Golpo romantic golpo নির্লজ্জ ভালোবাসা

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৪


নির্লজ্জ_ভালোবাসা

লেখিকাসুমিচোধুরী

পর্ব ৭৪ ( সারপ্রাইজ পর্ব)

❌আমার অনুমতি ছাড়া যেই ফেক পেইজ আমার গল্প কপি করেন আমি ঠান্ডা মাথায় বলছি আপনি আস্তো গু খান❌

রাত বারোটা ছুঁইছুঁই। চারদিক নিস্তব্ধ হয়ে এলেও তিথির মনে প্রশান্তি নেই। সে ব্যালকনির গ্রিল ধরে একদৃষ্টিতে বাড়ির মেইন গেটের দিকে তাকিয়ে আছে। সন্ধ্যার পর আয়ান বেরিয়ে গেছে, এখনো ফেরার নাম নেই। শীতের এই কনকনে রাতে তিথির চোখে ঘুম নেই, বরং এক অজানা অস্থিরতা তার শরীর জুড়ে বাসা বেঁধেছে। হঠাৎ তার মনে হলো, আয়ান পাশে না থাকলে তার চারপাশটা কেমন হাহাকারের মতো শোনায়। সে আজ বুঝতে পারছে, আয়ানের প্রতি তার এই টানটা কেবল দীর্ঘদিনের শূন্যতা বা একা থাকার অভ্যাস নয় এটা তার চেয়েও গভীর কিছু।প্রতিটি মুহূর্তে আয়ানকে কাছে পাওয়ার তীব্র আকাঙ্ক্ষা, তার কণ্ঠস্বর শোনার জন্য অস্থিরতা আর তার বুকে মাথা রেখে সব ক্লান্তি ভুলে যাওয়ার এই যে ব্যাকুলতা এটাই কি ভালোবাসা? তিথির বুকের ভেতরটা আজ এক অজানা সুখে তোলপাড় করছে। সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে, আয়ানকে সে শুধু নিজের জীবনের অংশ হিসেবে চায় না, বরং তার পুরো অস্তিত্ব জুড়ে এখন কেবল আয়ানেরই বসবাস। এই নিঃশব্দ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে তিথি আজ নিজের কাছেই স্বীকার করে নিল আয়ানকে সে নিজের জীবনের চেয়েও বেশি গভীর ভাবে ভালোবেসে ফেলেছে।আগে যখন আয়ান তার ওপর অধিকার খাটাত, অহেতুক রাগ দেখাত বা পাগলামি করত, তখন তিথি বিরক্ত হতো। কিন্তু এখন যখন আয়ান একদম বদলে গেছে, যখন সে আগের মতো তিথিকে নিয়ে কোনো মাতামাতি করে না সেই শূন্যতাটুকু তিথিকে প্রতি মুহূর্তে কুরে কুরে খাচ্ছে। আয়ানের এই শান্ত থাকাটা যেন ঝড়ের আগের নিস্তব্ধতা।

তিথি তার পেটে হাত রেখে দীর্ঘশ্বাস ফেলল। কীভাবে এই খবরটা সে আয়ানকে দেবে? এই সত্যিটা বলার মতো শক্তি বা সাহস তিথি যেন কোনোভাবেই সঞ্চয় করতে পারছে না। আর বাড়ির বড়দের কাছেও সে মুখ খুলতে পারছে না।হঠাৎ করেই প্রকৃতির মেজাজ বদলে গেল। গা ছমছমে নিস্তব্ধতা ভেঙে দিয়ে তীব্র গতিতে বাতাস বইতে শুরু করল। শীতের সেই ঝোড়ো বাতাসে তিথির চুলগুলো পাগলের মতো মুখে এসে পড়ছে। সে বারবার চুল সরাচ্ছে আর গেটের দিকে তাকাচ্ছে।

ঠিক তখনই গেটের সামনে একটা গাড়ির হেডলাইটের আলো পড়ল। তিথির বুকের ধুকপুকানি বেড়ে গেল। গাড়ি থেকে যে নামল, তাকে চিনে নিতে তিথির এক সেকেন্ডও দেরি হলো না। টলমল পায়ে গাড়ি থেকে নামল আয়ান। দূর থেকে দেখে মনে হচ্ছে আজ সে বেশ ক্লান্ত, কিংবা অন্য কিছু।

আয়ান টলতে টলতে বাড়ির ভেতরে ঢুকল, তার হাঁটাচলার ধরন দেখেই বোঝা যাচ্ছে মাথার ভেতরটা আজ পুরোপুরি তার নিয়ন্ত্রণে নেই এবং সে ড্রিংক করেছে।আয়ান বড় বড় পা ফেলে কোনোমতে রুমে এসে ঢুকল । তিথি এতক্ষণ ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আয়ানের অপেক্ষাই করছিল। আয়ানকে রুমে ঢুকতে দেখে সে ও ধীরপায়ে ভেতরে এল।

তিথি ঠিক আয়ানের মুখোমুখি এসে দাঁড়াতেই দুজনের চোখাচোখি হলো। আয়ানের দিকে তাকিয়ে তিথি যেন মুহূর্তেই শিউরে উঠল। এমন আয়ানকে সে তার পুরো জীবনে কখনো দেখেনি। আয়ানের সেই তীক্ষ্ণ চোখের মণি দুটো আজ রক্তবর্ণ হয়ে আছে, কপালে এলোমেলো চুলগুলো ঘামে লেপ্টে একাকার। শার্টের উপরের দুটো বোতাম খোলা, বুকের কাছে ঘামে শার্টটা গায়ের সাথে লেপটে আছে। পুরো মানুষটার মাঝেই আজ এক ধ্বংসাত্মক অবহেলা।

আয়ান তিথির দিকে এক পলক তাকাল, কিন্তু সেই দৃষ্টিতে কোনো চেনা মানুষ ছিল না। সে কোনো কথা না বলে টলমল পায়ে বিছানার দিকে যেতে চাইল, কিন্তু শরীরের ভারসাম্য তাকে বেইমানি করল। এক কদম ফেলতেই সে যখন হুড়মুড় করে ফ্লোরে পড়ে যেতে নিল,তিথি পাগলের মতো ছুটে গিয়ে আয়ানকে জাপটে ধরল।

আয়ানের শরীরের পুরো ভারটা তিথির ওপর আসতেই আয়ানের মুখ থেকে বেরিয়ে আসা সেই কড়া পানীয়র তীব্র আর কটু গন্ধটা সরাসরি তিথির নাকে এসে ধাক্কা দিল। এমনিতেই তিথির এখনকার শারীরিক অবস্থায় সামান্য সুগন্ধিও সহ্য হয় না, সেখানে এই উৎকট গন্ধ! তিথির মনে হলো তার নাড়িভুঁড়ি সব এক নিমেষে দলা পাকিয়ে গলার কাছে উঠে এসেছে। শরীরটা রি রি করে উঠল তার। সে তড়িঘড়ি করে মুখটা অন্য দিকে ঘুরিয়ে প্রাণপণে বমি আটকে ফিসফিস করে বলে উঠল।

“ওয়াক থু ! আয়ান তুমি ড্রিংক করেছ?”

আয়ান নেশার ঘোরে টলতে টলতে তিথির চোখের দিকে তাকাল। তার সেই লাল হয়ে থাকা চোখ দুটোতে আজ রাজ্যের অবহেলা আর তাচ্ছিল্য। তিথির প্রশ্নের উত্তরে সে জড়িয়ে যাওয়া গলায় কর্কশভাবে বলে উঠল।

“আমি নেশা করি আর যাই করি, তাতে তোর কী? ছাড় আমায়! তোর ছোঁয়া এখন আমার কাছে বিষাক্ত মনে হয়। একদম টাচ করবি না আমাকে।”

বলেই আয়ান নেশার ঘোরেই তিথিকে একটা হালকা ধাক্কা দিল। যদিও শরীরে খুব একটা শক্তি ছিল না, তবুও সেই অবহেলার ধাক্কাটা তিথির হৃদয়ে গিয়ে তীরের মতো বিঁধল। তিথি ছিটকে সরে গেল না, বরং আরও শক্ত করে আয়ানকে আঁকড়ে ধরল। তার চোখের সামনে আজ সেই আয়ান দাঁড়িয়ে নেই যে নেশার নাম শুনলে দশ হাত দূরে থাকত, যে ছিল সবার আদর্শ। আজ সেই আয়ানকে এই রূপে দেখে তিথির বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল।

মুহূর্তের মধ্যে তিথি আয়ানকে ছেড়ে দিয়ে আয়ানের পা দুটো জড়িয়ে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ল। ডুকরে কেঁদে উঠে সে আকুতি করতে লাগল।

“আয়ান, দোহাই তোমার! আমার সমস্ত ভুল, সমস্ত অপরাধের জন্য তুমি আমাকে মাফ করে দাও। আমি তোমাকে এই রূপে সহ্য করতে পারছি না। তুমি আমাকে মেরে ফেলো, যা শাস্তি দেওয়ার দাও, আমি মাথা পেতে নেব। কিন্তু প্লিজ আয়ান, তুমি আগের মতো ফিরে এসো। তুমি এমন করলে আমি যে মরে যাব।

তিথির আর্তনাদ আর কান্না শুনে আয়ান হঠাৎ খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ ছিল না, ছিল এক বুক হাহাকার আর উন্মাদনা। সে নিজের পা ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে জড়িয়ে যাওয়া গলায় বলল।

“কেন? আমি কি আয়ান না? আমাকে দেখে কি এখন আয়ান মনে হয় না? বল না, কেমন দেখাচ্ছে আমাকে? খুব ভালো নাকি খুব খারাপ? বল তিথি, বল!”

তিথি আয়ানের পা দুটো আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরল। তার চোখের জলে আয়ানের পায়ের কাছের প্যান্টটা ভিজে একাকার। সে ভাঙা গলায় ডুকরে কেঁদে উঠে বলল।

“আয়ান, তোমার পায়ে পড়ি, প্লিজ আমাকে মাফ করে দাও! আমি জানি আমি অনেক বড় ভুল করেছি, কিন্তু তুমি আমাকে আর দূরে ঠেলে দিও না। আমি তোমাকে চাই আয়ান, আমি তোমার সাথে থাকতে চাই! দোহাই তোমার, আমাকে আর একটা বার সুযোগ দাও। আমি নিজেকে শুধরে নেব, সব ঠিক করে দেব।”

আয়ান এবার ভীষণ বিরক্ত হলো। নেশার ঘোরে তার মাথার ভেতরটা যেন ছিঁড়ে যাচ্ছে, আর তিথির এই কান্না সেই যন্ত্রণাকে আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে। সে পা ঝাড়া দিয়ে ছাড়ানোর চেষ্টা করতে করতে ধমক দিয়ে বলল।

“তিথি, মাথা নষ্ট করিস না! পা ছাড় বলছি। আমি নিজের মধ্যে নাই, বেশি জোরাজুরি করলে উল্টোপাল্টা কিছু করে ফেলব। পা ছাড়, আমি ঘুমাব!”

কিন্তু তিথি আজ নাছোড়বান্দা। সে জানে আজ যদি আয়ানকে এই অবস্থায় ছেড়ে দেয়, তবে তাদের দূরত্ব চিরস্থায়ী হয়ে যেতে পারে। সে জেদ ধরে আরও জোরে পা জড়িয়ে ধরে বলল।

“না! আমি ছাড়ব না। তুমি যতক্ষণ পর্যন্ত আমাকে মাফ না করছ, যতক্ষণ না বলছ তুমি আর কোনোদিন এসব ছোঁবে না ততক্ষণ আমি এই পা ছাড়ব না। তুমি আমাকে মেরে ফেললেও না।

“ছাড়বি না তাহলে পা?”

“না, না, না!”

আয়ান মুহূর্তের মধ্যে হিংস্র হয়ে উঠল। নেশার ঘোরে সে হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে এক ঝটকায় তিথিকে ফ্লোর থেকে তুলে সজোরে বিছানায় ধাক্কা মেরে ফেলে দিল। তিথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই আয়ান বাজপাখির মতো তিথির ওপর চেপে বসল। তিথির নরম কোমরটা এক হাতে শক্ত করে চেপে ধরে সে তিথির ঠোঁট দুটো নিজের আয়ত্তে নিয়ে নিল।

কিন্তু এটা কোনো ভালোবাসা বা সোহাগের ছোঁয়া ছিল না এ ছিল এক বুক জমানো যন্ত্রণার বহিঃপ্রকাশ। আয়ান কোনো চুমু খেল না,বরং মনের সবটুকু ঘৃণা আর কষ্ট দিয়ে তিথির ঠোঁটে কামড়ের পর কামড় দিতে থাকল। আয়ানের মুখের সেই উৎকট ড্রিংকের গন্ধ সরাসরি তিথির নাকে-মুখে যাওয়ায় ওর পাকস্থলী উল্টে পেট ফেটে বমি আসছে। অন্যদিকে ঠোঁটের সেই তীব্র কামড়ের যন্ত্রণায় তিথির চোখ থেকে নোনা জল অঝোরে গড়িয়ে পড়ছে।

তিথি প্রাণপণে আয়ানকে ধাক্কা দিয়ে সরাতে চাইল। তার এখন শুধু নিজের নয়, ভেতরের সেই ছোট্ট প্রাণটার কথাও ভাবতে হচ্ছে। কিন্তু আয়ান আজ কোনো বাধা মানছে না। সে আরও হিংস্র হয়ে তিথির দুই হাত বিছানায় সজোরে চেপে ধরল, যেন সে আজ সবটুকু অধিকার আদায় করে নেবে। তিথির ঠোঁট কেটে রক্ত বেরিয়ে আসছে, কিন্তু আয়ানের কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। সে যেন এই ব্যথার মাঝেই নিজের মনের জ্বালা মেটানোর চেষ্টা করছে।

তিথি আতঙ্কে পাথর হয়ে গেল। তার পেটে আয়ানেরই সন্তান, অথচ আয়ান নেশার ঘোরে আজ একি নিষ্ঠুর আচরণ করছে! আয়ান যেন এক উন্মত্ত পশুর মতো তিথির ঠোঁট কামড়ে রক্তাক্ত করে দিল। ঠোঁট চিরে নোনা রক্তের স্বাদ আয়ানের মুখে লাগলেও তার হুঁশ ফিরল না। সে পাগলের মতো ঘন ঘন শ্বাস নিতে নিতে তিথির ঘাড়ের কাছে মুখ ডুবিয়ে দিল।

আয়ান এখন হিতাহিত জ্ঞানশূন্য। নেশার তীব্রতা তাকে এতটাই গ্রাস করেছে যে সে নিজের অস্তিত্বটুকুও ভুলে গেছে। তিথি চিৎকার করে বলতে চাইছে, “আয়ান থামো! তোমার সন্তান আমার পেটে, অন্তত তার কথা ভেবে নিজেকে সামলাও!” কিন্তু এক অজানা আতঙ্কে আর কান্নায় তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। মনে হচ্ছে কোনো অদৃশ্য শক্তি তার কণ্ঠস্বর রোধ করে রেখেছে।

ধীরে ধীরে আয়ানের ছোঁয়া যখন আরও গভীর আর হিংস্র হতে শুরু করল, তখন তিথির মনের ভেতরের মায়ের মমতা জেগে উঠল। সে বুঝতে পারল আর চুপ করে থাকলে নিজের সন্তানের ক্ষতি হয়ে যেতে পারে। সে সমস্ত শক্তি সঞ্চয় করে ডুকরে কাঁদতে কাঁদতে চিৎকার দিয়ে বলে উঠল।

“আয়ান, প্লিজ থামো! তোমার সন্তান আমার পেটে! উল্টাপাল্টা কিছু করো না, আমাদের বাচ্চাটার ক্ষতি হয়ে যাবে।”

কথাটা বলেই তিথি ভয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। সে ভাবল আয়ান হয়তো এবার আরও রেগে যাবে বা অবাক হবে। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হওয়ার পরও কোনো প্রতিক্রিয়া না পেয়ে তিথি ধীরে ধীরে চোখ খুলল। রুমের ভেতর এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা। তিথি দেখল আয়ান একদম নিশ্চুপ হয়ে গেছে। তার কোনো নড়াচড়া নেই।

তিথি ভালো করে লক্ষ্য করল, আয়ানের সেই ভারী আর তপ্ত নিঃশ্বাসগুলো এখন নিয়মিত ছন্দে তার বুকের ওপর আছড়ে পড়ছে। আয়ান তার বুকের ওপর মুখ রেখেই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেছে। নেশার তীব্রতা আর শরীরের ক্লান্তি মিলিয়ে আয়ান আর নিজেকে ধরে রাখতে পারেনি। তিথির বুকেই মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেছে।

আয়ান এখন একদম ছোট বাচ্চাদের মতো নিশ্চিন্তে ঘুমিয়ে আছে। তার সেই নিষ্পাপ শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে তিথির কলিজা যেন মোচড় দিয়ে উঠল। কে বলবে এই মানুষটাই মাত্র কিছুক্ষণ আগে এক উন্মত্ত জানোয়ারের মতো তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে লাগছিল! এখন তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক অবুঝ শিশু, যে দীর্ঘদিনের ক্লান্তি শেষে এক চিলতে আশ্রয়ের খোঁজে শান্তিতে ঘুমিয়ে পড়েছে।

তিথি পরম মমতায় আয়ানের এলোমেলো চুলের মাঝে আঙুল ডুবিয়ে দিল। আলতো করে মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তার চোখের কার্নিশ বেয়ে জল উপচে পড়ল। সে নিজেকে আর সামলাতে পারল না নিচু হয়ে আয়ানের কপালে একটা দীর্ঘ চুমু খেয়ে ফিসফিস করে বলল।

“আমি জানি আয়ান, তোমার এই অবস্থার জন্য আমিই দায়ী। প্লিজ আয়ান, আমাকে ক্ষমা করো! তোমার এই অপরাধী বউটাকে মাফ করে শুধু একবার কাছে টেনে নাও। কথা দিচ্ছি, এরপর থেকে তোমার একটা কথারও অবাধ্য হব না। তুমি যেখানে বসতে বলবে সেখানে বসব, যেখানে দাঁড়াতে বলবে সেখানে দাঁড়াব। শুধু আমাকে এভাবে পর করে দিও না।”

কথাগুলো বলতে বলতে তিথি ডুকরে কেঁদে উঠল। আয়ানের এই নিষ্ঠুর পরিবর্তনের প্রতিটি ক্ষত আজ তার হৃদয়ে তীরের মতো বিঁধছে। একে একে সব স্মৃতি তিথির চোখের সামনে সিনেমার মতো ভেসে উঠতে লাগল। মনে পড়ল আরফার বিয়ের দিন সকালে আয়ান তাকে কত আকুতি করে বলেছিল “চল না দুজন মিলে ঘর সাজাই, একে অপরকে প্রাণভরে ভালোবাসি।” মনে পড়ল আয়ানের সেই পাথরচাপা আর্তনাদ “তুই যদি বিষ হস, তবে সেই বিষ পান করতেও আমি রাজি।”

আয়ানের সেই শাসন, সেই পাগলামি মাখানো অধিকার খাটানো সবকিছুই আজ তিথির কাছে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ সম্পদ মনে হচ্ছে। এমনকি সেই অভিশপ্ত রাতের কথা মনে পড়তেই তিথির বুকের ভেতরটা হাহাকারে দুমড়ে-মুচড়ে গেল, যেদিন সে নিজের হাত দিয়ে আয়ানকে আঘাত করেছিল আর আয়ান ডুকরে কেঁদে তার সবটুকু ভালোবাসা নিংড়ে দিয়েছিল।

আজ সেই আয়ান আর নেই। তার জায়গায় আজ যে মানুষটা পড়ে আছে, সে যেন এক জীবন্ত পাথর। ভাবতেই তিথির কষ্টে কলিজা ছিঁড়ে যাচ্ছে। সে ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকল তার চোখের নোনা পানি কানের পাশ দিয়ে গড়িয়ে বালিশ ভিজিয়ে দিচ্ছে।

কী অদ্ভুত এক বিধাতার লিখন! তিথি আজ যার জন্য অঝোরে চোখের জল ফেলছে, সেই মানুষটা ঠিক তার বুকের ওপরেই পরম শান্তিতে ঘুমাচ্ছে। দেখে মনে হচ্ছে কত শত রাত ধরে সে এমন এক ফোঁটা শান্তির ঘুম ঘুমায়নি। মানুষটা একদম বুকের খুব কাছে মিশে আছে, অথচ তিথি তাকে মন থেকে ছুঁতে পারছে না। তার এক মুহূর্তের ভুলে জ্যান্ত আয়ানটা আজ এক আবেগহীন জ্যান্ত লাশে পরিণত হয়েছে।

আয়ানের ভারী নিশ্বাসগুলো তিথির গলায় উষ্ণ আভা ছড়াচ্ছে। তিথি কাঁপাকাঁপা হাতে আয়ানকে আরেকটু শক্ত করে জড়িয়ে ধরল, যেন এই মুহূর্তটা কোনোদিন শেষ না হয়।


ভোরবেলার মিষ্টি রোদের আভা জানলার পর্দা চুইয়ে ঘরে এসে পড়েছে। পাখির কিচিরমিচির ডাকে আয়ানের যখন ঘুম ভাঙল, সে ঘুমের ঘোরেই অনুভব করল কোনো এক অতি পরিচিত নরম উষ্ণতায় সে ডুবে আছে। অবচেতন মনেই আয়ান চোখ মেলে তাকাল। কিন্তু পরক্ষণেই যখন সে দেখল সে তিথির ওপর একদম লেপ্টে শুয়ে আছে, ওর শিরদাঁড়া দিয়ে এক তীব্র শীতল স্রোত বয়ে গেল।

মুহূর্তের মধ্যে আয়ান এক ঝটকায় বিছানা থেকে নেমে দাঁড়িয়ে পড়ল। আচমকা এই ধড়ফড়ানিতে তিথির ঘুমটাও ভেঙে গেল। সে চোখ কচলে তাকিয়ে দেখল আয়ান শার্টের কলার ঠিক করতে করতে বিভ্রান্ত চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। আয়ানের মাথায় কাল রাতের ঝাপসা স্মৃতিগুলো ভিড় করছে, কিন্তু ঠিক কী ঘটেছিল তা সে স্পষ্ট করতে পারছে না। তার শুধু মনে পড়ল প্রচুর ড্রিংক করেছিল কাল রাতে, কিন্তু তিথির সাথে কী আচরণ করেছে তা একদমই অন্ধকার।

আয়ান শান্ত কিন্তু দ্বিধামাখা কণ্ঠে তিথিকে জিজ্ঞেস করল।

“তিথি কাল রাতে কি আমি উল্টোপাল্টা কিছু করেছি তোর সাথে?।”

তিথি বিছানায় উঠে বসে আয়ানের দিকে তাকাল। আয়ানের সেই আগের মতো শান্ত চোখ দুটো দেখে তিথির বুকটা হু হু করে উঠল। সে জানে, আয়ানকে কাল রাতের হিংস্রতার কথা বললে ও নিজের ওপর ঘৃণা শুরু করবে। তিথি নিজের কামড়ে রক্তাক্ত হওয়া ঘাড় ওড়না দিয়ে আড়াল করে অতি কষ্টে নিজেকে সামলে নিল। তারপর ধীরস্বরে মিথ্যে বলে দিল।

“না।”

“ওহ।”

বলেই আয়ান একটা লম্বা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল। সে মনে মনে ভাবল যাক, অন্তত কোনো অপ্রীতিকর পরিস্থিতি তৈরি হয়নি। আয়ান আর এক সেকেন্ড দেরি না করে সোজা ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল।

[সকাল ১০:০০]

রৌদ্র সম্পূর্ণ তৈরি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে শেষবারের মতো নিজেকে দেখে নিল। পাশেই বিছানায় তুরা ভীষণ মন খারাপ করে বসে আছে, তার চোখেমুখে বিচ্ছেদের স্পষ্ট ছাপ। রৌদ্র তুরার সামনে এসে বসল। তুরার ফোলা ফোলা গাল দুটো আলতো করে টেনে দিয়ে আদুরে স্বরে বলল।

“আমার বাবুর আম্মুটা এইভাবে মন খারাপ করে থাকলে আমি যাব কীভাবে, বলো তো?”

তুরা রৌদ্রর চোখের দিকে তাকাতে পারল না। সে মাথা নিচু করে ধরা গলায় বলল।

“খুব মিস করব আপনাকে।”

রৌদ্র তুরার মাথায় পরম মমতায় হাত রাখল। তুরার চিবুকটা আলতো করে উঁচিয়ে ধরে সে নরম গলায় বলল।

“শুধু কি তুমি একাই করবে? আমি আমার আদরের বউ আর আমার অনাগত সন্তানটাকে রেখে যাচ্ছি, আমার বুঝি খুব একটা ভালো লাগবে? আমারও তো কলিজাটা ফেটে যাচ্ছে তোমাদের ছেড়ে যেতে।”

তুরা কোনো উত্তর দিল না,শুধু পাথরের মতো নিশ্চুপ হয়ে বসে রইল। তার চোখদুটো যেন কান্নার ভারে নুয়ে পড়ছে। রৌদ্র তুরার গাল দুটো দুই হাত দিয়ে ধরে সোজা করে চোখের দিকে তাক করিয়ে বলল।

“তুরা, আমার চোখের দিকে তাকাও তো?”

তুরা সাথে সাথে রৌদ্রর চোখের গভীরতায় ডুব দিল। রৌদ্র হেসে বলল।

“পাগলি একটা! আমি কি সারাজীবনের জন্য যাচ্ছি? মাত্র তো পনেরো দিন। কাজ শেষ হলে হয়তো আরও আগেই ফিরে আসব।”

তুরা অভিমানী গলায় বলল।

“আপনি পনেরো দিন বলছেন ঠিকই, কিন্তু আমার কাছে এই পনেরো দিন এক বছরের সমান মনে হচ্ছে। আপনাকে ছাড়া এক মুহূর্তও কাটানো আমার জন্য কত কষ্টের তা আপনি বুঝবেন না।”

রৌদ্র তুরার কথা শুনে আলতো হাসল। তুরাকে পরম মমতায় বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল সে। তুরার কপালে একটা আলতো চুমু খেয়ে আশ্বস্ত করে বলল।

“মন খারাপ করো না, আমি কাজ শেষ করেই দ্রুত চলে আসব। আর যখনই সময় পাব, তোমাকে কল দেব। তুমি এভাবে মন খারাপ করে থাকলে আমাদের সন্তানটাও কিন্তু ভেতরে কষ্ট পাবে।”

বলেই রৌদ্র তুরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসল। সে মুখটা নিচু করে তুরার পেটে একটা ভালোবাসার চুমু খেল। তারপর ফিসফিস করে যেন খুব গোপন কোনো কথা বলছে, এমন ভঙ্গিতে বলল।

“এই যে আমার প্রিন্স বা প্রিন্সেস, তোমার পাপ্পা একটু জরুরি কাজে বাইরে যাচ্ছে। আমি না থাকা পর্যন্ত তুমি তোমার মাম্মামকে দেখে রাখবে, ঠিক আছে? আর যখনই দেখবে তোমার মাম্মা মন খারাপ করছে, তখনই একটা লাথি মেরে মনে করিয়ে দেবে যে পাপ্পা নেই তো কী হয়েছে, আমি তো আছি।”

কথাটা বলেই রৌদ্র হঠাৎ জিভ কাটল। নিজেকে সংশোধন করে নিয়ে আবার বলল।

“এই না না! মাম্মাকে একদম ব্যথা দেবে না। যখন তোমার মাম্মাম মন খারাপ করবে, তখন তুমি খুব আলতো করে নড়াচড়া করে বুঝিয়ে দেবে যে তুমি পাশে আছো। কেমন।”

রৌদ্রের এই পাগলামি আর বাচ্চামো দেখে তুরা আর নিজের হাসি চেপে রাখতে পারল না। সে খিলখিল করে হেসে উঠল। হাসতে হাসতে কোনোমতে বলল।

“আপনি যেভাবে বলছেন, মনে হচ্ছে ও এখনই আপনার সব কথা শুনতে পাচ্ছে! আর ওর নড়াচড়া বুঝতে তো আরও চার-পাঁচ মাস সময় লাগবে।”

রৌদ্র তুরার দিকে তাকিয়ে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল।

“মন থেকে ডাকলে অবশ্যই শুনতে পায়। আমি আমার সন্তানকে মন থেকে ডেকেছি, তাই ও আমার সব কথা ঠিকই শুনতে পাচ্ছে।”

বলেই রৌদ্র উঠে দাঁড়িয়ে তুরার কোমর জড়িয়ে ধরল। তাকে নিজের আরও কাছে টেনে নিয়ে পুনরায় বলল।

“তুরা, প্লিজ সাবধানে থাকবে। একদম ভারী কোনো কাজ করবে না। যা করার আম্মুদের বলবে। আর যদি কোনো ছোটখাটো সমস্যাও হয়, আমাকে সাথে সাথে জানাবে। প্লিজ, টেক কেয়ার অফ ইয়োরসেলফ এন্ড ডোন্ট ডু এনিথিং স্ট্রেসফুল। প্রমিস মি ইউ উইল স্টে সেফ আনটিল আই কাম ব্যাক।”

তুরাও রৌদ্রের চুলে বিলি কাটতে কাটতে করুণ স্বরে বলল।

“আপনিও খুব সাবধানে থাকবেন। আর একটা কথা, আমি এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আপনার সাথে যাবই, প্লিজ না করবেন না। যদি মানা করেন, আমি আপনার সাথে আর কথাই বলব না।”

রৌদ্র আর না করার সাহস পেল না। সে মুখ তুলে তুরার ছোট ছোট হাত দুটো নিজের হাতের মুঠোয় নিয়ে বলল।

“ওকে আমার পাখি।”

এরপর রৌদ্র সবার সাথে নাস্তা শেষ করল। তবে তিথি নাস্তার টেবিলে এল না, সে শরীর খারাপের অজুহাতে রুমেই রয়ে গেল। রৌদ্র সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। এয়ারপোর্ট পর্যন্ত আয়ান গাড়ি চালাচ্ছে, আর তুরা আর রৌদ্র পেছনের সিটে। রৌদ্র তুরাকে এক হাত দিয়ে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে রেখেছে, যেন ছাড়লেই তুরা হারিয়ে যাবে। গাড়ি যখন এয়ারপোর্টের গেটে এসে পৌঁছাল, তুরার বুকটা হু হু করে উঠল। মাত্র পনেরো দিনের এই বিচ্ছেদ তুরার কাছে মনে হচ্ছে হাজার বছরের এক দীর্ঘ পথচলা।

গাড়ি থেকে নেমে রৌদ্র বাম হাতে সুটকেসটা ধরে তুরার সামনে এসে দাঁড়াল। তুরার মাথায় মমতায় হাত রেখে বলল।

“আসি পাখি? নিজের খেয়াল রাখবে আর আমাদের সন্তানটাকেও দেখে রেখো। আমি কিন্তু ফিরে এসে তোমাদের দুজনকে অনেক জ্বালাব, তৈরি থেকো।”

তুরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সবার সামনেই রৌদ্রকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠে বলল।

“আপনি প্লিজ খুব তাড়াতাড়ি ফিরে আসবেন। সবসময় আমাকে কল দেবেন আর নিজের দিকে খেয়াল রাখবেন।”

রৌদ্রও এক হাত দিয়ে তুরাকে জাপটে ধরে ওর কপালে শেষবারের মতো একটা গভীর চুমু খেল। ধরা গলায় বলল।

“একদম চিন্তা করবে না। আমি ঠিক থাকব, শুধু তুমি নিজের খেয়াল রাখবে। আই উইল মিস ইউ এভরি মোমেন্ট।”

এরপর রৌদ্র এয়ারপোর্টের ভেতরে প্রবেশ করল। পেছনে পেছনে তুরা আর আয়ানও কিছুটা এগিয়ে গেল। রৌদ্র বড় বড় পা ফেলে বিমানের দিকে এগোতে লাগল। ঠিক সিড়িতে পা দেওয়ার আগে সে একবার থামল। মন মানছে না,তাই পুনরায় পেছনে ঘুরে তার অশ্রুভেজা বউয়ের মায়াবী চোখের দিকে তাকাল। রৌদ্র আর বেশিক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে থাকতে পারল না, কারণ বেশিক্ষণ তাকালে হয়তো সে যাওয়ার সিদ্ধান্তটাই বদলে ফেলবে। সে দ্রুত মুখ ফিরিয়ে বিমানে উঠে পড়ল।

ধীরে ধীরে সব যাত্রী উঠে গেল, বিমানের ভারী দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। রানওয়ে দিয়ে চলতে চলতে বিমানটা এক সময় গর্জন করে আকাশে উড়াল দিল। দেখতে দেখতে বিমানটি আকাশের বিশালতায় হারিয়ে গেল আর সাদা মেঘের আড়ালে মিলিয়ে গেল।বিমানের সেই উধাও হয়ে যাওয়া দেখে তুরার বুকের ভেতরটা যেন ছ্যাঁত করে উঠল। এক অজানা শূন্যতা তাকে গ্রাস করল। পাশে দাঁড়িয়ে থাকা আয়ান তুরার কাঁধে হাত রেখে নিচু স্বরে বলল।

“তুরা মন খারাপ করিস না মাএ পনেরো দিনেরই তো ব্যাপার রৌদ্র ভাই তাড়াতাড়ি চলে আসবে চল এখন বাড়ি যাই।”

রানিং…!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply