নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৭৯ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
আয়ান থ্রি বলার সাথে সাথে ধুম করে পুরো হল রুমের আলো জ্বলে উঠল। আর তুরা বিস্ময়ে জাস্ট ‘হা’ হয়ে গেল হল রুমের চারপাশটা যে এত সুন্দর করে সাজানো হতে পারে, সেটা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
প্রতিটা দেয়ালে গুচ্ছ গুচ্ছ রঙিন বেলুন আর তাজা গোলাপের তোড়া। ঝিলমিলে জরি আর আলোকসজ্জায় পুরো ঘরটা যেন একটা পরীর রাজ্যে পরিণত হয়েছে। প্রতিটি কোনায় আভিজাত্য আর ভালোবাসার ছোঁয়া এক কথায় অসাধারণ তুরা কয়েক মুহূর্তের জন্য নিজের নিঃশ্বাস নিতে ভুলে গেল। সে বুঝতে পারছে না এটা কি স্বপ্ন নাকি কোনো অলীক বাস্তব। সে কি সত্যিই তার নিজের বাড়ির হল রুমে দাঁড়িয়ে আছে।
তুরা কাঁপা কাঁপা চোখে আয়ানের দিকে তাকাল। তার চোখে তখন হাজারো প্রশ্ন আর বিস্ময়। আয়ান তুরার চোখের ইশারা আর মনের অবস্থা বুঝতে পেরে একটা বাঁকা হাসি দিল। সে পকেটে হাত দিয়ে ক্যাজুয়াল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে বলল।
“কী রে? খুব স্বপ্ন মনে হচ্ছে তোর? ভাবছিস এই সাজসজ্জাগুলো আকাশ থেকে ডানা মেলে উড়ে এসেছে?”
তিথি পাশ থেকে মুচকি হেসে তুরার কাঁধে হাত রাখল। তুরা এখনো ঘোরের মধ্যে আছে। সে বিড়বিড় করে বলল।
“এসব… এসব কখন হলো ভাইয়া? আর কেন?”
আয়ান এবার ঘড়ির দিকে তাকিয়ে বলল।
“কেনর উত্তর তো আমি দেব না। যার দেওয়ার কথা সে-ই দেবে। তবে আপাতত এটা জেনে রাখ, বিমানে কিন্তু কোনো ব্যাক গিয়ার হয় না।”
আয়ান কথাটা বলার সাথে সাথে হঠাৎ চারদিকের নিস্তব্ধতা ভেঙে কারো ধীরলয়ে হাততালি দেওয়ার শব্দ শোনা গেল। সেই তালের সাথে তাল মিলিয়ে একটা গভীর এবং অসম্ভব পুরুষালি মায়াবী কণ্ঠস্বর হল রুমের প্রতিটি কোণায় প্রতিধ্বনিত হয়ে উঠল।
“যার জন্য আমার পুরো পৃথিবীটা আজ স্থির হয়ে আছে, তার বিশেষ দিনটা কি এমনি এমনি চলে যেতে দেওয়া যায়”
বউ, তুমি বড্ড অভিমানী,বুঝো না মনের ভাষা,
স্বামীর বুকে জমে থাকা নীরব কষ্টের আশা,
পাষাণ হয়েছিলাম জানি,কলটা ধরি নাই ঠিক,
কিন্তু সব নীরবতা ছিল এই দিনটারই দিক,
চেয়েছিলাম তোমায় চমকে দিতে, হাসাতে একটু বেশি,
ভুলে নিজেকেই বানালাম আমি অপরাধীর বেশী,
তবু ক্ষমা চাইতে কখনো আমার হয়নি দেরি,
মাথা নিচু করে দাঁড়াই আজ তোমার দরজায়,
আমার অর্ধাঙ্গিনী তুমি, জীবনের প্রতিটা গান,
হৃদয়, প্রাণ আর অস্তিত্ব দিয়ে বলি শুভ জন্মদিন জান,
তুরা পরিচিত,এত কাছের কণ্ঠটা শুনে ধীরে ধীরে সামনে তাকাতেই তার স্পন্দন কেঁপে ওঠে। চোখ তুলে তাকাতেই দেখে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে রৌদ্র, হাতে ইয়া বড্ড একটা লাল বেলুন। বেলুনটার গায়ে সাদা অক্ষরে লেখা।
“Sorry my love, I’m late
Because, many happy returns of day day”
রৌদ্রের কথায় তুরা অবাক হওয়ার চরম পর্যায়ে চলে গিয়েছে। ঠিক সেই মুহূর্তে বাড়ির অন্ধকার কোণে লুকিয়ে থাকা সবাই আনোয়ার খান, আশিক খান, আরিফুল খান, রৌশনি খান, তনুজা খান, হিমি খান, শিহাব আর নেহাল একে একে বেরিয়ে এলেন। তারা সবাই সমস্বরে হাততালি দিতে দিতে গেয়ে উঠলেন।
“Happy Birthday To You… Happy Birthday To You!”
সবার কণ্ঠের সেই সুর আর হাততালির মাঝেই হঠাৎ ধুম করে চারপাশ থেকে বৃষ্টির মতো টকটকে লাল গোলাপের পাপড়ি ঝরতে লাগল তুরার ওপর। তুরা বিস্ময়ে ওপরের দিকে তাকিয়ে দেখল, রেলিংয়ের পাশ থেকে আরশি আর আরফা দুহাত ভরে গোলাপের পাপড়ি নিচে ফেলছে আর চিৎকার করে বলছে।
“Happy Birthday Tura! Happy Birthday!”
তুরা যেন কথা বলার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলেছে। আজ যে তার জন্মদিন, সেই কথা তার নিজেরই মনে ছিল না।অথচ তার অজান্তেই তাকে ঘিরে এত বড় একটা আয়োজন হয়ে গেল। ঠিক সেই সময় তিথি দ্রুত হাতে বিশাল বড় একটা কেক এনে তুরার সামনে সাজানো টেবিলটার ওপর রাখল। কেকের ওপর জ্বলজ্বল করছে বাইশটা মোমবাতি।রৌদ্র এবার খুব ধীরে ধীরে তুরার পাশে এসে দাঁড়াল। সে আলতো করে তুরার হাতটা ধরে সেখানে রুপালি রঙের একটা ছুরি ধরিয়ে দিল। তারপর তুরার কানের কাছে মুখ নামিয়ে খুব নিচু আর দুষ্টুমিভরা গলায় বলল।
“কী মিসেস আব্রাহাম খান রৌদ্র? দেখা কি শেষ হলো? দয়া করে এইবার কেকটা কাটুন, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে। নাহলে কিন্তু কেক কাটার আর সময় থাকবে না, আমাদের আরও অনেক কিছু করার বাকি আছে।”
তুরা রৌদ্রের কথায় একদম হতভম্ব হয়ে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“আপনি… আপনি কখন এলেন?”
রৌদ্র ঠোঁটের কোণে দুষ্টুমিভরা হাসি ঝুলিয়ে বেশ ভাব নিয়ে বলল।
“আরে, ওই যে বললাম না বিমানটা মাঝ আকাশে উল্টো গিয়ার দেব।তো যেই না গিয়ারে হাত দিয়েছি, অমনি মনে হলো এতটা পাষাণ হওয়া কি ঠিক হবে? তার চেয়ে বরং বিমান থেকে একটা লাফ দিয়ে সরাসরি তোমার ড্রয়িংরুমে ল্যান্ড করি। তাই আর গিয়ার দেওয়া লাগল না, একদম প্যারাশুট ছাড়াই তোমার সামনে এসে হাজির হয়েছি।”
রৌদ্রের এমন আজগুবি আর ফানি কথা শুনে বাড়ির সবাই হো হো করে হেসে উঠল। ঠিক তখনই তিথি তুরার একদম কাছে এসে ফিসফিস করে অথচ বেশ রসিয়ে বলল।
“ওরে আমার বুদ্ধিমতী আপু রে। তুমি হয়তো একটা জিনিস মোটেও লক্ষ্য করোনি যে, বিমান কখনো মাঝ আকাশে ট্রাকের মতো উল্টো ঘুরানো যায় না। আর বিমানে তো নেটওয়ার্কই পায় না, তাহলে রৌদ্র ভাই কথা বলল কীভাবে? সব থেকে বড় কথা, রৌদ্র ভাই যখন বলল ‘তুরাকে ছাদ থেকে ঘাড় ধরে নিচে নামিয়ে দিয়ে আয়’ তখন তোমার বুদ্ধি কি সব হাঁটুতে চলে গিয়েছিল? তুমি যে এই কনকনে ঠান্ডায় ছাদে দাঁড়িয়ে আছো, সেটা নিচে না থাকলে রৌদ্র ভাই জানল কীভাবে? সিম্পল ক্যালকুলেশন আপু,a+b এর সূত্রের মতো সহজ যে, রৌদ্র ভাই আসলে অনেক আগেই বাড়িতে এসে লুকিয়ে ছিল।”
তিথির এই লজিক শুনে তুরা এবার নিজের বোকামি বুঝতে পেরে জিব কাটল।আসলে পরিস্থিতিটা এতটাই অসহনীয় ছিল যে, তখন রৌদ্রের প্রতিটি কথা সরাসরি বুকে গিয়ে বিঁধলেও তার মগজ খাটানোর মতো অবস্থায় ছিল না। তুরার সেই বিমূঢ় অবস্থা দেখে রৌদ্র এবার একটু সিরিয়াস হয়ে নরম গলায় বলল।
“তুরা, এবার কেকটা কাটো।”
তুরা আর কথা বাড়াল না। সে ঝুঁকে পড়ে ফুঁ দিয়ে মোমবাতিগুলো নেভাতে শুরু করল। আর সাথে সাথে হল রুমের সবাই হাততালি দিয়ে সমস্বরে গেয়ে উঠল।
“Happy Birthday To You… Happy Birthday To You!”
তুরা ছুরিটা দিয়ে কেক কেটে প্রথমেই এক টুকরো কেক তুলে আনোয়ার খানকে খাওয়ালেন। তারপর একে একে আশিক খান, আরিফুল খান, রৌশনি খান, তনুজা খান আর হিমি খানকে কেক খাইয়ে দিল। সবশেষে যখন রৌদ্রের মুখে কেক তুলে দিতে গেল, রৌদ্র দুষ্টুমি করে কেক খাওয়ার ছলে তুরার আঙুলে আলতো করে একটা কামড় বসিয়ে দিল। তুরা ব্যথায় সামান্য কুঁকড়ে উঠলেও মুখে কোনো শব্দ করল না, বরং লাজুক হাসিতে রৌদ্রের দিকে তাকাল।তুরা বাড়ির ছোট-বড় সবাইকে এক এক করে কেক খাইয়ে দিল এবং সবাইও পরম মমতায় তুরাকে কেক খাইয়ে দিল। বড়রা তার মাথায় হাত রেখে অনেক দোয়া করলেন। সারা ঘরে তখন এক আনন্দের উৎসব বয়ে যাচ্ছে। তুরা তার চোখের কোণে জমে থাকা জল মুছে ভাবল, আজকের এই দিনটা হয়তো তার জীবনের সবচেয়ে সুন্দর আর স্মরণীয় একটা রাত হয়ে থাকবে।
বড়রা সারাদিনের ধকল আর উত্তেজনায় ক্লান্ত হয়ে পড়ায় ধীরে ধীরে যে যার রুমে চলে গেলেন। এখন হল রুমে শুধু রৌদ্র, তুরা, আয়ান, তিথি, শিহাব, আরশি, নেহাল আর আরফা আছে। পুরো ঘরে একটা স্নিগ্ধ শান্ত ভাব নেমে এসেছে। আয়ান এবার তিথির দিকে একবার তাকিয়ে তারপর তুরার দিকে ঘুরে বসল। বেশ গম্ভীর গলায় বলল।
“তুরা, রৌদ্র ভাইয়ের ভালোবাসা দেখে আমি নিজেও অবাক হয়েছি, কেন জানিস?”
তুরা জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে না সূচক মাথা নাড়ল। আয়ান একটু দম নিয়ে বলতে লাগল।
“আসলে রৌদ্র তোর কলগুলো ইচ্ছে করেই ধরেনি। কারণ, যখনই তোর সাথে কথা হতো, ভাইয়ার মনে হতো সব কাজ ফেলে ওই মুহূর্তেই দেশে ছুটে চলে আসে। তোর সাথে ফোনে কথা বলে ভাইয়া শান্তি পেত না, বরং তার কষ্ট আরও কয়েক গুণ বেড়ে যেত। তাই ভাইয়া ইচ্ছে করেই তোর থেকে নিজেকে আড়ালে রেখেছিল। কিন্তু জানিস, ভাইয়া আমাকে প্রতি সেকেন্ডে কল দিয়ে খবর নিত তুই কী করছিস, ঠিকমতো খেয়েছিস কি না, এমনকি তোর শরীরের অবস্থা সব কিছু ভাইয়া আমার কাছ থেকে একদম নিখুঁত হিসাবের মতো বুঝে নিত।”
আয়ানের কথাগুলো শুনে তুরা অপলক চোখে রৌদ্রের দিকে তাকাল। রৌদ্র তখন অন্যদিকে তাকিয়ে আছে। আয়ান আবার বলতে শুরু করল।
“আমি নিজে দেখেছি, ফোনে যখন ভাইয়া তোর কথা জিজ্ঞেস করত,ভাইয়ার স্বরটা কেমন কাঁপত। মনে হতো তোর নামটা উচ্চারণ করতেও মানুষটার প্রচণ্ড কষ্ট হচ্ছে। ঠিক কতটা ভালোবাসলে মানুষ এভাবে দূরে থেকে নিজের ভেতর গুমরে মরে আর একা হয়ে থাকে, সেটা রৌদ্র ভাইকে না দেখলে আমি বুঝতাম না।”
আয়ানের এই স্বীকারোক্তি শুনে তুরার বুকের ভেতরটা হু হু করে উঠল। সে বুঝতে পারল, যে মানুষটাকে সে এতক্ষণ ‘পাষাণ’ ভেবে মনে মনে গালি দিচ্ছিল, সেই মানুষটা আসলে তার চেয়েও অনেক বেশি কষ্টে ছিল। রৌদ্রের সেই কঠিন খোলসের নিচে যে এতটা গভীর আকুলতা লুকিয়ে ছিল, তা যেন আজ আয়ানের কথায় নতুন করে প্রাণ পেল।
আয়ান আবারও বলতে লাগল।
“শুধু তাই না, এই যে আজকের এত আয়োজন তার সব কিছু ভাইয়া নিজে দাঁড়িয়ে থেকে করিয়েছে। বাড়ির কেউ জানত না তোর জন্মদিনের কথা। কাল সারা রাত জেগে রৌদ্র ভাই লোক দিয়ে এই সব কিছু সাজিয়েছে, আর বাড়ির সবাইকে আজ সকালে জানিয়েছে তোর জন্মদিনের কথা। তুই তো অভিমানে রুম থেকে বের হতি না, ভাইয়া ঠিক এই সুযোগটাই কাজে লাগিয়েছে। এমনকি আজ তুই যাতে রুম থেকে একদমই বের না হস, তাই আম্মুকে দিয়ে তোর খাবার রুমেই পাঠিয়েছে যাতে সারপ্রাইজটা নষ্ট না হয়।”
আয়ানের কথাগুলো শেষ হওয়ার আগেই তুরার চোখ থেকে টপটপ করে অশ্রু ঝরতে শুরু করল। যার ওপর এত দিন ধরে পাহাড় সমান অভিমান আর রাগ পুষে রেখেছিল, সেই মানুষটাই তাকে খুশি করার জন্য এতটা ব্যাকুল ছিল।তুরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। সব দ্বিধা ঝেড়ে ফেলে সে দৌড়ে গিয়ে রৌদ্রকে সবার সামনেই শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। রৌদ্র এতদিন পর তুরার এমন নিবিড় আলিঙ্গন পেয়ে চারপাশের সব কিছু ভুলে গেল। সেও পরম আবেশে তুরাকে নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল।
সবাই ওদের এই ভালোবাসার দৃশ্য দেখে একটু লজ্জা পেলেও স্বতস্ফূর্তভাবে হাততালি দিতে লাগল। পুরো হল রুম যেন এই দম্পতির ভালোবাসার সাক্ষী হয়ে রইল। ঠিক সেই মুহূর্তে শিহাব আরশির একদম কানে কানে ফিসফিস করে বলল।
“দেখছ কি ভালোবাসা সরম-লজ্জা সব একদম ঝেড়ে ফেলে দিয়ে জামাইকে সবার সামনে জড়িয়ে ধরছে। তুমিও তো মাঝে মাঝে এমন লজ্জা-ভয় ভুলে আমাকে জড়িয়ে ধরতে পারো। আমরাও তাহলে অন্যদের হাততালি দেওয়ার একটা সুযোগ করে দিতাম।”
শিহাবের কথায় আরশি লজ্জায় লাল হয়ে কনুই দিয়ে শিহাবের পেটে একটা গুঁতো মেরে ফিসফিস করে বলল।
“অসভ্য একটা একদম চুপ থাকেন তো।”
‘অসভ্য’ শুনে শিহাব দমে যাওয়ার পাত্র নয়, সে উল্টো দাঁত বের করে হাসল এবং আরশিকে একটা কড়া চোখ টিপ দিল। আরশি এবার লজ্জায় একদম কুঁকড়ে গিয়ে শিহাবকে একটা ধাক্কা মেরে দুই হাত দূরে গিয়ে দাঁড়াল। তার গাল দুটো তখন টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে।
রৌদ্র আর তুরা তখনো পৃথিবীর সব মায়া ত্যাগ করে আষ্টেপৃষ্ঠে একে অপরকে জড়িয়ে ধরে আছে। তাদের এই মগ্নতা দেখে নেহাল আর স্থির থাকতে পারল না। সে নাটুকে ভঙ্গিতে এগিয়ে এসে বাম হাতটা কোমরের পেছনে ঠেকিয়ে আর ডান হাতটা ভাঁজ করে কাল্পনিক মাইকের মতো মুখের সামনে ধরল। তারপর পাড়ার কোনো খিটখিটে মুরুব্বির মতো গলা খাঁকারি দিয়ে উচ্চস্বরে বলল।
“উহুম..উহুম! অ্যাই যে শোনেন ভাই ও ভাবি, ডিরেক্টর কিন্তু অলরেডি ‘কাট’ বলে দিয়েছে। আপনাদের এই রোমান্টিক শুটিং কি আজকের মতোই চলবে নাকি? সুদূর আমেরিকা থেকে কি শুধু এই এক সিন দেখানোর জন্যই আমাদের রাত জাগালেন? দয়া করে এই সিনটা স্টপ করে এবার ‘নেক্সট’ সিনের শুটিং শুরু করলে আমরা অভুক্ত পাবলিকরা বেশ খুশি হতাম। আর কতক্ষণ এভাবে স্ট্যাচু হয়ে থাকবেন?”
নেহালের এমন পাকনা মুরুব্বি মার্কা কথা আর ভঙ্গি দেখে উপস্থিত সবাই অট্টহাসিতে ফেটে পড়ল। তুরা এবার যেন ঘোর থেকে বাস্তবে ফিরল। সবার সামনে এভাবে রৌদ্রকে জড়িয়ে ধরে আছে ভেবে তার কান-মুখ ঝাঁ ঝাঁ করতে লাগল। সে তড়িঘড়ি করে রৌদ্রের বুক থেকে ছিটকে সরে এসে একটু দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়াল এবং লজ্জায় ওড়নার খুঁট আঙ্গুলে পেঁচাতে লাগল।
নেহালের কথা শুনে শিহাব কেন পিছিয়ে থাকবে? সেও এবার কোমর দুলিয়ে এগিয়ে এল। নেহালকে একটা বেশ জোরেশোরে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল সে। তারপর একদম গ্রামের মাতব্বরদের মতো লুঙ্গি সামলানোর ভঙ্গি করে (যদিও সে প্যান্ট পরা ছিল) খাঁটি আঞ্চলিক ভাষায় খেঁকিয়ে উঠে বলল।
“আরে হ সর! সর দেহি তুই! তগো মতো কিছূ পাবলিক দেশে আছে বইলাই তো আইজকাল ফ্রিতে ভালো নাটক-সিনেমা দেখা যায় না। কত সুন্দর টিকিট ছাড়া, পপকর্ন ছাড়া পাশে নিজের বউডারে নিয়া খাড়াইয়া খাড়াইয়া আয়েশ কইরা সিনেমা দেখতাসিলাম শালা তুই আইসা সবডি লণ্ডভণ্ড কইরা দিলি! তুই একটা আস্ত ঝামেলা রে ভাই, আস্ত একখান ভেজাল!”
শিহাবের এই শুদ্ধ আর আঞ্চলিক ভাষার জগাখিচুড়ি আর অদ্ভুত ভঙ্গি দেখে হাসতে হাসতে সবার পেটে খিল ধরার দশা। আরশি তো হাসতে হাসতে সোফায় বসে পড়ল। শিহাব আবার রৌদ্র আর তুরার দিকে ফিরে দাঁত বের করে বলল।
“ওরে ভাইজান রৌদ্র! তুমি কিছু মনে কইরো না। এই পাগলটার লাইগা সিনটা নষ্ট হইল। তোমরা আবার শুরু থিকা শুরু করো দেহি, আমি এক্কেরে মনোযুগ দিয়া দেখতাছি। নেহালরে আমি ঘাড় ধইরা বাইর কইরা দিতাছি খাড়াও।”
শিহাব আর নেহালের এই পাল্টাপাল্টি যুক্তি আর অদ্ভুত সব অঙ্গভঙ্গি দেখে হল রুমে হাসির রোল পড়ে গেল। নেহাল এবার শিহাবের দিকে এক পা এগিয়ে গিয়ে লুঙ্গি গোঁজার মতো করে প্যান্টের কোমর টেনে ধরল। তারপর একদম খাঁটি পুরান ঢাকার ভাষায় দাঁত মুখ খিঁচিয়ে বলল।
“আইলো রে! আইছে আমার বড় সিনেমার দর্শক! ওরে আমার ভিউয়ার রে! টিকিট ছাড়া সিনেমা দেখতে মন চায়? পয়সা খরচ করতে কলিজায় লাগে বুঝি? ফাও পাইলে তো তুই শ্মশানে গিয়াও বিরিয়ানি খুঁজবি! শোন বল্টু, এইখানে সিনেমা দেখার হল না, এইটা ঘর। তুই সিনেমা দেখতে চাইলে মোবাইলে ইউটিউব দেখ, এইখানে ডিস্টার্ব করবি না কইলাম!”
শিহাব এবার নিজের গলার চাদরটা (কাল্পনিক) কাঁধে ঠিক করে নিয়ে নোয়াখালীর টানে চিৎকার করে উঠল।
“অই মিয়া! কারে কী কও? আঁর বাড়ির সামনে আইলে তোরে কুত্তাদি কামড়াওয়াইতাম! সিনেমা দেখা কি তোর বাপের সম্পত্তি নি? রৌদ্র ভাই হইল আঁর কলিজার টুকরা, হিতিন নাটক করলে আঁই দেখতাম ন ত কে দেখব? তুই তো আইছস ওই হের লাইগা ওই যে কী কয় হের লাইগা ফ্রি কেক খাইতে! কেক চোর কোথাকার।”
নেহাল এবার আকাশ থেকে পড়ার ভঙ্গি করে কপালে হাত দিয়ে বলল।
“কী! আমি কেক চোর? আমি কি তোর মতো পকেটে কইরা বিরিয়ানির প্যাকেট নিয়া যাই? গতবার তো দেখছিলাম বিয়ে বাড়িতে কেমনে তুই মিষ্টির বাটি পকেটে ঢুকাইলি! আব্রাহাম ভাই, আপনি দেইখেন, আইজকা আপনার কেক যদি হারায় তাইলে এই শিহাবরে আগে চেক করবেন। ওর পকেট থিকা নির্ঘাত কেক বাইর হইবো!”
শিহাব এবার তেড়ে গিয়ে নেহালের কলার ধরার ভঙ্গি করে বলল।
“অই মিয়া, কথা সাবধানে কও! আঁর পকেট তো অনেক দূরে, তোর মুখে তো এহনো কেকের ক্রিম লাইগা আছে! তুই তো কেক কাটার আগেই আধাখান খাইয়া ফেলছস! সালা ভুক্কড় কুনহানকার।”
নেহাল আর শিহাবের এই কাণ্ড আর কথা শুনে হাসতে হাসতে সবার অবস্থা দফারফা। তুরা হাসতে হাসতে প্রায় কেঁদেই দিবে এমন অবস্থা, পেটে খিল ধরে গিয়েছে তার। আরশি হাসির চোটে সোফায় গড়াগড়ি খাচ্ছে, আর তিথি হাসতে হাসতে কোনোমতে সিঁড়ির রেলিং ধরে নিজেকে সামলে রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করছে। সবচেয়ে করুণ দশা আরফার। সে হাসতে হাসতে বেচারি জ্ঞান হারানোর মতো অবস্থা করে মেঝেতেই শুয়ে পড়েছে।রৌদ্র কোনোমতে নিজের হাসি থামিয়ে নেহাল আর শিহাবের উদ্দেশ্যে বলল।
“হয়েছে হয়েছে, এখন থামো তোমরা। তোমরা পারছ, জিতেছ! সো, আমি তোমাদের সবাইকে গ্র্যান্ড ট্রিট দিব।”
রৌদ্রের মুখে ট্রিটের কথা শুনে নেহাল আর শিহাব যেন বিশ্ব জয় করে ফেলেছে! এতক্ষণের ঝগড়া ভুলে দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে গলা গালি করে একদম লুঙ্গি ড্যান্সের ভঙ্গিতে নাচতে শুরু করল। তারা কোমর দুলিয়ে বলতে লাগল।
“ইয়ে শেষমেশ জিতেছি! আমগো রৌদ্র ভাইজান মেলা খাওন খাওয়াইবো! আইজকা ভুরিভোজ হইবো রেএএএ।”
তুরা তো অবাক! ‘জিতেছ মানে?’ সে কিছুই বুঝতে পারল না। তখন আয়ান হাসতে হাসতে হাঁপাতে হাঁপাতে এগিয়ে এল। সে নিজের শ্বাস ঠিক করে বলল।
“আরে এইটা একটা পুরো নাটক ছিল রে তুরা! আসলে তোর জন্মদিনের গিফট হিসেবে আমরা রৌদ্র ভাইয়ার কাছে বড় একটা ট্রিট চেয়েছিলাম। ভাইয়া শর্ত দিয়েছিল তোর এই মনমরা ভাব কাটাতে হবে। ভাইয়া বলেছিল, জন্মদিনের মতো এমন সুন্দর দিনে মন খুলে হাসা ভালো, তাই তোকে যদি আমরা প্রাণখুলে হাসাতে পারি, তবেই ভাইয়া আমাদের সবাইকে ট্রিট দিবে। আর সেই ট্রিট পেতেই নেহাল আর শিহাব এই দুর্দান্ত ‘ক্যাটওয়াক’ আর ঝগড়ার পারফরম্যান্সটা করল।”
তুরা আরেক দফা অবাক হলো আয়ানের কথা শুনে। সাথে সাথে তুরা রৌদ্রের দিকে তাকাল। এই মানুষটা এত কিছু করে ফেলেছে তার জন্য! শুধুমাত্র তার ঠোঁটে একটু হাসি ফুটানোর জন্য এই বিশাল আয়োজন? তুরার ভাবনার মাঝেই আরফা হাসতে হাসতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।
“অনেক হয়েছে! আমার জামাই আর এই শিহাব ভাইয়ার অভিনয় দেখে আমি প্রায় টিকেট ছাড়া উগান্ডা চলে যাচ্ছিলাম, বাবা রেএ! এদের যে এত ট্যালেন্ট তা তো আগে বুঝি নাই।”
আরশি কোনো রকম সোফা থেকে উঠে নেহাল আর শিহাবের উদ্দেশ্যে বলল।
“আপনারা দুজন কখন এত অভিনয় শিখলেন? বিশেষ করে ওই লুঙ্গি স্টাইল টা?।”
নেহাল জোরে একটা দীর্ঘশ্বাস নিয়ে সোফায় ধপাস করে বসে পড়ল। কপালে জমে থাকা ঘামটা হাত দিয়ে মুছতে মুছতে বলল।
“আর বইলো না বোইন। আজকে পুরা দিন লাগছে এই ফানি ডাইলগ গুলা মুখস্থ করতে স্টাইল গুলা শিখতে। রৌদ্র ভাই যে কড়া মাস্টার! এক ডাইলগ ভুল হইলেই বলবে ট্রিট ক্যানসেল। পেটের দায়ে আর রৌদ্র ভাইয়ের ভয়ে আজ আমি বিশ্বসেরা অভিনেতা হইয়া গেলাম।”
তিথি তখন আয়ানের পাশে দাঁড়িয়ে হাসতে হাসতে বলল।
“আমি জানতাম না ভাইয়া ট্রিট খাওয়ার জন্য আপনারা এতটা পাগল হতে পারেন? আপনারা তো দেখি পুরাই প্রফেশনাল অ্যাক্টর হয়ে গেছেন।”
শিহাব সবাইকে থামিয়ে দিয়ে গম্ভীর মুখে বলল।
“অনেক তো হইছে! এখন আসল কাজ হইলো আমাদের তুরা ভাবিরে গিফট দেওয়া। তো ভাবির জন্য ভালোবেসে আমি একটা স্পেশাল গিফট আনছি। যদি কারও আপত্তি না থাকে, তাইলে আমি গিফটটা তুরা ভাবিরে দিতাম।”
আরশি বুকে হাত ভাঁজ করে শিহাবের দিকে একটু বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল।
“গিফট দিবেন তাতে আবার এমন করে বলতে হয়? দিয়ে দিলেই তো হয়, এত ভূমিকা করার কী আছে।”
শিহাব সোফার কোণায় রাখা সুন্দর করে মোড়ানো গিফট বক্সটা বেশ কায়দা করে হাতে নিয়ে বলল।
“আরে গিফট অনেক স্পেশাল, একদম কল্পনার বাইরে! আমার মনে হয় না আমার মতো এত দয়ালু মানুষ জীবনে কাউকে এমন গিফট করেছে। এইটা দেওয়ার পর তুরা ভাবি খুশিতে আত্মহারা হইয়া যাবে।”
কথাটা বলেই শিহাব বক্সটা বেশ একটা নাটকীয় ভঙ্গি করে তুরার সামনে ধরে বলল।
“তো মিসেস তুরা ভাবি, প্লিজ আপনি গিফট গ্রহণ করে আমাকে সনাক্ত করেন? আর হ্যাঁ, গিফটটা কিন্তু এখানেই এখনি খুলতে হবে! আমি চাই পুরা পাবলিক দেখুক শিহাব কতটা বুদ্ধিমতি আর দয়ালু।”
নেহাল একপাশ থেকে ফোঁস করে একটা হাসি দিয়ে বলল।
“অই শিইব্যা! তোর বুদ্ধির দৌড় তো আমার জানা আছে। আবার কোনো আজগুবি জিনিস ভাবিরে দিস নাই তো?”
নেহালের মুখে ‘শিইব্যা’ ডাক শুনে শিহাব নিজের কান চুলকানোর ভঙ্গি করে নেহালের দিকে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল।
“কী বললি নেহাল কাল্লু? আবার কো? এই নাম তোরে কোন মজনু দিছে? তোর গায়ের যা রং, তোরে তো রাইতের বেলা সাদা গেঞ্জি ছাড়া খুঁজেই পাওয়া যাবে না।”
নেহাল এবার অপমানে সোফা থেকে এক ঝটকায় উঠে দাঁড়িয়ে গেল। নিজের দুই হাত প্রসারিত করে একদম কুস্তিগীরের মতো ভঙ্গি করে বলল।
“কী! আমি নেহাল কাল্লু? আমারে তোর কোন দিক দিয়া কাল্লু মনে হয় রে? চোখের জুতি কি বেশি হয়া গেছে? নাকি গাজর খাইতে খাইতে তুই এখন অন্ধ হয়া গেছস? আমার এই গায়ের রং হইলো একদম পিওর চকোলেট, আর তুই তো হইলি পুইড়া যাওয়া মচমচে বেগুন ভাজা।”
শিহাব নেহালের কথায় পাত্তা না দিয়ে তুরার দিকে বক্সটা এগিয়ে দিল। তুরা বেশ অবাক আর কৌতূহল নিয়ে বক্সটা হাতে নিল। সবাই একদম নিশ্বাস বন্ধ করে তাকিয়ে আছে দেখি শিহাব এমন কী ‘ঐতিহাসিক’ জিনিস আনল যা সে এত ঘটা করে দিচ্ছে।তুরা রৌদ্রের দিকে একবার তাকিয়ে মুচকি হাসল, তারপর আস্তে আস্তে গিফট বক্সের র্যাপিং পেপারটা খুলতে শুরু করল। বক্সটা খুলতেই তুরা ভেতরে যা দেখল, তাতে তার চোখ তো ছানাবড়া।সে বক্সের ভেতর থেকে জিনিসটা বের করতেই পুরো ঘরে এক সেকেন্ডের নীরবতার পর হাসির মড়ক লাগল। আরশি রাগে কাঁপতে কাঁপতে শিহাবের দিকে তাকাল।
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা সূচনা পর্ব