নীভৃতেপ্রেমআমার_নীলাঞ্জনা
নাজনীননেছানাবিলা
পর্ব_৩২
অনুমতি ব্যতীত কপি করা নিষেধ ❌
আপনি আমার প্রফেসর। আমাদের উচিত দূরত্ব বজায় রেখে চলা।
মিহালের চোখ চোখ রেখে অনুভূতিহীন ভঙ্গিতে কথাটি বললো নীলা।মিহাল খনিকের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলো।সে আদৌও কি কোনো কিছুর পরোয়া করে? আর যখন প্রসঙ্গ আসে নীলার তখন সে এক চুলও ছাড় দিতে রাজি না।তাই মুখে হাসি ফুটিয়ে নীলার চোখ চোখ রেখেই বলল __
দূরত্ব দূরের মানুষদের সাথে বজায় রাখতে হয়। তুমি আমার নিজের, নিজের কাছ থেকে কি দূরত্ব বজায় রাখা যায়?
নীলা চমকালো, থমকাল, চোখে মুখে বিষ্ময়তা, ঠোঁট শুকিয়ে গিয়েছে সাথে গলাও, কপাল বেয়ে ঘাম গড়িয়ে পরলো।এক অদ্ভুত অনুভূতির শিকার হলো সে। নিজেকে ধরে রাখা তার জন্য কষ্ট সাধ্য হয়ে উঠেছে প্রতিনিয়ত শুধু মাত্র মিহালের জন্য। কিন্তু নীলা কি আর এত সহজে দুর্বল হয়ে পরার মেয়ে? যেখানে থাকে সে দুর্বল হবে প্রয়োজনে সেই স্থান সে ত্যাগ করবে তবুও নিজেকে দুর্বল হতে দিবে না আর।
নীলা হাতের উল্টো পিঠের সাহায্যে কপাল গড়িয়ে পড়তে থাকা ঘাম চোখের ভ্রু এর কাছে আসার সঙ্গে সঙ্গে মুছে ফেলল। এবং ব্যাগ শক্ত করে চেপে ধরে বলল_
আমি আসছি।
বলেই নীলা সামনে হাঁটা দিল। কিন্তু তার পা জোড়া পাথর হয়ে যাওয়া জন্য একটি কথাই যথেষ্ট ছিল মিহালের।
নীলাকে চলে যেতে দেখে মিহাল আর নিজেকে ধরে না রেখে বলে দিল __
আমরা কাজিন হয় নীলা।তুমি আমার মামাতো বোন আর আমি তোমার ফুফাতো ভাই।আর মা তোমার একমাত্র ফুফু হয়।
নীলা ভাবতেও পারেনি মিহাল তাকে নিজ থেকে সত্যি বলে দিবে।নীলাকে থেমে পড়তে দেখে মিহাল যেন সাহস পেলো এবং সে নীলার সামনে গিয়ে দাঁড়ালো।নীলা মিহালের চোখে চোখ রাখতে পারছে না। একদিন এত সত্যের মুখোমুখি হতে হয়তো তাকে বেগ পেতে হচ্ছে। প্রথমত মিহালের ভালোবাসার স্বীকৃতি তার উপর মিহাল নিজ থেকেই সব সত্যি কথা বলছে যে তারা দুজন কাজিন। এমন নয় যে নীলা এ দুটি সত্যি কথা জানেনা কিন্তু মিহালের মুখ থেকে সত্যি শোনার জন্য সে প্রস্তুত ছিল না।সে ভেবেছিল পারিবারিক সমস্যাটা মুনভির কাছ থেকে জেনে তারপর নিজ থেকে কোন প্ল্যান করবে। কিন্তু এখন তার সব গুলিয়ে যাচ্ছে।
লিসা নীলার সাথে মিহাল কে কথা বলতে দেখে হিংসায় জ্বলে পুড়ে ছারখার হয়ে যাচ্ছে। তার উপর আবার জানতে পারল যে নীলাই তাকে কিডন্যাপ করেছিল। এখন আর ছাড় দিবে না নীলা কে। অবশ্য ইউনিভার্সিটিতে আসার আগেই সে প্রিপারেশন নিয়ে এসেছিল। শুধু ইউনিভার্সিটিতে এসে কনফার্ম হলো তাকে কিডন্যাপ নীলা করেছিল নাকি অন্য কেউ। কিন্তু নীলার কথায় তার মনে হচ্ছে তাকে নীলাই কিডন্যাপ করিয়েছে। এজন্য এখন সে নিজেই নীলাকে কিডন্যাপ করাবে। তার জন্যই লোক ভাড়া করে এনেছে।
ভাড়া করে আনা লোকের মধ্যে মেইন লিডাল লিসার কাছে আসতে লিসা আঙুল দিয়ে সামনে ইশারা করেই মুখ দিয়ে বলল ফার্স্ট ওয়ান।যেখানে নীলা আগে দাঁড়িয়ে আছে এবং পেছনে মিহাল।
লিসা তার কথা বলেই সে স্থান ত্যাগ করল।যাতে কেউ তাকে সন্দেহ না করে।
সেই লোকটা সামনে দিকে তাকাতেই দেখলো একজন পুরুষ সামনে দাঁড়িয়ে আছে এবং একজন মেয়ে পিছনে।তার তার ম্যাম তাকে বলেছি ফার্স্ট ওয়ান তাই সে ভাবল পুরুষটি কেই হয়তো কিডন্যাপ করতে হবে।সে নিজের লোকদের কে ইশারা দিতেই তারা তাদের মতোন কাজ করতে লাগলো।
নীলা আগে দাঁড়িয়ে ছিল ঠিকই কিন্তু মিহাল তার কথা বলার জন্য নীলার সামনে এসেছিল। নীলা এখনো মিহালের দিকে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে আছে।মিহাল নীলার কাছ থেকে এমন রিয়েকশন আশা করেছিল।তাই বলল_
আমি তোমাকে সব বুঝিয়ে বলছি।
তারপর মিহাল সেই পুরনো কথাগুলো বলল যা নিলা নিজের বাবার ডাইরি এবং মুনভির কাছ থেকে জানতে পেরেছিল।মিহাল তার মা বাবার কাহিনী বলে থামলো।আবার বলতে লাগলো _
তোমার ফুফুকে যখন পাত্রপক্ষ দেখতে এসেছিল তখন আমার বাবা এবং মুনভির বাবা সেখানে উপস্থিত হয় এবং আমার বাবা সবার সামনেই বলে যে উনি তোমার ফুফুকে ভালোবাসে। এতে করে তোমার বড় চাচা এবং আমার বাবার মাঝে ঝামেলা হয়। কারণ তোমার বড় চাচা নিজের বেস্ট ফ্রেন্ড এর কাছ থেকে এমন কিছু আশা করেননি তারপর আমার বাবা এবং তার বন্ধুকে সেদিন বাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়। এবং তোমার দাদা নিজের সম্মান রক্ষার্থে তোমার ফুফুকে বলেছিল যে ছেলে তাকে দেখতে এসেছে এই ছেলের সাথেই তার বিয়ে দেবে।
আবার আরেক দিকে তোমার ফুফুর এমন প্রেমের কথা শুনে মুনভির মায়ের পরিবাররাও ভয় পেয়ে যায় এবং ভাবতে থাকে হয়তো তাদের মেয়ে ও তোমার ফুফুর মত কারো সাথে সম্পর্কে জড়িয়ে আছে। তাই তারাও মুনভির মায়ের জন্য পাত্র দেখা শুরু করে এবং যেদিন পাত্র আসে সেদিন জানতে পারে মুনভির মায়ের সম্পর্ক আছে। এরপর অনেক ঝামেলা হয় এর দুই বাড়ির মাঝে। কেউই এ প্রেমের সম্পর্কে রাজি ছিল না। তোমার দাদা ছিল পুরনো দিনের তাই ওনার চিন্তাভাবনা ছিল পুরনো। এবং সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তোমার ফুফু এবং মুনভির মাকে জোর করে অন্য ছেলের সাথে বিয়ে দেওয়া হবে। এবং দুই বেস্ট ফ্রেন্ডের বিয়ে একদিনেই ঠিক করা হয়েছিল যাতে একদিনেই তারা সবাই মিলে পাহারা দিয়ে বিয়ে দিতে পারে। কিন্তু তবুও আমার বাবা এবং মুনভির বাবা নিজের ভালোবাসার জন্য বিপদে সম্মুখীন হয়ে তোমার ফুফু এবং মিনু আন্টিকে বিয়ে করার জন্য বর কে কিডন্যাপ করে এবং নিজেরা বর সেজে সেখানে চলে যায়। আর তোমার চাচারা তখন বাইরে পাহারা দেওয়ায় ব্যস্ত ছিল তাই ভেতরে কবুল বলার মুহূর্তে ঝামেলা হয় না যখন বরের নামের জায়গায় তাদের নাম থাকে। কারণ কাজীকে আগেই আমার বাবা টাকা দিয়ে হাত করে রেখেছিল। এবং কাজীকে বলেছিলো বরের নাম যেন ধীরে বলে যা কেবল তোমার ফুফু এবং মিনু আন্টি শুনতে পায়। তারপর যখন বিয়ে হয়ে যায় তখন শুরু হয়ে ঝামেলা। বরের জায়গায় আমার বাবা এবং তার বেস্ট ফ্রেন্ডকে দেখে তোমার চাচারা অনেক ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। এবং সেদিনের ঝামেলা ও মারামারি হয়। তারপর তোমার ফুফু এবং মিনু আন্টি নিজের পরিবারকে ছেড়ে বাবা এবং তার ফ্রেন্ডের সাথে চলে আসে। তারা সেই শহর ছেড়ে অন্য কোথাও চলে যায় এবং প্রথম কয়েক দিনে এক বন্ধুর বাসায় থেকে ছিল। তারপর বাবা এবং তার ফ্রেন্ড আবার প্যারিসে চলে আসে। আর তোমার ফুফু এবং মিনু আন্টি এ পাসপোর্ট বানাতে দেয়। তোমার ফুফু এবং মিনু আন্টি ঢাকার এক বাড়িতে থাকতো। বাবা এবং তার বন্ধু প্যারিসে এসে পড়াশুনার পাশাপাশি জব করত এবং নিজেদের স্ত্রীর খরচ চালাত। তারপর যখন পাসপোর্ট হয়ে যায় এখন তোমার খুব অত্যাচার আমার মা এবং মিনু আন্টি অর্থাৎ মুনভির মা আর এসে চলে আসে। এরপরে আর আমাদের বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি। কিন্তু যখন তুমি জন্মেছিলে তখন আমরা বাংলাদেশ গিয়েছিলাম। সেই দিনও অনেক ঝামেলা হয়েছিল তারপর বাংলাদেশ থেকে চলে এসেছিলাম এরপর আর বাংলাদেশ যাওয়া হয়নি আমাদের।
কথাগুলো বলেই থামল মিহাল। নীলা খুব মনোযোগ সহকারে কথাগুলো শুনছিল। এতগুলো বছর সে অনেক সত্যি থেকে অজ্ঞাত ছিল। আজ সকল সত্যি সে জেনে ফেলল।
মিহাল নীলাকে নরম সুরে জিজ্ঞেস করল _
বিশ্বাস করো আমায়? আমার কথাগুলো কি বিশ্বাস হচ্ছে তোমার?
নীলা নিজেও জানিনা তার কি হয়েছে। সে জানে মিহাল সত্যি কথা বলছে। এবং নিজের অজান্তেই মিহালকে অনেক বিশ্বাস করে ফেলেছে। তাই মাথা উপর নিচে নাড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে বলল_
বিশ্বাস করি আপনাকে।
কথাটি শোনো মাত্র হাসি ফুটে উঠলো। তারপর বলতে লাগলো __
এখানেই শেষ নয় বরং আবার সত্যি আছে এবং আরো রহস্য আছে। তোমার চাচাতো ভাই ইরফান সে প্যারিসে এসেছিল। তারপর
মিহাল আরো কিছু বলতে যাবে এমন সময় তাদের পেছনে থেকে এক প্রাইভেট কার এসে থামল এবং হুট করেই গাড়ি থেকে বের হয়ে কিছু লোক এসে মিহালের মুখে কালো মাস্ক পরিয়ে দিল। এবং একজন লোক মিহালের হাত বেঁধে দিল আরেকজন পা। তারপর খুব তাড়াতাড়ি গাড়ির ভেতরে তুলে ফেলল মিহালকে।
ঘটনা এত তাড়াতাড়ি ভেবেছিল যে নীলা বুঝতেই পারিনি কি হয়েছে। তার চোখের সামনে ঘটনা ঘটে গেল অথচ সে কিছুই করতে পারেনি।গাড়ি অনেকটা দূরে যেতেই নীলার টনক নড়ল। হাতে থাকা বই মাটিতে পড়ে গেল। দিশা হারিয়ে ফেললে নীলা। হাত-পা রীতিমতো কাঁপতে শুরু করেছে। বুঝতে পারছে না কি করবে। ফোন বের করে দেখলে ফোনে চার্জ নেই। গতরাতে চার্জ শেষ হয়ে গিয়েছিল তারপর আর চার্জ দেওয়া হয়নি। অল্প একটু চার্জ ছিল যা সকালে শেষ হয়ে গিয়েছে ইউনিভার্সিটিতে আসার পর আর ফোন দেখা হয়নি তাই ।ফোনে চার্জ থাকলে হয়তো সে এখন মুনভিকে কল করে জানাতে পারতো কিন্তু এখন এটা অসম্ভব না। তার শরীরের ঘাম বেরিয়ে পড়ছে। একদম ঠান্ডা হয়ে গিয়েছে। নীলা তো শুধু আল্লাহ্ আল্লাহ্ করছে এই বিপদ থেকে মিহাল কে বাঁচানোর জন্য।
চলবে???
Share On:
TAGS: নাজনীন নেছা নাবিলা, নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৬
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১৬
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১১
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা বোনাস পর্ব
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ৪
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ১
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২
-
নীভৃতে প্রেম আমার নীলাঞ্জনা পর্ব ২৭