Golpo romantic golpo নয়নার এমপি সাহেব

নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ২২


নয়নার এমপি সাহেব

পর্ব:- ২২
লেখনীতে:- Sanjana’s – গল্পঝুড়ি

হৃদয় হাসলো, অতঃপর বৃদ্ধাঙ্গুল দিয়ে তরীর ঠোঁটের লাগা খাবার মুছতে মুছতে বলল,
__ তার বদলে আমি কি পাবো?

তরী ঠোঁট ফুলিয়ে বলল,
আপনাকে কি দেব আমি? আপনার তো সবই আছে। তরীর কথায় হৃদয়ের ঠোঁটের কোণে বাঁকা এক হাসি ফুটে উঠল। চোখ দুটো অদ্ভুত ঝিলিক দিল। সে ধীরে ধীরে মুখটা তরীর কাছে নিয়ে বলল, সবথেকে প্রয়োজনীয় জিনিসটাই তো নেই আমার।

তরী কৌতূহলী হয়ে তাকিয়ে বলল,
__ কি নেই আপনার কাছে?

হৃদয় আরও একটু ঝুঁকে এল। তারপর কণ্ঠস্বর একটু নিচে নামিয়ে বলল,
__ ফিজিক্যাল রিল্যাক্সেশন।

হৃদয়ের এহেন কথায় তরী কিছুক্ষণ বোকার মতো তাকিয়ে রইল তার দিকে। হৃদয়ের কথার আগামাথা কিছুই বুঝতে পারছে না বেচারি। অতঃপর ও মুখ কুঁচকে বলল,
__ মানে…?

হৃদয় চোখ সরু করে তাকাল, তারপর মৃদু হেসে বলল—
__ মানে সময় হলে বুঝতে পারবি।

তরী সাথে সাথে মুখ ভেংচে দিল। ওর এই শিশুসুলভ অভিব্যক্তি দেখে হৃদয়ের হাসিটা আরও গভীর হল। সে হাত বাড়িয়ে আলতো করে তরীর দুই গাল চেপে ধরে বলল,

__ কামড়ে খেয়ে ফেলব তোকে।

__ ইশ! মানুষ আবার খাওয়া যায় নাকি? চোখ গোল করে বলল ও।

হৃদয় আর কিছু বলল না। শুধু একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল ওর দিকে, যেন সত্যিই খেয়ে ফেলতে ইচ্ছে করছে তার।


বিকেলের আলো ধীরে ধীরে বুজে যাচ্ছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা হালকা বাতাসে পর্দা নড়ছে। তরী নিজের রুমের বিছানায় চুপচাপ বসে আছে। মুখটা কেমন যেন কালো হয়ে আছে ওর। ওর পাশেই বসে আছে হৃদি। দুজনের মুখেই চিন্তার ছাপ স্পষ্ট। কারণটা খুবই গুরুতর।
ইনায়া কয়েক দিনের জন্য খান বাড়িতে বেড়াতে আসছে। এই খবরটা শুনেই তরী আর হৃদির মাথায় বাজ পড়লো। তরীর চিন্তিত মুখ দেখে হৃদি গম্ভীর কন্ঠে বলে উঠলো,

__ শোন তরী এইভাবে মনমরা হয়ে বসে থাকলে হবে না, ইনায়া আপু যখন এখানে আসবে, এক মাসের আগে তো যাবে বলে মনে হচ্ছে না।

হৃদির কথার পাছে তরী চুপ করে রইল।

হৃদি আবারও বলল,
_ শিরিন ফুফি তো বলল আপুর এক্সাম শেষ। তার মানে আপু অনেকদিনের প্ল্যান করেই আসবে। তারপর একটু ঝুঁকে ফিসফিস করে বলতে লাগল, _ দাভাইকে পটানোর ধান্ধা করতাছেনা ওই ছেমরি!

মুহূর্তেই তরীর মুখটা আরও চুপসে গেল। যেন কেউ তার বুকের ভেতর ছুরির আঘাত করেছে।

হৃদি হয়তো তরীর মন খারাপটা বুঝতে পেরেছে, তাই ও তরীকে আশ্বাস দিতে তরীর কাঁধে হাত রেখে বলে উঠলো,
__ দেখ তরী এখন মন খারাপ করে লাভ হবে না, এখন থেকে সকাল বিকাল দাভাই বাড়িতে থাকলেই তুই দাভাই এর পিছে পিছে থাকবি , একদম দাভাইয়ের পেছন ছাড়বি না বুঝতে পারলি?

তরী অবাক হয়ে বলল,
__কিহ?

হৃদি দৃঢ় স্বরে বলল—
__ হ্যাঁ। এমনভাবে থাকবি যাতে করে ওই ইনায়া আপু দাভাইয়ের ধারেকাছেও ঘেঁষতে না পারে।

__ কিন্তু আমি উনার পিছু পিছু থাকলে উনি যদি রেগে যান? ভয়ে ভয়ে বলল ও।

হৃদি মাথা নেড়ে বলল,
__আমার সেরকমটা মনে হয় না। উল্টো ইনায়া আপু যদি এরকম কিছু করে, তখনই দাভাই রেগে যেতে পারে। এমনিতেও আর পনেরো দিন পর ইলেকশন। তুই কি চাস এইসব নিয়ে দাভাই রেগে থাকুক? বা কোনো ঝামেলা হোক? আর এইটার প্রভাব ইলেকশনে পড়ুক?

তরী তৎক্ষণাৎ মাথা নাড়ল। না , ও এইরকমটা একদমই চায় না।

__ না, আমি এমনটা চাই না।

__তাহলে যেরকমটা বলছি, সেটাই কর। এখন থেকে তুইই দাভাইয়ের অফিশিয়াল বডিগার্ড।
হৃদি দৃঢ় স্বরে বলতেই তরী একটু দ্বিধা নিয়ে মাথা নেড়ে বলল,

__আচ্ছা…


পরেরদিন,
আজ সকালেই ইনায়া এসে পৌঁছেছে খান বাড়িতে। তবে সকাল থেকে হৃদয় বাড়িতে না থাকায় বিষয়টা নিয়ে তরী খুব একটা মাথা ঘামায়নি। কিন্তু সময়ের সাথে সাথে সেই নিশ্চিন্ত ভাবটা ধীরে ধীরে উধাও হয়ে যাচ্ছে।
সকাল গড়িয়ে দুপুর হল। দুপুর পেরিয়ে বিকেল এল। আর বিকেল যখন ধীরে ধীরে সন্ধ্যার দিকে ঢলে পড়তে লাগল, তখন থেকেই তরীর বুকের ভেতর অদ্ভুত এক অস্থিরতা বাসা বাঁধতে শুরু করল। কারণটা খুবই সহজ—
আর কিছুক্ষণের মধ্যেই হৃদয় বাড়ি ফিরবে। আর হৃদয় বাড়ি ফিরলে ইনায়া নিশ্চয়ই ওর আশেপাশে ঘুরঘুর করবে সারাক্ষণ। এই চিন্তায় তরী করিডোরের এপার থেকে ওপার হেঁটে চলছে অনবরত। বিকেল থেকে একটানা ও এই কথাটাই ভেবে চলেছে। এইদিকে হৃদিও কোমড়ে হাত দিয়ে তরীর সামনে দাঁড়িয়ে ভেবে চলেছে কি করা যায়। অনেকক্ষণ মাথা ঘামানোর পর অবশেষে তরী আর হৃদি মিলে একটা বুদ্ধি বের করল।

যেই ভাবা, সেই কাজ। তরী তাড়াতাড়ি নিজের রুমে ঢুকে পড়ল। টেবিল থেকে দুটো বই আর একটা খাতা নিয়ে দ্রুত গুছিয়ে নিল। তারপর সেগুলো বুকের সাথে চেপে ধরে দরজার দিকে এগিয়ে যেতে লাগল। দরজার সামনে পৌঁছাতেই হৃদি চোখ টিপে ইশারায় বলল,

__অল দ্য বেস্ট!

তরী মাথা নেড়ে বড় করে একটা নিঃশ্বাস ফেলল। যেন নিজের সাহসটা একটু জড়ো করল ও।
তারপর ধীরে ধীরে দুতলার লম্বা করিডোরটা পেরিয়ে লিফটের সামনে এসে দাঁড়াল। এক মুহূর্ত থেমে আবার গভীর নিঃশ্বাস নিল। এরপর আঙুল বাড়িয়ে লিফটের চার নম্বর বাটনটা চাপল। তরীর গন্তব্য হৃদয়ের রুম। হৃদয় বাড়ি ফেরার আগেই ও হৃদয়ের রুমে গিয়ে বসে থাকবে। তরীর বিশ্বাস আছে যদি ও পড়াশোনার কথা বলে, বইখাতা নিয়ে বসে থাকে,তাহলে হৃদয় কখনোই ওকে কিছু বলবে না।

লিফটের দরজা ধীরে ধীরে খুলতেই তরী এক মুহূর্ত থেমে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন ধুকপুক করে উঠছে বারবার। চারদিকে একবার তাকিয়ে নিয়ে নিঃশব্দে করিডোরটা পেরিয়ে এগিয়ে গেল হৃদয়ের রুমের দিকে।

হৃদয়ের রুমের দরজাটা আজানো ছিল, কিন্তু লক ছিল না। তরী সাবধানে দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল। গভীর নীল রুমটা সবসময়ের মতই গুছানো। বড় কাঁচের জানালাটা খোলা, হালকা বাতাস ঢুকছে ভেতরে। বিছানার পাশের টেবিলে কিছু ফাইল আর কাগজপত্র রাখা। ঘরের প্রতিটা জিনিসেই যেন হৃদয়ের উপস্থিতি লেগে আছে। তরী একটু ইতস্তত করে এগিয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে বিছানার কোণায় বসে পড়ল। বুকের সাথে চেপে ধরা বই দুটো সামনে রেখে খুলে বসার ভান করল। কিন্তু ওর চোখ বইয়ের পাতায় থাকলেও মনটা অন্য কোথায়।


এইভাবেই কেটে গেল এক ঘন্টা। বসে থাকতে থাকতে তরীর এবার ঘুম পাচ্ছে। হঠাৎ করেই দরজার বাইরে কারো পায়ের শব্দ ভেসে এল।
তরী এবার সোজা হয়ে বসলো। বুকটা ধক ধক করছে ওর। মুহূর্তের মধ্যেই দরজাটা ঠেলে ভেতরে ঢুকল হৃদয়। দীর্ঘকায় শরীর, ক্লান্ত মুখে হালকা কঠিন ভাব। মনে হচ্ছে সারাদিনের ব্যস্ততা নিয়ে সোজা বাড়ি ফিরেছে সে। কিন্তু রুমে ঢুকেই ওর দৃষ্টি পড়ল বিছানায় বসে থাকা ছোট্ট মেয়েটার উপর।
এক মুহূর্তের জন্য হৃদয় থমকে গেল। কিছুক্ষণ তরীর দিকে একইভাবে তাকিয়ে থাকলো সে। তারপর ভ্রু কুঁচকে বলল,

তুই এখানে কি করছিস? হৃদয়ের গম্ভীর কণ্ঠে প্রশ্নটা শুনে তরী একটু চমকে উঠল। তারপর তাড়াতাড়ি বইয়ের পাতায় চোখ নামিয়ে নিয়ে ছোট গলায় বলল, আমি, আমি পড়তে এসেছি।

হৃদয় সন্দিহান চোখে ধীরে ধীরে এগিয়ে এল।
ওর চোখে সেই পরিচিত তীক্ষ্ণ দৃষ্টি।
__পড়তে এসেছিস আমার কাছে?

তরী ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল যেন, অতঃপর মাথা নিচু করে নরম গলায় আবারও বলল,
__না, আসলে পড়াগুলো বুঝতে পারছিলাম না তো তাই।

হৃদয় কয়েক সেকেন্ড চুপ করে ওর দিকে তাকিয়ে রইল। তারপর হঠাৎই বিছানার কাছে এসে, তরীর সামনে ঝুঁকে বইটার দিকে তাকাল।
__ তুই পড়তেও বসিস? দেখি কি পড়ছিস?

তরী তোতলাতে তোতলাতে বলল,
__ইকোনমিক্স।

হৃদয় এবার ঠোঁটের কোণে হালকা বাঁকা হাসি টানল। কেননা ভার্সিটিতে তরীর ইকোনমিক্স সাবজেক্টই নেই। হৃদয় ধীরে ধীরে সোজা হয়ে দাঁড়াল।

ঠিক তখনই করিডোর থেকে ভেসে এল কারো হাসির শব্দ। কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই দরজায় দেখা দিল ইনায়া।

_ হৃদয় ভাইয়া! তুমি এসে গেছো? আমি সেই কখন থেকে তোমার অপেক্ষায়। পরপরই ইনায়ার চোখ পড়ল বিছানায় বসে থাকা তরীর উপর। এক মুহূর্তের জন্য ইনায়ার হাসিটা বিরক্তিতে বদলে গেল। ও কপাল কুঁচকে বলল, _তরী তুই এখানে?

তরী কিছু বলবে তার আগেই হৃদয় কঠিন কন্ঠে বলল,
__তুই আমার রুমে কি করছিস? আমার রুমে কারোর আসা আমার পছন্দ নয় সেটা তোর জানা নেই?

হৃদয়ের কঠিন স্বরে হঠাৎই রুমের ভেতর একটা অদ্ভুত নীরবতা নেমে এল।

তখনই ইনায়া ঠোঁট বাঁকিয়ে মৃদু হেসে বলল,
_ তরী তো তোমার রুমে আছে ভাইয়া । তারপর ও একটু এগিয়ে এসে কটাক্ষভরা স্বরে বলল, _ কি রে? শুনতে পাচ্ছিস না ভাইয়া কি বলল? ভাইয়া অন্য কারোকে তার রুমে আসা পছন্দ করে না। যা, রুম থেকে বের হ এখন।

তরী আবারও কিছু বলতে নিলে, তার আগেই হৃদয়ের গম্ভীর কণ্ঠ আবার ঘর কাঁপিয়ে উঠল,

_ জাস্ট শাট আপ, ইনায়া। হৃদয়ের চোখে তীক্ষ্ণ দৃষ্টি। _ আমি নয়নকে বলিনি। তোকে বলেছি। কয়েক সেকেন্ড চুপ থেকে সে স্পষ্ট করে বলল,
_ এই বাড়িতে আমার যা কিছু , সবই ওর। কথাটা বলে এক মুহূর্ত থামল হৃদয়। তারপর নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে যোগ করল, _ এই কথাটা যেন আমাকে দ্বিতীয়বার বলতে না হয়।

হৃদয়ের কাছে অপমানিত হয়ে ইনায়া নিঃশব্দে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষন। তার মুখের আত্মবিশ্বাসী হাসিটা ধীরে ধীরে মিলিয়ে গেল এবং সেখানে স্পষ্ট ফুটে উঠল ঈর্ষা।

হৃদয় এবার দরজার দিকে ইশারা করে বললো,
__ নাও! ইউ ক্যান লিভ।

রুমটা আবার নিস্তব্ধ হয়ে গেল। তরী এখনও বিছানার কোণায় বসে আছে। ওর চোখে মুখে খুশির ঝিলিক। আর রুমে দাঁড়িয়ে থাকা ইনায়ার চোখে তখন স্পষ্ট জ্বালা আর অপমানের আগুন জ্বলছে। যে ও তরীকে জ্বালিয়ে দিবে।

চলবে।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply