নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ২০
দরজায় দ্বিতীয়বার কড়া নাড়তেই কক্ষের ভারী নীরবতাটা ভেঙে গেল। বাহিরে প্রহরীর গলা।
“শাহজাদা, জমিদার বাবু আপনাকে ডাকছেন।”
বাইজিদ চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত বসে রইলো। যেন ভেতরের সব কথা, সব অভিমান গিলে ফেলছে। তারপর খুব ধীরে পালঙ্কের পাশ থেকে উঠে দাঁড়ালো।
মেহেরুন্নেসা পিঠ ফিরিয়েই শুয়ে রয়েছে। বাইজিদ এর উঠে যাওয়ায় ও কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না। বাইজিদ লোহার বিশাল আলমারি টা থেকে পাতলা ফতুয়াটা বের গায়ে দিল। তার আঙুলগুলো কেমন ধীর, কেমন নিস্তেজ। যেন আর কোনো তাড়া নেই, আর কোনো আশা নেই।
তারপর দরজার দিকে হাঁটতে শুরু করলো।
দরজার সামনে গিয়ে হঠাৎ থেমে গেল সে। কী মনে করে ধীরে ধীরে ফিরে তাকালো। মেহেরুন্নেসাও ঠিক তখনই মুখ ফিরিয়ে তাকালো।
চোখাচোখি হয়ে গেল। মুহূর্তটা খুব ছোট ছিল। অথচ মেহেরুন্নেসার মনে হলো, সেই এক পলকে কত কথা বলে ফেললো বাইজিদের চোখ। কী অদ্ভুত নিঃশব্দ কষ্ট! কতটা অপেক্ষা, কতটা অভিমান, কতটা না-পাওয়া জমে আছে সেই সবুজাভ চোখ জোড়ায় ।
মেহেরুন্নেসার বুকটা ধক করে উঠলো। মানুষ টাকে কি কষ্ট দিয়ে ফেলল। সে কি ভেবেছে তাকে অগ্রাহ্য করা হলো? মেহেরুন্নেসার গলা পর্যন্ত কথা এসে আটকে গেল।
ইচ্ছে করছিল তাকে ডেকে বলতে শুনুন, আমি রেগে নেই। আমি রাগ করি নি… আমি শুধু কষ্ট পেয়েছি। কিন্তু ঠোঁট নড়লো না।
শুধু অসহায়ের মতো তাকিয়ে রইলো কিছুক্ষণ।
বাইজিদও আর কিছু বললো না। তার চোখের কোণে একফোঁটা ক্লান্ত বিষণ্নতা নেমে এলো। তারপর খুব ধীরে চোখ নামিয়ে নিল। দরজা খুলে বাইরে চলে গেল। দরজাটা বন্ধ হওয়ার শব্দটা যেন পুরো কক্ষজুড়ে কেঁপে উঠলো।
মেহেরুন্নেসা আর শুয়ে থাকতে পারলো না। তড়িঘড়ি করে উঠে বসল সে।
এলোমেলো চুল বিছানা জুড়ে ছড়িয়ে আছে। বুকের কাছে চাদরটা শক্ত করে চেপে ধরে দরজার দিকে তাকিয়ে রইলো। চোখদুটো জ্বালা করছে। মনে হচ্ছে সে খুব বড় একটা ভুল করে ফেলেছে।
বাইজিদ যখন তার দিকে তাকিয়েছিল, সেই চোখের দৃষ্টি এখনো বুকের ভেতর বিঁধে আছে।
মনে মনে পণ করলো শাহজাদা আসলে তার থেকে ক্ষমা চেয়ে নিবে। ক্ষমা করতে না চাইলে প্রয়োজনে পায়ে ধরবে। চোখ জোড়া ভরে আসে পানিতে।
দীর্ঘ করিডোর পেরিয়ে বাইজিদ এসে থামলো জমিদার বাকের শাহর কক্ষের সামনে। দরজার বাইরে দুজন প্রহরী দাঁড়িয়ে। ভেতর থেকে মৃদু কণ্ঠস্বর, ভারী আসবাবের শব্দ ভেসে আসছে। বাইজিদ নিজের মুখের ভাবটা শক্ত করলো। কয়েক মুহূর্ত আগের কষ্ট, অভিমান, সবকিছু যেন বুকের গভীরে ঠেলে রেখে দিল।
তারপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিচু গলায় বললো
“ভেতরে আসবো আব্বাজান?”
ভেতর থেকে গম্ভীর স্বর এলো
“আসো।”
বাইজিদ দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকলো। বড় কক্ষ। দেয়ালে পুরনো তলোয়ার, বংশের প্রতিকৃতি, ভারী মখমলের পর্দা। মাঝখানে বিশাল কাঠের টেবিলের পাশে বসে আছেন বাকের শাহ। তার চোখের দৃষ্টি সবসময়কার মতোই কঠিন, হিসেবি।
বাইজিদ এগিয়ে গিয়ে মাথা নত করলো।
“আসসালামু আলাইকুম আব্বাজান।”
বাকের শাহ তার দিকে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন
“ ওয়ালাইকুম আসসালাম। বসো।”
বাইজিদ বসল না। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।
বাকের শাহ ঠোঁট সামান্য শক্ত করলেন। তারপর টেবিলের ওপর রাখা একটা হিসাবের খাতা বন্ধ করে বললেন
“আজকাল তোমার কী হয়েছে, বাইজিদ?”
বাইজিদ ভ্রু কুঁচকালো।
“মানে?”
“মানে এই যে, তোমার মনোযোগ আর আগের মতো নেই। জমিদারির খাজনার হিসাব তিনদিন ধরে পড়ে আছে। দক্ষিণের জমির মামলা তুমি এখনো দেখো নি। আজ প্রজাদের সাথে বৈঠকেও তোমাকে অমন অন্যমনস্ক লাগছিল।”
কক্ষটা নিঃশব্দ হয়ে গেল। বাইজিদ চুপ করে রইলো। বাকের শাহ ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালেন। তার ভারী পায়ের শব্দে কক্ষের মেঝে যেন কেঁপে উঠলো।
“তুমি আমার ছেলে। তোমার চোখ দেখে আমি বুঝি তোমার ভেতরে কী চলছে।”
তিনি এসে বাইজিদের সামনে দাঁড়ালেন।
“একটা মেয়ের জন্য নিজের মাথা হারিয়ে ফেলছো না তো?”
বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে এলো।
“না, আব্বাজান।”
“তুমি যা চেয়েছিলে, আমি বিনা প্রশ্নে তা তোমাকে দিয়েছি। তাই বলে কি এক দিক নিয়ে পরে থাকলে তোমার চলবে বাইজিদ?”
বাকের শাহর কণ্ঠে এবার বিরক্তি।
“তুমি যেদিন থেকে মেহেরুন্নেসাকে এই মহলে এনেছো, সেদিন থেকেই বদলে গেছো। আগে তোমার মাথায় শুধু কাজ ছিল। এখন তোমার চোখে শুধু অন্যমনষ্কতা দেখি।”
বাইজিদ মুখ নামিয়ে নিল না। বরং ধীর, নিয়ন্ত্রিত গলায় বললো
“ বিয়ে টা আমার দায়িত্বের কোনো ত্রুটি হয়ে দাড়াবে না। কথা দিচ্ছি আব্বা”
“হওয়া উচিতও না।”
বাকের শাহ আবার নিজের জায়গায় গিয়ে বসলেন।
“কারণ তুমি শুধু আমার ছেলে নও। তুমি এই জমিদারির ভবিষ্যৎ।”
তারপর কিছুক্ষণ চুপ থেকে গম্ভীর স্বরে বললেন
“কারাগারে গিয়ে মিরানের সাথে দেখা করো। প্রয়োজন পড়লে মৃত্যু দন্ড দাও। ওর চাপ আর নেওয়া যাচ্ছে না”
বাইজিদ শান্ত ভাবে বলল
“কিন্তু আব্বা, ও যাদের হত্যা করেছে প্রত্যেকেই অপরাধী ছিল কোনো না কোনো ভাবে”
বাকের শাহ এর চোখদুটো তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে।
“তোমার হৃদয়কে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখো। কোনো অপরাধীর শাস্তি দেওয়ার ও কে?”
বাইজিদ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালো। বাকের শাহ ফের বলল
“আর হ্যা। নিজেকে শক্ত রাখবে, যেমন টা আগে ছিলে। জমিদারির মসনদে বসতে হলে দুর্বলতার জায়গা রাখা যায় না।”
এক মুহূর্তের জন্য মেহেরুন্নেসার মুখটা ভেসে উঠলো বাইজিদের মনে। তারপর সে আবার নিজের মুখের সব অনুভূতি মুছে ফেললো।
“জ্বি, আব্বাজান।”
মাথা নত করে কক্ষ থেকে বেরিয়ে গেল সে। গন্তব্য প্রাসাদের পিছনের কারাগার। সামনে অন্ধকার করিডোর। তার শেষে স্যাঁতসেঁতে কারাগার। আর সেখানে আছে বন্দি মিরান।
কারাগারের দিকে নামার সিঁড়িগুলো সবসময়ই অদ্ভুত ঠান্ডা। পাথরের স্যাঁতসেঁতে দেয়াল, নিচে নামার সাথে সাথে ভারী হয়ে ওঠা বাতাস, দূরে কোথাও থেকে ভেসে আসা পানির টুপটাপ শব্দ সব মিলিয়ে যেন অন্য এক জগৎ।
বাইজিদ ধীর পায়ে নামছিল। তার পেছনে দুজন রক্ষী। সামনে হাতে মশাল নিয়ে আরেকজন পথ দেখাচ্ছে।
মশালের কাঁপা আলোয় সরু, বাঁকানো করিডোরটা কখনো উজ্জ্বল হয়ে উঠছে, কখনো আবার অন্ধকারে ডুবে যাচ্ছে। ভেজা পাথরের দেয়ালে ছায়াগুলো লম্বা হয়ে কাঁপছে।
বাইজিদের মুখ শক্ত। চোখে কোনো অনুভূতি নেই।
কিন্তু তার বুকের ভেতরটা এখনো ভারী হয়ে আছে। কক্ষ থেকে বের হওয়ার আগে মেহেরুন্নেসার সেই দৃষ্টি, সেই না-বলা কথা, এখনো তার মনে রয়ে গেছে।
“ওই শেষ কক্ষটা, শাহজাদা,”
এক রক্ষী নিচু গলায় বললো।
করিডোরের একেবারে শেষে লোহার মোটা শিকওয়ালা একটা কক্ষ। দরজার সামনে দুজন পাহারাদার দাঁড়িয়ে। তাদের একজন তাড়াতাড়ি এগিয়ে এসে মাথা নত করলো। তারপর বলল
“আজ আবার পালানোর চেষ্টা করেছিল, শাহজাদা। পশ্চিম দিকের ছোট ফটক পর্যন্ত পৌঁছে গিয়েছিল। পরে ধরে আনা হয়েছে।”
বাইজিদ কোনো উত্তর দিল না। শুধু স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো দরজার দিকে। রক্ষী দরজা খুলতেই ভেতরের ঠান্ডা, ভারী বাতাস এক ঝটকায় বাইরে বেরিয়ে এলো। কক্ষটা ছোট। দেয়ালের কোণে একটা মশাল জ্বলছে। তার ম্লান আলোয় মেঝের ওপর বসে আছে মিরান। ভালো নাম উম্মে মিরান।
দুই হাত ভারী শিকলে বাঁধা। শিকলের অন্য প্রান্ত দেয়ালের লোহার রিংয়ে আটকানো। তার গায়ের পোশাক ধুলো আর কাদায় মলিন। লম্বা চুল এলোমেলো হয়ে কাঁধের ওপর পড়ে আছে।
তবু তাকে দেখে ভাঙা মনে হয় না।
মাথা নিচু করে বসে থাকলেও তার ভেতরে একটা অদ্ভুত শক্তি আছে। এমন এক জেদ, যা এতদিনের বন্দিত্বও শেষ করতে পারে নি।
রক্ষীদের পায়ের শব্দে ধীরে ধীরে মুখ তুললো সে।
তার চোখদুটো ক্লান্ত, কিন্তু ভয়হীন।
বাইজিদকে দেখেই ঠোঁটের কোণে খুব সামান্য, বিদ্রূপের মতো একটা হাসি ফুটলো।
“সালাম শাহজাদা, গরীবের ঘরে স্বাগতম”
রক্ষীরা তৎক্ষণাৎ গর্জে উঠলো।
“বেয়াদব!”
বাইজিদ হাত তুলে তাদের থামিয়ে দিল।
তারপর খুব ধীরে কক্ষের মাঝখানে রাখা কাঠের চেয়ারটায় গিয়ে বসল। দুই কনুই হাঁটুর ওপর রেখে কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলো মিরানের দিকে। মিরানও তাকিয়ে আছে। দুজনের চোখের মধ্যে অদ্ভুত এক নীরব লড়াই। বাইজিদ নিচু, ধীর স্বরে বললো
“পালাতে চেয়েছিলে কেন? হাঁপিয়ে উঠেছো? কষ্ট হচ্ছে? অপরাধ করার সময় এগুলে মনে ছিল না?”
মিরান হেসে ফেললো। হাসিটা ক্লান্ত, তিক্ত।
“ছ্যাহ শাহজাদা। আপনার মত বুদ্ধিমান, বিচক্ষণ লোকের থেকে এমন কথা আশা করিনি। আমি মোটেও পালাতে চাই নি। পালানোর হলে প্রত্যেকবার ফিরে আসতাম নাকি?”
বাইজিদ তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখে মিরান এর আচরণ
“তুমি জানো আমি কেন এসেছি?।”
“জানি।”
মিরান মাথা হেলিয়ে দেয়ালে ঠেস দিল। বাইজিদ সোজা হয়ে বলল
“তাহলে বলো।”
মিরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর বলল
“আরেকটা খু’ন করতে গেছিলাম আমি। কাজ শেষে ফিরে এসেছি আবার।”
বাইজিদ ভ্রু কুঁচকালো।
“বেড়িয়েছিলে কী করে? আর ফিরোই বা কি করে?”
মিরান তার দিকে স্থির চোখে তাকিয়ে রইলো।
“আপনি কি নিজের প্রাসাদে থাকা সবাইকে সত্যিই চেনেন?”
কথাটা শুনে কক্ষের ভেতর যেন হঠাৎ আরো ঠান্ডা হয়ে গেল। রক্ষীরা একে অপরের দিকে তাকালো। বাইজিদের মুখের পেশি শক্ত হয়ে উঠলো। মিরান খুব ধীরে, শিকলে বাঁধা হাতদুটো সামান্য নড়ালো। ঝনঝন শব্দ হলো।
তারপরই ঝনঝন শব্দে খাপ থেকে তলোয়ার বের করলো বাইজিদ। রক্ষীরা চমকে উঠলো।
বাইজিদ এক ঝটকায় সামনে এগিয়ে গিয়ে তলোয়ারের ঠান্ডা, তীক্ষ্ণ ডগাটা মিরানের গলার ঠিক নিচে চেপে ধরলো। মিরান নড়লো না। উল্টো অট্টহাসি তে ফেটে পড়লো
“কীভাবে?”
বাইজিদের কণ্ঠ নিচু, কিন্তু ভয়ানক ঠান্ডা। “কীভাবে তুমি কারাগার থেকে বের হয়েছিলে?”
তলোয়ারের ডগা গলার চামড়ায় আরো একটু চেপে বসলো।
“গতরাতে তুমি বাইরে গিয়েছিলে। তুমি খুন করেছো। তারপর আবার এই কারাগারে ফিরে এসেছো। তারমানে রক্ষীদের কেউ ই সাহায্য করছে এ কাজে?”
বাইজিদের চোখ রক্তিম হয়ে উঠেছে। মিরান আবার হেসে উঠলো। সেই হাসি বাড়তে বাড়তে কক্ষজুড়ে ছড়িয়ে পড়লো। উন্মাদের মতো। অস্বাভাবিক। শিকলে বাঁধা অবস্থাতেও যেন সে ভয় পাচ্ছে না। বরং এই সবকিছু তাকে আনন্দ দিচ্ছে।
বাইজিদের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠলো।
“চুপ!”
তার গর্জনে কক্ষের দেয়াল পর্যন্ত কেঁপে উঠলো।
কিন্তু মিরান থামলো না। হাসতেই থাকলো।
বাইজিদ হঠাৎ ঘুরে দাঁড়িয়ে রক্ষীদের দিকে তাকালো।
“কে ওকে সাহায্য করেছে?”
তার কণ্ঠে এমন ভয়ানক হুংকার ছিল যে দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে থাকা প্রহরীরাও সোজা হয়ে গেল।
“বল!”
কেউ উত্তর দিল না। দুজন রক্ষী মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলো। আরেকজন কাঁপা গলায় বললো
“আমরা কিছু জানি না, শাহজাদা। শপথ….”
“মিথ্যে!”
বাইজিদ তলোয়ারটা ঝটকা মেরে দেয়ালে আঘাত করলো। ধাতব শব্দে পুরো কক্ষটা কেঁপে উঠলো।
“এখান থেকে কেউ বের হতে পারে না। কেউ না। তাহলে ও কীভাবে গেল? কীভাবে ফিরে এলো?”
কক্ষজুড়ে পিনপতন নিরবতা। শুধু মশালের আগুন কাঁপছে। আর মিরানের শিকলের শব্দ।
বাইজিদ আবার তার দিকে ফিরলো। চোখদুটো এবার ভয়ানক ঠান্ডা।
“এতজনকে কেন খুন করেছো?”
মিরান মাথা কাত করলো।
তার এলোমেলো চুল মুখের ওপর নেমে এলো। ঠোঁটের কোণে আবার সেই হাসি।
“কারণ?”
সে খুব ধীরে কথাটা বললো। তারপর আবার হেসে উঠলো।
“আপনি বুঝবেন না, শাহজাদা।”
“আমি বুঝতে চাইও না। আমি জানতে চাই।”
মিরান এবার চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো।
চোখদুটো অদ্ভুত উজ্জ্বল। ভয়ংকর। তারপর কোনো উত্তর না দিয়ে আবার হাসলো।
একটা দীর্ঘ, ঠান্ডা, শিরদাঁড়া বেয়ে ওঠা হাসি।
বাইজিদ কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো।
তারপর ধীরে ধীরে তলোয়ারটা সরিয়ে নিল।
কিন্তু তার মুখের রাগ এতটুকুও কমলো না।
সে দরজার দিকে হাঁটতে হাঁটতে থেমে গেল। না ফিরে, পেছন ফিরে দাঁড়িয়েই বললো
“আজ থেকে ওকে কোনো খাবার দেওয়া হবে না।”
রক্ষীরা হতভম্ব হয়ে তাকালো। বাইজিদ ধীরে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকালো মিরানের দিকে।
“যতক্ষণ না মুখ খুলছে, খাবারের একটা কণাও যেন ও না পায়।”
মিরান এবারও হাসলো। কিন্তু তার চোখে প্রথমবারের মতো খুব ক্ষীণ, খুব সামান্য একটা পরিবর্তন দেখা গেল। আর বাইজিদ সেটা দেখলো। হাটা দিলো মহলের উদ্দেশ্যে। মাথায় চিন্তার পাহাড়, আবারও শূন্য হাতে ফিরছে সে। এবার হয়তো আব্বা আরো রেগে যাবে, ভাববে সঠিক কৌশল প্রয়োগ করতে পারেনি। কিন্তু এবার আর সে জমিদারের ঘরে গেল না। রক্ষী দিয়ে খবর পাঠালো, মিরান মুখ খোলে নি। নিজে চলে গেল নিজ কক্ষে। কিন্তু গিয়ে দেখলো মেহেরুন্নেসা ঘরে নেই। বালু ঘড়ি তে রাত্রির দ্বিতীয় প্রহর চলে। এত রাতে কোথায় গেলো মেহেরুন্নেসা? বাইজিদ এর কপালে চিন্তার ভাজ পড়লো। ব্যাস্ত পায়ে ছুটলো রত্নপ্রভার ঘরের দিকে। মেহেরুন্নেসা ওর কাছে যেতে পারে। নাকি আবার মহলের বাইরে বেড়িয়ে গেল? তাহলে তো সর্বনাশ।
মনে মনে শত প্রার্থনা। গিয়ে যেন পেয়ে যায় তার মেহের কে। সিঁড়ি নামার সময় ই মুখোমুখি হয় মেহেরুন্নেসার। সে উপর দিকেই উঠে আসছিলো। পিছনে দুজন দাসী। দুইজনের হাতেই বড় থালায় খাবার সাজানো ছোট্ট ছোট্ট পিতলের বাটি তে। বাইজিদ এক মূহুর্তের জন্যও স্থির না থেকে ছুটে গিয়ে মেহেরুন্নেসা কে জাপটে ধরলো নিজের বুকে। সুঠাম বাহুর শক্তপোক্ত বাধনে আকড়ে ধরলো মেহেরুন্নেসা কে। এতে মেহের এর হাতে থাকা শরবত এর গ্লাস টা ঝনঝন করে গড়িয়ে পড়লো সিড়ি দিয়ে। দাসীরা লজ্জায় মাথা নত করে ফেলল। বাইজিদ এর সেদিকে খেয়াল ই নেই। মেহেরুন্নেসা হতবাক স্বামীর কান্ড দেখে। আলতো করে তার চওড়া পিঠে হাত রেখে বলল
“কি হয়েছে আপনার? আপনি ঠিক আছেন তো?”
বাইজিদ এর বাধন এক চুলও আলগা হচ্ছে না। অস্থির কন্ঠে বলল
“কোথায় গেছিলে তুমি? আমাকে না বলে। এই রাতের বেলা কেন বের হয়েছো কক্ষ থেকে। কিছু প্রয়োজন হলে আমায় বলতে। কত ভয় পেয়ে গেছিলাম তোমায় না দেখে জানো তুমি”
মেহেরুন্নেসার কপাল কুচকে আসে। ফিসফিস করে বলে
“শাহজাদা, দাসীরা দেখছে তো। ছাড়ুন। আমরা ঘরে গিয়ে কথা বলি”
দাসীরা শাহজাদার এমন কান্ডে লজ্জায় আবার বৈঠকের দিকে ফিরে গেল উপায় না পেয়ে। ওভাবে তাদের সামনে দাড়িয়ে থাকা যায় নাকি। বাইজিদ তবুও ছাড়ছে না।
“আগে বলো তুমি আমার ওপর বিমুখ কেনো হয়ে আছো? আমার ওপর মনঃক্ষুণ্ন হয়ে কক্ষ থেকে চলে এসেছো তাই না?”
“আমি আপনার খাবার প্রস্তত করতে এসেছিলাম তো। আমি আপনার রেগে নেই বিশ্বাস করুন। ছাড়ুন এবার। কক্ষ চলুন, আপনার না ক্ষুধা পেয়েছে”
“ এদের জ্বালায় কি ঘুমানো যাবে না?কি হচ্ছে টা কি মহলে? ডাকাত পড়েছে নাকি? বাসন পত্র কে ছুড়ছে?”
নিজের ঘরে থেকে চেঁচাতে চেঁচাতে বেড়িয়ে এলো মারজান। সাথে সিমরান ও। কিন্তু বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসা কে এই অবস্থায় দেখে দুজন যেন আকাশ থেকে পড়লো। সিড়ির মাঝামাঝি মেহেরুন্নেসা কে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে ধরে দাড়িয়ে আছে বাইজিদ। এমনকি মারজান এর গলা পেয়েও তাদের নড়চড় নেই। সিমরান রাগে হিংসায় নিজের ওড়নার ওপর প্রান্ত মুঠো করে ধরলো। যেই শাহজাদার আশেপাশেও ঘেষা যেত না, সে মায়ের সামনে ওমন নির্লজ্জের মত মেহেরুন্নেসা কে জড়িয়ে ধরে আছে। মারজান হা করে দেখছে বাইজিদ এর কান্ড। এমন রুপ তার অদেখা।
সিমরান মারজান কে উসকে দিতে কাধে হাত দিয়ে কানে কানে বলল
“আম্মাজান দেখেছেন? মেয়েটা কেমন নির্লজ্জ। মহলের ভিতর কেউ এমন আচরণ করে? পারিবারিক শিক্ষা একদম ই নেই। শাশুড়ীর গলা পেয়েও ছাড়ছে না দেখেছেন?”
মারজান দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“তোর চোখল কি ন্যাবা হয়েছে? কে ধরে আছে চোখে দেখছিস না? ধরে তো আছে বাইজিদ, মেয়েটাকে বলে কি লাভ”
মারজান আরো একবার গলা খাকারি দিলো।
“উহুম উহুম”
তারপর সিমরান কে বলল
“যার বউ তার সাথেই আছে, তারই মহল তারই বউ। করুক যা খুশি। আমাদের কি? চল”
সিমরান এর মনে তখন ঢেউ উঠে গেছে যেন। মারজান এক প্রকার টেনে নিয়ে গেল তাকে সেখান থেকে। মেহেরুন্নেসার লজ্জায় মরে যেতে ইচ্ছা করছে। বাইজিদ এর বাধন একটু আলগা হতেই মেহেরুন্নেসা কোনো রকম ঠেলেঠুলে সরালো তাকে নিজের থেকে। বাইজিদ চোখ জোড়া অসম্ভব রকম লাল হয়ে আছে। মেহেরুন্নেসা ঘাবড়ে যায়। বাইজিদ হাত ধরে টেনে বলল
“ঘরে চলো”
কেমন অদ্ভুত শোনালো তার কন্ঠ। মেহেরুন্নেসা শুকনো ঢোক গিলে পিছন পিছন যেতে লাগলো। বাইজিদ এর হাঁটার সাথে তাল মেলাতে না পেরে কয়েকবার হোচট ও খেলো। একেবারে ঘরে এসেই বাইজিদ থামলো। মেহেরুন্নেসা কে টেনে ভিতরে এনে দরজার ভারি খিলটা তুলে দিলো। পিছন দিকে ফিরতেই মেহেরুন্নেসা চমকে যায়। অস্বাভাবিক ভাবে ওঠানামা করছে বাইজিদ এর বুক। নিশ্বাস ফেলছে দ্রুত। মেহেরুন্নেসা কিছুটা এগিয়ে এসে বলল
“আপনার শরীর খারাপ লাগছে?”
বাইজিদ ওর হাতটা খপ করে ধরে নিজের বুকের ওপর রেখে চেপো ধরলো। হৃৎস্পন্দনের গতি বাড়তি। হাস্কি স্বরে বলল
“এইখান টা ভীষণ অস্থির নূর। তোমাকে বড্ড চাইছে।”
মেহেরুন্নেসা জবাব দিল না। বাইজিদ বলল
“ তুমি কি আমায় মেনে নিতে পারো নি?”
মেহেরুন্নেসা জড়সড় হয়ে বলল
“সে….সেরকম কিছু নাহ”
বাইজিদ এর কন্ঠ ব্যাকুল
“তাহলে কেন আমায় আপন করে নিচ্ছো না? কেন তোমার আচরণে আমি টান পাই না? না তুমি আমার হচ্ছো, না আমাকে তোমার হতে দিচ্ছো। কেনো মেহের? আমার যে আর দূরত্ব সইছে না”
মেহেরুন্নেসা অবাক হচ্ছে বাইজিদ এর আচরণে। কেমন উন্মাদ এর মত হাসফাস করছে। মিনমিনে গলায় বলল
“আমাদের দূরত্ব কোথায়? আপনার কাছে, আপনার কক্ষেই তো আছি আমি”
“আমি চুল পরিমাণ দূরত্ব ও চাই না। মিশে যেতে চাই তোমার সাথে। অধিকার চাই স্বামীর। সম্পূর্ণ নিজের করে পেতে চাই তোমাকে”
মেহেরুন্নেসার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল স্রোত নেমে গেলো। বাইজিদ আবারো জড়িয়ে ধরলো মেহেরুন্নেসার সরু কোমর। সবুজাভ চোখ জোড়া ছটফট করছে যেন। মেহেরুন্নেসা তার হাত ধরতেই বাধন যেন আরো গাঢ় হলো।
আকাশ এর অবস্থা ভালো না। ঝড় বৃষ্টির হবে বলপ মনে হচ্ছে। কারেন্ট চলে যাবে। তাই আজ আগে আগে গল্প দিয়ে দিলাম। ৩k পূরণ না করলে যার অপেক্ষায় বসে আছো তা হচ্ছে না 🙂
আর অবশ্যই অবশ্যই বলিও কেমন হয়েছে, কেমন লাগলো? আজ আগে আগে দিয়ে দিলাম খুশি তোওওওও? 😽🫶
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৬ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
নূর এ সাহাবাদ বিয়ে স্পেশাল পর্ব
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৯
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৬