নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকা সুমিচোধুরী
পর্ব ৩১ (বিয়ের অংশ)
(❌কপি করা নিষিদ্ধ ❌)
তুরা দাঁড়িয়ে আছে এক বিশাল সবুজ চত্বরে। যা আলপিনের মতো দেখতে অসংখ্য ছোট ছোট পাহাড়ের মাঝখানে, সুইজারল্যান্ডের বরফশোভিত উপত্যকার এক কোণে অবস্থিত। সূর্যের সোনালী আলোয় পুরো মাঠটি হীরার মতো ঝলমল করছে। মাঠের প্রতিটি কোণ যেন শিল্পীর তুলিতে আঁকা এক স্বপ্নপুরী। চারদিকে হাজারো রঙের তাজা ফুল দিয়ে নিপুণভাবে সাজানো, কোথাও গোলাপের সারি, কোথাও টিউলিপের মেলা। মাঠের মাঝখানে, সারিবদ্ধভাবে স্থাপন করা হয়েছে নকশা করা কাঠের বড় বড় টেবিল, প্রতিটি টেবিলের উপর সাদা লিনেন বিছানো, আর তাতে ক্রিস্টালের গ্লাস ও সূক্ষ্ম কারুকার্যময় ডিনার সেট। প্রায় একশো থেকে দেড়শো মানুষ আশেপাশে দাঁড়িয়ে, তাদের চোখে কৌতূহল ও আনন্দ। চারদিকে এত সুন্দর করে সাজিয়েছে যে সেই সৌন্দর্য বর্ণনা করার মতো ভাষা নেই।
হঠাৎ তুরার উপর বৃষ্টির মতো গোলাপের পাপড়ি পড়তে শুরু করল। তুরা বিস্ময়ে হা করে আকাশের দিকে তাকাল। তার মাথার উপরে দু’টি বিশাল হেলিকপ্টার চক্কর দিচ্ছে, যাদের গা থেকে অবিরাম ধারায় তাজা গোলাপের পাপড়ি ঝরে পড়ছে, যা পুরো মাঠটিকে যেন গোলাপী চাদরে ঢেকে দিচ্ছে।
তুরা কথা বলার শক্তি যেন সত্যিই হারিয়ে ফেলল। সে শুধু চারদিকে হা করে তাকিয়ে দেখতে লাগল, তার এই স্বপ্নের মতো মুহূর্তকে। তুরার এই স্বপ্নময় ভাবনার মাঝেই, তার সামনে বড় একটা বিয়ের সুসজ্জিত মঞ্চ। মঞ্চের সামনে থেকে ধীরে ধীরে মানুষজন সরে গেল। তুরা এবার স্থির চোখে স্টেজের দিকে তাকাল। আর স্টেজে তাকিয়েই তুরা আরও বেশি অবাক হলো! কারণ স্টেজে কালো কোট, কালো প্যান্ট পরা একটা ছেলে উল্টো দিক হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তার শক্তিশালী পেশীবহুল পিঠ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। ছেলেটাকে দেখেই তুরার চিনতে দেরি হলো না এইটা যে আব্রাহাম রৌদ্র খান!
মুহূর্তের জন্য তুরা থমকে গেল, তার চোখে-মুখে অবিশ্বাস আর অপার বিস্ময়। রৌদ্রের এই অকল্পনীয় আয়োজন দেখে তার সমস্ত, ভয় যেন লজ্জায় মুখ লুকাল।
হঠাৎ রৌদ্র উল্টো দিক হয়েই একটা লাভ আকারের বড় বেলুন উঁচো করে ধরল। তুরা বিস্ময়ে তাকাল। সে দূর থেকেই ভালো করে লক্ষ্য করল লাভের মধ্যে কিছু লেখা আছে। তুরা মনে মনে পড়তে লাগল। লাভে লেখা।
~এই এত আয়োজন শুধু তোরই অপেক্ষায়~
~ আমার অদম্য বিশ্বাস, তুই আজ আসবিই~
রৌদ্রের দ্বিতীয় বার্তা, আবেগপূর্ণ প্রতিজ্ঞা।
~তুই তো শুধু মন নয়, মনের গভীর স্পন্দন~
~তোকে মুক্তি দিতে গেলে, লাগবে যে হৃদ-ছেদন~
~স্পন্দন থামলে যেমন রবে না এই দেহ~
~আমার জীবনে তুই মিশেছিস নেই কারও সাধ্য ছাড়ানোর কেহ~
রৌদ্রের তৃতীয় বার্তা, গভীর ভালোবাসার উপমা।
~অশ্রু ঝরেছিল মোর নদীর কিনারায়,~
~শপথ করেছি সেই ফোঁটা না ভোলা দায়~
~সেই জল যেমন অসম্ভব খোঁজা, এ বিশ্বাসে রাখিস ভর,
আমার এই নিঃশ্বাস থাকতে, ছাড়ব না কখনো হাত তোর~
রৌদ্রের চতুর্থ বার্তা, আবদার ও স্বীকারোক্তি।
~গোবরেতে জন্ম নিয়েও পদ্ম যেমন হাসে,~
~ আমি অপবিত্র, তুই শুদ্ধ ভালোবাসার পাশে।
~তোর একটি ছোঁয়াতে, শুদ্ধ হোক সব ভুল~
~ অপবিত্র হৃদয়টা হোক পবিত্র অনুকূল।~
রৌদ্রের পঞ্চম বার্তা, আত্মসমর্পণের আকুতি।
~জানি, আমি বহু মেয়ের সান্নিধ্যে গিয়েছিলাম বারবার,~
~এখন শুধু তোর কাছেই চাই শোধ-উদ্ধার~
~তুই এসে ঠিক করে দে না তোর এই পাগল আব্রাহাম রৌদ্র খান-কে,~
~জীবন সঁপে বাঁচতে চাই শুধু তোরই দু’চোখের বাঁকে!~
রৌদ্রের বার্তার পরও তুরা যখন একই জায়গায় স্থির, রৌদ্র তখন হতাশার শেষ সীমায় পৌঁছে গেল। সে দ্রুত আরও একটি কার্ড উঁচিয়ে ধরল। লেখাগুলোতে ছিল দৃঢ় প্রত্যাশা ও অসহায়ত্বের চূড়ান্ত আর্তনাদ।
“তুই যতটা দেরি করবি ততটাই হবে কষ্টের ক্ষয়,
প্রতিটা প্রহর আমার ব্যর্থতা নিয়ে যাবে নিশ্চয়ই!
মনে হবে, এত ভালোবেসেও তোর মন জয় হলো না, নিজেকে যে খুব ব্যর্থ লাগে, তুই কেন বুঝিস না।
তবে কি ধরে নেবো আমি আজ সত্যিই পরাজিত,
আব্রাহাম রৌদ্র খান কি তাহলে আজ সবার কাছে লাঞ্ছিত,”
রৌদ্রের সেই অভিমান মেশানো ব্যর্থতার কথা শুনে তুরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। তার সমস্ত অভিমান, ভয় সব যেন এক লহমায় ভেঙে গেল। সে ফুঁফিয়ে কেঁদে উঠল, দু’হাত দিয়ে মুখ চেপে ধরল, যাতে তার কান্নার শব্দটুকু রৌদ্রের কানে না পৌঁছায়। আজ রৌদ্র যে তাকে এত নির্দয়ভাবে চমকে দিবে, ভালোবাসার এমন চরম পরীক্ষা নেবে, তা তুরা কখনো ভাবতেই পারেনি। তার চোখ থেকে ঝরনার মতো জল গড়িয়ে তার সাজানো লেহেঙ্গার উপর পড়ছে।
তুরা যখন এভাবে কাঁদছে, ঠিক সেই মুহূর্তে রৌদ্র আবারো উল্টো দিকে স্থির থেকে, ধীরে ধীরে আরও একটি কার্ড উঁচু করে ধরল। যেন সে চোখ না দেখেও তুরার কান্না টের পাচ্ছে। সেই কার্ডে লেখা।
“ওরে পাগলী, কাঁদিস না আর, এই কথা শুনে আজ,
তোর এক ফোঁটা জল আমার আকাশ সমান বাজ।
নিজেকে যে শপথ দিলাম দেব না তোকে ব্যথা,
তুই কাঁদলে যে পাষাণ লাগে, থাকে না কোনো কথা।
তোর চোখের ঐ জল, নয় শুধু বৃষ্টির ধারা,
আমার বুকে যেন রক্তক্ষরণ, হই আমি আত্মহারা।”
রৌদ্রের সেই অসহায় আত্মসমর্পণের বার্তাটি তুরার হৃদয়ে শেষ পেরেক মেরে দিল। তার পক্ষে আর এক মুহূর্তও নিজেকে ঠিক রাখা সম্ভব হলো না। চোখের জল শুকিয়ে গেল, আর তার স্থানে জন্ম নিল অদম্য এক ভালোবাসা ও অপরাধবোধ।
আর এক মুহূর্তও দেরি না করে, তুরা তার হাতে থাকা শুভ্র ফুলের তোড়াটা সজোরে মাটিতে ছুড়ে মারল। তারপর তার দামী লেহেঙ্গার ভার উপেক্ষা করে, এক ঝটকায় মঞ্চের দিকে দৌড় দিল।
উপস্থিত সকলের কৌতূহলী দৃষ্টি উপেক্ষা করে, তুরা উন্মত্তের মতো মঞ্চের সিঁড়ি টপকাল। আলো-ঝলমলে মঞ্চে পৌঁছে, সে উল্টো দিক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা আব্রাহাম রৌদ্র খান-কে পিছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার সমস্ত আবেগ, সমস্ত ভালোবাসা যেন সেই আলিঙ্গনের বাঁধনে মিশে গেল।
আলিঙ্গন এতটাই শক্ত এবং আকস্মিক ছিল যে, রৌদ্রের হাতে থাকা কার্ডটি খসে পড়ল। তুরা তার মুখটা রৌদ্রের কালো কোটের ওপর চেপে ধরে, অস্পষ্ট, কান্নারুদ্ধ কণ্ঠে, ছন্দে বলল।
“আর নয়, আর একটিও কথা শুনতে চাই না আজ,
আপনার কাছেই এসেছি আমি, আর নেই কোনো কাজ।
আমার আসতেই হবে, আমি থাকব আপনার পাশে,
আব্রাহাম রৌদ্র খান,ভালোবেসে!
রয়ে যাবো চিরজীবন সঙ্গী হয়ে।”
রৌদ্র স্তম্ভিত হয়ে গেল। তুরার এই উষ্ণ, দৃঢ় আলিঙ্গন তার সব কষ্টের অবসান ঘটাল।আলিঙ্গনের বাঁধনে তুরার সেই ছন্দোবদ্ধ আত্মসমর্পণ শোনার সাথে সাথেই, উপস্থিত সকলে যেন একযোগে আনন্দধ্বনি করে উঠল। চারিদিক থেকে উচ্ছ্বসিত করতালি ভেসে আসতে লাগল। মুহূর্তেই, হেলিকপ্টার থেকে আরও তীব্র গতিতে গোলাপের পাপড়ি ঝরতে শুরু করল, যা পুরো মঞ্চ আর রৌদ্র তুরাকে গোলাপী শুভ্রতার এক আস্তরণে ঢেকে দিল।
রৌদ্র এবার ধীরে ধীরে সামনের দিকে ঘুরল। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে কান্না আটকানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু আজ যেন খুশির জন্য কান্না আর আটকে পারছে না। রৌদ্রের সেই কঠিন চোয়াল মুহূর্তেই নরম হয়ে গেল। তার চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
লোকে বলে, ছেলেরা নাকি কাঁদে না কিন্তু আজ রৌদ্র কান্না করছে। কারণ, সে আজ একটি নারীকে পাওয়ার খুশিতে নিজেকে স্থির রাখতে পারছে না, আর সেই নারীটাই হলো তাব্বাসুম ফিহা তুরা। আজ থেকে তুরা হয়ে গেল সবচেয়ে ভাগ্যবতী নারী।
রৌদ্র আর এক মুহূর্তও দাঁড়াল না। সে মুহূর্তে তুরার সামনে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল। তার শক্তিশালী দু’হাত দিয়ে তুরার হাত দুটো মুঠোয় নিয়ে নিল। রৌদ্র ফুঁফিয়ে কাঁদতে কাঁদতে, অশ্রুসিক্ত চোখে, গভীর ভালোবাসায় বলল।
“আমি কখনো ভাবতেও পারিনি, তোকে আমি এইভাবে পাবো।আমার জীবনে এমন শুভক্ষণ আসবে! তোকে আমি এইভাবে, এত ভালোবেসে কাছে পাব আমার সব আশা আজ পূর্ণ হলো, তুরা।”
রৌদ্র এবার তুরার মুঠো করা দুই হাতে আলতো করে চুমু খেল। তার ঠোঁট তুরার হাতের উষ্ণতা পেল, কিন্তু রৌদ্রের চোখ থেকে তখনো অশ্রু ঝরছে।
রৌদ্র এরপরও হাঁটু গেড়ে বসা ছিল। সে তার কালো কোটের ভেতরের পকেট থেকে দ্রুত একটি মখমলের বাক্স বের করল। বাক্সের ডালা খুলতেই হীরার ঝলকানিতে পুরো মঞ্চ আলোকিত হয়ে উঠল। রৌদ্র এবার চোখ তুলে তুরার চোখে চোখ রাখল,রৌদ্রের চোখে আনন্দের অশ্রুতে ভেজা,রৌদ্র সেই বাক্সটা তুরার সামনে ধরে আবেগে কম্পিত কন্ঠে বলল।
“Will you marry me Tura?
তুরা কি করবে? হ্যাঁ করবেই তো! যার জন্য সে এতগুলো দেশ পাড়ি দিয়ে এই অচেনা দেশে এসেছে, শুধু মাত্র তার সাথে সারাজীবন কাটাতে। তাহলে তার সাথে জীবনে কেন জড়াবে না!
মুহূর্তে তুরা আবেগের বাঁধন ছিঁড়ে বেরিয়ে এল। তার অশ্রুসিক্ত মুখে ফুটে উঠল স্নিগ্ধ এক মুঁচকি হাসি। সে হাঁটু গেড়ে বসে থাকা রৌদ্রের সামনে ডান হাতটি বাড়িয়ে দিল এবং অত্যন্ত স্পষ্ট ও মধুর কণ্ঠে বলল।
“Yes!”
তুরার মুখ থেকে সেই বহু প্রতীক্ষিত ‘হ্যাঁ’ শব্দটি শোনা মাত্রই রৌদ্রের মুখে অবিশ্বাস্য এক হাসি ফুটে উঠল। সেই হাসি যেন সূর্যের মতো উজ্জ্বল! তার চোখ তখনও অশ্রুসিক্ত, তবে এখন সেই অশ্রু কেবলই আনন্দের।
রৌদ্র আর এক মুহূর্তও দেরি করল না। সে প্রেম আর ভক্তির সাথে ধীরে ধীরে বাক্স থেকে ঝলমলে হীরার আংটিটা বের করে নিল। কাঁপা হাতে রৌদ্র সেই আংটি তুরার অনিন্দ্যসুন্দর আঙুলে পরিয়ে দিল।
আংটি পরানোর সাথে সাথেই উপস্থিত সকলে উচ্চ স্বরে আনন্দধ্বনি করে উঠল এবং তীব্র করতালি দিতে শুরু করল। হেলিকপ্টার থেকে তখনো গোলাপের পাপড়ি ঝরছে, যেন প্রকৃতিও তাদের মিলন উৎসবের সাক্ষী!
উপস্থিত অতিথিদের মধ্যে থেকেই একজন সাদা আলখাল্লা এবং টুপি পরিহিত মৌলভি সাহেব ধীরে ধীরে মঞ্চের সামনে এগিয়ে এলেন। বোঝা গেল, রৌদ্র শুধু প্রস্তাবের নয়, বিবাহের সমস্ত আয়োজন সম্পন্ন করেই তুরাকে এখানে এনেছে।
রৌদ্র তুরাকে ধরে স্টেজের মাঝখানে পাতা ফুল সজ্জিত একটি ছোট টেবিল ও দুটি চেয়ারের দিকে নিয়ে গেল। দুজনই বসলেন। পাশে রৌদ্রের পক্ষ থেকে দুজন এবং তুরার পরিবারের অনুপস্থিতিতে তার পক্ষে দুজন সাক্ষী (উকিল) বসলেন।
কাজী সাহেব সামনে বসে প্রথমে রৌদ্রের কাছ থেকে তুরার পাসপোর্ট এবং প্রয়োজনীয় ভিসা সংক্রান্ত ডকুমেন্ট চাইলেন। রৌদ্র দ্রুত সেই কাগজপত্র কাজী সাহেবের হাতে তুলে দিল, যা সে এতদিনে তৈরি করিয়েছে। কাজী সাহেব সেই গুরুত্বপূর্ণ ডকুমেন্টগুলো খুঁটিয়ে দেখলেন এবং বৈধতা নিশ্চিত করলেন।
এরপর কাজী সাহেব নিকাহনামা হাতে নিলেন।কাজী সাহেব শান্ত স্বরে আরবিতে বিসমিল্লাহ বলার পর বাংলায় সকলের উদ্দেশে বললেন।
“আলহামদুলিল্লাহ! আমরা এখানে আজ এমন এক মিলন দেখতে এসেছি, যা কেবল প্রেমের নয়, আল্লাহর দেওয়া পবিত্র বন্ধনের। বর আব্রাহাম রৌদ্র খান এবং কনে তাব্বাসুম ফিহা তুরা, দু’জনই মুসলিম ও বাংলাদেশি, তাই আমরা ইসলামী শরিয়াহ মোতাবেক এবং গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশের আইন অনুসারে নিকাহ সম্পন্ন করব।”
এরপর তিনি কাবিননামা পড়ে শোনালেন, যেখানে দেনমোহরের পরিমাণ সুনির্দিষ্টভাবে উল্লেখ ছিল।কাজী সাহেব রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে প্রথমবার জিজ্ঞাসা করলেন।
“আব্রাহাম রৌদ্র খান, আপনি কি সাক্ষীগণের সম্মুখে, উসুল ধার্যপূর্বক, তাব্বাসুম ফিহা তুরাকে আপনার স্ত্রী হিসেবে কবুল করতে সম্মত?”
রৌদ্রের গলা আবেগে ভারী। সে স্থির চোখে তুরার দিকে তাকিয়ে গভীর আবেগে বলল।
“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল!”
কাজী সাহেব একই প্রশ্ন তিনবার করলেন এবং রৌদ্র প্রতিবারই দৃঢ়তার সাথে কবুল বলল।
এরপর কাজী সাহেব তুরার দিকে ফিরলেন। তুরা সামান্য মাথা নিচু করল, তার চোখ মুঠোয় থাকা রৌদ্রের হাতের দিকে স্থির। তুরা আলতো ভাবে চোখ বন্ধ করল আজ থেকে তার জীবন বদলে যাবে সেও জড়িয়ে যাচ্ছে আব্রাহাম রৌদ্র খানের সাথে। রৌদ্র তুরার হাতটা আলতো করে চেপে ধরল, যেন গভীর ভরসা দিচ্ছে। রৌদ্রের সেই স্পর্শ পেয়ে তুরা গভীর শ্বাস নিল।
কাজী সাহেব তুরার দিকে ফিরে জিজ্ঞাসা করলেন।
“তাব্বাসুম ফিহা তুরা, আপনি কি সাক্ষীগণের সম্মুখে, ধার্যকৃত দেনমোহরের বিনিময়ে, আব্রাহাম রৌদ্র খানকে আপনার স্বামী হিসেবে কবুল করতে সম্মত?”
তুরার চোখ তখনো বন্ধ ,তার মনের গভীরে এক নতুন আলো জ্বলে উঠল। চোখের সামনে ভেসে উঠল অন্ধকারে মোড়া এক দীর্ঘ পথ, যে পথে ছিল ভয়ঙ্কর ঝুঁকি, কষ্ট আর অশ্রু। সে দেখল, প্রতিটি বাঁকে রৌদ্রের ছায়া তাকে পাহারা দিয়েছে, প্রতিটা আঘাত সে নিজের বুকে নিয়েছে। এত কষ্টের পথ পেরিয়ে আজ সে ভালোবাসার চূড়ায় দাঁড়িয়ে! এই সব স্মৃতি হৃদয়ে এক তীব্র বিশ্বাস জাগাল। এই মানুষটিই তার চিরদিনের ঠিকানা এই উপলব্ধি আসতেই তুরা চোখ বন্ধ রেখেই আনন্দের কম্পিত স্বরে বলল।
“আলহামদুলিল্লাহ, কবুল!”
তুরাকেও একই প্রশ্ন তিনবার করা হলো, এবং সে প্রতিবারই স্পষ্ট ও দৃঢ় কণ্ঠে কবুল বলল।
নিকাহ সম্পন্ন হতেই কাজী সাহেব আল্লাহর কাছে দাম্পত্য জীবনের সুখ ও সমৃদ্ধি কামনা করে মোনাজাত করলেন।
এরপরই চারদিকে শুরু হলো উচ্ছ্বাসের বন্যা। উপস্থিত শত শত অতিথি উঠে দাঁড়িয়ে বর ও কনেকে অভিনন্দন জানালেন। ফুলের পাপড়ির বৃষ্টি যেন থামতেই চাইছিল না। তাদের সুইস প্রবাসের সবুজ মাঠে আজ বাংলার পবিত্র নিকাহ সম্পন্ন হলো।
রানিং….!
আমি, তোমাদের এই গল্পের লেখিকা, হঠাৎ থমকে দাঁড়াই। আমার কলম থেমে যায়। আমার একটা কেপশন মনে পড়ল এই দৃশ্যের উল্টো পিঠে দাঁড়ানো আমার নিজের গল্প।
আমার সৃষ্টি উপন্যাসে তুরা আর রৌদ্র আজ পূর্ণতা পেল আমি মিলিয়ে দিলাম উপন্যাস নায়ক-নায়িকার পূর্ণতা। কিন্তু আমি আমি তো আজও অপর্ণতা! এক গভীর, চাপা দীর্ঘশ্বাস এসে ঢেকে দিল সব উচ্ছ্বাস। তুরার আলিঙ্গনে রৌদ্রের সেই তৃপ্তি দেখে, বুকের ভেতর মোচড় দিয়ে উঠল এক পুরোনো স্মৃতি।খুব মনে পড়ল তাকে যাকে নিয়ে বুনেছিলাম তুরার আর রৌদ্রের প্রতিটা মুহূর্তের আশা। প্রতিটি সংলাপ, প্রতিটি স্পর্শ, তাদের সম্পর্কের প্রতিটি গভীরতা সবকিছুই তো ছিল সেই না-থাকা মানুষটার ছায়া!
আজ সেই নেই। আজ সেই নেই জীবনে, আমি একা।আমার উপন্যাস আজ পূর্ণ, কিন্তু আমার জীবন এই সবুজ মাঠে দাঁড়িয়ে, উৎসবের মাঝেও আজও এক বিষণ্ণ অপূর্ণ।যদি লেখা যেত তাকে নিয়ে উপন্যাস তাহলে এভাবেই তাকে নিয়ে গড়ে তুলতাম আমার জীবনের উপন্যাস! তবুও বলি তুরা রৌদ্রের মতো হাজারো মানুষের যেন ভালোবাসা পুর্নতা পাই বিচ্ছেদ নামক জিনিসটা যেন মুছে যাই। ভালো থাকুক তুরা আর রৌদ্র শুভ কামনা করলাম আমি লেখিকা তাদের জন্য।
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৪,১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা সূচনা পর্ব
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৯