নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৮৪ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
রৌদ্রের আর্তনাদে করিডোরের প্রতিটি কোণ যেন ব্যথায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। সে উন্মাদের মতো ডাক্তারের পা দুটো জাপটে ধরে ফ্লোরে লুটিয়ে পড়ল। তার দুচোখ দিয়ে প্লাবনের মতো জল ঝরছে আর গলার স্বর কান্নায় ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে বিলাপ করে বলতে লাগল।
“ডাক্তার আপনি জানেন না আপনি কী বলছেন। আল্লাহর দোহাই লাগে আপনার এমন ভয়ংকর কথা মুখে আনবেন না। আমার তুরাকে বাঁচান ডাক্তার। আপনি কি বুঝতে পারছেন না ও যদি চলে যায় তবে শুধু একটা প্রাণ যাবে না রৌদ্র নামের এই রক্ত-মাংসের মানুষটার অস্তিত্বও ওই ওটির ভেতরেই শেষ হয়ে যাবে। ও ছাড়া আমার পুরো জগত ঘোর অমাবস্যার মতো অন্ধকার ডাক্তার। ওরে ছাড়া আমি একটা মুহূর্তও নিঃশ্বাস নিতে পারব না আমার কলিজাটা ছিঁড়ে বের হয়ে আসবে।”
রৌদ্রের চোখের নোনা জলে ডাক্তারের পা ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছিল। সে হিক্কা তুলে বলতে লাগল।
“আমার বাচ্চার প্রয়োজন নেই ডাক্তার আমি এই পৃথিবীর কাছে আর কোনো সুখ চাই না। আপনি শুধু আমার স্ত্রীকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন। নাহলে আমি পাগল হয়ে যাব ডাক্তার আমি তিলে তিলে মরে যাব ওর বিরহে। ও শুধু আমার অর্ধাঙ্গিনী না ডাক্তার ও আমার অক্সিজেন। অক্সিজেন ছাড়া কি কোনো মানুষ বাঁচতে পারে। পারে না তাহলে আমি বাঁচবো কি করে। ডাক্তার আমার তুরাকে ফিরিয়ে দিন নয়তো তুরার সাথে আমাকেও ওই ভেতরে নিয়ে চিরতরের জন্য ঘুম পাড়িয়ে দিন। আমি ওর সাথে ওপারে গিয়ে শান্তিতে থাকব এই বিচ্ছেদ আমি সইতে পারব না ডাক্তার আপনি কি শুনতে পাচ্ছেন? ফিরিয়ে দিন আমার তুরাকে।”
পাথর-হৃদয় মানুষ ডাক্তার টাও রৌদ্রের এই হাহাকারে ডুকরে কেঁদে উঠল। ডাক্তার কোনো উত্তর দিতে পারলেন না কারণ বিজ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় তিনিও আজ বড় অসহায়। তিনি অঝোরে কাঁদতে কাঁদতে রৌদ্রের হাত থেকে নিজের পা ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত অপারেশন থিয়েটারের ভেতরে চলে গেলেন। রৌদ্র তখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। সেও উন্মাদের মতো ওটির দরজার দিকে চাইল যেন সে নিজেই যমরাজের হাত থেকে তুরাকে ছিনিয়ে আনবে। ঠিক তখনই শিহাব পেছন থেকে রৌদ্রকে শক্ত করে জাপটে ধরল। শিহাব রৌদ্রকে টেনে সরিয়ে আনতে আনতে চিৎকার করে বলল।
“রৌদ্র ভাই। ভাই আমার শান্ত হো। এভাবে নিজেকে শেষ করিস না। তুরার কিছু হবে না রে তুই আল্লাহকে ডাক।”
রৌদ্র তখন নিজের হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে শিহাবের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে ধস্তাধস্তি শুরু করল। সে দাঁতে দাঁত চেপে চোখ বড় বড় করে ওঠির দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল।
“ছেড়ে দে আমায় শিহাব। ছেড়ে দে বলছি। ভেতরে তুরা আমাকে একা ফেলে পালিয়ে যাওয়ার ফন্দি করছে আমি জানি ও আমায় ফাঁকি দিতে চাইছে। আমি ভেতরে যাব ওকে গিয়ে শাসিয়ে আসব। ও কোন সাহসে আমাকে ছাড়া ওপারে যাওয়ার স্বপ্ন দেখে? আর একবার যদি ও আমাকে ছেড়ে যাওয়ার কথা মুখে আনে তবে ওর ওই মায়াবী মুখটা আমি কেটে দেব। ছেড়ে দে আমায় আমাকে তুরার কাছে যেতে দে। ও আমায় ছেড়ে কোথাও যেতে পারবে না কিছুতেই না।”
রৌদ্রের উন্মাদনা কোনোভাবেই থামানো যাচ্ছিল না। শিহাবের সাথে নেহালও এসে এক পাশ থেকে রৌদ্রকে শক্ত করে ধরল। নেহাল রৌদ্রের বিধ্বস্ত মুখটা দুই হাতে আগলে ধরে কাতর স্বরে বলল।
“রৌদ্র ভাই দোহাই তোমার শান্ত হও। ভাবির কিছু হবে না তুমি দেখবে ভাবি ঠিক আমাদের মাঝে ফিরে আসবে। তুমি এভাবে ভেঙে পড়লে ভাবি ভেতরে শক্তি পাবে কোত্থেকে? তুমি শান্ত হও ভাই।”
ঠিক তখনই অপারেশন থিয়েটারের ভেতর থেকে তুরার এমন এক তীব্র যন্ত্রণাকাতর আর্তনাদ ভেসে এল যে করিডোরের বাতাস যেন বিষাদে ভারী হয়ে উঠল। সেই চিৎকার শুনে রৌদ্রের শরীর রী রী করে কেঁপে উঠল। সে ওটির বন্ধ দরজার দিকে শূন্য দৃষ্টিতে তাকিয়ে চিৎকার করে কাঁদতে কাঁদতে ডাক্তারের উদ্দেশ্যে বলতে লাগল।
“ডাক্তার। আমাকে ছাড়া ওকে শেষ করবেন না দোহাই লাগে আপনার। আমাকে ভেতরে নিন ওর সাথে আমাকেও শেষ করে দিন। ডাক্তার শুনতে পাচ্ছেন আমার কথা? আমাকে ভেতরে নিন। একা ওকে মৃত্যুর মুখে ফেলে দেবেন না ওর সাথে আমিও চলে যাব।”
রৌদ্রের পাগলামি তখন চরম সীমায়। সে হুট করে হাসপাতালের ছাদের দিকে মুখ তুলে নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি নিংড়ে দিয়ে আকাশ ফাটানো চিৎকার করে বলতে লাগল।
“ইয়া আল্লাহহহহহহহহহহহহ। শুনতে পাচ্ছেন আপনি এক অসহায় স্বামী আর পাগল প্রেমিকের আর্তনাদ? হে মাবুদ শুনতে পাচ্ছেন এক উন্মাদের হাহাকার? আকাশ-বাতাস নদী-নালা এই বিশাল পৃথিবী সবাই কি শুনতে পাচ্ছো আমার কলিজা ছেঁড়া আর্তনাদ? হে মাবুদ আপনি যে পরম দয়ালু আপনার কাছে তো অসম্ভব বলে কিছু নেই। তাহলে আমার তুরাকে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন আল্লাহ।”
রৌদ্রের বুকফাটা কান্নায় হাসপাতালের করিডোরে উপস্থিত প্রতিটি মানুষ নিথর হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। রৌদ্র দুই হাতে নিজের বুক খামচে ধরে বিলাপ করতে লাগল।
“আমার কলিজাটা পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে আল্লাহ। আমার তুরাকে ফিরিয়ে দিয়ে আমার এই দগ্ধ কলিজাটা একটু ঠান্ডা করে দেন। যদি ও ফিরে না আসে তবে আমাকেও এই মুহূর্তে তুলে নিন। আপনার দেওয়া এই প্রাণ আমি আপনার কাছেই ফিরিয়ে দিচ্ছি। আমাকেও নিয়ে নিন আল্লাহ আমরা পরপারে দুজন একসাথে থাকব। কিন্তু এই পৃথিবীতে ওকে ছাড়া আমি এক মুহূর্তও থাকতে পারব না। শুনতে পাচ্ছেন আপনি? আমার তুরাকে দয়া করে আমার কাছে ফিরিয়ে দিন।”
রৌদ্রের এই নিদারুণ হাহাকার যেন সাত আসমান ভেদ করে যাচ্ছে। তার প্রতিটি শব্দে এমন এক তীব্র যন্ত্রণা ছিল যা শুনে পাথরের হৃদয়ও আজ ডুকরে কেঁদে উঠল। রৌশনি খান ফ্লোরে বসে ছেলের এই ধ্বংস হওয়া দেখছিলেন আর আঁচলে মুখ ঢেকে কাঁদছিলেন। পুরো পরিবার যেন আজ এক অগ্নিকুণ্ডে দাঁড়িয়ে আছে। আরশি ভিড়ের ভেতর থেকে পাগলের মতো ছুটে এসে রৌদ্রকে জাপটে ধরল। নিজের ভাইয়ের এমন পৈশাচিক আর্তনাদ কোনো বোনের পক্ষে সহ্য করা সম্ভব নয়। আরশি রৌদ্রের বুকে মাথা রেখে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে বলল।
“ভাইয়া। দোহাই লাগে তোমার শান্ত হও। তুরার কিছু হবে না ভাইয়া। ও আসবে ও তোমার এই পাগলামি জানে তো ও তোমার জন্য ঠিক ফিরে আসবে। তুমি আল্লাহকে ডাকো ভাইয়া এভাবে নিজেকে শেষ করে দিও না।”
রৌদ্র তখন আরশির কোনো কথা শুনতে পাচ্ছিল না। তার দুচোখ অপারেশন থিয়েটারের ওই বন্ধ দরজায় আটকে আছে। সে তার জীবনের শেষ শক্তিটুকু দিয়ে ওটির দরজার দিকে তাকিয়ে চিৎকার করে বলতে লাগল।
“তুরা। ওরে আমার কলিজা তুই এইভাবে যাস না রে। তোর এই পাগলটা যে তোকে ছাড়া মরে যাবে। তুই তো জানিস তোর এই রৌদ্র কতটা উম্মাদ তোর জন্য। তুই ছাড়া ওর অস্তিত্ব যে শূন্য। ফিরে আয় তুরা আমার বাচ্চার প্রয়োজন নেই আর কখনো বলবো না আমি বাবা হতে চাই আর কখনো তোর কাছে আবদার করবো না। আমার জীবনের সবটুকু সুখ সবটুকু নিশ্বাস যে তোর ওই প্রাণের ভেতরে আটকে আছে পাগলি। সেই প্রাণটা চলে গেলে তোর এই রৌদ্রও নিভে যাবে রে।”
রৌদ্রের গলার স্বর কান্নায় বুজে আসছিল সে হিক্কা তুলে বুক খামচে ধরে বিলাপ করতে লাগল।
“ফিরে আয় তুরা। আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে রে… একটু শান্তি দে আমাকে। আমি যে আর সহ্য করতে পারছি না। আমার কলিজার ভেতর আগুন জ্বলছে তুরা তুই ছাড়া সেই আগুন নেভানোর পৃথিবীর কারও সাধ্য নাই। ফিরে আয় আমার পাখি একবার ফিরে আয়।”
রৌদ্রের এই নিদারুণ বিলাপ শুনে করিডোরের দেয়ালগুলোও যেন আজ হাহাকার করে উঠল। উপস্থিত সবাই দেখল একটা মানুষ তার ভালোবাসার জন্য কীভাবে জীবন্ত পুড়ে ছাই হয়ে যাচ্ছে। রৌদ্রের এই আর্তনাদ যেন হাসপাতালের করিডোর ছাড়িয়ে অসীম শূন্যতায় মিলিয়ে যাচ্ছে।
অপারেশন থিয়েটারের ভেতরটা তখন এক রণক্ষেত্র। বাইরে যখন রৌদ্রের আর্তনাদ আছড়ে পড়ছে করিডোরের দেয়ালে ঠিক তখন ভেতরে ডাক্তার তুরাকে নিয়ে জীবনের শেষ লড়াইটা লড়ছেন। ডাক্তার খুব ভালো করেই জানেন বর্তমান অবস্থায় সিজার করা মানেই মৃত্যুর হার ৯৫% নিশ্চিত। তাই তিনি শেষবারের মতো চেষ্টা করছেন যাতে তুরা নিজের ভেতর থেকে শেষবারের মতো সেই অসম্ভব শক্তিটুকু সঞ্চার করতে পারে।
তুরার শরীর নিস্তেজ হয়ে আসছে বারবার তার চোখের পাতা ভারী হয়ে বুজে আসছে। যন্ত্রণার চেয়েও বেশি এক গভীর অবসাদ তাকে গ্রাস করছে। ডাক্তার বারবার তুরার গালে আলতো থাপ্পড় দিয়ে চিৎকার করে বলছেন।
“মিসেস তুরা। দোহাই লাগে আপনার চোখ বুঝবেন না। একটু কষ্ট করেন মা আর সামান্য একটু। আপনি পারবেন আপনাকে পারতেই হবে। আপনি না আপনার সন্তানকে দেখতে চেয়েছিলেন? তাহলে এভাবে হাল ছাড়বেন না। আপনি যদি এখন নিজের শরীরের সবটুকু শক্তি দিয়ে শেষ চেষ্টা না করেন তবে আপনার সন্তানকে বাঁচানো আমাদের পক্ষে অসম্ভব হয়ে পড়বে।”
ঠিক তখনই বাহির থেকে রৌদ্রের সেই বুকফাটা হাহাকার ওটির দেয়াল ভেদ করে ভেতরে অস্পষ্টভাবে ভেসে এল। রৌদ্রের কান্নার শব্দ শুনে তুরার অবশ হয়ে আসা হাতটা সামান্য একটু কেঁপে উঠল। ডাক্তার সেটা খেয়াল করে আরও আকুতি নিয়ে বললেন।
“শুনতে পাচ্ছেন মিসেস তুরা? আপনার স্বামী আপনার জন্য বাইরে পাগলের মতো করছেন। ওই মানুষটার জন্য হলেও একটু জোর দিন। আপনার অনাগত সন্তান আর আপনার স্বামীর মায়ার দিকে তাকিয়ে শেষবারের মতো লড়াইটা করুন। আপনার স্বামী যে আপনাদের বাচ্চার মুখ দেখার জন্য অধীর হয়ে আছেন একটু সাহস সঞ্চয় করুন আপনি হাল ছাড়লে সব শেষ হয়ে যাবে।”
তুরার চোখের কোণ দিয়ে এক ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ল। সেই তপ্ত অশ্রু যেন নিভে যাওয়া আগুনের শেষ স্ফুলিঙ্গ। সে কি পারবে রৌদ্রের জন্য তার অনাগত সন্তানের জন্য মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে আসতে? নাকি নিয়তির নিষ্ঠুর হাত তাকে চিরতরে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে।
রানিং…!
আজকের পর্বটা ছোট হলো আসলে এই পর্বটাই অনেক কষ্টে লেখলাম ফোন হাতে নিলেই আম্মু বৌ বৌ করে ওঠে মানাই নিও তোমরা আর আমার মতো কে কে বৌ বৌ শুনো তারাই বুঝবা আমার কষ্টটা😫😫
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা গল্পের লিংক
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৭