নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
২১ এর শেষাংশ
মেহেরুন্নেসা তখনও ছবিটার দিকে তাকিয়ে আছে। ছবিটার মানুষটার মুখ, চোয়ালের গড়ন, ঠোঁটের কোণের সেই অদ্ভুত বাঁক সবকিছুই যেন বাইজিদের মতো। শুধু চোখ দুটো আলাদা। ছবির মানুষটার চোখ ছিল গভীর কালো, আর বাইজিদের চোখে আছে সেই অস্বাভাবিক সবুজ আভা। তবে আরেকটা অমিল লক্ষ্য করলো মেহেরুন্নেসা। ছবিটার বাম ভ্রুর ওপরে বড় একটা তিল আছে। কিন্তু বাইজিদ এর কপালে কোনো তিল নেই।
মারজান ছবিটার দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো। তার মুখের রং ধীরে ধীরে ফ্যাকাশে হয়ে এলো। ঠোঁট শক্ত হয়ে গেল। যেন বহু বছরের পুরোনো কোনো অতীত আবার সামনে এসে দাঁড়িয়েছে।
ঠিক তখনই দরজার বাইরে তাড়াহুড়ো করে কারো পায়ের শব্দ শোনা গেল।
“বড় বেগম!”
হাঁপাতে হাঁপাতে ঘরে ঢুকলো এক দাসী।
“ছোট আম্মা এসেছেন। বৈঠকখানায় বসেছেন।”
কথাটা শোনামাত্র মারজান যেন চমকে উঠলো। তার চোখে স্পষ্ট অস্থিরতা ফুটে উঠলো। এক মুহূর্তও দেরি না করে সে মেহেরুন্নেসার হাত থেকে ছবিটা টেনে নিল।
“এটা লুকাও। এখনই!”
খুব নিচু গলায়, কিন্তু কড়া স্বরে বললো সে। মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে রইলো।
“কেন? এই ছবিটা….?”
“আমি যা বলছি তাই করো!”
মারজানের কণ্ঠে এমন তীব্রতা ছিল যে মেহেরুন্নেসা আর কথা বললো না। মারজান দ্রুত চারদিকে তাকিয়ে কাঠের বাক্সটার নিচে পুরোনো কাপড়ের ভাঁজ সরিয়ে দিল। ছবিটা সেখানে গুঁজে দিয়ে আবার কাপড়গুলো আগের মতো করে রাখলো। তারপর বাক্সটার ঢাকনা বন্ধ করে দিল এমনভাবে, যেন কখনো খোলাই হয়নি।
“এই ব্যাপারে একটা কথাও কাউকে বলবে না,” ফিসফিস করে বললো সে।
“বিশেষ করে তোমার ছোট আম্মার সামনে তো একদম না।”
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধুকপুক করে উঠলো। ছোট আম্মা? কে এই ছোট আম্মা? তার আসাতে এত ভয় কেন? আর এই ছবিটা লুকানোর প্রয়োজনই বা কী?
কিন্তু সে কিছু বলার আগেই মারজান তাড়াহুড়ো করে নিজের ওড়নাটা মাথায় টেনে নিল। কপালের পাশে সরে যাওয়া চুল গুছিয়ে নিয়ে দ্রুত দরজার দিকে এগিয়ে গেল।
দরজার কাছে গিয়ে আবার ফিরে তাকালো সে।
“তুমিও এসো। বেশি দেরি কোরো না।”
এই বলে মারজান প্রায় তড়িঘড়ি করে বেরিয়ে গেল। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো। ঘরটা হঠাৎ করেই অদ্ভুত নীরব হয়ে গেছে। যেন দেয়ালের ভেতরেও কোনো গোপন কথা আটকে আছে। তার চোখ আবার চলে গেল বন্ধ কাঠের বাক্সটার দিকে।
ছবিটা আসলে কার? কেউ কিছু বলছে না কেন? কে এই অরণ্য? বাক্স খুলে ছবিটা বের করে নিল আবার। কোমরে গুঁজে বেরিয়ে এলো ঘর থেকে।
বুকের ভেতর একরাশ প্রশ্ন নিয়ে ধীরে ধীরে সে-ও বৈঠকখানার দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
বৈঠকখানার ভারী কাঠের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই মারজানের পা যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। ঘরের মাঝখানে পিতলের কাজ করা লম্বা আসনে বসে আছে একজন নারী। গাঢ় নীল রঙের আবায়ার উপর সূক্ষ্ম রুপালি কাজ, মাথায় কালো ওড়না। তবুও ওড়নার আড়াল দিয়েও তার রূপ চাপা থাকেনি।
মহিলার নাম আমিনা। বাকের শাহের ছোট ভাই জাবের শাহের স্ত্রী। আট বছর আগে জাবের শাহ মারা যাওয়ার পর থেকেই সে আরব দেশে নিজের বাবার বাড়িতে থাকে। কত বছর পর আজ এই মহলে ফিরে এসেছে।
একসময় এই মহলে আমিনার রূপের গল্প হতো। আরব দেশের মেয়ে, গায়ের রং যেন দুধে আলতা, চোখদুটো লম্বাটে আর গভীর, যেন মরুভূমির রাত। মুখের গড়ন এত নিখুঁত যে তাকে দেখলে মনে হতো কোনো শিল্পী বড় যত্ন করে এঁকেছে।
কিন্তু আজ তার মুখে সেই পুরোনো দীপ্তি নেই। সৌন্দর্য এখনও আছে, তবে তার ওপর জমে আছে দীর্ঘ আট বছরের শোকের ছায়া। চোখের নিচে হালকা কালি, ঠোঁটের কোণে ক্লান্তি। যেন অনেকদিন ধরে ভেতরে ভেতরে কাঁদতে কাঁদতে সে শুকিয়ে গেছে।
মারজান দ্রুত এগিয়ে গেল।
“আমিনা…”
আমিনা মাথা তুলে তাকালো। মুহূর্তেই তার চোখে জল চিকচিক করে উঠলো। সে উঠে দাঁড়াতেই মারজান তাকে জড়িয়ে ধরলো।
“কেমন আছো?”
আমিনা মৃদু হাসলো। সেই হাসিতেও বিষণ্ণতা।
“ভালো আছি বললে মিথ্যে বলা হবে আপা। তবে আল্লাহ যেভাবে রেখেছেন…”
তার বাংলা উচ্চারণ গুলো একটু অন্যরকম। বংশগতই সে আরবীয়। মারজান তার হাত চেপে ধরলো।
“এতদিন পর এলে। একটা খবরও দিলে না?”
“হঠাৎই আসা”
নিচু গলায় বললো আমিনা।
“মনটা কেমন করছিলো। এই মহল… এই মানুষগুলো… সবকিছু খুব মনে পড়ছিলো।”
মারজানের বুকের ভেতরটাও কেমন হু হু করে উঠলো। এই মেয়েটা একসময় কত প্রাণবন্ত ছিল। মহলজুড়ে তার হাসির শব্দ শোনা যেত। জাবের শাহের পাশে দাঁড়িয়ে কেমন উজ্জ্বল লাগতো তাকে। কিন্তু সেই মানুষটাই নেই। আট বছর হয়ে গেছে। তবুও আমিনার চোখে এখনও সেই শোকের ছাপ।
“তুমি একদম শুকিয়ে গেছো,”
কষ্ট মেশানো গলায় বললো মারজান।
“নিজের যত্ন নাও না?”
আমিনা চোখ নামিয়ে ফেললো।
“যার জন্য সাজতাম, যার জন্য নিজের খেয়াল রাখতাম, সে তো নেই আপা।”
কথাটা শুনে কয়েক মুহূর্তের জন্য ঘরে নীরবতা নেমে এলো। তারপর মারজান নিজেকে সামলে নিল। একটু চারদিকে তাকিয়ে বললো,
“কোথায়? আমাদের বউ মা কোথায়? মহলে আসতেই শুনলাম এ ব্যাপারে”
ঠিক তখনই দরজার কাছে নরম পায়ের শব্দ হলো। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে বৈঠকখানায় ঢুকলো। তার মাথায় ঘোমটা টানা, চোখেমুখে হালকা কৌতূহল আর অস্বস্তি।
মারজান হাত তুলে ডাকলো,
“এসো মেহেরুন্নেসা।”
মেহেরুন্নেসা কাছে এগিয়ে এলো। মারজান তার দিকে তাকিয়ে বললো,
“এ হলো আমার ছোট জা, আমিনা। জাবেরের বউ। তোমার চাচি শাশুড়ি। ছোট আম্মা হয় উনি হুমম”
আমিনা ধীরে ধীরে চোখ তুলে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালো। তারপর যেন তার পুরো মুখের রং বদলে গেল। চোখদুটো বিস্ময়ে বড় হয়ে উঠলো।
সে স্থির হয়ে তাকিয়ে রইলো মেহেরুন্নেসার মুখের দিকে। যেন সে চারপাশের সবকিছু ভুলে গেল।
এই মহলে একসময় সুন্দরী বধূ বলতে সবাই তাকে চিনতো। তার রূপের গল্প দূরদূরান্ত পর্যন্ত ছড়িয়েছিল। আরব দেশের মেয়ে, দুধসাদা গায়ের রং, টানা চোখ, লম্বা চুল। নিজের সৌন্দর্য নিয়ে তার গোপন অহংকারও ছিল। মনে হতো, এই মহলে তার মতো সুন্দর আর কেউ কোনোদিন আসবে না।
কিন্তু আজ মেহেরুন্নেসাকে দেখে হঠাৎ করে নিজের সেই যুবতী বয়সের রূপও তার কাছে ফিকে লাগলো।
মেয়েটার মুখ যেন কারো হাতে নিখুঁত করে গড়া। কপালটা মসৃণ, চোখদুটো গভীর আর স্বচ্ছ, যেন ভোরবেলার নদী। নরম গোলাপি ঠোঁট, গালের পাশে ছোট্ট ছায়া, আর সেই স্নিগ্ধতা যেটা কোনো গহনা, কোনো সাজ দিয়ে পাওয়া যায় না।
মাথার ঘোমটার আড়ালেও মেহেরুন্নেসাকে এমন লাগছে যেন কোনো রাজপ্রাসাদের দেয়ালে আঁকা জীবন্ত ছবি। আমিনার বুকের ভেতর কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠলো। এত সুন্দরও মানুষ হয়?
সে এতটাই বিস্মিত হয়ে গিয়েছিল যে কিছুক্ষণ কথা বলতেই ভুলে গেল।
মারজান বিষয়টা টের পেয়ে একটু কড়া গলায় বললো,
“কি হলো? এভাবে তাকিয়ে আছো কেন? ছোট আম্মাকে সালাম করো। পায়ে হাত দিয়ে সালাম দাও।”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করলো। ঘোমটার আড়াল থেকে শান্ত চোখে একবার আমিনার দিকে তাকিয়ে সে ঝুঁকে পড়তে গেল।
কিন্তু তার আগেই আমিনা তড়িঘড়ি করে তাকে আটকালো।
“না, না…”
সে দুহাতে মেহেরুন্নেসার মুখ তুলে ধরলো।
তারপর খুব ধীরে, খুব মমতা নিয়ে মেয়েটার দুই গালে হাত বুলিয়ে দিল। আঙুলের নিচে এত কোমল, এত নিখুঁত ত্বক যে তার মনে হলো সে কোনো মানুষকে ছুঁয়ে নেই ছুঁয়ে আছে মোম দিয়ে গড়া কোনো পুতুলকে।
আমিনা ফিসফিস করে বললো,
“হায় আল্লাহ… এ তো একেবারে মোমের পুতুল।”
তার চোখে বিস্ময়ের সাথে অদ্ভুত এক মায়াও এসে জমলো।
“এত সুন্দর মেয়ে আমি জীবনে দেখি নি।”
মেহেরুন্নেসা লজ্জায় চোখ নামিয়ে ফেললো। গালের পাশে হালকা লাল আভা ফুটে উঠলো।
মারজান হেসে বললো,
“তোমার মতোই তো সুন্দর।”
আমিনা ধীরে মাথা নাড়লো।
“না আপা,”
তার কণ্ঠে কেমন যেন হারিয়ে যাওয়া স্বীকারোক্তি, “আমার রূপের সাথে এর তুলনাই হয় না।”
আমিনা অনেকক্ষণ ধরে মেহেরুন্নেসার মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো। যেন চোখ সরাতে পারছে না। তারপর ধীরে ধীরে নিজের গলার ভারী রত্নহারটার দিকে হাত বাড়ালো। হারটা ছিল পুরোনো, কিন্তু অপূর্ব। সোনার ওপর লাল আর সবুজ পাথরের সূক্ষ্ম কাজ। নিশ্চয়ই বহু বছর ধরে খুব যত্নে রেখে দিয়েছে সে। মারজান অবাক হয়ে বললো,
“এটা কি করছো আমিনা?”
আমিনা কোনো উত্তর দিল না। সে হারটা খুলে নিয়ে মেহেরুন্নেসার সামনে দাঁড়ালো।
“এটা তোমার।”
মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো।
“না, ছোট আম্মা, এটা…”
“চুপ,”
নরম গলায় থামিয়ে দিল আমিনা।
“তোমার গলায় বড্ড মানাবে।”
সে নিজ হাতে মেহেরুন্নেসার ঘোমটার ভেতর দিয়ে হারটা পরিয়ে দিল। ঠান্ডা পাথরগুলো গলায় ছুঁতেই মেহেরুন্নেসা কেমন অস্বস্তিতে মাথা নিচু করে ফেললো। কিন্তু আমিনা যেন আরো বেশি মুগ্ধ হয়ে গেল। হারটা পরার পর মেয়েটাকে যেন আরও বেশি উজ্জ্বল লাগছে। মনে হচ্ছে, কোনো বাদশাহি পরিবারের রাজকন্যা এসে দাঁড়িয়ে আছে তার সামনে।
আমিনা ধীরে ধীরে হাত বাড়িয়ে মেহেরুন্নেসার থুতনি ছুঁলো। তারপর খুব মায়াভরা চোখে তাকিয়ে নিজের আঙুলে আলতো করে তার থুতনিতে চুমু খেল।
“আল্লাহ তোমাকে সব অশুভ নজর থেকে বাঁচিয়ে রাখুক। তোমার শাশুড়ীও এমন সুন্দরী ছিল।”
ফিসফিস করে বললো সে। মেহেরুন্নেসা লজ্জায় আর অস্বস্তিতে একেবারে মিইয়ে গেল। এত আদর, এত মুগ্ধতাসবকিছুই তার কাছে নতুন লাগছে।
মারজান মনে মনে হিংসায় জ্বলে গেলেও আমিনার সামনে তা প্রকাশ করলো না। এরই মধ্যে সিমরান আসলো খবর পেয়ে। এসেই কদমবুসি করলো।
“ছোট আম্মা, আপনাকে কত কাল পরে দেখলাম। কেমন আছেন আপনি?”
আমিনা তেমন আগ্রহ দেখালো না। মারজান দাঁত কিটমিট করে মেহেরুন্নেসা কে বললো,
“যাও, হেঁশেলে গিয়ে দেখো নাস্তার আয়োজন ঠিকমতো হচ্ছে কি না।”
মেহেরুন্নেসা মাথা নেড়ে সরে যেতে নিল।
ঠিক তখনই এক দাসী দ্রুত পায়ে বৈঠকখানায় ঢুকলো।
“শাহজাদা ছোট বেগমকে ডাকছেন।”
মেহেরুন্নেসা থমকে দাঁড়ালো।
“আমাকে?”
দাসী মাথা নেড়ে বললো,
“জি। এখনই যেতে বলেছেন।”
মারজানের মুখে সঙ্গে সঙ্গে বিরক্তির ভান ফুটে উঠলো।
“এই তো একটু আগে ঘর থেকেই এলে । এর মাঝেই আবার ডাক?”
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। গালের কোণে লাজুক হাসি ফুটে উঠেছে।
“যাও, যাও,”
হাত নেড়ে বললো মারজান।
“তোমার শাহজাদা তো এক মুহূর্তও থাকতে পারে না।”
মেহেরুন্নেসা আর কিছু না বলে দ্রুত পায়ে বেরিয়ে গেল। সিমরান ভেংচি কেটে মুখ অন্য দিকে ফেরালো। সে চলে যেতেই মারজান একটু ঝুঁকে আমিনার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
“এই ছেলেটা বিয়ে করতে না করতেই বউ পাগল হয়ে গেছে।”
আমিনা মৃদু হেসে দরজার দিকে তাকালো, যেদিক দিয়ে মেহেরুন্নেসা গেল।
তারপর ধীরে ধীরে বললো,
“হবে না-ই বা কেন? এমন বউ পেলে কোনো পুরুষই কি স্বাভাবিক থাকতে পারে?”
সিমরান এর কানে বিষের মতো লাগছিলো কথ গুলো। আমিনাকে ভেংচি কেটে সেও চলে গেলো
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে কক্ষের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। ঘরে ঢুকেই সে থমকে গেল।
বাইজিদ জানালার পাশের নিচু পালঙ্কে বসে আছে। এক পা আরেক পায়ের ওপর তুলে, হাতে ছোট্ট একখানা বই। মুখে এমন ভাব, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুর সাথেই তার কোনো আগ্রহ নেই।
মেহেরুন্নেসা একবার দাসীর কথা মনে করল, যে বলেছিল শাহজাদা খুব জরুরি কাজে ডাকছেন। অথচ এখানে এসে দেখছে লোকটা দিব্যি নিশ্চিন্তে বসে আছে! সে দরজা বন্ধ করে ধীরে ধীরে ভেতরে এলো। ঠিক তখনই বাইজিদ বইটা নামিয়ে তার দিকে তাকালো।
তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত, রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো। চোখদুটো সরু হয়ে এলো। সেই সবুজ দৃষ্টি যেন মেহেরুন্নেসার মুখ ভেদ করে ভেতর পর্যন্ত পৌঁছে যাচ্ছে।
মেহেরুন্নেসার বুকটা কেমন কেঁপে উঠলো।
এই মানুষটার দিকে তাকালেই কেন জানি তার নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকে না। কিন্তু আজকে কেমন অদ্ভুত ভাবে দেখছে বাইজিদ। মেহেরুন্নেসার নিজেকে ধরা পড়া চোরের মত লাগছে।
“ডেকেছেন?”
জড়ানো গলায় বললো সে। বাইজিদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু সেই একইভাবে তাকিয়ে রইলো।
মেহেরুন্নেসা অস্বস্তিতে চোখ সরিয়ে নিল। নিজেকে ব্যস্ত দেখানোর জন্য দ্রুত আলমারির কাছে গিয়ে দরজা খুললো। ভেতরে রাখা জামাকাপড় গুছিয়ে ভাঁজ করতে লাগলো।
কিন্তু তার হাত কাঁপছে।
সে বুঝতে পারছে, বাইজিদের দৃষ্টি এখনও তার পিঠে গেঁথে আছে। একটু পর ভারী পায়ের শব্দ শোনা গেল। তারপর আচমকাই পিছন থেকে দুটো শক্ত হাত এসে তাকে জড়িয়ে ধরলো।
মেহেরুন্নেসা চমকে উঠলো। বাইজিদ তার ঘাড়ের কাছে মুখ নামিয়ে আনলো। তার গলার গভীর, ভারী স্বরটা কানের কাছে ধীরে ধীরে বেজে উঠলো
“বারে বারে ঘুঘু তুমি খেয়ে যাও ধান…”
মেহেরুন্নেসার আঙুলের ফাঁক থেকে কাপড়টা প্রায় পড়ে যেতে নিল। বাইজিদ আরও ঝুঁকে এল। তার কণ্ঠে কেমন অদ্ভুত গাঢ়তা।
“আজই বধিবো আমি তোমার পরাণ।”
মেহেরুন্নেসা আতঙ্ক মেশানো চোখে পিছনে তাকাতে গেল। বাইজিদ ঠোঁট বাঁকিয়ে হেসে উঠলো।
“এত ভয় পাচ্ছো কেন? আমি কি বাঘ নাকি?”
“আপনি আমাকে এভাবে ভয় দেখান কেন?”
“কারণ ভয় পেলে তোমার মুখটা আরও সুন্দর লাগে।”
মেহেরুন্নেসা তাড়াতাড়ি তার হাত ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।
“আমাকে ছাড়ুন। দরজা খোলা। কেউ দেখে ফেলবে।”
“কোথায়? দরজা তো বন্ধই।”
মেহেরুন্নেসা শুকনো ঢোক গিলল। ভয়ে ভুলভাল বেরোচ্ছে তার মুখ দিয়ে। বাইজিদ এবার তাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে নিল। তার চোখে তখন সেই চিরচেনা রহস্যময় ঝিলিক।
“জানো? তোমাকে ছাড়া রাত টা আমার পানসে লাগে বড়”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো। চোখ যেন কোটর ছেড়ে বেরিয়ে আসার উপক্রম। বাইজিদ নিশ্চিত টের পেয়ে গেছে।
বাইজিদ তার গলার রত্নহারটার দিকে তাকিয়ে বললো,
“তোমাকে এত সুন্দর লাগছে যে এখন আমার মনে হচ্ছে, এই পুরো মহল থেকে তোমাকে লুকিয়ে………”
ফিক করে হেসে ফেলল বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। বাইজিদের চোখদুটো আজ অন্যদিনের চেয়ে আলাদা লাগছে। সেই সবুজ দৃষ্টির ভেতর যেন কেমন অদ্ভুত এক তীব্রতা। ঠোঁটে হাসি আছে, কিন্তু সেই হাসিটা তার বুকের ভেতর কেমন অকারণ শীতলতা নামিয়ে দিল। সে ধীরে ধীরে বাইজিদের হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর চেষ্টা করলো।
“আমি নিচে যাই?”
খুব আস্তে বললো সে।
“ছোট আম্মা এসেছেন। আপনাকে খবর দিতে এসেছিলাম।”
বাইজিদ যেন শুনলোই না। সে আরো কাছে টেনে নিল মেহেরুন্নেসাকে। এমনভাবে, যেন অনেকদিন পর কাউকে পেয়েছে। তার আঙুলগুলো শক্ত হয়ে আছে মেহেরুন্নেসার বাহুতে।
“ছোট আম্মা?”
বাইজিদ নিচু স্বরে বললো, কিন্তু তার গলায় বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই।
“এসেছে তো এসেছে।”
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকালো।
“আপনি দেখা করতে যাবেন না?”
“পরে যাবো।”
“কিন্তু”
“এখন তোমাকে ছাড়তে ইচ্ছে করছে না।”
বাইজিদ তার মুখের দিকে এমনভাবে তাকিয়ে আছে যেন পৃথিবীতে আর কিছুই দেখছে না। সেই দৃষ্টিতে মুগ্ধতা আছে, কিন্তু তার সাথে আছে এমন কিছু, যেটা মেহেরুন্নেসা বুঝতে পারছে না।
তার বুকের ভেতরটা কেমন ধকধক করে উঠলো।
এই মানুষটা বরাবরই একটু অন্যরকম। কখনো হঠাৎ করে চুপচাপ, কখনো অকারণ হাসি, কখনো এমন দৃষ্টি যেন সে মেহেরুন্নেসাকে নয়, তার ভেতরের অন্য কাউকে দেখছে।
কিন্তু আজ বাইজিদ এর ভাবগতিক বুঝছে না মেহেরুন্নেসা। আস্তে করে বললো,
“আপনার কি হয়েছে?”
বাইজিদ কয়েক মুহূর্ত কোনো উত্তর দিল না। শুধু তার দিকে তাকিয়ে রইলো। তারপর ধীরে ধীরে মুখ নামিয়ে মেহেরুন্নেসার কানের কাছে ফিসফিস করে বললো,
“তোমাকে দেখলে আমার কেমন হয় জানো?”
মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে দাঁড়িয়ে রইলো।
বাইজিদ মৃদু হেসে উঠলো। কিন্তু সেই হাসিটা শুনে তার গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠলো। বাইজিদ গালে হাত বুলিয়ে বলল
“ইশশশ রাতে না ঘুমিয়ে চেহারা টা কেমন মলিন করে ফেলেছ বলোতো”
কথাটা শুনে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর কেমন অদ্ভুত অস্বস্তি জমে উঠলো। আতঙ্কে গলা শুকিয়ে চৌচির। কিন্তু তাকে অবাক করে দিয়ে বাইজিদ বলল
“সারারাত আমায় দেখে কাটাও জানি তো। এত সুদর্শন স্বামী পেয়েছ। তোমারই কপাল”
মেহেরুন্নেসার কুচকানো ভ্রু শিথিল হলো। ঠোঁটে হাসির রেখা ধরে রেখে বলল
“আ…আম্মা ডাকছে। আমি আসি”
এক প্রকার বাইজিদ এর থেকে ছুটে পালালো সে। বাইজিদ তাকিয়ে রইলো যতদূর তাকে দেখা যা। বড় বড় পা ফেলে মেহেরুন্নেসা হেঁশেলে আসলো। হেঁশেলে মারজান একা পায়েস রান্না করছে। মেহেরুন্নেসা আস্তে করে গিয়ে পাশে দাড়ালো
“দিন না আম্মা আমি করে দিচ্ছি”
“না বাপু, আমিনা সবার হাতে পায়েস খায় না”
মেহেরুন্নেসা জড়তা নিয়ে আরেকটু এগিয়ে আসলো মারজান এর। মিনমিনে গলায় বলল
“আম্মা বললেন না তো কে অরণ্য?”
মারজান খ্যাক খ্যাক করে উঠলো। পরক্ষণেই কেউ শুনবে ভেবে গলার স্বর নিচু করলো
“ছেড়ি তুমি বারবার ওই আপদের নাম ক্যান নিতাছো? হুননের এত শখ থাকলে রাইতে ঘরে আইসো ঠান্ডা তিলের তেল লইয়া। পায়ে মালুশ দিও, আমি কমুনে তহন”
মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে বলল
“আচ্ছা আম্মা। আম্মা বলছি, ওনার মানে ছোট আম্মার কি ছেলে মেয়ে নেই?”
মারজান তাকাতেই মেহেরুন্নেসা বলল
“না একা এসেছে তাই বললাম”
মারজান নিজের কপালে চাপড় মেরে বলল
“হায় আল্লাহ আমারে উঠাই নেও। এই মাইয়া বারবার কথা রে হেই এক দিকে লইয়া যায়। আরে অরণ্যই তো তুমার ছোট আম্মার পোলা।”
যারা গল্প হারিয়ে ফেলো, পর্ব খুজে পাও না। তোমরা ফলো দিয়ে রাখো না কেন? ফলো দিয়ে রাখলো গল্প আপলোড দেওয়ার সাথে সাথে তোমাদের কাছে চলে যাবে।
আজও তাড়াতাড়ি দিয়ে দিলাম। কেমন হলো বলিও কিন্তু। রিয়্যাক্ট দিবা আর বেশি বেশি কমেন্ট করবা। তবেই আমার লেখায় মন বসে 🥹🫶।
কমেন্টে কিছু কথা বলেছি চেক দাও জলদি।
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩০
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৬
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪০ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১