Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২৩


নয়নারএমপিসাহেব

পর্ব:- ২৩
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

হৃদয় ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে তরীর দিকে। তারপর বিছানায় বসে থাকা তরীর দুই পাশে হাত রেখে কিছুটা ঝুঁকে গেল । সে তরীর এতটাই কাছে যে তরীর মনে হচ্ছে ওর নিঃশ্বাস যেন বুকের ভেতরই আটকে আছে বেরোতে চাইছে না।
অতঃপর হৃদয় গভীর চোখে তাকিয়ে মৃদু স্বরে বলল,

__ এইবার বল কি চাই?

হৃদয়ের সোজাসাপ্টা কথায় তরী একদম স্থির হয়ে গেল। আমতা আমতা করতে লাগলো মুহুর্তেই। তরীকে আমতা আমতা করতে দেখে হৃদয় আবার বলল,

__ পড়াশোনা যে তুই করতে আসিসনি, সেটা আমি খুব ভালো ভাবেই জানি। এখন এইটা বল ভার্সিটিতে তোর কি কি সাবজেক্ট আছে? আদৌ ইকোনমিক্স সাবজেক্ট আছে তো?

এই কথা শুনেই তরী যেন ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল। চোখ বড় বড় করে এদিকে ওদিকে তাকাতে লাগল। মনে মনে নিজের উপর ভীষণ রাগ হল ওর। একটু বুঝে বলতে পারলো না কথাটা! এখন তো ঠিকই ধরা পড়ে গেল । মনে মনে নিজেকে বলদ নামের উপাধি দিল নিজেই।

তরীকে চুপ থাকতে দেখে হৃদয় আবারও ধীরে করে বলল,

__ কিছু চাই তোর ?

জবাবে তরী আড়চোখে একবার হৃদয়ের দিকে তাকাল। তারপর তাড়াতাড়ি চোখ নামিয়ে মাথা দুদিকে নেড়ে না বোঝাল।

মুহুর্তেই হৃদয় ভ্রু কুঁচকাল।

__ তাহলে আজ হঠাৎ বাঁদরছানার আমার রুমে আগমন ঘটল যে?

হৃদয়ের কথা শুনে পরমুহূর্তেই তরী ঠোঁট বাঁকিয়ে বলে উঠলো,

__ কেন? আমি কি আপনার রুমে আসতে পারি না? এখন কি আপনি আমাকে মারবেন নাকি?

হৃদয়ের কপালে মুহূর্তেই ভাঁজ পড়ল। সে অসন্তোষ গলায় বলল,

__ আমি কেন মারব তোকে?

__ ঐ যে! একবার আপনার রুমে এসেছিলাম বলে আপনি খুব রেগে গিয়েছিলেন আমার উপর। তারপর আমাকে শাস্তি দিয়েছিলেন? কথাগুলো তরী মাথা নিচু করেই বলল। পাছে না হৃদয় রেগে গিয়ে ওকে থাপ্পর দিয়ে দেয়।

এইদিকে তরীর মুখে এহেন কথা শুনেই হৃদয়ের মুখের হাসিটা মিলিয়ে গেল। তার জায়গায় অদ্ভুত এক যন্ত্রণা ফুটে উঠল। মুহূর্তের মধ্যেই সে যেন অস্থির হয়ে উঠল। কোনো কথা না বলে দ্রুত ঝুঁকে পড়ে তরীর কপালে খুব আদুরে করে একটা চুমু দিল। তারপর আদুরে গলায় বলল,

__সরি, বাবুই! আমি খুব সরি। সেদিন আমার ভুল হয়ে গিয়েছিল, তার জন্য তো আমি তোকে অনেক বার সরি বলেছি বাবুই, এখনও বলছি প্রয়োজন হলে সারাজীবন বলে যাবো।

তরী হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে হৃদয়ের দিকে। আজকাল মাঝে মাঝেই এই মানুষটাকে ও একদমই চিনতে পারে না। কখনো ভীষণ কঠিন, আবার কখনো এতটা নরম , যেন সম্পূর্ণ অন্য একজন মানুষ। কিন্তু এই মুহূর্তে হৃদয়ের চোখে যে কোমলতা আছে, সেটা স্পষ্ট বুঝতে পারছে তরী।
তাই এই সুযোগটাও হাতছাড়া করল না ও। ঠোঁট একটু ফুলিয়ে, একটু অভিমানী আবদারের সুরে বলল,

__ আমি আপনার রুমে একটু থাকি?

এতটুকু কথা বলেই ও নিচের দিকে তাকিয়ে রইল। আর হৃদয় স্থির চোখে তাকিয়ে রইল ওর দিকে কিছুক্ষণ যেন তরী ঠিক কি বলল এবং আদোও সে ঠিক শুনলো কিনা সেটা বুঝে নিতে চাইছে। তারপর হঠাৎ করেই হেসে উঠল, হাসার তালে তালে হৃদয়ের সমগ্র শরীর অসাধারন ভাবে কেঁপে উঠলো, তরীর নজর এড়ালো না এই দৃশ্য।
অতঃপর হৃদয় শান্ত একদম আদুরে কন্ঠে বলল,

__তুই পুরো দিন, পুরো রাত থাকতে চাইলেও আমার কোনো আপত্তি নেই, আর থাকতে পারেও না। এই রুমের একমাত্র অধিকারিণী তুই।

কথাটা যেন হাওয়ার মত নরম হয়ে এসে তরীর কানে লাগল। তরীর আদুরে মুখটা মুহুর্তেই খুশিতে ঝলমল করে উঠল। বিছানা থেকে প্রায় লাফিয়ে উঠল ও। ওর চোখে এমন উচ্ছ্বাস, যেন কেউ ওকে পৃথিবীর সবচেয়ে বড় উপহারটা দিয়ে দিয়েছে।

তরী সেভাবেই আবেগীয় গলায় জিজ্ঞেস করলো ,
__ সত্যিইইই।

হৃদয় কোনো জবাব দিল না। শুধু মৃদু হাসল। তারপর হাত বাড়িয়ে আলতো করে টেনে দিল তরীর তুলতুলে গালটা। কিন্তু তাদের দুজনের অগোচরেই আরেক জোড়া চোখ দেখছিল তাদের।
দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে ছিল ইনায়া। তার চোখ দুটো রাগে জ্বলছে। বুকের ভেতরটা যেন আগুনে পুড়ছে। তরীর প্রতি এতদিনের তার বিরক্তি আর রাগ ধীরে ধীরে এক অদ্ভুত হিংসায় পরিণত হলো আজ। হৃদয়ের তরীর প্রতি এতটা খেয়াল, এতটা যত্ন সেটা তার সহ্য হচ্ছিল না কিছুতেই।

ঘরের ভেতরে হৃদয় তখন ধীরে ধীরে তরীর কাছ থেকে সরে এসে দরজার দিকে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা ভেতর থেকে লক করে দিল। তারপর বাথরুমের দিকে হাঁটতে হাঁটতে খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,

__আমার জন্য কফি করতো। দেখ, ব্যালকনির পাশে কফি মেকার আছে।

জবাবে তরী পাক্কা গৃহিণীর মত করে বলল,
__ আমি জানি।

হৃদয় বাথরুমে ঢুকে দরজাটা বন্ধ করতেই ঘরে আবার নীরবতা নেমে এল। তরী কয়েক মুহূর্ত স্থির হয়ে বসে রইল। কিছু সময়ের মধ্যেই বাথরুম থেকে পানির শব্দ ভেসে আসতে লাগল। সেই শব্দটা কিছুক্ষণ চলার পর যখন থেমে গেল। ঠিক তখনই তরী তাড়াতাড়ি করে উঠে দাঁড়াল। তারপর দ্রুত পায়ে ব্যালকনির দিকে এগিয়ে গিয়ে কফি মেকারের সামনে দাঁড়াল। যতটা সম্ভব মনোযোগ দিয়ে কফি বানাতে লাগল। যেন এর থেকে কোনো বড় কাজ নেই এই পৃথিবীতে।

কয়েক মিনিট পর…..

বাথরুমের দরজা খুলে বেরিয়ে এল হৃদয়। তার কোমরে শুধু একটা সাদা তোয়ালে জড়ানো। ভেজা চুল থেকে এখনো পানির ফোঁটা পড়ছে। সে মাথায় তোয়ালে দিয়ে চুল মুছতে মুছতে ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। ঘরের আলোয় তার ভেজা শরীরের রেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যেন। এইদিকে তরী কফির মগটা দুহাতে ধরে দাঁড়িয়ে আছে। পুরো শরীরটা যেন কেমন জড়সড় হয়ে গেছে ওর। ভুল করেও একবারও হৃদয়ের দিকে তাকাচ্ছে না ও। চোখ নামিয়ে রেখেছে মেঝের দিকে। হৃদয়ের পায়ের শব্দ ধীরে ধীরে যতটা কাছে আসছে তরীর বুকের ভেতরটা ততই জোরে ধুকপুক করতে শুরু করেছে।

__ কফি করেছিস?

হৃদয়ের গম্ভীর কণ্ঠ শুনে তরী মাথা তুলে তাকাল না। শুধু উপরনিচ মাথা নেড়ে হ্যাঁ বোঝাল। হৃদয় হাত বাড়াতেই তরী চুপচাপ মগটা তার হাতে ধরিয়ে দিল। তারপর দৌড়ে গিয়ে হৃদয়ের বিছানায় উঠে গুটিসুটি মেরে বসে পড়ল ও। হৃদয়ও আর কিছু বলল না। ধীরে ধীরে কফিতে চুমুক দিতে লাগল। আজ অদ্ভুত এক শান্তি লাগছে তার মনমস্তিষ্কে। যেই তরী কিছুদিন আগেও তাকে দেখলে পালায় পালায় করতো আজ ও নিজের ইচ্ছায় তার কাছে এসে বসে আছে, তার রুমে থাকতে চাইছে ব্যাপারটা হৃদয়ের কাছে স্বপ্নের মতো সুন্দর লাগছিল। সে ধীরে মাথা ঘুরিয়ে তাকাল বিছানায় বসে থাকা ছোটখাটো আদুরে মেয়েটার দিকে।

তরী তখন নিজের বড় বড় চোখ দুটো ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে রুমটা দেখছে। কখনো দেয়ালের দিকে, কখনো বুকশেলফের দিকে, কখনো জানালার বাইরে তাকাচ্ছে যেন প্রথমবার দেখছে ও এই ঘর।

হৃদয় মন্ত্রমুগ্ধের মত তাকিয়ে রইল তরীর দিকে।
তরীকে দেখে তার মনে হচ্ছিল যেন নীল আকাশের মাঝে হঠাৎ ভেসে ওঠা কোনো শুভ্র মেঘ। তার এই গাঢ় নীল রঙের রুমটায় তরী যেন নীলাম্বরী শুভ্র কন্যা । এই ছোট্ট, সাদা তুলোর মতো মেয়েটা যেন নিজের অদৃশ্য আলো ছড়িয়ে পুরো ঘরটাকে আলোকিত করে দিয়েছে।

হৃদয় বুঝতেই পারল না কখন তার ঠোঁটের কোণে মৃদু এক হাসি ফুটে উঠেছে। আর বিছানায় বসে থাকা তরী তখনও নির্বিকার ভাবে চারপাশ দেখছে একদম অজান্তে।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply