“তোর স্বামী তোর সৎ বোন রে বিয়ে করে আনছে রে বউ। তোর কপাল ডা এবার পুড়লো”
প্রতিবেশী মহিলাটির কথায় চমকে উঠলো প্রভা। জমিদার বাড়ির জামাতা কিনা দ্বিতীয় বিয়ে করলো? বিকাল বেলা গোসল সেরে স্বামীর পছন্দের সালোয়ার সেট টা পরে শুয়ে শুয়ে উপন্যাসের বই পড়ছিলো প্রভা। হঠাৎ এসে পাশের বাড়ির মহিলাটি এমন কথা বলায় বেশ অবাক হলো সে। শোয়া থেকে উঠে বসে বলল
“কি যা তা বলছেন? উনি কেনো আমার সৎবোন কে বিয়ে করতে যাবে?”
ইতিমধ্যেই ছুটে এলো প্রভার ছোট জা শিমু। শিমুর চোখ মুখ খুব অস্থির লাগছে দেখতে।
“আ…আপা, ভাইজান আপনার সৎ বোন কে…
শিমুর কথা শেষ হওয়ার আগেই শিমু কে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে প্রভা এক দৌড়ে ছুটে গেলো বাইরে। এলোমেলো পায়ে দৌড়ে যেতেই দেখলো সদর দরজা থেকে শুরু করে চারিদিকে মানুষের ভিড়। প্রভা আর মাহবুব এর ঘরটা ভিতরের দিকে হওয়ায় লোকজনের শব্দ কর্ণগোচর হয় নি প্রভার। তাছাড়াও মাটির দেওয়ালের বাড়িতে, একপাশ থেকে অন্যপাশে শব্দ পৌছায় না তেমন। আরেকটু সামনে এগিয়ে যেতেই দেখলো নতুন বধূ বেশে তার স্বামীর পাশে দাড়িয়ে আছে নিজেরই সৎ বোন তিলোত্তমা। প্রভা কে দেখে মাহবুবের হাতটা আরো শক্ত করে ধরলো তিলোত্তমা। প্রভা এলোমেলো হাতে চুল গুলো খোপা করে এগিয়ে গেলো সদর দরজার সামনে।
দুজনকে অপাদমস্তক দেখলো। মাহবুবের দিকে একবার তাকিয়ে তিলোত্তমা কে বলল
“ছোট বেলা থেকে কোলে পিঠে করে বড় করার বেশ ভালো প্রতিদান দিলি। নিজের বোনের ঘর ভাঙতে তোর একবারও কলিজা কাপলো না?”
তিলোত্তমা মাহবুবের বাহু জড়িয়ে ধরে পিঠে মুখ লুকানোর চেষ্টা করলো। মাহবুব প্রভার চোখে চোখ রাখতে পারছে না আজ। কত বড় অপরাধ করে এসেছে, তাকানোর সাধ্যি কি আছে আর? ভালোবেসে বিয়ে করেছিলো প্রভাকে। কিন্তু শেষ ওবদি এই দিনে এসে দাড়ালো সম্পর্ক।
প্রভার শাশুড়ি এলো বরন ডালা হাতে। পিছন থেকে খ্যাক খ্যাক করে বলল
“ওই অপয়া মুখ খানা নিয়ে সরো তো সামনে থেকে। আমার চাঁদের টুকরো বউ মা কে বরণ করবো”
প্রভা কে একরকম বাহুর ধাক্কায়ই সরিয়ে ফেললো রমলা বেগম। তিলোত্তমার মুখের চারপাশে কুলো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে বরণ শেষে মিষ্টি মুখ করালো। প্রভা চুপ করে দেখে যাচ্ছে সব। তার সাধের সংসার কত সহজে রঙ বদলালো। বাড়ির কোনো একটা মানুষ তার পক্ষে কথা বলছে না। শিমু যাও ভালো একটা মেয়ে, কিন্তু স্বামীর ভয়ে কিচ্ছু বলতে পারছে না। কিন্ত তিলোত্তমা কে বাড়িতে প্রবেশের পথে বাধা হয়ে দাড়ালো মাহবুব এর বাবা, শামসুর হাওলাদার।
কড়া গলায় শোনানি দিলো
“এ বাড়িতে ইতিমধ্যেই একজন বউ মা আছে, অতএব দ্বিতীয় কারো প্রবেশের সুযোগ নেই”
রমলা বেগম স্বামীর সাথেও ঝাঁঝিয়ে উঠলো
“আপনার জ্ঞানের কথা নিজের কাছেই রাখুন দেখি। আমার ছেলে বিয়ে করে আনছে মানে এই বউ ঘরে ঢুকবে। আটকানোর সাধ্যি থাকলে আটকে দেখান। দেখি কেমন পারেন”
রমলা তিলোত্তমার হাত ধরে এনে বসালো বৈঠকখানার চৌকিটাতে। শাড়ির কুচি ধরে বড় বড় পা ফেলে গ্রামের লোকেদের মুখের ওপর দরজা বন্ধ করে দিলো। বউ মা কে নিয়ে প্রশংসায় পঞ্চমুখ মাহবুবের ডিভোর্সি ফুপু মল্লিকা হাওলাদার। বিয়ের দুই বছরের মাথায় ডিভোর্স নিয়ে চলে এসেছে। বাপের ঘরের আদরের দুলালী সংসার টাই করতে পারেনি।
মল্লিকা মাহবুবের ছোটভাই মিরাজ কে বললেন
“যাও মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে ভাই ভাবির বাসর ঘর টা সাজাওওও।”
মিরাজ উঠে দাড়িয়ে বলল
“ফুপুআম্মা আমি আর শিমুই সাজাচ্ছি, তোমার আদরের ভাইজি নতুন ভাবি কে দেখেই ঘরের ছিটকিনি তুলেছে”
শিমুর অনিচ্ছা স্বত্বেও স্বামীর সাথে গেলো মাহবুব আর তিলোত্তমার বাসর সাজাতে। প্রভা এখনো দেয়াল হেলান দিয়ে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। চোখের কার্নিশ বেয়ে গড়িয়ে পড়ছে নোনা জল। কিন্ত মুখ একদম নিশ্চুপ। শিমু সামনে দিয়ে যাওয়ার সময় দুহাত জড় করে ক্ষমা চাইলো প্রভার কাছে।
বাড়ির সকলে মেতে আছে নতুন বউ কে নিয়ে। মাহবুব আড় চোখে দেখলো প্রভা কে। দেওয়ালে হেলান দিয়ে বসে পরেছে মেঝেতে। ঘন্টাখানেক পর মিরাজ এলো। ঘর সাজিয়েছে।
মাহবুব আর তিলোত্তমা কে ঘরে পাঠালেন রমলা। হাত মুখ ধুয়ে এসে খেয়ে নিতে বলল। তিলোত্তমার হাত ধরে নিয়ে যাওয়ার সময় আবারও প্রভার দিকে তাকালো মাহবুব । এখনো সেভাবেই বসে আছে প্রভা। ঘরে গিয়ে তিলোত্তমা কে বসতে বলে হাতমুখ ধুতে গেলো নয়ন।
মেহেরুন্নেসা এখন বেড়িয়েছে ঘরে থেকে। এতক্ষন বাড়িতে লোকজনের সমাগম দেখে বের হয়নি। বাহিরের কোনো লোকের সামনে কখনো যায়নি সে। কালো সালোয়ার কামিজ পরিহিত। বড় হাতা জামা টার। হাত সম্পূর্ণ ঢাকা, শুধু কব্জি টুকু দৃশ্যমান। কালো ওরনাটা মাথায় সুন্দর করে হিজাবের মতো করে পরেছে। শুধু মুখ টুকু দেখা যায়। কপাল, চোয়াল, গলা সবই ঢাকা।
ওর পুরো নাম মেহেরুন্নেসা নূর। ওকে প্রথম দেখলে মনে হতো, যেন সাদা ভোরের কুয়াশা ধীরে ধীরে মানুষের আকার নিয়েছে। তার গায়ের রঙ শুধু উজ্জ্বল ফর্সা নয়, বরং চাঁদের আলো মেশানো নরম স্নিগ্ধ আভা। চোখ দুটো বড়, টানা, গভীর, যেন অজস্র কথা জমা আছে ভেতরে অথচ উচ্চারণের অনুমতি পায় না।
তার ভুরু দুটি আঁকা ধনুকের মতো, মাঝখানে লাজুক কপাল। কপালে কখনো টিপ পরে না, ওড়নার আড়ালেই তার সৌন্দর্য লুকিয়ে থাকে। ঠোঁট পাতলা নয়, আবার ভারীও নয়। গোলাপের পাপড়ির মতো নরম, কিন্তু সবসময় সংযত। অকারণে হাসতে শেখেনি সে। তার হাসি দেখা মানেই যেন বিরল কোনো ফুল ফোটা।
চুল ঘন, কালো, কোমর ছুঁই ছুঁই, কিন্তু সেই চুলও খোলা দেখা যায় না কারও সামনে। শক্ত করে বেঁধে, তার ওপর টেনে নেয় ওড়না। যেন নিজের সৌন্দর্য নিজেই পাহারা দেয়। মেহেরুন্নেসা এমন মেয়ে, যে আয়নায় নিজেকে দেখে না অহংকারে। দেখে ভয় মিশ্রিত সচেতনতায়। ছোটবেলা থেকেই তার বাবা শিখিয়েছেন
“রূপ আল্লাহর আমানত, তাকে হেফাজত করতে হয়।”
সে কোনোদিন উঠোন পেরিয়ে বাইরের আঙিনায় যায়নি অকারণে। জানালার ফাঁক দিয়ে আকাশ দেখেছে, কিন্তু বারান্দায় দাঁড়িয়ে কারও সঙ্গে গল্প করেনি। পাড়া-প্রতিবেশীর কারও সামনে মুখ খোলেনি প্রয়োজন ছাড়া। বাবা আর ভাই ছাড়া কোনো পরপুরুষের সামনে সে কখনো দাঁড়ায়নি।
চলার ভঙ্গিটাও আলাদা, পা ফেলে শব্দ না করে হাঁটে। যেন মাটিকেও কষ্ট দিতে চায় না। কথা বলে নিচু স্বরে, চোখ নিচু করে। অথচ সেই নিচু চোখের দৃষ্টিতেই এমন এক গভীরতা আছে, যা অজান্তেই কাউকে থমকে দিতে পারে।
তার পর্দাশীলতা ভীরুতা নয়, সেটা তার বিশ্বাস। তার লালনপালন, তার আত্মসম্মান।
সে জানে না দুনিয়ার কূটচাল, জানে না পুরুষের লালসা, জানে শুধু নিজের সীমা আর ইজ্জতের মূল্য।
গ্রামের দুই, চারজন মহিলা তাকে দেখেছে। এছাড়া কোনো মহিলার সাথেও সাক্ষাৎ করতে দিতে চান না শামসুর হাওলাদার। পাছে লোক সম্মুখে তারা মেহেরুন্নেসার সৌন্দর্যের বর্ননা দেয়। তবুও যে কজন দেখেছে তারা বলে বেড়ায়
“ও মেয়ে না, যেন নূর নেমে এসেছে।”
কিন্তু মেহেরুন্নেসা এসব জানে না। সে শুধু জানে তার পৃথিবী খুব ছোট। বাবা, ভাই, আর চার দেওয়ালের ভেতরটুকুই তার আকাশ। এখনো দুনিয়া তার অজানাই রয়ে গেছে। কিন্তু প্রভা জমিদারের মেয়ে। ও মেহেরুন্নেসার উল্টো। ছোটথেকেই রাজ-কাজ দেখে বড় হয়েছে কোনো সমস্যা দেখে দমে যাওয়ার মেয়ে না ও।
প্রভার পাশে গিয়ে বসে কেঁদে ফেললো মেহেরুন্নেসা
“ভাইজান এটা কেনো করলো ভাবি? আমার যে চোখে সইছে না এসব”
প্রভা উঠে দাড়ায়। চোখ মুছে বলে
“কষ্ট পেও না মেহের। এটা তো হওয়ারই ছিলো। গোটা পরিবার কে কষ্ট দিয়ে তোমার ভাই কে বিয়ে করে চলে এসেছিলাম। তার ও তো একটা অভিশাপ আছে।”
প্রভা সিড়ি উঠতে নিলে মেহেরুন্নেসা হাত ধরে বলল
“কোথায় যাচ্ছো ভাবি?”
প্রভা শক্ত গলায় বলল
“এই অভিশাপের সংসারে, আর এক মূহুর্তও নয়”
মেহেরুন্নেসার হাত ছাড়িয়ে নিয়ে গটগট পায়ে ঘরের দিকে গেলো প্রভা। ঘরের সামনে গিয়ে দেখলো ভিতর থেকে বন্ধ। কয়েকবার টোকা দিতেই দরজা খুলল তিলোত্তমা। সামনে প্রভা কে দেখে একটু ভড়কে গেলো। প্রভা রুমে ঢুকে গেলে তিলোত্তমা ওর পিছুপিছু গিয়ে বলল
“এই এই এটা এখন আমার ঘর। তুই এখানে কেনো এসেছিস?”
এর মধ্যে কল ঘর থেকে বের হলো মাহবুব। প্রভা মাহবুব কে দেখেও না দেখার মতো করে নিজের ব্যাগ বের করতে করতে তিলোত্তমা কে বলল
“জানি এটা তোর ঘর। অন্য কারো জিনিস নেওয়ার মতো অতটাও ছোটলোক আমি নই। সে স্বভাব তোর আছে। আমি জমিদারের কন্যা, দান করা আমার স্বভাব। আমি আমার জিনিস গুলো নিতে এসেছি।”
মাহবুব শুধু দেখলো। কিছু বলল না।
প্রভা নিজের কয়েকটা জামা ব্যাগে ঢুকিয়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলো। তখন তিলোত্তমা কিছু বলতে যাবে
“দেখ আপা…..
ওমনি প্রভা পিছনে ঘুরে কষিয়ে একটা চড় মারলো তিলোত্তমার গালে। রাগে অগ্নিমূর্তি ধারণ করেছে প্রভা। তিলোত্তমা কাঁদো কাঁদো হয়ে মাহবুব কে বলল
“দেখলে তুমি….
মাহবুব তাও কিছু বলল না। প্রভার দিকে তাকাতেই প্রভা বলল
“চড় টা মারলাম ওই নোংরা মুখে আমাকে আপা বলার জন্য”
ব্যাগ নিয়ে বেরিয়ে গেলো প্রভা। মাহবুব তাকিয়ে রইলো প্রভার যাওয়ার দিকে। ঘর পেরিয়ে ছোট বসার ঘরটার কাছে আসতেই প্রভার শাশুড়ি গলা উঁচু করে বলল
“অতো ত্যাজ দেখাও কারে জমিদারের বেটি? জমিদারের মুখ পুড়ায়া না সেই কবেই আইছো? অহন ত্যাজ দেহাই যাইবা আর হইবো নাকি? জমিদার বাকের শাহ্ সম্মানী মানুষ। তার সম্মান নষ্ট কইরা আমার ব্যাটার লগে পলাই আহনের সময় ই তোমারে মাটি দিয়া থুইছে। ওই ঘরে তোমার জায়গা হইবো না নবাব নন্দিনি।”
প্রভা বড় বড় পা ফেলে এগিয়ে আসলো রমলার সামনে। রমলা প্রভা কে দেখে দু’পা পিছিয়ে গিয়ে বলল
“দেখো দেখো, মনে হয় চোখ দিয়া আমারে গিলা খাইবো। হতচ্ছাড়ি কোনহানকার।”
প্রভা রাগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পেরে পাশে থাকা কাচের হারিকেন টা সজোরে মেঝেতে ছুড়ে ফেলল। ঝনঝন শব্দে তা ছড়িয়ে পরলো মেঝে জুড়ে। রমলা লাফ দিয়ে পিছনে সরে যায়। প্রভা হুংকার দিয়ে বলে
“দোয়া করেন আমার যেন জমিদার মহলে জায়গা না হয়। কারণ কোনো ভাবে জায়গা হয়ে গেলে, দুনিয়াতে আপনাদের জায়গা নড়বড়ে হয়ে যাবে”
প্রভার এরুপ হুমকি তে রমলার কপালে দীর্ঘ ভাজ পড়লো। পর পর বাকের শাহ্ এর দুই মেয়েকে পালিয়ে নিয়ে এসেছে তার ছেলে। এবার যদি ক্ষেপে গিয়ে জমিদার কোনো পদক্ষেপ নিয়ে নেন। শুকনো ঢোক গিলল রমলা। প্রভা দরজার সামনে গিয়ে ফের পিছনে তাকালো। প্রভার চাহনি তে রমলার বুকটা ধক করে উঠে। প্রভা আত্মবিশ্বাস এর সাথে বলল
“বাপ জায়গা না দিলেও আমার ভাই কিন্তু মরে নাই রমলা বেগম। আপনার ছেলেরে দুধ গোসল দিয়া পবিত্র করে রাইখেন”
প্রভার কন্ঠ পেয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো মাহবুব। মিরাজ আর শিমুও বেড়িয়ে এলো। রমলা চেচিয়ে বলল
“ও বাবুউউ। দেখছিস কি? আরে ওই মাইয়ারে আটকা। নইলে যে আমগো সবার গলায় দড়ি লাগবো।”
মাহবুবের আগে মিরাজ গিয়ে ধরে ফেললো প্রভার হাত। প্রভা ছাড়ানোর জন্য ছুটাছুটি করছে। কিন্তু পুরুষের শক্তির কাছে এক নারীকে হার মানতে হলো। মিরাজ টেনে এনে দড়ি দিয়ে বেঁধে ফেললো প্রভার দুই হাত। প্রভা রাগে জিদে চ্যাচাচ্ছে। রমলা পানের পিক ফেলে বলল
“পোড়া মুখীরে ঘর বন্ধ কইরা রাখ। মা*গীর বড় দেমাগ না? দেমাগ ছুটাইতাছি তুমার খাড়াও। যা ওরে ঘরে আটকে দে”
মেহেরুন্নেসা ছুটে আসে প্রভার চিৎকারে। রমলার হাতে পায়ে ধরে অনুরোধ করে
“ও আম্মা, আম্মা ছেড়ে দাও না ভাবি কে। ও ছোট ভাই জান, ভাবিকে ছেড়ে দাও। ওনার কি দোষ আম্মা? দোষ তো করছে তোমার বড় ছেলে। ভাবিকে ছাড়তে বলো না আম্মা”
মল্লিকা মেহেরুন্নেসার হাত ধরে টেনে সরিয়ে নিয়ে আসলো
“বড় দের মধ্যে কথা বলতে হয় না মেহের। এসো, এসো বলছি”
ফুপু মেহের কে টেনে নিয়ে ওর ঘরে খাটের ওপর ছুড়ে মারলো। মেহের নিজেকে সামলে উঠতে উঠার আগে দরজা বন্ধ করে দিলো। কুটিল হেসে শাড়ির কুচি ধরে হেটে এলো বৈঠক খানায়। মেহের দরজা ধাক্কাচ্ছে বারবার
“ফুপু আম্মা দরজা টা খোলো। এটা অন্যায়। তোমরা এমন করতে পারো না”
প্রভার হাত দুটো পিছনে বাধা। ছুটাছুটির দরুন মাথার ঘোমটা টা পরে গেলো মাথা থেকে।। মাহবুব পাঞ্জাবির হাতা গুটিয়ে এগিয়ে এসে সজোরে একটা থাপ্পড় মারলো প্রভার গালে। এতে প্রভা দমলো তো না ই আরো হিংস্র হয়ে উঠলো। পা দিয়ে জোরে আঘাত করলো মাহবুবের হাঁটুতে। তাল সামলাতে না পেরে হাঁটু ভেঙে বসে পড়লো মাহবুব। চৌকির কোণা লেগে কপালে জখম হলো বেশ খানিক টা। ক্ষত স্থানে হাত দিয়ে তরল অনুভব করতেই হাতটা সামনে আনলো মাহবুব। কপাল চুইয়ে রক্ত পরছে তার।
প্রভার চোখ এখনো আগুনের স্ফুলিঙ্গ হয়ে আছে, যেন ঝলসে দেবে সব। মাহবুব এর রাগ আরো দ্বিগুণ হলো। তেড়ে আসতে লাগলে হাঁটুর আঘাত তাকে থামিয়ে দিলো। নড়তে পারলো না আর। রমলা আর মল্লিকা গিয়ে প্রভার চুলের মুঠি ধরলো একজন, আরেকজন পা মাড়িয়ে দিলো নিজের পা দিয়ে।
প্রভা যন্ত্রণায় আর্তনাদ করতে লাগলো। শিমু মুখে ওড়না চেপে কাঁদছে। স্বামীর ভয়ে বাচাতে পারছে না প্রভা কে। মল্লিকা বলল
“আরে ভাবিজান। একে এখানে রাখা ঠিক হবে না। ভাইজান এলো বলে। ওকে ভান্ডার খানায় (আগের যুগে পুরনো জিনিস রাখার ঘর) আটকে দাও। কোনো ভাবে ছুটে যেনো জমিদার বাড়ি পৌঁছাতে না পারে”
মল্লিকা, রমলা আর মিরাজ টেনে হিচরে প্রভা কে নিয়ে গেলো পুরনো বই পত্র আর পুরনো জিনিস রাখার ছোট্ট ঘরটায়। কাঠের চেয়ারে বসিয়ে বেধে রাখলো হাত পা সাথে মুখ ও। রমলা ফের চুল টেনে ধরলো প্রভার
“নবাবজাদী, এবার পচে মর এই ঘরে।”
মল্লিকা আর মিরাজ কে বলল
“মাহবুবের বাবা এলে বলবি, এ মেয়ে বাড়ি ছেড়ে চলে গেছে। প্রতিবেশী দেরও একই কথা বলবি”
তিলোত্তমা লাল রঙের কামিজ পরে মাথায় ঘোমটা টেনে বসার ঘরের চৌকি টাতে বসে আছে। রমলা গিয়ে দাঁত কেলিয়ে হেসে তিলোত্তমার পাশে বসলো
“তা বেগম, কি কি গহনা এনেছো বাড়ি থেকে?”
তিলোত্তমা মুচকি হেসে বলল
“গায়ে যা দেখছেন তাই। এর চেয়ে বেশি আমার ছিলো না গয়না”
রমলার মন ভরলো না গয়না দেখে। জমিদারের কন্যা বলে কথা, যতই হোক দ্বিতীয় পক্ষ। প্রভা তো অনেক গহনা নিয়ে এসেছিলো। গত দুই বছরে সব উড়িয়ে ফেলেছে তারা। কিন্তু তিলোত্তমা তেমন কোনো গয়না আনেনি। হাসার চেষ্টা করে বলল
“তুমি তো জমিদর বাবুর দ্বিতীয় পক্ষের কন্যা তাই না?”
তিলোত্তমার মুখটা কালো হয়ে গেলো। দুদিকে মাথা নেড়ে না বোধক ইশারা করলো। মাথা নিচু করে বলল
“আমার বাবা ছিলেন একজন বনিক। বাবা মারা যাওয়ার পর জমিদার বাকের শাহ্ এর সাথে আমার আম্মার নিকাহ্ হয়। তখন আমার বয়স ৭ বছর ছিলো”
রমলার মুখ আরো কালো হয়ে এলো। গত দুই বছরে নিজের মেয়ের খোঁজ ই নেয়নি বাকের শাহ্। আর এ তো পরের মেয়ে। সাথে তেমন সোনা, মানিক্য ও তেমন আনেনি। তাহলে কি লাভ হলো একে বিয়ে করে। আরো বড় ঘরের কোনো বনিকের মেয়েকে ফাঁসালেও পারতো তার ছেলে। মনের বিষ মনে চেপে রেখে তিলোত্তমা কে ঘরে যেতে বললেন।
অনেকক্ষণ দরজা ধাক্কানোর পর, দরজা হেলান দিয়েই মেঝেতে বসে পড়েছে মেহেরুন্নেসা। মায়াবী চোখ জোড়া দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে পানি। গাল দুটো ভিজে উঠেছে। মনে মনে আব্বুকে খুব স্মরণ করছে। আব্বু উপস্থিত থাকলে হয়তো ভাবির সাথে এতবড় অন্যায় হতে দিতো না। মাগরিবের আযান পড়লো মসজিদে। মেহেরুন্নেসা আবার দরজা ধাক্কায়। বাইরে না গেলে অযু করবে কি করে।
আযান এর ধ্বনি শুনে রমলা নিজেই খুলে দিলো মেহেরুন্নেসার দরজা। মেহেরুন্নেসা হন্তদন্ত হয়ে বের হতে গেলে রমলা সজোরে চেপে ধরলো মেয়ের বাহু
“চুপচাপ অযু করে চলে আসবি। এদিক ওদিক যদি খবরদারি করতে দেখেছি। দেখে নিস তোর কি হাল করি”
“কিন্ত আম্মা ভাবি তো….
মেহের এর কথা শেষ হওয়ার আগেই ঠাস করে একটা চড় মেরে দিলো তার গালে। মেহের গালে হাত দিয়ে ছলছল চোখে তাকিয়ে রয়েছে মায়ের দিকে। ফর্সা গালটায় পাঁচটা আঙুলের দাগ বসে গেছে। মেহের কথা না বাড়িয়ে অযু করতে গেলো। তবুও তার আনারি চোখ চারিদিকে খুজছে প্রভাকে। কোথাও কোনো সারা শব্দ নেই। চিন্তিত হয়েই অযু করলো। ঘরে এসে নামাজ পড়ে নিলো। প্রভার জন্য দু’আ ও করলো মোনাজাত এ।
জায়নামাজ ভাজ করে আলনায় রেখে চৌকির কোণায় গিয়ে বসলো। চৌকির পাশের টেবিলটায় অল্প কিছু বই। আব্বু যখন নগরে গেছিলো তখন মেহের এর জন্য নিয়ে এসেছে। শামসুর হাওলাদার বাড়িতে নারী গৃহশিক্ষক এনে মেয়েকে পড়া শিখিয়েছেন। কোরআন এর সাথে মেহের বাংলাও পরতে পারে। গ্রামের অল্প সংখ্যক নারী রাই কেবল বাংলা পড়তে পারে। হাতে গোনা কয়েকজন। বাকিরা অশিক্ষিত। আর ইংরেজি কেবল জমিদার বাড়ির কয়েকজন পুরুষই জানে। এই হচ্ছে রাজ্যের শিক্ষা ব্যাবস্থা।
বাইরে অন্ধকার ঘুটঘুটে হয়ে আসছে। মেহেরকে খাবার টাও ঘরে দিয়ে গেলো রমলা। অযুর জন্য বালতিতে করে পানিও দিয়ে গেলো যাতে আর বের না হয় সে। দরজা বন্ধ করলো না। মেহের নিজেই ভিতর থেকে বন্ধ করে দিলো।
খাবার ঢেকে রেখেই শুয়ে পড়লো মেহের। খাওয়ার ইচ্ছা নেই। পাশের ঘরে থেকে ভেসে আসে মৃদু গোঙানির আওয়াজ আর আঘাতের শব্দ। মেহেরের টনক নড়লো। কাকে মারছে? ভাবি কে না তো। গলা শুকিয়ে আসে মেহের এর। হারিকেন টা হাতে নিয়ে নিশ্বব্দে ঘরের খিল খুলল। নিজের ঘর পেরিয়ে বসার ঘর পার হতেই মাহবুব কে দেখলো ভান্ডার ঘর থেকে বেরোতে। মেহের আড়ালে চলে গেলো দ্রুত। মাহবুব খোরাতে খোরাতে ঘরে চলে গেলো। তারপর মেহের গেল ওই ঘরের দরজার কাছে। জানালার ফাক দিয়ে হারিকেন দিয়ে দেখলো প্রভা চেয়ারে বাধা অবস্থায় উল্টে পরে আছে। মেহেরের শিরদাঁড়া বেয়ে একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো। মৃদু স্বরে ডাকলো
“ভাবি, ভাবি?”
প্রভার চোখ জোড়া নিভে আসছে। মেহের কয়েকবার ডাকলেও কোনো সারা পেলো না। বসার ঘরের ভিতর থেকে মল্লিকার গলা শোনা যায়। মেহের দ্রুত স্থান ত্যাগ করলো। মা বা ফুপুআম্মার হাতে পড়লে আর রক্ষে নেই। চুপিচুপি ঘরে ঢুকে ফের খিল তুলে দিলো। কোনো ভাবেই চোখের সামনে থেকে সরাতে পারছে না তিলোত্তমার রক্তাক্ত মুখখানা। মেয়েদের কি ভাগ্য। মেয়েদের সাথে এমন অত্যাচার আর কতকাল হবে? কয়দিন আগেও পাশের বাড়ির বউটা গলায় দড়ি দিলো স্বামীর অত্যাচার সহ্য করতে না পেরে। আবার মাহবুব ও এমন কাজ করছে। মাহবুব কে নিজের ভাই ভাবতেও ঘেন্নায় গা রিরি করছে মেহের এর।
কিন্তু প্রভাকে কি করে সাহায্য করবে ভেবে পায় না। সকালে আম্মা আর ফুপু যখন তালিম এ যাবে, তখন না হয় এক সুযোগে প্রভার কাছে যাওয়ার চেষ্টা করবে।
সকালের সূর্য উদয়ের পরপরই বাড়ি থেকে বেড়িয়ে যান শামসুর হাওলাদার আর মাহবুব। তাদের একখানা মুদি দোকান আছে। সেটার মোকামে যাবে নগরে। মিরাজ একটা আড়তে কাজ করে। সেও গেলো আড়তে। বাড়ির রান্না বান্না আর ঘরের কাজের পাঠ চুকিয়ে রমলা ননদ কে নিয়ে তালিমে গেলো। সাথে নিলো নতুন বউকেও। সবার সাথে পরিচয় করাতে হবে তো। বাড়িতে রইলো শিমু আর মেহের। সদর দরজায় তালা লাগিয়ে দিয়ে গেলো বাইরে থেকে।
মেহেরও এর অপেক্ষা তেই ছিলো। চারিপাশে চোখ বুলিয়ে দেখে নিলো, শিমু নিজের ঘরে বোধহয়। দ্রুত রান্না ঘরে গিয়ে প্লেটে খাবার নিলো, তারপর সেটা নিয়ে ভান্ডার ঘরে গেলো মেহের। কিন্তু দরজায় তালা ঝোলানো। এবার খাবারটা দিবে কি করে বেশ চিন্তায় পড়ে গেলো। মেহের থালা টা দরজার সামনে রেখে জানালার ফাঁক দিয়ে উঁকি দিলো। প্রভা আগের মতোই পড়ে আছে। মেহের সতর্কতার সহিত ডাক দিলো
“ভাবিই। ও ভাবি। শুনছো?”
প্রভা অনেক ধস্তাধস্তি করে মুখের রুমাল টা সরিয়েছে। কিন্তু কথা বলার শক্তি পাচ্ছে না যেনো। মেহের বলল
“তোমাকে খাবার দিই কিভাবে বলো তো ভাবি।”
প্রভা দুর্বল কন্ঠে বলল
“খা…খাবার লাগবে না মেহের। দরজা….দরজা টা খুলে দাও শুধু”
মেহের এর টলমলে চোখ দুটোর পানি টুপটাপ পড়লো মেঝেতে।
“ভাবি দরজায় তালা লাগানো। আর সদর দরজা তেও।”
প্রভা যেনো শেষ আশার আলোটুকুও হারালো। হঠাৎ তার মাথায় আসলো অন্য বুদ্ধি।
“মে…মেহের। মেহের। আছো?”
“হ্যা ভাবি আছি। শুনছি বলো”
“এ…একটা চিঠি লিখতে পারবে বোন? আমা…আমার ভাইজান এর কাছে। চিঠি পেলেই ভাইজান আমায় নিতে আসবে”
মেহের দ্রুত চোখের পানি মুছে নিলো। সে সব করতে প্রস্তুত, তবুও এই নির্দোষ টার যেনো মুক্তি হয়।
“পারবো পারবো। কিন্তু পাঠাবো কি করে? আমি তো জমিদার বাড়ি চিনি না”
“পাশের বাড়ির যে শাহানা ভাবি আসে মাঝে মধ্যে। ওর স্বামী রাজবাড়ীর সৈনিক। ওর কাছে দিলেই ও পৌঁছে দেবে বোন। আমি তোমার কাছে আজীবন কৃতজ্ঞ থাকবো। বাঁচাও আমায়।”
মেহের যদিও কখনো এই বাড়ির বাইরে যায়নি বড় হয়েছে পর থেকে। তবুও প্রভার জীবনের কথা চিন্তা করে হলেও যেতে হবে।
“আমি এক্ষুণি দোয়াত কলম আর কাগজ নিয়ে আসছি”
মেহের দৌড়ে গিয়ে হলদে একখানা কাগজ নিয়ে আসলো। কালি আর দোয়াত নিয়ে বসলো ঘরের সামনে। প্রভা বলে দিবে কি কি লিখতে হবে। প্রভা বলতে শুধু করলো
“প্রিয় ভাইজান,
সেদিন তোমাদের অবাধ্য হয়ে পালিয়ে আসার পর বুঝেছিলাম। পরিবারের অমতে কিছু করলে সুখী হওয়া যায় না। আজ আমি নির্যাতিত, মৃত্যু পথযাত্রী। কখন যানি ওরা আমাকে মেরে ফেলে। জানো ভাইজান তিলোত্তমা কে আমার স্বামী বিয়ে করেছে। ওরা আমাকে খুব মারছে ভাইজান। বেধে রেখেছে যাতে তোমার কাছে যেতে না পারি। যদি আমাকে জীবিত দেখতে চাও, তাহলে দ্রুত আমাকে উদ্ধার করে নিয়ে যাও। আর যদি ঘৃণায় মুখ ফিরিয়ে রাখো আজও। তাহলে আজকের পর থেকে জেনে নিও রত্নপ্রভা মরে গেছে। আমি রাজ্যের শেষ সিমানায় শামসুর হাওলাদার এর বাড়িতে আছি।
ইতি তোমার বোন রত্নপ্রভা।
একটা খামও তৈরি করলো মেহের। খামের ভিতর কাগজখানা ভরে ওপরে ঠিকানা লেখার জন্য জিজ্ঞেস করলো প্রভা কে। প্রভা বলে দিলো
ঠিকানা: সাহাবাদ প্রাসাদ
প্রাপক : বাইজিদ শাহ্
বাইজিদ শাহ্! নামটা মেহের পরপর দুইবার মুখে উচ্চারণ করলো। আচমকাই যেন কেমন একটা ঘোরের মধ্যে চলে গেলো। দরজা ঝনাৎ করে খোলার শব্দ পেয়ে সতর্ক হলো…
নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
সূচনা পর্ব
এই গল্প শুধু মাত্র এই আমার পেইজেই পাবেন। আমার পেইজ একটাই। এটা ব্যাতিত আমার অন্য কোনো পেইজ নেই। কিছু অসাধু ব্যাক্তি আমার আগেই চ্যাটজিপিটি দিয়ে লেখিয়ে পরবর্তী পর্ব দিচ্ছে। যাতে লেখার কোনো গুণ মাধুর্য নেই। তাই পরবর্তী পর্ব পেতে আমার পেইজ টা ফলো করে রাখুন।
চলবে?
কেমন হয়েছে অবশ্যই বলবেন। যদিও সমস্ত টুইস্ট এখনো বাকি। আপনাদের রেসপন্স ভালো আসলে পরবর্তী পর্ব দিবো। আর খাচায় বন্দি ফুল সকালে পাবেন। কারণ পোস্ট গ্যাপ না রাখাটা পেইজের জন্য মন্দ। শুধু এই কারনেই। গল্প টা শেয়ার করে দিয়েন যাতে আরো পাঠক পড়ার সুযোগ পায় 🤍
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৮
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৪
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫২