নির্লজ্জ ভালোবাসা লেখিকা প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
পর্ব ১৬
সময় যেন কারও ব্যক্তিগত যন্ত্রণার ধার ধারে না। সে তার নিজের গতিতে অবিরাম, নিরলসভাবে বয়ে চলে। প্রকৃতির নিয়মে এক মুহূর্তের জন্যও তার চলার পথে কোনো বিরতি নেই। সে কারও অশ্রু দেখে না, কারো আকুলতা বোঝে না, কিংবা কারো ফিরে আসার জন্য অপেক্ষা করে না। সময় শুধু তার নিজের পথে চলে, আর পিছনে ফেলে যাওয়া সব গল্প সব সুখ-দুঃখ এক নিরাসক্ত অতীত হয়ে যায়। ভোরের আবছা আলো যখন সবকিছুতে নতুন দিনের বার্তা নিয়ে আসে, তখনো নীরব ঘড়ির কাঁটা শুধু টিক টিক শব্দ করে প্রমাণ করে, জীবন স্থবির নয়, বরং সেই প্রবাহে সব বেদনাকেও টেনে নিয়ে যেতে বাধ্য।
রৌদ্র চলে গেছে আজ তিন দিন। এই তিন দিন তুরা কোনো কিছুতেই মন বসাতে পারেনি না পেরেছে খেতে, না পেরেছে হাসতে। তার চারপাশের পৃথিবীটা যেন হঠাৎ রং হারিয়ে ফেলেছে। সে সবসময় নিজের মনকে বার বার বুঝিয়েছে।রৌদ্র তার কেউ না, জাস্ট ভাই। কিন্তু মন যেন অন্য কিছু বলছে।মনের এই অজানা বিদ্রোহ তুরাকে স্বস্তি দিচ্ছে না। যতবার সে রৌদ্রের কথা ভুলতে চেয়েছে, ততবারই তার চোখের সামনে ভেসে উঠেছে ছাদের সেই দৃশ্য রৌদ্রের হাউমাউ করে কান্না, ফুওয়ার জন্য তার তীব্র যন্ত্রণা এবং বিদায়ের সময় তার দৃঢ় প্রতিজ্ঞার কণ্ঠস্বর। তুরা বুঝতে পারছে না, এই অস্থিরতা কি কেবল সহানুভূতি, নাকি এর আড়ালে অন্য কোনো অব্যক্ত সম্পর্ক দানা বাঁধছে।
সকালবেলা। ডাইনিং টেবিলে সবাই বসে খাবার খাচ্ছে। তুরাও খাচ্ছে বটে, তবে মুখে তার বিস্বাদ। ভাত যেন গলা দিয়ে গিলতে পারছে না শুধু হাত নাড়াচ্ছে, মনোযোগ তার খাদ্যে নেই। তার চোখের দৃষ্টি শূন্য, যেন রৌদ্রের বিদায় নেওয়ার সেই তিন দিন আগের স্মৃতিতে সে এখনো ডুবে আছে।
খাওয়ার ফাঁকে আনোয়ার খান, যিনি এই পরিবারের প্রধান তিনি গম্ভীর কণ্ঠে সকলের উদ্দেশ্যে বললেন।
“শিহাবের বাবা কল দিয়েছিল। শিহাব এখন সুস্থ। তাই তারা বিয়ের কাজটা আর দেরি করতে চাইছে না। তারা চায়, যতো দ্রুত সম্ভব বিয়ের কাজটা সেরে ফেলা হোক।”
আনোয়ার খানের এই ঘোষণা তুরার মাথায় যেন বজ্রাঘাত হানল। এক মুহূর্ত আগে রৌদ্রের জন্য তার মনে যে অজানা টান তৈরি হচ্ছে, এই কথায় তা তীব্র আতঙ্কে রূপান্তরিত হলো। তুরার হাতের চামচটি শব্দ করে প্লেটে পড়ে গেল। তার হৃদস্পন্দন হঠাৎ করেই যেন থেমে গেল।তুরার হাত থেকে চামচ পড়ে যেতে দেখে তনুজা খান দ্রুত প্রশ্ন করলেন।
“কী হলো তোর? এইভাবে চামচ পড়ল কীভাবে?”
তুরা যেন এই সহজ প্রশ্নেও বিচলিত হয়ে উঠল। সে তাড়াতাড়ি চামচটি আবার হাতে তুলে নিল। তার হাত তখনো অল্প অল্প কাঁপছে।
“কিছু হয়নি মা। ভুল করে পড়ে গিয়েছে।”
তুরার দুর্বল উত্তরে কেউ বিশেষ মনোযোগ দিল না। সকলে আবার নিজেদের মতো করে খাওয়ায় ব্যস্ত হলো।এইবার আশিক খান খাওয়ার ফাঁকে আনোয়ার খানের উদ্দেশ্যে বললেন। তার কণ্ঠে ছিল এক প্রকার স্বস্তি এবং অসহায় কৃতজ্ঞতা।
“আমিও আর দেরি করতে চাই না। যে ঝড় গেল এতকিছুর পর শিহাব বাবা যে আমার মেয়েকে বিয়ে করতে চাইছে, সেটাই আমার কাছে অনেক।”
আশিক খানের এই কথাগুলো তুরার কানে যেন সীসার মতো ভারী হয়ে বাজল। তার মনে হচ্ছে সে যেন এক অন্ধকার গর্তের গভীরে তলিয়ে যাচ্ছে। সবাই নিজেদের স্বস্তি ও নিরাপত্তার কথা ভাবছে, কিন্তু তার মনের ভেতরে যে রৌদ্রের প্রতি এক নতুন টান জন্মেছে, সে কথা কাউকে বলা অসম্ভব । সে এখন কী করবে?
তুরার মনের অনুভূতিগুলো এক ঝড়ো হাওয়ার মতো তোলপাড় হচ্ছে। রৌদ্রের প্রতি তার নতুন অনুভূতি,আর অন্যদিকে এই মুহূর্তে শিহাবের সাথে তার অনিবার্য বিয়ের ঘোষণা সব যেন তাকে suffocating করে দিচ্ছে। তুরার মানসিক অস্থিরতার মাঝেই আরিফুল খান, দ্রুত সিদ্ধান্ত নিতে চেয়ে বললেন।
“তাহলে আর দেরি কিসের? গায়ে হলুদ তো হয়েই আছে! তাহলে দু’দিনের মধ্যেই বিয়েটা দিয়ে দিই।”
আরিফুল খানের এই প্রস্তাব যেন তুরার হৃৎপিণ্ডকে এক মুহূর্তে চেপে ধরল। সে যেন কোনো কথা বলার শক্তি খুঁজে পাচ্ছে না।আনোয়ার খান আরিফুল খানের কথা শুনে বললেন। তার কণ্ঠে ছিল ভারী বিষাদ এবং কিছুটা ক্লান্তি।
“না,আর ক’টা দিন যাক। রৌদ্র চলে যাওয়ায় বাড়ির অবস্থা তেমন কারও ভালো না। আমি মনমরা বাড়িতে এখনই বিয়ের আয়োজন করতে চাই না। তবে খুব দ্রুতই দিতে চাই, সম্ভবত এই সপ্তাহের পরে।”
রৌদ্রের চলে যাওয়ার কারণে বিয়ের তারিখ পিছোলেও, তুরার মনে কোনো স্বস্তি এলো না। রৌদ্রের অনুপস্থিতিই যেন তার জীবন থেকে পালিয়ে যাওয়ার পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছে। সে জানতে পারল, বিয়েটা অনিবার্য, শুধু সময়ের অপেক্ষা। এই মুহূর্তে তার নীরবতা যেন তার অসহায় সম্মতি হয়ে ধরা দিল সবার কাছে।
আনোয়ার খানের সিদ্ধান্তের পর আর কেউ কোনো কথা বলতে পারলেন না। তাঁর সিদ্ধান্তই যেন সকলের কাছে চূড়ান্ত হয়ে ধরা দিল। টেবিলের পরিবেশটা দ্রুতই থমথমে হয়ে উঠল, যেখানে কিছুক্ষণ আগেও ছিল ব্যস্ততা। সকলে যার যার মতো খাওয়া দাওয়া শেষ করলেন। চামচ-প্লেটের মৃদু শব্দ ছাড়া আর কোনো বাক্য বিনিময় হলো না।
তুরা দ্রুত তার রুমে এল। ঘরে এসেই সে অস্থির পায়ে রুম পাইচারি করতে লাগল। তার মনে তখন হাজারো প্রশ্ন। কেন তার বিয়ে শিহাবের সাথে শুনে সে এইভাবে ভেঙে পড়ল? কেন তখন রৌদ্রের কথাই মনে হলো? কেন তার এমন অস্থির লাগছে? কেন? কেন? কেন?এই প্রশ্নের কোনো উত্তর না পেয়ে সে যেন ক্রোধে উন্মত্ত হয়ে উঠল। তুরা সোজা আয়নার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে আঙুল উঁচিয়ে চোখে জেদ আর কষ্টে লাল করে বলল।
“শোন তুরা, আজকের পর থেকে যদি রৌদ্রের নাম তোর মুখে দেখেছি, তাহলে মেরে তোকে তক্তা বানিয়ে দেব! রৌদ্র কে হয় রে? তার কথা তোকে এত কেনো মনে করতে হবে! রৌদ্র চলে গেছে অনেক দূরে। এখন রৌদ্র আর তুই আকাশ-পাতাল সমান। তাহলে কেন তুই বার বার রৌদ্রের কথা ভাবছিস? আবার যদি ওই বেডার কথা ভাবিস, তাহলে তোর দাঁত ভেঙে ইঁদুর মামার কাছে বিক্রি করে দেব! পাজি বেডি!”
তুরা যেন নিজের অনুভূতির সাথে পরিচিত হতে চাইছে না। তার সমস্ত সত্তা এই নতুন, অব্যক্ত টানটিকে অস্বীকার করতে ব্যস্ত। আবারো তুরা আয়নার দিকে তাকাল। তার চোখে তখন তীব্র জিজ্ঞাসা। তুরা চিৎকার করে, নিজের প্রতিচ্ছবির দিকে তাকিয়ে বলল।
“কে এই রৌদ্র? যে তার কথা তোকে এত মনে করতে হবে? রৌদ্র চলে গেছে, সেটা তো তোর খুশি হওয়ার কথা! তাহলে তুই কেন তার কথা এত মনে করছিস? কেন? কেন?”
নিজের মনের এই প্রশ্নের উত্তর সে দিতে পারল না। সেই অসহনীয় চাপ আর দ্বিধায় তুরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কথাটি বলেই সে আয়নার সামনে থেকে সরে এসে নিজের মাথার চুলগুলো শক্ত হাতে চেপে ধরে ফ্লোরে বসে পড়ল। তার মাথা তখন যন্ত্রণা আর অস্থিরতায় ছিঁড়ে যাচ্ছে। ফ্লোরে বসে সে তীব্র আর্তনাদ আর চিৎকার করতে থাকল। এই কান্না কেবল রৌদ্রের জন্য নয়, বরং নিজের অজানা ভালোবাসার কাছে হেরে যাওয়ার।
বিকাল বেলা। মনটা সামান্য হালকা করার আশায় তুরা ছাদে এলো। দিনের আলো তখন ম্লান হয়ে আসছে, নরম হলদেটে রোদ ছাদের একপাশে ঢলে পড়েছে। এই সময় ছাদের পরিবেশ সাধারণত শান্ত থাকে, কিন্তু তুরার ভেতরের অস্থিরতা সেই শান্তিকে যেন ব্যঙ্গ করছে।
যে ছাদ একদিন রৌদ্রের তীব্র যন্ত্রণা আর তার আত্মস্বীকারোক্তির নীরব সাক্ষী ছিল, আজ সেই ছাদেই তুরা এলো নিজের অব্যক্ত প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে। রৌদ্রের চলে যাওয়ার পর থেকে তার হৃদয়ে যে শূন্যতা সৃষ্টি হয়েছে, তা যেন এই খোলা আকাশের নিচে এসে আরও বেশি অনুভূত হলো। সে রেলিং ধরে দাঁড়াল, চোখ তুলে দিগন্তের দিকে তাকাল।যেখান থেকে রৌদ্র হয়তো বহু দূরে চলে গেছে। বাতাস এসে তার এলোমেলো চুলগুলো নাড়িয়ে দিয়ে গেল, কিন্তু তার মনের ভেতরে জমে থাকা মেঘগুলো সরানোর ক্ষমতা বাতাসেরও ছিল না।
তুরা কি নিজেকে বোঝাতে পারবে, রৌদ্রের প্রতি এই টান শুধুই ভাই হারানোর শোক? নাকি তার অন্ধকার অতীতের প্রতি সহানুভূতি? এই ছাদ, এই নির্জন বিকে তাকে কি কোনো উত্তর দেবে।
তুরা গভীর চিন্তায় মগ্ন। রৌদ্রের স্মৃতি, তার নিজের অনুভূতি এবং শিহাবের সাথে আসন্ন বিয়ের অনিবার্য নিয়তি সবকিছুই তাকে গ্রাস করছে। এমন সময় হঠাৎ তুরা কারো হাসির শব্দ পেল। শব্দটা তার পিছন দিক থেকে আসছে।তুরা চমকে উঠে পিছন দিকে তাকাল। দেখে, আরশি আর আরফা। ওদের দুজনকে দেখে তুরা দ্রুত নিজেকে স্বাভাবিক করে দাঁড়াল। চোখের ভেতরের অস্থিরতা সে এক নিমেষে লুকিয়ে ফেলার চেষ্টা করল।
আরশি আর আরফা এগিয়ে এলো। আরশি তুরার মুখের দিকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকাল, আরশি সরাসরি জিজ্ঞাসা করলো,,কিরে তুরা, তোর চোখ এমন লাল কেন? কেঁদেছিস নাকি?
আরশির সরাসরি প্রশ্নে তুরা দ্রুত তার ঠোঁটে খানিকটা হাসির ছোঁয়া ফুটিয়ে তুলল। সেই হাসি ছিল খুবই দুর্বল এবং কৃত্রিম, যা তার ভেতরের যন্ত্রণাকে ঢেকে দিতে পারল না।
তুরা আপ্রাণ চেষ্টা করে স্বাভাবিক কণ্ঠে বলল,,কই না আপু! আসলে কাল রাতে ঘুম হয়নি ভালো মতো। তাই হয়তো এমন দেখাচ্ছে?
আরশি আরফা দুজনেই তুরার মুখের দিকে সন্দেহ নিয়ে তাকাল। ঘুম না হওয়ার কারণে চোখ লাল হতে পারে, কিন্তু তুরার কণ্ঠস্বরে যে অস্বাভাবিক ভার ছিল, তা ওদের নজর এড়ালো না।
আরফা তখন হাসি চেপে আরশির উদ্দেশ্যে বলল,,হুম, ঘুম হয়নি! কারণ বিয়ের টেনশন! তাই না তুরা? এখন তো শিহাব ভাইও সুস্থ। আর দেরি নেই! আমাদের তো সেই জন্যই আসা, বিয়ের শপিং-এর প্ল্যান করতে হবে?
আরফার এই কথাগুলো যেন তুরার বুকে ছুরি চালিয়ে দিল। সে শুধু মৃদু হাসল, কোনো উত্তর দিতে পারল না।এই হাসি দেখে আরশি তুরার দিকে সন্দেহ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল। আরশি খুব ভালো করেই কিছুদিন ধরে লক্ষ্য করছে রৌদ্র চলে যাওয়ার পর থেকে তুরা কেমন যেন চুপচাপ হয়ে গেছে। আগে এই বাড়িটা তুরা মাতিয়ে রাখত হাসিগানে, কিন্তু আজ তুরা কেমন নিশ্চুপ, যেন তার ভেতরে কোনো বড় ঝড় চলছে।
আরশি এসব কিছু ভেবে নিজের মনে মনে বলল,কিছু একটা গোলমাল আছে। না হলে রৌদ্রের চলে যাওয়ায় তুরা এত ভেঙে পড়বে কেন? সে তো রৌদ্র কে তার কাজিন চোখেই দেখে! যাই হোক, আজ রাতে তুরার সাথে আমার যেভাবেই হোক কথা বলতে হবে। ওর কষ্টের কারণটা আমার জানতেই হবে।
এই সংকল্প নিয়ে আরশি তার মুখে হাসির রেখা টেনে তুরার উদেশ্য ভঙ্গি স্বরে বলল,,আসলে তুরা, শিহাব তোর সাথে দেখা করতে চায়। কিছুক্ষন আগে বাবার ফোনে কল এসেছিল। কাল ঠিক দশটায় তোকে নিয়ে সে ঘুরতে বের হবে।
আরশির এই কথা যেন তুরার স্তব্ধ হয়ে যাওয়া হৃদয়ে একটি ধাক্কা দিল। রৌদ্রের চলে যাওয়া আর শিহাবের সাথে আসন্ন বিয়ের অনিবার্যতার মাঝে, এই দেখা করার প্রস্তাব তুরার জন্য আরও অসহনীয় মনে হলো। সে যেন প্রস্তুত ছিল না। তার চোখ দুটি এক পলকে ছাদের রেলিং ছাড়িয়ে দূরে কোথাও স্থির হয়ে গেল। শিহাবের সাথে দেখা করা মানেই কেনো যেন মন বলছে রৌদ্রকে ভুলে যাওয়া যা তার মন কিছুতে মানতে পারছে না।
আরফা আনন্দে হেসে বলল,, বাহ! অবশেষে প্রেম পর্ব শুরু হচ্ছে! আমরা তাহলে কালকে শপিং-এ যেতে পারব এবং শিহাব ভাইয়ার সাথে ঘুরতেও পারবো তাই না তুরা?
তুরা নীরব, তার মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। এই নতুন পরিস্থিতিকে কীভাবে সামলাবে,সেই ভাবনায় সে যেন অন্ধকার দেখছে।আরশি আর আরফার সামনে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে।
তুরার ভিতরে ভয়ঙ্কর যুদ্ধ চলছে,তুরা নিজের মনকে নিজেই মনে মনে তীব্র কন্ঠে বলল,,কেনো রে তুই রৌদ্রকে ভুলতে চাচ্ছিস না? তুই তো রৌদ্রকে শুধু ভাই হিসেবেই দেখিস! তাহলে শিহাবের সাথে দেখা করতে তোর প্রবলেম কী? কেন তুই শিহাবের সাথে দেখা করতে মানা করছিস? তোকে বলছি না রৌদ্র কেউ না? কেন বার বার বিরক্ত করছিস?
নিজের মনের এই অনবরত প্রশ্নবাণে তুরা আরও অস্থির হয়ে উঠল। সে বাইরের দিকে স্বাভাবিক থাকার আপ্রাণ চেষ্টা করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার হৃদয় যেন রৌদ্রের স্মৃতি আর দায়িত্বের মাঝখানে বিভক্ত হয়ে যাচ্ছে। রৌদ্রকে জোর করে ভাই বানানোর যুক্তি আর শিহাবকে মন থেকে মেনে নিতে না পারার অবাধ্য অনুভূতি এই দুইয়ের চাপে তুরা যেন শ্বাস নিতে পারছে না।
তুরার এইরকম শ্বাসরুদ্ধকর অস্থিরতা দেখে আরশির মনে সন্দেহের কৌতূহল আরও জাগল। সেইদিনের তুরা, যখন শিহাবের কথা বলা হতো, তখন সে লজ্জায় লাল হয়ে যেত। কিন্তু আজ শিহাবের কথায় তুরার মুখ নিরামিষের মতো ফ্যাকাশে।
আরশি পুনরায় কৌতূহল নিয়ে জিজ্ঞেস করল,,কিরে তুরা, কী হয়েছে? তুই এমন করছিস কেন? মনে হচ্ছে ভিতর থেকে দম আটকে মরে যাচ্ছিস?
আরফাও এবার ভালো করে লক্ষ্য করলো। তুরা সত্যি কেমন যেন অস্বাভাবিক আচরণ করছে।
তুরা দুজনকে এইভাবে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকতে দেখে আরও হাঁসফাঁস করে উঠল। সে অতি কষ্টে ঢোক গিলে বলল,,না না, আসলে কিছু হয়নি আপু।আসলে আপু আমার না একটা কাজ আছে। আমি নিচে যাচ্ছি,তোমরা গল্প করো,কেমন?
তুরা কথাটা বলেই আর এক মিনিটও দাঁড়াল না। যত দ্রুত সম্ভব ছাদ থেকে নেমে এলো, যেন বাঘের ভয় থেকে বাঁচার চেষ্টা করছে। তার সেই দ্রুত নেমে যাওয়া দেখে আরশি আর আরফার সন্দেহ আরও গভীর হলো। তারা অবাক চোখে একে অপরের দিকে তাকালো।
তুরা দ্রুত ছাদ থেকে নেমে যাওয়ার পর আরফা তখনও তার চলে যাওয়ারা দিকে তাকিয়ে ছিল। সে আরশির উদ্দেশ্যে বলল,,আরশি, তুই কিছু লক্ষ্য করেছিস? রৌদ্র দা যাওয়ার পর থেকে তুরা কেমন অস্বাভাবিক আচরণ করছে! যেগুলো আমি তুরার মাঝে কখনো দেখিনি?
আরশি লম্বা একটা নিশ্বাস ফেলে আরফার কথায় সায় জানাল। তার চোখে তখনো চিন্তার ছাপ,,আমিও সেটাই ভাবছি। হঠাৎ তুরা এমন হলো কেন? কোনো কারণ তো থাকতে হবে।”
আরফা এবার আরও কৌতূহল নিয়ে, প্রায় ফিসফিস করে জিজ্ঞেস করল। যেন সে এক ভয়ংকর গোপন কথা উচ্চারণ করছে,,আচ্ছা, তুরা কোনোভাবে রৌদ্র দাকে ভালোবেসে ফেলল না তো?”
কথাটা শুনে আরশি যেন বিদ্যুতের শক খেল। সে অবাক হয়ে আরফার দিকে তাকাল। তার মুখ থেকে বিস্ময়ে কোনো শব্দ বের হলো না, শুধু বলল,,কিহহ! এইটা আজও সম্ভব? তুরা তো ভালোবাসে না তার জন্যই তো রৌদ্র ভাইয়া তুরাকে আবার দিয়ে গেল।
আরফা আর আরশি দুজনেই গভীর চিন্তায় ডুবে গেল। তাদের সামনে এখন কেবল একটিই প্রশ্ন রৌদ্র এবং তুরার সম্পর্কের অব্যক্ত দিকটা কী?
আরশি লম্বা একটা গোপন শ্বাস নিল। তার চোখে এখন বন্ধুদের প্রতি উদ্বেগ এবং রহস্য উন্মোচনের জিদ,,ঠিক আছে। আজকে রাতে ব্যাপারটা ক্লিয়ার করবো। যেভাবেই হোক, তুরার পেট থেকে কথাগুলো বের করতে হবে?।
আরফা দৃঢ়ভাবে মাথা ঝাঁকাল। তাদের এই যৌথ উদ্যোগে যেন এক গোপন অভিযানের সূচনা হলো। দুজনেই মিলে হাত মেলাল প্রতিজ্ঞা করল যে, যেভাবেই হোক, তুরার ভেতরে কী ঝড় চলছে এবং তার এই অস্বাভাবিক আচরণের মূল কারণ কী, তা তারা অবশ্যই জানবে। বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যার আবছা আলো যখন ছাদটিকে গ্রাস করল, তখন দুই বন্ধুর মনে ছিল কেবল তুরার নীরব যন্ত্রণার রহস্য ভেদ করার সংকল্প।
চলবে…..!
~~~
এই গল্প টা আপনাদের লেখিকা আফার পরামর্শেই লিখলাম। খারাপ হলে বলবেন তাহলে আর লিখবো না যদি ভালো হয় তাহলে জানিয়ে যাবেন! 🙂
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, প্রিঁয়ঁসেঁনীঁ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৪
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৪,১৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২০