নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৮৯ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
রৌদ্র রৌশানকে নিয়ে রুমে আসল। তুরা তখন রৌদ্রের শার্ট-প্যান্ট ভাঁজ করে আলমারিতে রাখছিল। রৌশান তুরাকে দেখেই এক দৌড়ে ওর কাছে গিয়ে এক লাফে কোলে উঠে পড়ল। সে বেশ উত্তেজিত হয়ে বলল।
“মাম্মা, জানো? পাপ্পা আজকে ফুপার কাছে ঠকেছে।”
তুরা রৌশানকে ভালো করে কোলে নিয়ে অবাক হয়ে বলল।
“ঠকেছে মানে?”
রৌদ্র হাসতে হাসতে এগিয়ে এল। কাঁধে তোয়ালে নিতে নিতে সে বলল।
“আর বলো না। রৌশান আমাকে আর শিহাবকে পুশ-আপ দিতে বলছে। তো পুশ-আপ দিতে গিয়ে আমি নাকি হেরে গেছি, ও এখন সেই নালিশই দিচ্ছে।”
তুরা রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে হাসল। সে খুব ভালো করেই জানে রৌদ্রের শক্তির দৌড় কতটুকু আর শিহাবের অবস্থা কেমন। তুরা রৌশানের গাল টিপে দিয়ে বলল।
“তাই নাকি? তোমার পাপ্পা হেরে গেল? আমার তো বিশ্বাসই হচ্ছে না।”
রৌশান মুখ ফুলিয়ে বলল।
“আমিও তো বিশ্বাস করতে পারছি না মাম্মা। কিন্তু ফুপা তো ঠিকই অনেকগুলো পুশ-আপ দিয়ে দিল আর পাপ্পা মাঝপথেই থেমে গেল।”
তুরা এবার রৌদ্রের চোখের দিকে তাকাল। রৌদ্র আলতো করে একটা চোখ টিপে তুরাকে ইশারা করল। তুরা মুহূর্তেই বুঝে গেল যে এটা রৌদ্রের কোনো একটা চাল ছিল হয়তো শিহাব কে জেতানোর জন্য সে ইচ্ছে করেই এমনটা করেছে। তুরা মুচকি হেসে রৌশানকে বলল।
“আচ্ছা, ঠিক আছে। আজ না হয় তোমার ফুপাই জিতল। কিন্তু তোমার পাপ্পা যে তোমার জন্য সুপারম্যান, সেটা তো আর পাল্টে যাচ্ছে না, তাই না?”
রৌশান রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে একটু ভাবল, তারপর মাথা নেড়ে সায় দিল। রৌদ্র এগিয়ে এসে রৌশানের মাথায় একটা গাট্টা মেরে বলল।
“এবার যাও তো বীর পুরুষ। গিয়ে নিজের ওই ছেঁড়া টি-শার্টটা পাল্টে এসো। নাহলে তোমার মাম্মা এখন আমাকে বাদ দিয়ে তোমাকে বকা শুরু করবে।”
তুরা রৌশানের ছেঁড়া টি-শার্টের দিকে তাকিয়ে পুরো আকাশ থেকে পড়ল। রৌদ্র যখন হাসতে হাসতে শিহাবের সেই আকাশকুসুম শক্তির দাপট আর টি-শার্ট ট্র্যাজেডির গল্প শোনাল, তুরা হাসতে হাসতে সোফায় গড়িয়ে পড়ার উপক্রম। রৌদ্র রৌশানকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিয়ে তুরার চোখের দিকে তাকিয়ে একটু গম্ভীর হওয়ার ভান করে বলল।
“শোনো, তুরা। আমি অফিস থেকে একটা বিশেষ পার্সেল পাঠাবো। তুমি পার্সেলটা রিসিভ করে যা যা করা দরকার গুছিয়ে নিও। আমি মেসেজে লোকেশন পাঠাবো, ঠিক সময়মতো ওই লোকেশনে চলে আসবে। দেরি করো না কিন্তু।”
তুরা মুখ খুলে কিছু জিজ্ঞেস করতে যাবে, তার আগেই রৌদ্র রৌশানকে নিয়ে ‘হুপ’ করে ওয়াশরুমে ঢুকে দরজা আটকে দিল। তুরা একটা লম্বা শ্বাস ফেলে মুচকি হাসল। এই লোকটার সারপ্রাইজ দেওয়ার অভ্যাসটা আর গেল না।
অন্যদিকে, আয়ান আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে টাইটা ঠিক করে নিতেই পাঁচ বছরের ছোট্ট আনায়া দৌড়ে এসে আয়ানের পা জড়িয়ে ধরল। আয়ান ওকে কোলে তুলে নিতেই আনায়া ওর চিবুকে গাল ঘষে আদুরে গলায় বলল।
“পাপ্পা। আসার সময় আমার জন্য একত্তুত্তু চকলেট নিয়ে আসবে?”
আয়ান আনায়ার কপালে আলতো করে একটা চুমু খেয়ে বলল।
“অবশ্যই আনবো আমার ছোট্ট প্রিন্সেস। তোমার পছন্দের সব চকলেট নিয়ে আসবো।”
ঠিক তখনি পাশ থেকে একটা গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“আর আমার জন্য?”
আয়ান ঘাড় ঘুরিয়ে দেখল তিহান কোমরে দুই হাত দিয়ে একদম বড়দের মতো ভাব নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আয়ান হেসে এক হাত দিয়ে তিহানকেও কোলে তুলে নিল। এখন আয়ানের দুই কোলে দুই রাজপুত্র-রাজকন্যা। সে তিহানের নাকে নাক ঘষে বলল।
“একদম টেনশন করো না বীর পুরুষ। তোমাদের দুজনের জন্যই চকলেটের পাহাড় নিয়ে আসবো। এবার খুশি তো?”
তিহান আর আনায়া দুজনেই খিলখিল করে হেসে উঠে আয়ানকে জড়িয়ে ধরল। ঠিক তখনই দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা তিথি দুই হাত বুকে ভাঁজ করে কপালে ভাজ ফেলে বলল।
“বাচ্চাদের আবদার তো সব মুখস্থ। তো, আমি কি এই বাড়িতে ভাড়ায় থাকি? আমার জন্য কি কিছুই আসবে না?”
আয়ান এবার তিথির দিকে তাকিয়ে বাঁকা হাসল। সে একটু রসিকতা করে বলল।
“তোমার জন্য আনবো না মানে? অবশ্যই আনবো। তোমার জন্য দুইটা কাকাতুয়া ঝুঁটিওয়ালা বেলুন আনবো আর ওই যে ছোটরা চুষি চকলেট খায় না? ওইগুলাও কয়েকটা নিয়ে আসবো। আর কী কী লাগবে বলো?”
তিথি চোখ দুটো বড় বড় করে তেড়ে এসে আয়ানের বাহুতে একটা কিল বসিয়ে দিয়ে বলল।
“মজা হচ্ছে? আমাকে কি তোমার ওই পিচ্চিদের মতো মনে হয়?।”
আয়ান তিথি আনায়া কে নামিয়ে দিয়ে টাইটা শেষবার ঠিক করে নিয়ে তিথির দিকে তাকিয়ে টিপ্পনী কেটে বলল।
“বাচ্চাদের মতো আবদার যেহেতু করছো, তার মানে তুমিও এখনো বাচ্চাই আছো। আর বাচ্চাদের জন্য তো ওইসবই মানায়।”
তিথি মোটেও দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে আয়ানের দিকে চ্যালেঞ্জিং চোখে তাকাল। তারপর দুষ্টুমি করে বলল।
“তাই? আমি বাচ্চা? তাহলে দেরি কেন, ওদের মতো আমাকেও এখন তোমার কোলে তুলে নাও তো দেখি।”
তিথির কথা শেষ হতে না হতেই পাশ থেকে আনায়া নিজের বড় বড় চোখ দুটো আরও গোল গোল করে মায়ের দিকে তাকাল। যেন সে বিশাল কোনো ভয়ংকর কথা শুনে ফেলেছে। আনায়া দুই হাত গালে দিয়ে আতঙ্কে বলে উঠল।
“হায় খোদা! মাম্মা, তুমি তো অনেক মোটা। তুমি পাপ্পার কোলে উঠলে পাপ্পার কোমর মট করে ভেঙে যাবে তো।”
মেয়ের মুখে এমন ‘বিস্ফোরক’ মন্তব্য শুনে তিথির চোখ তো একদম কপালে উঠে গেল। সে নিজের কোমরে হাত দিয়ে রাগে ফেটে পড়ে বলল।
“কীহহ! আমি মোটা? তোর এত বড় সাহস আনায়া!”
আনায়া একটুও ভয় না পেয়ে শান্তভাবে বলল।
“আমি আবার কী করলাম। তুমি একবার আয়নায় গিয়ে দেখো না, তুমি মোটা নাকি চিকন।”
তিথি এবার অপমানে আর রাগে ফোঁস ফোঁস করতে করতে আয়ানের দিকে তাকাল। আয়ান তখন হাসতে হাসতে প্রায় শেষ। তিথি চিৎকার করে বলল।
“আয়ান। তোমার এই মেয়েটাকে এখনই কিছু একটা বলো, নাহলে কিন্তু আমি আজ সত্যিই ওর মাথার চুল একটাও আস্ত রাখবো না। একদম টেনে ছিঁড়ে ফেলবো।”
আয়ান হাসতে হাসতে কোনোমতে নিজেকে সামলে নিয়ে আনায়ার মাথায় হাত বুলিয়ে বলল।
“আরে মা, এভাবে সরাসরি সত্যি কথা বলতে হয় না। দেখো, তোমার মাম্মা কিন্তু এখন ড্রাগন হয়ে যাচ্ছে।”
তিথি এবার সত্যিই অগ্নিশর্মা হয়ে গেল। সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আয়ানের দিকে তেড়ে এসে চিৎকার করে বলল।
“কীহহ! তার মানে আনায়া সত্যি কথাই বলেছে? তুমিও ওকে সাপোর্ট করছো?”
আনায়া বিপদ বুঝে এক লাফে আবার আয়ানের কোলে উঠে বসল। সে আয়ানের গলা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে আতঙ্কে চিৎকার করে বলল।
“পাপ্পা দৌড়াও। মাম্মা খেপেছে। মাম্মার কাছে লাঠি আছে। আমাদের দুজনকেই মেরে আজকে কোমর ভেঙে দেবে। বাঁচতে চাইলে জোরে দৌড়াও।”
তিথি এবার সত্যি সত্যি হাতের কাছে থাকা একটা কুশন বা লাঠি সদৃশ কিছু একটা তুলে নিয়ে তাদের ধরতে ছুটল। আয়ান দেখল পরিস্থিতি বেগতিক। এই ড্রাগন কুইনের হাতে আজ ধরা পড়লে আর রক্ষা নেই। আয়ান আনায়াকে কোলে নিয়ে এক দৌড়ে রুমের বাইরে বের হতে হতে পেছনের দিকে তাকিয়ে তিহানের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল।
“ওরে বাপরে। তিহান, সামলা তোর মাকে। যদি চাস তোর বোন আর বাপ কে।”
তিহান তো বাপ-বোনের এই দৌড়ানি দেখে আর মায়ের সেই রুদ্রমূর্তি দেখে হাসতে হাসতে ড্রয়িংরুমের কার্পেটে গড়িয়ে পড়ল। সে হাততালি দিয়ে বলল।
“পাপ্পা জোরে দৌড়াও। মাম্মা কিন্তু ধরে ফেলল।”
রাত ৮টার দিকে তুরা নিজের ব্যালকনিতে পায়চারি করছে আর বারবার গেটের দিকে তাকাচ্ছে। মনে মনে ভাবছে, রৌদ্র কখন পার্সেলটা পাঠাবে। রৌশান, তিহান, শান্তা আর আনায়াকে নিয়ে আনোয়ার খান, আশিক খান আর আরিফুল খান মেলায় গিয়েছেন, তাই বাড়িটা এখন বেশ শান্ত।
অপেক্ষা করতে করতে তুরার অপেক্ষার প্রহর যেন শেষ হলো। সে দূর থেকে একটা গাড়ি দেখতে পেল গাড়িটা রৌদ্রের। হয়তো অফিস থেকেই পাঠিয়েছে। গাড়িটা গেটের সামনে থামতেই ড্রাইভার নেমে এসে একটা সুন্দর প্যাকেট তুরার হাতে দিয়ে গেলেন। তুরা পার্সেলটা নিয়ে ধুকপুক বুকে ভেতরে আসল।
লিভিং রুমের সোফায় বসে সে সাবধানে পার্সেলটা খুলল। ভেতরটা দেখেই তার চোখ ছানাবড়া! পার্সেলে রয়েছে একটি ধবধবে সাদা গর্জিয়াস শাড়ি, হাতে পরার একগুচ্ছ কাঁচের চুড়ি আর শাড়ির সাথে চমৎকার ম্যাচিং করা একটি নেকলেস। তুরা মুগ্ধ হয়ে জিনিসগুলোর ওপর হাত বুলিয়ে দেখছিল, তখনই তার চোখে পড়ল কাপড়ের ভাঁজে লুকিয়ে রাখা একটা ছোট চিরকুট।
তুরা চিরকুটটা খুলে পড়তে লাগল।
~প্রিয় বউবতী~
“অবাক না হয়ে চটপট রেডি হয়ে নাও। এই শাড়িটা পরে তাড়াতাড়ি নিচে আসবে। একদম দেরি করবে না কিন্তু! ফাস্ট।”
তুরা শাড়ি আর চিরকুটটা বুকের সাথে চেপে ধরে আপনমনেই হেসে উঠল। এটা রৌদ্রের প্রথম পাগলামি না, সে প্রায়ই তুরাকে এভাবে হঠাৎ হঠাৎ চমকে দিয়ে ভালোবাসার জানান দেয়। তুরা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে চটপট শাড়িটা পরে নিল। হালকা সাজ আর সাদা শাড়িতে তাকে একদম অপার্থিব সুন্দর লাগছে।
তৈরি হয়ে তুরা নিচে নামলে সেই গাড়িটাই তাকে নিয়ে রওনা হলো। ড্রাইভার যেখানে তাকে নিয়ে এল, সেটা একটা নির্জন অথচ দারুণ সাজানো জায়গা। তুরা গাড়ি থেকে নামতেই চারপাশের স্নিগ্ধ বাতাসে মনটা ভরে গেল। সে মাত্র দু-পা এগোতেই পেছন থেকে দুটো চেনা হাত এসে আলতো করে তার চোখ দুটো চেপে ধরল। সেই হাতের স্পর্শে তুরার চিনতে এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। সে মুচকি হেসে শান্ত গলায় বলল।
“সারপ্রাইজ পাবো, তাই না?”
রৌদ্রের তপ্ত নিঃশ্বাস তুরার কানের কাছে আছড়ে পড়ল। সে নিচু স্বরে ফিসফিস করে বলল।
“হুম, ধরো তাই।”
তুরা আর কথা বলল না। রৌদ্র তুরাকে নিয়ে কিছুটা সামনে এগিয়ে গিয়ে আলতো করে ওর চোখ থেকে হাত সরিয়ে নিল। চারপাশটা নিঝুম, শুধু হালকা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ। রৌদ্র তুরার কানের কাছে মুখ নিয়ে নরম স্বরে বলল।
“আমার তরফ থেকে এই সামান্য একটা গিফট তোমার জন্য।”
তুরা চোখ মেলতেই সামনে যা দেখল, তাতে ওর নিঃশ্বাস যেন আটকে এল। ওর চোখের সামনে দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল রাজকীয় তিন তলা বাড়ি। ধবধবে সাদা রঙের ওপর নীলচে আলোয় বাড়িটাকে ঠিক কোনো স্বপ্নের প্রাসাদের মতো লাগছে। তুরা বিস্ময়ে বাকরুদ্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল। রৌদ্র পেছন থেকে তুরার কাঁধ জড়িয়ে ধরে নিজের বুকের সাথে লেপ্টে নিল। তারপর নিচু স্বরে বলতে লাগল।
“অবাক হচ্ছো তো বাড়িটা দেখে? তাহলে মনে করো, আজ থেকে পাঁচ বছর আগে তোমার জন্মদিনে আমি তোমার কাছ থেকে একটা সই নিয়েছিলাম। তখন এই বাড়িটার কাজ শুরুই হয়নি, তবে আমি ওইদিন সব কাগজপত্রে সই করিয়ে বাড়িটা তোমার নামে করে দিয়েছিলাম।”
তুরার এবার মনে পড়ল সেই দিনের কথা। রৌদ্র ওর জন্মদিনে হুট করেই একটা কাগজে সই নিয়েছিল, কিন্তু কী কাগজ সেটা বলেনি এবং কি সে জানতেও চাইনি। আজ বুঝতে পারল, রৌদ্র কত বড় একটা সারপ্রাইজ ওর জন্য সাজিয়ে রেখেছিল। তুরা ভেজা চোখে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আমি এত বড় বাড়ি দিয়ে কী করবো। আমার তো তুমি আর রৌশান থাকলেই চলে, আর কিছু তো চাই না।”
রৌদ্র তুরার কথা শুনে আলতো করে ওর তপ্ত গালে একটা চুমু খেল। তারপর মায়াবী স্বরে বলল।
“এইটা আমাদের ছোট্ট ভালোবাসার ঘর। যেখানে তুমি, আমি আর আমাদের প্রিন্স রৌশান থাকবো। আজ থেকে এটাই আমার ছোট্ট সাজানো ফ্যামিলি।”
তুরা রৌদ্রের বুকে পিঠ ঠেকিয়ে একটু চুপ করে রইল। তারপর মুচকি হেসে ঘাড় ঘুরিয়ে রৌদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে বলল।
“সবই বুঝলাম। তবে আমি বাড়ি চাই না রৌদ্র, আমার অন্য কিছু চাই।”
রৌদ্র এবার কিছুটা অবাক হলো। সে তুরাকে দুহাতে ধরে নিজের সামনের দিকে ঘুরিয়ে নিল। ওর গভীর চোখে চোখ রেখে বলল।
“পৃথিবীর যা কিছু চাইবে, আমি তোমার জন্য আমার সাধ্যের মধ্যে সব এনে দেবো। বলো আমার বউবতী বউ, তোমার আর কী চাই?”
তুরার গাল দুটো মুহূর্তেই লজ্জায় রক্তিম হয়ে উঠল। রৌদ্রের চোখের দিকে সরাসরি তাকাতে পারছে না সে। তুরা ধীরে ধীরে মাথা নিচু করে ফেলল। হৃদপিণ্ডের ধুকপুকানি তখন স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সে নিচু স্বরে, কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“আমি… আমি আপনাকে একটা ছোট্ট রাজকন্যা দিতে চাই। আর রৌশানকে একটা ছোট্ট বোন দিতে চাই।”
তুরার কথা শেষ হতে না হতেই রৌদ্রের মুখের হাসি মূহূর্তেই উবে গেল। এক অজানা আতঙ্কে ওর বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই বিভীষিকাময় হসপিটালের স্মৃতি, অপারেশন থিয়েটারের বাইরের সেই দীর্ঘ অপেক্ষা। তুরাকে হারানোর যে ভয়টা সে মনের গভীর কোনো কোণে লুকিয়ে রেখেছিল, সেটা যেন আবার জ্যান্ত হয়ে ওর টুটি চেপে ধরল।
রৌদ্র এক ঝটকায় তুরার দিক থেকে মুখ ঘুরিয়ে নিল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল, কপালে ভাজ পড়ল। সে অস্থির গলায় প্রায় চিৎকার করে বলে উঠল।
“অসম্ভব! তু… তুরা, আমার কোনো রাজকন্যা চাই না। আমি… আমি রৌশান আর তোমাকে নিয়েই বাকি জীবনটা কাটিয়ে দিতে চাই। বিশ্বাস করো, আমার আর কিচ্ছু লাগবে না।”
বলার সময় রৌদ্রের গলাটা কান্নায় ভেঙে এলো। ওর কন্ঠস্বরের সেই কাঁপুনি দেখে তুরা বুঝতে পারল রৌদ্রের ভয়টা আসলে কোন জায়গায়। ও এখনো সেই পুরনো আতঙ্ক থেকে বের হতে পারেনি। তুরা খুব ধীর পায়ে রৌদ্রের সামনে এসে দাঁড়াল। রৌদ্রের দুই হাত নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে ওকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে শান্ত স্বরে বলল।
“তুমি না আমাকে অনেক ভালোবাসো? তুমিই না বললে তোমার সাধ্যের মধ্যে যা কিছু আছে আমাকে সব দিতে পারবে। তাহলে এই ইচ্ছেটা তো তোমার সাধ্যেরই বাইরে না রৌদ্র, তবে কেন পারবে না?”
রৌদ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সে মুহূর্তের মধ্যে তুরাকে নিজের বুকের মাঝে পিষে ফেলে জড়িয়ে ধরল। তুরার কাঁধে মুখ লুকিয়ে শিশুর মতো ডুকরে কেঁদে উঠল রৌদ্র। সে রুদ্ধকণ্ঠে বলল।
“তুরা, আমার ভীষণ ভয় হয়। তুমি জানো না সেই সময়টা আমি কীভাবে পার করেছি। আমি আর কোনো রিস্ক নিতে চাই না তুরা। তোমাকে হারানোর কথা ভাবলেই আমার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসে।”
তুরার চোখেও তখন জল। সে রৌদ্রের পিঠে হাত বুলিয়ে দিতে দিতে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
“আরে পাগল! কিচ্ছু হবে না। আল্লাহ সাথে আছেন, তুমি এভাবে একদম কাঁদবে না। নাহলে আমার মেয়েটা যখন আসবে, তখন কিন্তু তাকে দিয়ে তোমাকে আচ্ছা করে বকা খাওয়াবো।”
রৌদ্র তবুও শান্ত হতে পারছিল না। ওর শরীরটা এখনো ভয়ের আতিশয্যে কাঁপছে। একটা পুরুষ একটা নারীর জন্য কতটা পাগল হতে পারে, তার জীবন্ত প্রমাণ যেন এই মুহূর্তে রৌদ্র। সে শুধু একজন সফল মানুষ বা বাবা নয়, সে তুরার প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া এক দিশেহারা প্রেমিক। তুরা এবার রৌদ্রকে নিজের থেকে একটু দূরে সরিয়ে সোজা করে দাঁড় করাল। নিজের শাড়ির আঁচল দিয়ে রৌদ্রের চোখের পানি সযত্নে মুছে দিতে দিতে বলল।
“কাঁদলে না সুখের জোয়ার পানিতে ডুবে যায়, বুঝেছ? কিচ্ছু হবে না আমার। বিশ্বাস রাখো, আল্লাহ আমাদের সাথে আছেন।”
রৌদ্র তুরার হাতটা খপ করে ধরে নিজের মুঠোয় পুরল। তারপর সেই নরম হাতের পাতায় পাগলের মতো বারবার চুমু খেয়ে ধরা গলায় বলল।
“যদি তোমার কিছু হয় তুরা, সত্যি বলছি আমি পাগল হয়ে যাবো। তোমাকে ছাড়া আমি এই পৃথিবীর আলো সইতে পারবো না।”
তুরা এবার আর কোনো তর্কে গেল না। সে শুধু একটা প্রশান্তির হাসি হেসে রৌদ্রের শক্ত হাতটা নিজের ছোট হাতের মুঠোয় নিয়ে বাড়ির গেট দিয়ে প্রবেশ করল। ভেতরে পা রাখতেই তুরার চোখ দুটো বিস্ময়ে বড় বড় হয়ে গেল। চারপাশটা যেন কোনো রূপকথার বাগান। ছোট ছোট নাম না জানা ফুলের গাছ থেকে মিষ্টি একটা সুবাস ভেসে আসছে। বাগানের এক কোণায় সুন্দর একটা কাঠের দোলনা রাখা।
মাঝখান দিয়ে চলে গেছে চমৎকার কারুকাজ করা সরু রাস্তা। এক কোণায় একটি নীলচে সুইমিং পুল, যেখান দিয়ে ঝরনার মতো অবিরাম পানি ঝরছে। পানির সেই ঝিরঝির শব্দ নিঝুম রাতটাকে আরও বেশি মায়াবী করে তুলেছে। তুরা অপলক চোখে তাকিয়ে রইল এই সাজানো পৃথিবীর দিকে। রৌদ্র আলতো করে তুরার কাঁধে চিবুক রেখে ফিসফিস করে বলল।
“কেমন লাগল তোমার এই ছোট্ট স্বর্গ? এখন থেকে এটা শুধু আমাদের।”
তুরা ঘোরলাগা চোখে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“এত সুন্দর সব কিছু! তুমি এতোটা নিখুঁত করে কবে সাজালে রৌদ্র?”
রৌদ্র বাঁকা হাসল। তুরার আঙুলের ফাঁকে নিজের আঙুল গলিয়ে দিয়ে বলল।
“যখন তুমি শান্তিতে ঘুমাতে, আমি তখন আমাদের এই ঘরটা বানানোর স্বপ্ন দেখতাম। চলো, তোমাকে তোমার রাজপ্রাসাদের ভেতরটা ঘুরিয়ে দেখাই।”
এরপর রৌদ্র তুরাকে বাড়ির ভেতরে নিয়ে এলো। ভেতরের কারুকাজ আর আভিজাত্য দেখে তুরা মন্ত্রমুগ্ধের মতো তাকিয়ে রইল। প্রতিটি দেয়াল আর আসবাবপত্রে যেন আভিজাত্যের ছোঁয়া। তুরা এতটাই বিমোহিত যে তার মুখে কোনো ভাষা নেই। এরপর রৌদ্র ওকে নিয়ে আসল মাস্টার বেডরুমে। ঘরে পা রাখতেই তুরা চট করে পেছনের দরজাটা টেনে লক করে দিল। সেই শব্দ শুনে রৌদ্র কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল। সে ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল।
“দরজা বন্ধ করলে কেন? একটু পর তো আমরা চলেই যাবো।”
তুরা কোনো কথা না বলে ধীরপায়ে এগিয়ে এল রৌদ্রের একদম কাছে। ওর চোখেমুখে তখন এক অদ্ভুত নেশা আর গভীর ভালোবাসা। সে রৌদ্রের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে চঞ্চল হাতে রৌদ্রের শার্টের বোতামগুলো একটা একটা করে খুলতে শুরু করল। নিচু স্বরে অথচ দৃঢ়ভাবে বলল।
“নো, যাবো না। আজ আমরা এখানেই থাকবো। আমাদের এই নতুন বাড়ি আর এই নতুন বেডরুমেই আমাদের রাজকন্যা আসবে।”
রৌদ্র তুরার এমন সাহসী আর মোহনীয় রূপ দেখে নিজেকে সামলাতে পারল না। সে দুষ্টুমি ভরা হাসি দিয়ে তুরার সরু কোমরটা দুহাতে জড়িয়ে ধরল। ওকে নিজের শরীরের সাথে একদম মিশিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“ওরে পাগলী বউ। বাঘকে খেপাচ্ছো কিন্তু। একবার যদি এই বাঘ সত্যি খেপে যায়, তবে কিন্তু আর সামলাতে পারবে না।”
তুরা এক ঝটকায় রৌদ্রের শার্টটা গা থেকে খুলে দূরে ছুঁড়ে মারল। রৌদ্রের খালি চওড়া কাঁধের ওপর নিজের দুই হাত রেখে ওর গালে নাক ঘষে সুরসুরি দিয়ে আদুরে গলায় বলল।
“এমন ভাবে বলছো যেন আমি তোমাকে কোনোদিন সামলাই না। শোনো, পাঁচ বছর ধরে আমি তোমাকে যেভাবে কন্ট্রোল করে আসছি, বাকি জীবনটাও ঠিক সেভাবেই করে যাবো, বুঝেছো মিস্টার আব্রাহাম খান রৌদ্র?”
রৌদ্র তুরার এমন শাসন আর সোহাগ মিশ্রিত কথা শুনে হো হো করে হেসে উঠল। সে তুরাকে এক ঝটকায় কোলে তুলে নিল আর তুরার চোখে চোখ রেখে বলল।
“আচ্ছা, দেখা যাক আজ কে কাকে কন্ট্রোল করে। তবে মনে রেখো বউবতী, আজ কিন্তু কোনো মায়া হবে না।”
তুরা রৌদ্রের গলা জড়িয়ে ধরে ওর বুকে মুখ লুকালো।রৌদ্র তুরাকে সযত্নে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে ওর কপালে গভীর এক উষ্ণ চুমু এঁকে দিল। ঝরনার শব্দের সাথে সুর মিলিয়ে অতি শান্ত স্বরে ফিসফিস করে বলল।
“আই লাভ ইউ তুরা… আই লাভ ইউ সো মাচ।”
তুরা মুহূর্তেই রৌদ্রের গলা জড়িয়ে ধরল। ওর গালে আদুরে এক চুমু খেয়ে রৌদ্রের কানের কাছে নিজের ঠোঁট নিয়ে ফিসফিস করে প্রতিউত্তরে বলল।
“আই লাভ ইউ টু রৌদ্র… লাভ ইউ সো মাচ আমার বাবুর আব্বু, আর আমার অনাগত রাজকন্যার আব্বুটা।”
রৌদ্র তুরার নেশাতুর চোখের দিকে তাকিয়ে দুষ্টুমি আর গভীরতা মিশিয়ে বলল।
“তাহলে শুরু হোক রাজকন্যা আনার মিশন?”
তুরা লজ্জায় লাল হয়ে দুই হাতে মুখ ঢেকে চোখ বন্ধ করে ফেলল। মুহূর্তের মধ্যে রৌদ্র হারিয়ে গেল তুরার মাঝে। মিশে গেল একে অপরের আত্মার সাথে। নিশ্বাসে নিশ্বাস মিশে চারপাশের সবকিছু যেন এক নিবিড় ভালোবাসার দহনে একাকার হয়ে গেল। নতুন সেই বাড়ির প্রতিটি কোণা আজ এক নতুন স্বপ্নের সাক্ষী হয়ে রইল।
অন্যদিকে, সময়ের স্রোতে ভেসে চলছে আরও কিছু ভালোবাসার গল্প। শিহাব আর আরশির দিনগুলো কাটছে তাদের আদরের মেয়ে শান্তাকে নিয়ে অফুরন্ত হাসি-খুশিতে। নেহাল আর আরফা মেতে আছে নিহাদের দুষ্টু-মিষ্টি সব খুনসুটিতে। আর আয়ান-তিথির সংসার চলছে তাদের দুই রাজপুত্র ও রাজকন্যাকে ঘিরে অবিরাম খুনসুটি আর মিষ্টি সব ঝগড়া নিয়ে।
আর এদিকে চলছে রৌদ্র-তুরার সেই নিবিড়, অপার্থিব ভালোবাসা। পরম করুণাময়ের কাছে একটাই প্রার্থনা সারাজীবন তারা যেন এভাবেই একে অপরের পরিপূরক হয়ে থাকে। তাদের সাজানো সংসারে যেন কোনোদিন কোনো কালো মেঘের ছায়া না আসে। খুব শীঘ্রই যেন তুরার কোলে সেই ছোট্ট রাজকন্যা চলে আসে,যার জন্য রৌদ্রের এই ব্যাকুলতা। তাদের ভালোবাসার এই মায়াবী পৃথিবীটা যেন সবসময় সুখে টইটম্বুর থাকে, কখনো যেন ফুরিয়ে না যায় এই মায়া।
সবাই যেন এভাবেই হাসি আর আনন্দে মিলেমিশে থাকে চিরকাল। বলতে আজ সত্যিই খুব কষ্ট হচ্ছে, মনের অজান্তেই চোখে ভিড় করছে নোনা জল। কারণ আমাদের এই প্রাণবন্ত আর মায়াবী ভালোবাসার গল্পটা এখানেই শেষ হচ্ছে। যে গল্পের পরতে পরতে ছিল আবেগ, হাসি আর চোখের জল সেই চিরচেনা মানুষগুলোর কাছ থেকে আজ বিদায় নেওয়ার সময় এসেছে। সবার কাছে সকল ভুল-ত্রুটির ক্ষমা চেয়ে নিয়ে আজ গল্পের এই রঙিন পাতায় শেষ তুলির আঁচড় কাটছি।
গল্পের শেষ মানেই তো নতুন কোনো গল্পের শুরু। ভালো থাকুক রৌদ্র-তুরা, ভালো থাকুক তাদের ভালোবাসার মানুষগুলো।
~ সমাপ্ত ~
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮৩
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোকে পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৭
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ১৫
-
অসম্ভব রকম ভালোবাসি তোমায় পর্ব ৩৩