Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৮


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব- ১৮

বৈঠক খানা ভর্তি মানুষের সামনে কতগুলো সিড়ি গড়িয়ে নিচে এসে পড়েছে সিমরান। আচমকা এমন কান্ডে হচকচিয়ে ওঠে সবাই। মেঝেতে পড়ার সাথে সাথেই নাক মুখ দিয়ে গড়িয়ে রক্ত পরতে শুরু করলো। মারজান আর রত্নপ্রভা দৌড়ে গিয়ে ধরলো সিমরান কে। মেহেরুন্নেসা সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে আসে। মারজান কটমট করে তাকায় মেহেরুন্নেসার দিকে। গরম হয়ে বলল
“এই মেয়ে। তুমিও তো ছিলে ওখানে। ও পড়লো কী করে?”

মেহেরুন্নেসা শান্ত চোখে তাকায় মারজান এর দিকে। মারজান তড়িঘড়ি করে সিমরান এর মাথাটা নিজের কোলে তুলে নেয়। মেহেরুন্নেসা সিমরান এর পাশে বসে বলল
“শাহজাদার ঘরে যাওয়ার ভীষণ তাড়া ছিলো বেচারির। গতি সামলাতে পারেনি। পড়ে গেলো”

বাকের শাহ দাসীদের আদেশ দিলো সিমরান কে কক্ষে নিয়ে যেতে। বৈদ্য খবর দেওয়া হলো। সকলে উঠলেও টেবিলের একটা চেয়ারে বসে আরাম করে আপেল খাচ্ছে সুনেহেরা। চোখে খুশির ঝিলিক। মেহের টা কে যতটা বোকা ভেবেছিল, ততটাও নাহহ। সিমরান কে নিয়ে গেলে মেহেরুন্নেসা ও বাইজিদ এর ঘরের দিকে রওনা হলো।

এই প্রথম এত বেলা করে ঘুম থেকে উঠলো বাইজিদ। ভোরে উঠে নামাজ আদায় করে শারীরিক ব্যায়াম করা তার নিত্যদিনের অভ্যাস। তারপর গোসল সেরে যথাসময়ে বৈঠকে হাজির হয় নাশতা করতে। কিন্তু গত কালের মত এত গুরুত্বপূর্ণ একটা রাতে সে কী করে অমন গভীর ঘুমে তলিয়ে গেলো ভেবে পায় না। মাথাটা এখনো ভো ভো করে ঘুরছে। ঘুমের পর নিজেকে স্বচ্ছ লাগার বদলে আরো ভারি লাগছে সম্পূর্ণ শরীর। ফুল দিয়ে সাজানো পালঙ্ক টার দিকে একবার তাকিয়ে বিছানা ছেড়ে নামলো। মেহেরুন্নেসা নির্ঘাত তার ওপর মনঃক্ষুণ্ন হয়েছে। সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী কে সময় না দিয়ে, দুটো ভালো মন্দ জিজ্ঞেস না করে ওমন বেয়াক্কেল এর মত সে ঘুমিয়ে গেছিলো ভেবেই হাসফাস করে। কী এমন ঘুম পেল তার কালকে। কত রাত তো মেহেরুন্নেসা কে ভেবেই কাটিয়ে দিয়েছিল নির্ঘুম। আর কাল একান্তে কাছে পেয়েও জেগে থাকতে পারলো না?

তার তো উচিত ছিলো মেহেরুন্নেসার সাথে গল্প করার, তার পছন্দ অপছন্দ জিজ্ঞেস করার, আগামী জীবন নিয়ে আশ্বাস দেওয়ার। একটা মেয়ের কত স্বপ্ন থাকে এই রাত নিয়ে। সেই সব ভেঙে চুরমার করে দিয়ে বাইজিদ ঘুমিয়ে পড়েছিলো। অপরাধ বোধে তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে। গায়ের পাঞ্জাবি টা খুলে আয়নার সামনে গিয়ে দাড়াতেই স্বচ্ছ কাচটায় দেখা যায় তার প্রিয় নারীটির অবয়ব। দরজার সামনের রাজকীয় পর্দা দু’হাতে সরিয়ে ভিতরে প্রবেশ করলো মেহেরুন্নেসা। পরনে মেঝে ছুই ছুই বিশাল ঘের এর গোল জামা।

মেহেরুন্নেসা ভিতরে ঢুকতেই আয়নার কাঁচে তার প্রতিবিম্ব পড়ে। জানালার ফাঁক গলে আসা সকালের আলোয় যেন আরো উজ্জ্বল লাগছে তাকে। গাঢ় রঙের বিশাল ঘেরওয়ালা জামাটা মেঝে ছুঁয়ে আছে, মাথার ঘোমটার নিচে কপালের পাশে কয়েকটা ভেজা চুল লেগে রয়েছে। সদ্য গোসল করা শরীর থেকে হালকা আতরের গন্ধ ভেসে আসছে।
আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদ এক মুহূর্তের জন্য স্থির হয়ে গেল। পাঞ্জাবি খোলা, ফর্সা সুঠাম দেহের ওপর সকালের আলো এসে পড়েছে। প্রশস্ত কাঁধ, বুকের ওপর ছায়া-আলোয় ফুটে ওঠা রেখাগুলো দেখে মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠলো। সঙ্গে সঙ্গে সে চোখ নামিয়ে নিল। গাল দুটো লাল হয়ে উঠলো লজ্জায়। বাইজিদ আয়নার দিকেই তাকিয়ে চোখ সরু করে মৃদু হেসে বলল
“এত সকালে আমার মহারানি গোসল করেছে কেন?”
মেহেরুন্নেসা আরো অপ্রস্তুত হয়ে গেল। নিচের দিকে তাকিয়েই বলল,
“আমি..আমি আসলে।”
বাইজিদ ধীরে ধীরে তার দিকে ফিরলো। সেই দৃষ্টিতে এমন এক মুগ্ধতা, যেন বহুদিনের চাওয়া জিনিসটা অবশেষে সামনে পেয়েছে। সে কয়েক পা এগিয়ে এলো। মেহেরুন্নেসা অজান্তেই এক পা পিছিয়ে গেলেও বাইজিদের চোখ থেকে নিজের চোখ সরাতে পারলো না।
কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইলো বাইজিদ। যেন খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে নিচ্ছে নিজের স্ত্রীকে। কপালের কয়েকটা ভেজা চুল, নাকের ডগা সামান্য লাল, গালের হালকা লাল আভা, ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা সংকোচ। কিছুই তার চোখ এড়ালো না।
তারপর খুব আস্তে হাত বাড়িয়ে মেহেরুন্নেসার মাথার ঘোমটাটা একটু সরিয়ে দিল। ঘোমটা সরে যেতেই ভেজা কালো চুল গুলো ঝলমলিশে ছড়িয়ে পড়লো। বাইজিদ এক মুহূর্ত চোখ বন্ধ করে সেই চুলের গন্ধ নিল।
“এই গন্ধটা…”
খুব নিচু স্বরে বলল সে
“আমার বাকি জীবন মনে থাকবে।”
মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস কেঁপে উঠলো। সে চোখ তুলে একবার তাকিয়েই আবার নিচু করে ফেলল।
বাইজিদ এবার আর নিজেকে আটকালো না। আলতো করে তাকে নিজের বুকের কাছে টেনে নিল। এত কোমল, এত সাবধানে, যেন একটু জোরে ধরলেই সে ভেঙে যাবে। মেহেরুন্নেসার কপাল এসে ঠেকলো তার বুকে। বাইজিদের বুকের ধুকপুকানি স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে সে।
বাইজিদ ধীরে ধীরে বলল,
“কাল রাতে আমি তোমার প্রতি অনেক অন্যায় করেছি। তোমাকে একা ফেলে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। বিশ্বাস করো, এমনটা আমি চাইনি।”
মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইলো। তারপর খুব আস্তে বলল,
“আমি কিছুই মনে করিনি। আপনি ক্লান্ত ছিলেন। তাই ঘুমিয়ে গেছিলেন। এতে দোষের কিছু নেই”

বাইজিদ মেহেরুন্নেসা কে বুকে রেখেই বলল
“তবুও আমার খুব খারাপ লাগছে। তোমার কত স্বপ্ন ছিল হয়তো। আর আমি…”
মেহেরুন্নেসা এবার মাথা তুলে তাকালো তার দিকে। চোখে একফোঁটা অভিমান থাকলেও তার চেয়ে বেশি ছিল কোমলতা।
“সব স্বপ্ন এক রাতে শেষ হয়ে যায় না”
তারপর আস্তে করে বলল
“কিছু স্বপ্ন সময় নিয়ে পূরণ হয়।”
কথাটা শুনে বাইজিদের ঠোঁটে ধীরে ধীরে হাসি ফুটে উঠলো। সে মেহেরুন্নেসার কপালের ওপর খুব যত্ন করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল। তারপর কানে কানে বলল
“তাহলে আমি প্রতিটা স্বপ্ন ধীরে ধীরে পূরণ করবো… যতদিন লাগে।”

কেমন ঘোর লাগা গলায় বলল
“ভেজা চুলে তোমায় আরো আবেদনময়ী লাগছে”

মেহেরুন্নেসা লজ্জায় নাথা নিচু করে ফেলে। বাইজিদ এর ঠোঁট এগিয়ে যায় পছন্দের নারীর রক্তজবার ন্যায় রক্তিম ঠোঁট জোড়ার দিকে। বাইজিদ ধীরে ধীরে ঝুঁকে আসছে আর মেহেরুন্নেসাও লজ্জায় চোখ বুজে ফেলেছে, তখনই দরজাটা হুড়মুড়িয়ে খুলে গেল।
“বাইজিদ!”
মারজানের তীক্ষ্ণ গলায় যেন পুরো ঘরটা কেঁপে উঠলো। দুজনেই এমনভাবে চমকে উঠলো যেন হাতেনাতে চোর ধরা পড়ে গেছে। মেহেরুন্নেসা তড়িঘড়ি করে বাইজিদের বুক থেকে সরে দাঁড়ালো। তার মুখ মুহূর্তেই টকটকে লাল হয়ে উঠলো। অন্যদিকে বাইজিদও অপ্রস্তুত হয়ে এক পা পিছিয়ে গেল।
দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছে মারজান। চোখ মুখ কুৎসিত করে বলল
“এই সকালবেলা দরজা বন্ধ করে কী করছিলে তোমরা?”

মেহেরুন্নেসা মাথা নিচু করে এক মুহূর্তও দাঁড়াতে পারলো না। আঁচলটা মুখের পাশে টেনে নিয়ে প্রায় দৌড়ে বারান্দার দিকে চলে গেল। বাইরে গিয়ে দাঁড়াতেই ঠাণ্ডা হাওয়া এসে তার গরম গাল ছুঁয়ে গেল। বুকের ভেতরটা এখনো ধড়ফড় করছে। লজ্জায় তার মনে হচ্ছে যেন মাটির সঙ্গে মিশে যায়। এদিকে বাইজিদ দাঁতে দাঁত চেপে মারজানের দিকে তাকালো। তারপর কপট রাগ দেখিয়ে বলল,
“ আপনার কি কারো ঘরে ঢোকার আগে দরজায় কড়া নাড়ার অভ্যাস একেবারেই নেই?”
মারজান ভ্রু তুলে বলল,
“ওমা! তোমার ঘরে ঢুকতে আবার কড়া নাড়তে হবে নাকি?”

বাইজিদ গম্ভীর মুখে বলল।
“বিশেষ করে যখন কেউ সদ্য বিয়ে করেছে। তার ঘরে অন্তত…”
মারজান এবার ঠোঁট বেকিয়ে ভেংচি কাটলো।
“তাই নাকি? তা আমি কি জানতাম আমার শাহজাদা এত সকালে এমন ব্যস্ত থাকবে? সেই কখন আসলো মেয়েটা ঘরে, এখনো অবদি কি করছিলে তাই দেখতে আসলাম”

বাইজিদ বিরক্ত মুখে বলে উঠলো। মারজান হেসে ফেলল এবার। তারপর একটু এগিয়ে এসে ফিসফিস করে বলল,
“আমি আসলে বলতে এসেছিলাম, নিচে বৈদ্য এসেছে। সিমরানের অবস্থা ভালো নয়। সিড়ি থেকে পড়ে গেছে। জ্ঞান ফিরেছে মাত্র। কিন্তু সে এমন কান্নাকাটি করছে যেন কেউ তাকে সিঁড়ি থেকে ধাক্কা মেরে ফেলেছে।”

বাইজিদের চোখের দৃষ্টি একটু বদলে গেল। সে একবার বারান্দার দিকে তাকালো, যেখানে মেহেরুন্নেসা এখনো মুখ ফিরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠলো।
“কে কী বলছে সেটা পরে দেখা যাবে। এখন আপনি যেতে পারেন”

কথাটা শান্ত গলায় বলল বাইজিদ। কিন্ত মারজান কাঋে বিষাদ ঠেকলো। বেড়িয়ে যেতে নিলে বাইজিদ ফের বলল
“এখন থেকে, আমার ঘরে ঢোকার আগে দরজায় কড়া নাড়বেন।”
মারজান ভেংচি কেটে চলে যেতেই কিছুক্ষণ স্থির দাঁড়িয়ে রইলো বাইজিদ। তারপর ধীরে ধীরে বারান্দার দিকে এগিয়ে গেল। বারান্দার এক কোণে দাঁড়িয়ে আছে মেহেরুন্নেসা। দুহাতে রেলিং আঁকড়ে ধরে দূরের জঙ্গলের দিকে তাকিয়ে আছে সে। সকালের নরম আলোয় জঙ্গলটা কুয়াশার আবরণে আধো ঢাকা। গাছের মাথার ওপর দিয়ে হালকা বাতাস বয়ে যাচ্ছে। সেই বাতাসে মেহেরুন্নেসার ভেজা চুলগুলো উড়ে এসে গাল ছুঁয়ে যাচ্ছে বারবার।
কিন্তু সে কিছুই টের পাচ্ছে না। এখনো লজ্জায় তার বুক ধড়ফড় করছে। একটু আগের ঘটনার কথা মনে পড়তেই গাল দুটো আবার রাঙা হয়ে উঠলো। ঠিক তখনই পেছন থেকে নিঃশব্দে এসে দাঁড়ালো বাইজিদ।
এক মুহূর্ত তাকে দেখলো শুধু। সকালের আলোয় দাঁড়িয়ে থাকা মেয়েটাকে তার অবিশ্বাস্য সুন্দর লাগছে। মনে হচ্ছে, এই দৃশ্যটা সে বহুদিন ধরে নিজের মনে এঁকে রেখেছিল।
তারপর খুব আস্তে, খুব সাবধানে, বাইজিদ দুহাত বাড়িয়ে মেহেরুন্নেসাকে ঘিরে ধরলো। তার দুহাত গিয়ে থামলো রেলিংয়ের ওপর, মেহেরুন্নেসার দুই পাশ দিয়ে। ফলে মেহেরুন্নেসা যেন সম্পূর্ণ তার বাহুর ভেতর বন্দি হয়ে গেল।
হঠাৎ স্বামী কে এত কাছে পেয়ে কেঁপে উঠলো মেহেরুন্নেসা। নিঃশ্বাস আটকে এলো তার। পেছনে বাইজিদের বুকের উষ্ণতা, কাঁধের কাছে তার গরম নিঃশ্বাস। সব মিলিয়ে সে যেন আর ঠিকমতো দাঁড়িয়েই থাকতে পারছে না।
“এত দূরে দূরে দাঁড়িয়ে আছো কেন?”
খুব নিচু স্বরে বলল বাইজিদ।
মেহেরুন্নেসা চোখ নামিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“আমি দূরে কোথায় দাঁড়িয়ে আছি?”
“আমার থেকে।”
কথাটা বলে বাইজিদ মুখটা একটু ঝুঁকিয়ে আনলো তার কাঁধের কাছে। ভেজা চুলগুলো সরিয়ে দিল ধীরে ধীরে। তারপর কাঁধের ওপর খুব ছোট্ট, খুব নরম করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।
মেহেরুন্নেসার পুরো শরীর কেঁপে উঠলো। হাতের আঙুলগুলো রেলিং শক্ত করে চেপে ধরলো সে। মনে হলো বুকের ভেতরটা যেন কেমন হালকা হয়ে যাচ্ছে, আবার ভারিও হয়ে উঠছে। বাইজিদ থামলো না। আরেকবার, তারপর আরো একবার, কাঁধের কাছে আলতো করে ঠোঁট ছোঁয়ালো। তার প্রতিটা স্পর্শে মেহেরুন্নেসা লজ্জায় আরো মিইয়ে যেতে লাগলো। মাথাটা আস্তে আস্তে নুয়ে এলো, চোখ দুটো বন্ধ হয়ে গেল।
বাইজিদ মৃদু হেসে তার কানের পাশে মুখ এনে বলল
“গত রাত টা হারিয়ে ফেলেছি। আজকের রাতটা কিন্তু আমার চাই”
বাইজিদের কথায় মেহেরুন্নেসার বুকটা আবার ধক করে উঠলো। সে লজ্জায় কিছু বলতে পারলো না। শুধু মাথা নিচু করে রেলিং আঁকড়ে দাঁড়িয়ে রইলো। তার কানের ডগা পর্যন্ত লাল হয়ে গেছে। বাইজিদ মৃদু হেসে আরেকটু ঝুঁকে এল।
“এভাবে চুপ করে থাকলে কিন্তু আমি ধরে নেবো, তুমি রাজি।”

স্ত্রীর অবস্থা দেখে বাইজিদ হেসে উঠলো। সেই হাসিটা অদ্ভুত উষ্ণ। যেন অনেকদিন পর সত্যি করে হাসছে সে। তারপর আলতো করে মেহেরুন্নেসার কানের পাশে উড়ে আসা চুলগুলো সরিয়ে দিয়ে বলল,
“আমি গোসল করে আসি। তুমি একা গোসল করলে লোকে আবার আমায় ভুল বুঝবে।”

বলেই চোখ টিপলো বাইজিদ। মেহেরুন্নেসা মাথা নেড়ে সম্মতি দিল। বাইজিদ ঘরের ভেতরে ঢুকে পাশের গোসলখানার দিকে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর পানির শব্দ ভেসে এলো। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে ঘরে ফিরে এসে পালঙ্কের পাশে বসলো।

কিছুক্ষণ পর গোসলখানার দরজা খুলে গেল।
মেহেরুন্নেসা অন্যমনস্ক হয়ে বসে ছিল। শব্দে মুখ তুলে তাকাতেই তার নিঃশ্বাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
ভেজা শরীরে বাইরে এসে দাঁড়িয়েছে বাইজিদ। কোমরে সাদা কাপড় জড়ানো, কাঁধ থেকে টপটপ করে পানি পড়ছে। সদ্য গোসলের পর তার গায়ের রঙ যেন আরো উজ্জ্বল দেখাচ্ছে। ভেজা চুলগুলো এলোমেলো হয়ে কপালের ওপর পড়ে আছে। কপাল বেয়ে একফোঁটা পানি নেমে এসে গালের পাশ দিয়ে গড়িয়ে পড়লো।
প্রশস্ত কাঁধ, সুঠাম বুক, সবুজ চোখে সেই চিরচেনা গভীরতা মেহেরুন্নেসার মনে হলো, এত সুন্দর একজন মানুষকে এভাবে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে যেন স্বপ্নের মত লাগছে। যেন এ কোনো রুপকথার গল্পের কোনো শাহজাদা।
বাইজিদ মুচকি হেসে বলল,
“এভাবে তাকিয়ে আছো কেন?”
মেহেরুন্নেসা আঁতকে উঠে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে ফেললো।

বাইজিদ ইচ্ছে করেই তার সামনে এসে দাঁড়ালো। তারপর পাশের টেবিল থেকে নরম তোয়ালেটা তুলে মেহেরুন্নেসার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল,
“আমার চুলগুলো মুছে দেবে?”
মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত ইতস্তত করলো। তারপর ধীরে ধীরে তোয়ালেটা হাতে নিল।
বাইজিদ তার সামনে বসে পড়লো। মেহেরুন্নেসা কাঁপা হাতে তার ভেজা চুলে তোয়ালে ছুঁইয়ে দিল। খুব আস্তে আস্তে চুলগুলো মুছে দিতে লাগলো। বাইজিদ চোখ বন্ধ করে বসে রইলো। তার মুখে একরাশ প্রশান্তি। যেন এই ছোট্ট যত্নটুকুই তার কাছে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সুখ।
মেহেরুন্নেসার আঙুল কখনো তার কপাল ছুঁয়ে যাচ্ছে, কখনো কানের পাশে। প্রতিবারই বাইজিদের ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি ফুটে উঠছে। চোখ বন্ধ রেখেই বাইজিদ বলল
“জানো? তোমাকে পেয়ে আমার মনে হচ্ছে, আমি কোনো যুদ্ধ জিতে এসেছি।”
মেহেরুন্নেসা থমকে গেল।
“কেন?”
বাইজিদ এবার চোখ খুলে তার দিকে তাকালো। সেই দৃষ্টিতে এত মায়া, এত মুগ্ধতা যে মেহেরুন্নেসা আবার চোখ নামিয়ে ফেললো। দরজায় ফের খটখট শব্দ। বাইজিদ বিরক্তি তে চোখ বুজে দীর্ঘশ্বাস ছাড়লো। কিন্তু তা মিলিয়ে গেলো প্রভার গলা শুনে
“ভাইজান, আসবো?”

“আয়”

দুজন দাসী সাথে করে ট্রে ভর্তি খাবার নিয়ে এসেছে প্রভা। খাবার গুলো গুছিয়ে দিয়ে মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে আসতে লাগলো। বাইজিদ মেহেরুন্নেসা কে নিয়ে যেতে দেখে বলল
“ওকে কোথায় নিয়ে যাচ্ছিস?”

প্রভা মেহেরুন্নেসার হাত ধরে রেখেই বলল
“দরকার আছে ভাইজান। তুমি খেয়ে নাও”

প্রভা মেহেরুন্নেসা কে নিজের ঘরে নিয়ে যায়। রত্নপ্রভার ঘরটা যেন অন্য এক জগৎ। বড় বড় জানালার গা বেয়ে সকালের শেষ আলো ঢুকে পড়েছে, আর সেই আলোয় ঘরের মাঝখানে রাখা পিতলের কারুকাজ করা সিন্দুক, লালচে কাঠের আলমারি আর মখমলের কাপড়ে মোড়া গহনার বাক্সগুলো ঝলমল করে উঠছে। সামনে খোলা তিনটা বাক্স। একটার ভেতর সারি সারি সোনার চুড়ি, যেন ছোট ছোট সূর্য। আরেকটাতে মুক্তোর মালা, সাদা মুক্তোগুলো এমনভাবে জড়ো হয়ে আছে যেন কারও হাত থেকে ঝরে পড়া শিশির। শেষ বাক্সটাতে ছিল ভারী নকশা করা হার, পান্না বসানো নথ, আর কপালে পরার টিকলি।
মেহেরুন্নেসা চুপচাপ পাশে বসে একটা একটা করে গহনা এগিয়ে দিচ্ছিল।
রত্নপ্রভা একটা চওড়া সোনার হার হাতে তুলে নিয়ে মৃদু হেসে বলল,
“এটা আমার আম্মাজান এর গয়না”

মেহেরুন্নেসা হারটার ওপর আঙুল বুলিয়ে মুগ্ধ চোখে তাকালো। হারটার মাঝখানে লাল পাথর বসানো, চারপাশে সূক্ষ্ম নকশা। যেন রক্তজবা ফুল ফুটে আছে সোনার ভেতর । আরেকটা বাক্স খুলতেই ভেতর থেকে এল চন্দনের হালকা গন্ধ। বাক্সটা ছিল ছোট, পুরনো, গাঢ় বাদামি কাঠের। উপরে খোদাই করা লতা-পাতার নকশা। বাক্সের ভেতর সারি করে রাখা ছিল রুপোর পায়েল, নীল পাথরের কানের দুল, আর কয়েকটা পুরনো আংটি।

কথা বলতে বলতে রত্নপ্রভা গহনা গুলো আলমারির তাকে গুছিয়ে রাখছিল। মেহেরুন্নেসা নিচের দিকের ছোট্ট কাঠের বাক্সটা টেনে বের করল। বাক্সটা অন্যগুলোর চেয়ে আলাদা। ভারী, ধুলো জমে আছে ওপরে। তালা নেই, কিন্তু যেন বহুদিন কেউ খোলেওনি।
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে ঢাকনাটা তুলতেই ভেতর থেকে একটা পুরনো কাপড়ের খাম বেরিয়ে এলো।
“ এটা কী?”
রত্নপ্রভা তখন আলমারির দিকে মুখ করে ছিল। তাই খেয়াল করল না। মেহেরুন্নেসা খামটা খুলতেই একটা পুরনো আঁকা ছবি বেরিয়ে এল।
ছবিটা হাতে নিয়েই সে থমকে গেল। ছবির মানুষটা.. ঠিক বাইজিদের মতো। একই মুখ। একই ভ্রু। একই তীক্ষ্ণ চোয়াল। এমনকি ঠোঁটের কোণের সেই চাপা হাসিটাও।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল।
একটা জিনিস আলাদা। ছবির মানুষের চোখ দুটো কালো। স্বাভাবিক, গভীর কালো।
আর বাইজিদের চোখ সবুজ।
মেহেরুন্নেসা বিস্ময়ে ছবিটার দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর ছবিটা আলোয় উল্টে পাল্টে দেখল। না, ভুল দেখছে না। চোখ সত্যিই কালো। ধীরে ধীরে সে মুখ তুলে রত্নপ্রভার দিকে তাকালো।
“আপা”
রত্নপ্রভা ফিরে তাকাতেই মেহেরুন্নেসার হাতে ছবিটা দেখে তার মুখের রং মুহূর্তে বদলে গেল।
“আপা, শাহজাদার চোখ কি জন্ম থেকেই এমন? মানে সবুজ?”
রত্নপ্রভা কিছু বলল না।
মেহেরুন্নেসা আবার ছবিটার দিকে তাকিয়ে ফিসফিস করে বলল,
“চোখের রং কি পরিবর্তন হয় নাকি? ছবিতে তো স্পষ্ট কালো মনি লাগছে”

এক মুহূর্তে যেন ঘরের সব শব্দ থেমে গেল। রত্নপ্রভার শিরদাঁড়া বেয়ে শীতল একটা স্রোত নেমে গেল। তার চোখে এমন এক আতঙ্ক ফুটে উঠল, যেন বহু বছর আগের চাপা পড়ে থাকা কোনো ভয়ংকর স্মৃতি আচমকা দরজা ভেঙে ফিরে এসেছে।
সে তড়িঘড়ি করে মেহেরুন্নেসার হাত থেকে ছবিটা ছিনিয়ে নিল।
“ ওটা… ওটা পুরনো ছবি। আলো-আঁধারিতে এমন লাগে। আর তাছাড়া রং তুলিতে আঁকা”

এসব বলতে বলতে ছবিটা দ্রুত কাপড়ের খামের ভেতর ঢুকিয়ে বাক্সটা বন্ধ করে ফেলল রত্নপ্রভা। তারপর বাক্সটা আলমারির একেবারে পেছনে ঠেলে রাখল।
মেহেরুন্নেসা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।
“ কিন্তু আপা”
“আরে না না, তুমি ভুল দেখেছো। পুরনো ছবিতে সবকিছু ঠিকঠাক বোঝা যায় না।
রত্নপ্রভা জোর করে হাসল। কিন্তু সেই হাসিতে উষ্ণতা ছিল না, ছিল কেবল ভয়। তার হাত দুটো কাঁপছিল।
“আ…আচ্ছা তুমি যা..যাও। আমিই গয়নাগুলো গুছিয়ে রাখি।”

যারা গল্প খুজে পাচ্ছো না বা হারিয়ে ফেলছো। কয়েকটা গ্রুপে আমি পোস্ট দেখেছি লিংক চেয়ে। তোমরা পেইজ টা ফলো দিয়ে রাখছো না কেন?আর কেমন হইছে বলিও 🥹🫶
রিয়্যাক্ট দিও বেশি বেশি কেমন 😽

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply