Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৮


নয়নার এমপি সাহেব

পর্ব:- ৮
লেখনীতে:- Sanjana’s গল্পঝুড়ি

সেই মুহূর্ত থেকে কেটে গেছে অনেকটা সময়।
ঘড়ির কাঁটা গিয়ে ঠেকেছে রাত দশটায়। তরী এখনো ঠিক আগের জায়গাতেই বসে আছে।
হৃদয়ের একদম পাশে, একই ভঙ্গিতে, যেন নড়াচড়া করার অনুমতিও নেই ওর।

কিন্তু ওর চোখ বারবার ছুটে যাচ্ছে প্লাবনের দিকে।
যদিও প্লাবনের এখন তরীর দিকে তাকানোর সময় নেই। সে ব্যস্ত চারপাশের তরুণীদের সাথে হাসিঠাট্টা, গল্পে। কখনো কারো দিকে ঝুঁকে কথা বলছে, তো কখনো হেসে উঠছে জোরে। এই দৃশ্য তরীর বুকের ভেতর অদ্ভুত একটা চাপ সৃষ্টি করছে যেন।

এইদিকে তরীর গায়ের সাথে গা ঘেঁষে বসে আছে হৃদয়, নিজেও উঠছে না আর তরীকেও উঠে যেতে দিচ্ছে না। আসন্ন সবাই চাইছে হৃদয় তাদের সাথে কথা বলুক। কিন্তু হৃদয়ের ভাবভঙ্গি দেখে কেউ নিজে থেকে কথা বলতে যাচ্ছে না। কারণ এখানে উপস্থিত সবাই হৃদয়ের রাগ সমন্ধে অবগত। এই ছেলের কথার আগে হাত চলে।

অন্যদিকে দিকে ছেলের এমন বিহেভিয়ারে ইব্রাহিম খান খুবই লজ্জিত বোধ করছেন। রাজনীতির কত শত মানুষ এসেছে, আর এমপি হয়ে হৃদয়ের এমন গা ছাড়া ভাবে উনি অতিষ্ঠ। সেই সাথে নির্লজ্জ ছেলেটা এমন ভাবে তরীর সাথে গা ঘেঁষে বসে আছে, এইসব দেখে উপস্থিত সবাই কি ভাববে উনি সেটাই ভাবছেন।

হৃদয় বসে আছে একদম গম্ভীর মুখ করে, মেজাজ তার দুপুর থেকেই খারাপ, বাড়ি ফিরে তরীকে প্লাবনের সাথে দেখে খারাপ মেজাজ যেন আরও খারাপ হয়ে গেল। কিছুক্ষণ আগেই সে দাঁত চেপে তরীকে বলল,,,,

__এইখান থেকে এক পা নড়বি তো, তোর জানাজা আমি নিজ হাতে তুলবো।

কথাটা ঠাট্টা ছিল না মোটেও, তা তরী ভালো করেই জানে। হৃদয়ের চোখেই সেটা বোঝা গিয়েছিল।
তারপর থেকে তরীর সাহস তো দূরের কথা,
ইচ্ছেটুকুও নেই নড়ার। ও শুধু চুপচাপ বসে আছে,
কাঁধ শক্ত করে, হাত দুটো কোলে গুটিয়ে।

অন্যদিকে,,,,
এই দৃশ্য দেখে জ্বলে যাচ্ছেন শিরিন বেগম আর তার মেয়ে ইনায়া। তারা অনেকক্ষণ ধরেই তরীকে লক্ষ্য করছে। শিরিন বেগমের চোখে বিরক্তির ঝিলিক। কখনো তরীর দিকে তাকাচ্ছেন তো
কখনো হৃদয়ের দিকে। সেই সাথে ইনায়াও ঠোঁট কামড়ে তাকিয়ে আছে তরীর দিকে। চোখে স্পষ্ট ঈর্ষা আর অসহ্য ভাব।

হৃদয়ের পাশে বসার অধিকার তরীর নেই, এই কথাটা ওদের দুজনের চোখে ভেসে উঠছে। তারা তরী এবং নীলা চৌধুরীকে একদমই সহ্য করতে পারেন না । শিরিন বেগমের চোখে তারা হল এক ধরনের বোঝা এবং সেই সাথে সুযোগসন্ধানী, যারা নিজেদের অসহায়ত্বকে ঢাল বানিয়ে খান পরিবারে ঢুকে পড়েছে। শিরিন বেগমের মনে দৃঢ় বিশ্বাস,
তরী আর তার মা নীলা চৌধুরী এই পরিবারের টাকা, ক্ষমতা আর সম্মানকে নিজেদের সুবিধার জন্য ব্যবহার করছে। আর সবচেয়ে বড়ো যেটা শিরিন বেগমের সহ্য হয় না, তা হলো তাদের প্রতি হৃদয়ের অতিরিক্ত কনসার্ন। তরীর দিকে হৃদয় যেভাবে নজর রাখে, যেভাবে আগলে রাখে, শাসন করে, এই সবকিছু শিরিন বেগমের চোখে অস্বাভাবিক। উনার ধারণা অনুযায়ী —
হৃদয়ের যত মনোযোগ, যত যত্ন, যত গুরুত্ব,
সবকিছু থাকবে শুধুই তার মেয়ে ইনায়ার জন্য।
খান পরিবারের ভবিষ্যৎ বউ হিসেবে উনি ইনায়াকেই কল্পনা করে রেখেছেন, যবে থেকে হৃদয় এমপি পদে নিয়োগ হয়েছে।
কিন্তু উনার এই ইচ্ছার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে তরী। যার না আছে বড়ো বংশ, না আছে ক্ষমতার জোর, শুধু আছে ছেলে ধরার জন্য রূপ, এই রূপের জালে হৃদয়কে ও ফাঁসাতে চাইছে। এইটা অবশ্যই শিরিন বেগমের ধারণা।

অন্যদিকে ইনায়ার চিন্তাধারাও আলাদা কিছু নয়।
ওর মনে করে তরী সবসময় হৃদয়কে ফুসলানোফাসলানোর জন্য সরলতার ভান করা থাকে, বোকা সেজে থাকে কিন্তু ভিতরে ভিতরে খুব চালাক। ইনায়ার মনে হয়,,,,
তরী ইচ্ছা করেই হৃদয়ের সামনে দুর্বল আর বোকা সেজে থাকে, যাতে করে ওর প্রতি হৃদয়ের মায়া হয়, হৃদয়ের মনে গলে যায়। আর সেই সুযোগে ও এই পরিবারের টাকা, নিরাপত্তা, গুরুত্ব সবকিছু হাতিয়ে নিবে। এইসব ভেবেই তরীর প্রতি ওর ঈর্ষার আগুন দাউ দাউ করে বেড়ে চলছে প্রতিনিয়ত।

শিরিন বেগম নিচু স্বরে ইনায়াকে উদ্দেশ্যে করে বললেন,,,

__দেখেছিস? কোথা থেকে উঠে এসে কীভাবে হৃদয়ের ঘা ঘেষে বসে আছে! ধান্দাবাজ মেয়ে…

জবাবে ইনায়া বিরক্ত কণ্ঠে ফিসফিস করে বলল—

__আম্মু, ও তো কিছুই না। কিন্তু হৃদয় ভাইয়া কেন ওকে এত গুরুত্ব দেয় বুঝি না?

ইনায়ার কথার জবাবে শিরিন বেগম ঠোঁট বাঁকিয়ে বললেন—
__এই ধরনের মেয়েদের কাজই এইটা। নিজের রুপ দেখিয়ে আর ঘেষাঘেষি করে হৃদয়ের মাথাটা নষ্ট করে ফেলছে। এরা সুযোগ পেলেই সব দখল করে ফেলতে চাই। আমাদের সাবধানে থাকতে হবে। আর ভাবিও না বুঝি না , পনেরোটা বছর ধরে এদেরকে এই বাড়িতে পুষছে। মা টা যেমন মেয়েটাও হয়েছে ঠিক সেইরকম। দেখছিস না ইব্রাহিম ভাইয়াকে ভাইয়া ডাকতে ডাকতে নিজেকে ইব্রাহিম ভাইয়ের বোন বানিয়ে ফেলেছে সেই সাথে এই বাড়ির সদস্যও হয়ে উঠেছে। এখন ইব্রাহিম ভাইয়া আমাদের থেকেও এদের বেশি গুরুত্ব দেয়।

__ঠিক বলেছো আম্মু, আমাদের এই মা মেয়ে দুটোকেই এই বাড়ি থেকে তাড়াতে হবে খুব শীঘ্রই।
আর মামী মামাসহ হৃদয় ভাইয়ার মনেও ওদের প্রতি ঘৃণা আর অবিশ্বাস তৈরি করতে হবে।

__ঠিক বলেছিস, ভাবি আর ভাইয়াকে আমি সামলে নিব , তুই হৃদয়ের দিকটা সামলাবি বুঝতে পারলি?

জবাবে ইনায়া মাথা নাড়ল, মুহুর্তেই তাদের দুজনের চোখেই আবারও আগুন জ্বলে উঠল । আর সেই আগুনের কেন্দ্রে রয়ে গেল নিরীহ মুখে বসে থাকা তরী। যে জানেই না, এই রাজকীয় বাড়ির ভেতরে
তার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র শুরু হয়ে গেছে।


রাত বেড়ে চলেছে, হৃদয় এবং তরী এখনও একই জায়গায় বসানো, তরী ঘুমে ঢুলছে। তখনই হৃদয় আদুরে কন্ঠে বলল,,,,

__ আমার বাঁদরছানার খিদে পেয়েছে ?

হৃদয়ের প্রশ্নে তরী ঘুমজড়ানো চোখে তাকিয়ে রইল কিছুক্ষণ। যেন প্রশ্নটার মানে বুঝতে সময় লাগছে। তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে না জানাল। ওর খিদে পায়নি। ওর শুধু ভীষণ ঘুম পাচ্ছে।

মুহুর্তেই হৃদয় দীর্ঘশ্বাস ফেলল। ছোট বেলা থেকেই রাতে খাবার খাওয়ানোর সময় এই মেয়েকে নিয়ে বড্ড কাটখোড় পুড়তে হয়েছে নীলা চৌধুরীর। আর এখন হৃদয়ের। শত বকাঝকা করলেও এই মেয়ে রাতে খেতে চায়না, এখন তো নীলা চৌধুরীও পারে না ওকে রাতে খাওয়াতে, শুধুমাত্র হৃদয় ছাড়া। একমাত্র হৃদয়ের ভয়ে ওকে মাঝেমধ্যে ডাইনিং এ দেখা যায় রাতে। হৃদয় থাকলেই কোনো মতে দুগ্রাস মুখে তোলে। নয়তো হৃদয় বাড়িতে দেরি করে আসলে বেশিরভাগ রাতেই না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ে। তারপর হৃদয় ফিরে এসে শতবার ডাকলেও ও উঠে না । উল্টো কেঁদে কেটে ভাসায় খাবে না বলে।

অনুষ্ঠান শেষ হল কিছুক্ষণ আগে। গেস্টরা সকলেই বিদায় নিয়েছে। বাড়িতে এখন শুধু খান পরিবারের লোকজন। আজ সকলেই থেকে যাবেন। ছোটরা সবাই খেয়ে নিয়েছে। বাকি আছে শুধু হৃদয় আর তরী। অনিমা বেগম সব বুঝতে পেরেছেন হয়তো এখন তরীকে ডাইনিং টেবিলে বসিয়ে খাওয়ানো মানে এক প্রকার যুদ্ধ। তাই তিনি নিজেই হাত ধুয়ে প্লেটে খাবার নিয়ে এসে তরীর পাশে বসলেন।
অতঃপর মায়াভরা কণ্ঠে বললেন—

__তরী মা, আজ কিন্তু খাবার খেয়ে ঘুমাতে হবে, কাল রাতেও খাসনি। গুড গার্লরা প্রতিদিন রাতে খাবার খেয়ে ঘুমায়। আর তুমি তো গুড গার্ল, তাই না?

অনিমা বেগমের আদুরে কথায় কোনো কাজ হলো না। তরী ঘুমঘুম চোখে তাকালো উনার দিকে। ও কোনো উত্তর না দিয়ে হঠাৎ করেই হৃদয়ের বুকের দিকে মাথা এলিয়ে দিল। ও হয়তো ঘুমের ঘোরে ভুলে গেছে পিছনে যে হৃদয় বসে আছে।
তারপর ধীরে ধীরে মাথা নেড়ে বুঝিয়ে দিল, ও খাবে না। ও ঘুমাবে ওর ঘুম পেয়েছে।

হৃদয় আবারও দীর্ঘশ্বাস ফেলল। তখনই সে দেখতে পেল প্লাবন এগিয়ে আসছে তাদের দিকে। নজর সোজা তরীর উপর। মুহূর্তেই হৃদয়ের চোয়াল শক্ত হয়ে গেল। সে আর কোনো কথা না বলে আচমকাই সে তরীকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তরী ভড়কে গিয়ে তৎক্ষণাৎ হৃদয়ের কোটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরল।

অতঃপর হৃদয় অনিমা বেগমের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলল—

__মিনা আন্টিকে দিয়ে এই খাবারটা আমার রুমে পাঠিয়ে দাও। আমার জন্যও এই প্লেটেই একসাথে খাবার দিয়ে দিও।

অনিমা বেগম কিছু বলার আগেই। শিরিন বেগম তীক্ষ্ণ স্বরে ফোঁড়ন কাটলেন—

__এখন কি তুই এই মেয়ের আধখাওয়া খাবার খাবি নাকি হৃদয়? আর এই মেয়েকে খাইয়ে দিতে হবে কেন?এ কি ছোট নাকি? আমাদের হৃদি তো ওরই সমান। আমাদের হৃদিকে কি কেউ খাইয়ে দেয়?যতসব ঢং!

হৃদয় কিছু বলবে তার আগেই অনিমা বেগম শান্ত গলায় বললেন—

__তুমি ভুল বুঝছো শিরিন। তরীকে কারোর খাইয়ে দিতে হয় না। আসলে কি বলো তো রাত হলেই মেয়েটা কিছুতেই খাবার খেতে চায় না। ছোটবেলা থেকেই এমন। নীলা যে কত কষ্ট করে ওকে খাওয়াত।

অনিমা বেগমের কথা শুনে শিরিন বেগমের রাগ যেন আরও বেড়ে গেল তিনি ছ্যাৎ করে বলে উঠলেন —

__তাহলে ওর মা ওকে এখানে রেখে গেছে কেন?
সাথে করে নিয়ে যেত! যেহেতু তার মেয়েকে রাতে খাইয়ে দিতে হয়, তার উচিত ছিল ওকে সাথে করে নিয়ে যাওয়া। এই বাড়িতে কি সবাই ফ্রি বসে আছে নাকি? হৃদয় সারাদিন কাজ করে। আজ তো সারাদিন বাড়িতেই ছিল না। সন্ধ্যায় এসেছে। এখন ছেলেটা খেয়ে দেয়ে একটু রেস্ট করবে তা না, এখন আবার একে খাইয়ে দিতে হবে।

শিরিন বেগমের কথায় মুহূর্তেই হৃদয়ের মুখের ভাব পরিবর্তন হল। সে একবার তাকাল তরীর দিকে। তরী তখন তার বুকে মাথা রেখে আধঘুমে ঢুলছে। তাই হয়তো শিরিন বেগমের কথাগুলো ওর কানে যায়নি। তরী কিছু শুনতে পায়নি ভেবে হৃদয়ের বুকটা কিছুটা শান্ত হল, পরপর সে ধীরে শিরিন বেগমের দিকে তাকিয়ে ধাঁড়ালো স্বরে বলল—

__ফারদার আমার ব্যক্তিগত ব্যাপারে কথা বলতে আসবেন না। না হলে আমি ভুলে যাব আপনি আমার আব্বুর বোন হন।

এরপর সে আর কিছু বলল না কেননা তরীর কানে এইসব কথা যাক সে কোনোভাবেই চাই না। মেয়েটা বড্ড সেনসিটিভ।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply