Golpo romantic golpo নির্লজ্জ ভালোবাসা

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩০


নির্লজ্জ_ভালোবাসা

লেখিকাসুমিচোধুরী

পর্ব ৩০ (❌ কপি করা নিষিদ্ধ ❌)

সময় কখনো থেমে দাঁড়ায় না। সে সবসময় তার অবিরাম গতিতে এগিয়ে চলে। এটাই যেন তার প্রকৃতির একমাত্র নিজস্বতা। কেউ তার পথে এক মুহূর্তের বাধাও দিতে পারে না সে তার স্বাধীন ছন্দে বয়ে চলে।

এভাবে পনেরোটি দীর্ঘ দিন পেরিয়ে গেছে। কিন্তু এই পনেরো দিনে আসলে কিছুই বদলায়নি। আরশি আর শিহাবের মধ্যে এখনও সেই বরফের মতো ঠাণ্ডা দূরত্ব। শিহাব এখনও আরশিকে স্বামীর অধিকার দিয়ে মেনে নেয়নি। তবে খান বাড়ির সকলের বুকজুড়ে এখন এক গভীর, অসহনীয় উদ্বেগ। কারণ, তুরা এখনও বাড়ি ফিরেনি। আশিক খান খোঁজ নিয়েছেন তুরা তার প্রিয় কোনও বন্ধুর বাড়িতেও যায়নি। কোথাও তার এক টুকরোও খোঁজ নেই। এই নিয়ে বাড়ির সকলের মনে এক অজানা ভয় ও চাপা চিন্তা জেঁকে বসেছে।

সকাল বেলা। আনোয়ার খান বিশাল হলরুমে সোফায় বসে নিবিষ্ট মনে খবরের কাগজ দেখছেন, পাশে চায়ের কাপ। ধীরে ধীরে আশিক খানও এসে নিঃশব্দে তাঁর পাশে বসলেন। তাঁর মুখটা একদম শুকিয়ে কাঠ, যেন রাতের পর রাত দুশ্চিন্তায় তাঁর পেটে এক দানা খাবারও পড়েনি। আনোয়ার খান আড় চোখে আশিক খানের দিকে তাকালেন। আশিক খানের শুকনো, চিন্তিত মুখটা দেখেই তিনি বললেন।

“কী হয়েছে? কোনো বিশেষ সমস্যা?”

আশিক খান মাথা নিচু রেখেই ফিসফিস করে উত্তর দিলেন, যেন জোরে কথা বললে মেয়ের নাম বাতাসে মিলিয়ে যাবে।

“আজ আমার মেয়ে তুরা কতদিন ধরে যে বাসায় নেই! জানি না কোথায় আছে, কোন অবস্থায় আছে? ঠিকমতো এক মুঠো খেতে পারছে তো?”

আনোয়ার খান খবরের কাগজটা পাশে রেখে গভীর হতাশা নিয়ে বললেন।

“চিন্তা করিস না। যেহেতু নিজের ইচ্ছায় বেরিয়ে গেছে, সেহেতু নিশ্চয়ই ভালোই আছে। তবে আমি তো খোঁজ খবর নিতে পুলিশকে জানিয়ে দিয়েছি, খুব তাড়াতাড়ি পেয়ে যাবে।”

আশিক খান আর কিছুই বললেন না। শুধু মাথা যন্ত্রের মতো নাড়লেন। কিন্তু কেউ কি আর জানল বাইরে শান্ত এই বাবার মনে মেয়েটাকে একটিবার দেখার জন্য কতটা আকুলতা, কতটা ভয়াবহ চিন্তা প্রতি মুহূর্তে তাঁকে জ্বালিয়ে মারছে!

আয়ান ফোন টিপতে টিপতে নিচে নামার উদ্দেশ্যে যাচ্ছিল। আয়ানের চোখ একদম ফোনে স্থির।তিথি হাতে একটা কাগজ পড়তে পড়তে নিচে নামার উদ্দেশ্যে আসছিল। তিথিরও চোখ একদম সেই কাগজে স্থির। হঠাৎ আয়ান ও তিথি দু’জনেই অমনোযোগী থাকায়, সিঁড়ির মুখে একে অপরের সাথে প্রচণ্ড ধাক্কা খেয়ে দু’জন দু’দিকে ছিটকে পড়ে যায়। তিথি কোমরের ব্যথায় আর্তনাদ করে ওঠে।

“ও মা গো! আমার কোমর গেল গো! ওই মা গো! তুমি কোথায় গো? দেখো, তোমার মেয়ের কোমরটাই ভেঙে গেছে! আর বিয়ে হবে না আমার! তোমার মেয়েকে এখন সবাই বলবে, ‘ওই যে দেখো, কোমর ভাঙা মিস ইউনিভার্স আসছে!'”

আয়ানও দু’ কনুইয়ে ব্যথা পেয়েছে। হঠাৎ তিথির এই নাটকীয় চিৎকার শুনে আয়ান সামনে তাকিয়ে দেখে তিথি। আয়ানের শরীর রাগে দাউ দাউ করে জ্বলে উঠল। আয়ান তীক্ষ্ণ স্বরে তিথিকে বলল।

“তোর কি আমার সাথে কোনো জন্ম জন্মান্তরের শত্রুতা আছে যে দু’দিন পরপরই আমার সাথে ধাক্কা খাস? তোর কি চোখ নেই, নাকি চোখ আলমারিতে তালা দিয়ে চাবির গোছা আমার হাতে ধরিয়ে দিয়েছিস?”

আয়ানের কণ্ঠ শুনে তিথি সামনে তাকিয়ে দেখে আয়ান। মুহূর্তে আয়ানের কথায় তার ব্যথা উধাও! তিথি কোমর ধরে উঠে দাঁড়িয়ে, তেতো গলায় বলল।

“আমি যদি চোখ আলমারিতে তালা দিয়ে ঝুলিয়ে রাখি, তাহলে কি তুমি এসে আমার বিয়ে ভাঙা কোমরটার দায়িত্ব নিতে? নাকি আমাকে ডাস্টবিনে ফেলে দিয়ে বলতে, ওহ্! এটা তো একটা চলন্ত জঞ্জাল ছিল, এখন স্থির হয়েছে!’ বেশি কথা বলবে না তো! আমি তো ধাক্কা খেয়েও তোমার মতো হিংস্র হয়ে যাইনি!”

তিথির মুখে নিজের নাম ‘হিংস্র’ শুনে আয়ানের মাথার শিরাগুলো যেন দপদপ করে উঠল। এতক্ষণের চাপা রাগ যেন আগ্নেয়গিরির মতো ফেটে বের হলো। মুহূর্তের মধ্যে সে তিথির দিকে এক ঝটকায় এগিয়ে গেল।তিথি কিছু বুঝে ওঠার আগেই, আয়ানের শক্ত হাতের থাপ্পড় সপাং করে পড়ল তিথির গালে। থাপ্পড়ের শব্দে একটা তীব্র প্রতিধ্বনি হলো।

তিথি যেন থমকে গেল। বিস্ময়ে তার চোখ বড় বড় হয়ে গেল। গালটা জ্বালাপোড়া করছে।আয়ানের চোখে তখন ক্ষমা বা অনুশোচনার লেশমাত্র নেই। সে রাগে শ্বাস ফেলতে ফেলতে, তীক্ষ্ণ, দাঁতে দাঁত চাপা স্বরে বলল।

“আর একটাও ফালতু কথা যদি তোর মুখ থেকে বের হয়েছে, তাহলে তোর জিভ টেনে ছিঁড়ে দেব! বাড়িতে এত বড় সমস্যা চলছে, আর তোর ফাজলামো থামে না! নেচে বেড়ানো বন্ধ কর!”

কথাটা বলেই আয়ান আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে ঘৃণায় চোখ সরিয়ে নিয়ে সিঁড়ি বেয়ে তীব্র বেগে নিচে নেমে গেল।তিথি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে। তার চোখ থেকে ফোঁটা ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু কোনো আওয়াজ নেই। সে কাঁপা কাঁপা হাতে গালটা চেপে ধরল। আয়ানের চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে তার মনে এক গভীর মন খারাপের মেঘ জমল। কিন্তু সেই মেঘের আড়ালে মুহূর্তেই এক কঠিন ইস্পাত কঠিন প্রতিজ্ঞা জন্ম নিল।

“থাপ্পড় মারলে? এই থাপ্পড়ের হিসাব আমি সুদে আসলে চুকিয়ে ছাড়ব! বলে দিলাম হুহ।”


চৌধুরী বাড়ি,,,

শিহাব অফিস থেকে যেন তার ক্লান্ত শরীরটাকে টেনে আনল। এসেই হলরুমের নরম সোফায় ধপাস করে শরীরটা এলিয়ে দিল। তার প্রতিটি নিঃশ্বাসে ক্লান্তির ভার স্পষ্ট। আরশি তখনও চিপস খাচ্ছিল আর টিভি সিরিয়ালের কোনো নাটকীয় দৃশ্যে পুরোপুরি মনোযোগ দিয়েছিল। হঠাৎ শিহাবের এলিয়ে পড়ার শব্দ এবং তার বিপর্যস্ত অবস্থা দেখে আরশি এক লহমায় বুঝে গেল, লোকটা আজ অতিরিক্ত ক্লান্ত। আরশি কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়ে তাড়াতাড়ি রান্নাঘরে ছুটল, ঝটপট লেবু দিয়ে শরবত বানিয়ে সোজা শিহাবের সামনে ধরল। শিহাব চোখ বন্ধ করে ছিল, সামনে গ্লাসের উপস্থিতি টের পেয়ে বিরক্তিতে চোখ খুলল।

“কী হয়েছে? আর এই বিষ আমাকে কেন খাওয়াতে চাইছো?”

আরশির কণ্ঠে তখন এক টুকরো যত্ন।

“লেবুর জল। খান তো! মাথা হালকা লাগবে, ক্লান্তি দূর হবে।”

শিহাব চোয়াল শক্ত করে,রুক্ষতার শেষ সীমায় গিয়ে বলল।

“কোনো প্রয়োজন নেই।”

আরশি নাছোড়বান্দা। সে গ্লাসটা শিহাবের হাতের কাছে এগিয়ে দিয়ে, প্রায় আদেশ করার ভঙ্গিতে বলল।

“আরে বাবা! আপনি খেয়েই দেখেন না! খারাপ লাগবে না, গ্যারান্টি!”

শিহাব আর তর্ক করল না। যেন পরাজয় মেনেই, গ্লাসটা হাতে নিয়ে এক নিঃশ্বাসে শরবতটুকু শেষ করে দিল। আরশি তৃপ্তির হাসি নিয়ে শিহাবের দিকে তাকাল এবং ভ্রু নাচিয়ে বলল।

“কী, মিস্টার অহংকারী! কেমন লাগছে এখন?”

শিহাব সোফা থেকে ওঠার জন্য সোজা হয়ে বসল। তার কণ্ঠে এবার আর বিরক্তি নেই, চাপা কৃতজ্ঞতা।

“ভালো।”

শিহাবের একশব্দে উত্তর শুনে আরশির মাথা গরম হয়ে গেল। সে বিড়বিড় করে বলল, যেন নিজের সঙ্গেই কথা বলছে।

“শা’লা কিপ্টে! একটা ধন্যবাদও দিতে পারে না! শা’লা, তোর কপালে বউ জুটবে না, দেখিস! এমা! থুক্কু, আমি কী বলছি এসব? আমিই তো এর বউ! এই অহংকারের পাহাড় লোকটার সাথে থাকতে থাকতে আমার মস্তিষ্ক ফ্রাই হয়ে যাচ্ছে!”

আরশির এই অভ্যন্তরীণ কৌতুকের মাঝেই, শিহাবের শান্ত কণ্ঠস্বর তার কানে ভেসে এল। শিহাব রুমের দিকে যেতে যেতে বলল।

“ধন্যবাদ। সত্যি খুব ক্লান্ত ছিলাম। শরবত খাওয়ার পর অনেকটা সতেজ লাগছে।”

ততক্ষণে শিহাব সিঁড়ি বেয়ে রুমে চলে গেল। আর আরশি অপরাধীর মতো জিভে কামড় দিয়ে নিজের কপালে নিজেই চাপড় মেরে বলল।

“উফফ! শুধু শুধু লোকটাকে কিপ্টে খেতাব দিয়ে দিলাম! ধন্যবাদ তো দিলই! কিন্তু এই ধন্যবাদটা দুটো সেকেন্ড আগে দিলে কী হতো? তাহলেই তো আর আমি নিজেকে পাগল বলতাম না! আমার কোনো দোষ নেই! সব দোষ ওই অহংকারী লোকটার।”

শিহাব ক্লান্ত শরীরে রুমে এসে শার্ট-টাই এক হ্যাঁচকায় খুলে বিছানায় ছুড়ে মারল। ক্লান্তিতে ভুলেই তোয়ালে না নিয়েই প্রায় দৌড়ে ওয়াশরুমে ঢুকে পড়ল। শাওয়ার ছেড়ে সে চোখ বন্ধ করল, যেন জল তার সমস্ত ক্লান্তি ধুয়ে দেবে। আরশি রুমে এসে দেখল বিছানায় শার্ট টাইয়ের দলা। সে নিঃশব্দে সেগুলোকে যত্ন করে গুছিয়ে আলমারিতে রেখে দিল।

শিহাব শাওয়ার সেরে সবকিছু খুলে তোয়ালে নিতে গিয়ে দেখল তোয়ালে নেই! তার চোখ কপালে উঠল। শিহাব মাথায় হাত দিয়ে চাপা দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।

“সেট! তোয়ালে! এখন কী হবে!”

শিহাব ওয়াশরুমের দরজা এক ইঞ্চি ফাঁক করে দেখল আরশি আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের মনেই কিছু একটা করছে। শিহাব লজ্জা ও বিরক্তি নিয়ে ভাবল ডাকবে কি না। কিন্তু ভেজা শরীরে এভাবে দাঁড়িয়ে থাকা অসম্ভব! শিহাব শেষে অসহায়ভাবে আরশিকে ডাক দিল।

“এই মেয়ে, শুনো?”

আরশির কানে ‘এই মেয়ে, শুনো’ ডাকটা যাওয়া মাত্রই তার ভিতরের আগুনটা জ্বলে উঠল। আরশি ঘুরে তাকিয়ে দেখে শিহাব ওয়াশরুম থেকে এইভাবে ডাকলো৷ মুহুর্তে আরশি রেগে চোখ গরম করে বলল।

“দেখুন মিস্টার অহংকারী! আমি মেয়ে না, আমি আরশি! যদি ‘আরশি’ না ডাকতে পারেন, তাহলে ডাকবেনই না! তবুও এই ‘এই মেয়ে, শুনো’ মার্কা ডাক আমাকে দেবেন না!”

আরশির কথা শুনে শিহাবের মাথার রক্ত গরম হয়ে গেল। কিন্তু সে এখন নিরুপায় বন্দি! তাই শিহাব রাগ চাপিয়ে এক টুকরো মিথ্যা সহানুভূতিসূচক হাসি ফুটিয়ে বলল।

“ওকে ম্যাডাম! আর ডাকব না। এখন শুধু আমাকে একটু সাহায্য করেন?।”

আরশিও কর্তৃত্বের মজা বুঝতে পারল। সে দু’হাত বুকের ওপর আড় করে, উচ্চ ভান দেখিয়ে বলল।

“সরি বলেন!”

শিহাব দাঁতে দাঁত পিষে, গলার স্বর আরও কঠিন করে বলল।

“সরি।”

আরশি এবার গর্বের একটা লম্বা শ্বাস নিল। যেন সে বিশ্ব জয় করেছে!

“ঠিক আছে, মাফ দিলাম! আমি আবার খুব দয়ালু কেউ এত কষ্ট করে মাফ চাইলে মাফ না করে থাকতে পারি না।”

শিহাবের ধৈর্য এবার শেষ সীমায়। সে ঠোঁট কামড়ে ধরে, ওয়াশরুমের দরজা সামান্য চাপ দিয়ে শক্ত কণ্ঠে বলল।

“এখন কি আমাকে আপনি সহযোগিতাটা করবেন? নাকি আমি জল ঝরাতে ঝরাতে চলে আসব?”

আরশি যেন এবার একটু দ্রবীভূত হলো। কৌতুক করার সুযোগ নেই দেখে বলল।

“ঠিক আছে, বলেন কী সাহায্য চাই?”

শিহাব একদম স্কুলের বাচ্চাদের মতো লাজুক ভঙ্গিতে, আমতা আমতা করে বলল।

“আসলে ভুল হয়ে গেছে। আমি তোয়ালেটা না নিয়েই ভিতরে চলে এসেছি। আপনি যদি দয়া করে তোয়ালেটা এনে দেন।”

শিহাবের আমতা আমতা করা কথা শুনে আরশির চোখ কপালে উঠল! তার মানে শিহাব এতক্ষণ নগ্ন অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে! যদি সত্যি সত্যি ওই অবস্থায় চলে আসে, তাহলে তো সর্বনাশ! আরশি তাড়াতাড়ি তোয়ালে নিয়ে দাঁত কেলানো একটা সামান্য হাসি হেসে আস্তে করে তোয়ালেটা ওয়াশরুমের দরজার দিকে এগিয়ে ধরে, দুষ্টুমি মেশানো কণ্ঠে বলল।

“মিস্টার অহংকারী, আপনি কি শুনছেন? এই নিন আপনার তোয়ালে জাদু!”

‘মিস্টার অহংকারী’ নামটা শুনে শিহাবের রাগ হলো। মেয়েটা সবসময় তাকে অহংকারী বলে ডাকছে কেন? শিহাব বিরক্ত হয়ে তোয়ালেটা শক্তিতেই টান মারল। আর শিহাবের এত জোরে টান দেওয়ায় আরশিও ভর সামলাতে না পেরে সোজা ওয়াশরুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল!

মুহূর্তে ওয়াশরুমে ঢুকেই আরশি একদম নগ্ন অবস্থায় শিহাবকে দেখতে পেল। অপ্রত্যাশিতভাবে শিহাবকে ওই রূপে দেখে আরশি হা করে চমকে উঠল। তার চোখ বিস্ফারিত, মুখ দিয়ে কেবল একটা শব্দ বের হলো।

“ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন! বেঁচে থাকলে আবার দেখা হবে বাই আরশি তুই খতম।”

শেষ কথাটা বলেই আরশি সেন্স হারিয়ে পড়ে যেতে নিল। মুহূর্তের মধ্যে শিহাব আরশিকে শক্ত হাতে ধরে ফেলল।


সুইজারল্যান্ড,,,

আয়নার সামনে বসে আছে তুরা। তার চোখে মুখে বিরক্তি নয়, বরং এক তীব্র উত্তেজনা ও চাপা আশঙ্কা। পরনে তার অত্যন্ত দামী, শুভ্র রঙের লেহেঙ্গা। লেহেঙ্গাটি ছিল বরফের মতো স্নিগ্ধ, তাতে সূক্ষ্ম রূপালী জরির কাজ এবং হীরার মতো ছোট স্ফটিক বসানো, যা সামান্য আলো পড়তেই চোখ ধাঁধিয়ে দিচ্ছিল। এই রাজকীয় পোশাকটি সুইজারল্যান্ডের বাজারে বিশেষভাবে আব্রাহাম রৌদ্র খানই তার জন্য কিনেছেন।

তুরাকে একদম অপরূপা বধূর রূপে সাজানো হয়েছে। তার চোখে গভীর কাজলের টান, যা তার চোখের ভাষাকে আরও রহস্যময় করেছে, ঠোঁটে নরম গোলাপী আভা, আর চুলে সদ্য ফোটা সাদা অর্কিড গোঁজা। নিজেকে আয়নায় দেখে তার লজ্জা ও মুগ্ধতা কাজ করছে, কিন্তু একইসঙ্গে সে হতবুদ্ধি হঠাৎ রৌদ্র এইভাবে তাকে কেন সাজাচ্ছে! আবার ভাবল হয়তো কোথাও বিশেষ ভাবে ঘুরতে নিয়ে যাবে।

বেশ কিছুক্ষণ পর একজন মহিলা হাতে দুবাই থেকে আনা ফুলের তোড়া নিয়ে এলেন। তিনি তোড়াটি তুরার হাতে ধরিয়ে দিয়ে বললেন।

“Das isch für Dich. Nimm das und chum use.।”

বাংলা অনুবাদ_ এইটা তোমার জন্য। এটা নাও এবং বাইরে এসো।”

তুরা ভাষা বুঝল না, তবে ফুলের তোড়াটি আনন্দে নিল। মহিলাটি তুরাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উসখুস হয়ে আবার বললেন।

“Was isch los, Ma’am? Chum use!”

বাংলা অনুবাদ _ “কী হলো, ম্যাডাম? বাইরে এসো!”

তুরা তবুও যেন স্বপ্নের ঘোরে। মহিলাটি আর না পেরে তুরার কব্জি ধরে তাকে রুম থেকে নিয়ে বাইরে এলেন।তুরা বাইরে আসতেই হঠাৎ কোথা থেকে শক্তিশালী দুটো হাত এসে তুরার চোখ কালো রুমাল দিয়ে বেঁধে দিল। তুরা প্রচণ্ড আতঙ্কে শিউরে উঠল। সে রুমাল খোলার জন্য হাত বাড়াতে যাবে, তার আগেই দু’জন মহিলা এসে তার হাত পাথর চাপা দেওয়ার মতো চেপে ধরল।

তুরা ভয়ে তোতলাতে তোতলাতে বলল।

” কা কা কারা আপনারা? আমার চোখ এইভাবে বাঁধলেন কেন? ছেড়ে দিন আমাকে!”

কিন্তু মহিলারা তুরার কথায় কোনো উত্তর দিল না। তারা তুরাকে টেনে নিয়ে একটা দামী এসইউভি গাড়িতে বসাল। তুরা ভয়ে থরথর করে কাঁপতে কাঁপতে বলল।

“প্লিজ, বলুন আপনারা কারা? আর আমাকে এইভাবে কোথায় নিয়ে যাচ্ছেন? প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন, আমি রৌদ্রের কাছে যাবো!”

মহিলাটি আরও শক্ত করে তুরাকে আসন থেকে নড়তে না দিয়ে চেপে ধরল। গাড়ি তীব্র গতিতে চলতে লাগল। তুরা ভয়ে রীতিমতো ফুঁপিয়ে কেঁদেই দিচ্ছে। মহিলাটির হাত থেকে নিজেকে ছাড়ানোর জন্য তুরা প্রাণপণে হাত পা ছুঁড়ল, কিন্তু দু’জন মহিলার সাথে পেরে উঠল না।

তুরা ভাবছে, হয়তো তারা তাকে অপহরণ করছে, না হলে এইভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়ে কোথায় নিয়ে যাবে! বেশ কিছুক্ষণ পর গাড়ি হঠাৎ চরম নিস্তব্ধ এক জায়গায় থামল। মহিলারা তুরাকে গাড়ি থেকে নামাল। তুরা আবারো কান্না জড়ানো মিনতির সুরে বলল।

“প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন! আমি কী ক্ষতি করেছি আপনাদের? এইভাবে আমাকে কেন ধরে নিয়ে এলেন? প্লিজ আমাকে ছেড়ে দিন!”

একজন মহিলা ধমকের স্বরে বললেন।

“Chasch nöd still si, Meiteli? Warum redsch so viel?”

বাংলা অনুবাদ _”এই মেয়ে! চুপ থাকতে পারো না? এত কথা বলো কেন?”

মহিলাটির ধমক শুনে তুরা আর কথা বাড়াল না।

মহিলাটি তুরাকে নিয়ে কোনো একটা জায়গায় এনে দাঁড় করাল। যেখানে তুরা বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ ছাড়া কোনো আওয়াজ পাচ্ছে না।একদম নিস্তব্ধ বরফের রাজত্বের মতো অনুভব করতে পারছে। মহিলাটি আবারো তুরার হাতে ফুলের তোড়া ধরিয়ে দিয়ে আলতো করে তুরার চোখ থেকে রুমালটা খুলে দিল।

রুমাল খোলার সাথে সাথেই তুরা একদম স্তম্ভিত হয়ে গেল। তার মুখটা বিস্ময়ে হা হয়ে গেল, চোখ দুটো বড় বড়। সে যেন কথা বলার ভাষা পর্যন্ত হারিয়ে ফেলল। তীব্র গতিতে তার চারপাশে চোখ বুলিয়ে নিচ্ছে, কিন্তু মস্তিষ্কের কোষগুলো কোনো তথ্যই প্রক্রিয়া করতে পারছে না। তার চারপাশের দৃশ্যটি এতই অবিশ্বাস্য এবং এত সুন্দর্য যে মুহূর্তের জন্য সে ভুলে গেল কে তাকে ধরে এনেছিল, বা সে কেন কেঁদেছিল! তার ভেতরের সমস্ত ভয়, কষ্ট আর রাগ যেন এক লহমায় নিঃশব্দে বিলীন হয়ে গেল।

রানিং…!

একটু শ্বাস নিয়ে সবাই বলি আরশির জন্য বেচারি খতম ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন৷ বিয়েটা আজকে দিলাম না অনেকে বলতেছে আমি নাকি দাওয়াত দেই নাই তাই আজকে থামিয়ে রাখলাম কালকে বিয়ে সবাইকে দাওয়াত কে কি পরবা ভেবে রাখো ধন্যবাদ..! 😌

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply