Golpo romantic golpo নিষিদ্ধ রংমহল

নিষিদ্ধ রংমহল পর্ব ৩২(বাসর স্পেশাল❤️)


নিষিদ্ধ_রংমহল 🥀 (বাসর স্পেশাল❤️)

  • পর্ব ৩২
    আসমানের বুক চিরে শেষ বিকেলের বিষণ্ণ আলোটুকুও তখন প্রায় নিভে এসেছে। চারদিকে ছেয়ে এসেছে এক গাঢ় নিস্তব্ধতা। কেবল কাদার ওপর দিয়ে হাঁটার সপসপ শব্দ আর বৃষ্টির একটানা রিনিঝিনি ধ্বনি ছাড়া আর কোনো শব্দ শ্রবণগোচর হচ্ছে না। তাইমুর গজনবী এগিয়ে চলেছেন সুদীর্ঘ পদক্ষেপে, তাঁর হাতের মুঠোয় শক্ত করে পুরে রেখেছেন হেমাঙ্গিনীর কোমল হাত। সারাটা পথ কেউ কোনো কথা বলেনি।

তাইমুরের মুখমণ্ডল যেন আজ এক দুর্ভেদ্য পাষাণ প্রাচীর, যার অন্তরালে কী চলছে তা বোঝার সাধ্য হেমাঙ্গিনীর নেই। সে বারবার আড়চোখে তাইমুরের পানে তাকাচ্ছিল। তার মনে এক নিদারুণ সংশয় ঘোরাফেরা করছে। এই যে আভিজাত্য, সিংহাসন আর পরম স্নেহের পিতাকে বিসর্জন দিয়ে তাইমুর আজ পথের ধুলোয় নামলেন, এর জন্য কি তাঁর মনে কোনো অনুশোচনা দানা বাঁধছে? গজনবী বংশের সেই দোর্দণ্ডপ্রতাপ উত্তরাধিকারী কি তবে নিভৃতে নিজের এই আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের জন্য বিলাপ করছেন?

কিন্তু তাইমুরের চোখের মণি স্থির, সেখানে অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। বরং দেখা মিলছে এক লড়াকু মানুষের অবিচল সংকল্প। সেই নীরবতা হেমাঙ্গিনীকে ভয় পাইয়ে দিচ্ছিল, যেন এই নিস্তব্ধতার পরেই কোনো এক প্রলয়ংকরী ঝড় আছড়ে পড়বে তাদের জীবনে।

সন্ধ্যা গড়িয়ে যখন আঁধার আরও গাঢ় হলো, তখন তারা এসে পৌঁছাল এক পরিত্যক্ত লোকালয়ে। নদীর তীব্র ভাঙনে এই জনপদ আজ শ্রীহীন, জনশূন্য। তটরেখা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা এক জীর্ণ মাটির ঘর দেখে তাইমুর থামলেন। নদীর করাল গ্রাসে ঘরটির একাংশ ইতিপূর্বেই বিলীন হয়ে গেছে। বাকিটুকু দাঁড়িয়ে আছে এক বিষণ্ণ কঙ্কালের ন্যায়। ভাঙনকবলিত এই ভিটে ছেড়ে মানুষ অনেক আগেই অজানার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমিয়েছে।
তাইমুর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন,

  • আজকের রজনীতে এই জীর্ণ আস্তানাটুকুই আমাদের রাজপ্রাসাদ, বাঈজী সাহেবা।
    দেখুন, এই ভঙ্গুর ঘর যেন আমাদের প্রতিচ্ছবি।
    নদী তার সর্বস্ব কেড়ে নিয়েছে। ঠিক যেমন এই সমাজ আমাদের পরিচয় কেড়ে নিয়েছে। আসুন, ভেতরে আসুন।

ঘরের ভেতরে মেঝের ওপর ধুলোবালি আর শুকনো পাতার আস্তরণ। ওপরে খড়ের চালের অনেকটা অংশই ভাঙা। বৃষ্টির জল চুঁইয়ে চুঁইয়ে ভেতরে পড়ছে। নদীর ওপর থেকে ভেসে আসা তীব্র হিমেল বাতাস শরীরে আছড়ে পড়ছিল। হেমাঙ্গিনী তার সিক্ত বসনে থরথর করে কাঁপছিল।
ঠান্ডার এই তীব্রতা যেন তার হাড়ের ভেতরে গিয়ে বিঁধছিল। অন্ধকার ঘরটিতে আলোর কোনো সংস্থান নেই, কেবল আকাশের বিদ্যুতের ঝিলিক মাঝে মাঝে ঘরটিকে ভৌতিক আলোয় উদ্ভাসিত করে তুলছে।
ঘরের এক কোণে বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে তারা দুজনে ঘুপটি মেরে বসল। নিজের আরামদায়ক মসনদ ছেড়ে এই প্রথম মাটিতে বসলেন জমিদারপুত্র।

রাত গভীর হল। তীব্রতা বাড়ল ঠান্ডার। হেমাঙ্গিনীর কম্পন যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে গেল, তখন তাইমুর তাকে নিজের বলিষ্ঠ বক্ষের অত্যন্ত কাছে টেনে নিলেন। তাঁর সেই রাজকীয় আচকানটি আজ ধুলো আর কাদার প্রলেপে ম্লান, তবে তাঁর শরীরের সেই চিরচেনা উত্তাপটুকু এখনো অমলিন। হেমাঙ্গিনী তাইমুরের প্রশস্ত বুকে মুখ লুকিয়ে শীত লাঘবের ব্যর্থ চেষ্টা করতে লাগল।

রাত্রির সেই সুগভীর নিস্তব্ধতায়, নদীর কলকল ধ্বনি আর বৃষ্টির অঝোর ধারার মাঝে দুটো শরীর আজ বড্ড বেশি কাছাকাছি চলে এল। আভিজাত্যের বর্ম আজ নেই, নেই কোনো সামাজিক মর্যাদার প্রাচীর। তাইমুর অনুভব করলেন হেমাঙ্গিনীর তপ্ত নিশ্বাস তাঁর গলার কাছে আছড়ে পড়ছে। কামাতুর শিহরণ নয়, বরং এক আদিম ও গভীর অনুরাগে তাইমুর হেমাঙ্গিনীর চিবুক স্পর্শ করে মুখটি সামান্য উঁচু করলেন।

হেমাঙ্গিনীর সিক্ত কেশ আর অশ্রুভেজা চোখের মায়ায় তিনি পুনরায় পথ হারালেন। পথিক হলেন কামনার। তাইমুর অতি ধীরলয়ে হেমাঙ্গিনীর কম্পিত ওষ্ঠাধরে নিজের ঠোঁটজোড়া ডুবিয়ে দিলেন। সে ছিল এক সুদীর্ঘ গভীর চুম্বন। সেই ছোঁয়াতে ছিল না কোনো মোহিনী বাঈজীর প্রতি লালসা, ছিল কেবল এক প্রিয়তমার প্রতি হৃদয়ের সমস্ত নিংড়ানো আর্তি।
হেমাঙ্গিনীও যেন আজ এই ক্ষণটির প্রতীক্ষায় ছিল। সে তার সমস্ত সত্তা দিয়ে তাইমুরের রাজকীয় সান্নিধ্যকে আঁকড়ে ধরল। চারপাশের জীর্ণ কুটির আর ভাঙা চাল তখন যেন এক অপার্থিব স্বর্গে পরিণত হলো।

কিন্তু হঠাৎ করেই তাইমুর নিজেকে এক ঝটকায় সরিয়ে নিলেন। তাঁর নিশ্বাস তখনও দ্রুত, কপালে জমে আছে বিন্দু বিন্দু ঘাম। হেমাঙ্গিনী বিস্ময়বিস্ফোরিত নেত্রে তাঁর দিকে চেয়ে রইল। তার দুচোখে রাজ্যের প্রশ্ন! কেন এই আকস্মিক যতি?

তাইমুর হেমাঙ্গিনীর মুখাবয়ব নিজের দুই হাতের তালুতে নিলেন। তাঁর কণ্ঠস্বর তখন আবেগঘন অথচ অত্যন্ত গম্ভীর। তিনি বললেন,

  • মাফ করবেন, বাঈজী সাহেবা। আমার শিরায় গজনবী বংশের রক্ত বইলেও আমি কামনার বশবর্তী হয়ে আপনাকে পেতে চাই না। আমি চাই না এই জীর্ণ কুটিরে আমাদের ভালোবাসার অমর্যাদা হোক। আজ আমরা আশ্রয়হীন হতে পারি, তবে আমাদের সম্মান এখনো ধুলোয় মিশে যায়নি।

হেমাঙ্গিনী স্তব্ধ হয়ে শুনছিল। তাইমুর পুনরায় বললেন,

  • আমি আপনাকে স্ত্রীর পূর্ণ মর্যাদা দিয়ে তবেই স্বামীর অধিকার আদায় করব। কাল ভোরে যখন সূর্য উঠবে, তখন খোদার ঘরে গিয়ে আমরা পবিত্র বন্ধনে আবদ্ধ হব। হেমাঙ্গিনী কেবলমাত্র একজন বাঈজীর নাম হবে না, সে হবে তাইমুর গজনবীর বৈধ স্ত্রী। সেই অধিকারের পরে আমাদের এই ভালোবাসা হবে ইবাদতের ন্যায় পবিত্র। আজকের রাতটুকু না হয় শুধু একে অপরের হৃৎস্পন্দন শুনে প্রহর কাটাই?

হেমাঙ্গিনী কোনো উত্তর দিতে পারল না। তার দুচোখ বেয়ে আবারও লোনা জল গড়িয়ে পড়তে লাগল। পরম প্রাপ্তির লোনাজল।

রাত্রির তৃতীয় প্রহর যখন অতিক্রান্ত, তখন আকাশের সেই উন্মত্ত মেঘের গর্জন আর ঝোড়ো বৃষ্টির বেগ কিছুটা স্তিমিত হয়ে এল। প্রকৃতির সেই রুদ্ররোষ যেন এক নিদারুণ ক্লান্তিতে অবসন্ন হয়ে থিতু হল। নদীর দিক থেকে আসা সেই তীব্র বাতাসের ঝাপটা আর সেই ভাঙনকবলিত মাটির ঘরের ভ্যাপসা ও স্যাঁতসেঁতে ঘ্রাণ মিলিয়ে যেতে লাগল ক্রমশ।
তাইমুর গজনবীর বলিষ্ঠ বাহুডোরে আবদ্ধ থেকে হেমাঙ্গিনী এক অদ্ভুত, অনাস্বাদিত প্রশান্তির ঘুমে আচ্ছন্ন ছিল।

ভোরের প্রথম আলোকচ্ছটা যখন ধূসর মেঘের আস্তরণ চিরে নদীর ওপাড়ে উঁকি দিল, তখন ধরণীর বুকে মলিন তামাটে আলো ছড়িয়ে পড়ল। তাইমুর ঘুমন্ত হেমাঙ্গিনীর পানে চেয়ে মুচকি হাসলেন। এরপর অতি সন্তর্পণে তাকে জাগিয়ে তুললেন। তিনি গভীর কণ্ঠস্বরে বললেন,

  • উঠুন বাঈজী সাহেবা, অন্ধকার বিদায় নিয়েছে। আমাদের গন্তব্য এখনো বহু দূরে, আর পথও বড় কণ্টকাকীর্ণ। দিনের আলো পরিপূর্ণভাবে ফোটার আগেই আমাদের লোকচক্ষুর আড়ালে যেতে হবে।

হেমাঙ্গিনী ঘুম ঘুম চোখে উঠে বসল। দেখল জমিদারপুত্র তার পানে এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন। লজ্জায় গুটিয়ে যেতে লাগল হেমাঙ্গিনী।
টুকটুকে লাল মুখখানা দেখতে বেশ লাগছিল তাইমুরের। তবে হাতে সময় কম থাকার ফলে তাগাদা দিলেন তিনি।

নদীর তীরের সেই জীর্ণ ও কর্দমাক্ত মেঠো পথ ধরে তাঁরা হাঁটতে শুরু করলেন। গজনবী এস্টেটের শেষ সীমানা তারা ফেলে এসেছে। সামনের বিস্তৃত এলাকা জুড়ে নীলকরদের নীল বিষের কালো মেঘ পুঞ্জীভূত। মাইলের পর মাইল ফসলি জমি আজ ধানের চিরচেনা সুগন্ধ হারিয়ে ব্রিটিশদের নীল দাদনের শৃঙ্খলে বন্দি। এমন অন্ধকার ও শোষণের ক্রান্তিকালে এক দোর্দণ্ডপ্রতাপ জমিদারপুত্রের এমন নিরাসক্ত বিসর্জন আর এক বাঈজীর প্রতি এমন শুদ্ধ অনুরাগ যেন কোনো এক বিস্ময়ে ঘেরা রূপকথা!

হাঁটতে হাঁটতে তাঁরা এসে পৌঁছালেন একটি প্রাচীন মোগল স্থাপত্যের জীর্ণ ক্ষুদ্র মসজিদের নিকটে। এ মসজিদটি যেন কালের সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে!
চুনকামের পলেস্তারা খসে পড়ছে। দেয়ালে শেওলার গাঢ় আস্তরণ। কিন্তু সেই মোঘল আমলের গাম্ভীর্য আজোও দৃশ্যমান।

মসজিদের পুকুরঘাটে তাইমুর ও হেমাঙ্গিনী ওযু সেরে নিলেন। হেমাঙ্গিনীর পরনের সেই মহার্ঘ্য সিক্ত বসন শুকিয়ে এখন কিছুটা খসখসে ও রুক্ষ হয়ে গেছে। তবে তার মুখাবয়বে আজ এক অপার্থিব লাবণ্য। এক বৈধ পরিচয় পাবার তীব্র আকাঙ্ক্ষা তার নয়নকোণে ভাস্বর।

মসজিদের বৃদ্ধ ইমাম সাহেব তখন ফজর শেষ করে একাগ্রচিত্তে তসবিহ পাঠ করছিলেন। তার পাশে বসে ছিলেন আরও দুজন গ্রামবাসী। এক বৃদ্ধ কৃষক আর এক তরুণ মুসাফির। তারাও সম্ভবত বৃষ্টির তোড়ে এই মসজিদে আশ্রয় নিয়েছিলেন।

দুজন ধুলোমাখা আগন্তুককে দেখে কিঞ্চিৎ বিস্ময় ও কৌতূহল নিয়ে চাইলেন তারা। তাইমুরের কর্দমাক্ত আচকান আর রাজকীয় পাদুকার বিন্যাস দেখেই প্রাজ্ঞ ইমাম সাহেব বুঝতে পারলেন, এ কোনো সাধারণ ছিন্নমূল পথিক নয়।
তাইমুর বিনীত মস্তকে ইমাম সাহেবের সম্মুখে দণ্ডায়মান হয়ে দৃঢ় অথচ মন্দ্রস্বরে বললেন,

  • হুজুর, আমরা আজ খোদাতায়ালার পবিত্র দরবারে উপস্থিত হয়েছি এক অলঙ্ঘনীয় বন্ধনের সন্ধানে। সমাজ আমাদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। আভিজাত্য আমাদের বিচ্যুত করেছে। কিন্তু আমরা চাই শরিয়ত মোতাবেক নিকাহ্ বন্ধনে আবদ্ধ হতে। আপনি কি মেহেরবানি করে আমাদের এই আরজি কবুল করবেন?

ইমাম মৃদু হাসলেন। তাঁর শ্বেতশুভ্র দাড়িতে ভোরের আলো ঝিলিক দিয়ে উঠল। তিনি বললেন,

  • পুত্র, আল্লাহর ঘরে সবারই অবারিত আশ্রয়। প্রেম যদি রিপুমুক্ত ও পবিত্র হয়, তবে খোদাতায়ালা স্বয়ং তাতে রহমত বর্ষণ করেন। কিন্তু আপনার সাথে তো কোনো সাক্ষী নেই, নেই কোনো দেনমোহরের সংস্থান! তবে?

তাইমুর ধীরগতিতে তাঁর আঙুল থেকে একটি দুষ্প্রাপ্য নীলকান্তমণি খচিত স্বর্ণাঙ্গুরি খুলে ইমাম সাহেবের সম্মুখে স্থাপন করলেন। এটিই ছিল গজনবী বংশের ঐতিহ্যের অন্যতম তিলক। তিনি নিচু স্বরে বললেন,

  • হুজুর, এই আংটিই আমার স্ত্রীর মোহরানা। আমি আমার বর্তমান সামর্থ্যের শ্রেষ্ঠটুকু দিয়ে এই নারীকে গ্রহণ করছি। আর সাক্ষী? এই মসজিদের প্রাচীন দেয়াল আর ওপরের এই অনন্ত আকাশই না হয় আমাদের এই পবিত্র মিলনের সাক্ষী হয়ে থাকবে? দয়া করুন হুজুর।

ইমামের পাশে থাকা সেই বৃদ্ধ কৃষক আর তরুণ মুসাফির তাইমুরের আকুতিতে মোমের ন্যায় গলে গেলেন। তারা স্বতঃস্ফূর্তভাবে রাজি হলেন বিবাহের সাক্ষী হতে। কৃষকটি ম্লান হেসে বললেন,

  • হুজুর, আমরা যদি এক জোড়া আশ্রিত প্রাণের সাক্ষী হয়ে তাদের জীবনে নূর ফিরিয়ে আনতে পারি, তবে এর চেয়ে সওয়াবের কাজ আর কী হতে পারে? আমরা সানন্দে সাক্ষী থাকব।

নিস্তব্ধ মসজিদের ভেতরে খুৎবা পাঠ করা হলো। সাক্ষীদের উপস্থিতিতে, আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে কবুল বলার মধ্য দিয়ে বাঈজী হেমাঙ্গিনী আজ থেকে রূপান্তরিত হলো ‘হেমাঙ্গিনী বেগম’ এ। সেই সাক্ষী দুজন অত্যন্ত ভক্তিভরে তাদের জন্য দোয়া করলেন।

মসজিদের সেই নির্জন কোণে বসে হেমাঙ্গিনী নতজানু হয়ে তাইমুরের পায়ে হাত দিয়ে সালাম করল। তার গাল বেয়ে কয়েক ফোঁটা তপ্ত অশ্রু ঝরে পড়ল। সে এখন জমিদারপুত্র নবাব তাইমুর গজনবীএ স্ত্রী, একচ্ছত্র অধিকারী! এক বাঈজীর অভিশপ্ত জীবনে এর চেয়ে বড় রাজত্ব আর কী-ই বা হতে পারে?

নিকাহ্ শেষে তাঁরা নদীর ঘাটে এসে একটি বড় ছাউনি নৌকা দেখতে পেলেন। ঘাটে সারি সারি নৌকা বাঁধা থাকলেও নীলকুঠির ফিরিঙ্গি সাহেবদের ভয়ে মাঝিরা সর্বদা তটস্থ। তাইমুর হাঁক দিলেন। এক বৃদ্ধ মাঝি তার বিশাল পানসি নৌকা নিয়ে এগিয়ে এল। তাইমুর নৌকার মাঝির চোখের দিকে তাকিয়ে এক বিশেষ দৃঢ়তায় বললেন,

  • মাঝি, আমাদের কি কোলাহলবিহীন, নির্জন মাঝনদীতে নিয়ে যেতে পারবে? গন্তব্য অনিশ্চিত। তবে আজ রাতের জন্য তোমার নৌকাটা আমার চাই।

মাঝি প্রথমে ইতস্তত করছিল। সে বিড়বিড় করে বলল,

  • সাহেব, নীলকুঠির পেয়াদারা নদীতে টহল দিচ্ছে। কোনো অপরিচিত আরোহী দেখলে তারা রক্ষে রাখবে না।

তাইমুর আচকানের ফাঁক থেকে একটি স্বর্ণমুদ্রা বের করে মাঝির হাতে দিলেন। স্বর্ণের সেই ঝলকানি আর তাইমুরের রাজকীয় কণ্ঠস্বর মাঝিকে মুহুর্তেই পরাস্ত করল। সে মাথা নিচু করে বলল,

  • উঠুন হুজুর। যা হবে পরে দেখা যাবে ক্ষণ!

নদীর বিশাল বুক চিরে একজোড়া নৌকার মন্থর যাত্রা শুরু হলো। বিকেলের রক্তিম সূর্য তখন বিদায় নেবার জন্য প্রস্তুত। মাঝি তখন ছাউনির চতুর্দিক অতি সাধারণ কাপড় দিয়ে থেকে ঢেকে দিল। একটি ছোট কামড়ার ন্যায় তৈরি হল। রাত কাটানোর জন্য মোটামুটি একটি বন্দোবস্ত।

যখন গোধূলির আলো মুছে গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত হলো চারিপাশ, তখন মাঝি বড় নৌকাটিকে এক নির্জন চরের ছোট্ট মাটির কিনারায় নিয়ে এসে থামাল। তীরের এক হিজল গাছের গুঁড়িতে শক্ত করে কাছি বেঁধে দিয়ে প্রধান মাঝি তার সঙ্গীকে নিয়ে পেছনে বেঁধে রাখা ছোট ডিঙিটিতে চড়ে বসল। যাওয়ার আগে শুধু নির্লিপ্ত কণ্ঠে বলে গেল,

  • হুজুর, আমরা কাল ফজরের পর ফিরব। আপনারা নিশ্চিন্তে বিশ্রাম নিন।

​মাঝিরা অন্ধকার চিরে অন্য নৌকায় চড়ে মিলিয়ে গেল। আর সেই নির্জন চরের বুকে, ভাসমান নৌকার নিভৃত কামরায় রয়ে গেল তাইমুর ও হেমাঙ্গিনী।
নদীর মৃদু দুলুনির সাথে সাথে তাঁদের হৃদস্পন্দনও যেন এক অদ্ভুত তালে ধুকপুক করছিল।
​তাইমুর হেমাঙ্গিনীর অতি সন্নিকটে এসে উপবেশন করলেন। আজ আর কোনো সামাজিক বিড়ম্বনা নেই, নেই কোনো লোকলজ্জার অদৃশ্য প্রাচীর। তিনি অত্যন্ত কোমল স্পর্শে হেমাঙ্গিনীর ঘোমটা সরিয়ে তার মুখখানি উঁচিয়ে ধরলেন। আজ থেকে এই নারী কেবলমাত্র তার বৈধ অর্ধাঙ্গিনী। তাইমুর ফিসফিস করে নিভৃতে বললেন,

  • বেগম সাহেবা, আজ এই জীর্ণ নৌকাই আমাদের কাঙ্ক্ষিত মহল। আমি একজন ব্যর্থ জমিদারপুত্র। আপনাকে গজনবী মহলের ঐশ্বর্য দিতে পারিনি। তবে এই বিশাল নীলিমা আর গঙ্গার অবাধ রাজত্ব আজ আপনার চরণে সমর্পিত।

(পরবর্তী পর্ব আগামীকাল সন্ধ্যা ৭ টায় আসবে)

লেখনীতে, আতিয়া আদিবা

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply