নূরএসাহাবাদ
jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস
পর্ব – ১৪
সিঁড়ির ধাপগুলো পেরোতে পেরোতেই সুনেহেরার কানে এলো কথাটা। আস্তাবলের সোনালি রঙের সেই তেজী ঘোড়াটা নাকি আহত হয়েছে। কথাটা বলেছিল এক প্রহরী, কিন্তু তার চোখে-মুখে অদ্ভুত এক দ্বিধা ছিল।
সুনেহেরার কওালে পড়লো দীর্ঘ ভাজ। আর এক মুহূর্তও দেরি করলো না। বুকের ভেতর ধকধক করা উৎকণ্ঠা তাকে প্রায় দৌড় করিয়ে নিয়ে গেল আস্তাবলের দিকে।
হলুদ পোষাকে মোড়া তার শরীর, সোনালি চুল বাতাসে উড়ছে। তার চোখে শুধু একটাই ভাবনা, প্রিয় ঘোড়াটাকে যেন সুস্থ দেখে। তার কত কত নিরব অভিযান এর সঙ্গী সেই সোনালি রঙের ঘোড়াটা। আদর করে যার নাম দিয়েছিল সমু। সমুর আহতের খবর শুনে সুনেহেরা ছুটে এলো আস্তাবলে। আস্তাবলের দরজা ঠেলে ভেতরে ঢুকতেই সে থমকে গেল। ঘোড়াটা সম্পূর্ণ সুস্থ।
সারি সারি ঘোড়ার মধ্যে শান্তভাবে দাঁড়িয়ে আছে, যেন কিছুই হয়নি। তাকে দেখেই একটু আদুরে ভঙ্গিতে ঘাড় নাড়ালো।
সুনেহেরার চোখ মুহূর্তেই বদলে গেল। উৎকণ্ঠা গলে গিয়ে জায়গা নিল তীব্র সন্দেহ। ধীরে ধীরে সে চারপাশে তাকালো। তাকে ভূয়া খবর দিয়ে আস্তাবলে আনা হয়েছে। রুক্ষ হয়ে উঠলো তার মুখের অভিব্যাক্তি। আর তখনই সামনে এগিয়ে এলো বর্মে আবৃত রক্ষীদের প্রধান, মাহাদি।
চোখ জোড়া দেখে বোঝা যায় মুখে হালকা ফিচেল হাসি।
“কি হলো, শাহজাদি? খবরটা শুনেই এত তাড়াহুড়ো করে এলেন?”
সুনেহেরার চোখ জ্বলে উঠলো।
“এই খবরটা কে ছড়িয়েছে?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট রাগ। মাহাদি ধীরে ধীরে এগিয়ে এলো।
“খবরটা সত্যি কিনা, সেটা তো আপনি নিজেই দেখে নিলেন।”
একটু থেমে চোখ সরাসরি তার চোখে রেখে বললো,
” একটা কথা জানতে এই গুজব রটানো শাহজাদি। গত রাতে আস্তাবলে আসেন নি কেন?”
এই কথাটাই যেন আগুনে ঘি ঢেলে দিল। সুনেহেরার চোয়াল শক্ত হয়ে গেল।
“আপনি সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছেন, মাহাদি।”
মাহাদি শান্ত। একদম অচঞ্চল।
“আমি শুধু আমার দায়িত্ব পালন করছি, শাহজাদি।”
এক মুহূর্তের জন্য নীরবতা। তারপর হঠাৎই সুনেহেরা কোমরের পাশে হাত নিয়ে গেল।
ঝনঝন শব্দে বেরিয়ে এলো তার তলোয়ার।
এক ঝলকে সে সামনে ঝাঁপিয়ে পড়লো।
“আপনার সাহস কতোটা, সেটা এখনই বুঝে যাবেন!”
তলোয়ার সোজা মাহাদির দিকে নেমে এলো।
কিন্তু আঘাতটা লাগলো না। মাহাদি এক পা সরে গেল। চোখের পলকে তার হাত উঠে এলো।
সুনেহেরার কব্জিটা ধরে ফেললো সে, ঠিক তলোয়ার নামার আগ মুহূর্তে। দৃঢ়, নিখুঁত, কিন্তু কোনো রুক্ষতা নেই। তলোয়ারের ধার বাতাস চিরে থেমে গেল মাঝপথে। সুনেহেরা বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলো। তেজী গলায় বলল
“আমাকে ছেড়ে দিন বলছি। আপনার সাহস কী করে হয় আমার গায়ে হাত লাগানোর”
তার কণ্ঠে রাগ আর অপমান মিশে আছে।
মাহাদি শান্ত গলায় বললো,
“শাহজাদি, আপনি আহত হতে পারেন।”
সে তার হাত ঘুরিয়ে এমনভাবে চেপে ধরলো, যাতে তলোয়ারটা আলগা হয়ে যায়। পরের মুহূর্তেই তলোয়ার সুনেহেরার হাত থেকে পড়ে গেল মাটিতে। টং করে শব্দ হলো। সুনেহেরা আরও ক্ষেপে উঠলো।
“আপনি আমাকে নিরস্ত্র করলেন?”
মাহাদি সাথে সাথেই তার হাত ছেড়ে দিল।
এক ধাপ পিছিয়ে গেল, সম্মান বজায় রেখে।
“আমি কখনোই আপনাকে আঘাত করবো না, শাহজাদি।”
তার কণ্ঠ শান্ত, কিন্তু দৃঢ়।
“কিন্তু আপনাকে নিজের রাগের কাছে হারতেও দিতে পারি না।”
সুনেহেরা শ্বাস নিচ্ছে দ্রুত। তার চোখ এখনো আগুনের মতো জ্বলছে।
“আপনি আমাকে ফাঁদে ফেলেছেন।”
মাহাদি ধীরে মাথা নত করলো।
“হ্যাঁ, ফেলেছি।”
একটু থেমে আবার বললো,
“কারণ আপনি এমন কিছু লুকাচ্ছেন, যা এই রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।”
সুনেহেরা ঠান্ডা হেসে উঠলো।
“সব কিছু জানেন ভেবে ভুল করবেন না।”
মাহাদির চোখ তীক্ষ্ণ হয়ে উঠলো।
“তাহলে বলুন, গত রাতে আপনি নদীর দিকে কেন গেছিলেন?”
আস্তাবলের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এলো।
সুনেহেরা হাতের উল্টো পিঠে মুখ মুছলো। ধারালো দৃষ্টিতে তাকিয়ে মাহাদি কে বলল
“এই শেষ বার আপনাকে ক্ষমা করলাম আমার ব্যাক্তিগত বিষয়ে হস্তক্ষেপ করায়। পরের বার……
সুনেহেরার কথা শেষ হওয়ার আগেই মাহাদি বলল
“বিষয়টা আপনার ব্যাক্তিগত নয় শাহজাদি। বিষয়টা গোটা জমিদার পরিবারের। আপনি এমন কিছু করছেন যেটা এই রাজ্যের জন্য বিপজ্জনক হতে চলেছে”
সুনেহেরা কিছু বলার আগেই একজন রক্ষী এসে দাড়ালো। মাথা সামান্য ঝুকিয়ে বলল
“সরদার, শাহজাদা অবিলম্বে আপনার সাক্ষাৎ চায়”
মাহাদি এক মূহুর্তও দেরি না করে পা বাড়ালো মহলের দিকে। সুনেহেরা দুহাতে মুখের সামনে থাকা চুল গুলো গুছিয়ে নিয়ে বড় করে শ্বাস নিল। সমুর মুখে হাত বুলিয়ে সেও চলে গেলো মহলের দিকে।
হলুদের পর্ব শেষ হতেই দাসীরা বড় পিতলের পাত্রে গরম পানি নিয়ে এলো। সেই পানির উপর ভাসছে গোলাপ, গাঁদা আর জুঁই ফুলের রঙিন পাপড়ি। চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে এক মিষ্টি, কোমল সুবাস, যেন পুরো অন্দরমহলটা নরম এক স্বপ্নে ঢেকে গেছে।
মেহেরুন্নেসাকে ধীরে ধীরে বসানো হলো সেই ফুলভরা পানিতে। হলুদের সোনালি আভা মিশে তার ত্বক যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠেছে। পানি ছুঁতেই তার শরীর হালকা কেঁপে উঠল, আর পাপড়িগুলো ভেসে এসে তাকে জড়িয়ে ধরল। যেন প্রকৃতি নিজেই তাকে আদরে ভাসিয়ে দিচ্ছে।
দাসীরা যত্ন করে তার গা থেকে হলুদের রঙ ধুয়ে দিচ্ছে। প্রতিটা স্পর্শে ফুটে উঠছে তার স্বাভাবিক রূপ। নরম, মসৃণ, আর এক অদ্ভুত দীপ্তি যা চোখে পড়লেই থেমে যেতে হয়।
গোসল শেষ হলে তাকে উঠিয়ে শুকনো কাপড়ে জড়িয়ে আনা হলো। এবার পোশাক বদলানোর পালা। সিমরান নিজেই এগিয়ে এলো। হাতে নতুন শাড়ি আর গয়না। কিন্তু মেহেরুন্নেসার দিকে তাকাতেই সে থমকে গেল।
মেয়ে হয়েও যেন চোখ ফেরাতে পারছিল না সে।
তার দৃষ্টিতে শুধু বিস্ময় নেই, আছে এক চেপে রাখা হিংসা। এমন সৌন্দর্য সে সহ্য করতে পারছে না পুরোপুরি। মেহেরুন্নেসার শরীরের প্রতিটি ভাঁজে যেন নিখুঁত কারুকাজ, স্বাভাবিক অথচ দৃষ্টি কাড়ার মতো। ত্বকের সেই সোনালি আভা তাকে আরও আলাদা করে তুলেছে।
সিমরান ধীরে ধীরে তার চুল সরিয়ে দিল, যেন ভালো করে দেখতে পারে। কিন্তু তার আঙুলের স্পর্শে এখন আর আগের কোমলতা নেই, সেখানে মিশে গেছে এক অদৃশ্য কঠোরতা।
নিজের অজান্তেই ফিসফিস করে উঠল
আল্লাহ, এমন রূপও হয়?
কিন্তু সেই স্বরের ভেতরে প্রশংসার পাশাপাশি লুকিয়ে আছে কষ্ট, একটা অদৃশ্য হিংসা। যেন মনে মনে বলছে, কেন এই সৌন্দর্য তার নয়।
পাশের দাসীরাও চুপিচুপি তাকিয়ে আছে, কেউ কেউ মুগ্ধ, কেউ বিস্মিত। আর সিমরান তাদের মাঝেই দাঁড়িয়ে, ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি টেনে রাখলেও চোখে স্পষ্ট অস্বস্তি।
তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ধীরে ধীরে খুলতে লাগলো তার ভেজা শাড়ির আচল। মেহেরুন্নেসা একটু অপ্রস্তুত হয়ে গুটিয়ে নিলো নিজেকে। কয়েকজন নারীর সামনে সে এখন টকটকে লাল একটি ব্লাউজ আর নকশা করা লাল ঘাগড়া পরে। গলা, পেট, কোমর উন্মুক্ত। সিমরান সরু চোখে দেখলো তার নিখুঁত গায়ের মাপ।
কয়েকজন বড় একখানা শাড়ি এনে ঘিরে দিলো মেহেরুন্নেসার চারপাশ। ভিতরে বাকি পোষাক টুকু পরিবর্তন করলো। আরেকটা ব্লাউজ পড়লো গাঢ় খয়েরি রঙের। পরা শেষ হলে আচ্ছাদন আলগা করা হলো। সিমরান আস্তে করে নতুন শাড়িটা জড়িয়ে দিতে শুরু করল। হাত চলে নিয়ম মেনে, কিন্তু মনটা যেন অন্য কোথাও আটকে আছে।
আজ মেহেরুন্নেসা শুধু সাজছে না আজ সে এমন এক রূপে জ্বলছে, যার সামনে দাঁড়িয়ে সিমরান এর মনেই নিঃশব্দে জন্ম নিচ্ছে হিংসা।
গোটা সাহাবাদ রাজ্য যেন উৎসবের আলোয় জেগে উঠেছে। চারদিকে রঙিন পতাকা, আলো, মিষ্টির গন্ধ আর মানুষের উচ্ছ্বাসে মুখরিত প্রাসাদচত্বর। সৈন্যরা শৃঙ্খলা বজায় রেখে মিষ্টি আর খেজুর বিতরণ করছে, প্রজারা হাসিমুখে আশীর্বাদ দিচ্ছে তাদের প্রিয় জমিদারপুত্রকে।
আর এই সমস্ত কিছুর মাঝেই, নিজের কক্ষে পায়চারি করছে বাইজিদ।
তার চোখে এক অদ্ভুত অস্থিরতা। যেন সময়টাই থেমে গেছে। প্রতিটা মুহূর্ত তার কাছে ভারী হয়ে উঠছে। মেহের এর নামটা মনে আসতেই তার ঠোঁটের কোণে হালকা হাসি খেলে যায়, আবার সেই হাসির আড়ালেই লুকিয়ে থাকে এক গভীর অস্থিরতা। কতক্ষণ আর অপেক্ষা করবে সে? কখন সেই মুহূর্ত আসবে, যখন হালাল বন্ধনে বাঁধা পড়ে সে একান্তে পাবে তাকে? নিজের কক্ষে, নিজের কাছে। সেই মূহুর্তে নিজেকে কীভাবে সামলাবে সে? যখন বধূ বেশে মেহেরুন্নেসা তার কাছাকাছি আসবে। এক কক্ষে, এক পালঙ্কে।
ভাবতেই তার বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। আঙুল মুঠো করে ফেলে সে। যেন নিজেকেই নিয়ন্ত্রণে রাখতে কষ্ট হচ্ছে। সে জানালার কাছে গিয়ে দাঁড়ায়। দূরে আলোকসজ্জায় ঝলমল করছে প্রাসাদ। কিন্তু তার চোখে এসব কিছুই ধরা পড়ছে না।
তার সমস্ত ভাবনা এক জায়গায় আটকে আছে।
ঠিক তখনই দরজায় মৃদু কড়া নাড়ার শব্দ।
বাইজিদ বিরক্ত ভঙ্গিতে তাকায়।
“ভেতরে আসো”
একজন রক্ষী মাথা নিচু করে ভেতরে ঢুকে দাঁড়ায়।
“হুজুর, বেগম সাহেবাকে হলুদ দেওয়া শেষ হয়েছে। এখন আপনাকে হলুদ দেওয়ার প্রস্তুতি চলছে”
কথাটা শুনে বাইজিদের চোখে ঝিলিক খেলে যায়।
“শেষ হয়েছে?”
মনে মনে শব্দটা আওড়ায় সে। ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে ফুটে ওঠে এক তৃপ্তির হাসি। যেন আরেক ধাপ এগিয়ে এলো সে তার কাঙ্ক্ষিত মুহূর্তের দিকে। রক্ষী বলল
“নিয়ম তো ছিল আপনাকে আগে দেওয়ার। কিন্তু আপনার আদেশে তার কার্যই আগে সম্পন্ন হয়েছে”
“ঠিক আছে, যাও”
রক্ষী সরে যেতেই বাইজিদ গভীর শ্বাস নেয়।
তার অস্থিরতা যেন আরও বেড়ে যায়। এখন আর শুধু অপেক্ষা নয়, প্রতিটা সেকেন্ড যেন তাকে ঠেলে নিয়ে যাচ্ছে সেই রাতের দিকে, যে রাতের পর মেহেরুন্নেসা আর শুধু নাম থাকবে না,
সে হবে তার। শুধু তার।
গোটা প্রাসাদ যখন উৎসবের আলো আর কোলাহলে মুখর, তখন বাইজিদের ভেতরটা যেন অন্য এক আগুনে জ্বলছে। বাসর রাতের কথা মনে আসতেই তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। মেহেরুন্নেসাকে একান্তে কাছে পাওয়ার চিন্তাই তাকে অস্থির করে তুলছে। মনে হচ্ছে কতদিনের অপেক্ষা, কত কল্পনা সব মিলিয়ে যেন তার জীবনের সবচেয়ে কাঙ্ক্ষিত মুহূর্ত হয়ে উঠেছে।
সে কল্পনায় দেখতে পায়, মেহেরুন্নেসা নীরবে বসে আছে, লাজুক চোখ নিচু করে আর সে ধীরে ধীরে এগিয়ে যাচ্ছে। এই ভাবনাই তার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক টান তৈরি করে। সে চোখ বন্ধ করে এক মুহূর্ত, যেন নিজেকে সামলায়। কিন্তু অস্থিরতা কমে না, বরং আরও বেড়ে যায়। ব্যাকুল হয়ে ওঠে সে।
আর এক মুহূর্তও স্থির থাকতে পারে না। দ্রুত পা ফেলে অন্দরের দিকে এগিয়ে যায়। তার চলার ভঙ্গিতেই স্পষ্ট, ভেতরে কতটা তাড়না কাজ করছে। দরজার সামনে এসে একবার থামে, গভীর শ্বাস নেয়, কিন্তু সেই শ্বাসও যেন অস্থির।
ভেতরে প্রবেশ করতেই চারপাশে প্রস্তুতির আমেজ। দাসীরা হলুদের থালা সাজিয়ে রেখেছে, সুগন্ধ ছড়িয়ে আছে বাতাসে।
বাইজিদকে দেখেই সবাই সসম্মানে সরে দাঁড়ায়।
সে আর কিছু না বলে সোজা গিয়ে বসে পড়ে।
তার চোখে এখন এক অদ্ভুত দীপ্তি, অপেক্ষা, তাড়না আর অদম্য আকাঙ্ক্ষার মিশেল।
আজ আর কোনো বাধা নেই। আজকের প্রতিটা আয়োজন, প্রতিটা রীতি তাকে এক ধাপ করে এগিয়ে নিচ্ছে সেই মুহূর্তের দিকে । যখন মেহেরুন্নেসা হবে তার, একান্তে, চিরতরে।
লাল মখমলের কাপড় বিছানো পিড়ি টা তে বসে বাইজিদ হলুদ লাগালো। তবে তাকে হলুদ লাগাতে পারলো কেবল মারজান, রত্নপ্রভা আর সুনেহেরা। বহিরাগত কোনো আত্মীয় মহিলা এমনকি সিমরান এর হাতে হলুদ লাগাতেও সে নারাজ। স্ত্রী কে যেমন আড়াল করে রাখছে, তারও উচিত স্ত্রীর হক এর বিষয়টা দেখার। এই পর্যায়ে চরম অপমানিত হলো সিমরান। হাতে হলুদ তুলে এগিয়ে নিয়ে গেলেও তা স্পর্শ করলো না শাহজাদার গাল। সেই ক্ষোভ টুকুও গিয়ে জমলো মেহেরুন্নেসার ওপর। সব কিছুর জন্য মেহেরুন্নেসা কেই তার দায়ী মনে হচ্ছে।
সন্ধ্যার শেষ আলোটা মিলিয়ে যেতে না যেতেই সাহাবাদ প্রাসাদের চারপাশে নেমে এলো এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। আকাশে ঝুলে থাকা আধো চাঁদের আলো যেন প্রাসাদের গা বেয়ে নেমে এসে অন্ধকারের সঙ্গে মিশে যাচ্ছে। দূরের জঙ্গলে মাঝে মাঝে শেয়ালের ডাক সব মিলিয়ে পরিবেশটা যেন রহস্যের গা ছমছমে পর্দায় মোড়া।
মেহেরুন্নেসা আজ আর আগের মতো নির্লিপ্ত নেই। তার চোখে আজ এক অদ্ভুত তীক্ষ্ণতা। সারাদিন ধরে সে নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করেছে, কিন্তু মনের ভেতর সেই দৃশ্যটা বারবার ফিরে এসেছে। গতরাতে দেখা সেই সোনালি চুলের মেয়েটা। আর আজ সে নিশ্চিত, ওটা সুনেহেরা ছাড়া আর কেউ না।
প্রাসাদের পিছনের কক্ষের জানালার আড়ালে দাঁড়িয়ে সে চুপচাপ লক্ষ্য রাখছিল। সময় যেন আজ ধীরে ধীরে এগোচ্ছে। প্রতিটা মুহূর্ত তার ধৈর্যকে চ্যালেঞ্জ করছে।
কিছুক্ষণ পরেই পেছনের দরজার দিকে হালকা একটা শব্দ। মেহেরুন্নেসার বুক ধক করে উঠলো।
সে নিঃশব্দে পর্দা সরিয়ে তাকাল। অন্ধকারের মধ্যে একটা ছায়ামূর্তি ধীরে, খুব সাবধানে এগিয়ে যাচ্ছে। গায়ে কালো চাদর, মাথা ঢাকা। কিন্তু চাঁদের ফিকে আলো ঠিকই এক মুহূর্তের জন্য ছুঁয়ে গেল তার সোনালি চুল গুলো। মেহেরুন্নেসার ঠোঁট শক্ত হয়ে এলো।
“সুনেহেরা”
মৃদু স্বরে নিজের কাছেই ফিসফিস করলো সে। আজ আর কোনো সন্দেহ নেই। কিন্তু প্রশ্নটা আরও গভীর হলো। সে কোথায় যাচ্ছে? কেন যাচ্ছে? এত রাতে একা? মেহেরুন্নেসার ভেতরে কৌতূহল আর অজানা ভয় মিশে এক অদ্ভুত ঝড় তুললো। কিন্তু ভয় তাকে থামানোর মতো শক্তিশালী নয়। বরং সেই ভয়ই যেন তাকে আরও সামনে ঠেলে দিচ্ছে। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে এগোল। প্রতিটা পদক্ষেপে সাবধানতা যেন মেঝের একটা শব্দও বাইরে পৌঁছাতে না পারে।
দরজা খুলে বাইরে বেরোতেই ঠাণ্ডা বাতাস তার মুখে এসে লাগলো। চারপাশে অন্ধকার, শুধু দূরের প্রদীপগুলো কাঁপতে কাঁপতে জ্বলছে।
সামনে, কিছুটা দূরে সুনেহেরা দ্রুত পায়ে হাঁটছে। কালকের মত আজ ঘোড়া নেই সাথে। মূলত মাহাদির ঝামেলা এড়াতেই সুনেহেরা ঘোড়া আনতে আস্তাবলে যায় নি। মেহেরুন্নেসা দূরত্ব বজায় রেখে তাকে অনুসরণ করতে লাগলো। মাঝে মাঝে গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়ছে, কখনো প্রাসাদের দেয়ালের ছায়া ধরে এগোচ্ছে।
কিন্তু অদ্ভুত ব্যাপার হলো। গতকাল তো সে নদী দিকে যাচ্ছিল।
কিন্তু আজ সুনেহেরা যেন কোনো সাধারণ পথে যাচ্ছে না। সে সরাসরি বাগান পেরিয়ে উত্তরের জঙ্গলের দিকেই এগোচ্ছে সেই জঙ্গল, যেটা নিয়ে প্রাসাদের দাসীদের ফিসফাস শুনেছে মেহেরুন্নেসা । যেখানে নাকি রাতের বেলা কেউ তাকানোরও সাহস করে না, কেউ কেউ বলেওখানে এমন কিছু আছে, যা দিনের আলোয় দেখা যায় না।
মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো।তবুও সে থামলো না। তার মনে হলো, আজ যদি সে না যায়, তাহলে হয়তো এই রহস্য চিরকাল অজানাই থেকে যাবে।
হঠাৎ সুনেহেরা থেমে গেল। মেহেরুন্নেসা তাড়াতাড়ি একটা বড় গাছের আড়ালে লুকিয়ে পড়লো। কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা।
তারপর সুনেহেরা ধীরে ধীরে মাথার চাদরটা খুললো। চাঁদের আলো এবার পুরোপুরি পড়লো তার মুখে। কিন্তু মেহেরুন্নেসার নিঃশ্বাস যেন আটকে গেল। ওটা কি সত্যিই সুনেহেরা?নাকি অন্য কেউ?কারণ তার ঠোঁটে ফুটে উঠলো এক অচেনা, ঠাণ্ডা হাসি যেটা মেহেরুন্নেসা আগে কখনো দেখেনি। আর ঠিক সেই মুহূর্তেই
জঙ্গলের ভেতর থেকে ভেসে এলো কারও পায়ের শব্দ। একজন দু’জন না। পুরো একটা দল ছুটে আসছে এদিকে।
সুনেহেরা মাথা ঘুরিয়ে তাকালো সেই অন্ধকারের দিকে, যেন কারও জন্যই অপেক্ষা করছিল।
মেহেরুন্নেসার বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠলো।
“ও একা নয়…”
তার মনের ভেতর প্রতিধ্বনি হলো।
অন্ধকারের গভীর থেকে ধীরে ধীরে বেরিয়ে এলো একটা ছায়া। কিন্তু তার মুখটা এখনো অদৃশ্য।
আর ঠিক তখনই, হঠাৎ পায়ের নিচে শুকনো ডাল ভেঙে যাওয়ার ক্ষীণ শব্দ
“কচ্!”
মেহেরুন্নেসার মুখ ফ্যাকাসে হয়ে গেল। সুনেহেরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে ঘুরে তাকালো
“কে ওখানে?”
তার কণ্ঠে ছিল না ভয়। ছিল কেবল ঠাণ্ডা, হিসেবি সতর্কতা। মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো, গাছের আড়ালে নিজেকে আরও গুটিয়ে নিলো।
চারপাশে আবার নেমে এলো নিস্তব্ধতা। শুধু হৃদস্পন্দনের শব্দটা যেন অস্বাভাবিকভাবে জোরে শোনা যাচ্ছে। আজকের রাতে কিছু একটা প্রকাশ পেতেই চলেছে। কিন্তু সেটা কি সত্য?
নাকি আরও ভয়ংকর কোনো মিথ্যা ?
জঙ্গলের নিস্তব্ধতা যেন হঠাৎ করে ভারী হয়ে উঠলো। মেহেরুন্নেসা নিঃশ্বাস আটকে তাকিয়ে আছে। সুনেহেরার দৃষ্টি তখনও অন্ধকারের গভীরে স্থির।
ঝোপঝাড়ের ভেতর থেকে একের পর এক আলো জ্বলে উঠতে লাগলো। হারিকেন। একটা… দুইটা… তারপর ধীরে ধীরে আরও… আরও…
মুহূর্তের মধ্যেই অন্ধকার চিরে বেরিয়ে এলো সারি সারি কালো পোষাক পরা লোক। তাদের মুখ প্রায় ঢাকা, শুধু চোখ দুটো অস্পষ্টভাবে জ্বলজ্বল করছে। প্রত্যেকের হাতে একটি করে হারিকেন কম্পমান আলোয় তাদের ছায়া গাছের গায়ে লম্বা হয়ে পড়ছে।
মেহেরুন্নেসার গা শিউরে উঠলো। এরা কারা? এতদিন কোথায় ছিল? লোকগুলো একে একে এসে থামলো সুনেহেরার সামনে। তারপর নিঃশব্দে নিজেদের জায়গা ঠিক করে নিলো। দুই সারিতে ভাগ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়লো তারা। মাঝখানে ফাঁকা একটা পথ তৈরি হলো, যেন কারও জন্য সাজানো এক অদ্ভুত মঞ্চ।
পুরো জায়গাটা এখন কেবল হারিকেনের হলদেটে আলোয় ভাসছে। কিন্তু কেউ কথা বলছে না। এক ফোঁটা শব্দ নেই। শুধু বাতাসের শব্দ, আর দূরে কোথাও শুকনো পাতার মর্মর। সুনেহেরা ধীরে ধীরে সামনে এগিয়ে এলো। তার মুখে সেই অচেনা, ঠাণ্ডা হাসি এখনও লেগে আছে। যেন এই সবকিছু তার কাছে খুবই স্বাভাবিক বরং সে-ই এদের অধিপতি।
হঠাৎ একজন কালো পোশাকধারী সামনে এগিয়ে এলো। তার হাতে একটা ছোট বাক্স। বাক্সটা খুলতেই ভেতর থেকে বের হলো কিছু অদ্ভুত আকৃতির পাথর প্রতিটা পাথরে খোদাই করা চিহ্ন,
যেগুলো এই যুগের নয় বলেই মনে হয়।
মেহেরুন্নেসার কপাল কুঁচকে গেল।
“এটা কেমন খেলা?”
সে নিজের মনেই প্রশ্ন করলো। লোকগুলো একসাথে মাথা নিচু করলো। তারপর শুরু হলো সেই অদ্ভুত খেলা। পাথরগুলো একে একে মাটিতে রাখা হলো একটা নির্দিষ্ট বিন্যাসে। যেন কোনো অজানা চক্র তৈরি হচ্ছে। প্রতিটা চালের সঙ্গে সঙ্গে হারিকেনের আলো কাঁপছে, আর বাতাসটা ভারী হয়ে উঠছে।
সুনেহেরা এক পা এগিয়ে এল। তার চোখে এখন অদ্ভুত এক তীক্ষ্ণ দীপ্তি। সে পাথরগুলোর দিকে তাকালো, তারপর খুব ধীরে একটা পাথর তুলে অন্য জায়গায় বসালো।
মুহূর্তেই চারপাশে থাকা লোকগুলোর মধ্যে এক অদ্ভুত সাড়া পড়ে গেল। তারা কেউ নড়লো না, কিন্তু তাদের নিঃশ্বাস যেন একসাথে থেমে গেল।
এরপর একে একে তারা চাল দিতে লাগলো। কিন্তু যতবারই তারা চেষ্টা করছে, সুনেহেরা যেন আগেই বুঝে নিচ্ছে সব।
তার প্রতিটা চাল নিখুঁত,হিসেবি, অপরাজেয়।
সময় যেন থমকে গেছে। শেষে একটা নির্দিষ্ট পাথর সরাতেই পুরো বিন্যাসটা বদলে গেল।
একটা নিঃশব্দ বিস্ফোরণের মতো অনুভূতি ছড়িয়ে পড়লো চারপাশে। সব হারিকেনের আলো একসাথে দপ করে জ্বলে উঠলো তারপর আবার স্থির।
লোকগুলো একসাথে মাথা নিচু করলো।
যেন পরাজয় স্বীকার। মেহেরুন্নেসার চোখ বিস্ময়ে বড় হয়ে গেল। বুকের ভেতরটা ধকধক করছে।
সুনেহেরা ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়ালো। তার ঠোঁটে আবার সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠলো। কিন্তু এবার সেই হাসিতে ছিল এক ধরনের কর্তৃত্ব। এক ধরনের অদৃশ্য শক্তির ছাপ। সে কিছু বললো না। তবুও সবাই বুঝে গেল। খেলা শেষ।
তারপর যা ঘটলো, তা আরও অদ্ভুত।
এক এক করে লোকগুলো ঘুরে দাঁড়ালো। তাদের হারিকেনের আলো ধীরে ধীরে দূরে সরে যেতে লাগলো। তারা আবার দুই লাইনে দাঁড়িয়ে কিন্তু এবার ফিরে যাচ্ছে। কোথায়? উত্তরের দিকে। উত্তরের প্রাসাদ। যে প্রাসাদের মানেই আতঙ্ক। এত বছর ধরে মূল প্রাসাদের পিছনে গোপন করে রাখা হয়েছে সেই প্রাসাদ।
মেহেরুন্নেসার শরীর ঠাণ্ডা হয়ে গেল।
“উত্তরের প্রাসাদ…”
তার মনে পড়লো সেই রহস্যময় কথা। সেই নিষিদ্ধ জায়গা। সুনেহেরা শেষবারের মতো চারপাশে তাকালো। এক মুহূর্তের জন্য মনে হলো, তার দৃষ্টি যেন সোজা মেহেরুন্নেসার লুকিয়ে থাকা জায়গার দিকেই থেমে গেল। মেহেরুন্নেসার বুক কেঁপে উঠলো।
সে নিঃশ্বাস বন্ধ করে দাঁড়িয়ে রইলো। কিন্তু সুনেহেরা কিছু বললো না। শুধু ধীরে ধীরে ঘুরে দাঁড়িয়ে হাঁটা দিলো দক্ষিণ দিকে। এদিকেই প্রাসাদ। মেহেরুন্নেসা বুঝলো ওর পিছু পিছু না ফিরলে হারিয়ে যাবে সে এই জঙ্গলে। দ্রুত তাল মেলাতে লাগলো সুনেহেরার সাথে। কিন্তু কিছু মূহুর্তের ব্যাবধানেই হারিয়ে গেল সুনেহেরা। মেহেরুন্নেসা তখন খুব ঘাবড়ালো। হলুদ ভারি শাড়িটা তার গায়ে। ওপরে শুধু একটা শাল জড়ানো। খালি পায়ে দ্রুত ছুটে চলেছে কেবল চোখের আন্দাজে। কিছুদূর এগোতেই পিছনে শোনা গেলো কারো পায়ের আওয়াজ। মেহেরুন্নেসা আরও জোরে ছুটতে লাগলো। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলো পিছন থেকে চাদের আলোয় তার কাছাকাছি বড় এক ছায়া পড়েছে। ঠিক পিছনেই দাড়িয়ে আছে কোনো অবয়ব।
মেহেরুন্নেসা ঢোক গিলে ভয়ে ভয়ে পিছনে ফিরতেই দৃশ্যমান হলো সেই অবয়ব।
“আআআআআআআআআআ”
কেমন হয়েছে বলিও পাখিরা। গত পর্বে কিন্তু ৩k হয় নি হুমম। আজ ৩k করে দাও। কালকে ঈদ স্পেশাল পর্ব আসবে। সবাইকে ঈদ মোবারক পাখিরা 🥹🫶। তোমাদের ঈদ কাটুক ভীষণ সুন্দর। ঈদ মোবারক 😘🫶
Share On:
TAGS: জান্নাতুল ফেরদৌস, নূর এ সাহাবাদ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৪ এর প্রথমাংশ
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ১৩
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ২৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৫
-
খাঁচায় বন্দী ফুল অন্তিম পর্ব
-
নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৫১
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৪৯
-
খাঁচায় বন্দী ফুল পর্ব ৩৫