নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ৪
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
ভার্সিটির ক্যান্টিনটা তখন দুপুরবেলার আলসে ভিড় পেরিয়ে পুরোপুরি জমে ওঠেছে। টেবিলের একপাশে হৃদি নিশ্চিন্ত ভঙ্গিতে বসে জুসের গ্লাসে স্ট্র নাড়ছে, আর তার ঠিক সামনে তরী মুখটা কাচুমাচু করে বসে আছে। ওর চোখদুটো ফাঁকা, যেন শরীরটা এখানে থাকলেও মনটা কোথাও আটকে আছে গতরাতের গভীর নীলচে অন্ধকারে।
ও এখনও বুঝে উঠতে পারছে না, হৃদয়ের রুমে ও কিভাবে গিয়েছিল। আর কেনই বা কিছু ওর মনে নেই।
তরীর এই অস্বাভাবিক চুপচাপ ভাবটা হৃদি এড়াতে পারল না। মাথা একটু কাত করে, হালকা বিরক্তি নিয়ে বলল,,,,
__আরে বাবা, এত ভাবছিস কেন তুই? দাভাই তো আর তোকে এই নিয়ে কিছু বলেনি, তাই না? তুই দাভাইয়ের রুমে গিয়েছিস বলে কি দাভাই তোকে বকেছে?
তরী ধীরে ধীরে দুদিকে মাথা নেড়ে না বলল । এই নিয়ে হৃদয় তাকে কিছু বলেনি, এতটুকু টু শব্দও করেনি। যা তরীর কাছে খুবই আশ্চর্যের ব্যাপার।
তরীর মাথা নাড়ানো দেখে হৃদি কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলতে লাগল ,,,
__ তাহলে? এত চিন্তা করছিস কেন তুই? আর এমনিতেও সকালবেলা তো দাভাই আম্মুকে নিজেই বলল, তুই নাকি ঘুমের মধ্যেই দাভাইয়ের রুমে গিয়ে বলেছিলিস, তুই ঐ রুমেই ঘুমাতে চাস। তাই দাভাই নাকি তার দ্বিতীয় তলার রুমে এসে ঘুমিয়েছিল।
হৃদি কথাটা এমন স্বাভাবিকভাবে বলল, যেন এতে আশ্চর্যের কিছুই নেই। কিন্তু তরীর ভেতরটা অস্থির হল খুব। হৃদয় এমনিতেই ওকে খুব একটা পছন্দ করে না, তার উপর ওর এমন হুটহাট কান্ড না জানি ওর কপালে কি দুঃখ নিয়ে আসে।
হৃদির কথার জবাবে তরী মিনমিনে গলায় বলল,,,
__কিন্তু হৃদি আমার কিছু মনে পড়ছে না কেন? কখন আমি ঐ জল্লাদের রুমে গেলাম বলতো? আমার কেন কিছুই মনে পড়ছে না?
তরীর কণ্ঠটা খুবই ক্ষীণ, যেন কথাগুলো নিজের কাছেই বলছে ও।
হৃদি এবার জুসের গ্লাসটা নামিয়ে তরীর দিকে পুরো মনোযোগ দিল।
তরী আবারও বলতে লাগল,,,,
__আমার যতটুকু মনে আছে… আমি যখন উনার দ্বিতীয় তলার রুমে কান ধরে দাঁড়িয়েছিলাম, তারপর তুই আর মামনি এসেছিলি, তারপর তোরা আবার চলেও গেলি আমাকে ঐখানে একা ফেলে।
__আরে আমরা কি ইচ্ছে করে চলে গিয়েছিলাম নাকি। তুই দেখলি না দাভাই আমাদের যেতে বলেছিল। আচ্ছা তুই তারপর কি হয়েছে বল।
__তারপর উনি আমাকে খাটে বসতে বললেন। আমার পা খুব ব্যথা করছিল, সেটা উনি হয়তো বুঝতে পেরেছিলেন । সেই জন্য উনি আমার পায়ে ম্যাসাজও করে দিয়েছিলেন। এতটুকু বলে থেমে গিয়ে আবার বলল ও,,,
__ তারপর… তারপর তো আমার আর কিছুই মনে নেই। তরীর চোখে তখন অদ্ভুত একটা প্রশ্ন বেঁধে আছে। স্মৃতির শূন্যতা যেন তাকে আরও বেশি আতঙ্কিত করছে।
এইদিকে তরীর কথাগুলো কানে যেতেই হৃদি আচমকা চমকে উঠল। এক মুহূর্তের জন্য ওর মুখের সব স্বাভাবিকতা উধাও হয়ে গেল। ও বিশ্বাসই করতে পারছে না, ঠিক কী শুনল ও?
নিজের কানকে আরেকবার যাচাই করার জন্য হৃদি প্রায় তড়িঘড়ি করে প্রশ্ন করল,,,,
__ কী বললি তুই?
তরী ঠোঁট চেপে বোকা বোকা চোখে তাকাল হৃদির দিকে।
__ কী আবার বললাম আমি?
হৃদি এবার গলা নামিয়ে, স্পষ্ট করে বলল,,,
__তুই এখন কী বললি? দাভাই তোর পায়ে ম্যাসাজ করে দিয়েছে কাল রাতে?
তরী বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে মাথা নাড়ল। ব্যাপারটা ওর কাছে এতটাই স্বাভাবিক যে একবারও মনে হলো না, কথাটা কতটা অস্বাভাবিক শোনাতে পারে। কেননা হৃদয় প্রায়ই এমনটা করে ।
হৃদি অবিশ্বাসে চোখ বড় বড় করে তাকিয়ে বলল,,,
__তুই কি বলছিস? তুই স্বপ্ন দেখিসনি তো আবার?
তরী এবার বিরক্ত হয়ে ঠোঁট বাঁকিয়ে বলল,,,
__ আশ্চর্য! স্বপ্ন কেন দেখব? বলেই ও স্ট্র দিয়ে জুসে একটা বড় চুমুক বসাল, যেন বিষয়টা এখানেই শেষ।
ঐদিকে হৃদির মাথায় ঘুরছে অন্যকিছু, ওর দাভাই তরীর পায়ে ম্যাসাজ করে দিয়েছে? এইরকম কিছু ওর দাভাই এর থেকে একদমই আশা করা যায় না। ওর কাছে এটা কোনো সাধারণ ব্যাপার নয়। ওর দাভাই তো তরীকে একদম পছন্দ করে না তাহলে এই যত্ন? এইসব কিছুর পেছনে কি এমন কিছু আছে, যা এতদিন ওর ভাবনার সীমার বাইরে ছিল।
হৃদি চুপ করে কিছুক্ষণ তরীর দিকে তাকিয়ে রইল ।ক্যান্টিনের কোলাহলের মাঝেও ওর কানে শুধু একটা কথাই ঘুরপাক খাচ্ছে, হৃদয় তরীর পা ম্যাসাজ করে দিয়েছে, যাকে কিনা হৃদয় সবসময় মেসি মেসি বলে হেনস্থা করতে থাকে।
সকাল প্রায় সাড়ে নয়টার দিকে হৃদয় তরীকে নামিয়ে দিয়েই নিজের কাজে চলে যায়। কালো মার্সিডিজটা ধীরে ধীরে ক্যাম্পাসের গেট ছাড়িয়ে অদৃশ্য হয়ে যাওয়ার পর থেকেই তরী যেন একটু হালকা নিঃশ্বাস ফেলেছিল।
দেখতে দেখতে দুপুর বারোটা বেজে গেল, তরী শুধু একটা ক্লাস করার সুযোগ পেল আজ, আজ বললে ভুল বরাবরই ও একটা ক্লাসই করার সুযোগ পায়, এই নিয়ে ক্লাসের টিচারদের থেকে ওর রোজ কথা শুনতে হয়।
অন্যদিকে হৃদির সব ক্লাস শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু তরীর একটা ক্লাস আছে দুপুর দুটায়। কিন্তু ও ক্লাসটা করবে না। মাথার ভেতর নানারকম চিন্তা ভাবনা গিজগিজ করছে, ক্লাসরুমের চার দেয়ালের ভেতর বসে থাকার মতো মানসিক অবস্থায় ও আজ নেই। যেহেতু তরী আর ক্লাস করবে না তাই দুজনে মিলেই সিদ্ধান্ত নিল একটু শপিং এ যাবে কেননা আর কিছু দিন পরেই হৃদয়ের আম্মু-আব্বুর এনিভার্সারি।
যেই ভাবা, সেই কাজ। দুজন একসাথে গেটের দিকে এগোতেই চেনা গাড়িটা চোখে পড়ল। সামনে দাঁড়ানো কালো গাড়িটার সাথে দাঁড়িয়ে আছে দুজন দেহরক্ষী। ওদের আসতে দেখে দুজনেই দ্রুত গতিতে এসে দাঁড়ালো ঐদের পাশে। তাতে তরী বা হৃদি ! কেউই অবাক হলো না কিংবা বিচলিত হলো না। কারণ এটা রোজকার ব্যাপার। হৃদয় নিজেই তরী এবং হৃদির নিরাপত্তার জন্য গার্ডস রেখে দিয়েছে। এই দুজন বাড়ির বাইরে সর্বদাই তরী এবং হৃদির সাথে সাথে থাকে।
রাজনীতির জগতে যেমন বন্ধুর অভাব নেই, তেমনি বন্ধু রুপি শত্রুর ও অভাব নেই। আর সেই শত্রুদের চোখ সবসময়ই পড়ে থাকে হৃদয়ের পরিবারের দিকে। বিশেষ করে ইলেকশনের সময়টায় পরিস্থিতি আরও কড়া হয়ে যায়। মাস দুয়েকের জন্য তরী আর হৃদিকে প্রায় ঘরবন্দিই থাকতে হয়। খুব জরুরি কিছু না হলে বাইরে যাওয়ার অনুমতিই মেলে না। আর অনুমতি মিললেও, হৃদয় নিজে তার দেহরক্ষীরাসহ ওদের সঙ্গে থাকে। একা ছেড়ে দেওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। এই নিয়মগুলো নিছক শাসন নয়, বরং তাদের সুরক্ষার জন্য। তা তরী আর হৃদি দুজনেই খুব ভালো করে জানে। তাই প্রয়োজন ছাড়া ওরা নিজেরাও খুব একটা বাইরে বেরোয় না। আর সাধারণ সময়ে বেরোলেও, এই দুজন ছায়ার মতো পাশে থাকে ওদের ।
এখন আসা যাক সকলের পরিচয়পত্রে…..
ইব্রাহিম খান হৃদয় এই নামটাই খান পরিবারে যথেষ্ট। গত তিন বছর ধরে সে দেশের সংসদে একজন নির্বাচিত এমপি। বয়সে তরুণ হলেও প্রভাব, দৃঢ়তা আর কঠোর সিদ্ধান্তে সে বহু প্রবীণ রাজনীতিবিদকেও ছাপিয়ে গেছে। খান পরিবারের সবার বড় সন্তান হৃদয়। ইব্রাহিম খান ও অনিমা বেগমের বড়ো ছেলে হৃদয়। ইব্রাহিম খান অর্থাৎ হৃদয়ের বাবা একজন প্রভাবশালী ব্যবসায়ী সেই সাথে তিনি প্রায় বিশ বছর ধরে রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ক্ষমতার করিডোরে তার নাম উচ্চারিত হয় সম্মানের সঙ্গে, আবার ভয়ের সঙ্গেও। তার পরবর্তী প্রজন্মের মধ্যে রাজনীতির ময়দানে নামার সাহস একমাত্র হৃদয়ই দেখিয়েছে। বাকিরা নিজেদের ব্যবসা বাণিজ্য, কর্পোরেট জগৎ আর সম্পদের হিসেবেই সীমাবদ্ধ রেখেছে জীবন।
হৃদয়ের একমাত্র বোন— হৃদিয়ানা খান। পরিবারের সবার চোখের মণি ।
ইব্রাহিম খান ছিলেন তার বাবামায়ের একমাত্র সন্তান। তবে হৃদয়ের দাদারা ছিলেন চার ভাই। পরিবর্তীকালে সেই চার ভাইয়ের হাত ধরেই গড়ে উঠেছিল এই বিশাল খান বংশ। যাদের শিকড় জমিদারি আমলে প্রোথিত, যাদের নাম এখনও শহরের ক্ষমতাবান মহলে সমানভাবে উচ্চারিত হয়। জমি, সম্পদ, প্রভাব আর উত্তরাধিকার, সব মিলিয়ে খান পরিবার মানেই এক বিশাল সাম্রাজ্য।
অন্যদিকে তরীর পরিবারে শুধুই আছে তরীর মা নীলা চৌধুরী এবং তরী নিজে। তরীর পুরো নাম নয়নতরী নয়না। বর্তমানে তরীর পরিবারে শুধুই তরী এবং ওর মা আছেন তবে তরী এবং ওর মাকে হৃদয়দের পরিবারের সদস্যও বলা যায়। অনিমা বেগম এবং ইব্রাহিম খান দুজনেই তরীকে হৃদির মতোই ভালোবাসে। কখনো দুজনের মধ্যে কাউকে আলাদা করে দেখেননি উনারা। আর নীলা বেগমও হৃদয় এবং হৃদিকে নিজের সন্তানের মত করে দেখেন।
চলবে।
গল্পের চতুর্থ পর্ব লেখার সময় মনে হল আরে আমি তো কারোর পরিচয় লেখিনি এখনও।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৬
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩