নয়নার এমপি সাহেব পর্ব ১
”“আমি এমপি সাহেবের গুপ্তস্থানে গরম কফি ফেলে দিয়েছি হৃদি। বলেই হু হুঁ করে কেঁদে উঠলো তরী।
ঐদিকে তরীর এমন কথা শুনে হৃদি ড্যাবড্যাব করে তাকিয়ে আছে। ও এখনও বুঝতে পারছে না তরীর কথার মানে। তারপর চোখমুখ কুঁচকে ধীরে বলল হৃদি,,,
__গুপ্তস্থানে গরম কফি ফেলে দিয়েছিস মানে?
কী বলছিস তুই?
তরী মাথা নেড়ে ফুঁফাতে ফুফাতে বলল ,,,
__হ্যাঁ! এবং শুধু তাই নয় আমি ভুল করে উনার গুপ্তস্থানে হাত দিয়ে ছুঁয়ে দিয়েছি হৃদি।
এবার হৃদির চোখ আরও বড় হয়ে গেল। ঐদিকে তরী হাত দিয়ে মুখ ঢেকে কেঁদেই যাচ্ছে অনবরত।
থাম… থাম আগে। অতঃপর হৃদি তরীর কাঁধে হাত রাখল। কান্না থামা বোন আমার। কী হয়েছে, সবটা খুলে বল।
হৃদির শান্ত গলায় তরী কিছুটা স্থির হল। অতঃপর একে একে সব ঘটনা বলতে শুরু করল।
__মামনি আমাকে বলল, তরীমা এই কফিটা গিয়ে হৃদয়কে দিয়ে আয় তো। বিশ্বাস কর হৃদি, আমি মামনিকে কতবার করে বলেছি। আমি যাবো না মামনি, তোমার ওই জল্লাদ ছেলে আমাকে দেখলেই রেগে যায়। কিন্তু মামনি আমার একটা কথাও শুনল না।
তখনই হৃদি চাপা গলায় জিজ্ঞেস করল,,,
__তারপর? তারপর কি হয়েছে ? তুই দাভাই এর রুমে গিয়েছিলি কফি নিয়ে?
তরী মাথা নেড়ে সম্মতি জানাল।
__আমি ভয়ে ভয়ে উনার রুমে কফিটা নিয়ে যায়, গিয়ে দেখি উনি চেয়ারে বসে বই পড়ছেন আমি অনেক সাবধানেই কফিটা নিয়ে উনার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় , আর তখনই উনি এত জোড়ে ধমকে উঠলেন আমাকে….
মুহুর্তেই ওর চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই দৃশ্য। হৃদয়ের সামনে কফি নিয়ে দাঁড়াতেই হৃদয় হঠাৎ গর্জে উঠলো,,,,
__বড়দের রুমে ঢোকার আগে পারমিশন নিতে হয় এতটুকু জানিস না ইডিয়ট? বেসিক ম্যানারসটুকুও নেই তোর মধ্যে? হৃদয়ের বলা শব্দগুলো এত জোরে, এত তীক্ষ্ণ ছিল যে তরী ভয়ে আঁতকে উঠলো। ভয়ে রিতিমত হাত থেকে কফির গ্লাসটা ছেড়ে দেয় ও এবং তৎক্ষণাৎ সেটা হৃদয়ের উরুতে পড়ে , যার দরুন কফির বেশিরভাগটাই ছিটকে পড়ে যায় তাঁর শরীরের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায়। আর কাপটা আছড়ে পড়ে মেঝেতে এবং ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে যায়।
অকস্মাৎ এই ঘটনায় হতভম্ব হয়ে যায় তরী। ও কি করেছে কিছুই বুঝতে পারছেনা যেন। শুধু দেখল, হৃদয়ের শরীরের ওপর গরম কফি পড়ে আছে। স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়ায়, ভয় আর অপরাধবোধে ও হাত বাড়িয়ে সেই জায়গাটা ঝাড়তে শুরু করলো। কফি এতটাই গরম ছিল যে মুহূর্তেই তরীর হাত লাল হয়ে গিয়েছে। তাহলে হৃদয়ের অবস্থা কী হতে পারে? ভাবতেই তরীর শরীর কেঁপে উঠল।
এইদিকে সবটা শোনার পর হৃদি চুপ করে বসে রইল। তার কানে দিয়ে যেন ধোঁয়া বেরোচ্ছে। একদিকে ও বুঝতে পারছে, তরী কতটা বড় ভুল করে ফেলেছে, যদিও সেটা পুরোপুরি অনিচ্ছাকৃত। অন্যদিকে ভাইয়ের সেই করুণ অবস্থার কথা ভাবতেই হৃদির বুকের ভেতর মায়া আর দুশ্চিন্তা একসাথে জমে উঠল। এই ঘটনাটা যে শুধু একটা দুর্ঘটনা নয়, এটা যে সামনে আরও বড় ঝড় ডেকে আনতে পারে, সেটা হৃদি গভীরভাবে অনুভব করতে পারছে। ওর দাভাই এমনিতেও খুব রাগী মানুষ আর কোনো এক কারণে সে তরীকে একদম পছন্দ করে না। সবকিছু ভেবেই হৃদির দুশ্চিন্তা বাড়লো।
হৃদি কয়েক সেকেন্ড চুপ করে রইল। তারপর কপালে হাত ঠেকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
__ তুই যে কী কাণ্ড করেছিস তরী!
লাজু আবার কাঁদতে নিলে, হৃদি তৎক্ষণাৎ শক্ত গলায় বলল,,,,
__এই! আবার কাঁদবি না। যা হয়েছে হয়ে গেছে। এখন মাথা ঠান্ডা রাখ।
তরী কাঁপা কণ্ঠে বলল,
__হৃদি আমি ইচ্ছে করে কিছুই করিনি। উনি এমনভাবে চেঁচালেন যে আমার মাথা কাজ করা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। কফিটা কি করে পড়ে গেল আমি বুঝতেই পারিনি।
তরীর চোখের সামনে এক সেকেন্ডের জন্য ওর হৃদয় এর রাগী মুখটা ভেসে উঠল।
ঐদিকে হৃদি জানে, তার ভাই রেগে গেলে সামনে যা পায় তাই ধ্বংস করে দিতে পারে। তার ওপর এমন একটা দুর্ঘটনা ভাবতেই মাথা ঝিমঝিম করে উঠছে ওর। হৃদি আবারও শান্ত গলায় বলল,,,
__তারপর দাভাই কিছু বলেনি তোকে? হৃদি সাবধানে প্রশ্ন করল।
তরী ঠোঁট কামড়ে বলল,,,,
_ উনি কিছুক্ষণ একদম নড়েননি। তারপর দাঁতে দাঁত চেপে শুধু বললেন,,,, _বেরিয়ে যা। এখনই… এবং আমিও আর এক সেকেন্ডও দাঁড়াইনি। দৌড়ে বেরিয়ে এসেছি।
এইবার হৃদি একটু স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলল।
__তাহলে অন্তত তখন তোকে কিছু বলেননি। এটা ভালো লক্ষণ।
তরী অবাক হয়ে তাকাল।
__ভালো লক্ষণ?
হৃদি মাথা নাড়ল।
__হ্যাঁ। দাভাই যদি তখনই ফেটে পড়ত, তাহলে তুই হয়তো আর এখন বেঁচে থাকতি না। হৃদির এমন কথায় তরী ভয়ে মাথা নাড়ল।
তারপর হৃদি তরীর কাঁধে হাত রেখে নরম গলায় বলল,,,
__শোন, এটা দুর্ঘটনা। তুই কোনো খারাপ উদ্দেশ্যে করিসনি কিছু। তুই আসলে সাহায্যই করতে গিয়েছিলি।
জবাবে তরী ফিসফিস করে বলল,
__কিন্তু উনি তো এইটা বুঝবেন না হৃদি। উনি এমনিতেই আমাকে সহ্য করতে পারেন না।
জবাবে হৃদি একটু ভেবে বলল,
__দেখ, দাভাই যতই রাগী হোক, সে অন্ধ নয়। সে বুঝবে এটা ভুলে হয়েছে। আর যদি দরকার পড়ে, আমি নিজে দাভাই এর সাথে কথা বলব।
তরী ভীত চোখে তাকাল।
__তুই বলবি?
হৃদি দৃঢ়ভাবে বলল,
__হ্যাঁ। নয়তো আম্মুকে বলব।
তরীর চোখ ভিজে উঠল, কিন্তু এবার সেই জল কৃতজ্ঞতার। হৃদি হালকা করে তরীর মাথায় টোকা দিল।
__বোকা কোথাকার।
ঘরের ভেতর আবার একটু নীরবতা নেমে এল। কিন্তু হৃদির মাথার ভেতর তখন একটাই চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে— ওতো বলে দিয়েছে তরীকে কিন্তু
এই দুর্ঘটনার পর হৃদয় কী প্রতিক্রিয়া দেখাবে?
তা ওর জানা নেই।
ঐদিকে হৃদয়ের রুমে হৃদয় চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে। চোখের সামনে খোলা বইটা পড়ছে না সে। মেজাজ এমনিতেই তেতে আছে তার উপর তরীর সেই কাণ্ড আগুনে ঘি ঢেলে দিয়েছে যেন।
হঠাৎই হৃদয় চেয়ার ঠেসে উঠে দাঁড়াল। অতঃপর রাগী গলায় বলল,,,,
__এই বাড়িতে এক কাপ কফির জন্য কি আমাকে অনন্তকাল অপেক্ষা করতে হবে?
হৃদয়ের চিৎকারে খান বাড়ি যেন কেঁপে উঠেছে। দেয়ালের ঘড়িটা পর্যন্ত কেঁপে উঠলো। নিচতলায় বসে থাকা অনিমা বেগম আঁতকে উঠে দাঁড়ালেন। বুকের ভেতরটা ধক করে উঠল একমুহুর্তে উনার—ছেলের এই স্বর মানেই বয়ে আনা ঝড়।
ঐদিকে হৃদির ঘরের এক কোণে তরী ঘাপটি মেরে বসে আছে। ভয়ে ওর হাত-পা ঠান্ডা হয়ে এসেছে। চোখের সামনে বারবার ভেসে উঠছে হৃদয়ের রাগী মুখ, জ্বলন্ত চোখ। মনে হচ্ছে, এই বুঝি দরজা খুলে হৃদয় ঢুকে পড়বে।
সেই মুহূর্তে এক সেকেন্ডও দেরি করল না হৃদি। দ্রুত পায়ে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল ও।উদ্দেশ্য ভাই এর জন্য কফি বানাবে। কিচেনে ঢুকেই হৃদির প্রথম চোখ পড়ল তার মা অনিমা বেগম ইতিমধ্যেই কফি বানাচ্ছেন। হাতে তাড়াহুড়োর ছাপ, চোখেমুখে দুশ্চিন্তা।
__আম্মু…
হৃদির ডাকে অনিমা বেগম ফিরে তাকালেন।
উনি দুশ্চিন্তায় বললেন,,,
__ তোর দাভাইয়ের হঠাৎ কী হয়েছে? এত রেগে আছে কেন? আর কফিটা তো আমি তরীর হাতেই পাঠিয়েছিলাম…
জবাবে হৃদি দুঃচিন্তা নিয়ে বলল,,,,
__সে অনেক কাণ্ড ঘটে গেছে আম্মু। আগে দাও, কফিটা আমি ভাইয়াকে দিয়ে আসি।
হৃদির চোখের দৃঢ়তা দেখে অনিমা বেগম আর প্রশ্ন করলেন না। শুধু মাথা নাড়লেন। আপাতত এটাই সবচেয়ে দরকার।
হৃদয় স্বভাবতই রাগী। নিজের কাজ নিজে করতে পছন্দ করে সে। কিন্তু দুদিন ধরে অসুস্থ থাকায় সে নিচে নামছে না। তার উপর পার্টিগত নানা বিষয়, বাইরের চাপ, সব মিলিয়ে সে ভেতরে ভেতরে আরও অস্থির হয়ে আছে। এই কদিন অনিমা বেগম কিংবা হৃদিই তার খাবারদাবার রুমে দিয়ে আসছে।
হৃদি কফির কাপটা হাতে নিল। কাপের গরম ধোঁয়া উঠছে। ও ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠল। হৃদয়ের রুমের সামনে এসে দাঁড়িয়ে গভীর শ্বাস নিল একবার। তারপর দরজার সামনে দাঁড়িয়ে স্পষ্ট গলায় বলল,,,
__দাভাই আসবো?
__আয়। গম্ভীর কন্ঠে বলল হৃদয়।
হৃদির বুকের ভেতরটা কেঁপে উঠল একমুহুর্ত। কফির কাপটা হৃদয়ের হাতে তুলে দিয়ে ও বেরিয়ে যাওয়ার জন্য ঘুরতেই পেছন থেকে আবার হৃদয়ের কঠিন স্বর শোনা গেল—
__বাঁদরটাকে আমার রুমে আসতে বল।
এইটুকুই যথেষ্ট ছিল। হৃদির গলা মুহূর্তে শুকিয়ে গেল। বুকের ভেতর ধুকপুকানি বেড়ে গেল অস্বাভাবিকভাবে। ও ঘুরে দাঁড়িয়ে কিছু বলতে গিয়েছিল,,,
__দাভাই… তরী আসলে….
__কি বললাম তোকে আমি?
ব্যস হৃদি আর একটাও শব্দ করার সাহস পেল না। ধীরে মাথা নাড়ল, তারপর নিঃশব্দে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এল। ঘরের বাইরে এসে ও যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচল। কিন্তু এই স্বস্তিটুকুও ক্ষণস্থায়ী। কারণ যে দায়িত্বটা এখন তার কাঁধে, সেটা ভাবতেই বুক ভারী হয়ে উঠল।
অতঃপর হৃদি সোজা চলে গেল নিজের ঘরে।
তরী তখনও বিছানার এক কোণে গুটিশুটি মেরে বসে ছিল। চোখ লাল, মুখ শুকিয়ে আছে হয়তো ভয়ে। হৃদিকে দেখামাত্রই ও উঠে দাঁড়াল।
__আমি যাবো না হৃদি। আমি কিছুতেই যাবো না ।আমি ওই জল্লাদের রুমে যাবো না। আমাকে মেরে ফেলবে ঐ লোক। কাঁপা কণ্ঠে বলল তরী।
হৃদি শক্ত করে তরীর হাত চেপে ধরল।
__কিছু হবে না। আমি আম্মুকে গিয়ে বলছি দ্রুত দাভাই এর রুমে যা। না গেলে দাভাই আরও রেগে যাবে।তখন পরিস্থিতি আমাদের হাতের বাইরে চলে যাবে।
তরীর চোখে আতঙ্ক জমে উঠল। ওর ঠোঁট কাঁপছে। চোখের কোণে জল জমে আছে। ইচ্ছে করছে দৌড়ে পালিয়ে যেতে । ইচ্ছে করছে দৌড়ে এখান থেকে পালিয়ে যেতে। কিন্তু তা তো সম্ভব নয়।
হৃদি আবারও আলতো করে বলল,,,,
__চল… আমি বাইরে পর্যন্ত যাচ্ছি তোর সাথে। তারপর আম্মুকে বলব গিয়ে আসতে।
হৃদি গভীর শ্বাস নিল। বুকের ভেতরটা কাঁপছে, পা দুটো যেন ভারী হয়ে গেছে। তবুও ধীরে ধীরে ও দরজার দিকে পা বাড়াল।””
চলবে।
সূচনা পর্ব
গল্প:-
নয়নারএমপিসাহেব
রেসপন্স পেলে এগিয়ে যাবো।
Share On:
TAGS: নয়নার এমপি সাহেব, সঞ্জনা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE