নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ২৮
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
দীঘির পাড়ে দাঁড়িয়ে আছে তরী। দুপুরের আলো ধীরে ধীরে নরম হয়ে আসছে, পানির উপর বাতাসের হালকা ঢেউ উঠছে বারবার। কিন্তু সেই শান্ত পরিবেশের সাথে তরীর মুখের ভাবের কোনো মিল নেই। ওর মুখ দেখলেই বোঝা যাচ্ছে এখানে আসার কোনো ইচ্ছাই ছিল না ওর। প্লাবনের একরোখা জোরাজুরিতেই শেষ পর্যন্ত তাকে এখানে আসতে হয়েছে। তরী একদম সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে কাঠকাঠ মুখ নিয়ে,ওর চোখে স্পষ্ট বিরক্তি। অতঃপর কোনো ভণিতা না করেই সরাসরি বলল ও,
__ আপনার কি বলার আছে দ্রুত বলুন প্লাবন ভাইয়া। আমার বাড়ি ফিরতে হবে। নয়তো উনি রেগে যাবেন।
প্লাবন কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে বলতে লাগল,
__ আসলে নয়না কিভাবে যে বলবো বুঝতে পারছি না। আমি সেদিন ঐখানে তোমাকে ঐ বিপদে রেখে চলে আসতে চাইনি। কিন্তু পরিস্থিতিটা এমন হয়ে গিয়েছিল, আমি বাধ্য হয়ে চলে আসি। আর তারপরেই তো হৃদয় সেখানে আসে, আমার তোমাকে নিয়ে কি যে চিন্তা হচ্ছিল। শুধু তোমাকে কিভাবে ঐ পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করবো সেটাই ভাবছিলাম। বিশ্বাস করো নয়না, আমি আজীবন তোমার ভালোই চাই। কিন্তু ঐদিন… ! প্লাবন কথাটা শেষ করার আগেই হঠাৎ পিছন থেকে কর্কশ একটা হাসির শব্দ ভেসে এল।
__ আরেহ! এ তো দেখছি এমপি ইব্রাহিম হৃদয় খানের নিজস্ব মাল! কথাটা বলেই লোকটা হেসে উঠল।
__ তা আমাদের তো আজ বড় সৌভাগ্য! স্বচক্ষে দেখতে পারছি তাকে।
হঠাৎ পিছন থেকে এই ধরনের কথা শুনে তরী এবং প্লাবন দুজনেই চমকে উঠল। তরী দ্রুত ঘুরে দাঁড়াল।
কয়েকজন ছেলে দাঁড়িয়ে আছে ওদের থেকে একটু দূরে। চেহারাচলনে স্পষ্ট বোঝা যায় ছেলেগুলো গুন্ডা টাইপের হবে। চোখে হিংস্রতা, ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি। তরী এই ছেলেগুলোকে চিনতে না পারলেও প্লাবন ঠিকই চিনে ফেলেছে। ওরা হৃদয়ের বিপক্ষ দলের লোক। মুহূর্তেই প্লাবনের মুখের রঙ উধাও হয়ে গেল। ভয়ে তার কপাল বেয়ে ঘাম ঝরতে শুরু করল। সে মনে মনে ভাবছে, আগে যদি জানতো এমন হবে! তাহলে সে কোনোদিনও এখানে আসতো না।
তখনই ওদের মধ্যে থেকে আরেকজন সামনে এগিয়ে এল। লোকটার চোখে কুটিল দৃষ্টি। সে তরীর দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসল, তারপর নোংরা ভাবে বলতে লাগল,
ভাই, এমপির মাল তো দেখছি সেই আগুন? লোকটা একটু থেমে চোখ বুলাল তরীর পা থেকে মাথা পর্যন্ত। তারপর আবারও বাজে ভাবে বলল, দেখতে তো সেই সুন্দর ! এমপি তো মনে হচ্ছে সারারাত এই আগুনের মজা নিয়েই সারাদিন চাঙ্গা থাকে। আজ আমরা এই আগুন ছুঁয়ে দেখলে কেমন হবে ভাই? লোকটার গলায় অশ্লীল কৌতুকের সুর।
এইদিকে তরীর বুকের ভেতরটা ধকধক করতে লাগল। ও বুঝতে পারছে, পরিস্থিতি খুব দ্রুত খারাপের দিকে যাচ্ছে। তখনই আবারও ছেলেগুলোর মধ্যে একজন ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠলো,
__ কিন্তু এমপির মাল তো দেখি অন্য এক মালের সাথে মজা করে বেড়াচ্ছে! এমপি কি এই খবর জানে ? কথাটা বলতেই ছেলেগুলো একসাথে নোংরা হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসির শব্দ যেন চারপাশের বাতাসকেও কলুষিত করে তুলল।
ওদের মধ্যেই আরেকজন এগিয়ে এসে তরীর দিকে একই নোংরা দৃষ্টিতে তাকিয়ে বলল,
_ আরে ভাই, এমন আগুন সুন্দরীদের একজনকে দিয়ে কি পোষায়? তারপর লোকটা তার পাশের লোকটার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসি দিয়ে আবার বলল, _আমরা তো অনেকজন আছি! পুষিয়ে দিতে পারব কি বলিস? কথাগুলো শেষ হতে না হতেই আবার বিকৃত হাসিতে ফেটে পড়ল সবগুলো ।
এইদিকে রাগে তরীর শরীর থরথর করে কাঁপছে।
ওর চোখে আগুন জ্বলছে, কিন্তু সেই আগুনের সঙ্গে মিশে আছে ভয়ও। এই মুহূর্তে কি করবে ও কিছুই জানে না। কি করা উচিত, কিছুই যেন মাথায় আসছে না। ওর বুকের ভেতরটা ধকধক করছে আনবরত।
অন্যদিকে দীঘির পাড়ে বসে থাকা সাধারণ মানুষগুলো পরিস্থিতি বুঝে এক এক করে সরে যেতে শুরু করল। কেউই এইসব বিপদে জড়াতে চায় না কিনা। কিছুক্ষণের মধ্যেই চারপাশটা প্রায় ফাঁকা হয়ে গেল।
ঠিক তখনই,,,,
দূর থেকে দ্রুত পায়ের শব্দ ভেসে এল। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই তরীর দুইজন বডিগার্ড সেখানে এসে পৌঁছাল তাদের সঙ্গে আরেকটি ছেলে ।গার্ডদের দেখামাত্রই তরীর বুকের ভেতর জমে থাকা আতঙ্ক যেন একটু নরম হয়ে এল। মনে হল,
প্রাণটা যেন আবার শরীরে ফিরে এসেছে।
অন্যদিকে হঠাৎ দুজন বড়সড় শরীরের লোককে সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে ছেলেগুলোর মুখের হাসি মুহূর্তেই উধাও হয়ে গেল। তারা অজান্তেই কয়েক পা পিছিয়ে গেল। গার্ডদের সঙ্গে থাকা ছেলেটা ঐ গুন্ডা গুলোর উদ্দেশ্যে বলল,
_ ভাইয়ের জিনিসে নজর দেওয়ার সাহস দেখিয়েছিস! তোদের ব্যবস্থা ভাই নিজে হাতে করবে। তারপর ছেলেটা তরীর দিকে তাকিয়ে একটু নরম স্বরে বলল, _ ভাবি, আপনি চিন্তা করবেন না। ভাই আসছে।
কথাটা শেষ হতে না হতেই দূর থেকে একটা গাড়ির গর্জন শোনা গেল। পরের মুহূর্তেই একটা কালো গাড়ি ফুল স্পিডে এসে ঠিক তরীর সামনে ব্রেক কষল । চাকার ঘর্ষণে ধুলো উড়ে উঠল চারপাশে।
হঠাৎ এত দ্রুত গাড়ি থামায় তরী ভয়ে দুকদম পিছিয়ে গেছে।
পরপর গাড়ির দরজা দ্রুত খুলে গেল। পরের মুহূর্তেই গাড়ি থেকে নামল হৃদয়। তার চোখ দুটো রক্তিম, চোয়াল শক্ত করে চেপে ধরা। তার মুখের সেই ভয়ংকর কঠোরতা দেখে চারপাশের বাতাসও যেন হঠাৎ ভারী হয়ে উঠল। সে এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। লম্বা পা ফেলে সোজা এগিয়ে এসে তরীর সামনে দাঁড়াল। পরের মুহূর্তেই তার শক্ত হাত এগিয়ে এসে তরীর দুগাল চেপে ধরলো। তরীর মাথাটা সামান্য উপরের দিকে উঠে গেছে। হৃদয়ের চোখ তখন আগুনের মতো জ্বলছে। পরপর সে অগ্নি কন্ঠে বলে উঠলো,
__ সাহস কি করে হয় তোর? আমাকে না জানিয়ে এইখানে আসার? একবারও আমাকে জানানোর প্রয়োজন মনে হয়নি তোর? এত স্পর্ধা তোর?
রাগে প্রায় চিৎকার করেই কথাগুলো বলল হৃদয়।তার কণ্ঠ যেন বজ্রপাতের মতো গর্জে উঠেছে এই মুহূর্তে। হৃদয়ের এই রাগী গলা শুনে তরীর বুকটা কেঁপে উঠেছে মুহুর্তেই। ওর ঠোঁট কেঁপে উঠল, চোখ ভিজে গেল। পরের মুহূর্তেই ও ঠোঁট উল্টিয়ে কেঁদে ফেলল। অতঃপর কিছু না বলে হঠাৎই নিজের ছোট হাতদুটো দিয়ে হৃদয়ের কোমর জড়িয়ে ধরল শক্ত করে। ওর এই আঁকড়ে ধরা যেন বারবার জানান দিচ্ছে, আমার কোনো দোষ নেই।
হৃদয় কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে রইল। তার চোখের আগুনটা যেন মুহূর্তেই একটু নরম হয়ে এল। সে ধীরে ধীরে তরীর তুলতুলে নরম গাল ছেড়ে দিল।
তারপর হাত বাড়িয়ে তরীর পিঠ শক্ত করে জড়িয়ে ধরল এবং ওকে নিজের দিকে আরও একটু টেনে নিল। কিন্তু তার চোখের দৃষ্টি তখনও কঠোর। সে কিছু না বলেই চোখের ইশারায় নিজের গার্ডদের নির্দেশ দিল। ইশারা বুঝতে গার্ডদের এক সেকেন্ডও লাগল না। তারা তৎক্ষণাৎ এগিয়ে গিয়ে সেই ছেলেগুলোকে ধরে টেনে নিয়ে যেতে শুরু করল।
হৃদয়ের নির্দেশে আরেকজন গার্ড প্লাবনের হাতও শক্ত করে ধরে টেনে গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
সেই মুহূর্তে প্লাবন ধস্তাধস্তি করতে করতে চিৎকার করে উঠল,
_ আরেহ! কি করছো তুমি? ছাড়ো আমাকে বলছি! সে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বলতে লাগল, _ তোমার সাহস কি করে হয় আমার গায়ে হাত দেওয়ার! ভুলে যেও না, আমিও খান বংশের ছেলে! তোমার কি অবস্থা করবো তার কোনো আইডিয়া নেই তোমার!
কিন্তু প্লাবনের কথাগুলো গার্ডটা একটুও কর্ণপাত করল না। লোকটা শক্ত করে তাকে টেনে নিয়ে যেতে লাগল।
প্লাবন তখন চিৎকার করে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে বলল,
__ হৃদয়! তোর গার্ড আমাকে এইভাবে নিয়ে যাচ্ছে আর তুই চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছিস? কিছু বলছিস না কেন?
হৃদয় কোনো জবাব দিল না। এমনকি একবারের জন্যও ফিরে তাকাল না। তার সমস্ত মনোযোগ তখন শুধুই তরীর দিকে। সে কঠিন চোখে একবার তরীর দিকে তাকাল। তারপর হঠাৎই ঝুঁকে পড়ে তরীকে পাঁজাকোলে তুলে নিল। তরী চমকে উঠলেও কিছু বলল না। শুধু নিঃশব্দে হৃদয়ের বুকের সাথে লেগে রইল। হৃদয় তরীকে নিয়ে সোজা গাড়ির দিকে যেতে লাগল। গাড়ির সামনে পৌঁছাতেই ড্রাইভার তাড়াতাড়ি দরজা খুলে দিল।
হৃদয় খুব সাবধানে তরীকে গাড়ির সিটে বসিয়ে দিয়ে , তারপর ড্রাইভারের দিকে তাকিয়ে ঠান্ডা গলায় বলল,
— আপনার আসতে হবে না এখন। হৃদয়ের চোখে তখনও সেই অদ্ভুত কঠোরতা ঝিলিক দিচ্ছে।
এইদিকে ড্রাইভার খুব ভালো করেই বুঝতে পেরেছে আজকের ঘটনা এখানেই শেষ হচ্ছে না।
কিছুক্ষণ পর,,,,,,
হৃদয়ের গাড়ির ভেতরে অদ্ভুত এক নীরবতা নেমে এসেছে। স্টিয়ারিংয়ে হাত রেখে কঠিন মুখ করে বসে আছে হৃদয়। তার মুখ শক্ত, চোখ সামনে রাস্তার দিকে স্থির। যেন চারপাশে কিছুই দেখছে না, কিছুই শুনছে না। আর পাশেই তরী নিজের ছোট দুটো হাত দিয়ে হৃদয়ের এক হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। ওদের দুজনের মুখেই কোনো কথা নেই। দুজনেই যেন মুখে কুলুপ এঁটে বসে আছে। তরী মাঝে মাঝে ধীরে চোখ তুলে হৃদয়ের দিকে তাকাচ্ছে তো আবার দ্রুত চোখ নামিয়ে নিচ্ছে।
এইভাবে প্রায় দীর্ঘ দশ মিনিট কেটে গেল। গাড়ির ভেতরে শুধু নিঃশ্বাসের আওয়াজ শোনা যাচ্ছিল তখন। হঠাৎই সেই নীরবতা ভেঙে ধমকে উঠল হৃদয়,
__ কি চাইছিস তুই? এক্সিডেন্ট করে আমি মরে যাই? তার কণ্ঠে বিরক্তি আর চাপা রাগ।
এইদিকে কথাটা শোনার সাথে সাথেই তরী যেন বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে গেল। ও তৎক্ষণাৎ হৃদয়ের হাত ছেড়ে দিয়ে গাড়ির দরজার দিকে সিটে গেল।
তারপরই ফুঁপিয়ে উঠল ও। তবে এই কান্না আসলে কান্না নয়, এ হল আহ্লাদী কান্না। মুখ দিয়ে ফুঁপফুঁপ শব্দ বেরোচ্ছে, কিন্তু চোখে একফোঁটা জলও নেই।
হৃদয় গভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে সেটা দেখল। তারপর ধীরে একটা দীর্ঘ নিঃশ্বাস ছাড়ল। পরপর মনে মনে ভাবছে,
__ এই মেয়ে তাকে জব্দ করতে শিখে গেছে। ইনটেরেস্টিং….. পরের মুহূর্তেই সে হাত বাড়িয়ে তরীকে টেনে নিল নিজের দিকে এবং সে ভাবেই তরীকে নিজের উরুর উপর বসিয়ে দিল। হঠাৎ এমনটা হওয়ায় তরীও ঘাবড়ে গিয়ে হৃদয়ের কোটি শক্ত করে আঁকড়ে ধরলো, ব্যস তখনই টপ টপ শব্দে হৃদয়ের ব্র্যান্ডেড কোটির দুটো বোতাম ছিঁড়ে গেল। কিন্তু সেসব হৃদয় পাত্তা দিল না। সে শান্ত ভঙ্গিতে তরীকে সহ সিট বেল্ট বেঁধে নিতে ব্যস্ত।
তরীও আহ্লাদী ভঙ্গিতে হৃদয়ের গলা জড়িয়ে ধরে তার বুকে মুখ লুকিয়ে ফেলল। হৃদয়ের বুকের ভেতর ধকধক শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। সেভাবেই হৃদয় গাড়ি স্টার্ট দিল। গাড়ি ধীরে ধীরে রাস্তা ধরে এগিয়ে যাচ্ছে। হৃদয়ের মুখের দিকে তাকালে বোঝা কঠিন, সে এখন রেগে আছে, নাকি শান্ত হয়ে গেছে। কিছুটা পথ পেরোনোর পর হঠাৎই হৃদয় গম্ভীর কণ্ঠে তরীর উদ্দেশ্যে বলল,
__ আজ আমি যা বলব, বিনা কোনো প্রশ্নে ঠিক তাই করবি। আজ আমার বিপক্ষে একটাও কথা বলার সাহস দেখালে তোকে মেরে ফেলবো আমি। আই রিপিট, যেভাবে বলা হবে ঠিক সেভাবেই করবি।
চলবে।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৬
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১০
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৫
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৭