Golpo romantic golpo নির্লজ্জ ভালোবাসা

নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৮


নির্লজ্জ_ভালোবাসা

লেখিকাসুমিচোধুরী

পর্ব ২৮ (Love Story)

❌ কঠোরভাবে কপি করা নিষিদ্ধ ❌

সব কিছু যেন এক নিমিষেই অতল নিস্তব্ধতায় থমকে গেছে। সেই তীব্র আবেগের প্রভাবে রৌদ্রও থমকে গেছে, যেন কোনো মন্ত্রবলে বরফের মতো জমে গেছে।

তুরার মুখ থেকে ভালোবাসার সেই অমূল্য কথাটি শুনে রৌদ্র আনন্দের আতিশয্যে স্তব্ধ হয়ে গেছে,রৌদ্র মুহূর্তের জন্য কথা বলতেও ভুলে গেল। হঠাৎ ঝড়ের গতিতে বাতাস বইতে শুরু করল। সেই বাতাস যেন তাদের দুই হৃদয়ের মাঝে বয়ে চলা উচ্ছল আনন্দের বার্তা বহন করছিল।

রৌদ্র এক নিমিষেই তুরাকে নিঃশ্বাসের অভাবে শক্ত করে আলিঙ্গন করল। তুরার কপালে স্নিগ্ধ চুম্বন এঁকে দিয়ে সে আবেগরুদ্ধ কণ্ঠে জিজ্ঞেস করল।

“কী, কী বললি তুরা? তুই যা বলছিস, সত্যি?”

তুরা রৌদ্রকে আরও দৃঢ়ভাবে জড়িয়ে ধরে বলল।

“সত্যি! সত্যি! হাজার হাজার সত্যি।”

মুহূর্তে রৌদ্র তুরাকে সেই আবেগময় অবস্থাতেই পাজাকোলে তুলে নিল। সে পাগলের মতো ঘুরতে ঘুরতে উন্মত্তের মতো চিৎকার করে বলতে লাগল।

“আমি আমি কখনো ভাবিনি আমি তোকে এইভাবে পাবো! আমি তো ভেবেছিলাম আমার ভালোবাসাটা হয়তো মারাত্মক অপরাধ হয়ে গেছে! কিন্তু না, আমার ভালোবাসা অপরাধ হয়নি। আমার ভালোবাসা সত্যি ছিল, তাই তো আজ আমি তোকে পেলাম! আই লাভ ইউ তুরা! আই লাভ ইউ সো মাচ তুরা!”

তুরাও কান্নাভেজা কণ্ঠে চিৎকার করে বলল।

“আমি এই কথাটা আগেই বলতে চেয়েছিলাম, কিন্তু কেমন জানি আমার আপনাকে ভয় লাগত, তাই বলতে পারিনি! তবে আজ যখন আপনাকে একটা মেয়ের সাথে দেখলাম, বিশ্বাস করেন, আমার বুকে অসহ্য কষ্ট হয়েছিল। আমি নিজেই নিজের মাঝে ছিলাম না, তাই তো বেরিয়ে এসেছি।”

তুরার কথা শুনে রৌদ্র খুশি ও আবেগ ভরা কণ্ঠে বলল।

“ভালোই হয়েছে মেরিন জড়িয়ে ধরেছে! নাহলে আজ এই মুহূর্তটা যে কবে আসত, তার ধারণাই ছিল না। আমার তরফ থেকে মেরিনকে অনেক অনেক ধন্যবাদ।”

রৌদ্রের মুখে ‘মেরিন’ নামটি শুনে তুরা অবাক হয়ে জানতে চাইল।

“মেরিন কে?”

রৌদ্র হেসে জবাব দিল।

“যে জড়িয়ে ধরেছিল, সেই মেরিন।”

তুরা কৌতূহলী হয়ে জানতে চাইল।

“আচ্ছা! ওই মেয়ে আপনাকে চেনে কিভাবে?”

রৌদ্র তুরার হাত নিজের মুঠোয় নিয়ে, গভীর ভালোবাসায় বলল।

“তুরা! তুই আমার অতীত কিন্তু জানিস? তো, মেরিন আমার অতীত লাইফে ছিল। তোর প্রতি আসক্ত হওয়ার পর আমি সব মেয়েদের কাছ থেকে মাফ চেয়েছি। এবং কি, অনেকে টাকার খাতিরে মাফও করে দিয়েছে। আর এই মেরিন অন্য দেশে গিয়েছিল, নাম্বার ব্লকলিস্টে ছিল, তাই হঠাৎ যোগাযোগ বন্ধ হওয়ায় এমন করেছে। কিন্তু বিশ্বাস কর, তোর প্রতি আসক্ত হওয়ার পর আমি আর কোনো মেয়ের সান্নিধ্যে যাইনি। আমি ভেবেছিলাম, তোকে পাইনি এই জীবনে আমার কাউকে লাগবে না। লাইফটা একাই কাটিয়ে দেব। কিন্তু আমার ভালোবাসা সত্যি ছিল, তাই আমি তোকে আজ পেলাম। কখনো ছেড়ে যাস না তুরা। নিজের জীবনের সবটুকু দিয়ে তোকে আমি সারাটা জীবন আগলে রাখব।”

রৌদ্রের কথাগুলো শেষ হতেই তুরা প্রায় এক মিনিটের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। নীরবতা এত গভীর যে রৌদ্রের হৃদস্পন্দন সে শুনতে পাচ্ছিল। রৌদ্র তুরাকে চুপ করে থাকতে দেখে সামান্য মাথা নিচু করল,তার চোখে ভয়ের ছায়া এই বুঝি তুরা সরে গেল। কিন্তু মুহুর্তে তুরা রৌদ্রের অবস্থা দেখে, তার চোখে দ্বিধা না জমতে দিয়েই, রৌদ্রের কোলে থাকা অবস্থাতেই তার গলা নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল।তুরা অত্যন্ত আবেগ ও দৃঢ়তা স্বরে বলল।

“আপনার অতীত কী হয়েছে বা হয়নি, আমি আর এইসব কিছুই জানতে চাই না। আমার কাছে আপনার অতীত অন্ধকার, আর সেই অন্ধকারে আমার কোনো আগ্রহ নেই। আমি শুধু এখন ভাবতে চাই আপনাকে নিয়ে আমাদের সারাজীবনের পথচলা। আপনার হাত দুটো চিরকালের জন্য শক্ত করে ধরতে। ব্যাস, আর কিছু না। আমি আপনার অতীতকে না, আপনাকে ভালোবাসি। আমার শুধু আপনি হলেই চলবে, আর কিছু চাই না আমার।”

তুরার কথাটা শুনে রৌদ্রের মুখে এক মুগ্ধ হাসি ফুটল। সে তুরার কপালের সাথে নিজের কপাল ঠেকালো। সেই স্পর্শে দু’জনের ভয়ের রেশ যেন মুছে গেল।রৌদ্রে গভীর প্রত্যয় ও ভালোবাসার সাথে বলল।

“আমি তোকে কথা দিচ্ছি, আমার ভিতরে রূহু টা থাকতে তোকে আমি এক চুল পরিমাণও কষ্ট দেব না। আমার প্রতিটি নিঃশ্বাস শুধু তোকে ঘিরেই থাকবে। আমিও তোকে নিয়ে এই সারাটাজীবন কাটাতে চাই। তুই আমার শুরু, তুই আমার শেষ আশ্রয়। তুই আমার বর্তমান, তুই আমার চূড়ান্ত লক্ষ্য। আই লাভ ইউ তুরা।”

তুরাও রৌদ্রের কপালে কপাল ঠেকিয়ে চোখ বন্ধ করল।তুরা কণ্ঠে স্বর্গীয় শান্তি নিয়ে বলল।

“আই লাভ ইউ টু রৌদ্র ভাইয়া।”

মুহূর্তে রৌদ্র তুরাকে কোল থেকে নামিয়ে, এক তীব্র আকর্ষণে, বুকের গভীরে টেনে নিল। তুরা সেই স্পর্শে পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি ভুলে, এক পরম শান্তির উষ্ণতায় রৌদ্রকে নিবিড়ভাবে জড়িয়ে ধরল।

সেই রাত। মাথার উপরে তারাশূন্য আকাশের বুক চিরে থাকা ঘন অন্ধকার জঙ্গল সেই দুই হৃদয়ের গোপন কথাগুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে রইল। সাক্ষী থাকল তাদের প্রথম ভালোবাসার কম্পিত কথোপকথন যেখানে প্রতিটি শব্দে ছিল ভবিষ্যতের অটল প্রতিশ্রুতি। সাক্ষী থাকল প্রকৃতির শ্বাস-প্রশ্বাস ঝিঁঝিঁ পোকার একঘেয়ে ডাক,শীতল বাতাসের সরসর শব্দ, আর নিশাচর গাছের পাতার মৃদু আন্দোলন। সেই মহাজাগতিক অন্ধকারে, তাদের ভালোবাসার শপথ যেন চিরকালের জন্য অঙ্কিত হয়ে গেল।

,,,,,

গভীর রাতে, বিদেশী শহরের নিঃশব্দ পিচ ঢালা রাস্তা। আকাশের চাঁদ হয়তো সামান্য আবছা, কিন্তু রাস্তার আলোগুলো দু’জনের হাতে ধরা সম্পর্কের বাঁধনকে আরও উজ্জ্বল করে তুলেছে। রৌদ্র আর তুরা একে অপরের হাতের উষ্ণতা অনুভব করতে করতে পাশাপাশি হেঁটে চলেছে। আজ রৌদ্রের বুক থেকে যেন ভারী পাথর সরে গেছে এক অজানা ভয়, যা এতদিন চেপে ছিল, তা আজ তুরার সাহচর্যে উধাও। তুরা গল্প করতে করতে হাসছে, আর মাঝে মাঝেই আদুরে ভঙ্গিতে রৌদ্রের চওড়া কাঁধ বা বুকে মাথা হেলিয়ে দিচ্ছে।

তারা হাঁটছিল। সেই মুহূর্তে, তুরা হঠাৎ থেমে গিয়ে রৌদ্রের দিকে মুখ তুলে তাকাল। তাদের হাঁটার ছন্দ যেন মুহূর্তের জন্য থেমে গেল, আর তুরা রৌদ্রের চোখে চোখ রেখে এক ঝলক দুষ্টুমি মাখা হাসি হেসে, তার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুঁড়ে দিল।

“আচ্ছা রৌদ্র ভাই, আপনার কি একটা বিশেষ ঘটনা মনে আছে?”

রৌদ্র থমকে দাঁড়াল। তার ভ্রু কুঁচকে উঠল, চোখে চিন্তার ছাপ। রাস্তার মৃদু আলোয় সে তুরার মুখ দেখল।

“কোন ঘটনার কথা বলছিস তুই?”

মুহূর্তে তুরা তার ডান হাতের তালু দিয়ে নিজের নরম গালটা আলতো করে ছুঁয়ে দিল, আর চোখে এক কৃত্রিম অভিযোগের সুর এনে বলল।

“আপনি আমাকে চড় মেরেছিলেন! তাও কিনা আমার এই নরম, তুলতুলে গালে?”

তুরার ‘থাপ্পড়ের’ অভিযোগ শুনে রৌদ্র আকাশ-ফাটানো ফিক করে হেসে দিল। রাস্তার দু’পাশের দোকানগুলো যেন সেই হাসির প্রতিধ্বনি তুলল।

“ওহ্, আচ্ছা এই কথা! তোর সেই ঐতিহাসিক চড়টা এখনও মনে আছে?”

তুরা গাল ফুলিয়ে, ঠোঁট উল্টে বলল।

“মনে থাকবে না কেন? নরম গালে আপনার ওই মারের দাগ হয়তো মুছে গেছে, কিন্তু অপমানের দাগ এখনও টাটকা! সামান্য একটা ধাক্কা লাগায় আপনি আমাকে অমন একটা দুর্দান্ত চড় মেরেছিলেন?”

তুরার করুণ মুখ আর রাগী কথা শুনে রৌদ্র হাসতে হাসতে মাটিতে বসে পড়ার উপক্রম হলো। সে পেটে হাত চেপে ধরে প্রায় কাতরানো স্বরে হাসতে লাগল। তুরা তাকে এভাবে হাসতে দেখে চোখ সরু করে তাকাল, তার রাগ যেন আরও বেড়ে গেল।

“মাঝরাস্তায় কি আপনাকে পাগলা কুকুরে ধরলো যে এমন হাসির দমক উঠেছে? আপনি কি পাগল হয়ে গেলেন?”

রৌদ্র হাসি থামানোর ব্যর্থ চেষ্টা করে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল।

“দাঁ… দাঁড়া! প্লিজ! আগে একটু শান্ত হয়ে নিই।”

তুরা এবার দাঁতে দাঁত চেপে, ভুরুর ভাঁজ আরও ঘন করে বলল।

“আমার কষ্ট দেখে আপনার হাসি পাচ্ছে, তাই না! ঠিক আছে।”

রৌদ্র হাসি সামলে, তুরার দিকে ঝুঁকে রহস্য করে বলল।

“হাসি পাচ্ছে মানে! সেই হাসি! তুই আমাকে ছোটবেলার এমন একটা কথা মনে করিয়ে দিলি! তুই জানিস? তুই যেদিন এই পৃথিবীতে এলি, সেইদিনই….(হিশু) ইস্, কী ভয়ংকর গন্ধটাই না ছিল!”

রৌদ্র কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যা বলল, কেবল তুরাকে বেশি করে রাগিয়ে দেওয়ায় মজা নিতে। রৌদ্রের মুখে এমন কথা শুনে মুহূর্তে তুরার চোখ দুটো যেন কপালে উঠে গেল, তার মুখ হাঁ হয়ে গেল!

“কীহহহহ? আপনি এ কী বলছেন!”

“জ্বী ম্যাডাম। একেবারে সঠিক বলছি।”

ব্যাস! আর কথা নেই। তুরা রাগে আগুন হয়ে গেল। সে আর সময় নষ্ট না করে রৌদ্রের বুকে ধুমধাম কিল-ঘুষি মারতে শুরু করল, তার গলার স্বর রাগে কাঁপছিল।

“আমার সাথে মিথ্যা কথা বলে মজা করেন! দাঁড়ান, দেখাচ্ছি মজা কাকে বলে!”

তুরার কিল ঘুষি খেতে খেতে রৌদ্র নকল ব্যথা দেখিয়ে যেন গলা ফাটিয়ে বলল।

“আহা! মার! মার! তোর এই লজ্জাবতী নরম হাত দুটো দিয়ে মার। আরে বাহ! এ তো বিনাপয়সায় শরীরচর্চা হচ্ছে! মার, মার! আরও জোরসে!”

তুরা মারতে মারতে ক্লান্তিতে হাঁসফাঁস করছে, কিন্তু রৌদ্রের মুখে ব্যথার লেশমাত্র নেই। তার ঠোঁটের কোণে লেগে আছে দুষ্টু হাসি, সে একদম নির্লিপ্ত। রৌদ্রের এই ভাবলেশহীনতা দেখে তুরার নিজের শক্তির উপরই ভীষণ রাগ হলো। হঠাৎ তুরার চোখে শয়তানি বুদ্ধির ঝিলিক দেখা গেল। তুরা কিল-ঘুষি থামিয়ে, দুষ্টু হেসে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে আহ্বান জানানোর ভঙ্গিতে ভ্রু নাচালো। রৌদ্র এই নীরব ইশারা দেখে সতর্ক হয়ে চোখের ইঙ্গিতে জানতে চাইল।

“কী মতলব ম্যাডাম?”

মুহূর্তে তুরা আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট না করে বিদ্যুৎ গতিতে রৌদ্রের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল! সে রৌদ্রের কোমরের দু’পাশে ও বগলের নিচে হিংস্রভাবে কাতুকুতু দিতে শুরু করল। রৌদ্রের কাতুকুতুতে মারাত্মক ভয়! সে আর্তনাদ করে উন্মত্তের মতো হাসতে হাসতে রাস্তায় লুটিয়ে পড়ল, আর তুরাকে শক্ত করে ধরে রাখায় সেও সঙ্গে গড়িয়ে গেল।

রৌদ্র কোনোমতে হাসির দমক সামলে নিয়ে, তুরার পেটে ও গলায় পাল্টা কাতুকুতু দিতে লাগল। গভীর রাতের সেই নিস্তব্ধ বিদেশী রাস্তায়, রাস্তার আলোগুলোর নিচে, দু’জন যেন পৃথিবীর সমস্ত চিন্তা ভুলে গিয়ে, নির্লজ্জের মতো হাসাহাসি করতে করতে একে অপরের গায়ে মিশে গড়াগড়ি খেতে থাকল। সেই মুহূর্তের নির্মল আনন্দ আর উষ্ণতা গোটা পরিবেশকে ভরে তুলল।

🌿__________________🌿

বাংলাদেশ,,

শিহাব আরশিকে নিয়ে খান বাড়িতে পৌঁছতেই এক নিস্তব্ধ, চাপা উত্তেজনা চারদিকে ছড়িয়ে গেল। শিহাব তার স্বাভাবিক ভঙ্গিতে সবার সাথে কুশল বিনিময় করল, কিন্তু আরশি তখন যেন মাটির সঙ্গে মিশে যেতে চাইছিল। লজ্জায় সে শিহাবের দিকে চোখ তুলে তাকাতেও পারছিল না। মনে হচ্ছিল, এখন নিজেকে চাবুক মারতে পারলে যেন শান্তি হয়! এত বড় একটা কাণ্ড! তাও কিনা একটা ছেলের ঠোঁটে!আরশির কানে কেবল একটাই বাক্য বাজছিল।

“আরশি! তুই এত হালকা মেয়ে কবে হলি? ছিহ্! শিহাব ভাইয়া এখন তোকে ঘোর খারাপ ভাবছে! কী লজ্জার ব্যাপার!”

আরশির এই তীব্র আত্ম-ধিক্কারের মাঝেই রৌশনি খান এগিয়ে এলেন। যদিও তার মনের গহীনে ক্ষোভের আগুন জ্বলছিল, তবুও তিনি ঠোঁটে এক ফালি কৃত্রিম হাসি ফুটিয়ে তুলে আরশিকে বললেন।

“কী রে, দাঁড়িয়ে আছিস কেন? শিহাব বাবাকে রুমে নিয়ে যা। অনেক দূর থেকে ক্লান্তিকর জার্নি করে এসেছে। ফ্রেশ হয়ে দু’জনে তাড়াতাড়ি নিচে আয়।”

কথাটা বলেই রৌশনি খান আরশির উত্তর শোনার অপেক্ষাও না করে দ্রুত রান্নাঘরের দিকে চলে গেলেন। রৌশনি খানের এই নিস্পৃহ আচরণ দেখে আরশির মনটা আরও খারাপ হয়ে গেল। এরপর কোনোমতে সবার সাথে দায়সারা কথা বলল সে। পরিবারের অন্য সদস্যদের ভিতরেও রাগ থাকলেও, এখন কেউ তা প্রকাশ করল না।

আরশি শিহাবকে নিয়ে নির্দিষ্ট ঘরে এল। লজ্জায় আরশির গলা দিয়ে যেন শব্দ বের হচ্ছে না, মাথা নিচু করে সে শুধু মেঝে দেখছে। তবুও সৌজন্যের খাতিরে মাথা নিচু রেখেই বলল।

“এইটাই… এইটাই আমার রুম। আপনি এখানেই থাকুন। আমি আরফার ঘরে যাচ্ছি। আর ওইদিকে ওয়াশরুম আছে, আপনি ফ্রেশ হয়ে নিতে পারেন।”

কথাটা বলেই আরশি ঘর থেকে মুক্তি পেতে দ্রুত বের হতে যাবে, ঠিক তখনই শিহাবের কণ্ঠস্বর তাকে থামিয়ে দিল।

“বাহ্! এই প্রথম দেখলাম! মেয়েরাও যে এমন নির্লজ্জ ও বেপরোয়াভাবে ছেলেদের ঠোঁটের উপর ঝাঁপ দিতে পারে, তা আমার জানা ছিল না। বিয়ের শুরুতেই যদি এই অবস্থা হয়, না জানি পরে আর কত কী দেখতে হবে!”

কথাটা শুনে আরশি যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হলো! লজ্জায় তার জিভ শুকিয়ে কাঠ, সে ঠোঁটে দাঁত চেপে ধরল। কোনোমতে সামনের দিকে ঘুরতে ঘুরতে তোতলাতে শুরু করল।

“আ… আ… ব… ইয়ে মানে, আমি ভীষণ সরি!”

আরশি তাকিয়ে দেখল, ঘর খালি! ওয়াশরুম থেকে জলের শব্দ আসছে, তার মানে শিহাব ইতিমধ্যেই ভিতরে চলে গেছে। আরশি আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়ানোর সাহস পেল না। প্রায় ছুটে পালানোর ভঙ্গিতে ঘর থেকে দ্রুত বেরিয়ে এল।

রাতের খাবার পর্ব শেষে যে যার ঘরে ফিরে গেল। আরশি আর আরফা দু’জনেই মন হালকা করার জন্য ছাদের খোলা হাওয়া উপভোগ করতে এল। ছাদে উঠেই তারা দেখল, আয়ান আর শিহাব পাশাপাশি দাঁড়িয়ে নিচু স্বরে কিছু একটা নিয়ে কথা বলছে।

আরফা তাদের দু’জনকে দেখে একটু অবাক হয়ে বলল।

“বাহ্! তোমরা দু’জন এই নিঝুম রাতে ছাদে কী করছ?”

আরফার প্রশ্নে আয়ান দুষ্টুমি ভরা হাসি হেসে বলল।

“কী আর করব! তোদের মতো পেত্নিদের দেখতে এসেছি, আর তাদের নিয়েই গল্প করতে এসেছি!”

আরফা চোখ দুটো সরু করে আয়ানের দিকে তাকাল।

” ভাইয়া, তুমি!”

আয়ান মুখে কৌতুকের ভাব এনে বলল।

“কী হয়েছে? তোরা সত্যি পেত্নি তাহলে!”

ঠিক সেই হাস্যরসের মুহূর্তে শিহাব আরফার বদলে আরশির দিকে আড় চোখে তাকিয়ে, ঠোঁট কামড়ে যেন কথাটা মুখ ফসকে বেরিয়ে গেল।

“তার থেকেও ভয়ংকর কিছু!”

কথাটা বলেই শিহাবের খেয়াল হলো সে আরশির বদলে আরফার দিকে তাকিয়ে মন্তব্য করেছে। সে সঙ্গে সঙ্গে থতমত খেয়ে গেল এবং আরফার দিকে তাকিয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে তোতলাল।

“আ.আ..ব..আসলে আরফা, আমি কথাটা তোমাকে..?।”

কিন্তু তার বাক্য শেষ করার আগেই আরফা রেগে আগুন হয়ে গেল। তার মুখ লাল, সে চোখ দিয়ে যেন অগ্নিবৃষ্টি করছে।

“আপনাদের কারও সাথে আর একটাও কথা বলব না! নিন, আপনারা সবাই মিলে আমাকে নিয়ে মজা করতে থাকুন, আমি গেলাম !”

কথাটা বলেই আরফা পা ঠুকে ঠুকে বড় বড় পা ফেলে দ্রুত ছাদ থেকে নেমে চলে গেল। আয়ান পরিস্থিতি বুঝে নিয়ে আরশি ও শিহাবের দিকে আড় চোখে তাকাল এবং গলা খাঁকারি দিয়ে শিহাবের উদ্দেশে বলল।

“আসলে ব্রো, আমার একটা খুব জরুরি কল দিতে হবে। আপনি আর আরশি থাকেন তাহলে, আমি যাই।”

এই বলে আয়ানও আর এক মুহূর্ত না দাঁড়িয়ে ছাদ থেকে নিচে নেমে গেল।

আয়ান নিচে নেমে যেতেই ছাদটা যেন আরও গভীর নীরবতায় ডুবে গেল। নিস্তব্ধতা এতটাই তীব্র যে দু’জনের নিঃশ্বাসের শব্দও যেন কানে বাজছে। শিহাব ছাদের ঠান্ডা গ্রিল ধরে স্থিরভাবে দাঁড়িয়ে আছে। তার পিছুটানহীন ভাব আরশির মনে আরও ভয় জাগাচ্ছে। আরশি বুঝতে পারছে না, কী করে এই থমথমে পরিবেশ স্বাভাবিক করবে।

কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর, আরশি মনে অনেকটা সাহস সঞ্চয় করে শিহাবের পাশে এগিয়ে গেল। সে শিহাবের দিকে মুখ করে দাঁড়িয়ে নরম স্বরে বলল।

“শিহাব ভাইয়া, এভাবে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? ঘুমাবেন না?”

শিহাব আরশির কথায় তার দিকে না তাকিয়েই, অত্যন্ত নিস্পৃহ গলায় উত্তর দিল।

“যখন ঘুম আসবে, তখন ঘুমাব। এখন কি তোমাকে জানাতে হবে আমি ঘুমাব কি না?”

শিহাবের কঠিন কথায় আরশি ভিতরে ভিতরে ভীষণ মন খারাপ করল। সে তো শুধু স্বাভাবিকভাবে জানতে চেয়েছিল, এমন করে বলার কী ছিল?

আরশি তাই আর তর্ক না করে, বিষণ্ণ গলায় বলল।

“ঠিক আছে, আপনার যখন ইচ্ছে হয় তখন ঘুমিয়েন। বাই, গুড নাইট।”

কথাটা বলেই আরশি ধীর পায়ে সেখান থেকে চলে যেতে উদ্যত হলো। হঠাৎ শিহাব কী মনে করে যেন নিজের অজান্তেই বিদ্যুৎগতিতে আরশির ওড়নার এক প্রান্ত ধরে টান মারল। আরশি তাল সামলাতে না পেরে একদম শিহাবের শক্ত বুকে আছড়ে পড়ল।

শিহাবের বুকে আছড়ে পড়তেই আরশির অজান্তেই তার বুকের স্পন্দন কেঁপে উঠল এবং দ্রুত ধুকপুক করতে লাগল। এদিকে শিহাবেরও একই অবস্থা! দু’জনেরই হৃদকম্পন এতটাই তীব্র যে, মনে হলো যেন একে অপরের হার্টবিটের শব্দ শুনতে পাবে। শিহাব মাথা নিচু করে আরশির দিকে তাকাল। সেই মুহূর্তে তার চোখ আরশির চোখে এক পলকের জন্য আটকে গেল।

মুহূর্তেই শিহাব দ্রুত অন্যদিকে দৃষ্টি ফেরাল। কী হলো তার? সে এইভাবে আরশিকে টান দিল কেন? আর তার হার্টবিট এমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে কেন, যেমনটা তুরাকে দেখলে একসময় করত? শিহাবের মনের ভেতরে যেন এক অচেনা ঝড় উঠল।

শিহাব আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। সে দ্রুত আরশিকে সরিয়ে দিয়ে সোজা করে দাঁড় করাল। কোনো কথা না বলে, বড় বড় পা ফেলে, প্রায় ছুটে যাওয়ার ভঙ্গিতে ছাদ থেকে নেমে চলে গেল।

আরশি হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। সে কিছুই বুঝতে পারল না শিহাব হঠাৎ এইভাবে তার ওড়না ধরে টান দিল কেন? আর তার নিজের হৃদয়ই বা এমন করছে কেন? আগে তো শিহাবকে কতবার দেখেছে, তখন তো এমন অদ্ভুত লাগত না! শুধু কি স্বামী বলেই এমন অনুভূতি? কিন্তু আগে যখন তাকে দেখেছে, তখন তো এমন হয়নি। আরশি নিজের এই অপরিচিত অনুভূতির কারণ খুঁজে পেল না।

রানিং…!

ভুলক্রটি হলে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন আর অনেকে ফেক পেইজে ফেক গল্প পড়ছেন তাই দয়া করে ফেক পেইজ থেকে দুরে থাকবেন!আর রাতে সারপ্রাইজ পর্ব আছে সবার জন্য …!

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply