Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৪


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ২৪
লেখনীতে Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

রাত প্রায় দুটো….

হৃদয়ের ঘরের ভেতর অদ্ভুত নীরবতা জমে আছে। দেয়ালে ঘড়ির টিকটিক শব্দ স্পষ্ট শোনা যাচ্ছে। তরী তখন গভীর ঘুমে মগ্ন। কিন্তু হৃদয়ের চোখে কোনো ঘুম নেই আজ। কিভাবে থাকবে? তারই চোখের সামনে তার প্রিয় নারী ঘুমের রাজ্যে ডুবে আছে হৃদয় জ্বলসানো আবেদনময়ী রূপ নিয়ে তার পুরো বিছানা জুড়ে। ঘুমের মধ্যে নিজের পরিহিত পোশাকেরও কোনো হুঁশ নেই ওর। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে ছড়িয়ে আছে বালিশের উপর, নিঃশ্বাসের ওঠানামায় বক্ষস্থল ধীরে ধীরে উঠানামা করছে ওর। হৃদয় সোফায় বসে আছে, কিন্তু তার চোখ বারবার ঘুরে ফিরে সেদিকেই চলে যাচ্ছে।
চোখ সরাতে চাইছে, অথচ তার চোখ দুটো যেন আজ তার কথা শুনতে নারাজ। নিজের অশান্ত মনটাকে শান্ত করতে সে বারবার চেষ্টা করছে, কিন্তু কিছুতেই পারছে না। হৃদয়ের বুকের ভেতরটা কেমন অদ্ভুত এক অস্থিরতায় ভরে উঠছে। এই জ্বালা, এই অনুভূতি , এই অদ্ভুত টান আজ সহ্য হচ্ছে না তার।

সামনে রাখা বোতলটা হাতে নিয়ে ঢকঢক করে কয়েক ঢোক পানি খেল সে। অতঃপর উঠে দাঁড়াল। তারপর টেবিল থেকে একটা সিগারেট তুলে নিয়ে ধীর পায়ে ব্যালকনির দিকে চলে গেল। আজ আর এই রুমে থাকা সম্ভব না তার পক্ষে যাবে। নয়তো, কোনো অঘটন ঘটে যাবে আজ।

ব্যালকনির দরজা খুলে সে বাইরে এসে দাঁড়াল। রাতের ঠান্ডা বাতাস চোখে মুখে এসে লাগতেই হৃদয়ের মন শান্ত হল কিছুটা। আকাশে আধখানা চাঁদ উঠেছে, চারপাশের নীরব শহর যেন চাঁদের সৌন্দর্য আরো বাড়িয়ে দিয়েছে। সে রেলিংয়ের পাশে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে সিগারেট ধরাল। সিগারেটের ধোঁয়ার কুণ্ডলী ধীরে ধীরে রাতের অন্ধকারে মিলিয়ে যেতে লাগল।


কিছুক্ষণ পর….
তরীর ঘুম একটু একটু করে ভাঙতে শুরু করেছে। গভীর সুরের একটা গানের লাইন যেন তার কানে এসে লাগছে। ও ধীরে ধীরে চোখ খুলল। পরমুহূর্তেই হকচকিয়ে উঠে বসল। এই সুর কোথা থেকে আসছে? মন দিয়ে শুনতেই বুকটা হঠাৎ কেঁপে উঠল। এই কণ্ঠস্বরটা তো ওর খুব চেনা। কিন্তু, এইরকম সুর তো ও আগে কখনো শুনেনি। তরী ধীরে ধীরে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়াল। মেঝেতে পা দুটোও খুব সাবধানে রাখলো ও, যেন শব্দ না হয়। তারপর আস্তে আস্তে হাঁটা দিল ব্যালকনির দিকে। ব্যলকনির দরজার কাছে গিয়ে থামতেই স্পষ্ট শোনা গেল গানের কিছু লাইন। হৃদয়ের গভীর স্বরের গলার গান এই প্রথম শুনলো তরী। একটা অদ্ভুত কষ্ট মিশে আছে তাতে। তরীর বুকটা একমুহুর্তে ধক করে উঠল। ও কিছুক্ষণ একইভাবে ব্যালকনির দরজার সামনে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে তাকিয়ে রইল হৃদয়ের দিকে। হৃদয় তখন তরীর দিকে পিঠ দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। হাতে আধখানা জ্বলা সিগারেট।

সেই মুহূর্তেই তরীর উপস্থিতি বুঝতে পেরে হৃদয় চুপ হয়ে গেল, ওদিকে তরীর ঘনঘন নিঃশ্বাসের শব্দ খুব স্পষ্ট হয়ে হৃদয়ের কানে পৌঁছাচ্ছে। তরীর নিঃশ্বাসের শব্দে মনে হল মেয়েটা ভীষণ অস্থির।
কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ ঠিক সেইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল। একজন ব্যালকনির ভেতরে, আরেকজন দরজার সামনে। তারপর হঠাৎই হৃদয়ের গভীর, ভারী কণ্ঠ ভেসে এল,
__কাছে আয়।

তরী যেন মুহূর্তেই কেঁপে উঠল। ওর বুকের ভেতরটা ধকধক করতে শুরু করেছে। তবুও সাহস নিয়ে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছে ও। একটু একটু করে এসে দাঁড়াল হৃদয়ের খুব কাছাকাছি। তরী কাছে আসতেই হৃদয় চোখ ঘুরিয়ে তাকাল ওর দিকে। রাতের ম্লান আলোয় তরীর মুখটা আরও আদুরে আরও কোমল দেখাচ্ছে।

অতঃপর হৃদয় ধীরে জিজ্ঞেস করল,
__উঠে পড়েছিস কেন? এখনও তো সকাল হয়নি। আরও অনেকটা রাত বাকি।

তরী মাথা নিচু করল। পরপর নরম গলায় বলল,
__ঘুম ভেঙে গেছে‌। আর ঘুম পাচ্ছে না। আপনি ঘুমাননি?

জবাবে হৃদয় হালকা হেসে বলল,
__কি করে ঘুমাবো? পুরো খাট জুড়ে তো তুই ঘুমিয়েছিলি।

কথাটা শোনামাত্রই তরীর মুখটা ম্লান হয়ে গেল।

__সরিইই…. মন খারাপ করে বলল তরী। ওর জন্য হৃদয়ের ঘুম হয়নি। ভাবতেই তরীর মন খারাপটা তীরতীরিয়ে বেড়ে গেল। মাথা আরও নিচু করে ফেলল ও।

হৃদয় কয়েক সেকেন্ড ওর দিকে তাকিয়ে রইল নিঃশব্দে।তারপর সিগারেটটা রেলিংয়ের বাইরে ফেলে দিয়ে হঠাৎই সে হাত বাড়িয়ে তরীর কব্জিটা আলতো করে আঁকড়ে ধরল। তারপর খুব সংক্ষিপ্ত স্বরে বলল,

__চল।

তরী বড়বড় করে তাকাল তার দিকে। চোখে স্পষ্ট বিস্ময় আর জিজ্ঞাসা।

__কোথায় যাবো এত রাতে? ওর কণ্ঠ কৌতূহলী।

হৃদয় একবার আকাশের দিকে তাকাল, তারপর ধীরে ধীরে চোখ নামিয়ে তরীর দিকে স্থির করল। তার চোখে তখন অদ্ভুত এক গাঢ়তা। গভীর স্বরে বলল,
__ আমি যেখানে নিয়ে যাবো সেখানেই যাবি।

তরী কয়েক সেকেন্ড স্থির হয়ে হৃদয়ের দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর আত্মবিশ্বাসী স্বরে বলল,
__ অবশ্যই আপনি যেখানে থাকবেন, আমিও তো সেখানেই থাকবো ।

মুহূর্তের জন্য হৃদয় যেন থমকে গেল। তরীর মুখে এমন সরল, নির্ভেজাল উত্তর সে হয়তো আশা করেনি।

হৃদয়ের আঙুলগুলো অজান্তেই আরও শক্ত হয়ে জড়িয়ে ধরল তরীর তুলতুলে হাত। তার ঠোঁটের কোণে ধীরে ধীরে এক দুষ্টু হাসি ফুটে উঠল। তার প্রতি তরীর বিশ্বাস চেক করার জন্য বলে উঠলো,

__তুই জানিস না। আমি কতটা খারাপ। যা বলছিস ভেবে বলছিস তো পড়ে পিছ পা হবি না তো । তখন কিন্তু আমি তোর কোনো কথা শুনবো না। ফিসফিস করে বলল।

জবাবে তরী অহংকারী ভাব নিয়ে বলল,
__আমার এমপি সাহেব মোটেও খারাপ নয়, কখনোই নয়। আর যেখানে আপনি আছেন সেখানে আমার পিছ পা হওয়ার কোনো প্রশ্নই আসে না।

হৃদয় স্তব্ধ তরী আজ ফটাফট জবাব দিচ্ছে, এমন ভাবে জবাব দিচ্ছে যে হৃদয়কে জব্দ করে ফেলছে ও। অতঃপর হৃদয় আর কিছু বলতে পারলো না।


তরী দাঁড়িয়ে আছে বাড়ির বারান্দার সিঁড়িগুলোতে। হৃদয় গেছে গ্যারেজের দিকে বাইক আনতে। দুই মিনিটের ব্যবধানেই হৃদয় বাইক নিয়ে এসে দাঁড়ালো , হৃদয়কে আসতে দেখে তরীও দ্রুত সিড়ি বেয়ে নেমে গেল।

__উঠ। শান্ত কন্ঠে বলল হৃদয়।

তরীও ধীরে ধীরে উঠে বসল। দুহাত হৃদয়ের কাঁধে রাখতেই তৎক্ষণাৎ হৃদয় ভারী স্বরে বলে উঠলো,

__ ঠিক ভাবে ধরে বস। পরমুহূর্তেই তরী দুই হাত দিয়ে শক্ত করে আঁকড়ে ধরল হৃদয়ের পেট।

হৃদয় তাকে নিয়ে ঘুরতে বেরিয়েছে এই ভাবনাটুকুই যেন তরীর বুকের ভেতর আনন্দের ছোট ছোট ঢেউ তুলে দিচ্ছিল। ওর চোখেমুখে এতটুকুও দ্বিধা নেই, নেই কোনো ভয়। বরং অদ্ভুত এক উচ্ছ্বাসে ভরে উঠেছে ওর ভেতরটা।

অতঃপর হৃদয়ের বাইকটা ধীরে ধীরে খান বাড়ির গেট পেরিয়ে বেরিয়ে গেল নিস্তব্ধ রাস্তায় গন্তব্যহীন পথে। চারপাশে গভীর রাতের নীরবতা। মাঝে মাঝে দূরে কুকুরের ডাক, কিংবা কোনো ট্রাকের অস্পষ্ট শব্দ ভেসে আসছে। হৃদয় একটু স্পিড বাড়াতেই ঠান্ডা বাতাস আরও জোরে এসে আছড়ে পড়ল তাদের গায়ে। তরী মুহূর্তেই আরও শক্ত করে জড়িয়ে ধরল হৃদয়কে। অতঃপর মাথাটা হৃদয়ের কাঁধে ঠেকিয়ে বলল,
__ আমরা কোথায় যাচ্ছি?

হৃদয় জবাব না দিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করল,
__কেন? ভয় করছে?

তরী দ্রুত মাথা নাড়ল।
__ একদমই না।

__ কেন না?

জবাবে তরী খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
__ আপনি সাথে আছেন না? ভয় কেন লাগবে?

তরীর কথাগুলো শুনে হৃদয়ের ঠোঁটে অজান্তেই এক চিলতে হাসি ফুটে উঠল। তরীর তার প্রতি এই বিশ্বাসটা যেন তার এতগুলো বছরের ভালোবাসার প্রাপ্তি। হৃদয়ের বুকের ভেতর দিয়ে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি বয়ে যেতে লাগল। কিছুক্ষণ নীরবতার পর হৃদয় আবার জিজ্ঞেস করল,

__ কেমন লাগছে বাবুই?

তরীর কণ্ঠে স্পষ্ট উচ্ছ্বাস,
__ খুব খুব খুব ভালো।

হৃদয় এবার একটু ধীর স্বরে বলল,
__ বাড়ি ফিরে যাবি?

তরী হকচকিয়ে উঠল মুহুর্তেই।
_ কেননন? _না মানে, এত তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে যাব আমরা?

হৃদয় আর কোনো জবাব দিল না। শুধু বাইকের স্পিডটা একটু বাড়িয়ে দিল। তারপর শুরু হল এই অদ্ভুত রাতের ভ্রমণ। শহরের ফাঁকা রাস্তা, নিস্তব্ধ মোড়, ঘুমিয়ে থাকা শহরতলী, রাস্তার হলুদ আলো একটার পর একটা পিছনে পড়ে যাচ্ছে তাদের। হৃদয় বাইক নিয়ে চলল শহরের অলিগলি পেরিয়ে। কখনও বড় রাস্তা, কখনও সরু গলি, কখনও নদীর ধারের নির্জন পথ। আর তরী একইভাবে হৃদয়কে আঁকড়ে ধরে বসে আছে। মাঝে মাঝে ঠান্ডা বাতাসে তার চুলগুলো উড়ে এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে হৃদয়ের ঘাড়। হৃদয় কিছু বলছে না। তরীও না।
কিন্তু দুজনের মাঝের নীরবতাটা অদ্ভুতভাবে আজ পূর্ণ।

রাত ধীরে ধীরে ফুরিয়ে আসতে লাগল। পূর্ব আকাশে হালকা নীলচে আলো ফুটতে শুরু করেছে। ঘড়ির কাঁটা তখন ভোর পাঁচটা ছুঁইছুঁই। এই পুরো সময়টা হৃদয় তরীকে নিয়ে শহরের অলিগলি জুড়ে এভাবেই ঘুরে বেড়াল। ক্লান্তি নেই, তাড়া নেই , শুধু বাইকের গর্জন, ঠান্ডা ভোরের বাতাস, আর দুইজন মানুষের নিঃশব্দ সঙ্গ। তরীর কাছে মনে হচ্ছিল এই রাতটা যেন শেষ না হয়।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply