Golpo কষ্টের গল্প নিগৃহীতা

নিগৃহীতা অন্তিম পর্ব


নিগৃহীতা

সাদিয়া_খান(সুবাসিনী)

বাবা মায়ের পিছন পিছন অনন্যা বাইশ রোজা চলা কালীন সময়ে চলে আসতে বাধ্য হয়েছিল।বাড়িতে প্রবেশ করার আগেই তার বাবা গেটের সামনেই যাচ্চে তাই বলে গালি গালাজ করতে লাগলো।দুই চোখ বুজে কেবল সেসব শুনছিল অনন্যা।ভাই সাথে আসেনি। কোনো এক দরকারি কাজে শহরের বাইরে যেতে হলো।অনন্যার বাবা রাগী মানুষ। থরথর করে কাঁপছেন ভদ্রলোক। রাত পোহালেই লোকে বলবে মেয়ে ফেরত পাঠিয়েছে শ্বশুরবাড়ি থেকে। এহেন অপমান সহ্য করার থেকে মেয়ে মরে যেত, গিয়ে লাশ নিয়ে আসতে আপত্তি ছিল না।

ড্রয়িং রুমে দাঁড়িয়ে অনন্যা চুপচাপ শুনছে।মানিয়ে নিতে পারেনি না কি তাকে মেনে নিতে পারেনি? নিজের ব্যর্থতাকে বুকে আগলে নিয়ে নিজের ঘরে পড়ে রইল অনন্যা। সেহেরিতে ডাক পড়লো না।তবুও সে সিদ্ধান্ত নিলো এক গ্লাস পানি খেয়েই সারাদিন থাকবে।করুক আল্লাহ তালার পক্ষ থেকে মাফ কিন্তু এই সমাজ তাকে মাফ করবে না। অনন্যার মায়ের সাহস নেই স্বামীর বিপক্ষে গিয়ে একটা কথা বলতে বা করতে অগ্যতা মেয়েকে দোকান থেকে লুকিয়ে এক প্যাকেট বিস্কুট এনে দিয়েছিল পরদিন। অনন্যা খুলেও দেখেনি।ডাক পড়েনি ইফতারেও। আবারো সেই পানি আর দুটো বিস্কুট খেয়ে বসে রইল। ইফতারের পর মা ভাত নিয়ে এলে চুপচাপ খেয়ে নিলো।কোনো কথা বললো না কোনো বিরোধিতা বা প্রশ্নও ছিল না।সে মনে মনে চিন্তা করে নিয়েছে যদি ওই বাড়ি থেকে নিতে আসে তাহলে চলে যাবে আর নিতে না এলে দুই একদিন পর একাই চলে যাবে।শ্বাশুড়ির হাতে পায়ে ধরে মাফ চাইলে না করবে না।তাছাড়া বাড়ির কাজও তো কম না। ঈদের সময় আরো কাজ বেশি হবে। তখন না করবে না। মন খারাপ করে জানালার পাশে বসে ছিল অনন্যা।তখন রাস্তা দিয়ে যাচ্ছিলো ওর ছোটো বেলার বান্ধবী।এতো বছর পর দেখা হওয়ায় দুজন বেশ খুশিই হলো।ঠিক সেই সময় ওর মন খারাপ দেখে জিজ্ঞেস করতেই সবটা বলল অনন্যা।দীপা তাকিয়ে ছিল ওর দিকে। মুচকি হেসে বলল,
“ডিভোর্স দিয়ে দে।নিজে স্বাবলম্বী হতে পারিস।অন্যেরটা কেন লাগবে?বাবা, ভাই কারোরটা লাগবে না।”
“আমি যে সংসার চাই রে।”
“নিজের আত্মসম্মান বলি দিয়ে?”
“আত্মসম্মান বলি দিয়ে নয়। জানিস আমি চাইলে কষ্ট করতে পারি।আর কিছু না হোক যদি গার্মেন্টসে চাকরি করি তবুও চলে যাবে। সম্মান পাবো কিন্তু পরিবার থাকবে না।”
“থেকেই বা কি পাচ্ছিস?”
“সব মেয়েই ক্যারিয়ার বা স্বাবলম্বী হতে চায় না।কিছু মেয়ে সংসার চায়, নীরবে সব মেনে নিতে চায়।তোদের চোখে আমরা দুর্বল হলেও আমরা সংসার আগলে রাখতে চাই।”
“শোন সংসারে থেকেও স্বাবলম্বী হওয়া যায়।ইচ্ছেটা থাকতে হয়।আমি করছি না?তোর থেকে আমার শ্বশুর বাড়ি আরো এক ধাপ এগিয়ে।বিয়েতে আমার বাবার দেওয়া গয়না তাদের পছন্দ হয়নি বলে আমাকে কেমন হেনস্থা করেছে সেটা দেখেছিস তো?আমি মাসে খুব না তিন থেকে চার হাজার টাকা ইনকাম করি। তিনটে নকশী কাথায় মাসে সেলাই করলে চার সাড়ে চার হাজার টাকা থাকে।ওই টাকা দিয়ে আমি আমার নিজের জন্য খরচ করি।সাবান কিনি, তেল কিনি।শখের চুড়ি কিনি।কিছু খেতে ইচ্ছে হলে খাই আবার কিছু কিছু জমাই। চাই না কারোর কাছেই।তুই অন্তত করতে পারিস।আমি বলছি কি শোন।আমার কাছ থেকে তুই টাকা নে।নিয়ে একটা কাথা সেলাই করে দেখ।যদি পারিস তাহলে আমিই অর্ডার দিবো।এখন কত দিন পরে ওরা যোগাযোগ করবে তার তো ঠিক নেই।সেই কয়েক দিন মন খারাপ না করে থেকে কিছু একটা কর।নিজেকে একটু দাম দে।পানির ও দাম আছে, মাটির ও দাম আছে।ওই যে রাস্তায় পড়ে থাকা ময়লা, প্লাস্টিক সেটার ও দাম আছে।তবে তুই নিজেকে কেন তুচ্ছ করছিস?কার জন্য করছিস একটু বলবি?”

অনন্যা ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।দীপার কথায় রাজি হতে বাধ্য হয়েছে কারণ এর পরেও দীপা প্রায় এক ঘন্টা নানা কথা বলে বুঝিয়েছে।সে এটা বুঝতে পেরেছে রাজি না হলে দীপা ওকে ছাড়বে না।ইফরাতের পর অনন্যার বাবা তারাবীর জন্য যেতেই দীপা এলো।একটা কাথা ও নকশা করেই এনেছে। সাথে কয়েকটা সুঁই আর সুতো। সেসবের নিচে ছিল সামান্য খাবার।চারটে কলা আর দুটো পাউরুটির প্যাকেট।
রাতভর অনন্যার আর ঘুম এলো না।রাসেলের কথা মনে পড়ছিল বার বার।ফোনটাও তো ওই বাড়িতে।কি করছে ওই বাড়ির সবাই? ভাবতে ভাবতে কখন যে অর্ধেক কাথা সেলাই হয়ে গেছে খেয়াল ও করেনি।

অপর দিকে রাসেলদের বাড়ির অবস্থা বেশ কাহিল।রাসেল দেখেও না দেখার ভান করে আছে।দুদিন যাবত ঘর পরিষ্কার হয় না।এক ইফরাতের সময় রান্না করার খাবার সেহেরীতেও চলছে। এখন আর ওয়াশিং মেশিন চললে বিল উঠে না, ব্লেন্ড করা মশলা স্বাস্থ্যের জন্য খারাপ হয় না।দুদিনেই বাড়ির এই অবস্থা দেখে না হেসে পারছে না।তবুও মাকে কিছুই বলল না।বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই অনন্যার কথা মনে পড়ে তার। ফোনটাও নেয়নি।খেয়েছে তো? অনন্যার ভাই শহরের বাইরে। কার থেকে খবর নিবে?নাহ কাল অফিসে যাওয়ার পথে একটা বার দেখে যাবে। কিন্তু আর ঘুম হলো না।ছোটো বোনের ছেলের জন্য দুধ গরম করতে গিয়ে মায়ের হাত পা পুড়ে গেল।তাকে নিয়ে ছুটলো হাসপাতালে। দুই বোন বাড়িতে মায়ের হাত পুড়ে গেছে এবার কি হবে? ইফতারের সময়েই বেজে গেল কান্ড।রাসেল দেখেও না দেখার ভান করলো। ইফতার শেষে দুই বোন আর বাবা মা তাকে ডেকে বলল,
“শোনো সংসার করতে গেলে দুই চারটে কথা হবেই।তাই বলে বউকে বাপের বাড়িতে রাখা উচিৎ হবে না।যাও গিয়ে নিয়ে এসো।”
“আমি তো তালাকের কাগজ করতে দিলাম আরো তোমার কথা শুনে।তুমিই তো বললে ডিভোর্স দিতে।”

রাসেলের মায়ের মাথায় আকাশ ভেঙ্গে পড়লো। কয়েক মাস আগে তার ফুপাতো বোনের ছেলের বৌকে একই ঝামেলায় তালাক দিয়েছে।পরের বউ এখন নাকানিচুবানি দেয়।কিন্তু অনন্যা তেমন নয়। হুমকি দামকি দিলেই মেয়েটা চুপ হয়ে যায়। নাহ ছেলেকে বুঝাতে হবে।সে ছেলেকে যতোই বুঝায় ছেলে ততোই উল্টো কথা বলে।বোন দুলাভাই কারোর কথাই মানে না।তার এক কথা যে মেয়ে রোজার দিনে খায় তাকে নিয়ে সংসার হয় না।বাধ্য হয়ে তার মা বলল,
“আরে মেয়েদের জন্য আল্লাহ তালা মাফ করেছে ওই সাত দিন।ওই সাত দিন খেলেও কিছু হয় না।”
“নাহ মা, তুমিই বলেছো ও নাস্তিক।তাছাড়া ওর রান্না ভালো হয় না।মশলা ব্লেন্ডারে ব্লেন্ড করতে চায়, তিন বেলা গরম গরম তরকারি, ভাত রান্না করে না।ওই মেয়ে আমি চাই না।তুমিই তো ভালো মা।তুমি তিন বেলা পাটায় মশলা বেটে আমাদের খাওয়াতে পারবে না?”
“কিন্তু আমার হাত তো পুড়ে গেছে।ঈদের আগে..
” আপারা আছে। আপারা করবে।”
“আমরা ঘুরতে এসেছি ভাই। এসে এসব করা আমাদের বাচ্চা নিয়ে কষ্ট হবে না?”
“আপা তোমাদের কষ্ট হয় আর ওই মেয়েটার হয় না? তিন বেলা মসলা পাটায় বেটে ভাত, তরকারি রান্না করতে?আমি ওকে আমি নামক জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিতে চাই।চিন্তা করিও না,এরপর যাকে আনবো সে এসব করবে না।শুরু থেকেই আমি করতে দিবো না।তোমাদের সংসারের জন্য আমি আমার স্ত্রীকে কষ্ট দিবো না।”

কেউ কোনো জবাব দিতে পারলো না। রাসেল বাসা থেকে বেরিয়ে গেছে। ভোর হলেও সে ফিরলো না।পাছে আবার ওই বাড়িতে তালাকের কাগজ পাঠায় এই ভয়ে রাসেলের বাবা দুই মেয়ের জামাই নিয়ে চলে গেল অনন্যার বাড়ি।দুপুর গড়িয়ে বিকেল হচ্ছিলো।অনন্যার একটা কাথা সেলাই শেষ। সবে মাত্র কলা পাউরুটি আর পানি খেয়ে আবার বসেছে কোথাও কোনো কিছু বাদ পড়লো কিনা দেখতে।ওমনি দীপা এলো। হাতে।পনেরো শ টাকা গুজে দিলো।সাথে আরো দুইটা কাথা।ফিসফিস করে বলল,
“এতো চাপ নিতে হবে না।শোন ট্রিট না দিলি সালামী কিন্তু দিস আফা।”

দুই বান্ধবী কথার ছলে হাসছিল তখন গেট দিয়ে প্রবেশ করলো রাসেলের বাবা,বোন জামাইয়েরা। তারা নিতে এসেছে। অনন্যার বাবা এক কথায় রাজি কিন্তু ওর ভাই রাজি নয়।অত:পর তারা কথা দিয়ে গেছে আর কিছুই হবে না ওদের দিক থেকে। যাওয়ার সময় দীপার দেওয়া টাকার থেকে হাজার খানেক টাকা মায়ের হাতে দিয়ে বলল, “মা শাড়ি কিনো একটা তোমার ইচ্ছে মতো।”

ইফতারের পর নিজের রুমে বসেই কাথা সেলাই করছিল অনন্যা। আজ হাতে হাতে সবাই কাজ করেছে। রাসেল ফিরে কারোর সাথে কথা না বলে নিজের রুমে চলে গেল।অনন্যাকে বিছানায় বসে থাকতে দেখেও কিছু বলল না। ওয়াশররুম থেকে বেরিয়ে এসে ওর হাতে একটা স্ট্যাম্প পেপার এগিয়ে দিলো।অনন্যা আসার পর শুনেছে রাসেল ওকে তালাক দিয়ে মুক্তি দিতে চেয়েছে তবে কী……

অনন্যা হাত বাড়িয়ে কাগজটা নিয়ে সেটা খুলতেই দেখলো একটা ফ্ল্যাটের দলিল। মালিকানাধীন ওর নিজের নামে। রাসেল ওর পাশে আরাম করে বসতে বসতে বলল,
“কাথা সেলাই করো আমার কোনো আপত্তি নেই।অবসর সময় পার হবে কিন্তু অনন্যা অন্যায় মেনে নিও না।আমি ছেলে চাইলেও মুখ ফুটে বলতে পারি না কিন্তু তোমাকে পারতে হবে।শোনো মেয়ে এই যে এটা? এটা তোমার নিজের বাড়ি।না বাবার বাড়ি না শ্বশুর বা স্বামীর বাড়ি।এটা থাকবে তোমার বাড়ি।যদি আবার বিতৃষ্ণা আসে এই সংসারে তাহলে সংসার তোমার নিজের গৃহে সাজাবে।তবুও এই স্বামী নামক অহেতুক আসামীকে আর যন্ত্রণা দিও না।তুমি ছাড়া যে খাঁ খাঁ করে এই বুকের ভিতরে।”

অনন্যা আবারো আজকে অঝোরে কাঁদছে। কেন কাঁদছে সে জানে না কিন্তু আজ শবে ক্বদরের রাতে সে আল্লাহ তালার কাছে দুই হাত তুলে মোনাজাত করছে আল্লাহ যেন এই মানুষটাকে সারাটা জীবন পাশে নিয়ে চলার তৌফিক দান করে।

সমাপ্ত ( কিন্তু সবার পরিসমাপ্তি টা কি এমন হয়?)

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply