Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১৩


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ১৩

বাইজিদের হাতের শক্ত টানটা যেন হঠাৎই সবকিছু এলোমেলো করে দিল। মেহেরুন্নেসা বুঝে ওঠার আগেই সে তাকে নিজের কক্ষে এনে দাঁড় করালো পালঙ্কের ঠিক সামনে। ভারী কাঠের দরজাটা ধীরে বন্ধ হতেই ঘরের নিস্তব্ধতা আরও ঘন হয়ে উঠল।
মেহেরুন্নেসা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। মাথা নিচু, বুকের ভেতর ধুকপুকানি স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে যেন।
বাইজিদ কিছুক্ষণ তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টির খেলা। কঠিন, আবার কোথাও যেন নরমও। তারপর হঠাৎ করেই মুখ ফিরিয়ে নিল।

গম্ভীর কণ্ঠে বলল,
“আমি ঘুমানোর পর… আপনি চলে যাবেন।”

কথাটা বলে সে আর একবারও পিছনে তাকালো না। ধীরে ধীরে পালঙ্কে গিয়ে শুয়ে পড়ল।
মেহেরুন্নেসা যেন আরও অপ্রস্তুত হয়ে গেল। এই এক কথাতেই যেন তার সব ভাবনা গুলিয়ে গেল।
তার হাত দুটো অন্যমনস্কভাবে আঁকড়ে ধরল ওড়নার প্রান্ত। মাথা আরও নিচু হয়ে এলো। লজ্জা, সংকোচ, অজানা অনুভূতির মিশেলে সে যেন জমে গেল এক জায়গায়। ঘরের বাতাস ভারী হয়ে আছে। বাইরে কোথাও দূরে শীতল হাওয়া জানালার পাল্লায় ধাক্কা দিচ্ছে, কিন্তু ভেতরে শুধু নীরবতা।

কিছুক্ষণ পর বাইজিদের শ্বাস-প্রশ্বাস ধীরে ধীরে স্থির হয়ে এলো। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। মেহেরুন্নেসা ধীরে ধীরে মুখ তুলল। তার চোখ এবার সাবধানে গিয়ে থামল বাইজিদের ওপর।
ঘুমন্ত মানুষটা যেন সম্পূর্ণ অন্য রকম। দিনের সেই কঠোরতা, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি কিছুই নেই। শান্ত, নিস্তব্ধ প্রায় নিরীহ।

মেহেরুন্নেসার দৃষ্টি অজান্তেই আটকে গেল তার মুখে।গভীর সবুজ চোখদুটো এখন বন্ধ, তবু যেন তাদের তীক্ষ্ণতা লুকিয়ে আছে পাতার আড়ালে। মেহেরুন্নেসা খেয়াল করেছিলো তার চোখের মনি সবুজাভ। ভেজা চুলের কিছু অংশ কপালের ওপর পড়ে আছে। ঠোঁটদুটো সামান্য ফাঁক নিঃশ্বাসের মৃদু ওঠানামা স্পষ্ট।
মেয়েটার বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন অচেনা কাঁপনে ভরে উঠল। এভাবে কাউকে দেখা… এভাবে অনুভব করা, এটা তার জন্য নতুন।
ধীরে ধীরে সে এক পা এগোল। তারপর আরেক পা। পালঙ্কের একটু পাশে এসে দাঁড়াল। তার চোখে তখন লজ্জার আভা, কিন্তু সেই লজ্জার আড়ালে একটা মুগ্ধতা স্পষ্ট। যেন সে নিজেকেই ভুলে গেছে।

খুব আস্তে, প্রায় নিঃশব্দে ফিসফিস করে বলল,
“আপনি এমন কেন?”
প্রশ্নটা বাতাসে মিলিয়ে গেল। কোনো উত্তর এল না। শুধু বাইজিদের শান্ত নিঃশ্বাস। মেহেরুন্নেসা একটু হাসল লজ্জায়, অজান্তে। তারপর ধীরে ধীরে পিছিয়ে এলো।
দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে আরেকবার ফিরে তাকাল। সেই একই দৃষ্টে নরম, মায়াভরা, একটু কাঁপা।

মনে হলো, এই ঘরের ভেতর কিছু একটা রেখে যাচ্ছে সে হয়তো নিজের অজান্তেই।ঠোঁট গোল করে শ্বাস নিলো। তারপর নিঃশব্দে দরজা খুলে বেরিয়ে গেল। ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নেমে এল। শুধু বাইজিদের ঘুমন্ত মুখে অদ্ভুত এক প্রশান্তি লেগে। দরজাটা নিঃশব্দে টেনে বন্ধ করতেই মেহেরুন্নেসা এক মুহূর্ত থামল। বুকের ভেতরটা এখনও কাঁপছে হালকা হালকা। সে নিজেকে সামলে নিয়ে ধীর পায়ে করিডোর ধরে এগোতে শুরু করল।

জমিদার প্রাসাদের সেই দীর্ঘ করিডোরটা প্রায় অন্ধকারে ডুবে আছে। দূরে কয়েকটা প্রদীপের ক্ষীণ আলো, দেয়ালে ছায়ার খেলা।
ঠিক তখনই
“এই যে, থামো।”
কঠিন, ধারালো কণ্ঠস্বর। মেহেরুন্নেসার পা থেমে গেল। ধীরে ধীরে মুখ তুলে তাকাতেই সামনে দেখা গেল সিমরানকে। দেয়ালের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে, ঠোঁটে বাঁকা হাসি, চোখে স্পষ্ট বিদ্বেষ। সিমরান ধীরে ধীরে এগিয়ে এল তার দিকে। চোখ দুটো ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত মেপে নিল মেহেরুন্নেসাকে।
“এত রাতে শাহজাদার কক্ষ থেকে ফিরছো?”

তার কণ্ঠে তাচ্ছিল্য ঝরে পড়ল।
“এখনো তো বিয়ে হয়নি তাই না? রাত বিরেতে পর পুরুষের ঘরে যাওয়া কি কোনো সতী নারীর লক্ষন?
একটু থামল সে, তারপর আরও নিচু স্বরে, বিষ মেশানো ভঙ্গিতে বলল
“বেগানা নারী-পুরুষ এক ঘরে এতক্ষণ কি করছিলে, শুনি?”

কথাগুলো যেন করিডোরের নীরবতা ভেঙে ছড়িয়ে পড়ল। মেহেরুন্নেসা কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। আগের মতো লজ্জায় মাথা নিচু করে থাকা সেই মেয়েটা যেন কোথাও মিলিয়ে গেল। ধীরে ধীরে সে মাথা তুলল। তার চোখে এখন অদ্ভুত এক স্থিরতা। শান্ত, কিন্তু সেই শান্তির ভেতরে যেন লুকিয়ে আছে কড়া কিছু। সে সোজা হয়ে দাঁড়াল। কণ্ঠস্বরে কোনো উচ্চতা নেই, কিন্তু প্রতিটা শব্দ পরিষ্কার, ঠাণ্ডা
“আমার তো হবু স্বামী।”

একটু থামল সে। চোখ সরাল না একবারও।
“আমি তার ঘরে গেছিলাম।”

সিমরানের মুখের হাসিটা খানিকটা থমকে গেল।
মেহেরুন্নেসা এবার এক পা এগিয়ে এল। খুব কাছে গিয়ে দাঁড়াল তার সামনে।
তার কণ্ঠ এবারও নিচু, কিন্তু তীক্ষ্ণ
“আপনি কেন এত রাতে শাহজাদার ঘরের সামনে?”

প্রশ্নটা যেন সরাসরি আঘাত করল। সিমরান কিছুক্ষণ চুপ করে রইল। চোখে অস্বস্তির ছাপ ফুটে উঠল, কিন্তু সে তা ঢাকতে চেষ্টা করল।
“আমি… আমি তো”
কথা শেষ করতে পারল না। মেহেরুন্নেসা হালকা একটা মৃদু হাসি দিল। সেই হাসিতে লজ্জা নেই, ভয় নেই শুধু অদ্ভুত এক আত্মবিশ্বাস।
“প্রাসাদে কে কোথায় যায়, তার হিসাব রাখার আগে, নিজের জায়গাটা বুঝে নেওয়াই ভালো, বেগম সাহেবা।”

কথাটা বলেই সে আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না।
ধীরে, স্থির পায়ে সিমরানের পাশ কাটিয়ে এগিয়ে গেল সামনে। সিমরান স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মুখের অভিব্যক্তি ধীরে ধীরে বদলে যাচ্ছে—অবাক, অপমানিত, আর ভেতরে জমতে থাকা রাগে। আর করিডোরের শেষপ্রান্তে মিলিয়ে যেতে যেতে মেহেরুন্নেসার চোখে তখন সেই একই রহস্যময় স্থিরতা। যেন সে আর আগের সেই শান্ত, নরম মেয়ে নেই।

**

ভোরের প্রথম আলো যখন জানালার ফাঁক গলে ঘরে ঢুকতে শুরু করেছে, ঠিক তখনই বাইজিদের ঘুম ভাঙল। ধীরে ধীরে চোখ খুলল সে।
কিছুক্ষণ স্থির হয়ে শুয়ে রইল, যেন ঘুম আর জাগরণের মাঝখানে কোথাও আটকে আছে। তারপর এক লম্বা আড়মোড়া ভাঙল। পেশীবহুল দেহটা একটু টানটান হয়ে আবার ঢিলে হয়ে এলো। চোখে তখনো ঘুমের আবেশ। পালঙ্ক ছেড়ে ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল সে। খালি পায়ে হেঁটে গেল কক্ষের বড় ব্যালকনির দিকে। ভারী পর্দাটা সরাতেই ভোরের ঠাণ্ডা হাওয়া এসে মুখে লাগল।
বাইরে তখন এক অপূর্ব দৃশ্য।
বিস্তীর্ণ সবুজে ঢাকা উত্তরের জঙ্গল। যতদূর চোখ যায়, কেবল সবুজ আর কুয়াশার মিশেল। গাছের মাথায় ভোরের সোনালি আলো পড়েছে, কোথাও কোথাও হালকা কুয়াশা ভেসে বেড়াচ্ছে। পাখিরা ডানা ঝাপটে উড়ে যাচ্ছে দূরে। বাইজিদ রেলিংয়ে হাত রেখে দাঁড়িয়ে রইল। চোখ তার দূরে, কিন্তু মনটা যেন কোথাও অন্যত্র।
হঠাৎই মনে পড়ে গেল গত রাতের কথা।
মেহেরুন্নেসা! ঘরের ভেতর তার দাঁড়িয়ে থাকা, মাথা নিচু, লজ্জায় আড়ষ্ট সেই মুখটা যেন ভেসে উঠল চোখের সামনে।
আর তারপর ঘুমিয়ে পড়ার আগ মুহূর্তে… সেই শেষ দৃষ্টি। সে কি সত্যিই দেখেছিল? না কি স্বপ্ন ছিল? তার বুকের ভেতর হালকা একটা অদ্ভুত অনুভূতি নড়েচড়ে উঠল।

বাইজিদ ধীরে ধীরে চোখ বন্ধ করল এক মুহূর্তের জন্য। মনে করার চেষ্টা করল। সে কি তার দিকে তাকিয়ে ছিল? কতক্ষণ? কেন যেন মনে হচ্ছে, সেই দৃষ্টিটা শুধু লজ্জার ছিল না, আরও কিছু ছিল।

অজান্তেই তার ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল এক অপূর্ব, মৃদু হাসি। শীতল ভোরের হাওয়ায় সেই হাসিটা যেন আরও গভীর হয়ে উঠল।
নিজেকেই খুব আস্তে বলল
“অদ্ভুত মেয়ে…”

তার কণ্ঠে ছিল না কোনো বিরক্তি, না কোনো কঠোরতা। শুধু এক অচেনা কোমলতা।
দূরে জঙ্গলের ওপর সূর্যের আলো একটু একটু করে ছড়িয়ে পড়ছে, আর ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে থাকা সেই মানুষটার চোখে আজ এক নতুন আলো। হুট করে বাইজিদ এর মনে পড়লো আজ তো তাদের গায়ে হলুদ হওয়ার কথা।

কেউ আবার মেহেরুন্নেসা কে সাজাচ্ছে না তো তার অনুমতি ছাড়া। কোনো বহিরাগত তার চেহারা দেখে ফেলছে না তো? বাইজিদ খালি পায়েই দৌড় লাগালো অন্দরের দিকে। কারণ শুধু পুরুষরাই কি নারী দের রুপে নজর দেয় নাকি? নারীরাও দেখতে পারে কোণা নজরে।

অন্দরমহলের দরজা জোরে ঠেলে হন্তদন্ত হয়ে ঢুকে পড়ে বাইজিদ। তার হাঁপ ধরা শ্বাস, চোখে তীব্র অস্থিরতা। কিন্তু সেই অস্থিরতার ভেতরে লুকিয়ে আছে অন্যরকম এক ভয়।
এক অদ্ভুত ভয়। যেন কেউ তার সবচেয়ে আপন জিনিসটাকে ছিনিয়ে নিচ্ছে। ভেতরে ঢুকতেই চারপাশের দৃশ্য এক মুহূর্তের জন্য তাকে থামিয়ে দেয়। পুরো অন্দরমহল আজ যেন ফুলের রাজ্যে পরিণত হয়েছে। গাঁদা, রজনীগন্ধা, বেলি ফুলের মালা ছড়িয়ে আছে চারদিকে। মেঝেতে পাপড়ির আস্তরণ, বাতাসে মিষ্টি সুগন্ধ।

চারপাশে নারীদের ভিড়। সবার গায়ে হলুদ আর লালের মিশ্রণে সাজানো পোশাক। কেউ হাসছে, কেউ ব্যস্ত, কেউ গায়ে হলুদের থালা সাজাচ্ছে। আনন্দে মুখর পুরো পরিবেশ।
কিন্তু বাইজিদের চোখে এসব কিছুই ধরা পড়ে না।
তার বুকের ভেতর শুধু একটা কথাই ধাক্কা দিচ্ছে
মেহেরুন্নেসাকে কি আবার সাজিয়ে আনা হয়েছে?
সবাইয়ের সামনে? তার চোয়াল শক্ত হয়ে যায়।
না, এটা সে হতে দেবে না।

তার মেহেরুন্নেসার রূপ, সেটা সবার চোখের জন্য না। এমনকি নারীরাও দেখবে না। কেউ না।
তার দৃষ্টি দ্রুত ঘুরে বেড়ায় প্রতিটি কোণায়, প্রতিটি মুখে। ভিড় ঠেলে সামনে এগোয় সে, চোখে স্পষ্ট উদ্বেগ আর দখলদার এক তীব্রতা।কিন্তু কোথাও নেই মেহেরুন্নেসা।

তার কপালে ভাঁজ পড়ে, শ্বাস ভারী হয়ে ওঠে।
ঠিক তখনই সামনে এসে দাঁড়ায় সিমরান।
আজ সে যেন নিজের সবটুকু সৌন্দর্য ঢেলে দিয়েছে সাজে। হলুদ-লাল মিশ্রণের জমকালো পোশাক, কপালে টিপ, ঠোঁটে মৃদু রঙ, খোলা চুলে ফুলের গাঁথুনি। চোখে এমন এক আকর্ষণ, যেন সে চায় আজ বাইজিদের দৃষ্টি শুধু তার ওপরই আটকে থাকুক।
ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে সে বলে, “শাহজাদা, আপনি এত ব্যস্ত হয়ে কাকে খুঁজছেন?”

তার কণ্ঠে মিষ্টি টান, ভঙ্গিতে আমন্ত্রণ। কিন্তু বাইজিদ এক ঝলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।
সে যেন সিমরানকে দেখছেই না। অস্থির কণ্ঠে বলে,
“মেহেরুন্নেসা কোথায়?”
এই একটুকু বাক্যে এমন তীক্ষ্ণতা, এমন অধিকার যা শুনে সিমরানের বুকটা কেঁপে ওঠে।
সে আরেকটু কাছে আসে, নিজের ওড়না ঠিক করে নরম গলায় বলে, “আজ তো আপনার গায়ে হলুদ, একটু চারদিকে তাকান না। সবাই আপনার জন্য…….”
“আমি তাকে খুঁজছি।”

বাইজিদ এবার তার কথা কেটে দেয়। গলা ঠাণ্ডা, কিন্তু ভেতরে জমে থাকা আগুন স্পষ্ট।
“কোথায় সে?”
সিমরান থেমে যায়। তার ঠোঁটের হাসি ম্লান হয়ে আসে। এত সাজ, এত প্রস্তুতি সব যেন অর্থহীন হয়ে পড়ে এক মুহূর্তে। বাইজিদ আর এক সেকেন্ডও দাঁড়ায় না। তাকে পাশ কাটিয়ে ভিড়ের মধ্যে ঢুকে যায়। তার চোখে এখন একরোখা জেদ
মেহেরুন্নেসাকে সে খুঁজে বের করবেই।
কারণ আজ সে কাউকে তার মেহেরুন্নেসাকে দেখার সুযোগ দেবে না।

অন্দরমহলের হাসি-আনন্দের ভিড়ের মাঝেই হঠাৎ এক অদৃশ্য উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়ে।
আর সিমরান দাঁড়িয়ে থাকে স্থির হয়ে।
চোখের ভেতর জ্বলে ওঠে নীরব অপমান আর হিংসার আগুন।ভিড় ঠেলে দ্রুত এগোতে এগোতে হঠাৎই বাইজিদের সামনে এসে দাঁড়ায় মারজান।
তার চোখে বিরক্তি জমাট বাঁধা, শ্বাস ভারী। সামনে দাঁড়িয়েই আর নিজেকে থামাতে পারে না

“আমি কি বলিনি? এই আয়োজন যেন না করা হয়?”

কণ্ঠে রাগ চেপে রাখা নেই এবার।
মারজান ভ্রু তুলে তাকায়, ঠোঁটে হালকা বাঁকা হাসি।
“বিয়ে বাড়িতে গায়ে হলুদ হবে না? এটা আবার কেমন কথা, বাইজিদ? এত বড় আয়োজন, লোকজন, সবাই কি বলবে?”

“আপনি জানেন তো আমি কী বলেছিলাম।”
বাইজিদের গলা ঠাণ্ডা, কিন্তু তাতে চাপা আগুন স্পষ্ট।
“তবুও কেন করা হলো?”
মারজান এবার একটু সোজা হয়ে দাঁড়ায়, চোখে কড়া দৃষ্টি এনে বলে,
“সব কিছু কি তোমার কথায় চলবে? জমিদার বাড়ির নিয়ম আছে, ঐতিহ্য আছে। তুমি যা ইচ্ছে বললেই সব বন্ধ হয়ে যাবে নাকি?”
বাইজিদ দাঁত চেপে ফেলে।
“আমি চাই না কেউ তাকে দেখুক।”
শেষ কথাটায় এমন এক তীব্রতা, যেন চারপাশের বাতাস থমকে যায়। ঠিক তখনই পেছন থেকে নরম, প্রাণবন্ত একটা কণ্ঠ
“ভাইজান…”
বাইজিদ ঘুরে তাকায়।
সামনে সুনেহেরা। তার সোনালি চুল কাঁধ ছুঁয়ে নেমে এসেছে, হালকা ঢেউ খেলানো। হলুদ-লালের মিশ্রণে সাদামাটা কিন্তু অপূর্ব সাজে তাকে আজ যেন আলাদা করে দীপ্ত লাগছে। চোখে কোমলতা, মুখে মিষ্টি হাসি। সে এগিয়ে এসে একদম কাছে দাঁড়িয়ে বলে,
“তুমি এত রাগ করছো কেন, ভাইজান?”
বাইজিদ একটু নরম হলেও বিরক্ত গলায় বলে, “তোরা জানতিস না? এসব আয়োজন করতে আমি বারণ করেছিলাম।”
“জানি তো,”
সুনেহেরা মৃদু হেসে বলে,
“কিন্তু তুমি যেটা ভাবছো, তেমন কিছু হচ্ছে না।”

বাইজিদ ভ্রু কুঁচকে তাকায়,
“মানে?”
সুনেহেরা একটু কাছে ঝুঁকে নিচু গলায় বলে, “ভাবিকল সবার সামনে আনা হবে না। শুধু অন্দরের কয়েকজন মহিলা… একদম ঘনিষ্ঠরা, তারাই হলুদ লাগাবে। বাইরে কেউ দেখবে না।”

সে চোখ টিপে হালকা দুষ্টুমির সুরে যোগ করে, “এমনকি অন্দরেও সবাই না।”
বাইজিদের চোখে সন্দেহের ছায়া একটু নড়ে ওঠে।
“নিশ্চিত?”
“আমি আছি না?”
সুনেহেরা হাসে,

“আমি নিজে দেখছি সব।”
কথাগুলো যেন ধীরে ধীরে বাইজিদের ভেতরের ঝড়টা থামিয়ে দেয়। তার শক্ত হয়ে থাকা মুখটা একটু ঢিলে হয়, দৃষ্টি আগের মতো তীক্ষ্ণ থাকে না।
সে গভীর শ্বাস নিয়ে নিচু গলায় বলে,
“ঠিক আছে… খেয়াল রাখবে।”
সুনেহেরা মাথা নাড়ে,
“সবসময়, ভাইজান।”
পাশে দাঁড়িয়ে মারজান নিঃশব্দে সবটা দেখে।
তার চোখে এক ঝলক অদ্ভুত দৃষ্টি খেলে যায়
যেন এই আশ্বাস, এই শান্তি তার একেবারেই পছন্দ হচ্ছে না।
বাইজিদ আবার চারদিকে তাকায়। তবে এবার সেই উন্মত্ত খোঁজ নেই, আছে শুধু এক ধরনের অস্থির প্রতীক্ষা মেহেরুন্নেসার জন্য।

অন্দরমহলের এক কোণে দাঁড়িয়ে পুরো ঘটনাটা নিঃশব্দে দেখছিল রত্নপ্রভা। তার ঠোঁটের কোণে মিটি মিটি হাসি। বাইজিদের সেই অস্থিরতা, রাগ, বারবার চারদিকে তাকানো সবই তার চোখ এড়ায়নি। কীভাবে সে সবাইকে উপেক্ষা করে শুধু একজনকেই খুঁজে বেড়াচ্ছে আর কীভাবে প্রায় রাগে ফেটে পড়ছিল, যদি মেহেরুন্নেসাকে কেউ দেখে ফেলে।

এসব ভাবতেই রত্নপ্রভার চোখে ঝিলিক খেলে যায়। মনে মনে বলে ওঠে,
“এতটা ভালো তাকে কি করে বাসলে ভাইজান”

তার হাসিটা একটু গভীর হয়। যেন কেউ নিজের সবচেয়ে দামী সম্পদকে লুকিয়ে রাখে, আড়াল করে রাখে সবার চোখ থেকে, ঠিক তেমন করেই বাইজিদ মেহেরুন্নেসাকে আগলে রাখতে চাইছে।
কিন্তু এটা কি শুধু অধিকার? না…
এর ভেতরে অন্য কিছু আছে। রত্নপ্রভা ধীরে ধীরে মাথা নাড়ে। ভালোবাসা। খুব গভীর, অদ্ভুত এক ভালোবাসা। এই ভেবে সে আর দেরি না করে অন্দরমহলের ভেতরের কক্ষগুলোর দিকে এগিয়ে যায়। যেখানে মেহেরুন্নেসাকে গায়ে হলুদের জন্য সাজিয়ে রাখা হয়েছে।

ঘরের দরজার সামনে হালকা ফুলের মালা ঝুলছে। ভেতরে মৃদু আলো, বাতাসে চন্দনের গন্ধ।
ভিতরে ঢুকতেই চোখে পড়ে মেহেরুন্নেসা কে।
হলুদের জন্য দেওয়া পোশাকে বসে আছে চুপচাপ। গায়ে হালকা হলুদের আভা, খোলা চুলে ফুল গোঁজা। মুখে অদ্ভুত লাজুকতা, চোখ নিচু।
রত্নপ্রভা দরজার কাছে দাঁড়িয়েই কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে।

তারপর মৃদু হেসে ভেতরে ঢোকে।
“কি গো এত চুপচাপ বসে আছো কেন?”
মেহেরুন্নেসা মুখ তুলে তাকায়, নরম কণ্ঠে বলে, “এমনি…”
রত্নপ্রভা তার সামনে এসে বসে পড়ে, চোখে দুষ্টু ঝিলিক।
“তুমি জানো, বাইরে কী হচ্ছে?”
মেহেরুন্নেসার ভ্রু কুঁচকে যায়,
“কি?”
রত্নপ্রভা একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলে, “আমাদের ভাইজান তো একেবারে ঝড় তুলে দিয়েছেন।”
মেহেরুন্নেসা বিস্মিত চোখে তাকায়।
রত্নপ্রভা হেসে বলে,
“হন্তদন্ত হয়ে এসে সবাইকে জিজ্ঞেস করছে,মেহেরুন্নেসা কোথায়? ছোটআম্মা কেও একপ্রকার বকাঝকা করে ফেলেছে। শুধু এই জন্য যে তোমাকে যদি সবাই দেখে ফেলে!”

সে একটু থামে, তারপর মজা করে যোগ করে, “এমনকি বলেছে নারীরাও যেন না দেখে তোমার রূপ!”

কথাটা শুনতেই মেহেরুন্নেসার মুখ লাল হয়ে ওঠে।
তার চোখ হঠাৎ নিচু হয়ে যায়, আঙুলগুলো ওড়নার কোণা মুচড়ে ধরে। রত্নপ্রভা তাকিয়ে থাকে, হাসিটা আরও নরম হয়ে আসে।
“দেখে মনে হচ্ছে, তুমি তার কাছে খুবই মূল্যবান কিছু।”

মেহেরুন্নেসা কিছু বলে না। তার গাল রাঙা হয়ে উঠেছে, বুকের ভেতর ধুকপুকানি বাড়ছে। বাইজিদের সেই আচরণের কথা কল্পনা করতেই এক অদ্ভুত অনুভূতি ছড়িয়ে পড়ে শরীরজুড়ে।
লজ্জায় সে আরও আড়ষ্ট হয়ে বসে থাকে।
রত্নপ্রভা মৃদু স্বরে বলে,
“এভাবে সবাইকে দূরে সরিয়ে রাখছে যেন তোমাকে দেখে ফেললে নিয়ে যাবে মানুষ তোমার সব রুপ। এসব মানুষ কখন করে জানো? শুধু তখনই, যখন সে কাউকে খুব ভালোবাসে।”

মেহেরুন্নেসার ঠোঁট কেঁপে ওঠে। সে মাথা আরও নিচু করে ফেলে। ঘরের ভেতর নরম নীরবতা নেমে আসে। আর সেই নীরবতার মাঝেই মেহেরুন্নেসার লজ্জা যেন আরও গাঢ় হয়ে ওঠে।ঘরের ভেতর হালকা আলো। জানালার ফাঁক গলে আসা সূর্যের মৃদু আলো যেন এসে থমকে দাঁড়িয়েছে মেহেরুন্নেসার উপর।

দাসীরা তাকে ঘিরে শেষবারের মতো সাজিয়ে দিচ্ছে। তারপর যখন হলুদ শাড়িটা তার গায়ে জড়িয়ে দেওয়া হলো, আর কাঁচা হলুদের তৈরি গয়নাগুলো একে একে পরিয়ে দেওয়া হলো
ঘরের ভেতর যেন নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে গেল এক মুহূর্তে।

হলুদের শাড়ির কোমল আভা তার গায়ের রঙকে আরও দীপ্ত করে তুলেছে। কাঁচা হলুদের গয়না গলায়, হাতে, কানে তার সৌন্দর্যকে অদ্ভুত এক পবিত্রতায় মুড়িয়ে দিয়েছে। খোলা চুলের ফাঁকে গোঁজা সাদা ফুলগুলো যেন তার চারপাশে এক স্বর্গীয় আভা তৈরি করেছে।
তার মুখটা নিচু, চোখের পাতা ভারী, লাজে নরম হয়ে আছে পুরো অবয়ব।
এমন লাগছে যেন কেউ একজন মাটির পৃথিবীতে ভুল করে নামিয়ে দিয়েছে কোনো আলোর মূর্তি।

সিমরান দরজার কাছে দাঁড়িয়ে ছিল।
প্রথমে সে নিজের সাজ ঠিক করছিল, কিন্তু মেহেরুন্নেসার দিকে তাকাতেই তার হাত থেমে যায়। তার চোখ বড় হয়ে ওঠে। ঠোঁট একটু ফাঁকা হয়ে যায়। কথা বের হয় না।
সুনেহেরা পাশে দাঁড়িয়ে ছিল। সেও একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। তার চোখে বিস্ময়, মুখে মুগ্ধতা।
“এটা… মানুষ?” অবাক হয়ে প্রায় ফিসফিস করে বলে সে।

দাসীরা একে অপরের দিকে তাকিয়ে চাপা স্বরে ফিসফাস শুরু করে
এত সুন্দর কেউ হতে পারে? মনে হয় রূপকথার কেউ তো চোখ সরানোই যাচ্ছে না

মেহেরুন্নেসা আরও লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলে। তার আঙুলগুলো কাঁপছে হালকা করে।
ঠিক তখনই মারজান এগিয়ে আসে। তার চোখে অদ্ভুত এক দৃষ্টি মুগ্ধতা আছে, কিন্তু তার সঙ্গে মিশে আছে হালকা ঈর্ষার ছায়া। সে ধীরে ধীরে কাছে এসে দাঁড়ায় মেহেরুন্নেসার সামনে।
একটু ঝুঁকে তার মুখটা ভালো করে দেখে
তারপর হলুদের থালা থেকে আঙুলে একটু হলুদ তুলে নেয়।

ঘরের ভেতর নিস্তব্ধতা নেমে আসে। প্রথম স্পর্শ।
মারজান নিজের হাতে মেহেরুন্নেসার গালে আলতো করে হলুদ মাখিয়ে দেয়। হলুদের সেই সোনালি ছোঁয়ায় মেহেরুন্নেসার গাল যেন আরও উজ্জ্বল হয়ে ওঠে।
চারপাশে নারীরা মৃদু উল্লাসে হেসে ওঠে, কেউ কেউ বাহবা দেয়, কেউ আশীর্বাদ করে।

ঘরের বাইরে, রঙিন পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে আছে বাইজিদ। সে নিজেকে লুকিয়ে রেখেছে। কেউ তাকে দেখতে পাচ্ছে না। কিন্তু তার চোখ স্থির হয়ে আছে এক জায়গায়। মেহেরুন্নেসার উপর। এক ঝলক দেখার জন্যই সে এসেছে।
কিন্তু সেই এক ঝলকেই সে থেমে যায়।
তার নিঃশ্বাস আটকে আসে। চোখে বিস্ময়, হৃদয়ে এক অদ্ভুত ঝড়। মনে হয় সে যেন প্রথমবার তাকে দেখছে। তার মেহেরুন্নেসা এতটা সুন্দর? তার আঙুল মুঠো হয়ে আসে। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে যায়। আর সেই মুহূর্তে তার মনে একটাই কথা ঘুরে বেড়ায় এই রূপ, এই সৌন্দর্য, কেউ দেখতে পারবে না। কেউ না। শুধু সে। শুধু তার জন্যই এই মেহেরুন্নেসা।

আর কেউ খেয়াল না করলেও সুনেহেরার চোখ ফাকি দিতে পারলো না বাইজিদ। বিচ্ছু টা দেখেই ফেলল।
“উহুম, উহুম ভাইজান আসবে নাকি? হলুদ দিতে?”

সকলে তাকালো পর্দার দিকে। বাইজিদ বেশ লজ্জায় পড়লো। শাহাজাদা লুকিয়ে তার হবু স্ত্রী কে দেখছিলো। রত্নপ্রভা সকলকে নির্দেশ দিলো জায়গা খালি করতে। দাসীরা হুড়মুড়িয়ে বেড়িয়ে গেলো। বাইজিদ হলুদ পাঞ্জাবি পরে ধীরে ঢুকলো আচ্ছাদন এর ভিতর। সবাই গেলেও সিমরান রইলো দাঁড়িয়ে। এমন মূহুর্তে সে জীবনেও একা ছাড়বে না দুজনকে। সুনেহেরা সিমরানের কাঁধে হাত রেখে বলল
“তোমাকে নিমন্ত্রণ পত্র পাঠাতে হবে?”

আর কোনো কথা না বলে টেনে নিয়ে গেলো সিমরান কে। বাইজিদ মেহেরুন্নেসার মুখোমুখি বসলো। দুই আঙুলে তুলে নিলো অল্প একটু বাটা হলুদ। আলগোছে ছুঁইয়ে দিলো মেহেরুন্নেসার গালে। মেহেরুন্নেসা লজ্জায় মিইয়ে যায়। তাই দেখে বাইজিদ বলে
“তুমি শান্ত নদী হয়ে থেকো না মেহু । উত্তাল ঢেউ এর মতো এসে আছড়ে পরো আমার বুকে।”

চলবে? আগামী পর্বে বাসর 🌚। কেমন অনুভূতি তোমাদের? ৩k পূরণ করো, কালই গল্প দিব তাহলে। কেমন হলো অবশ্যই বলিও।

আগের পর্বে ৩k করতে পারোনি। তাও দিলাম। এইটায় যেন অবশ্যই ৩k হয়। গল্প হারিয়ে না ফেলতে, পেইজে ফলো দিয়ে রাখুন

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply