নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
২৪ এর প্রথমাংশ
রাত আরও গভীর হলো। জানালার বাইরে নিস্তব্ধ আকাশ, দূরে কোথাও রাতজাগা পাখির ডাক। কক্ষের ভেতর শুধু মৃদু আলো আর দুজন মানুষের নিঃশ্বাসের শব্দ। মেহেরুন্নেসা এখনও বাইজিদের বুকে মুখ লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার সমস্ত জড়তা, ভয়, সংকোচ ধীরে ধীরে গলে যাচ্ছে। বাইজিদ খুব যত্নে তার কপালের চুল সরিয়ে দিলো। তারপর এমনভাবে তাকে কাছে টেনে নিলো, যেন সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জিনিস।
সেই রাতে তারা অনেক কথা বললো। কিছু কথার ভাষা ছিল, কিছু ছিল না। বহুদিনের দূরত্ব, অভিমান, অস্বস্তি সব ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা প্রথমবার বুঝলো, বাইজিদের কঠিন মুখের আড়ালে কতটা গভীর আকুলতা লুকিয়ে ছিল তাকে কাছে পদওয়ার। আর বাইজিদও যেন তার সমস্ত নীরবতা ভেঙে শুধু মেহেরুন্নেসার কাছেই নিজেকে সমর্পণ করলো। একসময় ক্লান্ত রাত তাদের দুজনকে নিঃশব্দে জড়িয়ে নিল।
ভোরের হালকা আলো জানালার ফাঁক দিয়ে কক্ষে ঢুকতেই মেহেরুন্নেসার ঘুম ভাঙলো।
চোখ খুলেই সে স্থির হয়ে গেল। সে বাইজিদের বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। এক হাত এখনও তার কোমর জড়িয়ে। দুজনের গায়ে সম্ভ্রম বলতে একটা পাতলা চাদর। এক চাদরের ভিতর দুটো বস্ত্রহীন নগ্ন দেহ। গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার গাল গরম হয়ে উঠলো। লজ্জায় তার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
খুব সাবধানে সে মাথা তুললো। মনে হলো, যদি নিঃশব্দে উঠে যেতে পারে! বাইজিদের ঘুম ভাঙুক, সেটা সে এখন একদমই চায় না। আস্তে আস্তে তার হাতটা সরাতে গেল সে। ঠিক তখনই বাইজিদের কণ্ঠ ভেসে এলো, ঘুম জড়ানো, নিচু স্বরে
“কোথায় যাচ্ছো?”
মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। মুখ তুলে দেখলো, বাইজিদ চোখ খুলে তার দিকেই তাকিয়ে আছে। ঠোঁটের কোণে মৃদু হাসি।
“আমি… আমি তো…”
কথাগুলো জড়িয়ে গেল তার। বাইজিদ কিছু না বলে তাকে আবার নিজের দিকে টেনে নিলো।
“এত সকালে পালিয়ে যাওয়ার নিয়ম নেই। শাহজাদার কথা অমান্য করলে কিন্তু শাস্তি পেতে হয়।”
খুব আস্তে বললো সে। মেহেরুন্নেসা লজ্জায় চোখ বন্ধ করে ফেললো। বাইজিদের বুকে মুখ লুকিয়ে দিলো আবার। আর বাইজিদ তার মাথার ওপর আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিয়ে চোখ বন্ধ করলো। বাইরে তখন নতুন সকাল ধীরে ধীরে জেগে উঠছে। মেহেরুন্নেসা আর কিছুক্ষণ বাইজিদের পাশে নিঃশব্দে পড়ে রইলো। তারপর যখন বুঝলো সে আবার আধো ঘুমে ঢলে পড়েছে, খুব সাবধানে তার বাহুর ভেতর থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলো।
একবার পেছন ফিরে তাকালো। বাইজিদ ঘুমিয়ে আছে। সকালের আলোয় তার মুখটা অদ্ভুত শান্ত লাগছে। গত রাতের সেই কঠিন, রহস্যময় মানুষটাকে যেন কোথাও খুঁজেই পাওয়া যাচ্ছে না।
মেহেরুন্নেসার গাল আবার হালকা লাল হয়ে উঠলো। দ্রুত দৃষ্টি সরিয়ে সে গোসলখানায় চলে গেল।
অনেকক্ষণ ধরে ঠান্ডা পানিতে শরীর ধুয়েও তার বুকের ধুকপুকানি কমলো না। আয়নায় নিজের মুখ দেখে সে নিজেই লজ্জা পেয়ে গেল। চোখ দুটো কেমন উজ্জ্বল হয়ে আছে। গোসল শেষে কাপড় বদলে খুব চুপচাপ নিচে নেমে এলো সে।
মহল তখনও পুরোপুরি জেগে ওঠেনি। করিডোরে মৃদু অন্ধকার, কোথাও কোথাও প্রদীপের শেষ আলো জ্বলছে। দূরে রান্নাঘরের দিক থেকে হালকা শব্দ ভেসে আসছে।
সিঁড়ির শেষ ধাপে এসে হঠাৎই সে থেমে গেল।
রত্নপ্রভা দ্রুত পায়ে বাইরের দিকের করিডোর ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। মাথায় ওড়না টানা, মুখটা কেমন অদ্ভুত ফ্যাকাশে। সে চারপাশে একবার তাকালো, তারপর তাড়াহুড়ো করে পেছনের দরজার দিকে চলে গেল। মেহেরুন্নেসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইলো। এত ভোরে? রত্নপ্রভা তো সাধারণত নিজের কক্ষ থেকে বেরই হয় না এই সময়। তাও এমনভাবে, যেন কাউকে এড়িয়ে যাচ্ছে।
মেহেরুন্নেসার মনে হঠাৎ করেই কেমন একটা অস্বস্তি হলো। গত কয়েকদিন ধরেই রত্নপ্রভাকে কেমন অদ্ভুত লাগছে। চুপচাপ, ভয়ার্ত, যেন কিছু একটা লুকিয়ে রেখেছে। কয়েক মুহূর্ত দ্বিধায় দাঁড়িয়ে রইলো সে। তারপর খুব আস্তে, কোনো শব্দ না করে, রত্নপ্রভার পেছন পেছন এগিয়ে গেল। পেছনের সরু পথটা ধরে রত্নপ্রভা মহলের পেছনের পুরনো কবরস্থানের দিকে চলে গেল। ভোরের কুয়াশা এখনও পুরোপুরি কাটেনি। চারপাশে সাদা ধোঁয়ার মতো আবছা পর্দা। পুরনো বটগাছের ডাল থেকে টুপটাপ শিশির পড়ছে। মেহেরুন্নেসা দূর থেকে নিঃশব্দে তার পিছু নিলো।
জমিদারদের কবরস্থানটা মহলের একদম পেছনে। বহু পুরনো, নির্জন। শ্যাওলা ধরা পাথরের কবর, ভাঙা দেয়াল, আর চারদিকে অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। রত্নপ্রভা গিয়ে থামলো এক কোণের পুরনো কবরটার সামনে।
কবরটার পাথর প্রায় মুছে গেছে। শুধু অস্পষ্ট কিছু অক্ষর দেখা যায়। রত্নপ্রভা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার মাথা নিচু। হাত দুটো কাঁপছে হালকা।
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে তার কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। তারপর খুব আস্তে পিছন থেকে তার কাঁধে হাত রাখলো। রত্নপ্রভা যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে উঠলো।
“কে!”
চমকে ঘুরে দাঁড়াতেই তার মুখ ফ্যাকাশে হয়ে গেল।
“মেহের?”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো।
“আমি আপা। ভয় পেলে নাকি?”
রত্নপ্রভা দ্রুত চোখ সরিয়ে নিলো।
“না… কিছু না”
মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি ধীরে ধীরে নেমে গেল কবরটার দিকে। তারপর আবার রত্নপ্রভার মুখে।
“তুমি এই সময় এখানে কেন এসেছো?”
রত্নপ্রভা কিছু বললো না। তার চোখে কেমন আতঙ্ক আর কষ্ট মিশে আছে। মেহেরুন্নেসা আরও একটু কাছে এলো। খুব নিচু গলায় বললো
“অরণ্য শাহ্ এর কবর এটা তাই না??”
শব্দটা শুনতেই রত্নপ্রভার মুখের রং যেন এক মুহূর্তে উধাও হয়ে গেল। সে স্থির চোখে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে রইলো। ঠোঁট কাঁপছে।
“তুমি… তুমি এই নাম কোথায় শুনলে?”
“আপনার ঘরে,”
মেহেরুন্নেসা ধীরে বললো।
“সেদিন গহনা গোছানোর সময় এক অদ্ভুত লকেট পেয়েছিলাম আপনার গয়নার বাক্সে। যার দুই পিঠের এক পিঠে তোমার নাম এবং অপর পিঠে অরণ্য নাম টা লিখা ছিলো। তেমার চাচাতো ভাই হয় তো সে। তাহলে সেদিন কেন বলেছিলে চিনো না তাকে?”
রত্নপ্রভা চোখ বন্ধ করে ফেললো। যেন বহুদিন ধরে বুকের ভেতর চেপে রাখা কোনো ব্যথা হঠাৎ করে বাইরে বেরিয়ে আসতে চাইছে। তারপর খুব আস্তে, ভাঙা গলায় বললো
“অতীত টেনো না মেহের।”
মেহেরুন্নেসা আরো এগিয়ে এসে চেপে ধরলো রত্নপ্রভার হাত।
“বলো না আপা। আমি শুনতে চাই”
প্রভা মেহেরুন্নেসার দিকে তাকিয়ে বলল
“আজ ওবদি যে যে শুনেছে এই গল্প। অসুস্থ হয়ে পড়েছে তারাই।”
“তবুও আমি শুনতে চাই”
রত্নপ্রভা কিছুক্ষণ চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলো। তার চোখ এখনও সেই পুরনো কবরটার ওপর স্থির। যেন পাথরের নিচে চাপা পড়ে থাকা কোনো মানুষ নয়, তার নিজের ফেলে আসা জীবনটা শুয়ে আছে সেখানে। তারপর খুব আস্তে সে বললো
“আজ থেকে আট বছর আগে… তখন আমার বয়স সতেরো।”
ভোরের কুয়াশা ধীরে ধীরে মিলিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু রত্নপ্রভার চোখের ভেতর যেন অন্য এক সময়ের পর্দা নেমে এলো।
“আমি তখন একেবারে অন্যরকম ছিলাম, মেহের। বোকা, চঞ্চল, সারাদিন কথা বলতাম। হাসতাম। সবাই বলতো, আমার চোখে নাকি সবসময় রোদ লেগে থাকে।”
তার ঠোঁটে খুব ক্ষীণ, কষ্ট মেশানো একটা হাসি ফুটলো।
“আর অরণ্যের বয়স ছিলো বাইশ।”
নামটা উচ্চারণ করতেই তার গলা বদলে গেল।
“ আমার চাচা জাবের শাহ্ এর একমাত্র ছেলে ছিলো সে। পুরো এলাকায় সবাই তাকে চিনতো। কিন্তু জমিদারের ছেলে হয়েও সে একদম অন্যরকম ছিল।”
রত্নপ্রভা ধীরে ধীরে কবরটার ওপর হাত রাখলো।
“মারাত্মক সুদর্শন ছিলো সে। এতটাই, যে গ্রামের যুবতী থেকে বৃদ্ধারাও দূর থেকে তাকিয়ে থাকতো। কিন্তু অরণ্য এসব কিছুই বুঝতো না। কিংবা বুঝলেও পাত্তা দিতো না।”
তার চোখের সামনে যেন দৃশ্যগুলো আবার জীবন্ত হয়ে উঠছে।
“সবচেয়ে সুন্দর ছিলো তার হাসি। কেউ তাকে অপমান করলেও, বকাঝকা করলেও, সে শুধু খিলখিল করে হেসে উঠতো। এমন হাসি যেন পৃথিবীতে কোনো কষ্টই তাকে ছুঁতে পারে না।”
রত্নপ্রভা চোখ নামিয়ে ফেললো।
“লোকজন বলতো, ছেলেটা পাগল। কারণ তার কোনো কিছুর ওপর মায়া ছিলো না। জমিদারি, টাকা, ক্ষমতা কিছুই না। সে সারাদিন এদিক ওদিক ঘুরে বেড়াতো। কখনো এক জায়গায় স্থির হতে পারতো না। আমিও ছিলাম আরেক পাগলী”
একটু হাসলো প্রভা।
“যে কোথাও দুদন্ড স্থির হতো না তার অপেক্ষায় গোটা মহল পায়চারি করতাম। কখন সে আসবে। একগাল হেসে চঞ্চল ভঙ্গিতে মহলে ঢুকবে। ঢুকেই প্রথমে ভাইজান এর বকা খাবে। চাচাজান যাতে ওকে কিছু না বলে তাই ভাইজান ই আগেভাগে বকে ভিতরে পাঠিয়ে দিতো।
একটু থেমে খুব আস্তে বললো
“আর সে দারুণ ছবি আঁকতো।”
তার গলায় এবার কাঁপন।
“এমন ছবি, যেন কাগজে মানুষ শ্বাস নিচ্ছে। ফুল আঁকলে মনে হতো, এখনই গন্ধ বের হবে। আকাশ আঁকলে মনে হতো, হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবো।”
রত্নপ্রভা কবরটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বললো
“আর সবচেয়ে বেশি আঁকতো আমাকে। ভাইজান কে তো তুমি চেনো”
খুব ধীরে বললো রত্নপ্রভা।
“গুরুজনদের কথা তার কাছে আইন। ছোটবেলা থেকেই সে ভীষণ সংযত, দায়িত্ববান। কেউ কিছু বললে মাথা নিচু করে মেনে নিতো।”
তারপর কষ্টভরা একটুখানি হাসলো সে।
“অরণ্য ছিলো ঠিক তার উল্টো।”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ শুনছে।
“আব্বা এবং চাচাজান যা করতে নিষেধ করতেন, অরণ্য সেটাই করতো। পড়তে বসতে বললে ঘোড়া নিয়ে বেরিয়ে যেত। অতিথিদের সামনে থাকতে বললে ছাদে উঠে বসে থাকতো। কেউ বকাঝকা করলে হেসে দিতো।”
রত্নপ্রভার চোখে যেন হালকা আলো ফুটলো, আবার নিভেও গেল।
“মাঝে একসময় তার খুব খারাপ নেশা হয়ে গিয়েছিলো। কার সঙ্গে মিশতো, কোথায় যেত, কেউ জানতো না। কখনও মাঝরাতে ফিরতো। কখনও দুদিন তিনদিন বাড়িতেই থাকতো না।”
মেহেরুন্নেসা বিস্মিত হয়ে তাকালো।
রত্নপ্রভা খুব আস্তে মাথা নেড়ে বললো,
“মদ্য পান করে মহলে ফিরতো। চোখ লাল, জামাকাপড় এলোমেলো। পুরো মহল তার জন্য অশান্ত হয়ে থাকতো। চাচা জান রাগে দিনের পর দিন তার সঙ্গে কথা বলতেন না। কত বুঝিয়েছে সবাই। কত শাসন, কত মারধর কিছুতেই কিছু হয়নি।”
তার গলা কেঁপে উঠলো।
“কিন্তু একদিন……”
সে কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। যেন সেই দিনের স্মৃতিটা এখনও খুব কাছে।
“সেদিন সে খুব রাতে ফিরেছিলো। ভীষণ নেশা করা ছিল। বাগানের পাশে পড়ে ছিলো সারা রাত। সবাই ঘৃণায়, রাগে তার আশেপাশেও যায়নি। শুধু আমি গেছিলাম।”
রত্নপ্রভা চোখ নামিয়ে ফেললো।
“সেদিন আমি কাদতে কাদতে তাকে বলেছিলাম, ‘আপনি যদি আর কখনও এসব খান, আমি আর আপনার সঙ্গে কথা বলবো না।’”
তার ঠোঁট কেঁপে উঠলো।
“সে প্রথমে হেসেছিলো। তারপর আমার দিকে অনেকক্ষণ তাকিয়ে ছিল। এমনভাবে… যেন প্রথমবার কেউ তাকে সত্যি সত্যি থামতে বলেছে।”
ভোরের বাতাসে তার ওড়না উড়ে উঠলো হালকা।
“তারপরের থেকে সে সব ছেড়ে দিলো।”
খুব আস্তে, প্রায় ফিসফিস করে বললো রত্নপ্রভা
রত্নপ্রভা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে কবরটার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর খুব আস্তে বললো
“তাকে দেখলে প্রথমেই ভাইজান এর কথা মনে পড়তো। দুজনের আদলে অদ্ভুত মিল ছিল। যেন একই মুখ, শুধু দুটো আলাদা স্বভাব।”
তার চোখের সামনে যেন আবার সেই মুখটা ভেসে উঠলো।
“অরণ্য খুব লম্বা ছিল। দীর্ঘদেহী, যে ভিড়ের মধ্যেও তাকে আলাদা করে চোখে পড়তো। তার কাঁধ চওড়া, শরীরটা সুগঠিত। কিন্তু তবুও তার মধ্যে কোনো কঠিন ভাব ছিল না। বরং কেমন যেন উদাস, বাউন্ডুলে একটা সৌন্দর্য।”
রত্নপ্রভার গলা ধীরে ধীরে নরম হয়ে এলো।
“তার গায়ের রং ছিল কাঁচা হলুদের মতো টকটকে। রোদে দাঁড়ালে আরও উজ্জ্বল লাগতো। আর চুলগুলো”
সে হালকা হেসে ফেললো
“খুব মসৃণ ছিল। নরম, কালো। সবসময় একটু এলোমেলো হয়ে থাকতো। আমি রাগ করে বলতাম, অন্তত চুলটা ঠিক করে রাখুন। সে হেসে বলতো, ‘তুমি ঠিক করে দাও।’”
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ শুনছে।
“কিন্তু সবচেয়ে বেশি অমিল ছিল তাদের চোখে” খুব আস্তে বললো রত্নপ্রভা।
“ভাইজান এর চোখের মণি বড়ই বিরল। এমন মানুষ হয়তো ভাগ্যফেরে দেখা যায়। কিন্ত অরণ্যের চোখ গভীর, কালো। ভাইজান এর চোখে সবসময় একটা কঠোরতা থাকে। আর অরণ্যের চোখে ছিল দুষ্টুমি আর সরলতা ।”
একটু থেমে সে ফিসফিস করে বললো
“ সবচেয়ে সুন্দর ছিল তার হাসি। ও যখন হাসতো… তখন মনে হতো পৃথিবীতে তার চেয়ে সুন্দর মানুষ আর নেই।”
রত্নপ্রভা আবার সেই ভোরের স্মৃতিগুলো মনে করলো। অরণ্য যখন মহলে থাকতো, সে সারাক্ষণই তার আশেপাশে ঘুরঘুর করতো। অরণ্যের প্রতিটি অদ্ভুত খোঁজখবর, প্রতিটি দুষ্টুমি রত্নপ্রভা লুকিয়ে দেখে, হঠাৎ হেসে, হঠাৎ চুপচাপ।
একবার অরণ্যের খুব জ্বর হয়েছিল। অরণ্য তখন তার রাগের জন্য বিখ্যাত, কারো কথাই মানতো না। পুরো মহল চুপচাপ, কেউই তার কাছে যেতে সাহস পেল না। কিন্তু রত্নপ্রভা, অদ্ভুত সাহস নিয়ে, জলপট্টি হাতে তার কাছে গেল।
অরণ্য তাকে গভীরভাবে তাকিয়ে দেখলো। কেন জানি না সবার কথার বিরুদ্ধে গেলেও এই মেয়েটার বিরুদ্ধে যেত না সে। প্রভাকে সূক্ষ্ম চোখে দেখলো। তারপর খুব ধীরেবললো
“রত্না, আমার এই উদ্দেশ্যহীন, ছন্নছাড়া জীবনটাতে তুই জড়াস না। তোর জন্য কোনো শাহজাদা আসবে, দেখিস।”
রত্নপ্রভা চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলো। অরণ্যের চোখের সেই কঠিন সততা, সেই শক্ত স্বভাব সবই তাকে থমকে দিয়েছে। তার হৃদয় ভেঙে গেছে, কাঁপছে, কিন্তু সে কিছু বলতে পারলো না।
সেই রাতেই রত্নপ্রভা তার কক্ষে ফিরে গিয়ে নিজের কাঁধে মুখ ঢেকে চুপচাপ কাঁদলো। সে জানতো, নিজের এই হৃদয় ইতিমধ্যেই অরণ্যের জন্য ধ্বসে গেছে। সে নিজেকে আটকাতে চাইছিল, কিন্তু অরণ্যের উপস্থিতি এবং সেই দৃঢ় শব্দ তার সমস্ত প্রতিরোধ ভেঙে দিয়েছে।
রাতের নিস্তব্ধতায় তার কাঁদার শব্দ মিলিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু সে জানে, এই কান্নার প্রতিটি ফোঁটা তার ভালোবাসার প্রতিফলন যা অরণ্যের জন্যই জন্মেছে। পরের সকাল। সূর্যের হালকা কিরণ জঙ্গলের কোলের সবুজ পাতার মধ্যে দিয়ে ঢুকছে। পাখির কিচির-মিচির, বাতাসের মৃদু গান সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত শান্তি।
অরণ্য ঘোড়ায় চেপে বসেছে, আর রত্নপ্রভা তার পিছে । সেদিনটা ছিল ভিন্ন। অরণ্য তার রাগ ভাঙাতে, সেই কঠিন, ছন্নছাড়া মনকে কিছুটা শান্ত করতে ঘোড়া চড়ে তাকে নিয়ে জঙ্গলের গভীরে এসেছে।
নদীর পাড়ে এসে ঘোড়া থেমে গেল। জল ঝর্ণার মতো স্বচ্ছ। পানি নীরবে বয়ে যাচ্ছে। সেই নদীর ধারে তারা দুজন দাঁড়িয়ে আছে অরণ্য তার ঘোড়া সামলে, আর রত্নপ্রভা মৃদু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে।
হাওয়ায় অরণ্যের চুল এলোমেলো। তার চোখে সেই দুষ্টুমি আর গভীরতা মিশে আছে। নদীর নীরবতা যেন তাদের দুজনকেই আলিঙ্গন করছে।
হঠাৎ অরণ্য রত্নপ্রভার দিকে তাকিয়ে ধীরে বললো, চোখে এক অদ্ভুত সততা
“রত্না… আমাকে ভালোবাসিস?”
বলেই সে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো, যেন নদীর শান্তি তাদের দুজনের উত্তরে শোনার অপেক্ষায়।
রত্নপ্রভার চোখ বড় হয়ে গেল। মুখে কোনো শব্দ নেই, কিন্তু তার সমস্ত শরীর, চোখ, হাসি সবই উত্তর দিয়েছে। হৃদয় নিজেই উত্তর দিয়েছে।
রত্নপ্রভা অল্প কাঁপা হাতে মাথা নেড়ে, চোখের মৃদু আভা দিয়ে লাজুকভাবে সম্মতি জানালো হ্যাঁ, সে অরণ্যকে ভালোবাসে। তার গাল লাল, আর চোখে এক ধরনের মৃদু অস্থিরতা, যেন পুরো হৃদয়ই সেই মুহূর্তে অরণ্যের দিকে ধাবিত।
অরণ্য ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে এল। নদীর মৃদু স্রোত, পাখির কিচির-মিচির সব মিলিয়ে যেন তাদের চারপাশকে শান্তির আবরণে ঢেকে দিয়েছে। সে হাসলো।
“ভালোবাসিস, তাই বলছিস?”
সে কথাটা বললো, চোখে ধোঁয়ার মতো গভীরতা। “ভালোবাসলে যে সংসার করতে হয়, সেটা জানিস তো। আর আমাকে দিয়ে যে সংসার হবে না, রে।”
রত্নপ্রভার চোখ কিছুটা বড় হয়ে গেলো। সে কণ্ঠ ভাঙা হলেও কিছু বলতে পারলো না। অরণ্য আরও কাছে এলো, তার হাত আস্তে রত্নপ্রভার কাঁধে পড়লো।
“যদি আমার সব স্বভাব, আমার সব উদাসীনতা, আমার সব বাউন্ডুলে জীবন। এক কথায় সম্পূর্ণ আমি টার সব মেনে নিতে পারিস, তাহলে”
সে থেমে গিয়ে গভীরভাবে তাকালো,
“তাহলে আমি তোর ওপর আসক্ত হতে পারি। আর এই আসক্তি… ছেড়ে যাওয়া যাবে না।”
রত্নপ্রভা নিঃশ্বাস আটকে রেখে তার চোখে চোখ রেখে শুধু মাথা নেড়ালো। নদীর পানি হালকা ছলছল করছে, আর জঙ্গলের সবুজ বাতাস যেন এই মুহূর্তের সাক্ষী। রত্নপ্রভার মন ভারী হয়ে এল। নদীর পাড়ে দাঁড়িয়ে, অরণ্যের চোখের মধ্যে সেই অদ্ভুত অস্থিরতা দেখে সেও বুঝলো মানুষটা ইতিমধ্যেই আসক্ত হয়ে পড়েছে। কিন্ত তার এমন স্বভাবের জন্য তো পরিবার এ বিয়ে দেবে না। তার মনটা খারাপ, হৃদয়টা অস্থির। সে ভাবলো, অরণ্য খুব স্বাধীন, খুব বাউন্ডুলে, যার সঙ্গে জীবনের বন্ধন বাঁধা যাবে কি না, তা ভাবলেই কষ্ট হয়।
অরণ্য তার অনুভূতি বুঝতে পেরেছে। সে আস্তে রত্নপ্রভার হাত ধরে, নদীর হাওয়ার মতো মৃদু করে বললো
“রত্না, আমি জানি, আমার স্বভাব তোর জন্য কঠিন। সবাই বলে, আমার সঙ্গে কেউ সংসার করবে না। কিন্তু শুনে রাখ। গোটা দুনিয়ার প্রতি আমি বিমুখ হতে পারি, কিন্ত আমার প্রতি তুই বিমুখ হলে আমি বাঁচবো না। আমি ভালো স্বামী হবো শুধু তোর জন্য। দেখিস”
রত্নপ্রভার চোখে পানি এসে ভিজে উঠলো। অরণ্য তার দিকে ধীরে এগিয়ে এল, চোখে অদ্ভুত এক দৃঢ়তা।
“ আমি প্রতিশ্রুতি দিচ্ছি, আজ থেকে তোর জন্য যোগ্য জমিদার পুত্র হবো। কেউ তোর স্বামী কে নিয়ল কথা শোনাতে পারবে না। আর তোর পাশে থাকতে চাই।”
রত্নপ্রভার হৃদয় আবার উজ্জ্বল হয়ে উঠলো। নদীর নীরবতা, পাখির গান, সবই যেন তাদের চারপাশে একটা অদ্ভুত শান্তি ছড়িয়ে দিলো। সে মাথা হালকা করে নেড়ে অল্প হাসলো। মনে হলো, জীবনের সমস্ত অস্থিরতা, সমস্ত দুঃখ মুহূর্তের জন্য অদৃশ্য হয়ে গেছে।
রত্নপ্রভার চোখ ভরে উঠলো। মেহেরুন্নেসার ও চোখ জোড়া চিকচিক করছে। ধরা গলায় মেহের বলল
“কি চমৎকার ছিলো তোমাদের প্রেম কাহিনি”
প্রভার মুখটায় বিষাদের ছায়া নেমে এলো
“ততটাই ভয়ংকর ছিলো আমাদের বিচ্ছেদ। সবটা ভালো চলছিলো তার পর থেকে। সে পরিবর্তন হতে শুরু করে। মদ্যপান ত্যাগ করে। রাত্রি ভোজের আগেই বাড়ি ফেরে। কথা ভাষা মার্জিত হয়। চাচাজান এর দেওয়া টুকটাক কাজগুলোও করে। ভাইজান এর থেকে অনেক কাজ বুঝে নিয়ম করে। সুযোগ পেলেই আমায় নিয়ে ঘুরতে যায় ঘোড়া ছুটিয়ে। আমাকে ঘোড়া চালানো, তীর ছোড়া, তলোয়ার চালানো সব সে নিজে হাতে শেখায়।”
মেহেরুন্নেসা চোখ সরু করে তাকায়
“তাহলে ভয়ংকর বিচ্ছেদের কথা বলছো কেন?”
রত্নপ্রভার চোখ মুখ কঠিন হয়ে ওঠে। যেন পুড়নো ক্ষত তে কেউ খোচা দিয়েছে।
“সেই রাতটা ছিলো বিভীষিকা ময়। আবার নেশা করেছিল সে।”
ঢোক গিলে রত্নপ্রভা। তার হাত-পা কাঁপতে শুরু করে। মেহেরুন্নেসা দূরে দাড়িয়েও যেন তার হৃৎস্পন্দন শুনতে পাচ্ছে। সকালের শীতল আবহাওয়া তেও দরদর করে ঘামতে থাকে। চোখ গুলি আতঙ্কে কোটর ছেড়ে বেরোনোর উপক্রম।
তোমরা রিয়্যাক্ট দাও না কেন আশ্চর্য 🙂 গত পর্ব গুলির চাইতে পাঠক আরো বাড়ছে। অথচ রিয়্যাক্ট কমছে। অন্যদের মতো দুইদিন পর পর পর্ব দেওয়া শুরু করলে রিয়্যাক্ট অনেক আসতো।
কেমন হইছে বলিও। আর কি মনে হয় পরের পর্বে কি হতে চলেছে অনুমান করো তো 😌🫶
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪২ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৮ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২০