নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৬
বাসর ঘরের মৃদু আলো আর ফুলের ঘ্রাণ যেন শুধু পটভূমি হয়ে আছে। আসল দৃশ্যটা এখন বাইজিদকে ঘিরেই। বাইজিদের চোখ দুটো ভারী হয়ে এসেছে। নিদ্রা ওষুধ ধীরে ধীরে তার শরীরকে অবশ করে দিচ্ছে। মাথা ঘুরছে, দৃষ্টি বারবার ঝাপসা হয়ে যাচ্ছে। তবুও সে একটুও আলগা করছে না তার বাহুর বাঁধন। যেন সমস্ত শক্তি দিয়ে আঁকড়ে ধরে আছে মেহেরুন্নেসাকে।
তার বুক দ্রুত ওঠানামা করছে, নিঃশ্বাস গরম আর ভারী। মাঝে মাঝে সে চোখ বন্ধ করে ফেলছে, আবার হঠাৎ করেই আধখোলা চোখে তাকাচ্ছে মেহেরুন্নেসার মুখের দিকে। সেই দৃষ্টিতে আছে বিস্ময়, তৃষ্ণা, আর এক ধরনের অদ্ভুত নেশা। কথা ছিলো সারা রাত জেগে মেহেরুন্নেসা কে দেখবে। তবে চোখ জোড়া তার বেইমানি কেনো করছে? ভেবে পায় না বাইজিদ।
ধীরে ধীরে তার হাত উঠে আসে মেহেরুন্নেসার মুখের দিকে। আঙুলের ডগা দিয়ে ছুঁয়ে দেয় তার গাল, কপাল, চিবুক যেন প্রতিটা অংশ আলাদা করে মনে রাখতে চাইছে। তার স্পর্শে কোনো তাড়াহুড়ো নেই, বরং এক অদ্ভুত মনোযোগ। যেন এই মানুষটাকে সে নিজের চোখে, নিজের স্পর্শে পুরোটা বুঝে নিতে চাইছে।
“এতো… সুন্দর…”
কথাটা প্রায় ফিসফিস করে বেরিয়ে আসে তার ঠোঁট থেকে, কণ্ঠ ভারী, জড়ানো। সে আবারও টেনে নেয় মেহেরুন্নেসাকে নিজের বুকে। এবার আরও কাছে আসে। এতটাই কাছে যে দুজনের নিঃশ্বাস এক হয়ে যাচ্ছে। মাথা ঝিমঝিম করছে, শরীর দুলে উঠছে হালকা করে, তবুও তার বাহু শক্ত একটুও আলগা হচ্ছে না।
মাঝে মাঝে তার ঠোঁট ছুঁয়ে যাচ্ছে মেহেরুন্নেসার গাল, কানের লতি, গলার ভাজ। যেন অচেতন অবস্থাতেও সে থামতে পারছে না। তার এই আকর্ষণটা এখন আর শুধু আকর্ষণ না, এটা যেন একরকম অধিকার, একরকম হারানোর ভয় মেশানো আঁকড়ে ধরা। ঘোর লাগা গলায় বলল
“তোমায় আমি কতটা ভালোবাসি জানো মেহের?”
মেহেরুন্নেসা দুদিকে মাথা নাড়ল। বাইজিদ গভীর ভাবে মুখ ডোবালো মেহেরুন্নেসার ঘাড়ে। হাস্কি স্বরে বলল
“তুমি জানো? চিঠির খামের ওপর লেখা তোমার নামটা আমি সারারাত ধরে পড়েছিলাম। এর মধ্যে কতশত বার তোমার নামের প্রেমে পড়েছি জানো তুমি?”
মেহেরুন্নেসার শরীরে এক শীতল স্রোত বয়ে যায়। বাইজিদ উন্মাদনায় কামড় বসিয়ে দেয় স্বীয় রমনীর ফর্সা গলায়। ব্যাথায় চোখ খিঁচে বন্ধ করে নিলো মেহেরুন্নেসা। বাইজিদ বলল
“তুমি গোধূলি বেলার ঝড়ো হাওয়া।
যা শীতল করেছিলো আমার পাষাণ হৃদয় কেও”
বাইজিদ মুখে যাই বলুক, শরীর তাকে আর সঙ্গ দিচ্ছে না। মাথা ধীরে ধীরে নুয়ে আসছে মেহেরুন্নেসার কাঁধে। চোখ প্রায় বন্ধ, তবুও ফিসফিস করে বলে ওঠে
“তুমি কিন্তু যেও না…”
শব্দটা এতটাই অস্পষ্ট, যেন স্বপ্নের ভেতর থেকে আসছে।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতর কাঁপন আরও বেড়ে যায়। একদিকে বাইজিদের এই দুর্বল, অচেতন আঁকড়ে ধরা আর বাইরে জঙ্গলে সুনেহেরার অপেক্ষা। দুটো টান তাকে ছিঁড়ে ফেলছে ভেতর থেকে। বাইজিদের হাত এখনও শক্ত করে জড়িয়ে আছে তার চারপাশে। কিন্তু বোঝা যায় সে আর বেশিক্ষণ জেগে থাকতে পারবে না। একসময় বাইজিদের সমস্ত শক্তি যেন হঠাৎ করেই নিঃশেষ হয়ে গেল। তার বাহুর বাঁধন ধীরে ধীরে ঢিলে হয়ে আসে, মাথাটা নুয়ে পড়ে মেহেরুন্নেসার বুকে। তারপর পুরো শরীরটাই নিস্তেজ হয়ে ছেড়ে দেয় স্ত্রীর ওপর।
মেহেরুন্নেসা প্রথমে থমকে যায়।
“শুনছেন?”
নরম স্বরে ডাকে, কিন্তু কোনো সাড়া নেই। তার নিঃশ্বাস চলছে গভীর, ভারী। তবে সে আর জেগে নেই। অদ্ভুত এক অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে মেহেরুন্নেসার ভেতরে। কিছুটা স্বস্তি, তার চেয়েও বেশি এক অজানা কষ্ট। ধীরে ধীরে সে নিজের শরীর সামলে নিয়ে বাইজিদকে আলতো করে সরানোর চেষ্টা করে। কিন্তু এতক্ষণ যেভাবে শক্ত করে জড়িয়ে ছিল, তার ভার যেন এখন আরও বেশি মনে হচ্ছে।
অনেক কষ্টে, ধীরে ধীরে সে তাকে সতর্ক হাতে শুইয়ে দেয়, যেন তার ঘুম ভেঙে না যায়। মাথাটা ঠিক করে বালিশে রাখে, চাদরটা টেনে দেয় বুক পর্যন্ত। একটু থেমে যায় মেহেরুন্নেসা।
নীরবে তাকিয়ে থাকে বাইজিদের মুখের দিকে।
কিছুক্ষণ আগেও যার চোখে ছিল তীব্র আকাঙ্ক্ষা, এখন সে একদম শান্ত। ঘুমে ঢেকে গেছে তার সমস্ত তেজ। তবুও তার মুখের সেই সুদর্শন রেখাগুলো তীক্ষ্ণ চোয়াল, গভীর চোখের পাতা, ঠোঁটের কোণে হালকা ক্লান্তি সব মিলিয়ে যেন আরও বেশি কোমল, আরও বেশি মানবিক লাগছে তাকে।
মেহেরুন্নেসার বুকটা হালকা করে কেঁপে ওঠে।
এক অদ্ভুত মায়া জমে ওঠে তার ভেতরে।
আর সেই মায়ার সাথেই আসে তীব্র এক অপরাধবোধ। এই মানুষটা তাকে এতটা আপন করে জড়িয়ে রেখেছিল। কত আগ্রহ ছিল তার দুই চোখে। আর সে?
সে-ই তাকে ফেলে রেখে যাবে এখন অন্ধকারে, অন্য এক গোপন ডাকে সাড়া দিতে। তার আঙুল ধীরে ধীরে ছুঁয়ে যায় বাইজিদের কপাল। খুব আলতো করে সরিয়ে দেয় এলোমেলো চুলের গোছা। যেন শেষবারের মতো তাকে দেখে নিচ্ছে।
“ক্ষমা করবেন…”
মুখে না বললেও কথাটা যেন ভেতরেই প্রতিধ্বনিত হয়। একটু সময় দাঁড়িয়ে থাকে।
তারপর হঠাৎ করেই নিজেকে শক্ত করে ফেলে।
পিছন ফিরে ধীরে ধীরে হাঁটতে শুরু করে পোশাক বদলানোর দিকে। ঘরের এক কোণে গিয়ে থামে।
আয়নার সামনে দাঁড়ায়। তার চোখে এখনও দ্বিধা, কিন্তু সময় থেমে নেই। ধীরে ধীরে হাত তোলে, গয়না খুলতে শুরু করে। বাসরের সেই সাজ একে একে খুলে ফেলতে থাকে। পেছনে রয়ে যায় ঘুমন্ত বাইজিদ।
আস্তাবলের কাছাকাছি জায়গাটা রাতের অন্ধকারে প্রায় গিলে নিয়েছে চারপাশকে। দূরে প্রাসাদের মিনারগুলো কেবল অস্পষ্ট ছায়া হয়ে দাঁড়িয়ে। দিনভর উৎসব, আলো, কোলাহলের সেই সাহাবাদ প্রাসাদ এখন সম্পূর্ণ নিস্তব্ধ। বাতাসে শুধু শুকনো পাতার মচমচ শব্দ, আর মাঝে মাঝে ঘোড়ার নড়াচড়ার ক্ষীণ আওয়াজ ভেসে আসে।
এই নীরবতার মাঝেই দাঁড়িয়ে আছে সুনেহেরা।
তার পরনে যুদ্ধের গাঢ় রঙের আঁটসাঁট পোশাক, কোমরে বাঁধা তলোয়ার, সোনালি চুলগুলো শক্ত করে বেঁধে রাখা। তাকে আর আগের সেই রাজকীয় সাজের মেয়ের মতো লাগছে না। এ যেন একেবারে অন্য কেউ।
তার দৃষ্টি বারবার চলে যাচ্ছে প্রাসাদের পেছনের দরজার দিকে। মেহেরুন্নেসা আসার কথা কিন্তু এখনও এল না। অবশ্য বিয়ের রাতে স্বামীকে ঘুম পাড়িয়ে, তার অগোচরে বেড়িয়ে আসাও মুখের কথা নয় তা বুঝে সুনেহেরা।
তবুও সময়ের সাথে সাথে তার ভ্রু কুঁচকে আসছে, কিন্তু চোখে কোনো ভয় নেই। বরং এক ধরনের অস্থির প্রতীক্ষা। বাতাসে তার পোশাকের প্রান্ত হালকা দুলে উঠছে, তবুও সে এক ইঞ্চিও নড়ছে না।
হঠাৎ পেছন থেকে খুব মৃদু একটা শব্দ হলো। কারও পায়ের চাপা পদধ্বনি। সুনেহেরা শুনেই বুঝতে পারে কেউ এসেছে। কিন্তু আজ সে চমকে ওঠে না। বরং ধীরে ধীরে ঠোঁটের কোণে একটুখানি হাসি ফুটে ওঠে।
“শেষমেশ আসলেন তাহলে”
সে না ঘুরেই বলে ওঠে। অন্ধকারের ভেতর থেকে সামনে এগিয়ে আসে মাহাদি। তার উপস্থিতি নিঃশব্দ। তীক্ষ্ণ চোখ দুটো সোজা গিয়ে থামে সুনেহেরার ওপর। কিছুক্ষণের জন্য দুজনের মাঝখানে নীরবতা নেমে আসে। তারপর সুনেহেরা ঘুরে দাঁড়ায়।
চোখে এখন সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি, কিন্তু ঠোঁটে লেগে আছে অদ্ভুত এক হাসি যেন এই সাক্ষাৎটা সে আগেই অনুমান করেছিল। ঘাড় বাকিয়ে হেসে বলল
“নাহহ আজ পালাবো না। আজ আপনার সাক্ষাৎ এর প্রয়োজন ছিল আমার”
তার কণ্ঠে হালকা খোঁচা, কিন্তু ভয় নেই। একফোঁটাও না। চারপাশ এখনও নিস্তব্ধ, বাতাস ঠান্ডা। যেন আসন্ন কোনো অদৃশ্য সংঘর্ষের পূর্ব মূহূর্ত। সুনেহেরা ধীরে ধীরে এগিয়ে গিয়ে আস্তাবলের পাশে রাখা একটা বড় লোহার বস্তু সম্ভবত পুরোনো অস্ত্র বা যন্ত্রপাতি রাখার বাক্স, তার ওপর বসে পড়ে। ঠান্ডা ধাতব পৃষ্ঠে বসেও তার ভঙ্গিতে কোনো অস্বস্তি নেই, বরং যেন আরও দৃঢ় হয়ে ওঠে তার উপস্থিতি।
এক পা তুলে আরেক পায়ের ওপর রেখে, সে স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মাথা কাত করে তাকায় মাহাদির দিকে।
“দাঁড়িয়ে থাকবেন নাকি? বসতে পারেন এখানে।”
পাশের জায়গাটা হালকা চাপড়ে দেয় সে। মাহাদি এক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, তারপর মাথা নেড়ে ধীরে বলে
“মাফ করবেন, শাহজাদি আপনার পাশে বসা আমার জন্য শোভা পায় না। আমি দাঁড়িয়েই ঠিক আছি।”
তার কণ্ঠে বিনয় আছে, কিন্তু সেই বিনয়ের আড়ালে স্পষ্ট এক দৃঢ়তা। যেন নিজের অবস্থান সে খুব ভালো করেই জানে। সুনেহেরা ভ্রু একটু তোলে। কয়েক সেকেন্ড চুপচাপ তাকিয়ে থাকে তার দিকে তারপর হালকা করে হেসে ওঠে।
“এত নিয়ম মানলে জীবনটা খুব একঘেয়ে হয়ে যায়”
তবুও সে আর জোর করে না। বরং একটু সামনে ঝুঁকে আসে, চোখ দুটো সরু করে যেন বিষয়টা আরও গম্ভীর করে তোলে।
“একটা কাজ আছে আপনার জন্য।”
মাহাদি সঙ্গে সঙ্গে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। তার দৃষ্টি তীক্ষ্ণ হয়ে ওঠে।
“আদেশ করুন।”
সুনেহেরা কিছুক্ষণ চুপ থাকে। যেন শব্দগুলো বেছে নিচ্ছে।
“এই কাজটা সহজ না, আর ভুল করার সুযোগও নেই।”
তার কণ্ঠ এবার নিচু, ভারী। মাহাদির ঠোঁটে হালকা আত্মবিশ্বাসের রেখা ফুটে ওঠে।
“আপনি শুধু বলুন, শাহজাদি। যতটা সম্ভব না, পুরোটা দিয়েই করব।”
সুনেহেরা তার দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে। যেন যাচাই করছে এই মানুষটাকে কতটা ভরসা করা যায়। তারপর ধীরে ধীরে বলে
“আমার ইংরেজ বণিকদের সঙ্গে দেখা করতে হবে।”
কথাটা মাহাদি কে নাড়িয়ে দেয় যেন।
রাতের নিস্তব্ধতা যেন আরও ভারী হয়ে ওঠে।
মাহাদির চোখে এক ঝলক বিস্ময় খেলে যায়, কিন্তু সে নিজেকে সামলে নেয় খুব দ্রুত।
“কি বলছেন শাহজাদি?”
সুনেহেরা এবার সোজা হয়ে বসে, দৃষ্টি কঠিন হয়ে ওঠে।
“পারবেন কি না?”
এক মুহূর্ত নীরবতা। তারপর মাহাদি ধীরে মাথা নোয়ায়।
“পারব।”
তার কণ্ঠে এবার আর দ্বিধা নেই। শুধু অটল প্রতিশ্রুতি। সুনেহেরার ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে ওঠে।
“আমি জানতাম, আপনি পারবেন…”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“এবার আপনি আসুন, কোনো প্রশ্ন না করেই”
মাহাদি প্রশ্ন না করেই স্থান ত্যাগ করলো সত্যি। সুনেহেরা তাকিয়ে রইলো তার যাওয়ার দিকে। যতদূর দেখা যায়।
অন্ধকার যেন আজ একটু বেশি ঘন। চারদিক নিস্তব্ধ, শুধু দূরে কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক। ছায়ার ভেতর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসে এক অবয়ব। কালো বোরখায় আচ্ছাদিত পুরো শরীর, শুধু দু’টি চোখ উন্মুক্ত। অদ্ভুত এক আগুন জ্বলছে সেখানে।
মেহেরুন্নেসা আজ আর সেই লাজুক নববধূ নয়। আজ যেন সে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুত এক রহস্যময়ী নারী। সুনেহেরার চোখ একবার উপর থেকে নিচে নেমে যায়, তারপর ঠোঁটে হালকা হাসি ফুটে ওঠে।
“ প্রস্তুত তো?”
মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত দেরি না করে মাথা নাড়ে। সুনেহেরা মেহেরুন্নেসার বাহুতে মৃদু চাপ দিয়ে বলল
“আজ আর পিছিয়ে আসার সুযোগ নেই।”
দ্রুত ঘোড়ার পিঠে লাফিয়ে ওঠে সে। সোনালি ঘোড়াটা যেন অস্থির হয়ে আছে, পা ঠুকছে মাটিতে।
“ উঠো, সময় নেই।”
মেহেরুন্নেসা এক লাফে উঠে বসে সুনেহেরার পিছনে। দু’হাতে শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।
পরমুহূর্তেই ঘোড়াটা ছুটে চলে অন্ধকার চিরে।
হাওয়ার বেগে উড়তে থাকে তাদের পোশাক। রাতের ঠাণ্ডা বাতাস মুখে এসে লাগছে, কিন্তু৷ কারও চোখে ভয় নেই। পথ ক্রমশ নির্জন হয়ে ওঠে। গাছপালার ছায়া যেন তাদের গিলে ফেলতে চায়। দূরে কোথাও নদীর গন্ধ ভেসে আসে।
সাহাবাদের নদী কোণকা।
হঠাৎই ভারি, গভীর, কাঁপিয়ে দেওয়া এক শব্দ।
দূর থেকে ভেসে আসে বিশাল জাহাজের ইঞ্জিনের গর্জন। সেই শব্দে যেন চারদিকের নীরবতা ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
সুনেহেরা লাগাম আরও শক্ত করে ধরে। কপাল কুচকে আসে তার
“আমরা কি দেরি করে ফেলছি?”
মেহেরুন্নেসার চোখে ঝলসে ওঠে আতঙ্ক আর প্রতিজ্ঞার মিশ্র ছায়া। ঘোড়ার গতি আরও বেড়ে যায়। আর সামনে অন্ধকার নদীর বুক চিরে এগিয়ে আসছে অজানা এক পরিণতির ছায়া। নদীর পাড়ে পৌঁছাতেই ঘোড়াটা হঠাৎ থেমে যায়। যেন সে নিজেও ভয় পেয়ে গেছে। চারদিকে অদ্ভুত এক নিস্তব্ধতা। তার মাঝেইগর্জন।
গভীর, ভারি, বুক কাঁপিয়ে দেওয়া শব্দ। যেন নদীর বুক চিরে কোনো দানব জেগে উঠছে। সুনেহেরা ধীরে ধীরে মুখ তোলে।
মেহেরুন্নেসাও তার কাঁধের ওপর দিয়ে তাকায় সামনে। আর তারপর দু’জনের চোখ একসাথে স্থির হয়ে যায়।
নদীর মাঝখানে, উত্তাল ঢেউয়ের ওপর দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল জাহাজ। ঠিক জাহাজ নয়, যেন মৃত্যু নিজেই ভেসে এসেছে।
তার গা কালচে, পুরনো কাঠে তৈরি কিন্তু সেই কাঠের গায়ে অসংখ্য ক্ষতচিহ্ন, যেন শত যুদ্ধের সাক্ষী। কোথাও কোথাও কাঠ উঠে গেছে, লোহার পেরেকগুলো বাইরে বেরিয়ে আছে, যেন ধারালো দাঁত। উঁচু মাস্তুলগুলো আকাশ ছুঁতে চেয়েছে, কিন্তু সেগুলোর ওপর ঝুলে থাকা পালগুলো ছেঁড়া, ঝাঁঝরা প্রতিটা ছিদ্র দিয়ে হাওয়া ঢুকে এক ভয়ংকর শব্দ তুলছে।
পালগুলো যেন বাতাসে উড়ছে না, বরং ছটফট করছে যেন বন্দী কোনো প্রাণীর আর্তনাদ।
জাহাজের সামনের অংশে খোদাই করা এক বিকৃত মুখ অর্ধেক মানুষের, অর্ধেক পশুর। সেই মুখের চোখের জায়গায় ফাঁকা গর্ত, অথচ মনে হচ্ছে সেখান থেকেই কেউ তাকিয়ে আছে।
ডেকে মিটমিট করে জ্বলছে কিছু লণ্ঠন। সেই হলদে আলোয় অস্পষ্ট ছায়া নড়ছে মানুষ? নাকি অন্য কিছু বোঝা যাচ্ছে না।
চারপাশে কাক আর শকুনের মতো কালো পাখি চক্কর কাটছে। তাদের কর্কশ ডাক মিশে যাচ্ছে ঢেউয়ের গর্জনে। নদীর পানি জাহাজের ধাক্কায় উথাল-পাথাল হয়ে উঠছে। ঢেউ এসে আছড়ে পড়ছে পাড়ে, যেন সতর্ক করছে
“পিছু হটো…”
সুনেহেরার হাত অজান্তেই শক্ত হয়ে যায়।
তার চোখে এবার আর শুধু দৃঢ়তা নেই একফোঁটা বিস্ময়ও জেগে ওঠে। মেহেরুন্নেসার গলা শুকিয়ে আসে, কিন্তু চোখ সরায় না সে। সুনেহেরা ধনুক তীরে বসিয়ে তাক করে জাহাজ এর দিকে। কিন্তু আন্দাজে এই বিশাল জাহাজে তীর ছুড়ে হবেই বা কি। হঠাৎ দেখলো বগির সামনে এক মানুষ অবয়ব দেখা যায়।
তীর ছোড়ার ঠিক সেই ক্ষণটায় যেন সময় থমকে দাঁড়ায়। নদীর কালো জলের বুক চিরে এগিয়ে আসা বিশাল জাহাজটার বগির কিনারায় দাঁড়িয়ে থাকা অবয়বটা প্রথমে কেবল একটা ছায়ার মতোই মনে হয়। বাতাসে উড়তে থাকা চাদরের ফাঁক দিয়ে কেবল তার দেহের গড়নটা ধরা পড়ে, উচ্চ, দৃঢ়, রাজকীয়। চারপাশের মৃদু আলো আর হারিকেনের দপদপে শিখা মিলিয়ে তার মুখ পুরোপুরি স্পষ্ট নয়, কিন্তু তবুও কিছু একটা অদ্ভুত পরিচিত।
সুনেহেরা তখন তীর তুলতে ব্যস্ত, লক্ষ্য স্থির তার নিজের মতো করে। কিন্তু মেহেরুন্নেসার চোখ হঠাৎ থমকে যায়। তার বুকের ভেতর ধক করে ওঠে। ওই দাঁড়ানো অবয়বটা…? না, এটা হতে পারে না।
তার শ্বাস আটকে আসে। চোখ কুঁচকে আবার তাকায় সে। বাতাসে উড়ে যাওয়া কাপড়ের ফাঁক দিয়ে এক মুহূর্তের জন্য মুখটা স্পষ্ট হয়ে ওঠে আর সেই এক ঝলকেই যেন সমস্ত রক্ত হিম হয়ে যায় তার শরীরে।
“শাহজাদা?”
ঠোঁট নাড়ায় সে, কিন্তু শব্দ বেরোয় না।অসম্ভব। একদম অসম্ভব। নিজের হাতেই তো নিদ্রাবিষ পান করিয়েছিল তাকে। নিজের চোখে দেখেছে গভীর ঘুমে তলিয়ে যেতে। তাহলে… তাহলে এই জাহাজের বগিতে দাঁড়িয়ে থাকা লোকটা কে?
মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি তখন স্থির হয়ে আছে সেই অবয়বের ওপর। তার চোখে বিস্ময়, ভয়, আর এক অদ্ভুত সংশয়ের ছায়া।
এদিকে সুনেহেরা তখনও কিছু টের পায়নি। কিন্তু মেহেরুন্নেসার মুখের পরিবর্তন দেখে তার ভ্রু কুঁচকে যায়।
“কি হয়েছে?”
ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করে সে। মেহেরুন্নেসা কাঁপা আঙুল তুলে জাহাজের দিকে ইঙ্গিত করে।
সুনেহেরা তাকাতেই… তারও নিঃশ্বাস এক মুহূর্তের জন্য বন্ধ হয়ে আসে।
অবয়বটা সত্যিই বাইজিদের মতো। একই দাঁড়ানোর ভঙ্গি। একই কাঁধের দৃঢ়তা। এমনকি বাতাসে উড়তে থাকা পোশাকের ভাঁজেও যেন পরিচিত সেই রাজকীয় ঔজ্জ্বল্য। দুজনেই কিছুক্ষণ নিশ্চুপ। নদীর জলে জাহাজের ভারী দোল, কাঠের গায়ে ঢেউয়ের আঘাত, আর দূরের অদ্ভুত গর্জন। সব মিলিয়ে মুহূর্তটা হয়ে ওঠে ভয়ংকর ভারী।
“এটা… হতে পারে না…”
মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে বলে ওঠে, কণ্ঠে স্পষ্ট আতঙ্ক। ঠিক তখনই জাহাজটা আরেকটু কাছে আসে। হারিকেনের আলো একটু বেশি স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর সেই আলোয় অবয়বটা যেন ইচ্ছাকৃতভাবে সামনে এগিয়ে আসে।
তার মুখ পুরোপুরি দেখা যায় না, কিন্তু ঠোঁটের কোণে এক হালকা, শীতল হাসির রেখা ফুটে ওঠে। এক ঝটকায় সে ধনুক তোলে। সেই মুহূর্তটা এত দ্রুত ঘটে যে প্রতিক্রিয়া জানানোর সময়ই পায় না কেউ।
তীর ছুটে আসে শোঁওওও করে বাতাস চিরে।
মেহেরুন্নেসা আর সুনেহেরা দুজনের মাঝখান দিয়ে বিদ্যুৎগতিতে ছুটে গিয়ে পিছনের একটা পুরোনো গাছের কাণ্ডে সজোরে গিয়ে বিধে।
“ঠাস!”
শব্দটা নিস্তব্ধতা ভেঙে চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
গাছটা কেঁপে ওঠে, আর তীরটা গভীরভাবে ঢুকে যায় কাঠের ভেতর।
দুজনেই স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে কয়েক মুহূর্ত।
তারপর ধীরে ধীরে ঘাড় ঘুরিয়ে তারা গাছের দিকে তাকায়। তীরটা এখনো কাঁপছে, যেন তার ভেতরে লুকিয়ে আছে সেই অজানা অবয়বের সতর্কবার্তা।
আবার জাহাজের দিকে তাকাতেই অবয়বটা আর নড়ে না। স্থির দাঁড়িয়ে আছে। সুনেহেরা পাল্টা তীর ছুড়তে গেলে থামায় মেহেরুন্নেসা।
“আপা নাআআআআআ, ও…ওটা ওটা আপনার ভাইজান”
“তুমি পাগল হলে? ভাইজান এখানে কী করে আসবে?”
“তাহলে কে ওটা?”
সুনেহেরার ও কপাল কুচকে আসে। হঠাৎ কিছু একটা স্মরণে আসতেই তার চোখের আকার মাত্রা ছাড়ায়। হাতের ধনুকের বাধন আলগা হয়। জাহাজ এর দিকে তাকাতেই আপনা আপনি ফাঁক হয়ে যায় তার ঠোঁট জোড়া।
কেমন হয়েছে বলিও পাখিরা 😌🫶
আর বাইজিদ এর কথা গুলো কেমন লাগলো তাও জানিও ☺️😽 আমিও নিজেও দুই তিন বার পড়েছি বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসার ভালোবাসার মূহুর্ত টা 🤭 কদিন ধরে রিয়্যাক্ট খুব কম আসছে, তবুও তোমরা ঈদ নিয়ে ব্যাস্ত ভেবে আমি পর্ব দিচ্ছি। ৩k পূরণ করিও কেমন 🥺
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪০ এর শেষাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল ৪০ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৭
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৩
-
নূর এ সাহাবাদ বিয়ে স্পেশাল পর্ব