নয়নারএমপিসাহেব
পর্ব:- ২৭
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি
ভার্সিটির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে আছে তরী ।দুপুরের রোদটা হালকা হলেও বাতাসে একটা ক্লান্তি মিশে আছে। হাতে ব্যাগ, কাজ শেষ করে দ্রুত বাড়ি ফেরার তাড়ায় ছিল ও। ও আজ এসেছিল ভার্সিটিতে এসাইনমেন্ট জমা করতে। যেহেতু আজ হৃদির এসাইনমেন্ট এর ডেট ছিল না তাই ও আসেনি। তরী গাড়ি এবং বডিগার্ড নিয়ে একাই এসেছে। এসাইনমেন্ট জমা দিয়েই ও বাড়ি যাবে ভেবেছিল । তাই দ্রুত এসাইনমেন্ট জমা দিয়ে গেট পেরিয়ে বেরোতেই সামনে প্লাবন কে দেখতে পেল।তাকে দেখামাত্রই তরীর মুখটা বিরক্তিতে কুঁচকে গেল। এই সময়ে এই জায়গায় প্লাবন কি করছে তরী জানে না । তরী ভেবেছিল প্লাবনকে না দেখার ভান করে পাশ কাটিয়ে চলে যাবে। কিন্তু ও সেই সুযোগও পেল না। তৎক্ষণাৎ প্লাবন দ্রুত এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়িয়ে পড়ল।
__ নয়না, তুমি কি আমায় দেখতে পাওনি? আমি সেই কখন থেকে তোমার জন্য অপেক্ষা করছি।
প্লাবনের কথা শোনামাত্রই মুহুর্তেই তরী ভ্রু কুঁচকে তাকাল তার দিকে। চোখে মুখে ওর স্পষ্ট অস্বস্তি,
__আপনি কেন আমার জন্য অপেক্ষা করছিলেন, প্লাবন ভাইয়া?
জবাবে প্লাবন একটু ইতস্তত করে বৃলব,
__আসলে! আমার তোমার সাথে একটু দরকারি কথা ছিল, নয়না। এতদিন কতবার তোমার সাথে কথা বলার চেষ্টা করেছি, কিন্তু সুযোগই পাচ্ছিলাম না। তোমার ফোনও লাগছিল না। আজ যখন জানলাম তুমি ভার্সিটিতে এসেছো, সব কাজ ফেলে চলে এসেছি তোমার জন্য।
প্লাবন এর কথা শুনে তরীর চোখে বিস্ময় আর বিরক্তি একসাথে খেলে গেল।
__ আপনি আমার জন্য কাজ ফেলে এসেছেন?
__হ্যাঁ, নয়না।
তরী এবার ঠান্ডা গলায় জবাব দিল,
__কিন্তু কেন? হঠাৎ আপনার আমাকে কি দরকার, প্লাবন ভাইয়া? আর যদি সত্যিই বিশেষ কোনো প্রয়োজন থাকত! আপনি বাড়িতে আসতেন। সবাই তো বাড়িতেই থাকে।
প্লাবনের চোখে তখন অন্যরকম এক অস্থিরতা কাজ করছে সে একটু নিচু স্বরে বলল,
__ আমার তোমার সাথেই প্রয়োজন নয়না! ওই বাড়িতে আমি এই কথাগুলো বলতে পারতাম না।
হৃদয় আমাকে সেই সুযোগ দিতই না। তুমি তো জানোই সে কিরকম।
তরীর ভ্রু এবার আরও কুঁচকে গেল।
প্লাবন এবার কথাগুলোর আরও একটু জোর দিয়ে বলল,
__ তোমাকেও তো সারাদিন বকাঝকা করে সে, তাই না? আসলে হৃদয় চায় সবাই তার কন্ট্রোলে থাকুক।
প্লাবনের কথাগুলো শুনে মুহূর্তেই তরীর চোখে এক ঝলক তীক্ষ্ণতা নেমে এল। ওর মুখের অভিব্যক্তি বদলে গেল ধীরে ধীরে। এই প্রথম ও আর আগের মতো চুপ করে দাঁড়িয়ে রইল না। এতক্ষণ ওর চোখেমুখে যে বিরক্তির ছাপ ছিল, প্লাবনের কথাগুলো শুনতে শুনতে তা যেন মুহূর্তেই একশো গুণ বেড়ে গেল। সেই বিরক্তির সঙ্গে এবার জুড়ে গেল তীব্র রাগও।
একদিকে প্লাবনকে এখন আর সহ্যই করতে পারে না ও, তার উপর হৃদয়কে নিয়ে এমন কথা! আজকাল কেউ হৃদয় সম্পর্কে সামান্য কিছু বললেও তরী মেনে নিতে পারে না। তবুও অনেক কষ্টে নিজের রাগটা নিয়ন্ত্রণ করল ও। তারপর গম্ভীর স্বরে বলল,
__এমপি সাহেবের মতো কেউ এই পৃথিবীতে নেই, প্লাবন ভাইয়া। আর কেউ কখনো উনার মতো হতে পারবেও না। ওর কণ্ঠে তখন গর্ব আর অটল বিশ্বাসের মিশেল। ও আবারও বলল,
__উনার কাউকে কন্ট্রোল করতে হয় না। সবাই নিজে থেকেই কন্ট্রোল হয়ে যায়। আর উনি আমাকে বকাঝকা করেন সেটার প্রয়োজন পড়লেই, কিংবা আমি কোনো ভুল করলে। উনি আমার সব বিপদ নিজের কাঁধে নিয়ে নেন। আমাকে বলতে হয় না কিছু, উনি আগেই বুঝে যান আমার ভালোমন্দ, আমার বিপদআপদ।
আর এমনিতেও উনি আমাকে বকবেন না তো কে বকবে? উনার সম্পূর্ণ অধিকার আছে আমাকে বকাঝকা করার। আর সেই অধিকার আমার উনাকে কখনো দেওয়ার প্রয়োজন পড়েনি আর কখনো পড়বেও না, কারণ আমি জানি আগত যে কোনো বিপদে উনি অন্তত আমার হাত ছেড়ে যাবেন না। সেক্ষেত্রে অধিকার নিজে থেকেই তৈরি হয়ে যায়, তাই নয় কি?
তরীকূ এমন বড়োদের মত কথা বলতে দেখে। প্লাবন কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে তাকিয়ে রইল ওর দিকে। তারপর ধীরে জিজ্ঞেস করল,
__ তুমি কি আমার উপর রেগে আছো, নয়না?
জবাবে তরী ভ্রু কুঁচকে বলল,
__ আপনার এমনটা মনে হওয়ার কারণ কি, প্লাবন ভাইয়া?
__ না আসলে সেদিন তো আমি….
__ আমি ঐসব কিছু মনে রাখিনি, তার থেকেও ইম্পর্টেন্ট এমপি সাহেব থাকতে আমাকে কোনো বিপদ স্পর্শ করতে পারবে না। আর একটা কথা বলে রাখি, রাগ অভিমান আমি যারতার সঙ্গে করি না। করি শুধু আমার নিজের মানুষদের সঙ্গে। কথাটা বলেই ও পাশ কাটিয়ে দাঁড়াল।
__ আপনার যদি আর কোনো প্রয়োজন না থাকে, আমি যাই। আমার দেরি হচ্ছে।
এইদিকে প্লাবন হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে তরীর দিকে। এই তরীকে সে চেনে না। তার জানা সেই সরল, চুপচাপ মেয়েটা কোথায় গেল? যে মেয়েটা নাকি হৃদয়কে একদম পছন্দই করত না, সেই মেয়েটা আজ এত দৃঢ়ভাবে হৃদয়ের পক্ষে দাঁড়িয়ে আছে! সে কিছুতেই বুঝে উঠতে পারছে না, হঠাৎ এই পরিবর্তন কেন?
তরী আর কোনো কথা না বলে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিল। কিন্তু ঠিক তখনই….. প্লাবন হঠাৎ হাত বাড়িয়ে তরীর কব্জিটা শক্ত করে ধরে ফেলল। তৎক্ষণাৎ সেই মুহূর্তের দৃশ্যটা, দূরে কোথাও থেকে একটা ফোনের স্ক্রিনে ভেসে উঠল। স্ক্রিনের ওপারে কেউ একজন রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে আছে।
এইদিকে প্লাবন কিছু বলার আগেই, তরী ঠাস! করে এক ঝটকায় হাতটা ছাড়িয়ে নিল। ওর চোখ কান রাগে লাল হয়ে উঠেছে।
যা দেখে প্লাবন তাড়াতাড়ি বলতে লাগল,
__ সর! সরি নয়না। প্লিজ আমাকে খারাপ ভেবো না। আসলে ভুলবশত হয়ে গেছে। সো সরি।
তরী স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ওর বুক ওঠানামা করছে দ্রুত। রাগে ওর চোখ দুটো লাল হয়ে উঠেছে, কানও লালচে। তবুও ও আপ্রাণ চেষ্টা করছে নিজেকে সংযত রাখতে। কারণ ও জানে, এই মুহূর্তে যদি নিজের রাগকে প্রশ্রয় দেয়, তাহলে হয়তো পরিস্থিতি আর নিয়ন্ত্রণে থাকবে না।
এইদিকে প্লাবনের মুখে অনুশোচনার ছাপ দেখা যাচ্ছে। কণ্ঠে এক ধরনের অসহায়তা মিশে আছে তার,
__ প্লিজ নয়না! আমাকে ভুল বুঝো না। আমি আজকের জন্যও লজ্জিত, আর সেদিনের ঘটনার জন্যও। সত্যি বলছি, আমি খুব অনুতপ্ত।
অতঃপর সে এক মুহূর্ত থেমে গিয়ে আবার বলল,
__ নয়না, আমার একটা রিকোয়েস্ট রাখবে, প্লিজ ? আমাকে কি পাঁচ মিনিট সময় দিতে পারো? শুধু পাঁচ মিনিট।
তরী তখনও স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে তার দিকে। ওর মুখে বিরক্তির ছাপ স্পষ্ট। অতঃপর ও ঠান্ডা গলায় বলল,
__ আপনার যদি কিছু বলার থাকে, দ্রুত বলুন প্লাবন ভাইয়া। আমার দেরি হয়ে যাচ্ছে।
প্লাবন যেন একটু অস্বস্তিতে পড়ে গেল। চারপাশে একবার তাকিয়ে নিয়ে নিচু স্বরে বলল সে,
— নয়না! চল না সামনের দীঘির পাড়ে একটু বসি। প্লিজ। বেশি সময় নেব না। জাস্ট কয়েকটা গুরুত্বপূর্ণ কথা ছিল তোমার সঙ্গে।
তরীর কুঁচকে থাকা ভ্রু মুহুর্তেই আরও কুঁচকে গেল।
তৎক্ষণাৎ মধ্যেই ও মাথা নেড়ে বলল,
_ না, সেটা সম্ভব নয় প্লাবন ভাইয়া। ওর কণ্ঠে এবার দৃঢ়তা। অতঃপর তরী আবারও বলল, _ এখন ইলেকশনের সময়। এই সময়ে দীঘির পাড়ে যাওয়াটা ঠিক হবে না। আর উনি আমাকে ভার্সিটি থেকে সোজা বাড়িতে যেতে বলেছেন। এখন এই সময়ে কোথাও যাওয়াটা সম্ভব নয়।
__ প্লিজ নয়না! না করো না। তার কণ্ঠে একরকম মরিয়া ভাব।
__ তুমি তো একা যাচ্ছ না। আমি তো আছিই তোমার সঙ্গে। তাহলে এত ভয় পাচ্ছো কেন?
কথার শেষভাগে তার গলায় হালকা অহংকারের সুর ফুটে উঠল। তারপর সে আবার বলল,
__ হ্যাঁ মানছি, তোমাদের এমপি সাহেবের খুব নামডাক আছে। কিন্তু তাই বলে আমাদের কোনো নামডাক নেই! এমনটা কিন্তু নয়? আমাকেও কিন্তু সবাই চেনে ! সবাই জানে।
এইদিকে তরীর চোখের দৃষ্টিতে যেন ধীরে ধীরে কঠোরতা জমে উঠছে। কারণ ও খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে, এই কথাগুলোর আড়ালে প্লাবনের অহংকারই বেশি কথা বলছে।
চলবে।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৩
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১৪
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৩
-
নয়নার এমপি সাহেব গল্পের লিংক
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২২
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ৭
-
নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৬