Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৯


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ৯
লেখনীতে:- Sanjana

কপি করা নিষিদ্ধ ❌

সেই কখন থেকে হৃদয় তরীকে খেতে বলছে। কিন্তু মেয়েটা কিছুতেই ওর কথা শুনছে না। হৃদয় প্লেটটা এক হাতে ধরে, অন্য হাতে খাবার মেখে আবারও এগিয়ে দিল তরীর ঠোঁটের কাছে।

__খেয়ে নে নয়ন, কেন জ্বালাচ্ছিস?

তরী নিভু নিভু চোখ মেলে তাকালো।

__ আমি খাব না। আমার খিদে নেই।

মুহুর্তেই হৃদয় ভ্রু কুঁচকে বলল—

__ হা কর বলছি।

__ আমি খাব না বলছি তো , খিদে নেই। আমার ঘুম পেয়েছে, আমি ঘুমাব।

এবার হৃদয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। সে ধমকে বলে উঠলো —

__ দেখ নয়ন, মেজাজ এমনিতেই খারাপ হয়ে আছে। চুপচাপ হা কর। নয়তো থাপড়ে গাল লাল করে দেবো একদম।

হৃদয়ের ধমক শুনে তরীর চোখেমুখে মুহূর্তেই বিরক্তির ছায়া নামল। ঠোঁট চেপে ধরে অনিচ্ছায় হা করল ও। হৃদয় সঙ্গে সঙ্গে এক লোকমা ভাত তুলে ওর মুখে পুরে দিল।

কিছুক্ষণ সময় এইভাবে পেরুতেই, হঠাৎ হৃদয়ের স্বর নরম হয়ে এল—

__নয়ন…

হঠাৎ হৃদয়ের আদুরে ডাকে তরী চমকে উঠে তাকালো তার দিকে। হৃদয়ের চোখে তখন আর রাগ নেই, আছে অদ্ভুত এক ক্লান্তি, হৃদয় আবারও অস্থির কন্ঠে বলল —

__ তোর কি আমাকে খুব অপছন্দ? আমি কি খুব খারাপ?

তরী পিটপিট করে তাকিয়ে আছে তার দিকে। হঠাৎ এমন প্রশ্ন ও আশা করেনি।
পরপর মিনমিনেয়ে জবাব দিল ও —

__ আপনি হঠাৎ এইভাবে বলছেন কেন?

হৃদয় ঠোঁট বাঁকিয়ে তিক্ত হাসি হাসল।
__তাহলে আমি কিভাবে বলবো তুই বল? আমার যে সবকিছু অসহ্য লাগছে নয়ন।

হৃদয়ের এমন কথায় তরী একটু ভয় পেয়ে গেল। আজকাল মাঝেমধ্যেই হৃদয় ওকে এই নামে ডাকছে। তরীর জানা মতে ও কোনো ভুল করে থাকলেই এই লোক ওকে এই নামে ডাকে। তাই ও ভয়জড়ানো কন্ঠে বলে উঠলো—

__ কি হয়েছে? আমি কি আবার কিছু ভুল করেছি?

হৃদয় এইবার আর জবাব দিল না।বুকের ভেতরটা যেন ক্ষতিবিক্ষত হয়ে আছে। আজ সারাটা সময় পার্টির প্রতিটা মুহূর্তে তরীর চোখ ঘুরে ফিরে গেছে শুধু প্লাবনের দিকে। হৃদয় পাশে বসা থেকেও যেন অদৃশ্য ছিল ওর কাছে। একবারের জন্যও তরী তার দিকে তাকায়নি। একবারও না। ওর দৃষ্টি,
মনখারাপ, অস্থিরতা সবই ছিল অন্য একজনকে ঘিরে। আর এইসব কিছু হৃদয় পাশে বসে খেয়াল করেছে, অনুভব করেছে। হৃদয় শক্ত মনের মানুষ অনুভূতি তুলে ধরতে পারে না। সে অনুভূতি প্রকাশ করতে পারে না। ভালোবাসা বলতে পারে না। ব্যথা যন্ত্রনা দেখাতে জানে না। কিন্তু তরীর প্লাবনের প্রতি সেই অকারণ মনোযোগ হৃদয়ের বুকের ভেতরটা যেন ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিল। প্রতিদিন তরীর ওর প্রতি বেখায়ালিপনা , অবহেলাগুলো সে আর নিতে পারছে না। হৃদয় চামচটা প্লেটে ঠেকিয়ে রাখল শক্ত করে। চোখের দৃষ্টি কঠিন হয়তো তাই তার ভেতরের দুর্বলতাটা তরী বুঝতে পারছে না। তরী হৃদয়ের কথার গভীরতা বুঝতে না পেরে চুপচাপ মাথা নিচু করে খাবারটা খেতে লাগল। ওর চোখে তখনও ঘুম আর ক্লান্তির ছায়া।

এইদিকে হৃদয় চুপ করে তরীকে খাইয়ে দিচ্ছে। তার
ভেতরে ভেতরে একটাই ইচ্ছে ঘুরপাক খাচ্ছে, যে তরী একবার হলেও তাকে জিজ্ঞেস করুক, সে খেয়েছে কিনা। সেই ইচ্ছায় হৃদয় শুধু তাকিয়ে রইল পলকহীন ভাবে। তরী অবশ্য হৃদয়ের মনের কথা পড়তে পারল না।
তবুও হঠাৎ যেন অজান্তেই বলে উঠল—
__ আপনি খাবেন না?

মুহুর্তেই হৃদয় বিস্ময়ে তাকালো ওর দিকে। এই একটা ছোট প্রশ্নেই বুকের ভেতরের জমে থাকা ভার যেন একটু হালকা হলো। পরপর তরী একবার হৃদয়ের মুখের দিকে তাকালো তো আরেকবার নিজের প্লেটের দিকে।

__এতগুলো খাবার আপনি আমার জন্য এনেছেন? আমি কি এত মোটা? বলতে বলতে নিজের শরীরের দিকে তাকিয়ে নিল।

ওর কথার হৃদয় কোনো জবাব দিল না। শুধু গলা নরম করে ধীরে বলল—

__আমাকে খাইয়ে দে তো।

সেকেন্ডেই তরীর চোখ বড় বড় হয়ে গেল। আবারও ও একবার হৃদয়ের দিকে তাকালো, আবার নিজের প্লেটের দিকে।

__ কি হলো? খাইয়ে দিতে বললাম তো?

__আমি… আমি খাইয়ে দিব?

__ আর কাউকে দেখতে পাচ্ছিস এখানে?

তরী দুদিকে মাথা নাড়ল। পরপর মিনমিন করে উঠলো,,,,

__আপনি আমার প্লেট থেকে খাবেন?

__ হ্যাঁ। তোর কোনো অসুবিধা তাতে? নাকি তোর কম পড়ে যাবে কোনটা? তোর কি মনে হয় ইব্রাহিম খান হৃদয়ের টাকার অভাব তোকে খাওয়াতে পড়াতে পারবে না।

হৃদয়ের কথায় তরী মুখ কুঁচকিয়ে বলল—

__ এটা তো আমার খাওয়া খাবার। আমি নষ্ট করে ফেলছি। আপনি কিভাবে খাবেন?

তরীর কথা শেষ হতে না হতেই হৃদয় ঠান্ডা গলায় বলল—
__ মুখ দিয়ে।

হৃদয়ের ফালতু জবাবে তরী মুখ ভেঙচাল। এই দৃশ্য হৃদয়ের চোখ এড়াল না। মুহূর্তেই ওর চোয়াল তীক্ষ্ণ হয়ে উঠল। পরপর তরীর গাল হালকা করে চেপে ধরে বলে উঠলো,,,

__মুখ ভেঙাচ্ছিস কাকে তুই? কামড়ে মুখ লাল করে দেবো বেয়াদব!

তরীও কম যায় না, ও ঠোঁট বেঁকিয়ে বলল—

__ কেন আপনি রাক্ষস?

__নয়নন.. পাকামো বন্ধ করে যা করতে বলেছি শুরু কর। কুইক। সময় অপচয় করা আমার পছন্দ নয়।

তরী শুনলো না উল্টো আবারও পাকামো করে তরতরিয়ে বলে উঠলো,,,

__ আপনার হাত নেই?

ব্যস সেই মুহূর্তেই হৃদয় হঠাৎ করে ঝুঁকে এসে তরীর ফোলাফোলা গালে সত্যি সত্যি দাঁত বসিয়ে দিল।

__ আউউউ! ব্যথায় কিড়মিড়িয়ে উঠলো ও।

তৎক্ষনাৎ তরীকে একশোগুন অবাক করে দিয়ে হৃদয় সেই জায়গাতে শব্দ করে চুমু খেল। তরী ভড়কে পিছিয়ে গেল কিছুটা, ওর এইটুকু জীবনে কোনো পুরুষ মানুষ হতে এটাই প্রথম স্পর্শ। তরী হাঁসফাঁস করতে লাগলো কিছুক্ষন। হৃদয়ের ঠোঁটে তখন বাঁকা হাসি। যা তরীর নজরে পড়লো ঠিক।
তরী ভয় আর লজ্জা মেশানো চোখে তাকালো একবার তার দিকে। তখনই হৃদয় ইশারাতে ওকে খাইয়ে দিতে বলল।

তরীরও কি হল কে জানে, ও নিজে থেকেই ধীরে ধীরে আঙুলের সাহায্যে ভাত তুলে কাঁপাকাঁপি হাত হৃদয়ের দিকে বাড়িয়ে দিল।

পরমুহূর্তেই হৃদয় ওর হাত ধরে থামিয়ে বলল—

__ হাত কাঁপাচ্ছিস কেন?

তরী ফিসফিস করে বলল—
__ আমি কাঁপাচ্ছি না, নিজে নিজে কাঁপছে।

__কেন?

__আপনি, এমন তাকাচ্ছেন…

তখনই হৃদয় ঠোঁটের কোণে একচিলতে হাসি ফুটিয়ে বলল —

__তাকাবো না তো কি করবো নয়ন?

এই একটা বাক্যে তরীর বুকের ভেতরটা অদ্ভুত করে কেঁপে উঠল। এত আদুরে ভাবে কেন বারবার ডাকছে তাকে এই লোক। তরী বুঝে পায়না হৃদয়ের মনে আদতে কি চলে।

সেই মুহূর্তে হৃদয় ভাত মুখে নিল , সেই ভাবেই তরীর হাত টেনে ধরে, পরপর আঙুলে কামড় বসালো।

__ উফ…! তরীর মুখ দিয়ে ক্ষীণ একটা আওয়াজ বেরিয়ে এলো। ওর চোখ দুটো বড় বড় হয়ে গেল ব্যথায় আর বিস্ময়ে।

হৃদয় ভাত চিবোতে চিবোতেই নিচু গলায় বলল—
__বেশি মুখ চলালে , এই গাল আর হাতের দাগগুলো তোর সর্বাঙ্গে বসবে । বলতে বলতে তরীর গালে দাঁতের হালকা দাগটা ছুঁয়ে দিল ।

তরী ঠোঁট ফুলিয়ে চোখে পানি জমিয়ে তাকিয়ে রইল হৃদয়ের দিকে। হৃদয় ধীরে ধীরে ওর গাল ছেড়ে দিয়ে আঙুলে বসা দাঁতের দাগটার দিকে তাকাল। তার চোখেমুখে একচিলতে সন্তুষ্টির দেখা মিলল সেই মুহূর্তে।

হৃদয় আবার খাওয়ার দিকে মনযোগ দিল, তবে আঙুলের এবং গালের ছাপগুলো বারবার চোখে পড়ছে তার। যা হৃদয়ের বুকে এক অদ্ভুত শান্তি বইয়ে আনছে।


সকাল দশটা বেজে ৪০ মিনিট।
তরীর সবেমাত্র ঘুম ভাঙ্গলো। যেহেতু কাল রাত করে ঘুমিয়েছে আজ দেরি করে উঠবে এটাই স্বাভাবিক।

তবে আজকের দিনটা অন্যদিনের মত নয়। অন্যদিন হলে এই সময় খান বাড়িটা থাকত নিস্তব্ধ। কেউ কেউ কাজে বেরিয়ে যেত, কেউ আবার নিজের ঘরে ব্যস্ত। কিন্তু আজ সেরকমটা নয়।
আজ সকাল থেকেই বাড়িটা যেন উৎসবমুখর।
হাসিখুশি পরিবেশ সব মিলিয়ে চারপাশে এক অদ্ভুত প্রাণচাঞ্চল্যতা দেখা যাচ্ছে।

তরী সবেমাত্র ফ্রেস হয়ে রুম থেকে বেরিয়েছে‌। ওর মেজাজ আজ একদম ফুরফুরে।
তখনই বাঁধ সাধলো ইনায়া। ওর পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছে ইনায়া। হঠাৎ কেউ সামনে এসে দাঁড়ানোতে তরী থেমে গেল। পরপর চোখ তুলে তাকাল। ইনায়াকে দেখে মুহুর্তেই ওর চোখে মুখে বিরক্তি স্পষ্ট হল।

__ কিছু বলবেন, ইনায়া আপু?

ইনায়া কোনো জবাব দিল না। শুধু ভ্রু কুঁচকে এমনভাবে তাকিয়ে রইল, যেন তরী কোনো অপরাধ করে ফেলেছে।

তরী এবার বিরক্তি কন্ঠে বলল—

__কি হল এইভাবে পথ আটকে দাঁড়িয়ে আছেন কেন? কিছু বলার থাকলে বলুন নয়তো পথ ছাড়ুন?

__ মুখ তো তোর খুব চলে তরী।তাচ্ছিল্যের হাসি দিয়ে বলে উঠলো ইনায়া।

তরী আবারও বিরক্তি দৃষ্টি নিক্ষেপ করলো ইনায়ার দিকে। তাও নিজেকে সামলে নিয়ে বলল—

__ যার সামনে যতটুকু চলার তার সামনে ততটুকু চলবে সেটাই স্বাভাবিক।

তরীর এমন কথা শুনে ইনায়া যেন এইবার তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো, ও কটমট করে বলতে লাগল —

__দেখ ইনু হৃদয় ভাইয়া তোর প্রতি একটু কনসার্ন তাই বলে ভেবে নিস না, তুই এই বাড়ির মালিক। ভুলে যাস না তুই কিংবা তোর মা এই বাড়ির কেউ নস। আর রইলো হৃদয় ভাইয়ার কথা উনি তোর খরচাপাতি দেয় তোর প্রতি করুণা দেখিয়ে, কারণ তোর বাবার পরিচয় নেই তো তাই। তাই বলে তুই উনার মাথায় চড়ে বসবি সেটা তো হয় না আর…

তখনই ইনায়াকে থামিয়ে দিল ইনু,,,

__প্রথমত আমি এমপি সাহেবের মাথায় চড়ে বসিনি। আর আমার খরচাপাতি উনাকে কেউ চালাতে বলেননি, সেটা উনি স্বেচ্ছায় করছেন। আর ইনায়া আপু আমার আম্মুর যথেষ্ট টাকা পয়সা আছে আমাকে চালানোর জন্য। ভুলে যেওনা সে বেবিসটেইক কেয়ার এজেন্সির মালিক। তাই আমার খরচাপাতি সামলানোর জন্য আমার আম্মুকে কারোর কাছে হাত পাততে হবে না, পনেরো বছর আগেও হয়নি আজও হবে না।

দ্বিতীয়ত আমার কাছে আমার আম্মুই আমার আমার আম্মু আব্বু সব।

তৃতীয়ত আপনার যদি আমাকে নিয়ে এত সমস্যা হয়ে থাকে, তাহলে আপনি আপনার চোখ বন্ধ করে রাখবেন নয়তো এইখানে আর আসবেন না । ঠিক আছে? কেননা ভালো আঙ্কেল এবং মামনি আমাকে হৃদির মত করেই ভালোবাসে, তাই আপনার মত মানুষের কথায় ইনফ্লুয়েন্স আমি হবো না। তাই এইসব চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না আপনার, আমি তাদেরকে ভালোবাসি তাঁরাও আমাকে ভালোবাসে আমাদের মধ্যে কূটনীতি করতে আসলে না, আপনার খবর করে ছাড়বো আমি। মাইন্ড ইট।

বলেই তরী ইনায়াকে আর্মের সাহায্যে ধাক্কা মেরে গটগট করে এগিয়ে গেল সিঁড়ির দিকে।

ঐদিকে পিছনে ইনায়া হিংসার দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তরীর দিকে। তরী যে ওকে মুখের উপর অপমান করে গেছে, সেটা ভেবে ইনায়া জ্বলেপুড়ে শেষ হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে প্রতিজ্ঞা করল,
এই অপমানের জবাব সে একদিন ঠিকই নেবে।

চলবে ‌।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply