নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৭৭ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
সবাই মিলে তিথিকে নিয়ে মেতে ওঠায় আর সবার সামনে অমন হাসাহাসি করায় তিথি আর সেখানে থাকতে পারল না। লজ্জায় একদম লাল হয়ে সে সবার মাঝখান থেকে এক দৌড়ে নিজের রুমে চলে গেল। তার এমন লাজুক পালানো দেখে বাড়ির সবার খুশির মাত্রা যেন আরও কয়েক গুণ বেড়ে গেল। পুরো বাড়ি আবারও হো হো করে হাসির শব্দে মুখরিত হয়ে উঠল।
কিছুক্ষণ পর আয়ানও নিজের রুমে ফিরে এল। তিথি তখন ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে ছিল। আয়ানকে রুমে ঢুকতে দেখে সে যেন মুহূর্তের মধ্যে নিজের সব ভয় আর জড়তা ঝেড়ে ফেলল। সে এক দৌড়ে এসে আয়ানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আয়ানের বুকের মাঝে মুখ লুকিয়ে ধরা গলায় বলল।
“এইবার একদম শক্ত করে ধরেছি, আর ছাড়াতে পারবে না। তোমার যদি আমাকে অনেক অনেক শাস্তি দিতে মন চায়, তবে দিয়ে দাও কিন্তু দয়া করে আর দূরে ঠেলে দিও না। আয়ান, আমি তোমার সাথে সারাজীবন থাকতে চাই। আই প্রমিস এখন থেকে তুমি যা বলবে আমি ঠিক তাই করব। তোমার কোনো কথার অবাধ্য হব না আমি, সবসময় তোমার কথামতো চলব। আর আর ।”
আয়ান তিথির এমন আকস্মিক পাগলামি দেখে একটু থমকে গেল। সে খানিকটা ভ্রু কুঁচকে গম্ভীর গলায় জিজ্ঞেস করল।
“আর কী?”
তিথি আয়ানকে আরও আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরল, যেন সে আজ পৃথিবীর সবটুকু অধিকার ফিরে পেয়েছে। আয়ানের টি শার্ট খামচে ধরে সে আদুরে গলায় বলল।
“ভালোবাসি আমার বাবুর আব্বুটাকে।আই লাভ ইউ,আই লাভ ইউ সো মাচ।”
তিথির ভালোবাসার স্বীকাররত্ব দেখে আয়ান যেন এক নিমেষে আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। সে মুহূর্তের মধ্যে তিথিকে ছেড়ে দিয়ে এক ঝটকায় নিচু হয়ে তার পেটে মুখ গুঁজল। দুহাতে তিথির পেট জড়িয়ে ধরে অনেকটা ঘোরের মধ্যে ফিসফিস করে বলতে লাগল।
“তিথি, এখানে আমাদের বাবু আছে তাই না? ও সত্যি আসবে? আমাকে ও ‘বাবা’ বলে ডাকবে? আমার আঙুল ধরে টলমল পায়ে হাঁটবে? বিশ্বাস কর, আমি ভাবতেই পারছি না।”
আয়ানের কণ্ঠস্বরে এক অদ্ভুত মুগ্ধতা আর আকুলতা মিশে ছিল। তিথি মায়াবী চোখে আয়ানের দিকে তাকিয়ে মুচকি হেসে মাথা দুলিয়ে সায় দিল।
“হুম।”
আয়ান এবার তিথির পেটে মুখ ঘষে একটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরে দুষ্টুমি করে বলল।
“বাবু, তুমি তাড়াতাড়ি চলে আসো। তুমি এলে আমি আর তুমি মিলে তোমার মাম্মাকে অনেক জ্বালাবো। একটুও শান্তিতে থাকতে দেব না, সারাক্ষণ জ্বালিয়ে মারবো দুজন মিলে।”
আয়ানের এমন বাচ্চার মতো আবদার আর দুষ্টুমি শুনে তিথি আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসির শব্দে পুরো ঘরটা যেন প্রাণ ফিরে পেল। আয়ান মুগ্ধ হয়ে মাথা তুলে তিথির দিকে তাকাল। তিথির ওই অনাবিল হাসি মাখা মুখটা দেখে সে যেন স্থবির হয়ে গেল। আয়ানের অপলক চাহনি দেখে তিথি মুহূর্তে লজ্জায় রাঙা হয়ে গেল এবং হাসি থামিয়ে মাথা নিচু করে ফেলল।আয়ান ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। একদম তিথির মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সে তিথির দুহাত নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তিথির চোখের দিকে গভীর ভাবে তাকিয়ে অপরাধবোধে ভারী গলায় বলল।
“তিথি, আমি জানি আমি তোর সাথে অনেক খারাপ ব্যবহার করেছি। অকারণে তোকে বকাঝকা করেছি, এমনকি তোকে অনেক কষ্টও দিয়েছি। শারীরিক আর মানসিক যে যন্ত্রণা তোকে দিয়েছি, তার জন্য আমাকে ক্ষমা করা হয়তো কঠিন। কিন্তু প্লিজ তিথি, এই অপরাধী আয়ানকে একবার ক্ষমা করে দিস! সত্যি বলতে, আমার মাথায় ভালোবাসার এক অদ্ভুত পাগলামি চড়ে বসেছিল। তোকে হারানোর ভয়ে এতটাই পাগল ছিলাম যে কী করেছি আমি নিজেও জানি না।”
আয়ান একটু থেমে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বলতে লাগল।
“আমি তোর থেকে দূরে ইচ্ছে করেই থাকতাম। অপরাধ শুধু তুই করিসনি, বড় অপরাধী আমি নিজেও। তোকে তোর মতো করে বাঁচতে দেইনি, অহেতুক অতিরিক্ত অধিকার খাটিয়ে ফেলেছি যা আমার মোটেও উচিত হয়নি। প্লিজ তিথি, আমাদের এই সুন্দর আগামীর জন্য আমাকে সবটুকু ক্ষমা করে দিস।”
কথাটা বলতেই আয়ান ডুকরে কেঁদে উঠল। সে তিথির হাতের ওপর নিজের নাক ঘষে চোখের জলে তিথির হাত ভিজিয়ে দিয়ে কম্পিত কণ্ঠে আবার বলতে লাগল।
“বিশ্বাস কর তিথি,এই কটা দিন যেন আমি একটা জ্যান্ত লাশ হয়ে বেঁচেছিলাম। তুই যেদিন আমাকে মেরেছিলি, প্রথমে আঘাতটা বুকে লাগলেও তোর থেকে দূরে যাওয়ার পর আমি বুঝতে পেরেছি আমিও তোর সাথে অনেক বাড়াবাড়ি করে ফেলেছি। স্বামী হয়ে আমার সেগুলো করা একদম উচিত হয়নি। আমি তোকে এড়িয়ে চলতাম শুধু এটা বোঝাতে যে, তুই আমাকে কতটা চাস সেই অভাবটা যেন তুই অনুভব করিস,তুই যখন আমার কাছে এসে মিনতি করতি তখন আমি অনেক দুর্বল হয়ে পড়তাম, কিন্তু অনেক কষ্টে শক্ত থাকতাম যাতে তুই ও একটু বুঝতে পারিস আপন মানুষ গুলা দূরে গেলে কতটা কষ্ট হয়,। কিন্তু বিশ্বাস কর, এই কটা দিন আমি এক মুহূর্তের জন্যও শান্তিতে দম নিতে পারিনি। খুব কষ্ট হতো আমার! সেই কষ্ট সামান্য কমাতে আমি কাল নেশা পর্যন্ত করে ফেলেছিলাম। কিন্তু সব শেষে তুই যে আমাকে এত বড় একটা উপহার দিবি, আমি ভাবতেও পারিনি! তুই আমাকে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহারটা দিলি। আমি কতটা খুশি তা তোকে কোনোভাবেই মুখে প্রকাশ করে বোঝাতে পারব না।”
আয়ানের এই বুকফাটা হাহাকার আর আর্তনাদ শুনে তিথিও আর নিজের চোখের পানি আটকে রাখতে পারল না। তার দুগাল বেয়ে নোনা জল গড়িয়ে পড়ল। সে আয়ানের হাতের ওপর নিজের হাত রেখে মমতা মাখানো স্বরে বলল।
“কে বলেছে তুমি অপরাধ করেছ আয়ান? মোটেও না! বরং তোমার পাগলামিগুলো আমি তখন বুঝতে পারিনি। তোমার মতো এমন পাগল স্বামী কে না চায় বলো? স্বামী যদি তার স্ত্রীকে হারানোর ভয়ে এতটা পাগল হতে পারে, তবে তো সেই স্ত্রী ভাগ্যবতী। হ্যাঁ, আমি ভাগ্যবতী যে আমি তোমাকে আমার জীবনসঙ্গী হিসেবে পেয়েছি।”
কথাটা বলেই তিথি আয়ানের হাত ছেড়ে দিয়ে তাকে আবারও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আয়ানের কাঁধে মুখ গুঁজে সে বলতে লাগল।
“তুমিও আমাকে ক্ষমা করে দাও। তোমার গায়ে হাত তুলেছি, ঘাড় তেরামি করেছি যেগুলো একদম আমার করা উচিত হয়নি। কিন্তু এখন থেকে আমি একজন আদর্শ স্ত্রী হয়ে দেখাব। আমি তোমার সব কথা শুনব, একজন স্বামী হিসেবে তোমাকে সর্বোচ্চ সম্মান করব। আর শোনো, আমি আমার আগের সেই পাগল আয়ানকেই চাই, কোনো পরিবর্তন চাই না। তুমি আগের মতোই আমাকে শাসন করবে, বকা দেবে আমি এটাই চাই।”
আয়ান তিথির কথা শুনে তাকে আরও নিবিড়ভাবে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল। দুই হৃদয়ের সবটুকু অভিমান যেন আজ এই চোখের জলে ধুয়ে মুছে পরিষ্কার হয়ে গেল।
আয়ান তিথির কপালে গভীর এক চুমু খেয়ে আবেগী কণ্ঠে বলল।
“আই লাভ ইউ তিথি, আই লাভ ইউ সো মাচ!”
তিথিও আয়ানের বুকে মুখ গুঁজে পরম তৃপ্তিতে চোখ বন্ধ করল। এক চিলতে হাসি ফুটিয়ে ফিসফিস করে বলল।
“আই লাভ ইউ টু, বাবুটার আব্বু।”
বেশ কিছুক্ষণ তারা এভাবেই একে অপরকে জড়িয়ে ধরে রইল। নিস্তব্ধ ঘরে কেবল দুজনের নিশ্বাসের শব্দ। এই নীরবতা যেন তাদের মনের গহীনে জমে থাকা মাসের পর মাসের সব কষ্ট আর হাহাকার এক নিমেষে ধুয়ে মুছে দিল। এরপর আয়ান তিথিকে আলতো করে পাঁজাকোলা করে তুলে নিল এবং বিছানায় শুইয়ে দিল। নিজেও পাশে শুয়ে তিথিকে নিজের বুকের ভেতর টেনে নিয়ে পরম আবেশে জড়িয়ে ধরল। চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘ প্রশান্তির শ্বাস ফেলে আয়ান বলল।
“আমি আজকে আমার বাবু আর আমার বাবুর আম্মুটাকে নিয়ে শান্তিতে ঘুমাব। জানিস তিথি, কতদিন পর আজ আমি একটু শান্তিতে চোখ বোজাতে পারছি।”
তিথিও কোনো কথা না বলে আয়ানের হৃদপিণ্ডের স্পন্দন শুনতে শুনতে চোখ বন্ধ করল। কতদিন এই আশ্রয়ের জন্য তার মন ছটফট করেছে! আজ এই চেনা বুকটা তিথির কাছে স্বর্গের চেয়েও বেশি সুখের মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর দুজনেরই চোখের পাতায় ঘুমের আবেশ নেমে এল। একে অপরকে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে তারা গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল।সব শেষে মান-অভিমান আর যন্ত্রণার দেয়াল ভেঙে দুটি বিরহী হৃদয় আজ পূর্ণতা পেল। চার দেয়ালের এই ছোট্ট ঘরটি আজ ভালোবাসার এক নিটোল উপাখ্যানে পরিণত হলো।
পরের দিন সকাল হতেই খান বাড়িতে যেন আবারও খুশির জোয়ার নামল। আগের রাতের রেশ কাটতে না কাটতেই শিহাব, আরশি, নেহাল আর আরফা খবর পেয়ে হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে। শুধু তারাই নয়, আরও অনেক আত্মীয়-স্বজন বাড়িতে ভিড় জমিয়েছে। সবার মুখেই এক কথা “কী সাংঘাতিক কাণ্ড! দুই বোনের বিয়েও হলো একসাথে, আবার মা-ও হতে যাচ্ছে একসাথে!”
তুরার মতো তিথিকেও এখন পা ফেললে মেপে ফেলতে হচ্ছে। আরশি আর আরফা তো তুরা আর তিথিকে একদম জ্বালিয়ে মারছে।বাড়ির বড় মহিলারা এখন সারাক্ষণ এই দুই হবু মায়ের সেবা আর যত্ন নিয়েই ব্যস্ত।
এদিকে শিহাব আর নেহাল মিলে আয়ানকে রীতিমতো টেনেহিঁচড়ে ছাদের এক কোণায় নিয়ে এল। আয়ান কোনোমতে তাদের হাত ছাড়িয়ে অবাক হয়ে দুজনের দিকে তাকিয়ে বলল।
“আরে ভাই, কী হয়েছেটা কী? আমি কি আপনাদের কোনো চরম শত্রু নাকি যে এভাবে টানতে টানতে ছাদে নিয়ে আসলেন?”
শিহাব দুষ্টুমি করে মেয়েদের মতো ন্যাকামি করে আয়ানের গাল টেনে দিয়ে বলল।
“না সোনা! তোমাকে টেনে নিয়ে আসলাম যাতে তুমি আমাদের সেই গুপ্তধনের রাস্তাটা দেখিয়ে দিতে পারো তাই।”
আয়ান আরও অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল।
“গুপ্তধনের রাস্তা মানে? কী বলছেন এসব?”
নেহাল এবার আয়ানের কাঁধে হাত রেখে টিপ্পনী কেটে বলল।
“মানে বোঝেন নাই ভাই? আমি কালকেই আপনাকে খোঁচা দিয়ে বললাম যে রৌদ্র ভাই তো বাবা হতে যাচ্ছে, আপনি কবে হবেন? আর আপনি ভাই এক রাতের ব্যবধানে একদম ‘প্র্যাকটিক্যাল’ করে দেখিয়ে দিলেন!কাজটা আপনি এক দিনেই সেরে ফেললেন ভাই? সেই লেভেলের স্পিড তো আপনার। যদি আমাদের ও গুপ্তধনের রাস্তা টা একটু দেখিয়ে দেন আমরাও তাহলে আপনার মতো এক রাতেই বাবা হয়ে যেতাম।”
আয়ানও কম যায় না। ওরা দুজন যদি সম্মানে ছোট হয়েও তার মতো বড় সম্মানে ভাইকে এমন নির্লজ্জ মার্কা প্রশ্ন করতে পারে, তবে সে কেন পিছিয়ে থাকবে? আয়ান মুখে এক বাঁকা হাসি ফুটিয়ে শিহাব আর নেহালের কাঁধে হাত রাখল। দুজনকে নিজের শরীরের কাছে টেনে এনে ফিসফিস করে রহস্যময় গলায় বলল।
“জানতে চান তো গুপ্তধনের রাস্তাটা ঠিক কোথায়?”
শিহাব আর নেহাল একদম অভদ্রের মতো উৎসুক হয়ে মাথা নাড়ল। তাদের চোখেমুখে তখন দুনিয়ার সব কৌতূহল। আয়ান এবার গলাটা আরও একটু নামিয়ে গম্ভীর মুখে বলল।
“তাহলে ভালো করে শোনেন, গুপ্তধনের আসল রাস্তা টা আপনাদের প্যান্টের চেইনের নিচেই লুকানো আছে।বাকিটুক নিজেরাই একটু খুঁজে বের করে নিন।”
আয়ানের এই অপ্রত্যাশিত আর ‘বোল্ড’ উত্তর শুনে শিহাব আর নেহালের মুখের হাসি যেন এক নিমেষে উধাও হয়ে গেল। ওরা দুজন একে অপরের মুখের দিকে তাকিয়ে থমকে রইল। আয়ান ওদের ওভাবে হা করে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে একটা বিজয়ীর হাসি দিল। তারপর নিজের শার্টের কলারটা একটু ঠিক করে ভাব নিয়ে বলল।
“কী হলো? রাস্তা চিনতে পেরেছেন নাকি আরও বিস্তারিত ম্যাপ এঁকে দিতে হবে? বড়দের সাথে কীভাবে কথা বলতে হয় সেটা আমি যেমন জানি,আর কীভাবে উত্তর দিতে হয় সেটাও জানা আছে। এখন আসছি, আমার অনেক কাজ!”
আয়ান গটগট করে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল। এদিকে ছাদে শিহাব আর নেহাল দুজন একে অপরের দিকে তাকিয়ে নিজেদের প্যান্টের দিকে তাকাচ্ছে আর লজ্জায় কুঁকড়ে যাচ্ছে। নেহাল বিড়বিড় করে বলল।
“শালা! আয়ান ভাই তো দেখছি একদম লেভেল পার করে দিয়েছে। আমরা আসলাম মজা নিতে, আর ভাই তো আমাদের মান-সম্মান সব চেইনের নিচে ঢুকিয়ে দিয়ে চলে গেল।”
নেহালের বিড়বিড় করা কথাগুলো শুনে শিহাব একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে পকেটে হাত রাখল। সে নেহালের দিকে তাকিয়ে বিরক্তির সুরে বলল।
“আরে শা’লা, আয়ান মিথ্যা কী বলেছে? যা বলেছে একদম খাঁটি সত্য কথাই বলেছে। বরং আয়ান আমাদের সম্মানে বড় হলেও বয়সে কিন্তু ও আমাদের ছোট। আর ওই ছোট হয়েই আমাদের পুরুষত্বে দাগ লাগিয়ে দিয়ে গেল! আমাদের বুদ্ধি কি হাঁটুতে নাকি যে ওর কাছে টিপস নিতে আসছিলাম?”
নেহাল দমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে সাথে সাথে উত্তর দিল।
“তুই শা’লা চুপ কর! তুই না কাল বললি যে দুজনের মধ্যে বিশাল ঝগড়া হয়েছে? আমি বেশ জানি, ঝগড়া না ছাই! সেই তো রাতে বউয়ের পেটে ‘আন্ডা’ পেড়ে দিল। আর তুই আমাকে ভুল ভাল রিপোর্ট দিবি না নেক্সট টাইম।”
শিহাব আর এক মুহূর্ত ওখানে দাঁড়াল না। সে গজগজ করতে করতে ছাদ থেকে নামতে শুরু করল। নামতে নামতে পেছনের দিকে না তাকিয়েই বলল।
“রাখ তোর আন্ডা তোর মুখে! তোর মুখে সবসময় শুধু জঘন্য লজিক। শা’লা আস্ত একটা গোবর তুই। তোর লজিক শুনতে থাকলে আমারও মাথা পাগল হয়ে যাবে।”
[রাত ১০:০০ টা খান বাড়ি]
আরশি গুনগুন করে গান গাইতে গাইতে রুমে ঢুকল। সারাদিনের ধকল শেষে শরীরটা একটু ক্লান্ত থাকলেও মনটা তার আজ ভীষণ ফুরফুরে। কিন্তু রুমে ঢুকে চারপাশটা ফাঁকা দেখে সে বেশ অবাক হলো। শিহাব কোথায় গেল? আয়না, বিছানা সব জায়গাই জনমানবহীন।
আরশি পা টিপে টিপে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গেল। পর্দা সরিয়ে উঁকি দিতেই দেখল, শিহাব একলা রেলিংয়ে ভর দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। আরশি মুচকি হাসল। সে খুব সাবধানে, নিঃশব্দে শিহাবের ঠিক পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তারপর পায়ের পাতায় ভর দিয়ে একটু উঁচু হয়ে নিজের দুহাত দিয়ে শিহাবের চোখ দুটো শক্ত করে চেপে ধরল।
শিহাব এক মুহূর্তের জন্যও চমকাল না। বরং তার ঠোঁটে একটা চওড়া হাসি ফুটে উঠল। সে আরশির হাত না সরিয়েই শান্ত গলায় বলল।
“বাহ! কবে থেকে আবার বাচ্চাদের মতো এই খেলা শিখলে?”
আরশি দমে গেল। সে হাত দুটো সরিয়ে দিয়ে শিহাবের পাশে এসে দাঁড়াল। ভ্রু কুঁচকে শিহাবের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলল।
“কী মুশকিল! আপনি বুঝলেন কীভাবে যে আমি এসেছি? আমি তো বিড়ালের মতো পা ফেলে আসলাম।”
শিহাব হাসতে হাসতে আরশির দিকে ঘুরে দাঁড়াল। সে আরশির দুই কাঁধ ধরে নিজের কাছে টেনে নিয়ে বলল।
“তোমার গায়ের ওই বিশেষ পারফিউমের ঘ্রাণ আর তোমার নিশ্বাসের শব্দ এগুলো চেনার জন্য চোখ খোলা রাখার দরকার পড়ে না আরশি। আমার মন বলে দিচ্ছিল তুমি আমার ঠিক পেছনেই দাঁড়িয়ে আছো।”
আরশি একটু লজ্জা পেয়ে অন্যদিকে তাকিয়ে বলল।
“ধ্যাত! আপনাকে সারপ্রাইজ দেওয়াটাই বৃথা। সব বুঝে ফেলেন।”
শিহাব আরশির চিবুক ধরে নিজের দিকে মুখটা ফেরাল। তার চোখে তখন দুষ্টুমির আভা। সে নিচু স্বরে বলল।
“সারপ্রাইজ যদি দিতেই হয়, তবে তুরা বা তিথির মতো দাও। দেখছো না আয়ান আর রৌদ্র কেমন সারপ্রাইজ পেয়ে একদম সাত আসমানে উড়ছে? আই অ্যাম ওয়েটিং ফর মাই সারপ্রাইজ টু। হোয়েন উইল ইউ গিভ মি দ্য গুড নিউজ।”
শিহাবের এমন সরাসরি প্রশ্নে আরশি লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গেল। সে শিহাবের বুকে মৃদু কিল মেরে মুখ লুকিয়ে ফেলল।শিহাব আরশিকে মুহূর্তের মধ্যে পাজাকোলা করে তুলে নিল। আরশির শরীরের সমস্ত ভার এখন শিহাবের বলিষ্ঠ দুই বাহুতে। শিহাব তার চোখের দিকে তাকিয়ে একদম মাতাল করা গলায় ফিসফিস করে বলল।
“এত লজ্জা পেলে তো চলবে না বউ। আমি চাইছি তুমি নিজে থেকে আমাকে সেই কাঙ্ক্ষিত সারপ্রাইজটা দাও,? আর সব থেকে বড় কথা সারপ্রাইজ পেতে হলে আমার কাছে আসতে হবে তোমাকে,তুমি না আসলে আমাকেই যেতে হবে তবুও তোমার এই পাগল স্বামীর সারপ্রাইজটা চাই মানে চাই বুঝেছো।”
আরশি লজ্জায় লাল হয়ে শিহাবের বুকে মুখ লুকাল, তার হার্টবিট যেন শতগুণ বেড়ে গেছে। শিহাবের এই মোহনীয় কণ্ঠ আর চাহনি তাকে পুরো অবশ করে দিচ্ছে। শিহাব এক চিলতে দুষ্টুমিভরা হাসি দিয়ে আরশিকে নিয়ে ব্যালকনি থেকে সোজা রুমে ঢুকে পড়ল। খুব সাবধানে সে আরশিকে বিছানায় শুইয়ে দিল।
তারপর আর কী হলো! শিহাব সেই কাঙ্ক্ষিত সারপ্রাইজটা পাওয়ার জন্য, অর্থাৎ তাদের ছোট পৃথিবীটা পৃথিবীতে আনার জন্য শিহাব আরশিকে সাথে নিয়ে এক মায়াবী ভালোবাসার জগতে হারিয়ে গেল। রাতের আঁধার ঘনিয়ে এল, আর সেই সাথে এক অন্যরকম প্রেমের আবেশে ডুবে রইল দুটি মন।
এদিকে নেহাল আছে মোক্ষম শিকারের অপেক্ষায়। বিছানায় আয়েশ করে চিত হয়ে শুয়ে, পায়ের ওপর পা তুলে বেশ ফুরফুরে মেজাজে একটা চটুল গান গাইছে সে। তার চোখের কোণে খেলে যাচ্ছে দুষ্টুমির ঝিলিক।
আরফা ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আপন মনে নিজের চুল বেণী করছে। আয়নার স্বচ্ছ কাঁচের ভেতর দিয়ে পেছনের নেহালের প্রতিচ্ছবি আর তার মুখের অদ্ভুত মতিগতি দেখে আরফার বুঝতে বাকি রইল না যে লোকটার মাথায় নতুন কোনো ফন্দি ঘুরছে। সে ঝামটা দিয়ে আড়চোখে তাকিয়ে বলল।
“অসভ্যতামি করার ধান্ধা আছে, তাই না? লক্ষণ তো সুবিধের ঠেকছে না!”
নেহাল যেন আকাশ থেকে পড়ল! সে হুট করে পাশ থেকে কম্বলটা টেনে নিয়ে একদম মেয়েলি ভঙ্গিতে নিজের মুখ ঢেকে ন্যাকামি করে বলল।
“ইস! কী লজ্জা! বউ কীভাবে হুটহাট মনের কথা বলে দেয় রে! আমার তো একদম শরম লেগে যাচ্ছে। কেন এমন করলা আরফা? শরমে তো মুখই দেখাতেই পারছি না আমি।”
আরফা বেণী গাঁথতে গাঁথতেই আয়নার দিকে কড়া নজরে তাকাল। নেহালের এই নাটুকেপনা দেখে সে কপালে হাত দিয়ে বিরক্ত হয়ে বলল।
“আপনার এই ঢং দেখলে আর বাঁচি না! আপনার আবার শরম? আমার তো মাঝে মাঝে সন্দেহ হয়, শরম নামক কোনো বস্তু আদৌ কি আপনার ভেতরে অবশিষ্ট আছে?”
নেহাল এবার কম্বল সরিয়ে এক লাফে উঠে বসল। সে একটা বাঁকা হাসি দিয়ে আরফার দিকে এগোতে এগোতে বলল।
“শোনো বউ রৌদ্র আয়ান সিরিয়াল ধরে প্রমোশন পেয়ে যাচ্ছে। শিহাব ও মনে হয় পাওয়ার জন্য মনেমিশনে নেমে গেছে। আমি তো আর পিছিয়ে থাকতে পারি না! শরম দিয়ে তো আর বংশ রক্ষা হবে না আরফা, এখন তো একটু কাজের কাজ করা দরকার।”
আরফা তাড়াতাড়ি বেণী শেষ করে উঠে দাঁড়িয়ে সাবধানে পিছিয়ে গেল। নেহালের মতলব দেখে সে চোখ বড় বড় করে শাসিয়ে বলল।
“খবরদার! একদম কাছে আসবেন না বলছি। আমি এখন ঘুমাবো।”
কে শোনে কার কথা! নেহাল এক ঝটকায় এগিয়ে এসে আরফাকে পাঁজাকোলা করে কোলে তুলে নিল। আরফা অপ্রস্তুত হয়ে নেহালের গলা জড়িয়ে ধরল। নেহাল তার চোখের দিকে তাকিয়ে মাতাল করা গলায় বলল।
“তোমার কী মনে হয় আরফা? তোমার মতো সুন্দরী বউ পাশে থাকতে এমন পাগল স্বামী কি তোমাকে এত সহজে ঘুমাতে দেবে? একদম না! চলো।”
কথাটা বলেই নেহাল আরফাকে বিছানার দিক নিয়ে যেতে যেতে দুষ্ট মাখা স্বরে গলার সুর টেনে বলল।
“রুমের বাতি নিভাইয়া,তোমাকে সাথে নিইয়া, বংশের বাতি দিমু জ্বালাইয়া।”
বলেই নেহাল আরফাকে পরম মমতায় বিছানায় শুইয়ে দিল। তারপর এক হাত বাড়িয়ে রুমের লাইটটা অফ করে দিতেই চারপাশ ঘুটঘুটে অন্ধকারে ডুবে গেল। সেই অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গেল তাদের খুনসুটি। নেহালও আরফাকে নিয়ে হারিয়ে গেল এক গভীর ভালোবাসার সাগরে, যেখানে কেবল তারা দুজন আর তাদের হৃদস্পন্দনের শব্দ।
রানিং…!
আজকের পর্বে টক ঝাল মিষ্টি আছে মনে হয় 🤦♀️
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৮
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৬