Golpo কষ্টের গল্প নিগৃহীতা

নিগৃহীতা পর্ব ১


ইফতারে একটা বেগুনী বেশি নেওয়ার কারণে পুরো পরিবারের সামনে অনন্যাকে বেশ কথা শোনালো তার শ্বাশুড়ি। অধিকাংশ ছিল বাবার বাড়িতে খাওয়া নিয়ে। মাথা নিচু করে আবার প্লেটে বেগুনীটা তুলে রেখেছিল মেয়েটা।শেষ পর্যন্ত প্রায় অনেকগুলো বেগুনী থেকে গেলেও আর গলা দিয়ে নামলো না মেয়েটার।
তারাবীর নামাজ পড়ে শাশুড়ী গজগজ করে বললেন,
“বাড়ির বউদের এতো মুখ থাকা ভালো না।এতো খাই খাই স্বভাব কেন থাকবে?

বেগুনি বেশি খাওয়ার কথাটা ফোন করে নিজের মেয়েদের ও জানালেন।লজ্জায় মাথা তুলতে ইচ্ছে করছিল না অনন্যার। চোখে মুখে পানি দিয়ে এসে রাতের রান্না বসালো। এই বাড়িতে আবার নিয়ম আছে। তিন বেলা গরম গরম তরকারি দিয়ে ভাত খায়। সকাল,দুপুর, রাতে আলাদা আলাদা ভাবে রান্না করতে হয়। রোজা রেখে একবার ইফতারের আগে রান্না করলে চলবে না।ইফতারের পর রান্না করতে হবে আবার সেহেরীর সময়।এই নিয়ম আগে ছিল না।তৈরি হয়েছে অনন্যা বাড়িতে আসার পর থেকে। উচ্চ-মধ্যবিত্ত পরিবারের ছেলে রাসেল। মায়ের আয়েশের জন্য সব করেছে কিন্তু সেসব কিছুতে হাত দেওয়ার অধিকার অনন্যার নেই।শিল পাটায় মসলা বেটে রাঁধতে হয় এমনকি তিন বেলা মশলা বেটে রাঁধতে হয়। না হলে তরকারি স্বাদ লাগে না। মশলা বাটতে বাটতে কিসব ভাবছিল সে। শাশুড়ী এসে বললেন,

” তাড়াতাড়ি করা যায় না? ইফতারের পর মানুষের ক্ষুধা লাগে। হাত চলে না কেন তোমার?সামান্য ডাল ভাত হতে কত সময় লাগে?”

সামান্য ডাল ভাতের দিকে তাকালো অনন্যা। আলু চিংড়ির চচ্চড়ি, রুই মাছের ঝোল,মুরগীর মাংস, ডাল সাথে ধনিয়া পাতার মরিচভাটা। ইফতারের পর দুই ঘন্টা লেগে গেছে এটুক করতে করতে। ওড়নায় হাত মুছে টেবিলে খাবার দিয়ে পাশেই দাঁড়িয়ে রইল। সবার খাওয়া শেষ হতেই আবার রান্নাঘর। অপর দিকে রাসেল মায়ের ঘরে উঁকি দিয়ে চলে গেল রান্নাঘরে। অনন্যা তখনো খায়নি। এঁটো প্লেটগুলো বেসিনে রাখার সময় রাসেল এসে বলল,
“এখনো এসব করছো? যাও ঘরে যাও৷ নামাজ পড়ো আগে।”
“হাতের কাজ শেষ করে যাচ্ছি।”
“আমি যেতে বলেছি না?”

খানিকটা উঁচু স্বরেই রাসেল কথাগুলো বলল।মায়ের কান অবধি নিশ্চয়ই পৌঁছেছে। ওর মা বেরিয়ে এসে বলল,
“কি বেয়াদব মেয়েরে? যা বলছে শুনতে পারো না?”
“মা তুমি আবার উঠে এলে কেন?যাও রুমে যাও।ঘুমিয়ে পড়ো।নাহ বুঝেছি তোমাকেও জোড় না করলে হবে না।আবার বলো না যেন তুমি হাতে হাতে কাজ করতে এসেছো?”

রাসেলের মা খানিকটা নতুন সুর ধরে বললেন “সে কপাল আছে?না হলে এসব এভাবেই পড়ে থাকবে।ওই দেখ তোদের কাপড় এনে ভাঁজ অবধি করেনি।”

“এখন করেনি, করে ঘুমাবে।তুমি যাও।নাহ তোমাকে দিয়ে হবে না।চলো তো দেখি।”

রাসেল মায়ের রুমে গিয়ে মাকে বিছানায় শুইয়ে দিয়ে বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে দিলো।যাওয়ার আগে বলল যখন ও বুঝবে মা বাবা সত্যি ঘুমিয়েছে দরজা খুলে দিবে তাছাড়া বাথরুম তো রুমেই আছে। অনন্যা এসব দেখে মাথা নিচু করে রুমে চলে গেল।ওযু করে তারাবী আর এশার নামাজ পড়লো।ক্ষুধা,ক্লান্তিতে কখন ঘুমিয়েছে খেয়াল নেই।ঘুম ভাঙলো ঠিক বারোটার পর।ধড়ফড়িয়ে উঠে বসেছে। ঘড়ির দিকে তাকালো।এখন না উঠলে তিনটের মধ্যে সব রান্না শেষ হবে না।গরুর মাংস ফ্রিজ থেকে বের করলে ছাড়তেও সময় লাগবে।চুলগুলো হাত খোঁপা করে রান্না ঘরে এসে দাঁড়ালো। মুহুর্তেই সবকিছু কেমন অনুভূতিহীন লাগছে তার। ভাতের পাতিল থেকে সবে মাত্র দুটো ভাত বেড়ে প্লেটে নিয়েছে খাবে বলে, সেই সময় রাসেলের মা দরজা খুলে বেরিয়ে এলো।এতো রাতে অনন্যাকে ভাত খেতে দেখে তেড়ে এসে ভাতের প্লেটটা হাত থেকে নিয়ে বলল,
“লাজ লজ্জা নাই সেটা না হয় বুঝলাম।এতো রাতে ভাত খেয়ে সংসারের ক্ষতি করার মানে কি? আয় রুজিতে বরকত আমার পরিবার থেকে তুলতে উঠে পড়ে লাগছ? এক রাতে কয় বার খেতে হয়?”
“আম্মা আমি রাতে খাইনি।চোখ লেগে গেছিলো তাই আর খাওয়া হয়নি।”
“এক রাত না খেলে কিছুই হবে না।সেহেরীতে খেও।এখন যাও, রুমে যাও।”

অনন্যা বেসিনে গিয়ে হাত ধুতে লাগলো।ঠিক তখন তার শাশুড়ি রান্না ঘরের দরজায় তালা দিয়ে চাবি নিয়ে চলে গেল নিজ রুমে।

চলবে ( আগামী পর্বে শেষ)

নিগৃহীতা ( সেই সকল নারীদের গল্প এটা যাদের বাবার বাড়ি কিংবা স্বামীর বাড়ি কোনোটাই আপন হয় না)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply