Golpo romantic golpo নূর এ সাহাবাদ

নূর এ সাহাবাদ পর্ব ১০


নূরসাহাবাদ

jannatul_ferdous_জান্নাতুল_ফেরদৌস

পর্ব – ১০

কপি করা নিষেধ। কপি করে চোরের পরিচয় দিবেন নাহহ।

মাটির রান্না ঘরের ভ্যাপসা গরমে ঘেমে নেয়ে একাকার তিলোত্তমা। ভোর বেলা উঠে যাতায় গম পিষে আটা তৈরি করে তা দিয়ে রুটি বানাচ্ছে সকলের জন্য। শশুর বাড়িতে পয়লা ৬ দিন আরামে কাটালেও ৭ দিনের দিন তার অবসান ঘটলো। ফুপু শাশুড়ির ক্যাটক্যাট আর শাশুড়ির কড়া নির্দেশে আজ থেকে রোজ তার বাড়ির সকলের জন্য নাস্তা এবং রাতের খাবার তৈরি করতে হবে। দুপুরের রান্নার পালা শিমুর। যাতা ঘুরাতে ঘুরাতে নরম হাত খানায় ফোঁসকা পড়েছে কয়েক জায়গা। সেই হাতেই বেলছে এবড়োখেবড়ো রুটি। একেক টার আকার হচ্ছে একেক রকম। কোনোটাই গোল হচ্ছে না।

হবে কী করে, কোনো দিন করেছে নাকি এসব কাজ। বাকের শাহ এর কন্যা না হলেও তার চেয়ে কোনো অংশে কম সুখে ছিল না সে জমিদার মহলে। চাওয়ার আগেই সব হাজির হয়ে যেত। খাবার খাওয়ার পর হাতটাও দাসী রা ধুইয়ে দিয়েছে। চুল গুলো পর্যন্ত নিজের আঁচড়াতে হয় নি, দাস দাসীরাই করতো সব। মাহবুব বিয়ের করার আগে বলতো তার বাড়িতে দাসী না থাকলেও কম যত্নে থাকবে না তিলোত্তমা। মাহবুব তার সম্পূর্ণ যত্ন করবে। কিন্তু তার মেয়াদ রইলো মাত্র ৬ দিন। এখন মাহবুব ও তিলোত্তমার হয়ে কোনো কথা বলে না।

লোহার তাওয়ায় রুটি সেঁকতে গিয়ে ছ্যাকা লাগলো হাতে। মৃদু চিৎকার দিয়ে উঠলো তিলোত্তমা। মল্লিকা আওয়াজ পেয়ে এগিয়ে এলো রান্না ঘরে। তিলোত্তমা হাত ধরে কাঁদছে বসে। এক হাত আরেক হাতে ধরে ঝাঁকাচ্ছে। তাওয়ায় রাখা রুটি টা পুরে কালো হয়ে যাচ্ছে। মল্লিকা তিলোত্তমা কে ডিঙিয়ে গিয়েও রুটি টাকে বাচাতে পারলো না। পুড়ে কয়লা হয়ে গেছে। এমন দৃশ্য দেখে মল্লিকার রাগ চরে গেলো তালুতে। দাঁত কিড়মিড় করে খপ করে মুঠোয় নিয়ে নিলো তিলোত্তমার চুলের খোপা। টেনে তুলল চুলের মুঠি ধরেই। ব্যাথায় কুকিয়ে দাড়াতেই গালে বসালো এলোপাতাড়ি চড়, থাপ্পড়। মুখ দিয়ে অনর্গল বেরোতে লাগলো অশ্রাব্য সব গালি
“বে” শ্যা, ঢেমনি কোথাকার। এটা তোর পাতানো বাপের জমিদারি পেয়েছিস? রান্না ঘরে এসে মন কোথায় থাকো তোর? রুটি টা পুড়িয়ে দিলি অজাতের ঝি। দেখি বাকি রুটি গুলোর কি হাল করেছিস”

রুটির ঝুড়িতে চোখ পড়তেই মল্লিকা আরো তেতে উঠলো। তিলোত্তমা কে খোঁপা ধরেই ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিয়ে বলল
“হায় হায় হায় হায় রে। ও খোদা তুমি কই? উঠায় নেও আমারে। এই সর্বনাশী করছে কি? সব রুটি নষ্ট কইরা দিছে। ওরে ও মাহবুব, মাহবুব। দেখ তোর নবাবের বেটি বউ কি করছে এগুলা। ওই মাহবুব। ভাবি, মিরাজ, শিমু! সব কই গেলা। দেইখা যাও।”

রমলা বেগম সবে হাত মুখ ধুয়ে এসেছে। মল্লিকার গলা শুনে এগিয়ে আসলো রান্না ঘরে। দরজা দিয়ে ঢুকে ভিতরের দৃশ্য চোখে পড়তেই মাথায় হাত দিয়ে মুখ হা করে ফেলল
“রুটি ডি রে করছে কি? একটা রুটিও তো খাওন যাইবো না”

মল্লিকা একটা রুটি তুলে হাত দিয়ে ছিড়ে দেখালো। চামড়ার মত শক্ত, টেনে ছেড়া যাচ্ছে না। বেশির ভাগই পুড়ে কালো হয়ে গেছে। রমলা রাগে বোম হয়ে কোমরে হাত দিয়ে বলল
“এই বিচার আইজ মাহবুব এরই করতে হইবো। উহহহহ জমিদারের ঝি। কয় ভরি সোনা গয়না লইয়া আইছো জমিদার মহল থাইক্কা। আগের টার তো মহলে ঠাই হইছে। তাই বইলা তুমার হইবো না। আমার মাইয়াডা উল্টা তগো দুই শয়তানির পাল্লায় পরে কারাগারে গেলো।”

মল্লিকা খ্যাক খ্যাক করে উঠলো রমলার কথায়
“দোষ তো ওগোর দুইজনের না খালি ভাবি। তোমার মাইয়াও আছে। আগ বাড়াইয়া কথা কইতে ক্যান জাইতে হইবো। এখন নিজেরই গেলো অন্ধকার কারাগারে”

রমলা ননদের সাথে কথা না বাড়িয়ে মাহবুব কে ডাকলো। সারা রাত বাইজি পাড়ায় কাটিয়ে ভোরে ফিরে গাঢ় ঘুম ঘুমিয়েছে মাহবুব। এমন কাচা ঘুমে ব্যাঘাত ঘটানোতে চটে গেলো খুব। চোখ ডলতে ডলতে রান্না ঘরে আসতেই মা আর ফুপুর এক বস্তা অভিযোগ তিলোত্তমা কে নিয়ে। রাগে তিলোত্তমার ঘাড় ধরে টেনে তুলল। গলা চেপে ধরে দাঁতে দাঁত পিষে বলল
“আমারে শান্তিতে থাকতে দিবি না তো? তোরেও আমি বাচতে দিমু না। আয় আমার লগে”

চুলের মুঠি ধরে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে গেলো ঘরে। মল্লিকা আর রমলার মুখে ফুটলো বিশ্বজয়ের হাসি।


বেলা গড়িয়ে সময় তখন প্রায় দ্বিতীয় প্রহর ছুঁতে চলেছে। এমন সময় বাকের শাহ্ দরবারের জরুরি আলাপ সেরে মাত্রই ফিরেছে ঘরে। কাসার নকশা করা গ্লাসটায় ঠান্ডা শরবত নিয়ে কক্ষের দরজায় কড়া নাড়লো সিমরান।
“চাচাজান আসবো?”

“এসো মা”

সিমরান গ্লাস টা নিয়ে পালঙ্কের পাশের ছোট কাঠের টেবিল টায় রাখলো। মাথা নিচু করে মিনমিনে গলায় বলল
“চাচাজান, মেহেরুন্নেসা কে এখনো তার বাড়িতে পৌছে দেওয়ার জন্য কেউ রিবা হয় নি”

বাকের শাহ্ শরবতে একবার চুমুক দিয়ে বলল
“সে কি? বাইজিদ কে তো গতকালই বললাম। ও তো বললো আজ সকালেই রওনা হবে। ভুলে গেছে নাকি? একটু ডেকে পাঠাও তো মা ওকে। বলো আমি ডাকছি এক্ষুণি”

সিমরান স্মিত হেসে বেড়িয়ে গেলো ঘর থেকে। সিড়ি দিয়ে উঠার সময় সামনা সামনি পড়লো সুনেহেরা। এই মেয়েটার দৃষ্টি কেমন অদ্ভুত। গন্তব্য ভুলিয়ে দেয়, উদ্দেশ্য নড়বড়ে করে দেয় ওর তীক্ষ্ণ চাহনি। বুকে হাত গুজে দাঁড়িয়ে বলল
“কোথায় যাচ্ছো?”

সিমরান শুকনো ঢোক গিলে বলল
“শা….শাহজাদার ঘরে”

সুনেহেরা কেমন সরু চোখে তাকালো সিমরান এর দিকে।
“চেহারা দেখে তো মনে হচ্ছে নিশ্চিত কোনো বদ মতলব আছে। ভাইজান গোসল করছে, এখন যেও না”

বলেই গটগট করে নেমে গেলো সুনেহেরা। চোখের আড়াল হতেই চারিদিকে ভালো করে দেখে নিলো সিমরান। তারপর চলে গেলো বাইজিদ এর কক্ষের দিকে। সদ্য গোসল করা, ভেজা উদাম গায়ে শাহজাদা কে দেখার সুযোগ সে কখনোই হাত ছাড়া করবে না।

প্রাসাদের উত্তর দালানের সেই অংশটা সাধারণত নিস্তব্ধই থাকে। বিকেলের আলো তখন ধীরে ধীরে ম্লান হয়ে এসে লম্বা জানালার ফাঁক দিয়ে করিডোরের মেঝেতে নরম সোনালি ছায়া ফেলে দিচ্ছে। সেই নীরবতার মাঝেই স্নানঘরের দরজাটা খুলে বেরিয়ে এলো বাইজিদ।
গোসল সেরে এসেছে সে। ভেজা চুল থেকে টুপটাপ করে পানি পড়ছে এখনো। প্রশস্ত কাঁধ বেয়ে চিকচিক করে গড়িয়ে নামছে পানির রেখা। কোমরে শুধু সাদা একটা তোয়ালে জড়ানো, ভেজা শরীরের উপর সূর্যের আলো পড়তেই যেন তার গায়ের রঙে অন্যরকম দীপ্তি ফুটে উঠেছে।
জমিদার পুত্র বাইজিদকে এমন অবস্থায় খুব কম লোকই দেখার সুযোগ পায়।
তার সবুজ চোখ দুটো গোসলের পর আরও তীক্ষ্ণ হয়ে উঠেছে, যেন অদ্ভুত এক গভীরতা আছে সেখানে। ভেজা চুল হাত দিয়ে এলোমেলোভাবে পেছনে সরিয়ে নিল সে। সেই মুহূর্তে তার ভঙ্গিটা এমন স্বাভাবিক, অথচ অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়,যেন নিজের অজান্তেই সে চারপাশের দৃষ্টি টেনে নেয়।

কিন্তু বাইজিদ জানে না, ঠিক এই সময়েই কেউ
একজন তাকে দেখছে। পর্দার আড়ালে নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে আছে সিমরান। সে পর্দার ফাঁক দিয়ে তাকিয়ে আছে একদৃষ্টে। প্রথমে যেন কৌতূহল ছিল, কিন্তু ধীরে ধীরে সেই দৃষ্টি অন্যরকম হয়ে উঠল। তার চোখে বিস্ময়, মুগ্ধতা আর এক অদ্ভুত লুকোনো আকাঙ্ক্ষার ঝিলিক।

এভাবে কাছ থেকে বাইজিদকে দেখার সুযোগ সে সচরাচর। বাইজিদ অন্যমনস্কভাবে মাথা ঝাঁকিয়ে ভেজা চুল থেকে পানি ঝরিয়ে দিল। কয়েক ফোঁটা পানি কাঁধ বেয়ে নিচে নেমে এলো। সেই দৃশ্যটা দেখে সিমরানের বুকের ভেতরটা কেমন অস্থির হয়ে উঠল।
তার দৃষ্টি যেন আটকে আছে বাইজিদের উপর।
মনে হলো, এমন একজন পুরুষের পাশে দাঁড়ালে কেমন লাগত? ভাবনাটা হঠাৎ করেই তাকে অন্য এক কল্পনার জগতে নিয়ে গেল।
সে যেন আর পর্দার আড়ালে নেই। বরং ঠিক বাইজিদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার হাতে একটা নরম কাপড়। সে আলতো করে বাইজিদের ভেজা চুল মুছে দিচ্ছে।

কল্পনায় বাইজিদ একটু ঝুঁকে দাঁড়িয়ে আছে, যেন ইচ্ছা করেই তাকে এই কাজটা করতে দিচ্ছে।
সিমরান একটু বিরক্তির ভান করে বলে,
“এত বড় মানুষ হয়ে নিজে নিজে চুল মুছতে পারেন না নাকি?”
বাইজিদের চোখে তখন সেই চেনা দুষ্টুমি। সবুজ চোখ দুটো সরাসরি তার দিকে তাকিয়ে আছে।
সে মুচকি হেসে বলে,
“তুমি যখন আছো, তখন আর আমাকে কষ্ট করতে হবে কেন?”

সিমরান লজ্জায় চোখ নামিয়ে নেয়, কিন্তু হাত থামে না। সে আবার কাপড়টা দিয়ে বাইজিদের কাঁধের ভেজা পানি মুছে দেয়।
বাইজিদ হঠাৎ তার হাতটা ধরে ফেলে।
“এই ভেজা ঠোটে একটা চুমু হবে কি?”

ঠাট্টার সুরে বলে সে। সিমরান রাগ দেখানোর চেষ্টা করে, কিন্তু মুখের কোণে হাসি লুকাতে পারে না। কল্পনার সেই দৃশ্যে তারা দুজন যেন একেবারে স্বাভাবিক স্বামী-স্ত্রী একটা সহজ, ঘরোয়া মুহূর্তের মধ্যে ডুবে আছে। ঠিক তখনই বাস্তবে করিডোরে হালকা বাতাস বইল। পর্দাটা দুলে উঠল। সিমরান হঠাৎ চমকে উঠল। তার কল্পনার জগৎটা মুহূর্তেই ভেঙে গেল। সে আবার বুঝতে পারল, এখনো পর্দার আড়ালেই দাঁড়িয়ে আছে।
আর সামনে দাঁড়িয়ে থাকা বাইজিদ কিছুই জানে না। সে অন্যমনস্কভাবে চুল মুছছে, যেন পৃথিবীর কোনো কিছুই তাকে স্পর্শ করছে না।
সিমরান ধীরে ধীরে পর্দার আড়াল থেকে একটু সরে গেল।
কিন্তু তার বুকের ভেতরে যে অদ্ভুত অনুভূতিটা জেগে উঠেছে তা আর সহজে থামার মতো নয়।
মনে মনে সে শুধু একটাই কথা ভাবল, যদি কখনো সত্যিই এমনটা হতো… যদি সত্যিই সে বাইজিদের জীবনের এতটা কাছে যেতে পারত… তাহলে হয়তো এই প্রাসাদের নীরব দেয়ালগুলোও অন্যরকম গল্প বলত।

করিডোরের নিস্তব্ধতা তখনও ঘন হয়ে আছে। সিমরান পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে নিজের বুকের ধুকপুক শব্দটা যেন নিজেই শুনতে পাচ্ছে। একটু আগের কল্পনার কথা মনে পড়তেই তার গাল আবারও গরম হয়ে উঠল। সে দ্রুত সরে যেতে চাইল যেন কেউ তাকে দেখার আগেই এখান থেকে চলে যেতে পারে।
ঠিক তখনই স্নানঘরের দিক থেকে একটা শব্দ হলো। বাইজিদ মাথা ঘুরিয়ে তাকাল। পর্দাটা হালকা দুলে উঠেছে। তার তীক্ষ্ণ সবুজ চোখ মুহূর্তেই সেটা লক্ষ্য করল। কয়েক পা এগিয়ে এসে পর্দার দিকে তাকাতেই সে দেখতে পেল ওখানে দাঁড়িয়ে আছে সিমরান। তার ভ্রু কুঁচকে গেল।
বিরক্তি স্পষ্ট হয়ে উঠল চোখেমুখে।
“আপনি?”

কণ্ঠটা ঠান্ডা। পর্দার আড়াল থেকে ধরা পড়ে যাওয়া মানুষটার মতো সিমরান এক মুহূর্তে স্থির হয়ে গেল। ধীরে ধীরে পর্দা সরিয়ে বেরিয়ে এলো সে। মাথা নিচু করে ফেলল । চোখ তুলে তাকানোর সাহস নেই।

তার গাল লজ্জায় লাল হয়ে উঠেছে। বাইজিদ একবার ওপর থেকে নিচ পর্যন্ত তাকাল। তারপর স্পষ্ট বিরক্তি নিয়ে বলল,
“আপনি এখানে কী করছেন?”
কণ্ঠে কোনো কোমলতা নেই। বরং কঠিন একটা দূরত্ব। সিমরানের বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল। সে তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে নিল। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তে সে যেন ভীষণ অপমানিত হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

নিজেকে সামলে নিয়ে কাঁপা গলায় বলল—
“জ… জমিদার বাবু… আপনাকে ডাকছেন।”
কথাটা বলার সময় তার গলাটা শুকিয়ে যাচ্ছিল।
বাইজিদ কিছুক্ষণ চুপ করে তার দিকে তাকিয়ে রইল। চোখে স্পষ্ট সন্দেহ আর বিরক্তি।
“খবর দিতে এসে… পর্দার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিলেন কেন?”

ঠান্ডা স্বরে জিজ্ঞেস করল সে। সিমরানের গাল আরও লাল হয়ে উঠল। সে তোতলাতে লাগল
“আমি… আমি আসলে… এইমাত্র এসেছি…”
কথাটা শেষ করতেও পারল না।
বাইজিদ গভীর একটা শ্বাস ফেলল, যেন পুরো ব্যাপারটাই তার কাছে অপ্রয়োজনীয় বিরক্তির মতো লাগছে।

তারপর সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,
“ঠিক আছে। আমি যাচ্ছি।”
এর বেশি আর একটা কথাও বলল না। ভেজা চুল থেকে পানি ঝরতে ঝরতেই সে করিডোর ধরে হাঁটা শুরু করল। সিমরান একই জায়গায় দাঁড়িয়ে রইল। মাথা নিচু। গাল এখনও লাল।
তার মনে হচ্ছিল। একটু আগের সেই কল্পনার মুহূর্তটা যেন হঠাৎ করেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে।
বাস্তবের বাইজিদ আর তার কল্পনার বাইজিদ দুজন যেন একেবারেই আলাদা।

বাইজিদ ধীর পায়ে করিডোর পেরিয়ে এগিয়ে গেল জমিদার বাড়ির দক্ষিণ দালানের দিকে। ওখানেই থাকেন বাকের শাহ্। তার ঘরের সামনে সবসময় একটা চাপা গাম্ভীর্য লেগে থাকে।
দরজার সামনে পৌঁছে বাইজিদ এক মুহূর্ত থামল। ভেতর থেকে হালকা কাশির শব্দ ভেসে আসছে। তারপর দরজায় হালকা ঠেলা দিতেই সেটা খুলে গেল।
ঘরের ভেতর আলোটা মৃদু। বড় টেবিলের পাশে বসে আছেন বাকের শাহ্। বয়স তার অনেক হলেও দৃষ্টিতে এখনো সেই কঠোরতা আছে। সামনে কিছু কাগজপত্র ছড়ানো, কিন্তু তিনি যেন সেগুলোর দিকে খুব একটা মন দিচ্ছেন না।
বাইজিদ ভেতরে ঢুকতেই তিনি ধীরে মাথা তুললেন।

কিছুক্ষণ ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন নীরবে। তারপর গম্ভীর স্বরে বললেন,
“বাইজিদ, আজ সকালে তোমাকে একটা কাজ বলেছিলাম।”
বাইজিদ শান্ত ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে রইল।
“মেহেরুন্নেসাকে বাড়ি পৌঁছে দিতে বলেছিলাম। মনে আছে?”
প্রশ্নটা খুব স্বাভাবিকভাবেই বলা হলো, কিন্তু তাতে যেন অদ্ভুত একটা ভার ছিল।
বাইজিদের চোখের পাতা একবার কেঁপে উঠল।
বাকের শাহ্ আবার বললেন,
“কেনো পৌছে দাও নি তাকে?”

কথাটা শুনতেই বাইজিদের মুখে যেন হঠাৎ ছায়া নেমে এলো। এক মুহূর্ত আগে পর্যন্ত তার মুখে যে নির্লিপ্ত ভাব ছিল, সেটা যেন মিলিয়ে গেল। চোখের দৃষ্টি অদ্ভুতভাবে গাঢ় হয়ে উঠল।
সে উত্তর দেওয়ার আগে কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। মনে পড়ে গেল রাতের সেই দৃশ্য।

বাকের শাহ্ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন তার দিকে।
“কী হলো? চুপ করে আছো কেন?”
বাইজিদ ধীরে চোখ নামাল।
কণ্ঠটা স্থির রাখার চেষ্টা করল।
“কিছু কাজ ছিল… তাই যেতে পারিনি।”
বাকের শাহ্ ভ্রু কুঁচকে তাকালেন।
“কাজ?”
তার কণ্ঠে স্পষ্ট সন্দেহ।
কিন্তু বাইজিদ আর কিছু বলল না। সে চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল।
তার মুখে তখন যেন অদ্ভুত এক ছায়া। কারণ সে নিজেও বুঝতে পারছে মেহেরুন্নেসার প্রতি যে টানটা তার ভেতরে জন্ম নিচ্ছে, সেটা সাধারণ কোনো অনুভূতি নয়।

বাইজিদ হুট করে বলে উঠলো এক অনাকাঙ্ক্ষিত কথা।
“আমি মেহেরুন্নেসা কে বিয়ে করতে চাই আব্বা”

ছেলের কথা শুনে যেন আকাশ থেকে পড়লেন বাইজিদ শাহ্
“এ তুমি কি বলছো? মাথা ঠিক আছে তোমার? তুমি মেহেরুন্নেসা কে কেনো বিয়ে করবে?”

বাইজিদ বলল
“কারণ জানি না। তবে তাকে দেখলে আমার অযথাই কেমন সুখ সুখ অনুভূত হয়। এই সুখ কে আমি দূরে যেতে দিতে চাইনা।”

বাইজিদ শাহ চোখ সরু করে তাকিয়ে রইলো। বাইজিদ মোটেও ছেলেমানুষী করার মত লোক না। অবশ্যই গভীর ভাবনা চিন্তা করেই সব টা বলছে। বাকের শাহ্ দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বলল
“কিন্তু সে কি রাজি তোমাকে বিয়ে করতে? আগে তার কাছে প্রস্তাব পাঠানো উচিত”

বাইজিদ বলল
“প্রস্তাব টা আমি তাকে একান্ত ব্যাক্তিগত ভাবে দিতে চাই আব্বা”

বাকের শাহ্ ক্ষণে ক্ষণে আশ্চর্য হচ্ছে বাইজিদ এর কথায়। তবুও সম্মতি দিলেন। বাইজিদ বাবার সম্মতি দেখে এক ফালি হাসলো। ভীষণ আনন্দের সেই হাসি। মেহেরুন্নেসা কে রত্নপ্রভার ঘরে পাওয়া যাবে। বাইজিদ সেদিকেই হাঁটা দিলো। কক্ষের ভারি লোহার দরজা টা বন্ধ। জড়তা নিয়ে দুই বার টোকা দিতেই খুলল রত্নপ্রভা। বাইজিদ কে ভীষণ অস্থির দেখালো। প্রভা চিন্তিত হয়ে বলল
“কি হয়েছে ভাইজান? তুমি ঠিক আছো তো?”

বাইজিদ অস্থির গলায় ই বলল
“মেহেরুন্নেসা ভেতরে আছে?”

প্রভা একবার ভিতরে তাকিয়ে বলল
“হ্যা আছে। কেনো?”

“তুই একটু বাইরে যা। তার সাথে আমার একান্তে কিছু কথা আছে”

দারুণ চমকে গেলেও ভাইয়ের কথার ওপর প্রশ্ন করার সাহস হলো না প্রভার। বেড়িয়ে গেলো আলগোছে। বাইজিদ ভিতরে ঢুকে দরজা বন্ধ করে দিলো। মেহের খাটে বসে ছিলো। বাইজিদ কে ঢুকতে দেখে চমকে উঠলো। বাইজিদ এগিয়ে এসে মেহেরুন্নেসার দিকে সরাসরি দৃষ্টি রেখে বলল
“বসুন, দরকারি কথা আছে আপনার সাথে”

মেহেরুন্নেসা জড়তা কাটাতে এলোমেলো দৃষ্টিতে তাকাতে লাগলো কক্ষের চারিদিকে। অল্প কিছু সময় নিরবতা কাটানোর পর বাইজিদ বলল
“মেহেরুন্নেসা, আমি আপনাকে বিয়ে করতে চাই”

মেহেরুন্নেসা বড় বড় চোখ করে তাকালো বাইজিদ এর দিকে। নিকাবের আড়ালে থাকা সেই দৃষ্টি অদেখা রয়ে গেল বাইজিদের। বাইজিদ আগের মতই তাকিয়ে বলল
“ধরে নিন আপনার ভাই এর করা অপরাধ এর শাস্তি আপনি খেটে যাচ্ছেন। আপনার পরিবারকে সেদিন ছেড়ে দিলাম তার প্রায়শ্চিত্ত আপনি করছেন। বলুন, আর যদি আপনি খাটতে না চান তাহলে…

বাইজিদ এর কথা শেষ হওয়ার আগেই মেহেরুন্নেসা মৃদু চিৎকার দিলো
“নাহহহ। নাহহ দয়া করুন”

বাইজিদ এর ঠোঁটে ফুটলো বিশ্বজয়ের হাসি। উঠে দাড়িয়ে বলল
“শাস্তি স্বরুপ আপনাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দিলাম। বাকিটা জীবন আপনাকে আমার সাথে কাটানোর রায় দিলাম। আপনি কি শাস্তি মাথা পেতে নিতে প্রস্তত?”

মেহেরুন্নেসা ওপর নিচ মাথা নাড়লো। নিকাবের ভিতর দুই গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়লো মুক্তোর দানার মত নোনা জল। বাইজিদ এর মুখে তখন খুশির ঝলক বইছে। উঠে দাড়িয়ে মেহেরুন্নেসা কে আগা গোড়া একবার দেখে বেড়িয়ে গেলো।

মধ্যাহ্ন ভোজের সময় হয়েছে। সকলেই বৈঠকে উপস্থিত। সিমরান মাত্র আসলো। কেউ ই খাওয়া শুরু করছে না। বাকের শাহ্ মুখ ভাড় করে বসে আছেন। মেহেরুন্নেসা প্রভার পাশে জড়সড় হয়ে দাড়িয়ে আছে। সকলের মধ্যে নিরবতা ভেঙে বাকের শাহ্ বললেন
“আমার একটা সিদ্ধান্ত নিয়েছি। তোমাদের সকলের উদ্দেশ্যে জানাচ্ছি যে, আগামী শুক্রবার, পবিত্র জুম্মার দিনে, দুজনের সম্মতিতেই আমি বাইজিদ আর মেহেরুন্নেসার বিবাহ ঘোষণা করছি।”

সিমরান এর চোখ তখন কোটর ছেড়ে বেড়িয়ে আসার উপক্রম। মারজান কিছু বলতে যাবে তখনই বাকের শাহ্ হাত উঁচু করে বলল
“ব্যাস! এরপর কেউ কোনো কথা বলবে না এই বিষয়ে। কে আছিস? গোটা রাজ্যে খেজুর, মিষ্টি বিলি কর। গোটা রাজ্য বাসী কে জানিয়ে দাও, শাহজাদার বিবাহ হতে চলেছে”
খাবার টেবিল টার অপর প্রান্তে বসা সুনেহেরার ঠোঁটে ফুটলো কুটিল হাসি।

লেখিকার এই একটাই পেইজ Jannatul Ferdous – জান্নাতুল ফেরদৌস। অন্য কোনো পেইজ থেকে নকল গল্প পড়া থেকে বিরত থাকুন। আমার আগেই কয়েকটা পেইজ ১৫ পর্ব দিয়ে দিয়েছে। চ্যাটজিপিটি দিয়ে লেখা।লেখায় কোনো মাধুর্য নেই গোছালো না লেখা। আমার এই গল্প আমার পেইজ থেকেই পেতে ফলো দিয়ে রাখুন। যাতে পোস্ট করার সাথে সাথে আপনার কাছে চলে যায়।

আর তোমাদের রেসপন্স দেখে আমার লিখার ইচ্ছে হারিয়ে যাচ্ছে আজকাল। অন্যান্য কপি করে পোস্ট করা পেইজে কত কত রিয়্যাক্ট। অথচ আমার তা নেই। তোমরা তো শুরুতে এমন ছিলে না 🙃 আজকাল মন্দা দেখা দিচ্ছে রিয়্যাক্ট কমেন্টে? এত কষ্ট করে লিখি তোমাদের জন্য। রিয়্যাক্ট দিও আর বলিও অবশ্যই কেমন হইছে। কমেন্ট বক্সে একটা জরুরী কথা বলেছি। দেখে নাও। অনেকেই ভুল বুঝছো বিষয়টা। অবশ্যই ৩k রিয়্যাক্ট চাই এটাতে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply