নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀
পর্ব_৩৩
নদীর বক্ষ আজ বড় শান্ত। সে যেন কোনো মৌন তপশ্চারিণী, মগ্ন তার নিভৃত সাধনায়। ছোট্ট চরের বালুকারাশিতে আছড়ে পড়া জলের মৃদু কুলকুল ধ্বনি আর বাতাসের মন্থর দীর্ঘশ্বাসে ঝিরঝির করে দুলে ওঠা হিজল গাছের পাতা, সব মিলিয়ে এক অপার্থিব নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে চারিপাশে।
নৌকার সেই ক্ষুদ্র ছাউনির ভেতরে আজ আর গজনবী বংশের জমিদারপুত্র কিংবা বাইজী নেই। সেখানে আজ বিরাজমান দুটি রূহ। দুটি দেহ। যারা জন্ম-জন্মান্তরের বন্ধনে আবদ্ধ হয়ে একে অপরের মুখপানে এক দৃষ্টিতে চেয়ে আছে। শত অনিশ্চয়তার মাঝেও খুঁজে পেয়েছে এক মুঠো সুখ।
আবছা অন্ধকারে নৌকার ঠিক কিণারায় একটি কাচের লণ্ঠন দুপদুপ করে জ্বলছে। সেই ক্ষীণ আলোয় হেমাঙ্গিনীর মুখাবয়ব আজ কোনো মর্ত্যের মানবীর ন্যায় ঠেকছে না। বরং সে যেন কোনো মন্দিরের দেবীপ্রতিমার ন্যায় উদ্ভাসিত।
তাইমুর গজনবী অতি সংগোপনে হেমাঙ্গিনীর চিবুক স্পর্শ করে মুখটি সামান্য উঁচু করলেন। হেমাঙ্গিনীর আয়ত নেত্রে আজও লজ্জা খেলা করছে। তবে সে লজ্জার আড়ালে রয়েছে নবাব তাইমুর গজনবী-কে সম্পূর্ণ রূপে নিজের করে পাবার আকাঙ্ক্ষা।
তাইমুর গভীর মন্দ্রস্বরে বললেন,
- বেগম সাহেবা, এই জীর্ণ নৌকাতেই হবে আমাদের বাসর। আমি আপনাকে কোনো রেশমি কাপড়, স্বর্ণালঙ্কার উপহার দিতে পারিনি। দিতে পারিনি আরামদায়ক শয্যা। গজনবী মহলের সেই মূল্যবান সম্পদের ওপর আজ আমার কোনো হাত নেই। তবে তার জন্য বিশেষ কোনো আক্ষেপও নেই।
কথা দিচ্ছি, এই বলিষ্ঠ বাহুডোর আপনাকে পৃথিবীর সমস্ত ঝড়-ঝঞ্ঝা থেকে রক্ষা করবে সর্বদা। কবুল বলার সেই পবিত্র মুহূর্তটি থেকে আপনি কেবল আমার হৃদয়ের রানী নন, আপনি আমার অস্তিত্বের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। আমার জান-এ-মন, আমার হুর-এ-মন, আমার প্রাণেশ্বরী!
হেমাঙ্গিনী কোনো উত্তর দিতে পারল না। সে কেবল তার কম্পিত হাত দুটি তাইমুরের প্রশস্ত বক্ষের ওপর আলগোছে রাখল। তাইমুরের হৃদস্পন্দন আজ এক অবাধ্য অশ্বের ন্যায় দ্রুতগামী। ধুকপুক ধুকপুক ক্রমশ বাড়ছে!
তাইমুর অতি ধীরলয়ে হেমাঙ্গিনীর সিক্ত কেশগুচ্ছ সরিয়ে তার কপালে এক দীর্ঘ চুম্বন এঁকে দিলেন।
হেমাঙ্গিনী চোখজোড়া বন্ধ করে অস্ফুট স্বরে বলল,
- ভেবেছিলাম নূপুরের ঝংকার আর মাহফিলের বাদ্যযন্ত্রের সেই কৃত্রিম সুরই ছিল আমার নিয়তি। কিন্তু আজ আপনার এই তপ্ত নিশ্বাসের শব্দ আমার কানে পৃথিবীর সমস্ত বাজনার চেয়েও হাজার গুণ বেশি শ্রুতিমধুর ঠেকছে। আপনার বৈধ অর্ধাঙ্গিনী হওয়ার গৌরব আমার জীবনের সমস্ত গ্লানি মুছে সাফ করে দিয়েছে, হুজুর। আমি আপনার নিকট নিজের সবটুকু বিসর্জন দিয়ে নিঃস্ব হতে চাই!
বেগমের কথাগুলো তাইমুরের রক্তে যেন আগুনের স্রোত বইয়ে দিল। তিনি গাঢ় কণ্ঠে বললেন,
- তবে আজ এই নিস্তব্ধতাই হোক আমাদের একান্ত বাদ্য। জান-ই-মন, আমি আপনার দেহ, মন, আপনার অস্তিত্বের প্রতিটি কণা আজ নিজের মাঝে শুষে নেব। দুনিয়ার কোনো শক্তি আমাদের প্রণয়ের মাঝে প্রাচীর হয়ে না দাঁড়াতে পারবে না।
নবাব তাইমুর গজনবী আর নিজেকে সংবরণ করতে পারলেন না। তিনি হেমাঙ্গিনীকে আলগোছে শীতলপাটির শয্যায় শায়িত করলেন। নৌকার মৃদু দুলুনির সাথে সাথে তাঁদের দুটি আত্মা আজ এক মোহনায় মিশে যাওয়ার জন্য ব্যাকুল হয়ে উঠল।
তাইমুর হেমাঙ্গিনীর ওষ্ঠাধরে নিজের তৃষ্ণার্ত ঠোঁট ডুবিয়ে দিলেন। মুহুর্তেই উত্তাপ ছড়িয়ে গেলো। নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে তাকে খামচে ধরল হেমাঙ্গিনী। উন্মাদের মত নব বিবাহিত স্ত্রীকে আদরে আদরে ভরিয়ে দিতে লাগল সে।
ভোরের সেই লগ্নটি ছিল যেন কোনো কবির আঁকা জলরঙের ছবি। আসমানের বিশাল ক্যানভাস থেকে তখনো অন্ধকারের রেশ পুরোপুরি মুছে যায়নি। এককোণে ভোরের শুকতারাটি শেষবারের মতো প্রদীপ্ত শিখায় মিটমিট করে জ্বলছে।
নদীর বুক চিরে বয়ে আসা শিরশিরে হিমেল হাওয়ায় নৌকার জীর্ণ ছাউনির পর্দাগুলো পতপত করে দুলছে।
তাইমুর গজনবী ধীরে ধীরে চোখ মেললেন। তাঁর বলিষ্ঠ বাহুডোরে আবদ্ধ হয়ে হেমাঙ্গিনী তখনো এক গভীর, প্রশান্ত ঘুমের সাগরে নিমজ্জিত। ভোরের এই নীলাভ আলোয় হেমাঙ্গিনীর অপূর্ব মুখচ্ছবি আজ বড্ড পবিত্র দেখাচ্ছে। তাইমুর আলতো করে শরীরের ওপর থেকে চাদরটি সরালেন। অনাবৃত হয়ে গেল হেমাঙ্গিনীর কাঁধ, গলা আর বুকের ভাঁজ! আবছা আলোতেও সেই স্থানগুলোতে ফুটে থাকা লালচে দাগগুলো যেন গত রাতের সেই উন্মত্ত অনুরাগের সাক্ষ্য দিচ্ছিল।
হেমাঙ্গিনীর আলুলায়িত কেশরাশি শক্ত বালিশের চারপাশ জুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে। এ যেন এক কৃষ্ণবর্ণ অরণ্য। তাইমুর অতি সন্তর্পণে, অত্যন্ত মমতায় তাঁর আঙুল দিয়ে সেই কেশগুচ্ছ সরিয়ে হেমাঙ্গিনীর ললাটে এক দীর্ঘ ও সিক্ত স্নেহের পরশ এঁকে দিলেন। হেমাঙ্গিনী ঘুমের ঘোরেই একটু নড়েচড়ে উঠল। তাইমুরকে আরও নিবিড়ভাবে আঁকড়ে ধরল। যেন অবচেতনেও সে এই আশ্রয়ের উত্তাপটুকু হারাতে চায় না। তাইমুর এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।
এরপর অতি সাবধানে নিজেকে মুক্ত করে তিনি পোশাক পরে নিলেন। ছাউনির বাইরে বেরিয়ে এলেন।
ক্ষণিককাল পর সে বৃদ্ধ মাঝি ফিরে এল। তাইমুর তাকে ইশারায় কাছে ডাকলেন। হাতের শেষ স্বর্ণমুদ্রাগুলোর মধ্য থেকে আরও দুটি বের করে মাঝির হাতে দিলেন। মাঝির চক্ষু চড়কগাছ! সে বিড়বিড় করে বলল,
- হুজুর, এ তো অনেক টাকা!
তাইমুর গম্ভীর স্বরে বললেন,
- মাঝি, আমাদের এখান থেকে অনেক দূরে নিয়ে চলো। যেখানে আমাদের পরিচয় কেউ জানতে চাইবে না। আমাদের নিয়ে কারো আগ্রহ থাকবে না।
মাঝি মাথা নিচু করে বলল,
- বুঝেছি হুজুর। হিমলতলী নামে একটা গ্রাম আছে। নদী পার হয়ে অনেকটুকু পথ হাঁটতে হবে। তবে সেখানে লোকজনের আনাগোনা কম। আর জমিদারি প্রভাবও নেই। ফিরিঙ্গি কুঠিয়ালদের ছায়া এখনো সেখানে তেমন পৌঁছায়নি।
- আমার কোনো আপত্তি নেই। নিয়ে চলো, মাঝি।
নৌকা চলতে শুরু করল। বেলা বাড়ার সাথে সাথে তীরের দৃশ্য পাল্টাতে লাগল। হেমাঙ্গিনী জেগে উঠে দেখল তারা নতুন এক গন্তব্যের দিকে এগিয়ে চলছে।
ঘাটে নৌকা ভিড়ানোর ঠিক আগে তাইমুর মাঝিকে বললেন কিছু সাধারণ পোশাকের বন্দোবস্ত করতে। মাঝি একটি গঞ্জ থেকে মোটা সুতির দু’খানা শাড়ি আর তাইমুরের জন্য সাধারণ ধুতি ও চাদর নিয়ে এল।
তাইমুর তাঁর সেই রত্নখচিত আচকান আর রাজকীয় পাদুকাগুলো একটি পুঁটলিতে ভরে নদীতে ফেলে দিলেন।
হেমাঙ্গিনী তার জাঁকজমকপূর্ণ বাঈজী পোশাক ছেড়ে সাধারণ এক গেঁয়ো বধূর সাজে নিজেকে সাজিয়ে নিল। মাথায় টেনে দিল চওড়া ঘোমটা।
ঘাটে নামার সময় তাইমুর হেমাঙ্গিনীর হাত ধরে বললেন,
- আমার হুর-এ-মন, আজ থেকে আমি আর কোনো সম্ভ্রান্ত ঘরের সন্তান নই। কোনো জমিদারপুত্র নই। আজ থেকে আমি কেবলই একজন সাধারণ মানুষ। যে নিজের স্ত্রীর মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার জন্য লড়বে। আপনি পারবেন তো এই জীবন সইতে?
হেমাঙ্গিনী ম্লান হাসল। বলল,
- হুজুর, ঐশ্বর্য তো অনেক দেখেছি। এবার না হয় ভালোবাসার এই রূঢ় রূপটুকুও দেখে নিই।
( পরবর্তী পর্ব আগামীকাল সন্ধ্যা ৭ টায় পড়তে ৩০০০ লাইক আর ৫০০ কমেন্ট সম্পন্ন করে দিবেন ❤️)
চলবে…
লেখনীতে, আতিয়া আদিবা
Share On:
TAGS: আতিয়া আদিবা, নিষিদ্ধ রংমহল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩১
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৯
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৬
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ২৫
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ১৭
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩২(বাসর স্পেশাল❤️)
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩০
-
নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৮