Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ৩
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

সকাল নয়টা,,,,

কোনো ভারী যন্ত্রের তীক্ষ্ণ আওয়াজে তরীর ঘুম ছুটে যায়। ও প্রথমে পিটপিট করে চোখ মেলে তাকানোর চেষ্টা করলো, তারপর আবারও বন্ধ করে ফেলল। শরীরটা আরাম চাইছে। কম্বলের উষ্ণতায় আরও একটু ঘুমিয়ে নিতে ইচ্ছে করছে , তাই অলস ভঙ্গিতে এইভাবেই পড়ে রইলো কিছুক্ষণ।

কিন্তু তখনই আবারও হেয়ার ড্রায়ারের জোরালো শব্দ কানে এসে ধাক্কা খেল ওর। মুহুর্তেই অলসতা ছুটে পালালো অদূরে। কম্বলের ভেতর থেকে মাথা তুলতেই চারপাশে তাকিয়ে চমকে উঠল, অপরিচিত ঘর। চারদিকে কেমন এক নীলচে অন্ধকার, যেন আলো থাকলেও আলো নেই। সবকিছুই যেন গাঢ় নীলের ভারে ডুবে আছে। মুহূর্তেই ভ্রু কুঁচকে গেল ওর।

__আমি কোথায়? আর পুরো রুম এমন গভীর নীলচে অন্ধকার কেন? মনে মনে প্রশ্ন করলো নিজেকে।

ঠিক তখনই সামনে থেকে ভারী, গম্ভীর কণ্ঠ ভেসে এল—
__সারাদিন শুয়ে বসে থাকা ছাড়া তোর আর কোনো কাজ নেই? পড়াশোনা আদৌ করিস, নাকি সব ছেড়ে দিয়েছিস?

তরী ভড়কে গেল। এই কণ্ঠ চিনতে ভুল হওয়ার প্রশ্নই নেই। ভয়ে শরীরের ভেতর কাঁটা দিয়ে উঠেছে যেন। পরমুহূর্তেই ভাবলো , আমি আবার স্বপ্ন টপ্ন দেখছি না তো। নিজের ভাবনাকে যাচাই করতে হাতের চামড়ায় জোরে চিমটি কাটল।
পরপরই উহু করে উঠলো। তার মানে স্বপ্ন নয়।

সেই মুহূর্তে হৃদয়ের কণ্ঠ আবারও গর্জে উঠল—
__কথা কানে যাচ্ছে না তোর? পড়াশোনাটা কি ছেড়ে দিয়েছিস, তাহলে বল আমি মনিকে বলে তোর বিয়ের ব্যবস্থা করছি।

ব্যস হৃদয়ের আর কিছু বলার দরকার পড়ল না। তরী ঝড়ের বেগে খাট থেকে নেমে গেল ।কোমরসমান লম্বা, গাঢ় ধূসর বাদামী কুকড়ানো চুলগুলো মুহূর্তেই ওর ছোট মুখশ্রীটা ঢেকে ফেলল। বিরক্তিতে চ শব্দ বেরিয়ে এল ওর ঠোঁট থেকে। দ্রুত চুলগুলো হাতে পেঁচিয়ে উঁচু করে ধরে রাখল। তারপর সরাসরি তাকাল হৃদয়ের দিকে।
এইদিকে এতক্ষণের হৃদয়ের বিরক্তিতে ভরা হালকা হলদেটে বাদামী চোখদুটো হঠাৎ করেই শান্ত হয়ে গেল। সেই শান্ত চোখে সে তাকিয়ে রইল তরীর দিকে নিঃশব্দে, স্থিরভাবে। তরী একবার হৃদয়কে দেখে নিয়ে, চোখ ঘুরিয়ে আশেপাশে তাকাল। ওর এখনো মাথায় ঢুকছে না, ও এখানে কি করে আসলো।

মূলত হৃদয়ের রুমে আসা তার জন্য নিষিদ্ধ। তাই ও এই রুমের সাথে ও খুব একটা ফিমিলিয়ার নয়। ছোটবেলায় অবশ্য প্রায় আসত, কিন্তু ওর যখন বয়স বারো হয়, তখন থেকে আর আসেনি এই রুমে এবং হৃদয় নিজেই তাকে তার রুমে আসতে মানা করেছে। তখন অবশ্য রুমটা সাধারণ রুমের মতোই ছিল, কিন্তু হৃদয় বড়ো হওয়ার সাথে সাথে রুমের সব পরিবর্তন করে নেয়, যা তরীর কাছে একেবারেই নতুন, তাই হৃদয়ের এই রুমের সাথে ও খুব একটা পরিচিত নয়, এইসব কিছুই ওর কাছে অচেনা। তবে সেই সময় হৃদয়ের মানা করার কারণটা বুঝতে না পারলেও, এখন অবশ্যই বুঝতে পেরেছে। হৃদয়ের কথা অনুযায়ী তরী তার রুম নোংরা করে ফেলতো যা হৃদয়ের পছন্দ নয়। তার অগোছালো স্বভাব এই নিখুঁত রুমের সাথে যায় না, সেটা তরী নিজেও জানে। তরীর মনে আছে ওর চৌদ্দ তম জন্মদিনে এই রুমে প্রবেশ করার অপরাধে হৃদয় কি থাপ্পড়ই না ওকে মেরেছিল, এক থাপ্পরে ও একসপ্তাহ জ্বরে ভুগেছে। ঐদিনের কথা ভাবলেই তরীর শরীরের রক্ত ঠান্ডা হয়ে যায় ‌, কি ভয়াবহ থাপ্পরই না দিয়েছিল এই জল্লাদ লোক ওকে।

হ্যাঁ, তরী এটা নিজেও মানে, ও খুব মেসি । ওর নিজের রুমে ওর বন্ধুরাও ঢুকতে চাই না। সেই নিয়ে তরী নিজেও নিজের উপর খুব বিরক্ত। কিন্তু এখন প্রশ্ন সেটা নয়। প্রশ্ন হচ্ছে,,,,
ও এই জল্লাদের রুমে কী করছে ? তরী নিজেও হৃদয়ের রুমে আসতে পছন্দ করেনা, সেই চৌদ্দ বছরের জন্মদিনের পর, হাতে গোনা দুএকবার এসেছে এই রুমে এবং সেটাও হৃদয়ের অনুমতিতেই। এই রুমটাকে তরীর খুব ভয় লাগে, কেমন নীলচে অন্ধকার চারিদিকে, ইভেন রুমের প্রত্যেকটা জিনিস গাঢ় নীল রঙের বেড, সোফা থেকে শুরু করে রুমের বড়ো বড়ো কার্টেন গুলোও নীল রঙের। তরী বুঝতে পারে না, কেউ নীল রঙ এত পছন্দ করে কী করে? সবকিছু নীল আর নীল । ওতো চারিদিকে ঠিক করে তাকালেই মাথা ঘুরে উঠে ওর, মনে হয় এই নীল কালারটা চারদিক দিয়ে ওকে ঘিরে রেখেছে এবং এখনই ওকে এই নীল রঙা দেওয়ালের সাথে মিশিয়ে নেবে । হৃদয়ের ঘরের জানালা-দরজা প্রায় বন্ধই থাকে। হৃদয় খুব একটা খোলে না, তাই আলো বাতাস ঢোকে না বললেই চলে। কেমন দমবন্ধকর ঘর। যেন এটা ঘর নয়, এটা একটা বন্ধ খাঁচা।
আর আজ সেই খাঁচার মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে ও নিজে।

তরী যখন নিজের ভাবনায় বিভোর, তখনই ওর নাক বারি খেল হৃদয়ের শক্তপোক্ত বুকে। পরপরই তরী নিজের চুলে হালকা টান অনুভব করলো এবং মিনিটেই হৃদয় নিপুণ হাতে তরীর চুলগুলো উঁচু করে একটা পনিটেল বেঁধে দিয়ে সাথে সাথেই তরীর থেকে সরে দাঁড়ায়। তরী পিটপিট চোখে একবার হৃদয়কে দেখছে তো একবার ওর বিপরীতে থাকা আয়নায় নিজের এবং হৃদয়ের প্রতিবিম্বটা দেখছে। ও হঠাৎ হঠাৎ বুঝতে পারে না হৃদয়কে। হঠাৎ করেই হৃদয় এত যত্ন দেখায় ওর প্রতি যা বরাবরই তরীর ছোট মনে আবেগ নিয়ে আসে। কিন্তু আবার পরমুহূর্তেই হৃদয় ফিরে আসে নিজের নির্দয় রুপে যা তরীর ছোট মনটাকে আবারও ভারী করে তুলে।

__ ভার্সিটি যাওয়ার ইচ্ছে আছে তোর, নাকি সেটাও নেই? হৃদি তো সেই কখন ভার্সিটি চলে গেছে? এখন কয়টা বাজে তোর কোনো খেয়াল আছে….

হঠাৎ হৃদয়ের ধমকে তরী চমকে উঠল। অতঃপর মিনমিনে গলায় ও জবাব দিল,,,,

__হৃদি আর আমার তো ক্লাস সেইম নয়।

তরীর কথায় হৃদয় একপলক দেয়ালে ঝোলানো ঘড়িটার দিকে তাকাল। সেকেন্ডের কাঁটা নিঃশব্দে ছুটছে। তারপর আবার তরীর দিকে চোখ ফেরাল সে।

__তোর ক্লাস সকাল নয়টায়। এখন নয়টা বেজে সাত মিনিট।

কথাটা যেন সোজা গিয়ে লাগল তরীর ব্রেইনে।মুহূর্তের মধ্যে ও ভড়কে গেল, ঠিক যেন চুরি করতে গিয়ে ধরা পড়া কোনো বাচ্চা। চোখ নামিয়ে চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইল , কোনো জবাব নেই মুখে। জবাব দেওয়ার মত কোনো উত্তর আছে নাকি ওর কাছে।

তরীর এই নীরবতা দেখে হৃদয় আবারও ঘড়ির দিকে তাকাল। এবার আর চোখে বিরক্তি নয়, বরং কঠোরতার ছাপ। পরপর গম্ভীর কণ্ঠে বলল হৃদয়,,,

__তোর কাছে পাঁচ মিনিট সময় আছে। দ্রুত তৈরি হয়ে নিচে আয়। এক মিনিটও যেন দেরি না হয়। তোকে ভার্সিটি নামিয়ে আমি জাতীয় সংসদ ভবনে যাব, ইম্পর্টেন্ট মিটিং আছে আমার। কথাগুলো নির্দেশের মতো ছুঁড়ে মারলো হৃদয়।

এইদিকে হৃদয়ের বলতে দেরি নেই তরীর ঝড়ের গতিতে যেতে দেরি নেই, হৃদয়ের রুম চারতলায় আর তরী যে রুমে থাকতে সেটা দ্বিতীয় তলায়, তাই তরীর আর সিঁড়ি বেয়ে নামার সময় হল না ও দ্রুত পায়ে লিফ্টের কাছে গিয়ে দুই নম্বরে চাপ দিল।


ঘড়ির কাঁটাতে তখন ৯টা বেজে ২৩ মিনিট,,,,

নিচে গেটের সামনে Black Mercedes-AMG G65 গাড়িটা নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে হৃদয়। নিখুঁতভাবে ইস্ত্রি করা সাদা ফতোয়া তার উপরে ব্ল্যাক কটি, কবজিতে ঘড়ি, হলদেটে বাদামী চোখদুটো এখন গ্লাসে ঢাকা পড়েছে। এই মুহূর্তে তার ব্যক্তিত্বই বলে দিচ্ছে তার ক্ষমতার পরিমাণ। তারপাশেই আরো তিনটা গাড়ি যেখানে হৃদয়ের দেহরক্ষীরা দাঁড়িয়ে আছেন, তারপাশেই একটা পুলিশের গাড়ি। যেহেতু হৃদয় এখন মিটিং এর জন্য সংসদ ভবনে যাবে, স্বাভাবিকভাবেই পুলিশের গাড়ি থাকবেই তার সাথে।

অন্যদিকে পুরো বাড়ির চারপাশে বডিগার্ড ছড়িয়ে আছে যারা এই বাড়িসহ বাড়ির ভেতরের মানুষগুলোকে রক্ষা করে চলছে প্রতিনিয়ত।


প্রায় পনেরো মিনিট ধরে হৃদয় একই জায়গায় দাঁড়িয়ে, চোখ গেঁথে আছে ফোনের স্ক্রিনে। বাইরে থেকে দেখলে মনে হবে সে গভীর মনোযোগে কোনো গুরুত্বপূর্ণ কাজ করছে, কিন্তু ভেতরে ভেতরে কারো অপেক্ষায় সে অস্থির হয়ে আছে। পাঁচ মিনিট! সে নিজেই বলেছিল। অথচ এতক্ষণ পেরিয়ে গেল, তরীর দেখা নেই। হৃদয় ভালো করেই জানে, স্বাভাবিকভাবে পাঁচ মিনিটে তৈরি হওয়া সম্ভব নয়। তবু সে সময় বেঁধে দেয়, যেন তরীর দম বন্ধ করে দেওয়া তাড়াটাই তার নিয়ম। ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ তুলে একবার বাড়ির দিকে তাকাল সে। দৃষ্টিটা ঠান্ডা এবং ধৈর্যশীল‌ । এইদিকে সে যে মিটিং এর জন্য লেইট হয়ে যাচ্ছে, নেতা মন্ত্রীরা তার অপেক্ষায় সেসবে তার বিন্দুমাত্র খেয়াল নেই।

চলবে।

আমি অনেক বড়ো করে লেখতে চাই , কিন্তু আমার ধৈর্যে কুলায় না, বড়ো করে লেখতে গেলে কেমন যেন গুলিয়ে ফেলি সবকিছু, কেমন যেন খাপছাড়া ভাব এসে পড়ে লেখায়, মেলাতে পারি না। তাই ছোট করে লেখি।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply