তার খেয়াল নেই। তার মাথার ভেতর শুধু একটাই কথা বারবার ফিরে আসছে। আর কেউ কিছু টের না পেলেও, সুনেহেরা যেন পেয়েছে।
আজ সকাল থেকে মেয়েটার আচরণ কেমন যেন অদ্ভুত। রান্নাঘরে যখন সে বাইজিদের পছন্দের খাবার রান্না করছিল, তখনও সুনেহেরা সন্দেহ চোখে কথা গুলো বলল। পুরো মহলের লোক তাকে স্বাভাবিক ভাবে নিলেও, সুনেহেরা তাকে সন্দেহ করছে।

মেহেরুন্নেসা জানে, এই মহলের কেউ যদি তার মনের গোপন কথা আন্দাজ করতে পারে, তবে সেটা সুনেহেরাই। আর এই কারণেই ভয়টা আরও বেশি। সে থেমে গিয়ে থামের গায়ে হাত রাখলো। দূরে নদীর দিকে তাকিয়ে রইলো।
নদীর ওপারে, অনেক দূরে, ইংরেজ বণিকদের সাদা তাবুগুলো ছোট ছোট বিন্দুর মতো দেখা যাচ্ছে। সূর্যের শেষ আলোয় সেগুলো কেমন ফ্যাকাসে লাগছে। হঠাৎ নিচের দিক থেকে ঘোড়ার খুরের শব্দ ভেসে এলো। মেহেরুন্নেসা চমকে নিচে তাকালো। প্রাসাদের ফটক পেরিয়ে দ্রুত বেরিয়ে যাচ্ছে একটা কালো ঘোড়া। তার উপর বসে আছে সুনেহেরা। তার সোনালি চুল গুলো বাতাসে উড়ছে, মুখে কেমন এক তাড়াহুড়ো, একরকম উদ্বেগ। সে একবারও পেছনে তাকালো না। সোজা নদীর দিকেই ছুটে গেল।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। সুনেহেরা এই সময়ে নদীর দিকে কেন যাচ্ছে? তার কি কোনো কাজ আছে সেখানে?
নাকি সে বাইজিদের কাছে যাচ্ছে? এই চিন্তাটুকু মাথায় আসতেই মেহেরুন্নেসার আঙুলগুলো থামের গায়ে শক্ত হয়ে চেপে বসল। অকারণেই তার ভেতরে কেমন একটা অস্বস্তি জন্ম নিল। মনে হলো, বিকেলের নিস্তব্ধতা, নদীর ধারে সাদা তাবু, আর সুনেহেরার হঠাৎ করে ছুটে যাওয়া সবকিছুর ভেতর কোথাও একটা অদ্ভুত রহস্য লুকিয়ে আছে।

নদীর পাড়ে ইংরেজ বণিকদের তাবুগুলো দূর থেকে যতটা শান্ত আর নিরীহ দেখাচ্ছিল, কাছে এসে ততটা লাগলো না। বিশাল সাদা কাপড়ের তাবু, চারপাশে কাঠের বাক্স, লোহার পিপে, বাঁধা ঘোড়া, আর অদ্ভুত সব পোশাক পরা লোকজন। নদীর ধারে নোঙর করা তাদের বড় জাহাজটা দূর থেকে দেখা যাচ্ছে। গোধূলির আলোয় কালো ছায়ার মতো দাঁড়িয়ে আছে।
বাইজিদ ঘোড়া থেকে নামতেই বণিকদের সর্দার এগিয়ে এলো। লম্বা মানুষ, ফর্সা মুখ, ধূসর চোখ। মুখে ভদ্রতার হাসি, কিন্তু সেই হাসি যেন চোখ পর্যন্ত পৌঁছায় না।
“শাহজাদা,”
ভাঙা ভাষায় বললো সে
“আপনার আগমনে আমরা সম্মানিত।”
বাইজিদ হালকা মাথা নাড়লো। তার সঙ্গে ছিল মাহাদি আর আরও দুজন প্রহরী।
“থাকার জায়গায় কোনো অসুবিধা হচ্ছে না তো?” শান্ত গলায় জিজ্ঞেস করলো সে।
“না, মোটেও না। সাহাবাদের আতিথেয়তা অতুলনীয়।”
সর্দার তাকে তাবুর ভেতরে নিয়ে গেল। তাবুর ভেতরটা বেশ সাজানো। মোটা গালিচা পাতা, মাঝখানে কাঠের টেবিল। তার উপর অদ্ভুত সব কাঁচের বোতল, রুপার পেয়ালা, আর একটা ছোট পিতলের পাত্র থেকে ধোঁয়া উঠছে।
সর্দার নিজ হাতে একটা পাতলা কাঁচের পেয়ালায় গাঢ় রঙের তরল ঢাললো।
“এটা আমাদের দেশের পানীয়”
সে বললো।
“চা।”
সাহাবাদে এখনো চায়ের প্রচলন হয়নি। এখানে সকালের পানীয় বলতে শরবত, দুধ বা কফির মতো কিছুই পরিচিত। কিন্তু বাইজিদ বহুবার বিদেশে গিয়েছে। কাবুল, দিল্লি, আরব এমনকি সমুদ্রপথে দূর দেশের লোকজনের সঙ্গেও তার পরিচয় হয়েছে। চা তার অপরিচিত নয়।
সে পেয়ালার দিকে তাকালো। ধোঁয়া উঠছে। অদ্ভুত এক গন্ধ। তবু ঠিক কেন যেন, আজ তার সেই চা খেতে ইচ্ছে হলো না।
সে হালকা হেসে পেয়ালাটা মাহাদির দিকে বাড়িয়ে দিলো।
“তুমি খাও।”
মাহাদি একটু অবাক হলেও কিছু বললো না। সে এমনিতেই নতুন কিছু খেতে পছন্দ করে। পেয়ালাটা হাতে নিয়ে এক চুমুকে অর্ধেক খেয়ে ফেললো। বাইজিদ তখনও সর্দারের সঙ্গে কথা বলছে। কথা বলতে বলতে তারা বাইরে আসলো। নদীর পানি, বাণিজ্য, কতদিন থাকবে তারা এসব নিয়েই আলোচনা করছে। কিন্তু কয়েক মুহূর্ত পরই পাশ থেকে অদ্ভুত একটা শব্দ ভেসে এলো।
মাহাদি টলতে টলতে এক পা পিছিয়ে গেল।
“শাহজাদা…”
তার গলাটা কেমন কেঁপে উঠলো। বাইজিদ ঘুরে তাকালো। মাহাদির চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে গেছে। সে বারবার চোখ পিটপিট করছে, যেন কিছু দেখতে পাচ্ছে না।
“আমার… চোখে কিছুই দেখছি না…”
তার হাতে থাকা পেয়ালাটা মাটিতে পড়ে ভেঙে গেল। পরের মুহূর্তেই সে ঢলে পড়লো। বাইজিদের চোখ মুহূর্তে ধারালো হয়ে উঠলো। সে এক ঝটকায় কোমরের তলোয়ার বের করে ফেললো।
ঠিক তখনই তাবুর চারপাশ থেকে কয়েকজন ইংরেজ বণিক ছুরি আর ছোট তলোয়ার হাতে বেরিয়ে এলো। তাদের মুখে আর কোনো ভদ্রতার হাসি নেই। শুধু হিংস্রতা। সর্দার ধীরে ধীরে পিছিয়ে গেল। ঠোঁটের কোণে কুৎসিত হাসি।
“দুঃখিত, শাহজাদা”
সে ভাঙা ভাষায় বললো।
“আজ আপনার ফিরিয়া যাওয়া হইবে না। আপনাকে বন্দি করিয়া আমরা মোটা টাকা আর স্বর্ণমুদ্রা উসুল করিবো”
তাবুর বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরাও আচমকা আক্রমণের শিকার হলো। চারপাশে চিৎকার, তলোয়ারের শব্দ। বাইজিদ তলোয়ার উঁচিয়ে সামনে এগিয়ে আসা একজনের আঘাত ঠেকালো। তারপর এক ঝটকায় তাকে মাটিতে ফেলে দিল। কিন্তু লোকজন অনেক।
আর তখনই….. শুঁইই!
বাতাস চিরে একটা তীর এসে সোজা একজন বণিকের গলায় গিয়ে বিঁধলো। লোকটা একটা আর্তনাদ করে মাটিতে পড়ে গেল। সবাই থমকে উঠলো। তাবুর বাইরে, জঙ্গলের অন্ধকার আড়ালে, একটা কালো ঘোড়া দাঁড়িয়ে।
আর তার পাশে সুনেহেরা। তার মুখে কোনো ভয় নেই। চোখদুটো ঠান্ডা, স্থির। হাতে ধনুক। সে দক্ষ হাতে আরেকটা তীর লাগালো। তার লক্ষ্য এবার সর্দার। সর্দার কিছু বুঝে ওঠার আগেই দ্বিতীয় তীরটা ছুটে এলো। তীর এসে তার কাঁধ ভেদ করে গেল। লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। চারপাশে হঠাৎ বিশৃঙ্খলা ছড়িয়ে পড়লো। বণিকেরা বুঝে উঠতে পারছে না আক্রমণটা কোথা থেকে হচ্ছে। এই সুযোগে বাইজিদ সামনে থাকা দুজনকে সরিয়ে দিল। তার তলোয়ারের ঝলক গোধূলির শেষ আলোয় কেমন ভয়ংকর লাগছিল।

দূর থেকে সুনেহেরা আবার তীর তুললো।
তার চোখে তখন একটাই জিনিস কেউ যেন বাইজিদের কাছে পৌঁছাতে না পারে। বাইজিদ বরাবরই একজন দক্ষ যোদ্ধা। শৈশব থেকে তলোয়ার, বর্শা, ধনুক সবকিছুর শিক্ষা পেয়েছে সে। তাই আকস্মিক আক্রমণেও তাকে এক মুহূর্তের জন্য দুর্বল লাগলো না। একজন বণিক ছুরি উঁচিয়ে তার দিকে ঝাঁপিয়ে আসতেই বাইজিদ শরীরটা একপাশে সরিয়ে তলোয়ার চালালো। মুহূর্তেই লোকটার হাত থেকে অস্ত্র ছিটকে পড়ে গেল। আরেকজন পেছন দিক থেকে আঘাত করতে এলে সে না ফিরেই কনুই দিয়ে তাকে সরিয়ে দিলো। তারপর ঘুরে দাঁড়িয়ে এমন এক আঘাত করলো, লোকটা মাটিতে গড়াতে গড়াতে পড়ে গেল।
তাবুর সামনে এখন বিশৃঙ্খলা। চিৎকার, ঘোড়ার হ্রেষাধ্বনি, তলোয়ারের ঝনঝন শব্দ সব মিলিয়ে নদীর পাড়ের নীরবতা ভেঙে গেছে। ওদিকে জঙ্গলের আড়ালে দাঁড়িয়ে সুনেহেরা একের পর এক তীর ছুঁড়ে যাচ্ছে। তার নিশানা এতটাই নিখুঁত যে প্রতিটা তীর গিয়ে কাউকে না কাউকে আঘাত করছে। একবার একজন বণিক বাইজিদের দিকে বন্দুক তুলতে যাচ্ছিল। সুনেহেরার তীর তার কবজিতে গিয়ে বিঁধতেই বন্দুকটা হাত থেকে পড়ে গেল। সুনেহেরা দ্রুত আরেকটা তীর তুললো।
কিন্তু ঠিক তখনই, কোথা থেকে যেন খুব দ্রুত একটা ছোট কাঁটা এসে তার কাঁধ বরাবর বিঁধলো।
“আহ!”
তীব্র জ্বালায় তার হাত কেঁপে উঠলো। ধনুক প্রায় হাত থেকে পড়ে যাচ্ছিল। সে বিস্ময়ে কাঁধের দিকে তাকালো। একটা চিকন, কালচে কাঁটা।
বিষমাখা। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার চোখের সামনে সবকিছু কেমন দুলে উঠতে লাগলো। হাত অবশ হয়ে যাচ্ছে। শরীরটা ভারী লাগছে।
সে টলতে টলতে এক হাঁটু গেড়ে বসে পড়লো।
ঠিক সেই মুহূর্তে
শুঁউউ!
তার মাথার ঠিক ওপর দিয়ে ভয়ংকর বেগে একটা তীর ছুটে গেল। তীরটা গিয়ে সোজা বিঁধলো সেই লোকটার গলায়, যে একটু আগেই জঙ্গলের ভেতর থেকে সুনেহেরার দিকে বিষমাখা কাঁটা ছুড়েছিল। সুনেহেরা বিস্ময়ে মাথা তুললো।
পরের মুহূর্তেই জঙ্গলের গভীর অন্ধকার থেকে একসঙ্গে অনেকগুলো তীর ছুটে এলো।
একটার পর একটা। এত দ্রুত, এত নিখুঁত যেন অদৃশ্য কোনো ছায়া তাদের ছুঁড়ে যাচ্ছে।
যে বণিকগুলো বাইজিদের দিকে এগোচ্ছিল, তারা হঠাৎ একে একে মাটিতে পড়ে যেতে লাগলো। কেউ তীরবিদ্ধ হয়ে, কেউ আতঙ্কে পেছাতে পেছাতে। বাইজিদও মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। তার চোখ সেদিকে চলে গেল।
জঙ্গলের ভেতর, গাছের ছায়ার আড়ালে, একটা কালো ঘোড়া।

আর তার উপর বসে আছে সম্পূর্ণ কালো বোরখায় আবৃত এক নারী। মুখ দেখা যাচ্ছে না। সে শেষবারের মতো একটা তীর ছুঁড়লো। তীরটা গিয়ে বণিকদের সর্দারের বুকের ঠিক পাশে বিঁধলো। লোকটা যন্ত্রণায় চিৎকার করে মাটিতে পড়ে গেল। তারপর সেই নারী আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। ঘোড়ার লাগাম টেনে সে জঙ্গলের আরও গভীরে ছুটে গেল। কালো বোরখাটা বাতাসে উড়ছিল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই সে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। সুনেহেরা আধচেতন চোখে তার চলে যাওয়া দেখলো।
তার বুকের ভেতর কেমন একটা কাঁপুনি উঠলো।
ওটা কে ছিল।

সন্ধ্যা নেমে এসেছে যখন তারা মহলের দিকে ফিরলো। সামনের পথে কয়েকটা মশাল জ্বলছে। সেই আলোয় দেখা যাচ্ছে বাইজিদের পোশাক ধুলো আর রক্তের দাগে ভরা, কপালের পাশে হালকা কেটে গেছে। মাহাদিকে দুজন প্রহরী ধরে এনেছে। বিষমাখা চা খাওয়ার পরও সে পুরোপুরি অজ্ঞান হয়নি, কিন্তু তার চোখে-মুখে ক্লান্তি আর অবসাদ স্পষ্ট।
আর সুনেহেরা ঘোড়ার উপর ঠিকমতো বসেও থাকতে পারছে না। কাঁধে কাপড় চেপে ধরা। বিষমাখা কাঁটার জায়গাটা ফুলে উঠেছে। মুখটা একদম সাদা হয়ে গেছে। প্রাসাদের ফটকে পৌঁছাতেই হৈচৈ পড়ে গেল।
“শাহজাদা!”
“আল্লাহ! এ কী অবস্থা!”
দাস-দাসীরা দৌড়ে এলো। প্রহরীরা ছুটে এলো। মুহূর্তের মধ্যেই খবর পৌঁছে গেল ভেতরে। মেহেরুন্নেসা তখন নিজের কক্ষে ছিল। একটু পর আযান হবে। নামাজের প্রস্তুতি নিচ্ছিলো। দূর থেকে হঠাৎ এত শোরগোল শুনে সে চমকে উঠলো। বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল। সে প্রায় দৌড়ে বারান্দায় এলো।
নিচে তাকাতেই তার নিঃশ্বাস আটকে গেল।
বাইজিদ দাঁড়িয়ে আছে উঠোনে। কিন্তু তাকে দেখে মনে হচ্ছে, বহুক্ষণ যুদ্ধ করে ফিরেছে। তার মুখ কঠিন, চোখে আগুনের মতো রাগ। পাশে সুনেহেরা প্রায় অজ্ঞান হয়ে পড়ছে।

মেহেরুন্নেসা আর কিছু না ভেবে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে এলো। সে গিয়ে সুনেহেরার হাত ধরতেই বুঝলো, তার শরীর জ্বরে পুড়ছে।
“কি হয়েছে?”
কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করলো সে।
সুনেহেরা ঠোঁট নাড়ালো, কিন্তু কথা বলতে পারলো না। বাকের শাহ্ বৈদ্যকে ডেকে সুনেহেরা কে দাসীদের দিয়ে কক্ষে পাঠালো। রত্নপ্রভা ছুটে আসলো
“সুনেহেরার কি হয়েছে ভাইজান?”
বাইজিদ এবার ধীরে বললো
“ওকে বিষমাখা কাঁটা মারা হয়েছে।”
মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। চারদিকে আবার ছোটাছুটি শুরু হলো। সুনেহেরাকে ধরে ভেতরে নিয়ে যাওয়া হলো। মাহাদিকেও অন্যদিকে নেওয়া হলো। উঠোনে শুধু বাইজিদ দাঁড়িয়ে রইলো।
কয়েক মুহূর্ত আগেও সে যেন শুধু রাগে জ্বলছিল। কিন্তু মেহেরুন্নেসা যখন ফিরে যাওয়ার আগে একবার তার দিকে তাকালো, তখন সে দেখলো সেই কঠিন চোখের নিচে ভয়ও আছে।
খুব গভীর, খুব লুকানো এক ভয়।
মেহেরুন্নেসা থেমে গেল।
“আপনি… আপনি ঠিক আছেন?”
খুব আস্তে বললো সে। বাইজিদ তার দিকে তাকালো। এক মুহূর্তের জন্য যেন তার মুখের সমস্ত কঠোরতা ভেঙে গেল।
“আমি আছি ঠিক আছি। কিন্তু যদি সুনেহেরার কিছু হয়, ওদের গোটা রাজ্য আমি ধূলোয় মিশিয়ে ফেলবো”

বাকের শাহ্ মেহেরুন্নেসা কে বলল
“আম্মাজান, ওর বিশ্রামের প্রয়োজন। ঘরে নিয়ে যাও।”

মেহেরুন্নেসা বাইজিদ এর বাহু ধরে কক্ষের দিকে এগোলো। ধীরে ধীরে বাইজিদকে কক্ষে প্রবেশ করালো। তার কক্ষটি উষ্ণ বাতাসে ভরা, কিন্তু বাইজিদের চোখে এখনও সেই আগুন রাগ আর ক্লান্তির মিশ্রণ। সে নিঃশব্দ, শক্তভাবে বসে আছে, কাঁধ ও পা কিছুটা কাঁপছে।
মেহেরুন্নেসা নীরবভাবে উষ্ণ পানি দিয়ে ক্ষত স্থান পরিষ্কার করতে লাগলো। পানি ছোঁয়ায় ধীরে ধীরে লাল দাগ, রক্ত আর ময়লার চিহ্ন ধুয়ে যেতে লাগলো। বাইজিদের চোখ বন্ধ, মুখে এক অদ্ভুত চাপ। সে স্পর্শটা ভালো লাগলেও রাগের কারণে কণ্ঠ খুলতে পারছে না।
ক্ষতগুলো পরিষ্কার হয়ে গেলে মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে তার কাপড় ঠিক করলো, পোষাক পাল্টে দিল। বাইজিদ কোনও ওষুধ দিতে দিতে নারাজ, চোখের রাগ আর অভিমান সে খোলা মনে প্রকাশ করছে। মেহেরুন্নেসা চেষ্টা করলো শান্ত করতে কথা বললো, চোখে মৃদু ভ্রূক্ষেপ দেখালো, হাত ধীরে স্পর্শ করলো কিন্তু বাইজিদর রাগ এতটুকু নরম হলো না।
মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসা থমকে দাঁড়ালো। বুঝতে পারল, আর কিছু করার উপায় নেই। সে ধীরে ধীরে নিজের আচল সরিয়ে নিল। উষ্ণ বাতাসে কক্ষ যেন আরও ঘন হয়ে গেল।
“নিজেকে শান্ত করুন শাহজাদা”
চোখে ভয় আর সহানুভূতির মিশ্রণ। তারপর, মৃদু নিঃশ্বাস ফেলে, সে ধীরে ধীরে নিজের হাত দিয়ে সোপে নিজেকে স্পর্শ করালো। নিজেকে তার স্বামীর কাছে সমর্পণ করল, যেন বলছে,
“আমি এখানে আছি, শুধু আপনার জন্য।”
বাইজিদ চোখ খুলে তাকাল। প্রথমে সে কিছুটা হতবাক, তারপর চোখের কোণে সামান্য নরম ভাব আসতে লাগল। রাগ কিছুটা কমতে শুরু করল, শরীরের কাঁপন ধীরে ধীরে হ্রাস পেল। মেহেরুন্নেসার দৃঢ় অথচ কোমল উপস্থিতি তার মনকে শান্ত করতে শুরু করল। কক্ষের নীরবতা ভেসে আসে শুধু তাদের নিঃশ্বাসের সঙ্গে। বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে রইলো, যেন সময়ও থমকে গেছে। কেবল দুজনের কাছাকাছি থাকা, স্পর্শের নরম অনুভূতি, এবং নিরবতা এটাই এখন মুহূর্তের পূর্ণতা।
মুহূর্তটি ছিলো এক অদ্ভুত মিশ্রণ রাগ, ক্লান্তি, বিশ্বাস আর নিঃশর্ত ভালোবাসার। মেহেরুন্নেসা জানত, এই শান্ত মুহূর্তেই বাইজিদ ধীরে ধীরে তার অভিমান ভুলে যাবে, এবং তারা একে অপরের কাছে আরও ঘনিষ্ঠ হবে। স্বামীর ক্রোধ কমাতে এই পথটাই বেছে নিলো সে।

তার ফল দেখা দিলো বাইজিদ এর ব্যাবহারে। শক্ত চোয়াল শিথিল হতে শুরু করলো। চোখের লালিমা ভাব কমে এলো। শুকনো ঢোক গিলল আবার। কিন্তু হুট করেই তার ব্যাবহার কেমন পরিবর্তন হয়ে গেলো। হিংস্র হয়ে উঠলো নিমেষেই। তড়িৎ গতিতে গিয়ে চেপে ধরলো মেহেরুন্নেসার গলা। দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“ছলনাময়ী, বিশ্বাসঘাতিনী। আজ তোর আমার হাতেই প্রাণ যাবে”

মোবাইলে ৫% চার্জ। সারাদিন বিদ্যুৎ নেই। তাই আজ পর্ব একটু ছোট। রেসপন্স করিও। পরের পর্বে ধামাকা আসতে চলেছে। কেমন হলো অবশ্যই জানিও 🫠🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply