৪.
তাইমুরের শরীর বেশ ক্লান্ত। কিন্তু তার ঘুম আসছে না। দুচোখের পাতা এক করবার চেষ্টা করেছেন বহুবার। কিন্তু হেমাঙ্গিনীর মোহ হতে নিজেকে মুক্ত করতে পারছেন না তিনি কোনোক্রমেই।
অন্যদিনের সাপেক্ষে আজকের সকালটা বেশ নির্জন। রবির আলো আর বাতাসের স্পর্শে মৃদুমন্দে কাঁপছে জমিদারবাড়ির আঙিনার দূর্বাঘাসগুলো। পাখির কুহুতান শ্রবণগোচর হচ্ছে উঁচু প্রাচীর হতে। নবাব তাইমুর গজনবী তার পালঙ্কে শুয়ে কান খাড়া করে ক্ষণিককাল শুনলেন পাখিদের কিচির মিচির।
মনে অদ্ভুত দ্বিধা আর ব্যকুলতার সংমিশ্রণে এক অনন্য অনুভূতির জাগরণ হল। বুকভরে শ্বাস নিয়ে জমিদারপুত্র ধীরস্বরে বললেন,
- মির্জা, একখানা চিঠি প্রস্তুত করো।
প্রধান খেদমতগার শোবহান মির্জা নিমজ্জিত গলায় কণ্ঠে আগ্রহ ধরে প্রশ্ন করল,
- হুজুর, কী লেখা হবে চিঠিতে?
নবাব তাইমুর গজনবী পালঙ্ক ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। ঘরজুড়ে ব্যস্ত ভঙ্গিতে পায়চারি করতে করতে বললেন,
- বাঈজী হেমাঙ্গিনীকে আমার পক্ষ হতে মধ্যাহ্নভোজে নিমন্ত্রণ জানাবে। আজকের ভোজে আমি তার সঙ্গ চাই। বাকিটা তুমি যথাযথ ভাষায় লিখে দাও।
নবাব তাইমুরের কণ্ঠে সামান্য উত্তেজনা পরিলক্ষিত হল। মনের অস্থিরতাও যেন কিছুটা লাঘব হল।
শোবহান মির্জা মাথা নত করে বললেন,
- যো হুকুম, হুজুর।
শোবহানের মুখে নিষ্ঠাবান সেবকের গাম্ভীর্যতা লেগে থাকে সবসময়। জমিদারপুত্রর হয়ে আগেও বহু নারীকে তিনি নিমন্ত্রণ পত্র পাঠিয়েছেন।
কিন্তু হেমাঙ্গিনীর প্রতি নবাবের আগ্রহে ভিন্নতা রয়েছে।
শোবহান মির্জা সময় নষ্ট করল না। অচিরেই দোয়াত থেকে কালি নিয়ে যত্নের সহিত সুগন্ধ ছড়ানো কাগজে লিখল নিমন্ত্রণপত্র। সে পত্র আরেকজন শিক্ষিত পাইকের দ্বারা পাঠানো হলো বাঈজীদের মহলে। এই পাইকের কাজ চিঠি পড়ে শোনানো। কারণ হেমাঙ্গিনীর লেখাপড়া জানার বিষয়টি জমিদারপুত্রর নিকট এখনো অজানা! গল্পের লেখিকা আতিয়া আদিবার পেজে সকল পর্ব আগে দেওয়া হয়। পেইজ সার্চ করুন ‘ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা’।
হেমাঙ্গিনী তখনো গভীর নিদ্রায় আচ্ছন্ন। সারারাত মাহফিলে নেচেছে। গান পরিবেশন করেছে। সুর এবং ছন্দের মোহময়তায় ডুবিয়ে দিয়েছে গোটা মাহফিলকে। হেমাঙ্গিনী তার কুচকুচে কালো কেশরাশি বালিশের উপর ছড়িয়ে আয়েশ করে বিচরণ করছিল স্বপ্নের নিস্তব্ধতায়।
হেমাঙ্গিনীর পক্ষ থেকে নিমন্ত্রণপত্র গ্রহণ করলেন বিলকিস বানু। পাইক চিঠিটি পড়ে শোনালেন।
শ্রদ্ধেয় হেমাঙ্গিনী,
আমাদের হুজুর, নবাব তাইমুর গজনবী – এ অঞ্চলের জমিদারের বড় পুত্র, আপনাকে তাঁহার একটি বিশেষ ইচ্ছার কথা এই লিপির মাধ্যমে জ্ঞাপন করিতেছেন।
আজিকার শুভ মধ্যাহ্নে, হুজুর নবাব তাইমুর গজনবী তাঁহার একান্ত কামরায় আপনার সান্নিধ্য কামনা করিতেছেন।
তাঁহার নির্দেশে, আপনার জন্য বিশেষভাবে মুঘল রন্ধনশৈলীর আয়োজন করা হইয়াছে। তিনি আশা পোষণ করিতেছেন, এই মধ্যাহ্নভোজনের পর আপনার কোকিলকণ্ঠের সুর তাঁহাকে মন্ত্রমুগ্ধ করিবে।
এই আয়োজন হুজুরের একান্তই ব্যক্তিগত। এর সম্পূর্ণ গোপনীয়তা রক্ষা করা হইবে এবং কোনো কর্মচারীর উপস্থিতি থাকিবে না। নবাব তাইমুর স্বয়ং আপনার উপস্থিতির জন্য অপেক্ষা করিতেছেন।
অতএব, আপনার আগমন যেন সময়মতো হয় সেই বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি রাখিবেন অনুরোধ করিতেছি। আপনার যাতায়াতের জন্য সুসজ্জিত পালকির ব্যবস্থা করা হইয়াছে।
নিমন্ত্রণ কাল: আজ মধ্যাহ্ন। অর্থাৎ ঠিক দুই প্রহর পরে।
ভবদীয় একান্ত অনুগত খাদেম,
শোবহান মির্জা
নবাব তাইমুর গজনবী হুজুরের আজ্ঞাবহ।
খাদেমের নিকট হতে পত্রটি হাতে নিলেন বিলকিস। তার চোখজোড়া বিস্ময়ে চকচক করে উঠল। জিজ্ঞাসা করলেন,
- হুজুর, খুদ ইয়ে নিমন্ত্রণ ভেজা?
পাইক উত্তর দিল,
- জ্বি।
উৎসাহী বিলকিস বানু প্রায় দৌড়ে হেমাঙ্গিনীর ঘরে প্রবেশ করলেন। হেমাঙ্গিনীর মাথার কাছে বসে মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে মৃদুস্বরে ডাকলেন,
- হেমা? শুনছিস? উঠ বেটি! দারুন খবর আছে মেরে পাস!
হেমাঙ্গিনী আলগোছে চোখ মেলল। নিদ্রাচ্ছন্ন দৃষ্টিতে একবার বিলকিস কে দেখল। এরপর পুনরায় চোখ বুঁজে ফেলল। আড়মোড়া ভাঙ্গতে ভাঙ্গতে শুধালো,
- কী হয়েছে, খালা? মহড়া শুরু হয়ে গেছে?
বিলকিস আর নিজের উত্তেজনা সামলে রাখতে পারলেন না। তিনি হেমাঙ্গিনীর দিকে জমিদারপুত্রের নিমন্ত্রণ পত্রটি বাড়িয়ে দিলেন। উচ্ছ্বসিত স্বরে বললেন,
- আরে দেখ তো! হুজুর তাইমুর তোকে মধ্যাহ্নভোজে নিমন্ত্রণ জানিয়েছেন। এইসা কিসমাত হার কিসি কো নেহি মিলতা, বেটি!
হেমাঙ্গিনী তার পালঙ্কে ধরফরিয়ে উঠে বসল। বিলকিস বানুর কাছ থেকে পত্রটি প্রায় ছোঁ মেরে নিয়ে নিল। গোটা ঘরে পায়চারি করতে করতে নিমন্ত্রণ পত্রটা পড়ল সে। একবার নয়। দুইবার নয়। বারবার পড়ল। চিঠিটা নাকের কাছে নিয়ে মন ভরে গন্ধ শুকল।
হেমাঙ্গিনীর অক্ষিজোড়ায় যেন হালকা লজ্জাভাব পরিলক্ষিত হল। আবার পরক্ষণেই ভেসে উঠল মায়ের মৃত্যুরহস্য উদঘাটনে আরেক ধাপ এগিয়ে যাওয়ার গোপন আনন্দ!
হেমাঙ্গিনী অন্দরমহলে প্রবেশ করার জন্য নিজেকে প্রস্তুত করতে লাগল। সে পুনরায় স্নান সারল। আলমারি খুলে সবচেয়ে দামী পোশাকটা বের করে পরিধান করল। অলংকারে আবৃত করল নিজের দেহ। সুসজ্জিত মুখখানা নিয়ে অধির আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগল দ্বিপ্রহরের।
অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে অবশেষে উক্ত সময় কড়া নাড়ল বাঈজী মহলে। হেমাঙ্গিনী সকলের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে পালকিতে চড়ে বসল।
চারজন বলিষ্ঠ বাহক ছন্দময় গতিতে পালকি নিয়ে এগিয়ে যেতে লাগল অন্দরমহলের পানে। তাদের সাথে ছিল দুজন অনুগত খাদেম। তাদের সতর্ক চোখজোড়া ঘোরাফেরা করছিল চতুর্দিকে।
হেমাঙ্গিনী আয়েশ করে পালকির রেশমি কুশনে হেলান দিল। বাহিরের উত্তাপ, ধুলাবালি পালকির ভারী মখমলের পর্দা ভেদ করে ভেতরে প্রবেশ করতে পারছিল না কোনোক্রমেই। বাইরের তীব্র সূর্যালোকে প্রকৃতি হাঁপিয়ে উঠলেও পালকির ভেতরে বিচরণ করছিল সুশীতল বাতাবরণ। ভারী পর্দা ভেদ করে আসা হালকা আলোর রেখাগুলো পালকির কাঠের মেঝেতে সৃষ্টি করছিল মায়াবী জালি নকশা।
হেমাঙ্গিনীর চোখ বুজে শুনছিল পালকি বাহকদের ছন্দময় পদধ্বনি এবং তাদের মন্ত্রের মতন একঘেয়ে সুর,
হুঁ হুঁ হেইয়ো… হুঁ হুঁ হেইয়ো..
বাঈজী মহল থেকে অন্দরমহলের পথটি ছিল বেশ সংক্ষিপ্ত। যাত্রাপথে হেমাঙ্গিনী আরোও একবার নিজেকে গুছিয়ে নিল। হাতের সরু চুড়িগুলি আলতোভাবে স্পর্শ করল। গলার মুক্তোর হারটি ছুঁয়ে দেখল। পোশাক নেড়েচেড়ে দেখল। কেননা এই মধ্যাহ্নভোজের নিমন্ত্রণ তার অন্দরমহলে নিয়মিত যাতায়াতের একটি দারুণ চাবিকাঠি হতে পারে। জমিদারপুত্রের নিকট এই মধ্যাহ্নভোজ শুধুমাত্র বিনোদন হলেও হেমাঙ্গিনীর নিকট নয়।
গল্পের লেখিকা আতিয়া আদিবার পেজে সকল পর্ব আগে দেওয়া হয়। পেইজ সার্চ করুন ‘ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা’।
ক্ষণিককাল পর পালকির গতি কিছুটা শ্লথ হলো। বাইরে অপেক্ষমাণ একজন খাদেমের নিমজ্জিত কণ্ঠস্বর শোনা গেল,
- অন্দরমহলের আঙিনায় প্রবেশ হল।
আরোও ক্ষণিককাল পর পালকি থামল অন্দমহলের সামনে। হেমাঙ্গিনীর হৃৎপিণ্ড দ্রুত গতিতে চলতে শুরু করল। প্রধান খাদেম বিনম্র ভঙ্গিতে হেমাঙ্গিনীকে সাহায্য করল পালকি থেকে অবতরণ করতে। এরপর তাকে নিয়ে প্রবেশ করলেন অন্দরমহলে। তিন তলার একটি বৃহৎ কক্ষের সামনে গিয়ে থেমে গেল খাদেম।
দৃঢ় গলায় বলল,
- হুজুর আপনার জন্য অপেক্ষা করছেন, সাহেবা।
হেমাঙ্গিনী বুক ভরে শ্বাস নিল। এরপর হাসিমুখে দরজায় টোকা দিল। ভেতর থেকে ভরাট কণ্ঠস্বর শ্রবণগোচর হল।
- ভেতরে আসুন।
হেমাঙ্গিনী নবাব তাইমুর গজনবীর খাস কামরায় প্রবেশ করল। কক্ষের জৌলুসে চোখ ধাধিয়ে গেল তার। প্রতিটি কোণা থেকে যেন ঝরে পড়ছে আভিজাত্য। মেঝেতে পাতা দামী পার্সিয়ান গালিচা। দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখা আছে মোঘল রীতির নকশা। নকশাগুলি যেন শিল্পীর হাতের সূক্ষ্ম কারুকার্যের অহঙ্কার বহন করছে।
ঘরের এক কোণে স্ফটিকের জলপাত্রে ভাসছে গোলাপের পাপড়ি।
নবাব তাইমুর গজনবী হেলান দিয়ে তার পালঙ্কে
বসেছিলেন। তাঁর পরনে নিখুঁত কারুকাজের শেরওয়ানি এবং পায়জামা। এ মসলিনের পোশান যেন তাঁর চরিত্রের ঋজুতা বহন করছে।
হেমাঙ্গিনীকে দেখে তিনি উঠে দাঁড়ালেন।
হাসিমুখে অতি নম্র ভঙ্গিতে অভিবাদন জানালেন।
- নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার জন্য ধন্যবাদ, হেমাঙ্গিনী। আপনার আগমন এই মধ্যাহ্নকে এক নতুন সুরভি দান করল।
হেমাঙ্গিনী নতজানু হয়ে সালাম জানাল জমিদারপুত্রকে। কোমল স্বরে বলল,
- হুজুর, খুশ আমদেদ! আমার মতো একজন বাঈজীর প্রতি আপনি যে দয়া দেখালেন, আপনার খাস কামরায় মুখ্য অতিথির মর্যাদা দিয়েছেন। এই সম্মান তো আমার সাত জন্মেরও প্রাপ্য নয়!
তাইমুর কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে পড়লেন। বললেন,
- হেমাঙ্গিনী সাহেবা, আপনি উঠে দাঁড়ান। আপনার প্রতি আমি কোনো দয়া দেখাই নি। এ আপনার যোগ্যতার প্রতিদান।
হেমাঙ্গিনী উঠে দাঁড়াল। হাসি হাসি মুখ করে অপেক্ষা করতে লাগল জমিদারপুত্রের দ্বিতীয় হুকুমের।
তাইমুর বললেন,
- হেমাঙ্গিনী সাহেবা, আপনি আপনার রূপের দ্যুতি দিয়ে আমার এই সামান্য কক্ষকে উজ্জ্বল করলেন। এবার আপনার সেবার জন্য যে মহার্ঘ্য ব্যঞ্জনগুলি অপেক্ষা করছে, তাদের অপেক্ষা পালা শেষ হওয়া কি প্রয়োজন নয়?
হেমাঙ্গিনী লজ্জামিশ্রিত স্বরে মাথা নিচু করে বলল,
- অবশ্যই হুজুর।
তাইমুর সামান্য হেসে অনুরোধের সুরে শুধালো,
- তাহলে কি আমরা এখন আহার শুরু করতে পারি? আপনি অনুমতি দিলে, আমি খাবার সাজাতে বলি?
হেমাঙ্গিনী মাথা নত করে দ্রুত উত্তর দিল,
- হুজুর, আমার ক্ষুধা এখন আপনার আনুগত্যে। আপনি আদেশ করুন, আমি সর্বদা প্রস্তুত।
খাদেমরা নিঃশব্দে মধ্যাহ্নভোজ এর পরিবেশন শুরু করল। প্রথমে এলো বাসন্তী পোলাও, কোরমা, মালাই কোফতা, খাসির মাংসের রেজালা। খাবার মাঝে মাঝে পরিবেশন করা হচ্ছিল ঘি-এ ভাজা নরম লুচি।
খাদেমরা নীরবে পরিবেশন শেষ করে কক্ষ ত্যাগ করল। নবাব তাইমুর ব্যক্তিগতভাবে একটি কোর্মার টুকরো নিজে হাতে নিয়ে হেমাঙ্গিনীর আলিসান থালায় রাখলেন। মৃদু হেসে বললেন,
- এই ব্যঞ্জনটি বিশেষভাবে আপনার জন্য তৈরি করিয়েছি। আশা করি আপনার পছন্দ হবে।
হেমাঙ্গিনী সাদরে গ্রহণ করল কোর্মার বৃহৎ টুকরাটি। সামান্য লাজুক হেসে বলল,
- হুজুর, আপনার রুচির প্রশংসা করার ভাষা আমার জানা নেই। এই সুবাস, এই স্বাদ আভিজাত্যের সুর প্রকাশ করে।
শান্ত গলায় তাইমুর বললেন,
- সুবাস কিংবা সুর। এই দুটি শব্দের মালিকানা বোধহয় আপনি কিনে রেখেছেন বাঈজী সাহেবা। মাহফিলে আপনার গান, নাচ তারই বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে!
হেমাঙ্গিনীর চোখে ঝিলমিলিয়ে উঠল সামান্য কৌতুক। মুচকি হেসে বলল,
- মাহফিলে ভাবি জমিদারের আগমন ঘটেছিল যে! তার মনোরঞ্জনের খোরাক হতে না পারলে জীবন বৃথা, হুজুর!
নবাব তাইমুর গজনবী হেসে ফেললেন। তিনি স্পষ্ট বুঝতে পারলেন, হেমাঙ্গিনী কেবলমাত্র রূপসী এবং শিল্পচর্চায় সমৃদ্ধ নয়। চতুর এবং বুদ্ধিমতীও বটে! তিনি জানতে চাইলেন,
- তবে কি আপনার ছন্দে বোনা প্রতিটি শিল্পের জাল কেবলমাত্র ভাবি জমিদারের মনোরঞ্জনের জন্য ছিল? মনের সুখ কিংবা দুঃখের প্রতিফলন ছিল না?
হেমাঙ্গিনী খাওয়া এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল। এই প্রথম তার কণ্ঠে কষ্টের ইঙ্গিত প্রকাশ পেল।
সে মাথা নিচু করে নিমজ্জিত স্বরে বলল,
- বাঈজীদের মন বলে কিছু থাকে না, হুজুর। আমাদের জন্মই হয় অন্যের মনোরঞ্জনের জন্য।
তাইমুর কিছু একটা আঁচ করতে পারলেন। তিনি দ্রুত প্রসঙ্গ পরিবর্তন করে বললেন,
- মাহফিলে গাওয়া আপনার সেই গীত আরও একবার শুনতে চাই, হেমাঙ্গিনী সাহেবা!
- অবশ্যই, হুজুর!
আহারের ফাঁকে ফাঁকে আলোচনার মধ্য দিয়ে তারা একে অপরের প্রতি সম্মান ও মুগ্ধতা প্রকাশ করে চললেন।
মধ্যাহ্নভোজ শেষ হলো রাবড়ি এবং পেস্তা ছড়ানো রসমালাই এর মাধ্যমে।
তাদের মাঝে আলাপচারিতা বহাল ছিল আরও কিছুক্ষণ। মৃদু হাসি, পানপাত্রের টুংটাং শব্দে মাখামাখি হয়ে ছিল কক্ষটি। সহসা সব আলোচনা, সব হাসির গুঞ্জন যেন থমকে গেল এক অদম্য আকাঙ্ক্ষার নীরব ইংগিতে।
জমিদারপুত্র নবাব তাইমুর গজনবী আর নিজেকে সংযত রাখতে পারলেন না। তিনি হেমাঙ্গিনীকে কোমলভাবে আদেশ করলেন,
- বাঈজী সাহেবা, আসুন। আমার পালঙ্কে এসে বসুন।
মন্ত্রমুগ্ধ হরিণীর মতো হেমাঙ্গিনী এগিয়ে গেল তাইমুরের পালঙ্কের পানে। পুরো শরীর কাঁপছে তার। সে গিয়ে বসল জমিদারপুত্রর পাশে। পালঙ্কের কোমলতা স্পর্শ করল তার সুগঠিত কোমড়। গল্পের লেখিকা আতিয়া আদিবার পেজে সকল পর্ব আগে দেওয়া হয়। পেইজ সার্চ করুন ‘ Atia Adiba – আতিয়া আদিবা’।
তাইমুর গজনবী অতি সন্তর্পণে ডান হাতের দুটি আঙুলে হেমাঙ্গিনীর চিবুকটি আলতো করে ধরলেন। তার মুখমণ্ডল উঁচিয়ে নিজের কাছে সামান্য টেনে আনল তাইমুর।
দুজন দুজনের নিশ্বাসের উষ্ণতা অনুভব করতে লাগল।
- গান করুন, বাঈজী সাহেবা! এই নীরবতা যে আমার সহ্য হচ্ছে না। বড় চঞ্চল করে তুলছে মনকে। আপনার কোকিল কণ্ঠের মাদকতায় ডুবে যাইতে চাইছে এ হৃদয়।
তাইমুরের স্বরে একই সাথে আদেশ এবং মিনতির মিশ্রণ পরিলক্ষিত হল।
তাইমুরের স্পর্শে হেমাঙ্গিনীর সমস্ত শরীর ঝাঁকুনি দিয়ে উঠল। সে চোখ বন্ধ করে ফেলল দ্রুত। তার কণ্ঠে শোভা পেল বিষাদযুক্ত সুর! হেমাঙ্গিনীর হৃদয়ের সকল গোপন কথা, সকল অব্যক্ত বেদনা যেন ঠিকরে বেরিয়ে আসছিল কণ্ঠনালী চিরে।
নবাব তাইমুর গজনবী মন্ত্রমুগ্ধের মতো শুনছিলেন হেমাঙ্গিনীর প্রতিটি তান। প্রতিটি মীড় তার শিরায় শিরায় ছড়িয়ে দিচ্ছিল নেশা। গানের আবেশ যখন ইতির শিখরে পৌঁছাল, তাইমুর তখন নিজের ওষ্ঠজোড়া হেমাঙ্গিনীর লাল টুকটুকে গোলাপের ন্যায় কোমল ঠোঁটদ্বয়ের মাঝে আনতে লাগলেন ক্রমশ। তাদের মাঝের দূরত্ব মুছে যেতে লাগল। তাদের নিশ্বাসের দ্রুততা বৃদ্ধি পেল আরোও।
পরের পর্ব আগামীকাল রাত ৭ টায় পড়তে চাইলে লাইক এবং কমেন্ট করবেন এই পর্বে। পেইজে ফলো দিয়ে রাখবেন।
[ চলবে….]
উপন্যাস: #নিষিদ্ধ_রংমহল
লেখনীতে, Atia Adiba – আতিয়া আদিবা
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, নিষিদ্ধ রংমহল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৮
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৩
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৪
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১২
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৬