Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ২১ এর প্রথমাংশ


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

২১ এর প্রথমাংশ

রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর। কক্ষের সব প্রদীপ নিভিয়ে রাখা। শুধু জানালার পাশে রাখা ছোট্ট পিতলের বাতিটা মৃদু আলো ছড়িয়ে আছে। সেই আলোয় আধো অন্ধকার কক্ষটায় বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসা খুব কাছাকাছি। মেহেরুন্নেসা বাইজিদের বুকের কাছে মুখ লুকিয়ে আছে। তার এলোমেলো চুল ছড়িয়ে আছে বাইজিদের বাহু জুড়ে। বাইজিদের আঙুল ধীরে ধীরে তার চুলে বিলি কাটছিল।
কিছুক্ষণ আগেও তার চোখে ছিল অভিমান, কষ্ট। আর এখন সেই চোখে অদ্ভুত কোমলতা। বাইজিদ নিচু হয়ে মেহেরুন্নেসার কপালে ঠোঁট ছোঁয়ালো।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো। খুব ধীরে সে মুখ তুলে তাকালো শাহজাদার দিকে।
আজ বাইজিদের চোখে কোনো দূরত্ব নেই।
শুধু গভীর, তীব্র এক টান।
মেহেরুন্নেসার মনে হচ্ছিল, এই মানুষটা যেন তাকল ভালোবাসার চাদরে মুড়ে দিয়েছে। বাইজিদ তার গাল ছুঁয়ে ফিসফিস করে কিছু বলতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই তার কণ্ঠ থেমে গেল।
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে দেখলো, বাইজিদের চোখদুটো কেমন ঝাপসা হয়ে আসছে। তার হাতের স্পর্শটাও ঢিলে হয়ে গেল।
“শাহজাদা?”

বাইজিদ যেন শুনতেই পেল না। এক মুহূর্ত পরেই তার মাথাটা ধীরে ধীরে মেহেরুন্নেসার কাঁধের ওপর নুয়ে পড়লো। মেহেরুন্নেসা প্রথমে হেসে ফেলতে যাচ্ছিল। ভাবলো, হয়তো খুব ক্লান্ত। কিন্তু পরের মুহূর্তেই তার বুকের ভেতর কেমন ঠান্ডা হয়ে গেল।
“শাহজাদা?”
সে তাড়াতাড়ি করে বাইজিদ কে পালঙ্কে বসালো।
দুই হাতে বাইজিদের মুখটা ধরলো। কোনো সাড়া নেই। তার নিঃশ্বাস চলছে। মুখ শান্ত। কিন্তু সে অচেতন। একেবারে গত রাতের মতো। মেহেরুন্নেসার হাত কেঁপে উঠলো। গতকাল তো সে নিজেই নিদ্রাবিষ মেশানো দুধ শাহজাদা কে দিয়েছিল । আর তারপর বাইজিদ এভাবেই হঠাৎ ঘুমিয়ে পড়েছিল। কিন্তু আজ? আজ তো সে কিছুই দেয় নি। তাহলে আবার কেন? মেহেরুন্নেসা হতভম্ব হয়ে বসে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে ভয় ঢুকে পড়লো বুকের ভেতর। এটা তো স্বাভাবিক নয়। সে তাড়াতাড়ি পাশের পাত্রে রাখা পানি হাতে নিয়ে বাইজিদের মুখে ছিটালো।
“শাহজাদা! শুনতে পাচ্ছেন? চোখ খুলুন…”

কোনো লাভ হলো না। বাইজিদ নিস্তব্ধ। মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস দ্রুত হয়ে এলো। তার মনে হতে লাগলো, কক্ষের দেয়ালগুলো যেন তাকে ঘিরে আসছে।নকে করেছে এটা?
আজ সে খাবার, শরবত কিছুই তো খায়নি।
হঠাৎ ই তার স্মরণ হলো সিমরান টর কথা। গতদিনও সে এই কাজ করেছে, আজও নিশ্চয়ই ও ই করেছে। রাগে জিে কাঁপতে কাঁপতে সে আবার বাইজিদের হাত নিজের হাতে তুলে নিল। যেন বাঘিনী রুপ ধারণ করেছে। ওড়না টা গায়ে, মাথায় ভালো করে জড়িয়ে বেরিয়ে গেল কক্ষ ছেড়ে। সিড়ি দিয়ে নিচে এসে সোজা গেল সিমরান এর ঘরের সামনে। সিমরান কিছুক্ষণ আগে মারজান এর ঘর থেকে এসে শুয়েছে। সবে ঘুমটা লেগেছে চোখে। সেই সময় দরজায় খটখট শব্দ। বিরক্তি তে কপাল কুচকে আসে তার। এখন আবার কে এলো নাটক করতে।

আবার একটু ভয় ও পায় পায়। এত রাতে কে দরজা ধাক্কাচ্ছে? তবুও উঠে গিয়ে খুলল। দরজার সামনে মেহেরুন্নেসা কে দেখেই তার মেজাজ চড়ে যায়। মাঝরাতে এই মেয়েটা এসেছে তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাতে। রেগে কিছু বলতে যাবে এমন সময় মেহেরুন্নেসা আচমকা চেপে ধরলো সিমরান এর গলা। চাপ এর দরুন কয়েক পা পিছিয়ে কক্ষের ভিতর ঢুকে গেলো দুজন। মেহেরুন্নেসা নিজের সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে টিপে ধরেছে সিমরান এর গলা। চোখ উল্টে আসে সিমরান এর। প্রতিরোধ করার শক্তি টুকু নেই। টলে আসলে মেহেরুন্নেসা নিজেই ছেড়ে দিলো। সিমরান নিজের গলা দুইহাতে আকড়ে ধরে লুটিয়ে পড়লো মেঝেতে। হাসফাস করতে করতে বলল
“ওাগল হয়ে গেছো? আঘাত কেন করছো আমায়? মেরে ফেলবে নাকি? খুনী একটা”

সিমরান এর কথা গুলো যেন মেহেরুন্নেসার রাগের জন্য আগুনে ঘি ঢালার মত। পুনরায় তেড়ে গিয়ে চেপে ধরলো সিমরান এর গাল। দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“তোমার সাহস হয় কী করে শাহজাদা কে নিদ্রাবিষ দেওয়ার? কোন স্বার্থে আমাদের সুন্দর সম্পর্ক নষ্ট করতে উঠে পরে লেগেছো হ্যা? বলোওওও। উত্তর দাও। আমাদের প্রথম রাত তুমি নষ্ট করেছো, কিচ্ছু বলিনি আমিব।আজ আবার কোন সাহসে একই কাজ করলে”

সিমরান আকুতি করে বলল
“বি….বিশ্বাস করো, আমি…আমি আজ কিচ্ছু মিশাই নি শাহজাদার খাবারে। সারাদিন আমি ঘরে ছিলাম।”

“ভাবি, ভাবি কি করছো টা কি? ছাড়ো ওকে। মরে যাবে তো। ভাবি ছাড়ো”

কোথ থেকে চিলের মত ছুটে এসে মেহেরুন্নেসা কে সিমরান এর থেকে টেনে সরালো সুনেহেরা। মেহেরুন্নেসা এখনো হাঁপাচ্ছে
“আমাকে ছাড়ো ছোট আপা, আজ ওকে আমি মেরেই ফেলবো”

মেহেরুন্নেসা কে জোর করে টেনে তুলল সুনেহেরা।
তার গায়ে গাঢ় রঙের ওড়না জড়ানো। মুখে অদ্ভুত তাড়া। চোখদুটো এদিক-ওদিক তাকাচ্ছে। মেহেরুন্নেসা কিছু বলতে যাবে তার আগেই সুনেহেরা তার হাত শক্ত করে ধরে টেনে করিডোরের অন্ধকার কোণের দিকে নিয়ে গেল।
ফিসফিস গলায় বলল
“পাগল হয়ে গেছো? ও আজ নিদ্রাবিষ দেয় নি ভাইজান কে। দিয়েছি আমি”
মেহেরুন্নেসা হতভম্ব।
“কী বললে?”
সুনেহেরা তার দুই কাঁধ চেপে ধরলো।
“ভাবি, ভোর হতে চলেছে। তুমি এখনো কক্ষ থেকে বের হও নি কেন?”

সুনেহেরার গলায় অস্থিরতা।
“আজ অনেক বড় সত্যি সামনে আসতে চলেছে। আর দেরি করো না।”
মেহেরুন্নেসা কিছুই বুঝতে পারছিল না। তার মাথায় এখন শুধু একটাই কথা ঘুরছে।
সে হঠাৎ সুনেহেরার হাত চেপে ধরলো।
“শাহজাদাকে আজ নিদ্রাবিষ কে দিয়েছে?”
সুনেহেরা চুপ।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
“বলো!”
সুনেহেরা ধীরে ধীরে তার দিকে তাকালো।
তারপর খুব নিচু স্বরে বললো
“আমি।”
মুহূর্তেই মেহেরুন্নেসার মুখ সাদা হয়ে গেল।
“তুমি?”
“হ্যাঁ।”
“কেন?”
সুনেহেরা চোখ নামিয়ে নিল। তার কণ্ঠে চাপা কষ্ট।
“কারণ আজ তোমাকে ভীষণ প্রয়োজন”

সুনেহেরা আর এক মুহূর্তও দাঁড়ালো না। মেহেরুন্নেসার হাত শক্ত করে ধরে তাকে নিয়ে দ্রুত পা ফেললো করিডোর ধরে। মহল তখন নিস্তব্ধ। শেষ রাতের ভারী অন্ধকার চারদিকে। দূরে কোথাও একটা নিশাচর পাখির ডাক ভেসে আসছে। সুনেহেরা তাকে নিয়ে গেল পুরনো ভাণ্ডারঘরের পেছনে। দেয়ালের সঙ্গে লাগানো একটা বড় কাঠের তাক সরাতেই নিচে অন্ধকার সিঁড়ি দেখা গেল।
“চলো।”
মেহেরুন্নেসা বিস্মিত চোখে তাকালো।
“এটা…?”
“পেছনের সুরঙ্গ। খুব কম মানুষ জানে।”
কথা শেষ করেই সুনেহেরা আগে নামলো। বাধ্য হয়ে মেহেরুন্নেসাও পেছন পেছন নামতে লাগলো।
নিচে ঠান্ডা, স্যাঁতসেঁতে পথ। দেয়ালের গায়ে পুরনো শ্যাওলা। সুনেহেরার হাতে ধরা ছোট্ট প্রদীপের আলোয় সরু সুরঙ্গটা কখনো ডানে, কখনো বাঁয়ে বেঁকে গেছে। মেহেরুন্নেসা হাঁটছে। কিন্তু তার মন পড়ে আছে বাইজিদের কাছে।
এই মুহূর্তে তার স্বামীর পাশে থাকা উচিত ছিল তার।
আজ রাতে প্রথম বাইজিদ তাকে অভিমান ভুলে কাছে টেনেছিল। সেই চোখ, সেই কণ্ঠ, সেই নরম স্পর্শ সবকিছু এখনো তার শরীরে লেগে আছে। বার বার কানে বারি খাচ্ছে সেই কথাটা
“তুমি… আমাকে এতটা অপছন্দ করো মেহেরুন্নেসা?”
কথাটা আবার কানে বাজতেই বুকটা মোচড় দিয়ে উঠলো তার। সে তো অপছন্দ করে না।
বরং যখন বাইজিদ তার দিকে তাকায়, তার এত কাছে আসে, তখন কেন যেন বুকের ভেতরটা কেঁপে ওঠে। আজ যদি সে একটু আগে বুঝতে পারতো!
যদি সে বাইজিদের দিকে ফিরে বলতো, “আমি রাগ করি নি।”
যদি সে তার হাতটা ধরে রাখতো। কিন্তু সে কিছুই করে নি। আর এখন সে তাকে ফেলে কোথায় যাচ্ছে? মেহেরুন্নেসার চোখ ভিজে উঠলো। সে একবার থেমে দাঁড়ালো।
“আমি ফিরে যেতে চাই।”
সুনেহেরা সঙ্গে সঙ্গে ঘুরে তাকালো।
“পাগল হয়েছো, ভাবি।”
“শাহজাদা একা… তিনি জেগে উঠে”
“তিনি জেগে ওঠার আগেই সব শেষ হয়ে যাবে।”
সুনেহেরার গলায় এমন এক ভয় ছিল, যাতে মেহেরুন্নেসা থমকে গেল। সুনেহেরা হাঁটতে হাটতেই বলল
“তুমি কিছুই জানো না। আজ ভোরের আগে তোমাকে উত্তরের প্রাসাদ থেকে ফিরতে হবে।”

মেহেরুন্নেসা আর কিছু বললো না।
শুধু চোখ নামিয়ে আবার হাঁটতে লাগলো।
সুরঙ্গের শেষ মাথায় এসে একটা ছোট লোহার দরজা খুললো সুনেহেরা। সঙ্গে সঙ্গে ঠান্ডা হাওয়া এসে মুখে লাগলো।
বাইরে পুরোপুরি অন্ধকার না । আকাশ টা ধূসর। চারপাশে কুয়াশা। অল্প কিছুটা দূরে উত্তরের প্রাসাদের কালো অবয়ব দেখা যাচ্ছে।
দুজন চাদর শক্ত করে গায়ে জড়িয়ে সেই দিকেই হাঁটা শুরু করলো।

অল্প সময় হাঁটার পর কুয়াশার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে স্পষ্ট হয়ে উঠলো উত্তরের প্রাসাদ। মেহেরুন্নেসা থমকে দাঁড়ালো। দূর থেকে প্রাসাদটাকে যতটা বড় মনে হয়েছিল, কাছে এসে তার চেয়েও অনেক বেশি বিশাল, অনেক বেশি ভয়ংকর লাগছে।
কালচে পাথরের দেয়ালগুলো জায়গায় জায়গায় ফেটে গেছে। উঁচু মিনারের মাথায় শুকনো লতাপাতা জড়িয়ে আছে। জানালাগুলো অন্ধকার। যেন অনেকগুলো ফাঁকা চোখ তাদের দিকে তাকিয়ে আছে। চারপাশে এমন নিস্তব্ধতা, যেন বহু বছর ধরে এখানে কোনো মানুষের পা পড়ে নি।
ঠান্ডা হাওয়া বয়ে যেতেই মেহেরুন্নেসার শরীরটা রিরি করে উঠলো। সে অজান্তেই নিজের চাদরটা আরো শক্ত করে জড়িয়ে নিল।
“এখানে… আমরা কেন এসেছি?”
তার গলা কেঁপে উঠলো। সুনেহেরা কোনো উত্তর দিল না। সে শুধু দ্রুত পায়ে সামনে এগিয়ে গেল। প্রাসাদের বিশাল লোহার ফটকটা আধখোলা। ধাক্কা দিতেই কঁক করে শব্দ তুলে ধীরে ধীরে খুলে গেল। শব্দটা শুনে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। ওরা ভেতরে ঢুকলো। আর সঙ্গে সঙ্গে মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল।
ভেতরের দৃশ্যটা যেন কোনো মৃত রাজ্যের।
বিশাল হলঘর। এত বড় যে, শেষ মাথাটা পর্যন্ত স্পষ্ট দেখা যায় না। মাথার অনেক ওপরে গম্বুজাকৃতির ছাদ। সেই ছাদজুড়ে পুরনো আঁকা ছবি, কালচে হয়ে যাওয়া নকশা। মাঝখানে ঝুলছে বিরাট এক ঝাড়বাতি। অনেকগুলো মোম অর্ধেক অবস্থায় বসানো সেখানে। সুনেহেরা হাতের প্রদীপ টা একটা মশালে ছুইয়ে সেটা দিয়ে সব গুলো মোম জ্বালিয়ে দিল। হলুদ আলোয় পুরো হলঘরটা যেন আরো বেশি ভয়ংকর, আরো বেশি রহস্যময় হয়ে উঠেছে।

মেঝেটা কালো পাথরের। এত চকচকে, যেন এখনো কেউ নিয়মিত মুছে রাখে। সেই মেঝেতে ঝাড়বাতির আলো পড়ে অদ্ভুত ছায়া তৈরি করেছে। দুই পাশে বিশাল বিশাল দেয়াল। দেয়ালজুড়ে ঝোলানো অসংখ্য পুরনো ছবি।
মেহেরুন্নেসা থমকে তাকিয়ে রইলো। সব ছবিতেই একই পরিবার। একই রক্তের মানুষ। কেউ তলোয়ার হাতে, কেউ সিংহাসনে বসা, কেউ গম্ভীর মুখে দাঁড়িয়ে। কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো, প্রত্যেকের চোখ যেন তাদের দিকে তাকিয়ে আছে।
যেদিকেই মেহেরুন্নেসা তাকায়, মনে হয় ছবির মানুষগুলোও তার দিকেই তাকিয়ে।
তার বুকের ভেতরটা ধীরে ধীরে ভারী হয়ে উঠলো। দুই পাশে ঘুরে উঠে গেছে বিশাল দুটো সিঁড়ি। অন্ধকারের মধ্যে মিলিয়ে গেছে ওপরে। সিঁড়ির রেলিংয়ে ধুলো জমে আছে। কোথাও কোথাও মাকড়সার জাল। তবু কেমন যেন মনে হয়, এইমাত্র কেউ এখানে হেঁটে গেছে।

মেহেরুন্নেসা হঠাৎ খুব নিচু গলায় বললো
“আপা, আমার ভালো লাগছে না।”
সুনেহেরা থামলো না। তার মুখটা অস্বাভাবিক ফ্যাকাশে। চোখদুটো কেমন অস্থির।
“ভয় পেয়ো না। আর একটু।”
ঠিক তখনই উপরে, দোতলার অন্ধকার বারান্দায় যেন কারো ছায়া নড়লো। মেহেরুন্নেসা চমকে মাথা তুলে তাকালো। কেউ নেই। শুধু ঝাড়বাতির আলো কাঁপছে। তার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে। সে তাড়াতাড়ি সুনেহেরার হাত চেপে ধরলো। প্রাসাদটা যেন নিঃশব্দে তাদের গিলে ফেলছে। হলঘর পেরিয়ে সুনেহেরা তাকে নিয়ে গেল ডানদিকের লম্বা করিডোরে।

করিডোরটা আগের চেয়েও অন্ধকার। দেয়ালের মোমদানিগুলোয় মোম রাখা, সুনেহেরা যেটা সামনে পড়ছে সেটাই জ্বালিয়ে দিচ্ছে। তবে আলো এত কম যে চারপাশের ছায়াগুলো আরো গাঢ় হয়ে উঠেছে।
মেহেরুন্নেসার পায়ের শব্দ পাথরের মেঝেতে চাপা প্রতিধ্বনি তুলছে। কিন্তু কয়েক কদম পর থেকেই তার মনে হতে লাগলো, আরেকটা শব্দ আছে।
তাদের পায়ের শব্দের সাথে সাথে যেন আরেকজনও হাঁটছে। নিশ্চিত হতে সে হঠাৎ থেমে গেল। শব্দটাও থেমে গেল।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধকধক করছে। ধীরে ধীরে পিছন ফিরে তাকালো। লম্বা করিডোর। আধো অন্ধকার। দেয়ালে কাঁপতে থাকা মোমের আলো। কেউ নেই।
“কী হলো?”
সুনেহেরা ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করলো।
মেহেরুন্নেসা ঠোঁট ভিজিয়ে বললো,
“আমার মনে হলো… কেউ আছে।”
সুনেহেরা সঙ্গে সঙ্গে তার হাত শক্ত করে ধরলো।
“পেছনে তাকিয়ো না। চলো।”
কিন্তু এরপর থেকে প্রতি কয়েক কদম পর পরই মেহেরুন্নেসার মনে হতে লাগলো, কেউ তাদের অনুসরণ করছে।
খুব নিঃশব্দে, খুব ধীরে। যেন অন্ধকারের আড়াল থেকে একজোড়া চোখ তাদের দেখছে। কখনো মনে হয়, ঠিক পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। কখনো মনে হয়, করিডোরের বাঁকের পাশে কালো ছায়ার মতো কিছু একটা সরে গেল।

একবার তো সে স্পষ্ট শুনলো, তাদের পেছনে যেন কারো পোশাক মেঝেতে ঘষে যাওয়ার শব্দ হলো।
সে তড়াক করে ঘুরে দাঁড়ালো। কেউ নেই। শুধু একটা মোমের শিখা অকারণে দপদপ করে কেঁপে উঠলো। মেহেরুন্নেসার হাত ঠান্ডা হয়ে গেছে।
তার মনে হচ্ছে, এই প্রাসাদের প্রতিটা দেয়াল, প্রতিটা অন্ধকার কোণ, সবকিছু যেন তাদের দেখছে। অবশেষে সুনেহেরা তাকে নিয়ে একটা পুরনো কক্ষের সামনে থামলো। দরজাটা আধখোলা। ভেতরে ঢুকতেই ধুলোর গন্ধে মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস আটকে এলো।
কক্ষটা অনেকদিন ব্যবহার হয় নি। চারপাশে পুরনো আসবাব। ভারী পর্দা। দেয়ালের কোণে মাকড়সার জাল।

কিন্তু ঘরের একদম সামনের দেয়ালে ঝোলানো বিশাল একটা প্রতিকৃতি দেখে মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে গেল। তার মনে হলো, বুকের ভেতরকার সবকিছু হঠাৎ থেমে গেছে। ছবিটায় দাঁড়িয়ে আছে এক যুবক। উঁচু দেহ। গাঢ় পোশাক। তীক্ষ্ণ চোয়াল। ঠোঁটের কোণে চাপা কঠোরতা।
আর সেই মুখ। মেহেরুন্নেসা এক পা এগিয়ে গেল।
তারপর আরেক পা। না। এটা অসম্ভব। এই মানুষটা হুবহু বাইজিদের মতো। একই মুখ। একই ভ্রুর রেখা। একই ঠোঁট। এমনকি চোখের দৃষ্টিটাও।
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে উঠলো।
“এটা…”
সে ফিসফিস করে উঠলো।
“এ তো শাহজাদা…”
মেহেরুন্নেসা আরো কাছে এগিয়ে গেল।
মোমের আলোয় ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইলো।
তারপর হঠাৎ সে থমকে গেল। নজর পড়লো চোখে। ছবির মানুষটার চোখ কালো।
গভীর, অন্ধকার, অস্বাভাবিক কালো। কিন্তু বাইজিদের চোখ তো সবুজ।
সেই অদ্ভুত, দুর্লভ সবুজ, যা সে প্রথম দেখাতেই ভুলতে পারে নি। মেহেরুন্নেসার শরীর শীতল হয়ে গেল। তার হাত কাঁপতে কাঁপতে ছবিটার নিচে রাখা পুরনো নামফলকের ধুলো মুছে দিল।

কিন্তু সেটাও অস্পষ্ট। তবে শেষে শাহ্ লেখা টুকু বেশ ভালোই পড়তে পারলো মেহেরুন্নেসা। এই ছবিটা এবার আর সে হাত ছাড়া করবে না। সুনেহেরা তখন প্রাসাদের নকশায় মোমের আলো ফেলে দিক নির্বাচন করতে ব্যাস্ত। মেহেরুন্নেসা কাচের ফ্রেম থেকে আলগোছে ছাড়িয়ে নিলো ছবিটি। গোল করে মুড়ে আরেকটা ভাজ দিলো। কোমরে গুজে নিয়ে এগিয়ে গেলো সুনেহেরার কাছে।

সুনোহেরা কাগজটা গুটিয়ে বলল
“ভুল জায়গায় এসেছি। মূল সিড়ি থেকে বাম দিকে ভান্ডার ঘর”
ওরা আবার করিডোরে বেরিয়ে এলো। এবার সুনেহেরা আরো দ্রুত হাঁটছে। লম্বা অন্ধকার করিডোর পেরিয়ে, বাঁদিকে একটা সরু সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলো দুজনে। নিচে নামার সঙ্গে সঙ্গে বাতাসটা আরো ঠান্ডা হয়ে উঠলো। স্যাঁতসেঁতে গন্ধ। কোথাও জমে থাকা পুরনো কাঠের গন্ধ, কোথাও ধুলোর।
অবশেষে সুনেহেরা একটা ভারী দরজার সামনে এসে দাঁড়ালো। দরজাটার গায়ে মরিচা ধরা লোহার কাজ। সে দুই হাতে ধাক্কা দিতেই কঁক করে শব্দ তুলে দরজাটা ধীরে ধীরে খুলে গেল।
ভেতরে পুরনো ভাণ্ডারঘর।
বিশাল ঘর। ছাদ এত উঁচু যে ওপরে অন্ধকার ছাড়া কিছুই দেখা যায় না। চারপাশে সারি সারি বড় বড় কাঠের বাক্স। কোথাও লোহার সিন্দুক। কোথাও ভাঙা পালঙ্ক, পুরনো আয়না, ধুলোমাখা পর্দা, ভাঙা মশাল। মনে হয়, বছরের পর বছর ধরে মহলের যত অপ্রয়োজনীয় জিনিস, সব এনে এখানে ফেলে রাখা হয়েছে।
সুনেহেরা হাতে ধরা মশালটা উঁচু করে ধরলো।
“এইদিকে।”
সে একটা কোণের দিকে এগিয়ে গেল। সেখানে পাশাপাশি রাখা তিনটে বিশাল কাঠের বাক্স। বাক্সগুলোর গায়ে ধুলো জমে পুরু আস্তরণ হয়ে গেছে। একটার ওপর একটার মতো পুরনো কাপড়, ছেঁড়া চাদর, ভাঙা ফুলদানী। সুনেহেরা হাঁটু গেড়ে বসে সব সরাতে লাগলো। তার হাত কাঁপছে। মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকিয়ে আছে।
“তুমি কী খুঁজছো?”
“একটা বাক্স।”
“এত বাক্সের মধ্যে কোনটা?”
“কালো কাঠের। উপরে রুপার নকশা করা।”

মেহেরুন্নেসাও ঝুঁকে পড়লো। দুজনে মিলে একটার পর একটা জিনিস সরাতে লাগলো। ধুলো উড়ছে। পুরনো কাঠের গন্ধে নিঃশ্বাস ভারী হয়ে আসছে। একটা সিন্দুক সরাতেই নিচে ছোট্ট একটা কাঠের বাক্স দেখা গেল। কিন্তু সেটা নয়। তারপরে আরেকটা। তারপর আরো একটা।
সুনেহেরা ক্রমশ অস্থির হয়ে উঠছে।
“না… না… এখানেই তো থাকার কথা”

তার গলায় আতঙ্ক। মেহেরুন্নেসা চারদিকে তাকালো। মশালের আলোয় বাক্সগুলোর ছায়া যেন দেয়ালে বিশাল হয়ে উঠেছে। হঠাৎ তার মনে হলো, ভাণ্ডারঘরের অন্ধকার কোণে যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে। সে চমকে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো।
কেউ নেই। শুধু একটা ভাঙা আলমারি। তার বুক ধড়ফড় করছে। ঠিক তখনই সুনেহেরা আচমকা একটা বাক্সের সামনে থেমে গেল।
“পেয়েছি!”
বাক্সটা অন্যগুলোর চেয়ে ছোট। কালচে কাঠ। উপরে ধুলোয় ঢাকা রুপালি নকশা। মাঝখানে একটা অদ্ভুত চিহ্ন খোদাই করা।
সুনেহেরা তাড়াতাড়ি হাতের আঁচল দিয়ে ধুলো মুছলো। তারপর কাঁপা হাতে ঢাকনাটা তুলতে যাবে তখনই দেখলো তাতে তালা লাগানো। মেহেরুন্নেসা এগিয়ে এসে বলল
“এবার চাবি কোথায় পাবে?”

সুনেহেরার ঠোঁটে খেলে গেল রহস্যের হাসি।
“চাবি আমাদের প্রাসাদেই আছে”
ঠিক তখনই বাইরে কোথাও থেকে ভেসে এলো ভারী ধাতব শব্দ।
টং…টং…টং…
প্রাসাদের নিস্তব্ধতার মধ্যে শব্দটা এত জোরে বাজলো যে মেহেরুন্নেসা কেঁপে উঠলো। মনে হলো, পুরো প্রাসাদটা যেন সেই শব্দে কেঁপে উঠেছে।
সুনেহেরার মুখ মুহূর্তেই সাদা হয়ে গেল। তার হাত বাক্সের ওপর থেমে গেল। মেহেরুন্নেসা ফিসফিস করে বললো,
“এটা কিসের শব্দ?”

সুনেহেরা আচমকা ছুটে গিয়ে মেহেরুন্নেসার হাত শক্ত করে ধরে ফেললো। এত জোরে ধরেছে যে ব্যথা পেয়ে উঠলো সে।
“চলো!”
“কী হয়েছে?”
“এক মুহূর্তও এখানে থাকা যাবে না!”
সুনেহেরার গলায় এমন ভয়, এমন মরিয়া তাড়া ছিল যে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ঠান্ডা হয়ে গেল। সে আর প্রশ্ন করতে পারলো না। প্রায় টেনেহিঁচড়ে সুনেহেরা তাকে নিয়ে বেরিয়ে এলো ভাণ্ডারঘর থেকে। করিডোরে বের হতেই আবার বেজে উঠলো সেই ঘণ্টা।
টং… টং…
শব্দটা এবার আরো কাছে, আরো ভারী শোনালো। যেন পুরো উত্তরের প্রাসাদ জুড়ে প্রতিধ্বনি হচ্ছে। সুনেহেরা পেছনে একবার তাকালো।
“দৌড়াও!”
দুজনে প্রায় ছুটে চললো অন্ধকার করিডোর ধরে। মোমের আলো একটার পর একটা পেছনে পড়ে থাকছে। দেয়ালে কাঁপতে থাকা ছায়াগুলোকে দেখে বার বার মনে হচ্ছে, কেউ তাদের সঙ্গে সঙ্গে দৌড়াচ্ছে। মেহেরুন্নেসার শ্বাস কেঁপে উঠছে।
“আপা, কী হয়েছে? কে—”
“চুপ!”
মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে গেল।
“আপা…!”
“তাকিয়ো না!”
প্রায় কেঁদে উঠলো সুনেহেরা।
“দয়া করে, পেছনে তাকিয়ো না। শুধু আমার সঙ্গে চলো।”
টং…
আবার বেজে উঠলো ঘণ্টা।
এবার এত জোরে যে মেহেরুন্নেসার মনে হলো, শব্দটা তার বুকের ভেতর আঘাত করছে।
দুজনে দৌড়ে নিচের সিঁড়ি দিয়ে নেমে এল। বিশাল হলঘরটা পেরিয়ে যখন ফটকের দিকে যাচ্ছে, তখন হঠাৎ কোথা থেকে ঠান্ডা বাতাসের ঝাপটা এলো। ঝাড়বাতির মোমগুলো একসঙ্গে কেঁপে উঠলো। কয়েকটা নিভেও গেল।
অন্ধকারের মধ্যে মেহেরুন্নেসার মনে হলো, দেয়ালে ঝোলানো ছবিগুলোর চোখ যেন তাদের অনুসরণ করছে। ফটক পেরিয়ে বাইরে বের হতেই কুয়াশার ভেতর দিয়ে আবার সেই ঘণ্টার শব্দ ভেসে এলো।
সুনেহেরা আর দাঁড়ালো না। সে মেহেরুন্নেসাকে প্রায় টেনে নিয়ে দৌড়াতে লাগলো সুরঙ্গের দিকে। অবশেষে সুড়ঙ্গে ঢুকে তারা থামলো। বুকে হাত দিয়ে বড় বড় নিশ্বাস নিতে লাগলো। মেহেরুন্নেসা কে বলল
“জোর বাচা বেচে গেছি। দ্রুত ঘরে যাও। সকালে সুযোগ বুঝে দেখা করবো তোমার সাথে। আমাদের দুর্দিন ঘুচতে চলেছে”

মেহেরুন্নেসা সুনেহেরার কথা পুরোপুরি বুঝলো না। তাও মাথা নেড়ে চলে গেল নিজ কক্ষে। বাইজিদ এখনো ঘুমে আচ্ছন্ন। সে আলগোছে গিয়ে শুয়ে পড়লো বাইজিদ এর পাশে।


সকাল এর সূর্যের আজ তেজ নেই। আকাশ মেঘলা। চারিদিকে মেঘ গর্জন করছে। বাইজিদ এর কক্ষের সুবিশাল বারান্দায় পায়চারী করছে মেহেরুন্নেসা। কে উত্তর দিবে এই ছবিটার? কে এই লোক। এটা কি বাইজিদ? নাকি অন্যকেউ। এই মহলের বয়স্ক কাওকে দেখাতে হবে। মেহেরুন্নেসা ছবিটা আঁচলের তলায় লুকিয়ে মারজান এর ঘরে গেলো। মহিলা তখন নিজ কক্ষে আরাম করে পান চিবুচ্ছে। মেহেরুন্নেসা দরজার সামনে থেকে ডাকলো
“আসসালামু আলাইকুম আম্মা। ভিতরে আসতে পারি?”

মেহেরুন্নেসার মুখে আম্মা ডাক শুনে মারজান আর না করতে পারলো না। এতবছরে বাইজিদ একবারও আম্মা ডাকেনি তাকে। কিন্তু তার স্ত্রী ডাকলো।
“ওয়ালাইকুম আসসালাম। এসো”

মেহেরুন্নেসা গুটি গুটি পায়ে ভিতরে ঢুকলো। মারজান এর পাশে গিয়ে দাঁড়াতেই মারজান বলল
“তুমি আমার ঘরল এসেছো, তোমার স্বামী দেখলে আবার রাগ করবে”

মেহেরুন্নেসা স্মিত হাসলো
“না আম্মা, তেমন কিছু না”

“ও, তা বলো কি দরকারে”

মেহেরুন্নেসা ছবিটা বের করে ভাজ খুলল। মারজান এর সামনে মেলে ধরে বলল
“এটা কার ছবি আম্মা?”

ছবিটা দেখে মারজান এর চোখের ভাবমূর্তি পরিবর্তন হয়ে গেলো সাথে সাথে। অবাক হয়ে বলল
“এই ছবি তুমি কই পাইলা?”

মেহেরুন্নেসা মিথ্যা বলল। কারণ সত্যি টা সে বলতে পারবে না
“ইয়ে…আসলে গত কাল কে পুরনো কাপর এর বাক্সে পেয়েছি”

মারজান শুকনো ঢোক গিলল। মেহেরুন্নেসা তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে বলল
“এটা কি আপনার ছেলের ছবি আম্মা? কিন্তু ওনার চোখের রং তো বিরল। সবুজাভ চোখের মনি তার। কিন্তু এটাতে তো একদম স্বাভাবিক লাগছে”

মারজান এদিক ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল
“ না এইডা বাইজিদ না। এইডা হইলো অরণ্য। খবরদার এই ছবি কাওরে দেখাইও না মাইয়া। হেঁশেলে নিয়া উনুনে পুড়াই দেও যাও”

আজকেও তাড়াতাড়ি দিলাম। রিয়্যাক্ট দিও। আর কমেন্ট এত কম আসে কেন? 🥲। গত পর্বে তোমরা ৩k পূরণ করেছো, তাই আজ সবচেয়ে বড় পর্ব দিলাম।
শোনো, যেটার জন্য বলতেছিলা তোমরা। অবশ্যই সেটা স্পেশাল হবে। তাই ভরসা রাখো উখে? কেমন হইছে অবশ্যই বলিও পাখিরা 😽🫶

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply